কে অপরাধী?

কে অপরাধী?

-জানিস শ্রাবণ? আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমিও বেনারশি শাড়ি পরব। আমাকে অনেক সুন্দর করে সাজানো হবে। কত মজা হবে। তাইনা?

আমি রুমির চোখে মুখে খুশির জোয়ার দেখে, আমার মলিন চোখে কোণ কুচকে, ঠোটে মৃদু হাসির রেখা টেনে তার কথায় গলা মিলিয়ে বললাম, “হ্যাঁ, তোকে তখন অনেক সুন্দর লাগবে।”

রুমি আমার দিকে তাকিয়ে আবারো বলল, “জানিস শ্রাবণ? মা আজ থেকে আমাকে রান্না শিখিয়ে দিচ্ছে। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে রাধতে হবে তো, সেজন্য। তুই না কৈ মাছের ঝোল খেতে পছন্দ করিস? আমি এটাও শিখে নেব। তারপর তুই যখন আমার শ্বশুর বাড়ি যাবি আমি নিজ হাতে তোকে রান্না করে খাওয়াব। খবরদার, খালি হাতে যাবি না। আমার জন্য মুড়ির মোয়া আর চকলেট কিনে নিয়ে যাবি।”

আমি আবারো রুমির কথায় তাল মিলিয়ে বললাম, “তুই যা যা খেতে পছন্দ করিস, সব নিয়ে যাব তোর জন্য।”
আকাশের কান্না শুরু হয়ে গেল। রুমিকে যেতে বলার পরও সে যাবেনা। আজ নাকি আমার সাথে সে ভিজবে। শ্বশুর বাড়ি গেলে তো আর ভিজতে পারবেনা। তাই তার এই আবদার।

সে বৃষ্টিতে জমে থাকা পানিতে লাফিয়ে পানি ছিটাচ্ছে। কত আনন্দ তার চোখে মুখে। আমারই কেবল হাসির আড়ালে দুঃখ কষ্টগুলো জল হয়ে চোখ দিয়ে ঝরছে। আকাশ আমার হাসির আড়ালে দুঃখকে খুঁজে পেয়ে নিজেই বুক চাপড়ে কেঁদে জল ঝরাচ্ছে। এতে করে আমার চোখের জল আড়াল করতে পেরেছি। আমি যে রুমিকে ভালোবাসি এটাই সে এতদিন ধরে বুঝতে পারেনি। তাহলে কোনটা আমার চোখের জল আর কোনটা বৃষ্টির পানি সে আলাদা করবে কীকরে?

রুমি আমার ছোট বেলার খেলার সাথী। এখনও তো সে ছোট’ই আছে। সদ্য এসএসসি পাশ করা মেয়েটি আর কত বড় হয়েছে। তবুও কেন যে তার বাবা মা তাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে আমার জানা নেই। আমি ইন্টারে পড়ি অথচ মা সেদিন দুষ্টুমি করেই বলেছিল, “শ্রাবণটা বড় হয়ে গেছে। আর পাঁচ ছয় বছর পরই তাকে বিয়ে করিয়ে ঘরে মিষ্টি এক বউ নিয়ে আসব।”

বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাওয়া মেয়েটি পনেরো দিন পর কারো বউ হয়ে শ্বশুর বাড়ি যাবে। অথচ সে জানে না প্রেম কী? ভালোবাসা কী? রুমির ভিতরের ছোট রুমিটা বড় হয়নি এখনো।
আমি একদিন রুমিকে বলেছিলাম, “আমাকে বিয়ে করবি?”

উত্তরে বলেছিল, ” তোকে বিয়ে করব কেন? আমার তো বিয়ে হবে অনেক দূরে। ছবির মত আমিও পালকিতে করে শ্বশুর বাড়ি যাব।”

কত করে রুমিকে বুঝাতে চেয়েছি, আমি তাকে কত ভালোবাসি। অথচ সে ভালোবাসা কী সেটাই বুঝেনা। সিক্স সেভেনের মেয়েরা প্রেম বুঝে আর রুমি বুঝেনা। এজন্যইতো বলি তার ভিতরের শিশু সূলভ স্বত্ত্বাটি এখনো ছোটই রয়ে গেছে। তবুও আমি অপেক্ষা করেছি দিনের পর দিন। ভেবেছি একসময়তো বুঝতে পারবে। কিন্তু এত ছোট বয়সে তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে সেটা ভাবিনি।

পনেরো দিন পর রুমির বিয়ে। তাই বাইরে এতটা ঘুরাঘুরি তার উচিত নয়। তার মা তাকে এমনটাই বুঝিয়েছে। আর সেজন্যই আজ চারদিনেও রুমির দেখা মিলেনি। যে রুমিকে একটা দিন চোখের আড়াল করিনি। আজ বাধ্য হয়ে চারদিন না দেখেই থাকতে হচ্ছে। বুকের ভিতরের কোনো এক অংশে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে তা আমি বেশ বুঝতে পারছি।
প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময় যখন স্কুল থেকে ফিরার পথে আমি তেতুল গাছে উঠলাম। আমি উপর থেকে তেতুল ফেললে রুমি নিচ থেকে কুড়াত। দু’জন তেতুল খেতে খেতে বাড়ি ফিরতাম। বাড়ির পাশে ঘাটওয়ালা পুকুরের সিড়িতে বসে পানিতে পা দুলাইতাম। আমি আর রুমি কেউ সাতার জানতাম না। একদিন রুমি বলল, “শ্রাবণ আমি যদি পানিতে পড়ে যাই তুই ছবির মত করে আমাকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দিবিনা?”
আমি সেদিন বলেছি, “তুইও সাতার জানিসনা আমিওনা। তোকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দেব। হয়তো দু’জনই বেঁচে ফিরব, নয়তো দু’জনই জড়িয়ে ধরে মরে পানিতে ভেসে উঠব।”
রুমি রাগ দেখিয়ে চেচিয়ে উঠল। “তুই মরার কথা বললি কেন? আমি এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না।”
সন্ধা রাতে জোনাকি পোকা ধরে রুমির হাতে দিতাম। সে তালু বন্দী করে আমাকে দেখিয়ে বলত, “দেখ দেখ আমার ছোট ঘরে জোনাক জ্বলে।”
তখন রুমিকে একদম ছোট মনে হতনা। পাকা পাকা কথা বলত।

রুমির বিয়ের দিন রুমি নাকি আমাকে খোঁজছিল। তানিয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে জানতে চেয়েছিল আমি কোথায়? তখন আমি বাড়ি ছিলাম না। যাকে ভালোবাসি তার বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার মত সাহস নেই আমার। চোখের পানি কারো বাঁধা মানেনা কখনো কখনো মানুষের সামনেই ঝরঝর করে ঝরতে থাকে। আমি তখন নদীর পাড়ে আমার ভালোবাসা বিসর্জন দিচ্ছিলাম। ভালোবাসার মানুষটিকে বুঝাতেই পারলামনা ভালোবাসা কাকে বলে। এ কেমন ভালোবাসা আমার?

রুমি নাইয়র এল বাবার বাড়ি। আমি আবারো নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম। এবার আর পারলাম না নিজেকে লুকাতে। রুমির মা এল আমাদের বাড়ি। আমার হাত ধরে বসে পড়ল। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। আমার বাবা মা জানতে চাইল কী হয়েছে। রুমির মায়ের সরল সীকারোক্তি, “শ্রাবণ আমার মেয়েকে পাগল করছে। রুমি আর শ্বশুর বাড়ি যাবেনা বলে দিয়েছে। রুমি নির্লজ্জের মত শ্রাবণের কথা বলতেছে। এখন শ্রাবণই পারে আমার মেয়েটাকে বুঝিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠাতে। ”

বাবা মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা বিশ্বাস করতে পারছেনা কিছু। আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা। যে মেয়েটা প্রেম ভালোবাসা কী জানেনা। যে তার নিজের বিয়েতে এত খুশি। সে কেন আমার কথা বলে শ্বশুর বাড়ি যাবেনা? আমি রুমির মা’কে বলেছি, যে করেই হোক আমি রুমিকে বুঝাব।

পুকুর পাড়ে আমার সামনে মাথা নিচু করে রুমি দাড়িয়ে আছে। আমি তাকে আবারো প্রশ্ন করলাম, “এসব কী?”
উত্তরে বলল, “শ্রাবণ তুই না আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিস? আমি তো তখন বুঝতাম না। এখন বিয়ে হবার পর বুঝতে পারতেছি তোকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। তুই বিয়ের দিন আসিসনি। আমি মন খারাপ করে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছি। এক চাচাত ননদ আমাকে পরের দিন জিজ্ঞেস করল আমার কারো সাথে প্রেম ছিল নাকি? আমি বলেছি কোনটাকে প্রেম বলে? কী বুঝিয়েছে না বুঝিয়েছে সেটা বলার দরকার নেই। তবে এতটুকু বুঝতে পারি যে আমি তোকে হারানোর পর বুঝেছি প্রেম কী। আমি আর যাব না শ্বশুর বাড়ি। তুই আমাকে বিয়ে কর। ”

আমি রুমির মাথায় হাত রাখলাম। ভিতরটা গলে যাচ্ছে। অথচ চোখে রাগ দেখিয়ে বললাম, ” ছোটবেলা বিয়ের কথা বলেছি আর সেটা তুই এখনো ভেবে বসে আছিস।? আমি বিয়ে করব পাঁচ ছয় বছর পরে। তোর বিয়ে হয়ে গেছে আর তুই বলছিস তোকে বিয়ে করতে। সারা এলাকার মানুষ ছিঃ ছিঃ করবে। কয়েকটা দিন গেলে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। চাচা চাচির কথা একটু ভেবে দেখ। তাদের সম্মান নষ্ট করিস না। শ্বশুর বাড়ি যা।

রুমি চোখের পানি মুছতে মুছতে বাড়ি যাচ্ছে। শেষে কিছু না বলেই চলে গেল। মনে হয় আমার বুঝানোতে কাজ হয়েছে। তবুও আমি রুমির মায়ের সাথে আবার দেখা করলাম। বললাম, আমি বাড়িতে থাকলে রুমি যেতে চাইবেনা। আমি কিছুদিনের জন্য নানার বাড়ি যাই। আমাকে কয়েকদিন না দেখলে এমনিতেই রুমির মন ঘুরবে। রুমির মা আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন। আমি বাড়িতে এসে তৈরী হয়ে নানার বাড়ি ছুটলাম।

বাবার ফোন পেয়ে বাড়ি এলাম। এলাকার সবাই আমাকে দেখে কেমন যেন ফিসফিস করছে। এক ছোট ভাই এসে বলতেছে, “রুমি আফা পানিতে পইড়া মইরা গেছে। সাতার জানেনা, মনে হয় পইড়া গেছিল।”
আমি বাকরুদ্ধ। আমার পা আর সামনে এগুচ্ছে না।

রুমির লাশের পাশে মানুষের জটলা। অনেকের চোখে পানি। আমার চোখে পানি নেই। রুমির বিয়ের কথা শুনে সেদিন বৃষ্টির মত চোখ থেকে পানি ঝরছিল। আজ আমার চোখে পানি নেই। কেমন যেন পাথর পাথর মনে হচ্ছে নিজেকে। আমি কী সত্যিই রুমিকে ভালোবাসা বুঝাতে পারিনি? নাকি আমি নিজেই ভালোবাসা বুঝলাম না? আসলে কে অপরাধী?

কয়েকটা দিন কেটে গেল। নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে বারবার হেরে যাচ্ছি। যতবারই মনে প্রশ্ন আসছে ভালোবাসার অপরাধী কে? তখন আমার মন আমার দিকেই আঙ্গুল তুলছে বারবার।
ব্রীজে দাড়িয়ে আছি, নিচে নদী। পানিতে আমার খুব ভয়, আমি সাতার জানিনা। রুমিও সাতার জানতনা। পুকুর ঘাটে বসে রুমি আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, আমি পানিতে পড়ে গেলে আমাকে বাঁচাতে ছবির মত করে ঝাঁপ দিবি?
আমি বলেছিলাম ঝাঁপ দেব। বাঁচলে দু’জনেই বেঁচে ফিরব নয়তো দু’জনই মরব।
রুমি সেই পানিতেই মরল। আমি ঝাঁপ দিয়ে রুমিকে বাঁচাতে পারিনি। তবে আজ ঝাঁপ দিতে বাঁধা নেই। সাতার জানিনা তাতে কী? আমার রুমিকে পানির নিচে খুঁজে বেড়াব।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত