একদিনের হিমু

একদিনের হিমু

সকাল দশ’টা বাজে। জানালা খোলে রাতে কড়া একটা ঘুম দিয়েছি। মেজাজ টা বেশ ফুরফুরা। কাল রাতে আসলে ঘুম ইচ্ছে করে আসেনি, হুট করে চলে এসেছে। ইচ্ছে করে আসা আর হুট করে আসা ঘুমের মাঝে বিস্তর ফারাক আছে। ইচ্ছে করে যে ঘুম আসে সেটাকে, জোর করে আনতে হয়। আর হুট করে যে ঘুম আসে, সেটা প্রকৃতির ইচ্ছায় আসে। যার উপর কারো নিয়ন্ত্রন থাকে না। কাল রাতে আমার হুট করে ঘুম এসেছে। আর সেটা এসেছে প্রকৃতির ইচ্ছে অনুযায়ী।

কাল রাতে আকাশে একটা বিশাল চাঁদ উঁকি দিয়েছে। আমার জানালা টা রুমের পূর্ব পাশে, হওয়ার সুবাদে আকাশের মস্ত বড় চাঁদটা সম্পূর্ণ দেখা যায়। ঘর আলোতে ভরে উঠে, সাথে তৈরি হয় নেশা ধরা এক পরিবেশ। এইরকম পরিবেশের সাথে আমার হরহামেশা দেখা হয়। তারা যখন আমার সাথে দেখা করে, তখন তাদের বলি –
“ কিরে ব্যাটা? আজকে কি জন্য আসলি? ”

তারা অন্ধকার কে দূরে ঠেলে দেয়, মুচকি হাসি দিয়ে। তারপর বলে, “ প্রকৃতি আপনার সাথে খেলা করতে পাঠান আমাদের।”

আমার ছোট্ট ঘরে প্রচুর আলো প্রবেশ করে, জানালা দিয়ে। আমি রুমের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে, খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়লাম টেবিলে। সাদা আলোতে গোটাগোটা অক্ষরে তিন লাইনের একটা চিরকুট লিখলাম।

হলুদ রঙের খামে, চিরকুট টা ভরে সযত্নে খামের মুখ বন্ধ করে দিলাম। ঝুড়ি ভর্তি বেশ কিছু রঙিন খামের সাথে হলুদ খাম টাকে মিশিয়ে দিয়ে, ঝুড়ি টার দিকে তাকিয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। অনেক কথা এই ঝুড়ির পেটে থাকা খামে বন্ধি হয়ে আছে। শেষে ঝুড়ি টাকে খুব আদর করে তোলে রাখলাম নিরাপদ জায়গায়।

বিছানায় এসে জানালার পাশে বালিশ রেখে, ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল দশ’টায় নীলিমা কল দিয়ে শুধু একটা লাইন বলল,

– ঠিক একটা’ কুঁড়ি মিনিটে, যে রেষ্টুরেন্টে দেখা করি সেখানে আসবে।
আমি কিছু বলতে পারিনি। বলব কিভাবে? তার আগে কল কেটে দিয়েছে। দ্বিতীয় বার কল দেওয়ার অনুমতি দেয়নি আমাকে। বেশ অদ্ভুত একটা মেয়ে, নীলিমা। অদ্ভুত বলার কারণ টা যুক্তিযুক্ত ই।

তার কড়া একটা শর্ত, “কোনোদিন আমার নাম্বারে কল দিবে না। আমি নিজেই দিব। কল দেওয়ার পরে দ্বিতীয় বার কল দিবে না। ” আমি ই বোধহয় একমাত্র ছেলে, যাকে নিজের প্রেমিকা মিসড কল না দিয়ে ডাইরেক্ট কল দিয়ে কথা বলে। মেয়েরা মিসড কল দিবে, আর ছেলেরা ডাইরেক্ট কল দিবে। এটাই হচ্ছে নিয়ম। কিন্তু মেয়েটা এসব নিয়ম মানে না।

তার আরো একটা কড়া শর্ত, “ কোনো মেয়ের সাথে কথা বললে, চোখ খুলে নিব। ” আমি অনেক দিন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছি, “চোখ খুলবে কেন? চোখ খোলার দরকার কি? কথা বললে, জিহবা কেটে দিও। ” নীলিমা হেসে উত্তর দেয়, “ চোখ খুলে নিলে, দেখবে ও না – কথা ও বলবে না। ” কি ভয়ংকর ব্যপার?

আমি কালকে কিনে আনা, হলুদ রঙের পাঞ্জাবির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। কালকে, কালো রঙের একটা সাধারণ পাঞ্জাবি কিনতে বাজারে যাই। পাঞ্জাবি দেখার সময় হলুদ রঙের পাঞ্জাবি টা দেখে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে প্রবেশ করে ফেলি। পুরো ছ’শো টাকা দিয়ে পাঞ্জাবি টা কিনে, বাড়ি ফিরছিলাম। পকেটে বাড়তি একটা টাকা ও ছিল না। সেজন্য দু ঘন্টা হেটে বাড়ি ফিরতে হয়।

কালো রঙের প্যান্ট এর সাথে পাঞ্জাবি টা মানাচ্ছে না। বাইরে ছাঁদে শোভন ভাইয়ের একটা পাজামা শুকাতে দিয়েছে ভাবি, সাথে নীল রঙের পাঞ্জাবি। আমি পাজামা টা পড়ে নিয়ে, হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে পড়লাম মহা ঝামেলায়। হুট করে, জুতো জোড়ার বেল্ট ছিড়ে গেল। গত চার মাস ধরে, একশো’ বিশ টাকা দিয়ে কিনা স্যান্ডেল পড়ে হাটছি। ছিড়ার কথা নয় কি? এত দিন যে কি করে গেল সেটাই ভাবছি।
খালি পায়ে, হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে রাস্তায় হাটতে শুরু করেছি। শোভন ভাই আমাকে, রাস্তায় দেখে হা করে তাকিয়ে রইলেন। পাশে এসে বললেন,

– তোর মাথায় আবার হিমুর ভূত চাপলো কিভাবে?
– শোভন ভাই, আপনি মেয়ের বাবা হতে চলেছেন।
শোভন ভাই অনেকটা বিরক্ত এবং এক সময় রেগে গিয়ে, আমাকে বললেন,
– তুই, একদম হিমু হবার চেষ্টা করবি না। থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব।

আমি মুচকি হেসে, হাটা শুরু করলাম। গন্তব্য রাজ ভোজন রেস্তোরাঁ। পিছনে শুধু শোভন ভাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন। আমি চলে আসার জন্য চার কদম পা বাড়াতে, উনার কাছে একটা কল আসে। উনার কথা বলার ধরন দেখে বুঝতে পারি, ভাবি কে নিয়ে সমস্যা। আমি হেটে চললাম, কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে।

খালি পায়ে উত্তপ্ত পিচ ঢালা রাস্তায় হাটতে পারছি না। খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই কষ্টের মাঝে ও আমার একটা নেশা নেশা ভাব ধরেছে। মাথায় রোদের উষ্ণ তাপ আর চারপাশে থাকা কলহ আমাকে ঘিরে রেখেছে। আমি কল্পনা করার চেষ্টা করছি, কিভাবে নীলিমার সামনে গিয়ে দাড়াবো।

“ আমি পনেরো মিনিট দেরি করে, রাজ ভোজন রেস্তোরাঁ’তে প্রবেশ করব। নীলিমা আমাকে দেখার পরে বিরক্তি নিয়ে বলবে, বাজে কয়টা? তোমার কি সময় নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস নেই? এটা কিন্তু খুব খারাপ। আর হলুদ পাঞ্জাবি কেন পড়ে এসেছো? জানো না আমি হলুদ রঙ সহ্য করতে পারিনা? ঘেমে একাকার কেন? এই রোদের মধ্যে হেটে চলে এসেছো এত দূর? তোমার কোনো কান্ড জ্ঞান নেই? পায়ের দিকে, তাকিয়ে কিছুক্ষণ ‘থমকে’ হয়ে থাকবে। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলবে, খালি পায়ে কেন? হিমু হবার চেষ্টা চলছে না কি? ভুলেও এইসব করবে না। হিমু চরিত্র টা আমার একদম সহ্য হয় না। তুমি কি করছ, এসব? আমি চুপচাপ তার কথা শুনে যাব, কোনো উত্তর দিব না। নীলিমা একসময় আমাকে বলবে, তুমি ওই পাশে কেন বসেছ? কতবার বলেছি, আমার সাথে দেখা করতে আসলে আমার পাশে বসবে। তোমাকে সব কিছু বলে দিতে হয় কেন? এখনো ওইখানে বসে আছো? তুমি উঠে আসবে না আমি আসব? আমি মুচকি হেসে বলব, জানো নীলিমা তুমি দিন দিন মুটি হয়ে যাচ্ছো। তুমি উঠে আসলে তোমার একটু কসরত হবে, আর তারপর কিছু পরিমাণ ক্যালোরি কমবে। তুমি ই উঠে আসো। নীলিমা গাল ফুলিয়ে বলবে, আমি মুটি না। আমি তার দিকে তাকিয়ে, মিটিমিটি হাসবো। তারপর একসময় নীলিমা উঠে আসবে, আমার পাশে বসবে। রাগী গলায় বলবে, তুমি দুপুরে খেয়ে এসেছো? আমি অবাক হবার ভান করে বলব, তুমি না বললে ঠিক একটা কুড়ি মিনিটে চলে আসতে? নীলিমা বিরক্ত স্বরে বলবে, তুমি কি সময় মত এসেছো? আমি চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকব। ”

– হিমু ভাই না?
আমি নীলিমা কে নিয়ে করা এত সুন্দর কল্পনা থেকে অনেক দূরে সরে আসলাম। ইচ্ছে করে ও আর সেই কল্পনায় ফিরতে পারছিলাম না। মানুষ যখন কোনো কল্পনা করে, তখন সামান্য একটা জিনিস সেই কল্পনা থেকে মাইল খানিক দূরে পৌঁছে দেয়। আমরা মানুষ। স্বভাবতই আমরা অলস। আর সেজন্য এত দূরে ফিরে গিয়ে আমরা কল্পনা শুরু করতে পারিনা। আমি ও যেহেতু মানুষ, সুতরাং আমি ও অলস। তাই আমি আর পিছনে ফিরে গিয়ে কল্পনা করতে পারব না। আমি সামনে থাকা তেরো কি চৌদ্দ বছরের একটা ছেলেকে দেখলাম। বেশ কৌতূহল নিয়ে আমাকে দেখছে ছেলেটা। ছেলেটার বয়স তেরো চৌদ্দ থেকে বেশি হবে না। এই বয়সের ছেলেরা বইয়ের চরিত্রের বিষয়ে অনেক কৌতূহলী হয়। সাধারণত ষোল বছরের পর ছেলেদের মধ্যে যে কৌতূহল টা জন্ম নেয়, সেটা নিষিদ্ধ জিনিস গুলো নিয়ে। পূর্ণ বয়স্ক মানুষ নিষিদ্ধ বিষয় গুলো নিয়ে চিন্তা করতে আনন্দ আর মজা দু’টি পায়। ষোল বছরের পরে ছেলেদের মধ্যে লজ্জা জাগে, সাথে জাগে নিষিদ্ধ জিনিস জানার অদম্য কৌতূহল। আমার সামনে থাকা ছেলেটা ষোল বছরের না, আমি নিশ্চিত। সে হিমু চরিত্র নিয়ে কৌতূহলী। আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললাম,

– কিরে ব্যাটা কুদ্দুস আলী ?
– হিমু ভাই আমি কুদ্দুস আলী না।
– তোর আসল নাম কুদ্দুস আলী না?
– হু! কিন্তু আমাকে কুদ্দুস আলী ডাকবেন না। আমার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, “ সাদেকুর রহমান পায়েল ” আমার নতুন নাম।
– তোর মাঝে কি মেয়েলী স্বভাব আছে? পায়েল নাম কেন?
– হিমু ভাই, এটা মডার্ন নাম।
– আচ্ছা। আমি যে নকল হিমু তুই জানিস?
– আপনি নকল হিমু না।
– কেন? তোর এমনটা তোর মনে হলো?

– আপনি নকল হিমু হলে, আমার আসল নাম কোনোভাবে জানতে পারতেন না। ‘কুদ্দুস আলী’ আমার দাদা’র রাখা নাম। এই নামে গ্রামে অনেকে আমাকে, চিনে। কিন্তু শহরে কেউ চিনেনা।

– তোর বাবা একজন ঘুষখোর তুই আমার কথা বিশ্বাস করিস?
– আপনি যখন বলছেন, তখন বিশ্বাস করতে হয়। হিমুরা সব বলতে পারে।

– হিমুরা বললি কেন? আসল হিমু তো একজন! আর আমি নকল হিমু। আমার কথা বিশ্বাস করবি না একদম।
– হিমু ভাই। আপনি ঠিক বলেছেন, আমার বাবা ঘুষ নেওয়ার জন্য পুলিশের চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। এখন বলেন তো কিভাবে আপনাকে নকল হিমু বলি?

– তোদের বাড়িতে বিকেলে একবার আসবো। মা কে বলিস, গরুর মাংস ভোনা আর চিকন চালের রান্না করতে।
– বাবা আজকে, বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে এনেছেন। আপনি চলেন, দুপুরে খেয়ে নিবেন।
– না রে ব্যাটা। আমি বিকেলে আসবো।
– ঠিক আছে।

ছেলেটা রাস্তার ওপারে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। আমি তাকে পিছন থেকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

– শোন ব্যাটা। তুই তো বাড়ির ঠিকানা দিলি না। আমি কিভাবে আসবো?
ছেলেটা মিটিমিটি হেসে বলল,

– হিমু ভাই। আপনাকে কিছু বলতে হবে না। আপনি ঠিক ই বাসা খুঁজে চলে আসবেন।

আমি ছেলেটার চলে যাওয়া দেখছি। কত সুন্দর করে হাসে ছেলেটা। আমি জানতাম, ছেলেরা সুন্দর করে হাসতে পারে না। কিন্তু ছেলেটার বেলায় আমার ধারণা পালটে গেল। এই ছেলেটার হাসির প্রেমে পড়বে অনেক মেয়ে। কিন্তু আফসোস, ছেলেটা কারো হবে না। প্রকৃতি তাকে নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা খেলবে একটু পরে। প্রকৃতির বিপক্ষে কিছু করা যায় না। কিছু করলে তার ফলাফল হয় বিপরীত। আমার মনে একটা কুঁ ডাক ডেকে উঠেছে। ছেলেটার সাথে বিকেলে গরুর মাংস ভোনা দিয়ে চিকন চালের ভাত খাওয়া হবে না। ছেলেটার জন্য এক ভয়ানক ভালবাসা জেগে উঠলো শেষ পর্যন্ত। আমি প্রকৃতির বিপক্ষে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিব কি না সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছি। জগতে মায়া খুব কষ্টকর। ছেলেটা আমার দিকে একবার মাথা ঘুরিয়ে দেখলো, তারপর সব শেষ। আমি প্রকৃতির বিপরীতে যাব, সেটা বোধহয় প্রকৃতি বুঝে গেছেন। আমাকে তিনি তাই সুযোগ দিলেন না, শেষ চাল টা খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলেন। ছেলেটার ব্যথায় কুঁচকে উঠা মুখটা দেখেছি শুধু। তারপর কচ্ছপ গতিতে আমি তার পাশে গেলাম। রাস্তায় বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ ভীড় করেছেন। গাড়ি থেকে নেমে, এক ভদ্রলোক দৌড়ে এসে ছেলেটাকে নিয়ে গাড়িতে তোলে দ্রুত গাড়ি নিয়ে ছুটে চললেন। আমি জানি তিনি কোথায় যাবেন এখন।

আমি রাস্তার মাঝে দাড়িয়ে ছেলেটার তাজা রক্ত দেখছি। আমি কি আসলে ‘আসল’ হিমু? আসল হিমু কি চোখের সামনে কাউকে এভাবে বিপদে পড়তে দিত? অশৃংখল জ্যামে অনেকে আটকে গেছে। আমি রাস্তার মাঝে উদ্দেশ্যেহীন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় অনেকে বিরক্ত হয়ে হরণ দিচ্ছে। জগত টাকে নিয়ে প্রকৃতি বেশ নিষ্ঠুর খেলা খেলেন। আমরা যতবড় পাপ করি না কেন, প্রকৃতি এর শেষে বিচার ঠিক ই করেন। একজনের পাপের শাস্তি আরেকজন কে দিয়ে দেন। প্রকৃতি খুব ভালো ভাবে আমাদের বুঝেন। উনি জানেন, আমাদের দূর্বল জায়গা কোনটা। আমি রাস্তা পেরিয়ে ৩৬/সি নাম্বার বাড়িটা খুঁজে চলেছি। আমার ধারণা পায়েলের বাড়ি এখানে কোথাও। বাসার নাম্বার হচ্ছে ৩৬/সি। রাস্তার পাশে থাকা একটা পানের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম,

– ৩৬/ সি! বাসাটা কোথায় ?

দোকানে থাকা, ছটফটে চেহারার এক সুন্দরী নাবালিকা আমার দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে একটা হাসি দিল। জগতের সব বাচ্চাদের হাসি এত নিষ্পাপ আর সুন্দর হয় কেন? এর পিছনে প্রকৃতি কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন? আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো, সাদেকুর রহমান পায়েলের মুখটা। ছেলেটার নিষ্পাপ হাসিটা আমার চোখে ভাসছে কেন?

– পায়েলের বাসা খুঁজছেন?
– হু.. তুমি চিনো ?
– জ্বী, চলেন আমার সাথে।

মেয়েটা ভিতরে গিয়ে চট করে বাইরে বেড়িয়ে এলো। তার হাতে এক মুঠো চুইংগাম। গায়ের জামার পকেটে চুইংগাম ভর্তি করতে করতে সামনে হেটে চললো। তার বলা একটা কথা আমার কানে বারবার প্রতিধ্বনি তুলছে।
“ জানেন, পায়েলের চুইংগাম খুব পছন্দ। আমার সাথে দেখা হলে চুইংগাম খুঁজে নির্লজ্জ টা! ”

মানুষের সাথে কত স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। সাদেকুর রহমান পায়েল হয়তো এরপরে সবার স্মৃতি হয়ে থাকবে। স্মৃতি গুলো খুব যন্ত্রণা দেয় মানুষকে। স্মৃতির সাথে আপোষ করা উচিৎ না। স্মৃতি কে মুছে ফেলতে হয়। বড়সড় একটা বিল্ডিং এর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটি। আমাকে বললো ,

– গেইটে দারোয়ান আমাকে ভিতরে যেতে দেয়না। আপনি গেইট খোলার ব্যবস্থা করুন।

আমি গেইটে গিয়ে দারোয়ানকে ডাকলাম। বেশ কয়েকবার টোকা দিলাম গেইটে। চার পাঁচ মিনিট পরে কর্কশ কন্ঠে কেউ একজন বলল,

– খুলতাছি…

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম গেইটের পাশে। মেয়েটা আতংকিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন আমি বাঘের খোলা খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, বাঘ এক্ষুনি এসে আমাকে ছিড়ে ছিড়ে খাবে। মেয়েটা আমার থেকে ছ’হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। গেইটের ক্যাচক্যাচ শব্দ শুনে আমি দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম শুটকি মত একজন লোক গেইট খুলেছে। লোকটার কণ্ঠস্বর বেশ ভরাট। চেহারা না দেখলে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম এই লোকটা এভাবে কথা বলে। আমি কল্পনা করে নিয়েছি, লোকটা মোটাসোটা হবে। আমার দিকে প্রশ্ন বোধক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

– কি চাই? এখানে কেন?
আমি লোকটা কে ধমক দিয়ে বললাম,

– চুপ! তোর গেইট খুলতে এত দেরি হলো কেন? দাড়া তোর চাকরি খাচ্ছি আমি এক্ষুনি। পায়েলের বাবা কই? গিয়ে বল এক্ষুনি নিচে আসতে, আর সাথে তার মাকে ও আসতে বলবি।

লোকটা আমার কথা শুনে কেপে উঠে দৌড় দিল। বাতাস যেন উড়িয়ে নিয়ে গেল লোকটা কে। আমার হুট করে লোকটার উপর মেজাজ গরম হয়ে গেল। আজ লোকটার চাকরি যাবে আমি নিশ্চিত। লোকটার উপর মেজাজ খারাপ হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, পায়েল কে আজ কেন বাইরে বের হতে দেওয়া হলো। কিভাবে পায়েল বাইরে গেল? তার তো পায়েল কে বাইরে একা যেতে দেওয়া উচিৎ হয়নি। বেশ বিরক্ত বোধ করছি আমি লোকটার উপর। বিশাল একটা রাজপ্রাসাদ বানিয়ে রেখেছে পায়েলের বাবা। সব হারাম পয়সা দিয়ে তৈরি। যা কখনো টিকে থাকবে না। প্রকৃতি একটা একটা করে এই রাজপ্রাসাদের ইট খুলে নিবেন। একসময় এই রাজপ্রাসাদ হয়ে পড়বে ছোট্ট একটা ঝুপড়ি। ভুড়িওয়ালা শ্যামলা রঙের একজন ব্যক্তি ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দৌড়ে আমার দিকে আসছেন। উনার পিছনে দারোয়ান, আর দারোয়ানের পিছনে একজন লম্বা মহিলা। উনার উচ্চতা বোধহয় ছ’ফিট হবে। শ্যামলা রঙের ভুড়িওয়ালা লোকটি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি হাপিয়ে গেছেন এইটুকু জায়গা দৌড়ে এসে। আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

– কিছু বলবেন?

আমি উনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম উনার কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। আমি লোকটার করুন দৃষ্টি দেখে কিছুক্ষণ নিরব রইলাম। সময় নিলাম, উনাকে কথা টা বলার জন্য। উনি সেটা হজম করতে পারবেন কি না সেটা ভাবছি। ভদ্রলোকের স্ত্রী যখন, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– পায়েলের কিছু হয়েছে?
আমি বুঝতে পারলাম প্রকৃতি, জন্মদাত্রী মা’কে এমন কিছু গুন দান করেন যার মাধ্যমে সন্তানের সব কিছু মা বুঝে যান। উনি কি সাদেকুর রহমান পায়েলের ব্যপারে কিছু আঁচ করতে পেরেছেন?
আমি থমথমে কণ্ঠে বলে উঠলাম,

– পায়েলের একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। সে এখন বোধহয় কোনো হাসপাতালে আছে। আমার ধারণা সে এখানে খুব কাছে কোনো হাসপাতালে আছে। এখানে এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন হাসপাতাল আছে?

পায়েলের মা ‘শাড়ির আচঁল দিয়ে মুখ চেপে ধরেছেন। উনার চোখ মূহুর্তে জলজল করে উঠলো। দারোয়ানের ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। চোখে মুখে ভয় ফুটে উঠেছে স্পষ্ট। মানুষ কিভাবে এই মূহুর্তে নিজের চাকরি নিয়ে চিন্তা করতে পারে সেটা নিয়ে আমি ভাবতে চাইছি, কিন্তু সেটা পারিনি। শ্যামলা রঙের ভুড়িওয়ালা লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমি লোক টাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

– পাপ কখনো বাপ কে ছাড়ে না। কথাটা শোনেছেন আগে? আমার মনে হয় না শোনেছেন। কথাটা অল্প কিন্তু এর গুরুত্ব অনেক।

আমি পায়েলের মায়ের উদ্দেশ্য বললাম,

– আপনি কান্না করবেন না প্লিজ। প্রকৃতি আমাদের দূর্বলতা বুঝেন। আর সেই দূর্বল জায়গায় প্রকৃতি আঘাত করে। আমাদের পরীক্ষা করার জন্য, আসলে আমরা কতটা শক্ত সেটা জানার জন্য। আপনি গিয়ে গরুর মাংস ভোনা আর চিকন চালের ভাত নিয়ে হাসপাতালে যান। আমার মন বলছে পায়েলের ক্ষিধে পেয়েছে আর সে এখন মোটামুটি সুস্থ।
আমি ঘুরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি ছোট্ট মেয়েটার চোখ থেকে জল পড়ছে অঝোরে। তার পাশে গিয়ে বললাম,
– কিরে বেটি? কান্না করছিস কেন? পায়েল ভালো আছে। তুই চুইংগাম গুলো নিয়ে যা উনাদের সাথে। পায়েল না তোকে দেখলে চুইংগাম খুঁজে?

মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো। আবেগের খেলা বুঝা বেশ কঠিন। প্রকৃতি আমাদের মাঝে দু ধরনের আবেগ দিয়েছেন। একটা সুখের আর অন্যটা দুঃখের। এই দুটি আবেগের খেলা বেশ অদ্ভুত। এই খেলা অপেশাদার মানুষের জন্য না। খেলোয়াড় কে প্রকৃতি নিরবে নির্বাচন করেন।
আমি পায়েলের বাবা’র উদ্দেশ্য বললাম,

– মেয়েটা যদি বাড়িতে আসে, তাকে বিদায় করে দিবেন না আর কখনো। আপনারা হাসপাতালে ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন।

আমি মেয়েটা কে রেখে হাটতে শুরু করলাম। আমার এখন নির্ধারিত কোনো গন্তব্য নেই। আমি হেটে চলেছি ভবঘুরে হয়ে। মাথার উপরে এখন আর গরম সূর্য তাপ ছড়াচ্ছে না। বিকেল হয়ে এলো। সময়ের খুঁজে আমি যখন ব্যস্ত হয়ে উঠলাম , তখন আমার ভিতরে কে যেন বলে উঠলো,
“ তুমি একদিনের হিমু! ”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত