ভালোবাসা রইলো

ভালোবাসা রইলো

আজ আমার ভাইয়ার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। আমার ভাইয়ার নাম অক্ষর। ভাইয়া আমার থেকে দুই বছরের বড়। ভাইয়ার জন্মের সময় আমার আব্বুর প্রথম স্ত্রী মারা যায়। তারপর ভাইয়াকে লালনপালন করার জন্য বাধ্য হয়ে আব্বু আমার আম্মুকে বিয়ে করে। বিয়ের দুই বছর পর আমি জন্মগ্রহণ করি। ছোটবেলা থেকেই ভাইয়া শান্ত স্বভাবের । কারো সাথে মিশতো না তবে আমাকে যদি কেউ কখনো মারতো তাহলে ভাইয়া তার কাছে গিয়ে বলতো, আমার ছোটভাই ভালো না। তুমি ওর সাথে মিশবে না। ছোট থাকতে বেশ রাগ হতো ভাইয়ার উপর। কিন্তু যখন বুঝতে শিখলাম ভাইয়া কেন বলে। তখন থেকে ভাইয়ার উপর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। আব্বু আমাকে আর ভাইয়াকে একসাথে একই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। আমি প্লেতে আর ভাইয়া নার্সারিতে ভর্তি হয়। ভাইয়ার সাথে এক সাথে স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে সবসময় একসাথে থাকতাম। আমাদের সবকিছুতেই রুটিনবাঁধা ছিল।

এভাবেই চলে যায় চারটি বছর। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণীতে আর ভাইয়া চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো। চতুর্থ শ্রেণীতে ভাইয়ার রোল হয় দ্বিতীয় এবং রুহি আপুর রোল হয় প্রথম। এ নিয়ে ভাইয়ার সে কি মন খারাপ। কারণ ভাইয়া প্রতি শ্রেণীতেই প্রথম হতো। ভাইয়া ওদের শাখার ছেলেদের ভিতর শ্রেণী ক্যাপ্টেন ছিল এবং মেয়েদের ভিতর ছিল রুহি আপু। রুহি আপুকে ভাইয়া একটুও সহ্য করতে পারত না কিন্তু রুহি আপু ভাইয়ার সব খারাপ ব্যবহার মুখ বুজে সহ্য করত। সেদিন বাংলা স্যারের ক্লাস ছিল। আগে স্যারেরা সবাইকে বাড়ির কাজ করতে দিত। ভাইয়াও সেদিন বাড়ির কাজ দিয়েছিল এমনকি রুহি আপুও। ভাইয়া রুহি আপুর খাতায় স্যারের নামে খারাপ কথা লেখে। যাতে স্যার এটা দেখে রুহি আপুকে মারে। কিন্তু সেদিন রুহি আপু নিজের খাতাটা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে বিচার দেয়। স্যার রেগে গিয়ে ভাইয়াকে অনেক মারে। সেদিন রুহি আপু ভাইয়ার মারা দেখে অনেক কেঁদে ছিল। নিজেই গিয়ে স্যারকে বলেছিল, স্যার অক্ষরকে আর মারেন না, ওর কষ্ট হচ্ছে। ভাইয়া সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল রুহি তোকে আমি কখনও ভালো থাকতে দেব না। আব্বু সেদিনের ঘটে যাওয়া কথাগুলো শুনে ভাইয়াকে ঢাকা নামক ব্যস্ত শহরে পাঠিয়ে দেয়।

আমাকেও অন্য স্কুলে ভর্তি করে দেয়। ভাইয়া ঢাকাতে যাওয়ার পর রুহি আপুর সাথে প্রায়ই দেখা হতো। রুহি আপু আমার কাছে ভাইয়ার কথা জানতে চাইলে আমি সেখান থেকে চলে যেতাম। রুহি আপুর বাসার পাশে প্রাইভেট পড়ার কারণে আপুর সাথে প্রায়ই দেখা হতো। আর দেখা হলেই আমি তাকে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু একদিন আর এড়িয়ে যেতে পারি নি। সে পথ ধরে বলেছিল, কাব্য যদি তুমি অক্ষর কেমন আছে, কোথায় আছে এগুলো না বলো তাহলে কাল আমাকে আর এভাবে দেখতে পারবে না। আমি আপুর কথা শুনে ভাইয়ার কথা সব বলে দেই। ভাইয়া ৬ মাস বা যখন ছুটি পেত তখনই বাসায় আসতো। আর তখনই ভাইয়ার সাথে আবার দুষ্টুমিতে মেতে উঠতাম। আর যখন চলে যেত খুব কষ্ট হতো। ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিতাম অনুরূরভাবে ভাইয়াও। এভাবে চলে যায় ৯ বছর। ভাইয়ার মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নেয়। রুহি আপুও মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নেয়। দুজনেই সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। ভাইয়া জানতো রুহি আপুও ওখানে সুযোগ পেয়েছে। তাই ভাইয়া ইচ্ছা করেই সোহরাওয়ার্দীতে ভর্তি হয়। আর সেখান থেকেই ভাইয়ার প্রতিশোধ নেওয়ার শুরু হয়। ভাইয়া জানতো রুহি আপু তাকে পছন্দ করে, তবে এটা জানতো না রুহি আপু তাকে ভালোবাসে।

কিন্তু আমি জানতাম রুহি আপু ভাইয়াকে ভালোবাসে। ভাইয়া রুহি আপুকে দেখিয়ে দেখিয়ে অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলা, ফাজলামি করা এগুলো করত। এগুলো রুহি আপু দেখে নিজে নিজে বেশ জ্বলত এটা ভাইয়া জানতো।

কিছু দিনের মধ্যেই রুহি আপু ভাইয়াকে জানিয়ে দেই তার ভালোবাসার কথা। কিন্তু ভাইয়া রুহি আপুকে দীর্ঘ এক বছর তার পিছনে ঘোরায়। শুধু ঘোরাত না প্রতিনিয়ত কষ্ট দিতো। তবুও রুহি আপু কিছু বলতো না। কারণ রুহি আপুও জানতো ভাইয়া তাকে খুব ভালোবাসে। একসময় ভাইয়া জানিয়ে দেয় তার ভালোবাসার কথা। সেদিন রুহি আপু অনেক কেঁদেছিল আর বলেছিল ছোটবেলায় কি করেছি তার জন্য এতো কষ্ট দিলে আমাকে। ভাইয়া আর রুহির আপুর রিলেশনের কথাটা আমি দুই পরিবারের সবাইকে জানাই। পড়াশুনা শেষ করে তাদের বিয়েও হয়। কিন্তু পূর্ণতার মাঝেও কিছু অপূর্ণতা থেকে যায়। ভাইয়া আর রুহির আপুর বিয়ের একবছর পর তাদের মেয়ে সন্তান হয়। তবে রুহি আপু সন্তান জন্মদানের সময় মারা যায়। এতে ভাইয়া পাগলের মতো হয়ে যায়। তাকে বাসায় আটকিয়ে রাখা যেত না।

ভাইয়া আর রুহি আপুর মেয়ের নাম রাখা হয় রসনি। তার বয়স যখন দুই বছর। তখন ভাইয়া নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজির পরেও তাকে পাওয়া যায়না। তিন বছর পর ভাইয়াকে পাওয়া যায়। তবে জীবিত না মৃত। ভাইয়ার কবরের সন্ধান পাওয়া গেছিলো ঝিনাইদহ পাগলাকানাই কবরস্থানে। ভাইয়া সেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ভাইয়া আমার জীবনে একটা বড় অধ্যায়। অধ্যায় বললে তাকে ছোট করা হবে। সে আমার জীবনের একটা অংশ। আমি আজ যতটুকু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি সবটুকুই তার জন্যে। যেদিন এস এস সিতে রেজাল্ট খারাপ করি, সেদিন ভাইয়া বলেছিল, জীবন কিন্তু অনেক সুন্দর কাব্য, তোর জীবন তোকে সাজিয়ে নিতে হবে। ভাইয়া তোর কথাগুলো আজো আমার জীবনকে সাজাতে সাহায্য করে। ভালোবাসি তোকে ভাইয়া। বেঁচে থাকতে চায় তোর স্মৃতিগুলোকে বুকে ধারণ করে।
ভালোবাসা রইলো সকল ভাইয়াদের প্রতি।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত