রাগ

রাগ

চিংড়ি মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে মুখে নিতেই বুঝতে পারলাম কিছুটা সমস্যা হয়েছে। নিশির দিকে তাকিয়ে দেখি সে নির্বিকারে মুখে খাচ্ছে! আমার দিকে তাকানোর খিয়াল নেই না।

সমস্যা টা কি ? সাধারনত যখন নিশি আমার উপর রাগ করলে তরকারীতে খুব ঝাল দিয়ে রান্না করে! আজকে যে পরিমান ঝাল সে চিংড়ি মাছে দিয়েছে, এটা নিশ্চিত যে আমার উপর সে রেগে আছে। কিন্তু কারন টা কি? আমি আরও কিছুটা সময় চিন্তা করলাম! নিশির রাগের কারন টা ঠিক ধরতে পারলাম না! মুখ বুঝে ভাত খেতে লাগলাম! নিশি খানিকটা আড় চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে মাঝে মাঝে! বোঝার চেষ্টা করছে ঝাল তরাকরী খাওয়ার পরে আমার প্রতিক্রিয়া কি? আমি ঝাল দেওয়া তরকারী একদমই খেতে পারি না! নিশি এটা ভাল করেই জানে!এখন যদি আমি কিছু বলি তাহলে নিশি খাওয়ার টেবিলেই চিৎকার চেঁচামিচি শুরু করে দিবে, গত দিনের কোন একটা কারনে সে আমার উপর খেপে আছে এবং সেই চেপে যাওয়া কারন টা আগ্নেওগিরির সুপ্ত অগ্নিৎপাতের মত অপেক্ষা করছে।

চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়ার চিন্তা করলাম! এখন অশান্তি করতে ইচ্ছে করছে না! যুদ্ধে নামার আগে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে! সবার আগে জানতে হবে যুদ্ধ লাগার কারন! হাত ধয়ে যখন উঠে পড়লাম তখন নিশি বলল কি ব্যাপার শেষ করলে না? পেট ভরে গেছে! এই টুকু খেয়েই! ফাজিল মাইয়া জানিস না কি কারনে সব টুকু না খেয়ে উঠে গেলাম! তারপর আবার জানতে চাস কেন? আমি মুখের ভাব সথা সম্ভব নমনীয় রেখে বললাম অফিস থেকে বের হওয়ার সময় সাজিদ ভাই জোর করে একটা বার্গার খাইয়েছিল! অনেক টা পেট ভরে আছে এই জন্য! সাজিদ ভাই সম্পর্কে নিশির এক প্রানের বান্ধরীর স্বামী! তাই মাঝে মাঝে তার দোহাই দিয়ে বাইরের খাওয়ার কিংবা আড্ডা দেওয়ার কথা বললে নিশি কিছু বলে না !আজকেও কিছু বলল না!

চট জলদি রান্না ঘরের এসে আগে এক মুঠো চিনি মুখ দিলাম! এতোক্ষনে ঝালে আমার মুখ পুড়ে যাচ্ছিল! যখন ঝাল লাগাটা একটু ঠান্ডা হল তখনই চট করে আমার মাথায় নিশির রাগের কারন টা ধরা পড়লো! আমার বউ ব্রাজিলের সমর্থক! কেবল সমর্থক বললে ভুল হবে একেবারে ডাইহার্ড ফ্যান যারে কয়! আমিও খেলা দেখি, দেখি তবে কেবল ই তা বিনোদনের জন্য! কিন্তু নিশির অবস্থা একেবারে জীবন-মরন সমস্যা! খেলা দেখার সময় প্রতিটা বল কোন দিকে গেল, কেন গেল, কি ভুল হল এটা এমন হল কেন আরও কত কথা যে বলে চলে! মাঝে মাঝে বিরক্ত ধরে যায়! এতো ফুটবল জ্ঞান নিয়ে রাতে ঘুমায় কেমনে কে জানে? যাক আমার মনে হয় আগের জন্মে নিশির নির্ঘাত কোন ফুটবলার ছিল অন্তত মহিলা ফুটবলার ছিল! আর কিছু না হলে কোন ফুটবলার ভউ তো ছিলই ছিল! আমার উপর রাগের কারন হচ্ছে আমি গত দিন মেসির খেলার দেখে প্রসংসা করেছি!গত দুই খেলার আর্জেন্টিনার খেলা খুব বেশি ভাল না লাগলেও শেষ তাদের শেষ খেলাটা বেশ ভাল লেগেছে! আমার অপরাধ হয়েছে আমি কেন এতো ভাল বললাম প্রত্যেক ব্রাজিল ডাই-হার্ড ফ্যানদের এই এক সমস্যা! সবাই হয়তো না! তবে প্রায় সবারই এই গুন টা আছে।

এরা নিজেরা নিজেদের টিমের জয়ে যতটা আনন্দ পায় তার থেকেও হাজার গুন আনন্দ পায় আর্জেন্টিনার পরাজয়ে! আজিব পাব্লিক! যাক এই হচ্ছে আসল কারন! গত কালকে দুজন বসে খেলা দেখছিলাম! খেলা তো দেখছিলাম না নিশির ধারা ভাষ্য শুনছিলাম! এটা কেন করলো? এভাবে কেউ  খেলে? ফু! এই টিম নিয়ে কিভাবে খেলতে এসেছে। এদের কে খেলতে দেয়! এদের থেকে তো পাড়ার টিমও ভাল খেলে! কিন্তু যখন প্রথম তিন মিনিটের মাথায় গোল দিয়ে দিল নিশি মুখ হফ হয়ে গেল! কিন্তু আনন্দ আসতেও সময় লাগলো যখন বিপক্ষ টিমের মুসা এক মিনিটের মাথায় আবার গোল পরিশোষ করে দিল! খেলার ভিতর বেশ কয়েকবার আমি বলেছিলাম যে আজকে আর্জেটিনা ভাল খেলছে এবং প্রতিবারই নিশি আমার দিকে অগ্নি চোখে তাকিয়েছে।

কিন্তু খেলা চলছিল বলেই হয় তো কিছু বলে নি! কিন্তু আজকে সেই রাগের প্রতি ফলন দেখতে পাচ্ছি! খাওয়া দাওয়া শেষে খেলা দেখতে বসলাম! পর্তুগালের খেলা! ব্রাজিলের সাপোর্টার হলেও নিশি রোনাল্ডকে পছন্দ করে! কিন্তু খেলা হয়ে গেলে পর্তুগাল জিতলেও ২য় রাউন্ডে উঠতে পারলো না! নিশির মেজাজ আরেক দফা খারাপ হল! পুরো খেলায় আমি একদম চুপ ছিলাম! কি বলতে কি বলবো আবার নিশির মেজাজ আরও খারাপ হবে! কিন্তু খেলা শেষে নিশির সাথে একটা ছোটা খাটো মজা না করে পারলাম না! বললাম আরে তুমি এতো সিরিয়াস হচ্ছ কেন? নিশি আমার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকালো। কোন কথা বলল না! বললাম তোমার পছন্দের নেইমার তো ভাল করেছে! চার গোল দিয়েছে তিন ম্যাচে! রোনাল্ডো তিন গোল না দিতে পারলেও তিন ম্যাচে তিন হেয়ার স্টাইল নিয়ে তো হাজির হয়েছে!

নিশির ঠান্ডা দৃষ্টি আরও ঠান্ডা হয়ে গেল! আমি মনে মনে ভয় পেলাম। নাহ! এই কথা টা বলা ঠিক হয় নাই! নিশি এমনিতেও আমার উপর রেগে আছে। না জানি কি করে বসে! রাতে শোবার সময় দেখি নিশি বালিশ নিয়ে অন্য ঘরের দিকে হাটা দিল! আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম কি হল কোথায় যাও? পাশের ঘরে! কেন? কোন আর্জেন্টাইন সাপোর্টটারের সাথে আমি থাকবো না! আরে! এটা তোমাকে কে বললো যে আমি আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট করি! কর না তুমি? তাহলে মেসির এটো প্রসংশা কেন শুনি?

আরে আশ্চর্য! ভাল খেললে ভাল বলবো না? না বলবে না! এমন বেকুবী কথা আমার সামনে বলবা না! কি! আমি বেকুব? না! বেকুব তো আমি! মহিলা বেকুবকে বিয়ে কেবল এক বেকুবই করতে পারে! আসলে কেবল চেহারা দেখে কারও মস্তিস্ক বিচার করাটাই মূর্খতা! তুমি কি বললে? তুমি কি বললে? শোনা নাই? সিম্পল একটা খেলা নিয়ে যে এরকম হাস্যকর কাজ কর্ম করতে পারে তাদের মস্তিস্কের সূস্থ্যতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে! আরে সাপোর্ট কর ভাল কথা, তাই বলে এমন পাগলামী করার তো কোন মানে নেই! আছে?নিশি আমার কথার কোন জবান না বালিশ নিয়ে চলে গেল! মেজাজ টা আমারও খানিকটা খারাপ হল! গত কয়েক দিনে এমন খবর বেশ কয়েক জায়গায় শুনেছি! সাপোর্টিং নিয়ে মারা মারি করে মানুষ পর্যন্ত মারা গেছে! আমার এক চোট ভাইকে সেদিন বলতে শুনলাম যে তার প্রেমিকা মেসি কে মাছি বলেছে বলে সে নাকি তার সাথে ব্রেক আপ করেছে!

কি হাস্যকর এদের মস্তিস্ক! দুর দেশের কোন তারকার জন্য বাস্তবের মানুষ গুলো এদের কাছে কতই না গুরুত্বহীন, বাস্তবের সম্পর্ক গুলো কতই না ঠুনকো! কিন্তু এরা জানে না এই ক্রেজ কিন্তু থাকবে না! উত্তেজনাও খুব বেশি দিন থাকবে না! এখন যেই খেলা তাদের জীবন-মরন সমস্যা হয়ে দাড়িয়ে, কিছু দিন কিংবা কয়েক বছর খেলার প্রতি এই আকর্ষন থাকবে না! শুক্রবার মসজিদে নামাজ পড়াতে যাবো, দরজা খুলেছি এমন সময় দেখলাম একদল পিচ্চি পোলাপাইন দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছে! পাঞ্জাবী পায়জামা পরা! মাথায় টুপি! বললাম কি চাই? একজন বলল আফা আমাদের আসতে বলেছে! আমরা কাদেরাবাগ হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র! আমি কিছু বলতে যাবো দেখলাম তার আগেই নিশির আমার পিছন থেকে এসে ওদের হাতে একটা বড় প্যাকেট ধরিয়ে দিল!

আমি নিশির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম এটা কিসের প্যাকেট? জিলাপীর! তার থেকেও অবাক হয়ে বললাম কিসের জন্য? মিলাদের জন্য! এবার সব থেকে বেশি অবাক হয়ে বললাম তুমি ব্রাজিলের জেতার জন্য দোয়া করতে দিচ্ছ নাকি ? নিশি আমার কথার জবাব না দিয়ে পিচ্চিদের ছেলে গুলারে বুঝিয়ে দিল কি কি করতে হবে! আমি সত্যি সত্য এবার অবাক না হয়ে পারলাম না! এই মেয়ের সমস্যা কি? পাড়ার মসজিদের নামাজ পড়তেই গেলাম না লজ্জায়! যদি কেউ জানে আমার বউ এমন কাজ করেছে, মানুষের সামনে মুখ দেখাবো কিভাবে? আমি ভেবেছিলাম পাগলামীর মনে হয় এখানেই শেষ! শনির রাতে খেলা। আমি সকাল বেলা বের হয়েছিলাম একটু কাজে।

দুপুরে বাসায় এসে দরজার সামনে এক অদ্ভুদ দাড়িওয়ালা লোক বসে আছে! পরনে কালো,ময়লা আলখাল্লাহ! চোখ বন্ধ করে কি সব পড়ছে বিড়বিড় করে! আর নিশি সেদিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে -কি হচ্ছে এখানে? কালো আলখাল্লাহ তার চোখ খুলল না! মন্ত্র পড়াও বন্ধও করলো না! নিশি আমাকে ইশারায় চুপ করতে বলল! ওর মুখ দেখে মনে হল একটু শান্ত! গত দিনের মত এতো গম্ভীর না! মনে মনে বললাম যাক শান্ত হয়েছে ভাল! কিন্তু আবার কি নতুন ঝামেলা! আরও মিনিট দশেক পরে কালো ফকির চোখ খুলল! নিশি দিকে তাকিয়ে বলল যা! দোয়া করে দিলাম! এবার ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিৎ! সে এই বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান! আমি কৌতুহল নিয়ে বললাম কিভাবে বললেন? আমি বান-মেরে দিয়েছি! কেউ আর ব্রাজিলকে হারাতে পারবে না! সত্যি? এরকম একটা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম কে এই টাইপের বান মারতে পারেন  না? ফকির বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে বলল কেউ আমাকে দক্ষিনা দিয়ে বান মারতে বলে নাই! বান মারতে হলে দক্ষিনা লাগে, জোগার যন্ত্র লাগে! আরও অনেক কিছু!

আচ্ছা! আমি আপনাকে দক্ষিনা দিচ্ছি, আপনি আমার বউয়ের মন খেতে ফুটবল পাগলামীটা মুছে দিতে পারবেন? নিশিকে দেখলাম আমার দিকে আবারও গরম চোখে তাকালো! তারপর বলল পাগলা বাবা আপনি কার কাছে কি বলছেন! আপনাকে আমি ডেকে এনেছি আপনি আমার শুনবেন! তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল তুমি ঘরে যাও! আচ্ছা যাচ্ছি! তোমার আসলেই চিকিৎসা দরকার! চুপ থাকো! আর ৫০০ টাকা দাও! কেন? বাবা কে দিতে হবে! বাবা? কোন বাবা? নিশি আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন আমি কোন হাস্যকর কথা বলেছি!

একবার মনে হল বলি দেব না। কিন্তু তার পর মনে না দিলে আবার নতুন ঝামেলা সৃষ্টি হবে। এমনিতেই গত দুদিন ঝাল দেওয়া তরকারী খেতে খেতে পেটের অবস্থা ভাল না! কোন কথা বলে পকেট থেকে ৫০০ টাকা বের করে দিলাম! দুপুরে খাওয়ার সময় দেখলাম তরকারীতে ঝাল ঠিক আছে! বুঝলাম মেজাজ ঠান্ডা আছে! কিন্তু কতক্ষন থাকবে ঠিক বুঝতে পারছি না! আজকে খেলা যদি ব্রাজিল হেরে যায় তাহলে মনে সামনের এক সপ্তাহ বাড়িতে টেকায় দায় হয়ে যাবে! আমি চিন্তিত মুখেই ভাত খেতে লাগলাম!

পরিশিষ্টঃ আমি টিভির মেইন পাওয়ার বাটন চেপে টিভি অফ করলাম! খেলা শেষ হতে না হতেই নিশি হাতের রিমোর্ট টা ছুড়ে মেরেছে। তার মতে খেলায় ব্রাজিল কে জোর করে হারানো হয়েছে। রেফারী চিলির দিকে টেনে খেলিয়েছে! এখন তার যত রাগ ঐ রাফারীর উপর! রেফারীকে কে তো কাছে পায় নি রিমোর্ট টার উপর দিয়ে গেল ঝড় টা! যাক! আমি টিভি অফ করে শোবার ঘরে গেলাম! দেখি নিশি উপুর হয়ে খাটের উপর শুয়ে আছে মুখ ঢেকে! ওর পাশে গিয়ে বসলমা ! মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম এমন পাগলামো কেউ করে ? বল এমন পাগলামো কেন করছো?

নিশি মুখ তুলল তবে সম্পুর্ন না! আমার কোলে মাথা রেখে আমার ফুঁপিয়ে উঠলো! আমি মনে মনে হাসলাম! মেয়েটা এতো বড় হয়ে গেছে! কিন্তু ছেলেমানুষী টা এখনও গেল না! ওর কপালে আস্তে করে একটা চুম খেয়ে বললাম কালকে তোমাকে আবাহনী মাঠে নিয়ে যাবো ঠিক আছে। ওখানে তুমি এদেশের নেইমার, অস্কারের খেলা দেখবে! দেখবে ভিন্ন দেশী খেলোয়াদের খেলা দেখার চেয়ে নিজ দেশের খেলা দেখাটা কত টা আনন্দের!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত