স্মৃতি মুক্তি

স্মৃতি মুক্তি

আমার মনে হচ্ছে, আমি পাগল হওয়ার পর্যায়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। থেকে থেকে খালি আজগুবি কল্পনা মাথায় আসে। এই যেমন ধরুন, আপনি একটা গামলায় বসে ধ্যান করছেন একমনে, হঠাৎ কেউ এসে যদি একবালতি টাটকা গরমজল ঢেলে দেয়! হাহাহাহাহাহা।

চেম্বারে আসা মেয়েটার চেহারা বা শারীরিক অবস্থা বাইরে থেকে দেখে কেউ বলবেই না যে, ওর মানসিক কোনো সমস্যা আছে। সুস্থ স্বাভাবিকই মনে হয়, কিন্তু কথাগুলো! আমার মতো গম্ভীর মানুষও হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম।

একটানা বলেই যাচ্ছে মেয়েটা, “আচ্ছা ডাক্তারবাবু ভাবুন, মাঝরাত, পিনপতন নীরবতা চারিদিকে, ঘুটঘুটে আঁধারে কেবল একটা কম আলোর ল্যাম্পপোস্ট আলো মিটমিটিয়ে জ্বলছে। বড় বকুল গাছটায়, যেখানে অশরীরি কিছুর বাস, তারই নিচে একটা লোক বসে কর্ম সাড়ছে। হঠাৎ একটা বেড়াল লোকটার ঘাড়ে পড়লো! হাহাহাহাহাহাহা……..

মেয়েটা পারেও! হাহাহাহা। অদ্ভুতভাবে আমিও ওইসব কল্পনা করছি বসে বসে। মেয়েটার ব্যাপারটা আমার কাছে নতুন ছিলো। এর আগে এতো রোগী দেখেছি সবার থেকে ওর ব্যাপারটাই আলাদা ছিলো। বেশ উৎসাহ নিয়েই কাজটা করছিলাম।

সেদিনরাতে প্রায় ১টা নাগাদ ফোনের কাঁপুনি শুরু হয়। সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু না ঘুমালেই নয়। গা এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে ঘুম নেমে এলো। ফোনের শব্দে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলাম। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো, “ডাক্তার, আমি না এখন এলোচুলে ছাদের রেলিং এ বসে আছি। হঠাৎ নিচ থেকে কেউ তাকালো আর আমি হিঁহিঁ করে হেসে দিলাম…ভাবো একবার….হাহাহা।”

তখন মনে হচ্ছিলো মেয়েটা সত্যিই পাগল হয়ে গেছে। বলে কী রাতে ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে কী না জানতে ফোন দিলাম। একটু পরেই আসল কথাটা বললো। কথা বলার ঢং টা বেশ লাগে কিন্তু।বেশ মিষ্টি করেই বলল,
“ডাক্তার বেশি ঘুমিও না। তোমার ঘরে চোর ঢুকছে। না ধরলে পরে তোমাকেও তুলে নিয়ে যাবে। হিহিহি”।

সত্যি সত্যিই রান্নাঘরের বাসন ঝনঝনিয়ে উঠলো। ব্যাচেলর মানুষের ঘর যেমন হয় আমারটা একটু উন্নত। খুব বেশি তো না তবে মোটামুটি ভালোই জিনিস আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোর ধরা পড়লো আর সকালে জানতে পারলাম মেয়েটা আমার ওপরের তলাতেই থাকে। কিন্তু ভাবছি, মেয়েটা কী রেলিং এ বসে চোর পাহারা দেয়!

মেয়েটা বেশ মিশুক। ও যখনই চেম্বারে আসতো কেন জানি বেশিরভাগ সময়টা ওকেই দিতাম। সে যতই জরুরী কাজ থাকুক, সব বাদ দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পিপিন নামের এই অদ্ভুত মেয়েটার সাথে বসে কাটাতাম।

কিছু কিছু মানুষ থাকে, যারা নিজেদের মধ্যে বাচ্চাসুলভ একটা ভঙ্গি তৈরী করে। ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা হোক বা যা হোক। আর কিছু মানুষ থাকে, যাদের মধ্যে বাচ্চাসুলভ ভাবটা অজান্তেই এসে পরে। অভিনয়ের দরকার পরে না। দেখলেই মায়া লাগে। পিপিন তেমনই একজন ছিলো।

ব্যস্ততার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম বেশ কিছুদিন ধরেই। নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নেই। মায়াপুর যেতে ইচ্ছে করছিলো খুব। হঠাৎ একটা কল এলো, স্ক্রিনে “পিপিন” নামটা জ্বলজ্বল কর ভাসছে। হাজার ব্যস্ততাতেও এই কলটাই কখনো কেটে দিতে পারিনি। কেন জানিনা।

রিসিভ করে কানে দিতেই একটা হাসির শব্দ ভেসে এলো। তারপরেই কয়েকটা শব্দ,” আজ বিকেলে মায়াপুর যাবেন আমার সাথে। প্রশ্ন না, জানালাম কথাটা। টাটা।” খট করে লাইনটা কেটে গেল। মেয়েটা কী মন পড়তে জানে! কী করে বুঝলো!

স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটছি তবে অনেকটা ছন্নছাড়া ভাবে। পিপিনের বকবকানির কাছে সব ভাল লাগাও হার মানাচ্ছিলো যেন। আর সেই কী হাসি! শুরু হলে থামতেই চায় না। হঠাৎ বলে,

” ধরুন, আজ আপনার হিমু হতে ইচ্ছে হলো। হলুদ পকেটবিহীন পাঞ্জাবী, খালি পায়ে। কোনো রূপাকে ফোন করে বাসস্ট্যান্ডে আসতে বললেন। বেরিয়ে পরলেন কিন্তু ওখানে গেলেন না। অচেনা কোনো দিগম্বর বাবার খোঁজে ঘুরতে লাগলেন। পেয়েও গেলেন।

ধ্যানমগ্ন দিগম্বর বাবাকে প্রশ্ন করলেন,
-“কী গো দিগম্বর বাবা! সাধনা কেমন চলছে?
কুতকুতে চোখ দু’টো তুলে সাধু বললেন,
-“দিগম্বর কও ক্যারে! দিগম্বর মানে কিতা?”
-“দিগম্বর মানে হল বিবস্ত্র বা সহজ শব্দে নেংটা।”
পাশ থেকে সাগরেদটা ধমকে উঠলো,
-“দেহো! সাধুবাবা ডারে ল্যাংডা ডাহে” সাধুবাবা কন!”

তারপর…..হাহাহা…..তার….হাহা….

মেয়েটা কী সত্যিই পাগল নাকি মন ভাল করার কোনো ওষুধ! আমার জানা নেই । ব্যস্ততা আর শত কষ্টের মধ্যেও ভালো থাকা ওর কাছ থেকেই শেখা। এই রে! বর্ণনাটা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে। তবে হলপ করে বলতে পারি, ওর সম্পর্কে খুব কমই বলেছি।

কিছুদিনের মধ্যেই পিপিন সম্পর্কে আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ হতে থাকলো। আমি ভাবতাম হয়তো খুব বেশি বিষণ্ণতায় ভুগছে। কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। পরবর্তীতে দেখলাম সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকা মেয়েটা অনেক মানসিক চাপ নিজের মধ্যেই বয়ে বেড়াচ্ছে । গুমড়ে মরছে ভেতরে অথচ কাওকে কিছু বলে না।

নিরীক্ষণের পর বুঝলাম, আর বেশি চাপ নিলে হয়তো স্নায়ু ছিঁড়ে কোমায় চলে যেতে পারে এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। প্রিয় বন্ধু ও প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে বারবার ধাক্কা খেয়ে খেয়ে মেরুদণ্ডই ভেঙে ফেলেছে। বেঁচে আছে তবে মরার পর্যায়ে গিয়ে।

গত দশদিনে মেয়েটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, শুনেছি,জেনেছি। যেসব বন্ধুদের জন্য মরছে তাদের সম্পর্কে কখনে একটাও বাজে শব্দ বলেনি কখনো। পরে ওর এক আত্মীয়ের কাছে জানতে পারি সবটা। এমন একটা মেয়ে যে ছোট থেকেই বন্ধুবৎসল। কেউ একটু ভাল করে কথা বললেই তাকে বিশ্বাস করে বসে।

বন্ধুগুলো সবসময় তাকে প্রিয়জন নয়, প্রয়োজন ভেবেছে। রক্ত নেওয়া থেকে প্রেমিকাকে গিফট দেওয়া সমস্তটাই যেন পিপিনের দায়িত্বে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসেছিলো। তবুও দিনশেষে সেই মেয়েটাকেই “পাগল,মাথা খারাপ, নিচু মানসিকতা ” আারো না জানি কী কী বলে দূরছাই করেছে।

শেষবার ওর প্রিয় বন্ধুর কিডনীতে সমস্যা ধরা পরে। দুটো কিডনীই বাদ দিতে হবে। যেখানে বিপদ এসে দাঁড়ায়, ভালবাসা তখন জানালা খুঁজতে ব্যস্ত। লাখ টাকার প্রেমিকা পালালো অথচ সেই নিচু মানসিকতার মেয়েটাই কিনা একটা কিডনী নির্দ্বিধায় দিয়ে দিলো। পরবর্তীতে প্রেমিকা ফিরে এলে তার সামনেই পিপিনকে অকথ্য অপমান করা হয়। সে নাকি নিজেকে মহৎ প্রমাণ করতে এসব করেছে।

কথায় কথায় একবার বলেছিলো,
-“ডাক্তার, জীবনে যাইই করো, কখনো এমন বন্ধু বানাবে না যার মূল্য দু’দিন পরে শেষ হয়ে যাবে।” বুঝিনি সেদিন কথাটার অর্থ। মেয়েটার অাজগুবি কল্পনা গুলোতেও না কেমন একটা বাঁচার তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ পেত সবসময়। খেয়াল করেছি তবে এতটা আঁচ করিনি।

দশদিনের মধ্যে অদ্ভুত একটা মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম ওর সাথে। অল্প সময়টাকেও দীর্ঘ মনে হতো। না জানি কত রাত জেগেই কেটে গেছে ওর আজগুবি কল্পনা শুনে। হয়তো ওর জীবনের ওই দশদিনই আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো।

প্রায় রাতের ১/২টা বাজে ফোন আসতো, আধঘন্টা টানা বকবক তারপরই ওপাশটা শান্ত। বুঝতাম, ও ঘুমিয়ে পরেছে।

আজও কেন জানিনা একই সময়ে কানটা সজাগ রাখি, এই বুঝি ফোনটা বাজলো, স্ক্রিনে সেই নামটা ভেসে উঠলো, ওপাশ থেকে কেউ হাসি হাসি গলায় বলল,”আমার ঘরে অনেক জুনি পোকা (জোনাকি টা উচ্চারণ করতে পারতো না) সবগুলোই তুমি ডাক্তার। বুঝলে? হিহিহি”।

প্রথম যেদিন এসেছিলো শুধু যে নিজে হেসেছিলো তা না, প্রত্যেকটা স্টাফকেও হাসিয়েছিলো। যেদিন মারা গেলো সেই হাসিটায় ঠোঁটের কোণে উঁকি দিচ্ছিলো তবে চোখের নিচেকার কালিটাই প্রমাণ ওর বাঁচার আকুতিটা শেষ পর্যন্ত ছিলো।

একরাশ আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলো।

কথা বলছিলাম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিরুপম রায়ের সাথে। সেই দশদিন উনি আজো মনে রেখেছেন বর্তমান সময়ের মতোই। প্রথম দিকে খুব হেসেছিলেন নিজেও। আমি তো গড়াগড়ি খেয়েছি রীতিমতো। পরবর্তীতে চোখের জল বাঁধ ভেঙে নেমে গেছে। বন্ধুত্ব জীবনদান করে জানতাম, জীবন নিতে প্রথম শুনলাম।।

[ বেঁচে থাকুক সকল বন্ধুত্ব। সুস্থ থাকুক সকল বন্ধু।]

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত