ভালোবাসা ফাঁদ

ভালোবাসা ফাঁদ

সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গলো গ্লাস ভাঙ্গার শব্দ শুনে।ঘুম থেকে আঁতকে উঠে দেখি প্রেমা আমার রুমের ফুলদানি থেকে শুরু করে এ্যাশ ট্রে সব ফ্লোরে আছাড় দিয়ে ভাঙছে।আমি স্বপ্ন দেখছি নাকি বুঝতে পারছি না। প্রেমা আমার খাটে উঠে আমার গেঞ্জি টান দিয়ে ধরে বললো-

-ফারিয়ার সাথে রিলেসন ছিল বলোস নাই কেন!

-আসলে…

আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।প্রেমা গাল বরাবর কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে চলে গেল কাঁদতে কাঁদতে।প্রেমা চলে যাওয়ার পর আম্মা বলে উঠলেন,”মুইদা!এই মেয়ে বিয়ের আগেই বাসায় এসে এমন করলো! বিয়েটা বাবা করিস না!”

আমি আম্মাকে কোন উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে পরলাম।
নিচে গ্যারেজে গিয়ে দেখি প্রেমা ওর গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে।আমি গাড়ির কাচ নিচে নামাতে বললাম কিন্তু সে গাড়ি জোড়ে টান দিয়ে চলে গেল।দাঁড়োয়ান দেখি ফ্যাল ফ্যাল করে হাসিটা থামিয়ে আমাকে দেখছে।আমি কয়েকটা ধমক দিয়ে ভিতরের দিকে চলে গেলাম।মাথাটা খুব গরম হয়ে আছে।ফারিয়াকে কল দিলাম।

ফারিয়ার জন্য রাইফেলস স্কয়ারের ঐদিকের একটি রেস্টুরেন্টে বসে আছি। মেয়েটি আমাকে আধা ঘন্টা ধরে বসিয়ে রেখেছে।আসার নাম গন্ধও নেই। আমি জুস অর্ডার করে স্ট্র দিয়ে তা পান করছি। ফারিয়াতো আসেনি কিন্তু প্রেমা এসেছে ওর দুই বান্ধবীদের সাথে। আমি ভয়ে ভয়ে জুস গিলছি। প্রেমা অন্য টেবিলে বসেছে।প্রেমা আর আমার রিলেসানের সবচেয়ে বড় ডিস্টার্ব হলো ওর বান্ধবীরা।এই মেয়েগুলো হলো একেকজন বিচারক,বুদ্ধিজীবী। নর্মালি কাপলদের মধ্যে ঝগড়া হবেই।কিন্তু এই বুদ্ধিজীবীরা হরেক রকমের মন্তব্য, মতবাদ দিয়ে রিলেসানটায় আরো অশান্তি আনবেই।প্রেমার একটা বান্ধবীকেও দেখতে পারি না। কিন্তু আমি এদের দেখলেই হাসি মুখে কথা

বলি,প্রেমার চেয়ে বেশি কেয়ার করতে হয় ওদের।কেননা,ওদের সাথে ঝামেলা হওয়া মানে আমার রিলেসানে সমস্যা হওয়া। প্রেমা আমার দিকে রাগ করে তাকিয়ে থাকলেও সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর বান্ধবীরা। প্রেমা এখন আমার ফিয়োন্সি। কিন্তু এখনও এই বান্ধবীদের রাজত্ব চলে। আমি দূর থেকেই বুঝতে পারলাম যে প্রেমার একজন বান্ধবী বলছে যে, “মুয়ীদ ভাইয়া এখানে কি করে!?তর সাথে ঝগড়া হলো মানানোর চেস্টাও করলো না! আর এখানে বসে জুস খাচ্ছে। ছিহ! বিয়ের আগেই এত কেয়ারলেস।

বুদ্ধিজীবীরা আরো মতবাদ দেওয়ার আগেই আমি প্রেমার কাছে যাচ্ছি।হুট করে ফারিয়া আমার কাঁধে হাত রাখলো।ভয়ে আমার শরীর শিউরে উঠলো।প্রেমা এবং ওর বান্ধবীরা অগ্নি দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রেমার চোখ কাঁদো কাঁদো।প্রেমা তার টেবিল থেকে গ্লাস হাতে নিয়ে এসে জুস আমার মুখে ঢেলে চলে গেল আর যাওয়ার আগে বলে গেল,”আমার সাথে বিয়ে ঠিক করে এক্সকে নিয়ে ডেট করিস! শালা লুইচ্চা! আর জীবনেও আমাকে মুখ দেখাবি না!”

বুদ্ধিজীবীরা তো প্রেমার চেয়েও এ্যাঙ্গরি লুক দিয়ে চলে গেল।মনে হলো যে আমি প্রেমার নই ওদের ফিয়োন্সি।ফারিয়া এসব দৃশ্য দেখে হাসছে।ফারিয়াকে নিয়ে টেবিলে বসলাম।ফারিয়া বলে উঠলো-

-মুয়ীদ তোমার ফিয়োন্সি চলে গেল একবারও থামালে না!
-পাবলিক প্লেসে আরো সিন ক্রিয়েট করতো দেখ চারিদিকে তাকিয়ে কেমন করে তাকিয়ে আছে এখনো আমার দিকে! প্রেমা তোমাকে চিনলো কিভাবে?আর তুমি যে আমার এক্স এটা জানলো কি করে!

-মেয়েরা তো শার্লক হোমস জানই তো

-মেবি ওর বান্ধবীদের মাধ্যমে জেনেছে ফারিয়া কেমন চলছে তোমার দিনকাল?

-সেরা এ্যাটলিস্ট তোমার চেয়ে আমার হাব্বি হাজার গুণ বেস্ট! তোমার মত কথা শুনিয়ে কান্না করায় না! মানুষিক টর্চার করে না আর কোন ওকেসনে ঝগড়াও করে না।

-বুঝেছি শুনো দেশের একজন বিজনেস টাইকুন বলে কথা! সে কখনো হাত তুল্লেও তোমার কাছে কিছুই মনে হবে না। ওয়েট ভাল কথা মনে পরছে!আমার ফিয়োন্সি প্রেমা এটা তুমি কিভাবে জানলে?

-লিসেন মুয়ীদ আমি কিন্তু কোন প্যাচ বাজাই নাই! ম্যারিড লাইফে সুখেই আছি

-তোমরা মেয়েরা দুই লাইন বেশি ভাবো! প্রেমা আমার ফিয়োন্সি এটা জানলে কি করে?

-আরে ইয়ার! তোমার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে!

-তোমার আইডি তো ব্লক করে রেখেছি ৩ বছর হয়েছে!

-মেয়েদের আইডির অভাব থাকে না!

-হুম…. আচ্ছা ফারিয়া আজও আমায় ভালবাসো?

-তোমাকে ভালবাসলে ছেড়ে গিয়ে বিয়েটা করতাম?

-কাম অন ফারিয়া আমি সেই সময় ছাত্র ছিলাম তুমি তোমার বাসায় কিভাবে বলতে আমার কথা! এইটা টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি আমি বাস্তবতা বুঝি

-জানো মুয়ীদ চাইলে বিয়েটা থামাতে পারতাম কিন্তু,

-বাদ দাও ফারিয়া আমি উঠি গো…

-আমার সাথে উঠিগো..কি করো গো বলে কথা বলা এখনও দেখি ভুলোনি

-কেননা,তোমায় আজও ভুলিনি ও হ্যা বিলটা তুমি দিয়ো…হাজার হলেও কোটিপতির বউ তুমি

ফারিয়া হেসে দিল এবং আমিও হেসে চলে আসলাম।
রাস্তায় সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছি।হঠাৎ প্রেমার বাবার কল আসলো।রিসিভ করতেই বাপ-মা তুলে গালি দিতে লাগলেন,গালি জিনিসটা আমি খুব হেইট করি শুনতে।যদিও আমি অনেক গালি গালাজ করি।একটা সময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল, আমিও কয়েকটা গালি বসিয়ে দিলাম!

রাতের বেলা ঘরে চুপচাপ শুয়ে আছি।ঠিক তেমনটা লাগছে যেমনটা ৩ বছর আগে ফারিয়ার বিয়ের সময় লেগেছিল।
প্রেমার রাগ কমলে ওকে বোঝানো যেত,কিন্তু আমি যে প্রেমার বাবাকে যে কাউন্টার গালি দিয়েছি তারপর আর কোন কথা খাটবে না।হুট করে আম্মা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে এসে বললো-

-মুইদা প্রেমার বাবা কল দিছিলো! তুই নাকি তাকে গালি দিছোস! এসব শুনে প্রেমা ঘুমের ওষুধ খাইছে! তকে নাকি জেলে দিবে

-ঘুমের ওষুধ খাইছে মানে! প্রেমা কই!

-অমুক হাসপাতালে…

আমি সেই অবস্থায় দ্রুত হসপিটালে চলে গেলাম।আমাকে দেখেই প্রেমার বাবা গর্জে উঠলেন এবং বলতে লাগলেন –

-এ্যাই রাস্তার ছেলে তুই বাঁচতে চাইলে চলে যা!

-সিনক্রিয়েটটা পরে করেন আগে পরিস্থিতি ঠিক হোক!

-কেন জেলে যাইতে ভয় পাস!?

-আপনি পাগল নাকি! আমার ফিয়োন্সি ঘুমের পিল খেয়ে ওটিতে! আর আপনি!

-বিয়ের আশা বাদ দিয়ে দে! যে হবু শ্বশুড়কে গালি দিতে পারে সে কেমন ছেলে!

-শুনেন রেসপেক্ট জিনিসটা ছোটদের থেকে চেয়ে পাওয়া যায় না! আমি কোন রাস্তার ছেলে না যে যা খুশি বলবেন আর সহ্য করে যাবো! চৌধুরি সাহেব আর ওমর সানির সেই যুগ শেষ বুঝলেন! আর আপনি একজন সিনিয়র! যা ভাষা ব্যবহার করলেন ওটা কিছু না! টাকা থাকলেই কি মানুষ ভদ্রলোক হয়?

প্রেমার বাবা চুপ হয়ে গেলেন।আর এদিকে প্রেমা সেই বুদ্ধিজীবী বান্ধবীদের আগমণ।এসেই আমার দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।আমি ওদের দেখেই বললাম-
-আপনারা আসতে এত লেইট করলেন! বান্ধবীর রিলেসানে সমস্যা ক্রিয়েট করা ছাড়া কোন কাজ আছে! আমি জানি ফারিয়ার কথা তোমরাই জানাইছো! প্রেমার এক্স যে রাজিন..এটি তো আমি জানি কই আমিতো কোনদিন ওকে বুঝতে দেইনি! প্রেমার সাথে রিলেসান হওয়ার পর ফারিয়ার কথা অনেক বলার চেস্টা করি! কিন্তু একটা সময় মনে হলো যে না বলাটাই বেটার প্রেমা রাগি মানুষ! আচ্ছা বান্ধবীর রিলেসানে সমস্যা ক্রিয়েট করে আর বুদ্ধিজীবীর মত সলুশনের নাম করে বান্ধবীর মাথা ওয়াশ করা কোন দিক দিয়ে বেস্ট ফ্রেন্ডের লক্ষণ! আপাতত এটিই দোয়া করছি যে প্রেমার কিছু না হয়..আর কথায় কথায় কান পড়া দাও যে,”প্রেমা মুয়ীদের থেকে বেটার ডিজার্ভ করিস তুই! আজকের পর থেকে প্রেমার আশেপাশে আর দেখবা না আমাকে!বান্ধবীকে ভাল প্রেমিক খুঁজে দিয়ে বিয়ে দিয়ো!

বুদ্ধিজীবীরা চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বের হয়ে জানালো যে প্রেমা আশংকা মুক্ত এবং ১ ঘন্টা পর সবাই তার সাথে দেখা করতে পারবে।

১ ঘন্টা হয়ে গেলে আমি ভিতরে ঢুকে প্রেমাকে দেখে চুপচাপ চলে আসতে লাগলাম।কিন্তু রাগের কারণে তো মেয়েটাকে ছেড়ে চলে আসতে পারি না।দুইজনেরই রাগ বেশি।কিন্তু সম্পর্কের মাঝে যে কোন এক পক্ষকে অনেক সময় রাগটি দাবিয়ে রেখে সম্পর্কটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।আমি প্রেমার কাছে গিয়ে ওর হাতটি ধরলাম আর বললাম,”এরপর রাগ উঠলে আমার মাথা ফাটিয়ো!তাও এসব করো না।”প্রেমা হাতে চিমটি দিয়ে ধরে রেখে বললো,”আর তো কোন এক্স নেই তোমার!?”….আমি হাসতে হাসতে বললাম,”কেন শার্লক হোমসরা আছে না খুঁজে বের করার জন্য!”দুইজনেই মুচকি মুচকি হাসছি,সাথে বুদ্ধিজীবীরাও হাসছে এবং প্রেমার মা-বাবাও হাসছে।আমিতো ভেবেছিলাম সব ঠিক হবে না।যাক ঠিকতো হলো।মূলকথা,জেলের হাত থেকে বেঁচেছি।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত