পরিবারের প্রতি ভালবাসা

পরিবারের প্রতি ভালবাসা

আমি অফিসের কাজ করে বাসায় আসলাম। কিছু তো বিশ্রাম নিতে পারব। বাহিরে থাকলে বিশ্রাম নিব দূরের কথা চারদিকের মানুষের কথা শুনতে শুনতে পেট ব্যথা করে। কি পরিমাণ কথা পেটের ভিতর ঢুকে এখন বুঝেন। ফ্রেশ হয়ে খাটের মধ্যে শুয়ে পরলাম।

— আমার কথা কেউ মনে রাখে না। আমি এই পরিবারের কে? আমি তো একটা কাজের মেয়ে। আমি এই পরিবারের কাজ করার জন্য শুধু এই বাসায় আছি।

অনামিকা এই কথা গুলো বলে চোখের পানি মুছতে লাগল। আমি অনামিকার দিকে চেয়ে রইলাম। আমার চাওনি টা ছিল একটু হিংসা চোখের। আমি জানি অনামিকা কেন কান্না করছে। কারণ তার আজ জন্মদিন। জন্মদিনে তো কিছু দিতে হয়। যেমন ধরেন কেক। একটা কেকের দাম কমপক্ষে ১ হাজার হবে। ও বাবা গো আমার পকেট থেকে ১ হাজার টাকা চলে যাবে। অসম্ভব। আমি অনামিকর দিকে চেয়ে বললাম ৩শ টাকা দিলে হবে তো। অনামিকা এবার রাগের মাত্রা টা বাড়িয়ে বলে টাকা নিয়ে যাবে কোথায়?
আমি বললাম তোমার জন্য একটা জিনিস আনলাম। অনামিকা এবার আমার কাছে একটা লাফ দিয়ে আসল।
— কি এনেছ গো?

— তার আগে কান্না বন্ধ করো। যাও পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে এসো। তাইলে তোমাকে দেখতে ভালো লাগবে। এখন তোমাকে দেখতে একেবারে ভূত্নী মেয়ের মতো লাগছে।

অনামিকা খুশি হয়ে মুখ পরিষ্কার করতে গেল। এই সুযোগে আমি ঘুমিয়ে গেলাম। অনামিকা আমাকে ঘুমাতে দেখে কষ্ট করে তার কান্না টা বন্ধ করল। তবে অনেক বিরক্ত হলো। উপরের দিকে একবার তাকাল। কিসের জন্য তাকাল আমি জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে উপরের দুঃখ টা পাখির মতো উড়িয়ে দিল।

আমি খেতে বসলাম। অনেক খিদা লাগছে। কি করব। কি পরিশ্রম টাই না করতে হয়। অনামিকা কিন্তু ভালো রান্না করতে পারে। কিন্তু মসলাপাতি তো আমি এনে দেই। বাজার তো আমি এনে দেই। তাইলে তো যে কোনো মেয়ে ওই ভালো রান্না করতে পারবে। আমি ভুল করে দুধের মধ্যে চিনি মনে করে লবণ দিয়ে দিলাম। যেই মুখে দিলাম ওয়াও কি তিতা। আমি অনামিকা বলে জোরে ডাক দিলাম। অনামিকা এসে কি বলল?
আমি বললাম তিতা।
— কি তিতা? বলবা তো।
— খেয়ে দেখো।
আমার কাছে লবণ কেন রাখলে?

তুমি আমার স্বামী। তুমি আমার স্বামী হয়ে একটা গাধার মতো কাজ করো। তুমি এতো গাধা কেন? আমার স্বামী হতে পারো না। তোমার থেকে গাধা অনেক ভালো। কারণ গাধা কারো স্বামী হতে চায় না। আমি মিনমিন করে বললাম ” তাইলে তুমি গাধারও ঘর করে এসেছ। ”

মুখ সামনে কথা বলো। একটা কাজ ভালো মতো করতে পারো না। সব কিছুতে শুধু ভুল করো। এখন এই দুধমাখা ভাত কে খাইবে?

আমি হাসি দিয়ে বললাম ” তুমি খাবে। আমি চিনি দিয়ে খাব। দেও ভাত দেও আর চিনি এনে দেও। ”
অনামিকা তার বাবাকে দোষ দিয়ে আমার কাছ থেকে চলে গেল। ও বাবা আমি তোমার কাছে কি দোষ করে ছিলাম। যে একটা অপদার্থ আমার গলায় ঝুলিয়ে দিলে।

আজ শুক্রবার। তাই বাসায় কিছু কাজ করতে হবে। তাই ভাবলাম বাসা টা পরিষ্কার করি। তাই কাজ করতে লাগলাম। আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে পুড় আলমারি টা ওই পরিষ্কার করে ফেললাম। সব কাপড় ফ্লোরে রেখে আলমারি পরিষ্কার করলাম। অনামিকা এসে আমাকে বলে ” মন টায় কয় তোমারেও এই আলমারির মতো পরিষ্কার করি। গাধা পিটিয়ে যদি মানুষ করা যেত তাইলে তোমাকেও মানুষ করতে পারতাম। ” আমি আমার গাল টা হাতিয়ে দেখলাম আমি ঠিক আছি কিনা। নাতো আমি পুরাই ঠিক। তাইলে এই কথা গুলা কি আমাকে বলল। আমি আবার বললাম ” এই কথা গুলা কাকে বলছ গো?

— ঘোড়ার গাঁধে ছড়িয়ে তোমাকে মানুষ করব। সব সময় অবুঝের মতো কাজ কর কেন?
— আচ্ছা তোমার কথায় কি রস বলতে কিছু নেই। আমার মতো স্বামী পাইছ বলে ঘর করতে পারতাছ। নইলে অন্য কেউ হলে তোমাকে কবে বিদায় করে দিত।
— ইশ! আমার কপাল টা। কি সুখ টাই না তুমি আমাকে দিয়েছ। আচ্ছা আমার কোনো ইচ্ছা তুমি পূরণ করতে পারছ।
— তোমার কোন ইচ্ছা টা আমি পূরন করতে পারি নি। আমরা তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারি।
তার চাইতে কি আর করব।
— ভালো লাগছে না যাও তো।

অনামিকার অনেক জ্বর। কি করব অফিস টাও বন্ধ দিবে না। অনামিকা খাট থেকে মাথা টা তুলতেই পারছে না। আমি অনামিকার কাছে গেলাম। আমার সাথে অভিমান করেছে। আমার একটাই দোষ শুধু ঝগড়া করি। অনামিকা অভিমান করে মুখ টা লুকিয়ে রাখছে। আমি মাথা টা হাতিয়ে দিলাম। কিন্তু আমার হাত টা সরিয়ে দিচ্ছে। আমার হাতে কি ময়লা? যে মাথায় লেগে যাবে। আমি কি পঁচা জিনিষ। যে মাথায় হাত দিলে গন্ধ করবে। অনামিকা বুঝতে পারছে এবার আমিও অভিমান করে দিব। তাই কিছু বলল না। তাই অফিসের বস কে একটা ফোন দিলাম। বস কে মিথ্যা কথা বললাম। বললাম আমার প্রচণ্ড জ্বর। বস বিশ্বাস করে আমাকে দুই দিনের ছুটি দিয়ে দিলেন। এবার অনেক টা শান্তি পেলাম। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। জলপট্টি দিব। তাই পানি নিয়ে আসলাম আর জলপট্টি দিতে লাগলাম। কিছু সময় দেওয়ার পর দেখতে পেলাম জ্বর টা আগ থেকে অনেক কম। আমি অনামিকার দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিতে লাগলাম। অনামিকা মুখ বাঁকা করে আমাকে বলল ” রান্নাঘরে গিয়ে আমার জন্য রান্না করো। যাও বলছি। ”

কি আর করব বউ এর জন্য রান্না করতে গেলাম।

দুই দিন অফিসের ছুটি কাটিয়ে সকালবেলা অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছি। অনামিকা কে দেখলাম রান্নাঘরে কি করতাছে। হঠাৎ ঠাস করে একটা শব্দ হলো। আমি দৌড়ে গেলাম। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি অনামিকা ফ্লোরে শুয়ে আছে। আমার শ্বাসপ্রশ্বাস টা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার চোখ টা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি অনামিকা কে ধরে খাটে তুললাম। অনামিকা আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি অনামিকার কপাল টা হাতিয়ে দিলাম। কেঁদে কেঁদে বললাম ” তোমার কি হয়েছে?

অনামিকা কিছু বলতে পারছে না। চোখ টা শুধু বন্ধ করে আছে। আমি অনামিকা কে আমার কোলে তুলে একটা গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। গাড়িতে অনামিকা মুখ টা দেখছি। আমার খুব ঝগড়া করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু অনামিকা তো কথা ওই বলতে পারছে না। হাসপাতালে ভর্তি করতেই ডাক্তার চলে আসে। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে। মুচকি মুচকি হাসি দিয়ে বলে একটু মন ভরে হাসেন। আমি তো পুরাই অবাক হয়ে গেলাম। এ দিকে অনামিকা কথা বলতে পারছে না তার উপর ডাক্তার আমাকে হাসতে বললেন কেন?
আমি ডাক্তার কে বললাম ” কেন হাসবো বউ মরে যাবে বলে? ”
ডাক্তার রাগ করে বলে ” দূর মিয়া আপনি বাবা হতে চলেছেন। ”

সত্যি তাই। আমি মিটমিট করে একটু হাসলাম। অনামিকা শুনলে অনেক খুশি হবে। এখন অনামিকা ঘুমিয়ে আছে। কিছু সময় পর অনামিকার ঘুমটা ভাঙল। অনামিকা ঘুম ঘুম চোখে বলে ” আমার কি হয়েছিল?

আমি হাসতে হাসতে বললাম ” তোমার জ্বালা ওই সহ্য করতে পারি না তার মধ্যে এখন তোমারা দুই জন্য সঙ্গী হলে?
অনামিকা খুব অবাক হলো। আমি মুচকি হেসে বললাম ” তুমি মা হতে চলেছ। ” অনামিকা এবার আমার কোলে এসে মাথা লুকিয়ে রাখল।
কি লজ্জা হা। হিহিহি।

আমাদের বাবু টার বয়স ২ বছর হয়েছে। আমি অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে খেতে বসলাম। অনামিকা আমার বাবু টাকে খুব বকা দিচ্ছে। আমি বললাম বাবুটার বয়স তো অল্প এখন সে এতো খাবার খাবে কি করে। অনামিকা আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল। হঠাৎ রাগের মাত্রা বাড়িয়ে বলে পরিবার টা আমি চালাই। আমার যা ইচ্ছা আমি তা করব তাতে তোমার কি? এই বাবু টা আমার। বাবু টাকে আমি আদর করব মারব তাতে তোমার কি? আমাদের প্রতি তোমার এখন কোনো দায়িত্ব আছে। থাকবে কি করে এখন তো তোমার কাছে তোমার অফিসের কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যাও নিজের অফিসের কাজে যাও। আমি কিছু বললাম না। যদি বলি তাইলে আমার চাকরি থাকবে না। তাই একটু খেয়ে অফিসে দৌড় দিলাম। অফিসে দৌড় দেওয়ার আগে বাবুটার দিকে একবার চেয়ে হাসি দিলাম। বাবু টা খিলখিল করে হাসি দিল। এ দিকে অনামিকা হিংসায় মুখ টা কালো করে পেলল। কি হিংসুটে মেয়ে। বাবু টাকে যে আমি আদর করি তা নিজে সহ্য করতে পারে না। আমিও হাসি মাখা মুখ নিয়ে অফিসে চলে গেলাম।

বাবুর জন্য একটা গাড়ি কিনে আনলাম। আমার বাবু টা গাড়িতে করে ঘুরেঘুরে সারা বাসা টা ছড়বে। শুধু হাসবে। আমি আর অনামিকা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখব। গাড়িটা বাসায় এনে রাখতেই অনামিকা বলল ” আমি বললে টাকা নাই।
কিন্তু বাবুর বেলায় সব কিছু। আমি বললাম আমার একটা শাড়ি দরকার কিন্তু তুমি বলছ তোমার কাছে টাকা নেই। তুমি এতো মিথ্যা কথা বল কেন? আমার খুব কষ্ট লাগে যখন তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বল। ” আমি আমার ব্যাগ থেকে শাড়ি টা বের করে দিলাম। অনামিকা যেমন বাঘ দেখতে পেল। এমন ভাবে চেয়ে রইল। আমি বললাম এই নেও তোমার শাড়ি। সে কত খুশি।

আমার শার্ট টা প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। তবুও প্রায় ৪ বছর ধরে একটা শার্ট ওই পড়ছি। কি করব গরিব মানুষ। বউ বাবু টাকে তো বাঁচাতে হবে। তাদের সব ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমার ইচ্ছা টা মরে গেছে। তাকে যদি জাগিয়ে তুলি তাইলে তাদের আর আশা পূরণ হবে না। আমাকে খুব কষ্ট করে চলতে হবে। একটা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু কোনো রিক্সা পাচ্ছি না তাই হেঁটে হেঁটে অফিসে চলে যেতে লাগলাম। কই মাত্র তো ১ ঘণ্টা সময় লাগবে। তাতে তো আর টাকা খরছ হবে না। এইটাই আমার আয়ের উৎস। আমার পরিবারের প্রতি ভালবাসা।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত