আমি আক্রান্ত

আমি আক্রান্ত

এডমিশন দিয়ে ইউনিভার্সিটি লাইফে পা দিয়ে তখনো আমার জড়তা কাটেনি ! মানে আগে মেয়েদের দেখলে দশহাত দূর দিয়ে হাঁটতাম আর ইউনিভার্সিটিতে পা দিয়ে সেটা পাঁচ হাত কমে গিয়েছিলো । কিন্তু মেয়েদের থেকে দুরত্বটা ঠিকই বজায় রাখতাম । প্রথম বছর কেটে গেলো অনেক বন্ধু জুটে গেলো কপালে , বান্ধবীও জুটলো তবে হাতে গোনা কয়েকটা তাও আবার কয়েকদিনের জন্য । মানে ধরেন ক্যাম্পাসে কোন অনুষ্ঠান লাগলেই যেতে বলে আমিও আজাইরা মানুষ চলে যাই তারপর বলির পাঠা বানিয়ে পকেট খালি করে ছেড়ে দেয় । এইভাবে কয়েক মাস যাওয়ার পর যখন দেখলাম অবস্থা খুবই খারাপ তখন পেত্নিগুলো পায়ে পড়ার মতো অনুরোধ করলেও আর যেতাম না , বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রেহাই নিতাম । এতে করে মাস শেষে কিছু টাকা বাঁচতো , যা দিয়ে মুরগির চাপ খাওয়া যেত কয়েকদিন … আহা কি টেস্ট ।

ক্লাস খুব কম করতাম । তবে ডিপার্টমেন্টের ক্রিকেট টীমের ক্যাপ্টেন থাকার জন্য স্যার ম্যাডামদের নজরে আসি । এছাড়া ক্যাম্পাসে প্রায় সব অনুষ্ঠানে থাকার চেষ্টা করি ঠিক এতটুকু ছাড়া আমায় খুঁজে পাওয়া মুশকিল ।

২১ শে ফেব্রুয়ারির ভোর সকালে আমার ফোনে একটা ফোন আসলো । ঘুম ঘুম চোখে খেয়াল করে দেখি ডিপার্টমেন্টের অনেক প্রিয় এবং শ্রদ্ধাভাজন স্যারের ফোন । ফোন ধরতেই বললো প্রভাত ফেরিতে আসতে । লাফ দিয়ে উঠে ৫ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে চলে গেলাম ক্যাম্পাসে । গিয়ে দেখি সাজ সাজ রব , পরীদের মেলা বসেছে । আমার ফ্রেন্ড সুমন ও দেখি চলে এসেছে । অনেক নীরিহ আর ঘুম কাতুর ছেলে এত সকালে কিভাবে এখানে আসে মাথায় ধরলো না ।

যাইহোক স্যারের সাথে দেখা করতেই প্রভাত ফেরি চলতে শুরু করলো ক্যাম্পাসের কিছু অংশ এক বার ঘুরে শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিতে হয় । নিরস বদনে হেঁটে চলেছি । চলতে চলতেই একটা মেয়েকে দেখতে পেলাম । চোখে চশমা , গাল দু’টো লাল , বোরকা পড়া বোরকার রংটা যে কি আমি ঠিক বলতে পারবো না ! কথার বলার সময় মেয়েটা হেসে হেসে কথা বলছে । আহ যা হওয়ার হয়ে গিয়েছিলো আমার , মানে বুকের মধ্যে ব্যাথা অনুভব করলাম । চোখ দু’টোকে ঐদিকে রাখার আর সাহস পেলাম না , হার্টফেল হয়ে যেতে পারে । চোখটা ঐ মেয়েটার দিকে থেকে ফিরিয়ে সুমনের দিকে নিয়ে বললাম –

আমি – দোস্ত ঐ মেয়েটা কে রে ?
সুমন – নাম মিমি আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ে সেম ইয়ার !
কত বড় লুচ্চা ভাবেন কোন মেয়ে এটা না বলতেই না দেখে গড়গড় বলে ফেললো মেয়েটার ডিটেইলস ! আসলে এরই বা দোষ কি মেয়েটার যা সুরত যে কেউ এর ব্যাপারে খোঁজ খবর রাখবে !
আমি – বন্ধু মেয়েটা কিন্তু ভালোই ।
সুমন – শুধু ভালো মানে ? আমার তো খুব ভালো লাগে !
আমি – তোর ভালো লাগে মানে ? ভাবি তোর ঠিক আছে ?
সুমন – হুহ আইছে মেয়েদের সাথে কথা বলার মুরদ নাই , মেয়েদের দেখলে ৫ হাত দূর দিয়ে হাঁটো আর তোমার জাগছে বিয়ের সাধ ? যা দেখি কথা বলে দেখা দেখি !

আমার আত্ন সম্মানে হাত দিলো এই হারামী ? ধুর থাক বলে প্রভাত ফেরি ছেড়ে বেরিয়ে আসলাম ! সুমন পেছন পেছন আসছিলো আর বলে যাচ্ছিলো যে – আরে রাগ করিস ক্যান ? কি এমন বললাম যে তুই বাঁকা হয়ে চলে যাচ্ছিস !

ওর খোঁচা মারা কথা শুনে আমি আরো জোরে হাঁটা শুরু করলাম , কিন্তু যখন বললো ক্যাম্পাসের বাইরের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের নাস্তাটা করাবে … তখন একটু আস্তে হাঁটা ধরলাম আর ভাবলাম যে যাক সকালের ফ্রি ফ্রি নাস্তাটা তো হয়ে গেলো । এরপর সেই রেস্ট্রুরেন্টে গিয়ে নাস্তাটা সেরে ফেললাম ! নাস্তা শেষ করতে করতে সুমনকে এটা বলেও শপথ করালাম যে করেই হোক মিমির সাথে আমার কিছু একটা করেই দিবে !

এরপর আর ক্লাস মিস দিতাম না । ক্লাসে স্যার বকবক করে যেত আর আমি ড্যাপ ড্যাপ করে মিমির দিকে তাকিয়ে থাকতাম ! মেয়েটা অনেকবার দেখে ফেলেছে ব্যাপারটা । প্রথম দিকে হাসতো পরবর্তীতে ক্লাস চলাকালীন সময় চোখে চোখ পরলেই চোখ গরম করে চাইতো মনে হতো আমায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবে । আর আমি এদিক না পারতাম কিছু বলতে না পারতাম না দেখে থাকতে।।

যাইহোক , এভাবেই কয়েকমাস পেরিয়ে গেলো ! ঐদিকে সুমনও চেষ্টা করে যেত । একদিন ক্লাস শেষে ক্লাসরুমের মধ্যে সবার সামনেই মিমিকে আমার ব্যাপারটা বলে । ক্লাসে সেদিন সেকি হাসাহাসি ! লজ্জ্বায় পড়ে গিয়েছিলাম সেদিন । এই সুমন গাঁধাটা মান সম্মান আবার শেষ করে দিলো । এরপর দ্রুত ক্লাস থেকে মাথা হেড করে বেরিয়ে আসি !

রাতে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে থাকলাম কি লজ্জ্বাজনক বিষয় এতকিছুর পর ক্লাসে যাবো কিভাবে সেটাই ভাবতেছিলাম ! এমন সময় হঠাত্‍ ফোন আসলো একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো – বিএফসিতে দেখা করবে ! ব্যস এতটুকুই বলেই রেখে দিলো । কে ফোন করেছিলো আমিও ঠিক এতটুকুতেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম । কারণ এই কন্ঠটা শুনার জন্যে আমিও অপেক্ষায় ছিলাম । নাম্বারটা বোধহয় সুমন গাধাটাই দিয়েছে মিমিকে । ধন্যবাদ জানালাম গাধাটাকে মনে মনে । আগামীকাল দেখা করে মিমি কি বলবে সেটা নিয়ে ভাবতে থাকলাম ।

সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম বিএফসির উদ্দেশ্য ! রিকসায় উঠে ফোন দিলাম মিমিকে ফোনটা ধরে বললো ও নাকি পৌছে গেছে ! আমি রিকসা ওয়ালাকে তাগাদা দিয়ে দশমিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম বিএফসিতে । গিয়ে দেখি কোনার একটা টেবিলে বসে আছে কি যেন একটা রংয়ের ড্রেস পড়ে । ঐযে ক্যান্সার রোগীদের সাহায্যের জন্য সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট টীম মাঝে মধ্যে লাল ধরনের যে জার্সি পড়ে খেলতে নামে ঠিক সেই রংয়ের সালোয়ার পড়েছিলো । চোখের চশমাটাও ঐ রংয়েরই ঠোঁটের লিপিস্টিকও একই কালারের ! আমি গিয়ে সামনের চেয়ারে বসে শুধু দেখে যাচ্ছিলাম ।

একটু পর মিমি বললো –

মিমি – কি হয়েছে ?
আমি – আমি আক্রান্ত !
মিমি – কিসে ?
আমি – তোমাতে !

শোনামাত্র মেয়েটা লাল গালে একটু হাসি দিলো আর আমি আবারও আক্রান্ত হলাম তবে সেটা ছিলো হার্টে সমস্যা ! তবে এই হাসিটা দেখার জন্য আমি হাজারো রোগে আক্রান্ত হতে রাজি !

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত