অভিনয়

অভিনয়

সকাল সাতটা।ভার্সিটি বন্ধের সময়ে এত সকালে সাধারণত আমার ঘুম কখনই ভাঙে না।আজকেও ভাঙত না।কিন্তু আজ এত সকালে ঘুম ভাঙানোর পেছনে দায়ি ব্যক্তিটা হচ্ছে মুরাদ।সে আমাদের মেসের কেয়ারটেকার।গত ১৫ মিনিটে সে আমাকে দশবার ডাকতে এসেছে।প্রতিবারই কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল সে।যেটা আমি ঘুমের তীব্রতায় বুঝতেই পারিনি।ঠিক দুই মিনিটের মধ্যেই মুরাদ আবারো এলো।”ভাইজান আপনি এতক্ষনে উঠছেন, ওইদিকে তো সর্বনাশ হয়ে গেছে।নিচতালায় বিশাল গন্ডগোল লাগছে।তারাতারি আপনি নিচে চলেন নিচে আপনাকে খুজতেছে।”..

মুরাদের কথা শুনে মনে হল মেসে বিশাল কিছু হয়েছে।পুলিশ আসছে বড় কোনো আসামি ধরতে।আর আসামি কাওকে পাইনি ধরার জন্য তাই সাদাসিদা আমাকেই ধরে নিয়ে যাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে।আমি ভয় পেয়ে বললাম, “পুলিশ আসছে নাকি?”..

মুরাদ একনিঃশ্বাসে বলল,পুলিশ আসলে তাও বাচঁতাম।সাতসকালে কোত্থেকে আসছে এক মেয়ে।মেয়ে নাকি আপনারে চিনে।আপনারে ডাকতে কয়।”..আমি বললাম,কি বল,এই সকালে কে আসবে আমার।আচ্ছা তুমি নিচে যাও আমি আসছি রেডি হয়ে।”ঠিক আছে ভাই জলদি আইসেন..”

শার্ট পরছি আর ভাবছি এত সকালে কে আমাকে ডাকতে আসবে।পরিবারের সবাই তো গ্রামের বাসাতেই থাকে আমার।এই শহরে পরিচিত বলতে শুধু বন্ধুবান্ধব আর বেস্ট ফ্রেন্ড রিমি…তাহলে কি রিমিই??..

আমার ধারণাই সত্যি হল।নিচতালার সোফায় জড়সড় হয়ে বসে আছে রিমি।ওকে ঘিরেই এত হইচই।মেসে কমবেশি অনেকেরই মেয়ে গেস্ট আসে।তবে রিমির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা।হইচই এর কারণ হচ্ছে তার পোশাক।সে এই সকালে বিয়ের পোশাক পরে সোফায় বসা।লালটুকটুকে বেনারসি শাড়িতে সাত সকালে কাওকে দেখলে অবাক হওয়া স্বাভাবিক।তাও আবার এই ঘিঞ্জি গলির মেসে।আমাকে দেখার সাথে সাথে রিমি বলল,”চল”।আমি বললাম কোথায়?.. ও বলল ‘বাইরে যেয়ে বলছি।আমি বললাম,ব্রাশ করি নাই তো..শুধু চোখে পানি দিছি।আর মানিব্যাগও আনি নাই।’ “কিচ্ছু লাগবে না তোর।তুই শুধু আমার সাথে এখন যাবি,ব্যাস। আমি চুপ করে বের হয়ে গেলাম।ওর কথার ওপর আর কিছু বলার ক্ষমতা আমার নাই…

‘সকাল সকাল এরকম সং সাজার মানে কি?’..চলন্ত রিক্সায় আমিই প্রথম নিরবতা ভাঙলাম..’কোনো মানে নেই।বাবা বিয়ে ঠিক করেছে।আজ আমার বিয়ে।আমি বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি।’..এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল রিমি।আমি একহাজার ভোল্টের শক খেলাম।যেই মেয়ে পরিক্ষায় পাঁচ নম্বর কম এনসার দিয়ে বাইরে বের হয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে সেই মেয়ে কিনা বাসা থেকে পালিয়ে এসেছে?!!..এটা কিভাবে সম্ভব!?..’আর তুই তো জানিসই তুইই আমার একমাত্র কাছের বন্ধু ও দুঃসময়ের সাথি।তাই আমি ঠিক করেছি আমি তোকে বিয়ে করে তোর কাছে থাকব।’..

এতক্ষনে আমার অবাক হওয়ার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে।গা থেকে ঘাম ঝরাও শুরু হয়েছে।’এসব কি ফালতু কথা বলছিস তুই?..আ..আ..আমি তোকে বিয়ে করে রাখব কোথায়?. ওই মেসে?..আমার নিজেরই একমাসের মেসভাড়া বাকি।রুমে আড়াইশ টাকা আছে ওটা দিয়ে বাকি মাস চালাতে হবে আমার,,আর তুই বলছিস তোকে বিয়ে করতে?..বিয়ে করার পর মিষ্টি কিনার মত টাকাও নাই আমার কাছে এখন।’….’আরেহ তুই টাকার চিন্তা করিস না।ওসব আমি ম্যানেজ করে নেব।তুই শুধু বল বিয়ে করবি কিনা…’

আমি আমতা আমতা করে বললাম ‘সে নাহয় করা যাবে’।।”করা যাবে মানে কখন করা যাবে?…বাবা অন্য কারো সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পরে??..”…’না আসলে সেটা না’…’তাহলে কিটা?.এখন মানে এখনই বিয়ে করা লাগবে।তারপর আমার হাত ধরে বাবার সামনে যেয়ে দাড়াবি,কি পারবি না??..’

আমি ঢোক গিলে মাথা নাড়ালাম…।বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে রিমি বলল,’আচ্ছা সত্যি করে বল তো তুই কি আমাকে ভালোবাসিস না?’..

রিমির মত লাজুক চশমা পরা সিরিয়াস টাইপের একটা মেয়ের কাছ থেকে হুট করে এরকম প্রশ্ন শুনে আমি থতমত খেয়ে গেলাম।ওর মুখের দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম ওর চুলগুলো মুখের একপাশে ঝুকে আছে আর মায়াময় চোখ দুইটা আমার মুখ থেকে সত্যিটা শোনার জন্য আধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।আমি কোন ইতস্তত না করে বললাম,,’তোকে আমি প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম।।লাভ এট ফাস্ট সাইট।কিন্তু এতদিন বলতে পারিনি জানিস’

রিমি একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ছেড়ে বলল,,’মিশন সাকসেসফুল..আমি যা জানতে এসেছিলাম তা জানা হয়ে গেছে..’.আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম,এসবের মানে কি?..

মানে হল আমার বিয়ে টিয়ে এগুলা আসলে কিছুই না।কাল রাতে আমার বাবা মা নানুবাসায় বেড়াতে গেছে।আমি আর আপু বাসায় একা।আপু যখন শুনলো তোর আমার তিন বছরের এমন লুকোচুরি সম্পর্ক তখন আপু বলল হয়ত তুই আমাকে ভালোবাসিস।তুই যেহেতু এতদিন কিছু বলিস নি তাই তোর সাথে এই ছোট অভিনয়টা করার আইডিয়া দিল আপু।এইযে লাল বেনারসিটা দেখছিস এটাও আমার আপুর।অবশেষে তোর মুখ থেকে কথাটা বের করেই ছাড়লাম।কি বলিস?..

আমার ঘোর তখনও কাটেনি।আমি আমতা আমতা করে বললাম,তুই আমার মত ইনোসেন্ট একটা ছেলের সাথে এরকম করতে পারলি রিমি?..তোর মনে কি একটুও দয়ামায়া নাই?..রিমি মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে বলল ‘দয়ামায়া আছে কিনা জানিনা।তবে ভালোবাসা ঠিকই আছে কোনো একটা ইনোসেন্ট ছেলের জন্য’…আমি আর কিছু বললাম না।শুধু মনে মনে ভাবলাম,অভিনয় থেকে যদি দারুন কিছু হয় তবে তো অভিনয়ই ভালো!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত