ভুলে যাওয়া অতীত

ভুলে যাওয়া অতীত

কখনও মাঝে মাঝে ভাবি আসলে কার দোষ ছিল? আরিফের? নুহার? নাকি তারা দুইজনে আল্লাহ্‌র পরীক্ষার পাত্র ছিল? কেন যে এই দুইজনের পরিচয় হয়েছিল, এখন ভাবতেই অবাক লাগে। প্রথমত আমি আরিফ কে দোষ দিব। কি দরকার ছিল তোর ওকে পছন্দ করার? অবশ্য এটা যে এতোটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাবে তাই বা কে জানত? সেই ইন্টার এর সময় থেকেই আরিফ রাস্তায় যাওয়া আসার পথে নুহা কে দেখত। তখন থেকেই কি যেন একটা ভাললাগা কাজ করত।কিন্তু কোনদিন মেয়েটার সামনা সামনি হয়নি। শুধু সাইকেল এ করে দূর থেকে মেয়েটির চলে যাওয়া দেখত। তখনও জানত না মেয়েটির নাম থিকানা।জানার চেষ্টাও করেনি কখনো। শুধু দূর থেকে ভাললাগার গণ্ডি সীমাবদ্ধ ছিল। কোচিং এর সময় নুহার সাথে আরিফের প্রথম পরিচয়। আসলেই কি প্রথম? নাহ, আরিফের তো মনে হতো নুহা কে সে বহু বছর ধরে চিনে।

শুরুর দিকের দিনগুলো যেন স্বপ্নময় ছিল। পরিচয় এর সুত্র ধরে একসময় ফোন নম্বর আদান প্রদান। তারপর থেকে কথা। একটু একটু করে কখন যে দুইজনে দুইজনার এত ভাল ফ্রেন্ড হয়ে গেল আমরা কেও বুঝতাম না। রেজাল্ট এর পর দুইজনে ভাল জায়গাই ভর্তি হয়। এতদূরে আসার পর তাদের বন্ধুত্ব আরও গাড় হয়। সারাদিন ফোন এ কথা। প্রতি মুহূর্তের সব তাতকা অনুভুতি গুলি শুধু নিজেদের সাথে শেয়ার করা। এভাবে অনেকদিন চলে যায়। আরিফের মেডিকেল এর সব ফ্রেন্ডরা জানত নুহার সাথে ওর affair আছে। প্রথম দিকে আরিফ খুব রাগ করত অদের কথায়। কিন্তু একসময় ও বুঝতে পারে, যতই নিজের মন কে চাপা দেয়ার চেষ্টা করুক না কেন, সত্যি কথা হল সে নুহার প্রেমে পরে গিয়েছে। পরবে নাই বা কেন? দুজনের মাঝে যে পরিমান understanding ছিল, তা আসলেই অবিশ্বাস্য। দুজনের মনের সব কথা, সব ভাব, সব আবেগ গুলি যেন নিজেদের গণ্ডি ছেড়ে মিশে গিয়েছিল আরেকজনের চেতনায়। একটা মুহূর্তও তারা কথা না বলে থাকতে পারতনা। এটা যে শুধু আরিফের দুর্বলতা, সেটা বলবনা। আমার মনে হয় নুহাও আরিফ কে পছন্দ করত, হাবে ভাবে তা মনে হলেও তা কখনো প্রকাশ করে নি।

বহু বহু দিন এভাবেই গেল। আরিফ আর এভাবে থাকতে পারলনা। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এক ঝুম বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় নুহা কে তার ভালবাসার কথা জানায়। সে বলেছিল-

” আমি তোমাকে আমার ভালবাসার কথা না বলে হয়তো অনেক কষ্ট নিয়ে দিনগুলি পার করে দিতাম। হয়তো কোনদিনও তুমি জানতে পারতে না যে তম্র এই বেস্ট ফ্রেন্ড টি তোমাকে কতটা ভালবাসে। কিন্তু আমার মাথায় একটা জিনিস খুব ভাবায়।তা হল,আমি যদি আজ তোমাকে এই কথা না বলি, যদি কোনদিনও না বলি,তবে শেষ বয়সে যদি একদিন আমার আফসোস হয় যে- ইসশ, যদি সেইদিন আমি নুহা কে বলতাম যে আমি তাকে কতটা ভালবাসি তবে সে হয়তো আজ আমার সাথে থাকত। তাহলে আজ আর তার কথা ভেবে অশ্রু ফেলতে হতো না,তাই আমি নিজের ভবিষ্যতের কাছে নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না। আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি আর তোমাকে নিয়ে আমার স্বপ্ন সাজাতে চাই”।

এই কথাগুলি বলে সেদিন আরিফ খুব খুব কেঁদেছিল। বৃষ্টির জল আর অশ্রু মিশে এক হয়ে গিয়েছিল। সেদিন নুহা খুব মন দিয়ে কথা গুলি শুনেছিল। সে জান্ত,আকদিন আরিফ এসব বলবে। নুহা বলেছিল আরিফ কে-“আরিফ, তুমি সত্যিই এত ভাল একটা চেলে,আমি আসলেই তোমাকে পেয়ে ধন্য। কিন্তু আমি affair করতে ভয় পাই, পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে।( বলে রাখি,নুহার আগে একটা affair চিল,জা ভেঙ্গে যায়। আরিফ সবকিছু জান্ত,তবুও ভালবাস্ত।আরিফের এটা প্রথম প্রেম)। তবে আরিফ,আমি যদি কোনদিনও কাউকে ভালবাসার কথা চিন্তা করি করি তবে সে হবে তুমি, কারন সুখে দুঃখে তুমি যেভাবে আমাকে আগলে রাখ,সেতা আর কেও পারবেনা।”

আরিফ খুব খুশি হয়েছিল। ও জান্ত,অ নুহার প্রতি যতটা সছেতন,তা আর কেউ হতে পারবে না। এতোটা ভালোবাসার প্রতি confidence ছিল যে চোখ বন্ধ করেও দূর থেকে বলতে পারত নুহা কি করচে,কি কালার এর ড্রেস পরেছে। হা, সুনলে অবাক মনে হতেই পারে,কিন্তু সত্যি।

এমন কোন মাস যায়নি যেই মাসে আরিফ নুহা কে গিফট পাঠায় নি। শুধু নুহা কেন, তার ছোট বোন কলি কেও সমানে গিফট পাঠাত। নুহার মা-বাবা ও আরিফ কে খুব পছন্দ করত, শুধু যার করার দরকার তার কোন খবর নাই। নুহার attitude দেখে যে কেউ বলবে সে আরিফ কে পছন্দ করে,কিন্তু মুখ ফুতে বলে না।

আমরা দেখেছি, প্রতি মাসে আরিফ তার পকেট মানির অর্ধেক টাকা গিফট আর মোবাইল বিল এ শেষ করত। না খেয়ে থাক্ত,তবুও নুহা কে তা বুঝতে দিত না, দুইজনের মোবাইল বিল একাই দিত। এমনও হয়েচে,হাতে টাকা নেই, বাসার পুরানা বই বিক্রি করে নুহা কে গিফট দিয়েছে। আরিফের খুব খুব শখ হতো কোন এক birthday তে নুহা ওর জন্য কিছু একটা পাঠাবে। কিন্তু না, কখনো তা হইনি। নুহার দেয়া কোন গিফট শোভা পায়নি আরিফের টেবিল এ। কিন্তু সে কিছুই মনে করত না। সে যে নুহার কাছের মানুশ হয়ে আছে, এতেই সে খুশি। আরিফ জানত, একদিন নুহা তার এ হবে, কারন তারা কেউ যে কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না।

আমার মনে পরে কোন একবার সরস্বতী পুজার কথা। কি এক কারণে নুহা আরিফের উপর খুব রাগ করে বলচে আর কখনো ফোন না দিতে, আর ফোন ও অফ করে রাখছে। সেদিনের আরিফের মুখ এখনও আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। সে দিক্বিদিক হারিয়ে সেদিনই এতদূরে গিয়েছিল শুধু নুহার সাথে দেখা করতে। সেদিন মাত্র আধা ঘণ্টা সে নুহার বাসায় ছিল। শুধু সরি বলার জন্য। সেইরাতে ১২ পর্যন্ত নিজ শহরে আরিফ আগুন্তুকের মতো একা একা হেঁটে বেরিয়েছে। গভীর রাতে সে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। শুধু একটা সরি……….।

তাদের এত এত কথা লিখলে এই গল্প কোনদিন শেষ হবে না। ৩.৫ বছরের কথা তো আর কম নয়। থাক,এবার অন্য কথায় আসি।

এই ৩.৫ বছর সময়টা খুব তাড়াতাড়িই যেন কেটে গেল। আরিফ আর নুহা অপরিবর্তিত। আরিফের ভালবাসা যেন আরও বেরে যায় এই সময়ের মাঝে।

কিছুদিন থেকে নুহার ব্যবহার একটু কেমন যেন লাগছে। এখন কেন যেন আরিফ কে পাত্তা দিতে চাইনা। অথচ আরিফ এখনও তার ভালবাসায় অটুট। এখন নুহা আর কেন যেন টাইম দিতে চাইনা।

হটাত একদিন তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। পাত্র মেরিন এ চাকরী করোয়।

– আরিফঃ শুন, এসব মানুষ গুলার চরিত্র ভাল হয়না।

-নুহাঃ না না, ছেলে অমন না, অনেক ভাল। নামায পরে।

-আরিফঃ আমাকে এসব শুনিও না, হাতের কাছে এত মেয়ে পাই অরা যে চরিত্র ঠিক রাখা সম্ভব না।

-নুহাঃ সবাই কে এক রকম ভাব কেন?

-আরিফঃ শুন নুহা, তুমি আমাকে যদি ভাল না বাস, ঠিক আছে। কিন্তু তুমি আখেনে বিয়ে করিও না, সুখি হবে না।

-নুহাঃ আমি অবশ্যই সুখি হব। তাছাড়া ছেলের অনেক টাকা আছে

-আরিফঃ টাকা ই কি সব?

-নুহাঃ আচ্ছা ঠিক আচে,আমি ছেলের সাথে কয়েক দিন ঘুরে দেখি সে কেমন।

নুহা ওই ছেলের সাথে ২ মাস ঘুরে, তাকে যাচাই বাছাই করে। engagement হয়।

আরিফ নিরব দর্শক, কিছু বলে না মুখ ফুটে, শুধু চোখের পানি ফেলে।

কেটে যায় আরও কিছু দিন। আরিফ নিজেকে নুহার জীবন থেকে একটু একটু করে গুটিয়ে নিচ্ছে। কারন সামনে তার বিয়ে। নুহা কখনই তাকে ভালবাসল না।

হটাত একদিন ফোন এ কথা বলতে গিয়ে নুহার কণ্ঠ কেমন যেন মনে হল। আরিফ নুহা কে তার চেও বেশি চিনত। তাই সে বার বার জিজ্ঞেস করে কি হইছে?

-নুহাঃ কিছু না।

-আরিফঃ আরে বল কি হইছে। দেখি সল্ভ করা যায় কিনা।

-নুহাঃ আরিফ আমি একটা কাজ করে ফেলছি।

-আরিফঃ কি কাজ?

-নুহাঃ আমি একজনকে ভালবেসে ফেলেছি।

-আরিফ(হতাশ হয়ে)ঃ কি, তোমার হবু জামাইকে নিশ্চয়ই?

-নুহাঃ না।

-আরিফ( অবাক হয়ে)ঃ মানে কি! তাহলে কে!

-নুহাঃ সে সফিক।

নিস্তব্ধ আরিফের পায়ের নিচে মাটি ছিল কিনা কে জানে? তবে মনে হয়েছিল মাটি ফুঁড়ে সে কবরে চলে গেলেই বুঝি ভাল হতো।

-আরিফঃ এসব তুমি কি বলতেছ? are u jocking?

-নুহাঃ না,আমি খুব serious.

-আরিফঃ এসব কথার মানে কি? তুমি জান না তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে? এখন এসব ফাজলামির মানে কি? তুমি আমাকেও এতদিন ঘুরালে, হবু জামাই কে ঘুরালে, আর এখন বলচ সফিকের কথা?

-নুহাঃ আমি কিছু জানি না আরিফ। but facebook এ ওর সাথে পরিচয় থেকেই আমি দুর্বল হই ওর প্রতি। ওকে আমার খুব আপন বলে মনে হতে থাকে।

-আরিফ( হতবাক)ঃ কতদিন থেকে তাকে চেন তুমি যে তাকে ভালবাস্লে? আর আমি এসবের কিছুই জানতে পারলাম না!

-নুহাঃ আসলে কখন যে ভালবেসে ফেললাম জানি না।

-আরিফঃ কি বল এসব? আমি ৩.৫ বছর জা পারলাম না,এই শফিক ৩ মাসে তা করল? তুমি ভুল করতেচ নুহা? তুমি পস্তাবা।

-নুহাঃ আমাকে পেলে না বলে অভিসাপ দিতেছ? বাহ, এই তাহলে তোমার আসল রূপ?

-আরিফঃ তোমার জা খুশি ভাব। এতদিনেও যে আমাকে ভুল চিনল তাকে আর কি বলব?

-নুহাঃ না, আমি চাই না তুমি কিছু বল।

-আরিফঃ তুমি জান তোমার পুরা family নষ্ট হয়ে যাবে, তোমার মা বাবা মুখ দাখাতে পারবে না, তোমার শ্বশুর বাসায় ই বা কি ভাববে?

-নুহাঃ আমি কিছু জানি না। শুধু জানি আমার আর ফিরে আসা সম্ভব না।

এরপর আরও অনেকদিন কেটে গেছে। ওর মা বাবার অনুরধে আরিফ অনেক বুঝিয়েছে নুহা কে। সে কারও কথা শুনে নি। পরিবারের সবার মাথা হেঁট করে সে তার হবু জামাই কে ছেড়ে দিয়েছে।

আরিফ এখনও বেঁচে আছে। কেন যেন শুকনো পাতার মতো ঝরে যাওয়া জীবনটা শেষ করে দিতে পারেনি। তার প্রথম ভালবাসার এমন আকাল সমাপ্তি মেনে নেয়া খুবই অসম্ভব ছিল। কিন্তু কিভাবে যেন বহু কষ্ট করেও সে বেঁচে আছে, তার আশেপাশের কিছু মানুষের ভালবাসায়। ছোট্ট জীবনের এত বড় আঘাত আরিফ কে কিসুদিনের জন্য বাক রুদ্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু না, সে মারা যায়নি। হয়তো এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তাকে কোন নেয়ামত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবেন।

প্রায় পাঠক, এখন আপনারাই বিচার করুন, কে দোষী?

আরিফ? – যে অন্ধের মতো নুহা কে ভালবেসেছে?

নুহা? – যে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় কাপড় বদলানোর মতো করে কিছু মানুষকে ঘুরিয়েছে?

নাকি আল্লাহ্‌র? – যিনি এই দুইজন কে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ছিলেন?

নাকি পাঠক আমি দোষী যে আপনাদেরকে এই সত্যি গল্প সুনালাম?

লিখেছেন – অজানা |

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত