স্মৃতির পাতায়

স্মৃতির পাতায়

আমিই মনে হয় একমাত্র ব্যাক্তি যে নাকি বউ নিয়ে প্রথম প্রেমিকার বাড়ি বেড়াতে এসেছি। তাও আমার প্রেমিকার অনুরোধে। তবে এখানে বেড়াতে আসার জন্য অবশ্য স্ত্রীকে একটি মিথ্যে বলতে হয়েছে। শশীকে বলেছি রোমিনা আমার বন্ধু। আসলে রোমিনা আমার প্রথম প্রেমিকা। রোমিনা’কে আগেই ফোনে বলে এসেছি শশী যেন কিছুতেই জানতে না পারে যে সে আমার প্রেমিকা ছিল।

রাতের আটটায় বাসে উঠেছি। গন্তব্য বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানা। সেখান থেকে নীলফামারীর নীল সাগর ও দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী ঘুরতে যাবার কথা। আমার আর শশীর আনন্দের সীমা নেই, কারণ এই প্রথম আমরা যমুনা সেতুর উপর দিয়ে যাব। রাতে বাসে যখন শশী আমার বুকে ঘুমাচ্ছিল, তখন তাকে ডেকে তুলেছি যমুনা সেতু দেখার জন্য। দেবীগঞ্জে পৌছলাম ভোর ছ’টায়। পৌছে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হবার পরপরই রোমিনার ফোন। রোমিনা বলতেছে,

“আমি জানি বাস ভোর ছ’টার দিকে আসবে, তাই নামাজ পড়ে আর ঘুমাইনি। আপনারা দেবীগঞ্জে নাস্তা করার চেষ্টাও করবেননা। ভ্যানে উঠুন, অল্প কিছুক্ষনের পথ। আমি নাস্তা তৈরী করে রেখেছি। কি আর করা? দেবীগঞ্চ বাজার পেরিয়ে সেতুর উপর থেকে ভ্যানে উঠলাম। কত সুন্দর গ্রাম বাংলার প্রকৃতি। বারবার জন্মাতে ইচ্ছে করে এই সোনার বাংলায়। চারিদেকে যেন হলুদের গালিচা বিছানো। সরিষা ফুলের মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তাটি। রোমিনার সাথে প্রেম করার সময় কতবার স্বপ্ন দেখতাম, আমি আর রোমিনা ভ্যানে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর আজ শশী আমার পাশে। এমনটাই কি হবার ছিল? তবুও হয়ে গেল।

রোমিনার বড় বোন রোজিনা আপুর সাথে ফোনে কথা বলত আমার এক বন্ধু। যদিও বন্ধুটি আমার চেয়ে বয়সে বড়। একদিন আমি দুর্বা ঘাসে শুয়ে আকাশপানে তাকিয়ে গান গাইতেছি। সাথে বন্ধু মাহমুদ ফোনে কথা বলতেছে। একটু পর এক মেয়ের কথা শুনলাম। “আপনার বন্ধু অনেক সুন্দর গান গায়”। কথাটা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মাহমুদ এতক্ষন ফোনের লাউড স্পিকার দিয়ে আমার গাওয়া গান শুনাচ্ছিল। আমি একটু রাগ দেখিয়ে বললাম, “মাহমুদ এটা কিন্তু ঠিক হয়নি।”মাহমুদ বলতেছে, “বেঠিকের কী হল? আমার শালিকা তোর গান শুনে প্রশংসা করছে।”

তখনই জানতে পারি মাহমুদ যার সাথে কথা বলে তার একটি ছোট বোন আছে। আমি রোজি আপুর সাথে কথা বলতে চাইলাম। আগেও বহুবার কথা বলেছি। রোজি আপু ফোন ধরার পর বলতেছি, “আপু তোমার ছোট বোন আছে এটাতো কখনো বলোনি তুমি?” বললে কী করতে? মাহমুদ’কে ভায়রা বানাইতাম। বানাও নিষেধ করল কে? কিন্তু আমার বোনতো ছোট। আমিওতো মাহমুদের ছোট। দেখো কথা বলে রাজী করতে পারো নাকি। রাজী করতে আমার মাস দুয়েক সময় লেগেছিল। তবে না দেখেই জড়িয়ে পড়েছিলাম। মাহমুদও রোজীর সাথে প্রেম করে না দেখেই। ২০০৯ সালে ফেসবুক তেমন কেউ ব্যবহার করতনা। ছবি পাওয়া বা দেখার মত উপায় ছিলনা। তাই না দেখেই কথার মায়ায়, অনুভূতির টানে ভালোবেসেছিলাম রোমিনা’কে।

মাহমুদ হুট করেই পঞ্চগড়ে চলে গেলো দেখা করতে। তখন আমি বাড়ি না থাকায় যেতে পারিনি। একদিন পর যখন মাহমুদ আসল, আমি গাল ফুলিয়ে বসে আছি। একটা দিন পর গেলে কী এমন ক্ষতি হত? তাহলে তো আমিও যেতে পারতাম। তখন মাহমুদ বলতেছে, “মন খারাপ না করে খুশি হওয়ার কথা তোর। রোজীর চাইতে রোমিনা অনেক বেশি সুন্দর।”আমিতো আরো রাগ দেখিয়ে বললাম, “তাহলে মোবাইলে ছবি তুলে আনলেনা কেন?” ছবিতো তুলতেই দেয়না। রোজীর ছবিওতো তুলতে পারিনি।

মনে মনে, কল্পনায় রোমিনা’কে সাজাইতাম। কেমন হতে পারে রোমিনা। কথা বলার সময় চোখ বুজে কথা বলতাম। মনে হত চোখেই ভাসতেছে রোমিনা। রাতের পর রাত কথা বলেছি। বাংলালিংক এর পঁচিশ পয়সা মিনিট অফার ছিল তখন। গান গাইতাম, কবিতা বলতাম। কথা যেন কখনো ফুরাতনা। মনে হত খাওয়া দাওয়া ছেড়ে শুধু কথাই বলি। চিঠি লিখেছিলাম একবার রোমিনাকে। সাথে নিজ হাতে বানানো চুড়ির মধ্যে সূতা দিয়ে কারুকাজ করে দুইজনের নাম। চার পৃষ্ঠার চিঠি পড়ে ফোনে বলেছিল, “এত কথা লিখলে কীকরে?”আমি বললাম, “আমারতো তবুও মনে হয় কিছুই লিখা হয়নি।”

২০১১ সাল, একদিন আমি আর মাহমুদ বসে আছি। রাত সাড়ে আটটা বা নয়টা তখন। রোজীর ফোন রিসিভ করে মাহমুদ কথা বলতেছে। মাহমুদ ঘন ঘন আমার দিকে তাকাচ্ছে আর কথা বলতেছে। একসময় মাহমুদ প্রচন্ড রেগে গেল। বলতেছে, “তুই তোর চিন্তাটাই করলি। আমার ভাই আমার বন্ধুটার কথা একটিবার চিন্তা করলিনা। তুই একটা স্বার্থপর। তোর সাথে আজ থেকে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি আমার বন্ধুর মনে কষ্ট দিয়ে তোকে নিয়ে সুখী হতে পারবনা। আর কখনো ফোন দিবিনা আমাকে।”

আমি বুঝতে পারছিনা কী হল। জানতে চাইলেও মাহমুদ কিছু বলেনা। টানা চারদিন আমার সাথে দেখা করেনি মাহমুদ। ফোন বন্ধ, বাড়িতেও নেই। নানির বাড়ি নাকি গেছে। এদিকে রোমিনার ফোনও বন্ধ। আমি কিছুই বুঝতে পারতেছিনা। রোজীকে ফোন দিলাম, রিসিভ করেনা। অবশেষে রিসিভ করে কান্না করে দিয়ে বলতেছে, “ভাই আমাকে মাফ করে দাও। আমার আর কোন উপায় ছিলনা। আমাকে দেখতে আসছে ছেলে পক্ষ, পছন্দও হয়েছে। আমি মাহমুদ’কে ভালোবাসি, তাই বলছি আমি বিয়ে করবনা। তারপর ঐ ছেলে পক্ষ রোমিনাকে পছন্দ করল। ছেলে সেনাবাহিনীর সদস্য। সম্মন্ধ ভালো বলে বাবা মা রাজী হয়ে গেল। এখনতো কাবিন করে বিয়ে হয়ে গেছে। আমাকে মাফ করে দাও ভাই।”

আমার হাত থেকে ফোন পড়ে গেলো। নিস্তব্ধ পাথরের মূর্তির মত হয়ে গেলাম। মাসখানেক সময় লেগেছিল আমার স্বাভাবিক হতে। তারপর রোজীও কথা বলত রোমিনাও কথা বলত আমার সাথে। দু’জনই আমাকে অনেক বুঝাইতো একটা বিয়ে শাদি করে সংসারী হবার জন্য। বলছি, হ্যাঁ বাবা মায়ের একটা মাত্র ছেলে বিয়েতো করতেই হবে। মাহমুদ রোজীর সাথে আর যোগাযোগ করেনি। আমি এত করে বুঝাইলাম রোজীর কোন দোষ নেই তুমি কথা বলো। মাহমুদের এক কথা, ‘রোজীকে বিয়ে করলে তোর কষ্ট বাড়বে বৈকি কমবেনা। আমি একবার না করেছি দ্বিতীয়বার আর হ্যাঁ হবেনা। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে অনেক কিছু। মাহমুদ বিয়ে করেছে, তার একটি মেয়ে আছে। রোজীর বিয়ে হয়েছে, তারও একটি মেয়ে আছে। রোমিনার এক ছেলে এক মেয়ে। আমি বিয়ে করেছি ছয় মাস হল মাত্র।

রোমিনার সাথে কথা হয় প্রায়ই, বন্ধুর মত। এখনতো ভার্চুয়ালের যুগ। তো আমিই বলেছি, রোমিনা নয় বছরতো হল। এখনো কী তোমাকে দেখতে পারবনা। তখন সে বলল, “বউ নিয়ে বেড়াতে আসো। তুমিও আমাকে দেখো, আমিও দেখি।”ভ্যান থেকে আমি আর শশী নামলাম। সাথেই সরকার বাড়ি। একটি ছোট্ট মেয়ে এসে হাত ধরে টানতেছে আর বলতেছে, “মামা আসেন, আম্মু আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছে।”চারিদিকে তাকালাম, তারমানে রোমিনা আমাদের দেখেছে। এটা রোমিনার বাবার বাড়ি। ওর স্বামী আসছে নাকি জানিনা। আমি রোমিনার মেয়েকে কোলে নিয়ে জানতে চাইলাম, “মামনি কী নাম তোমার?”উত্তরে বলল, “শ্রাবণী”।

অবাক হয়ে হাটতেছি আর ভাবতেছি, আমার নাম শ্রাবণ বলেই কী রোমিনা তার মেয়ের নাম রাখল শ্রাবণী?”রোজীর সাথে দেখা হয়নি। শ্বশুর বাড়ি অনেক দূর। রোমিনার ছেলে মেয়ে, রোমিনার ছোট ভাই জুয়েল, আমি, শশী আর রোমিনা ঘুরতে বেড়িয়েছি। নীল সাগর, স্বপ্নপুরী ঘুরলাম। কালিগঞ্জের মেলা শুরু হয়নি বলে দেখা হয়নি। তবে যতক্ষন ঘুরেছি, আমি আড়চোখে রোমিনাকে দেখেছি।

চোখে চোখ পড়তেই দু’জন সামনে নিতাম। আবার শশীর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, “আমার বউকে আমি ঠকাবনা, আমি এখন শুধু শশীকেই ভালোবাসি।”পরদিন আমি আর শশী ওদের বিদায় জানিয়ে বাসে উঠলাম। জানালা খুলে আকাশপানে তাকিয়ে ভাবতেছি। শশী গতকাল বিকালে যখন একটু শুয়ে ঘুমাচ্ছিল, তখন রোমিনা এসেছিল। তার কথাগুলো মনে পড়তেছে।

“শ্রাবণ ভাই, আমাকে ক্ষমা করবেন যদি মনে কোন কষ্ট পেয়ে থাকেন। আগে কী হয়েছিল সেটা মনে রাখার দরকার নেই। আপনার আমার দুজনেরই সংসার আছে। এখন আপনি আমার ভাই, বন্ধু। বন্ধুত্বের সম্পর্কটা রাখিয়েন।”আমি শশীকে বুকে টেনে নিলাম বাসের মধ্যে। আমার দিকে তাকাল শশী। বলতেছি, “শশী আমি তোমার কাছে একটা জিনিস গোপন করেছি।”আমি সব জানি। তুমি জানো মানে?

এত চিন্তিত হবার কিছু নেই। ভয় পাবারও কিছু নেই। আমি তখন ঘুমাইনি। রোমিনার সব কথা আমি শুনেছি। হি হি। আমিও চাই বন্ধুত্ব, ভাই বোনের সম্পর্কটা থাকুক। বলেই আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে বুকে শুয়ে আছে শশী।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত