ভালোবাসা যাতনাময়

ভালোবাসা যাতনাময়

সন্ধ্যার আকাশ তার উপর আবার আকাশে মেঘ জমেছে চারদিকে মেঘের গর্জন, মুহূর্তের মধ্যেই চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে, ব্যস্ত শহরের মানুষ গুলো ছুটাছুটি করছে শুধু ছুটছে না একটি মানুষ, রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আনমনে হয়ে একের পর এক সিগারেট টানছে রুদ্র মাঝে মধ্যে গাড়িতে দু-একটা লাত্তি দিচ্ছে, হঠাৎ বৃষ্টির ফোটা রুদ্রর উপরে পড়তেই হকচকিয়ে উঠলো সে চারদিকে মানুষের ছুটাছুটি দেখে বুঝলো তার এখন বাসায় ফেরা উচিত

রুদ্র গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক এমন সময় কে যেন বলে উঠলো

মেয়েটি: প্লিজ আমাদের একটু লিফট দিবেন আমরা এই বৃষ্টিতে গাড়ি খুঁজে পাচ্ছি না (কন্ঠটা রুদ্রর খুব চেনা লাগছে তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে পিছন ফিরে তাকালো, রুদ্র নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না এই মেয়েটিকে রুদ্র আবার দেখতে পাবে তাও প্রায় দুবছর পর সেটা রুদ্র কখনো কল্পনাও করতে পারেনি)

ছেলেটি: কি হলো আপনি কিছু বলছেন না কেন (রুদ্রর হুশ ফিরতেই মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো ছেলেটির দিকে চোখ পড়লো বাহ্ বেশ মানিয়েছে দুজনকে)

রুদ্র: হ্যাঁ চলুন কোথায় যাবেন আপনারা
ছেলেটি: এইতো সামনেই

রুদ্র: চলুন

রুদ্র ড্রাইভ করছে আর পিছনের সিটে বসে দিয়া আর ওর হাজবেন্ড কি কি শপিং করেছে তা নিয়ে কথা বলছে মাঝে মাঝে দিয়া জোরে জোরে হাসছে, এই সেই হাসি যে হাসি দেখেই রুদ্র দিয়ার প্রেমে পড়েছিল আজ প্রায় দুবছর পর দিয়ার হাসি রুদ্র শুনতে পেলো

সেদিনও এমন জুম জুম বৃষ্টি ছিল রুদ্র রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনি কে যেন রুদ্রর মাথায় ছাতা ধরে, রুদ্র পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে একটি মেয়ে ওর মাথায় ছাতা ধরে রেখেছে আর হাসছে, রুদ্র মুগ্ধ হয়ে সে হাসি দেখছিল হঠাৎ মেয়েটির কথায় রুদ্রর হুশ ফিরে

–আমার গাড়ি চলে আসবে এখনি আপনি ছাতাটা নিয়ে যান
–না না লাগবে না

–এই বৃষ্টিতে গাড়ি পাবেন না ভিজে তো একাকার হয়ে গেছেন (রুদ্র মুগ্ধ নয়নে মেয়েটিকে দেখছে আর ওর কন্ঠ শুনছে)

–কি হলো কথা বলছেন না যে
–না মানে
–আমি দিয়া, আপনি
–আমি রুদ্র
–আমার গাড়ি চলে এসেছে আপনি ছাতাটা নিয়ে যান
–নিতে পারি এক শর্তে আপনি আগামীকাল ঠিক এই সময় এই জায়গায় এসে ছাতাটি ফেরত নিয়ে যাবেন
–ওকে

দিয়া হাসতে হাসতে গাড়িতে উঠে চলে গেলো রুদ্র এখনো দিয়ার গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটির মিষ্টি হাসি কথা বলা তাকানো সবকিছু যেন রুদ্রকে পাগল করে দিয়েছে

রুদ্র গতকালের সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে দিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে ছাতাটা ফেরত দেওয়া হবে সাথে মায়াবতীকে আবার দেখা হবে, রুদ্রের অপেক্ষার প্রহর শেষ করে দিয়ে দিয়া এসে রুদ্রর সামনে দাঁড়ালো

দিয়া: সরি অনেক দেরি হয়ে গেলো আপনি বোধহয় অনেক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন
রুদ্র: এমন মায়াবতীর জন্য যুগযুগ অপেক্ষা করা যায় (বিড়বিড় করে বললো)
দিয়া: জ্বী কিছু বললেন
রুদ্র: না না কিছুনা, এই যে আপনার ছাতা
দিয়া: ছাতাটা ফিরিয়ে দেওয়া কি খুব বেশি প্রয়োজন
রুদ্র: একজন অচেনা মানুষের জিনিস আমার কাছে রাখবো কেন
দিয়া: আজ অচেনা দুদিন পর হয়তো অনেক বেশি চেনা হয়ে যাবো
রুদ্র: সেই সুযোগ কি পাবো
দিয়া: কিসের সুযোগ
রুদ্র: অচেনা মানুষটিকে চেনার
দিয়া: (কিছু না বলে মৃদু হাসল)
রুদ্র: চলুন না ওই দিকটায় যাই
দিয়া: চলুন

দুজন হাটতে হাটতে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালো, বিকেলের সোনালী রোদ নদীর পাড়ের মৃদু বাতাস সব মিলিয়ে রোমান্টিক পরিবেশ, মৃদু বাতাসে দিয়ার চুল উড়ছে আর ও বার বার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করছে সাথে অনেক কথা বলতেছে আর রুদ্র চুপ হয়ে সেই কথা গুলো শুনছে আর আড়চোখে দিয়াকে দেখছে, হঠাৎ দিয়া চুপ হয়ে রুদ্রর দিকে গভীর ভাবে তাকাতেই রুদ্র কোনো কিছু না ভেবে নদীর পাড়ের একগুচ্ছ কাশফুল হাতে নিয়ে দিয়ার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়লো

রুদ্র: মায়াবতী তোমার হাতে হাত রেখে সারাটি জীবন কাটানোর সুযোগ দিবে
দিয়া: (কিছু না বলে ফুল গুলো হাতে নিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে হাসছে)
রুদ্র: (দিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে দিয়ার হাসি দেখছে)

হঠাৎ দিয়া রুদ্রর দিকে তাকাতেই দেখলো রুদ্র ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, দিয়া লজ্জা পেয়ে রুদ্রর বুকে মুখ লুকালো

প্রতিদিন মোবাইল ফোনে চুপিচুপি কথা বলা, সেই নদীর পাড়ে প্রতিদিন দেখা হওয়া, ছোট ছোট খুনসুটি, মান-অভিমান আর একরাশ ভালোবাসা নিয়ে চলছে রুদ্র আর দিয়ার জীবন

সুখ নাকি খুব ক্ষণস্থায়ী তাই রুদ্রর জীবনেও সুখগুলো বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, প্রতিদিনের মতো আজো রুদ্র আর দিয়া নদীর পাড়ে এসেছে, দিয়া বসে আছে আর রুদ্র দিয়ার কোলে ছোট বাচ্চার মতো শুয়ে আছে এইটা রুদ্র প্রতিদিন করে, দিয়া রুদ্রের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললো

দিয়া: রুদ্র বাসা থেকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে

মুহূর্তের মধ্যে রুদ্রের সব স্বপ্ন যেন ভেঙে যেতে লাগলো, দিয়ার সামনে চুপ করে বসে রইলো

দিয়া: কিছু বলছ না কেন
রুদ্র: কি বলবো

দিয়া: আমি এখন কি করবো এখন পর্যন্ত অনেক গুলো বিয়ে ভেঙ্গেছি আব্বু বলে দিয়েছেন এখন বিয়ে ভা…..

রুদ্র: বিয়ে করে নাও
দিয়া: কি বলছ পাগল হয়ে গেছ নাকি

রুদ্র: দেখ দিয়া তুমি আমার পরিবার সম্পর্কে সব জানো আমার বাবা নেই বড় আপুর ছোট একটা চাকরির টাকা দিয়ে সংসার চলে তাছাড়া আমি অনেক চেষ্টা করেও একটা চাকরি জোগার করতে পারতেছি না এই অবস্থায় বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না আর তোমার বাবা আমার মতো মধ্যবিত্ত বেকার ছেলের কাছে তোমাকে বিয়ে দিবেন না

দিয়া: আমি এসব বুঝিনা আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না
রুদ্র: পাগলামি করো না তুমি আমাকে না বুঝলে কে বুঝবে বল

দিয়া: তাই বলে

রুদ্র: তোমার বাবার পছন্দে বিয়ে করে নাও সুখি হবে

দিয়া আর কিছু না বলে রুদ্রর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারপর চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেলো
দিয়া চলে যাওয়ার পর রুদ্র দফ করে মাটিতে বসে পরলো আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললো মধ্যবিত্ত আর বেকার বলে নিজের ভালোবাসাকে কোরবানি দিতে হলো…

দিয়া: সামনের বাসাটির কাছে রেখে দিয়েন (হঠাৎ দিয়ার কন্ঠে রুদ্র ভাবনা জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসলো)
রুদ্র একবার পিছন ফিরে দিয়ার দিকে তাকালো আর মনে মনে বললো সেদিন বলেছিলে আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না আর আজ আমি নেশা করি চুল গুলো লম্বা উসকোখুসকো বলে আমাকে চিনতেই পারলে না, সত্যি অসাধারণ তোমার ভালোবাসা

দিয়া: এখানেই রেখে দিন
রুদ্র: হুম
দিয়া: এই বৃষ্টিতে আমাদের সাহায্য করেছেন আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না
ছেলেটি: আপনার নামটা জানা হয়নি

রুদ্র: জ্বী আমি রুদ্র (নাম বলে রুদ্র দিয়ার দিকে আড়চোখে তাকালো নাহ মেয়েটি নাম শুনেও রুদ্রকে চিনতে পারেনি)

ছেলেটি: বাসায় চলুন এক কাপ চা খেয়ে যাবেন আমার স্ত্রী দিয়া খুব ভালো চা বানায়
রুদ্র: মা টেনশন করবেন আর একদিন এসে আপনার স্ত্রীর হাতের চা খেয়ে যাবো
ছেলেটি: ঠিক আছে

দিয়া আর দিয়ার হাজবেন্ড এর থেকে বিদায় নিয়ে রুদ্র গাড়িতে উঠে বসলো, শেষ বারের মতো গাড়ির ঝাপসা গ্লাস দিয়ে দিয়ার দিকে আরেকবার তাকালো দিয়া ওর হাজবেন্ড এর হাত ধরে হাসতে হাসতে বাসার ভিতরে চলে যাচ্ছে, রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো আর মনে মনে বললো আজ আমার গাড়ি আছে বাড়ি আছে দিয়াকে বউ বানানোর সব যোগ্যতা আছে কিন্তু দিয়াই আজ অন্য কারো, যে দিয়া রুদ্র ছাড়া বাঁচার কথা ভাবতো না সে দিয়া আজ রুদ্রকে চিনতেই পারেনি এটাই হয়তো বিধাতার খেলা….

বাসার ভিতর এসেই দিয়ার হাজবেন্ড বললো
–তুমি রুমে যাও আমি মায়ের সাথে দেখা করে আসছি
–ওকে

দিয়া এক দৌড়ে রুমে এসে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, কেউ দেখে ফেলার ভয়ে লেপ্টে যাওয়া কাজল তাড়াতাড়ি মুছতে শুরু করলো আর মনে মনে বললো

রুদ্র কি ভেবেছ আমি তোমাকে চিনতে পারিনি তোমার উসকোখুসকো চুল আর রোগা হয়ে গিয়েছ বলে, আরে বোকা যে আমি তোমার এই উসকোখুসকো চুলে রোজ বিলি কেটে দিতাম সেই আমি তোমাকে চিনতে পারবো না ভাবলে কিভাবে, জানো রুদ্র বাস্তবতা আমাকে অনেক বড় অভিনেত্রী বানিয়ে দিয়েছে তাই তো তুমি শুধু অভিনয়টা দেখলে অভিনয়ের আড়ালে চাপা কষ্টটা দেখলে না, তুমি শুধু আমার ঠোটের কোনের হাসিটাই দেখলে চোখের কোনের জলটা দেখলে না..

******************************************সমাপ্ত******************************************

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত