বিশ্বাস

বিশ্বাস

-আপা বিশ্বাস কর আমি দুলাভাইকে ই দেখসি সায়মা আপার সাথে।

-তোর চোখের ডাক্তার দেখা। ইফতি কাল মিটিংয়ে ছিলো। আজেবাজে কথা বলিস না তো।

-আপা আমি কি তোমাকে মিথ্যা বলব?
আমার এতে স্বার্থ কিসে?

-এত কিছু বুঝি না। আমাকে ফার্দার এধরনের কথা বলবি না। ইফতি কি আমি জানি আমাকে এসব শিখাতে আসবি না।

ফোন টা ধুপ করে কেটে দিলাম। মেজাজ টাই খারাপ হয়ে গিয়েছে।
ইফতির ব্যাপারে আমি একটা আজে বাজে কথা শুনতে পারি না। সহ্য হয় না। আমার ছোট ভাই কাকে না কাকে দেখে এমন বিশ্রী একটা দোষ দিলো ইফতির্। ও যদি জানতে পারে কত কষ্ট পাবে। আর সায়মা। ইসসস আমার ছোট বেলার বান্ধবী। ওকে ইফতি বোনের চোখে দেখে। ও ই যদি শুনতে পারে যে ওকে আর ইফতিকে নিয়ে আমার আপন ছোট ভাই বলেছে তাদেরকে নাকি ও গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় চুমু খাচ্ছে। ছি ছি!
আমার মুখটা কই থাকবে। এমন কথা কেমন করে বলি?
না এই কথা বলা যাবে না ইফতি কে।
ও ভাববে আমি অবিশ্বাস করে এই প্রশ্ন করেছি। আমি সায়মা আর ইফতি একই সাথে ভার্সিটি তে পড়তাম। ইফতি আর আমার প্রেম ছিলো সেই শুরু থেকে। তারপর ওর চাকরি আর আমাদের বিয়ে। সায়মা বেচারির তো নিজেরই কপাল টা খারাপ। বিয়ে হয়েছিলো। জামাই মারধর করত। একসময় ডিভোর্স হয়ে গেলো। আমি আর ইফতিই তো ওকে সাপোর্ট করেছি। আর সেই সম্পর্ক নিয়ে এত বাজে চিন্তা ভাবনা।
ছি ছি!

কলিংবেল এর আওয়াজ ……

ইফতি বাসায় এসেছে .. আমি আর একমুহুর্ত এসব নিয়ে ভাবব না। না বাস না।

দরজা খুলতেই ইফতি আমার দিক তাকিয়ে কাছে এসে জড়িয়ে ধরল।

-বাবু সন্ধ্যা এত দেরিতে হয় কেন? আমি তোমার চেহারা দেখার জন্য ঘড়ির দিক তাকিয়ে থাকি। চাকরিটাই ছেড়ে দিবো।

-আরে পাগল বলে কি?
চাকরি ছাড়তে হবে কেন?
আমি কি কোথাও পালায়া যাচ্ছি?

-তারপর ও বৌ ছেড়ে অফিস করা অনেক পেইন গো। তুমি বুঝবে না… যাইহোক আজ আমরা বাইরে খাবো।

-কেন? আমি এত কষ্ট করে রান্না করেছি।

-ঐটাও খাবো …পরে খাবো। তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হউ তো।

-কিন্তু ……

-কোন কিন্তু নাই। আজ আমরা বাইরে খাবো।

-আচ্ছা তুমিও জামা বদলে নেও। আমি রেডি হচ্ছি।

আমি বাথরুমেই ঢুকসিলাম এমন সময় ইফতি হাত টান দিয়ে বলল

-ম্যাডাম আমার সামনেই চেঞ্জ করুন। আমি তো আপনার একমাত্র স্বামী।

-যাহ পাগল! কি সব কথা। রেডি হতে দেও। দুষ্টামি পরে হবে।

-পরে হবে তো?

-হ্যাঁ হবে .. এখন ছাড়ো।

আমি হাসতে হাসতে শেষ .. জামা পাল্টাচ্ছি আর ভাবছি। ইফতি যে আমাকে কত ভালোবাসে তা তা শুধু আমিই জানি। একদিনও আমার সাথে কোন ঝগড়া করে নি বিয়ের পর। আমার সব রাগ ভালোবাসাকে এত সহজে মানিয়ে নিয়েছে। আর সেই ইফতিকে নিয়ে আমার ভাই কিভাবে এমন একটা কথা টা বলল?
আমি রেডি হয়ে বের হওয়ার পর ইফতির প্রথম কথা

-মা শা আল্লাহ আমার পরীটাকে এত সুন্দর লাগছে মনে হচ্ছে আজকে তোমাকে এক জায়গায় বসিয়ে মন ভরে দেখি।

-আর কোনদিন সুন্দর লাগে না বুঝি?

-সবসময় লাগে। আমার বৌ সবচেয়ে সুন্দর।

-এখন তুমি রেডি হচ্ছো না কেন? শার্ট বদলাবে না?

-না শার্ট বদলাতে লাগবে না। আচ্ছা শুনো তনু।

-হুম বলো।

-তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে।

-ইসস আল্লাহ এত ঢং কই থেকে পাও তুমি?

-হায়রে সত্যের দাম নাই।

-না নাই। চলো বের হও। আমরা কই যাবো?

-তুমি যেখানে বলবে। তোমাকে আজ বেহেশতে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে।

-যা বলো না? চলো

আমরা বের হয়ে গেলাম। পুরা বাসায় আমরা দুইটা প্রাণীই থাকি। একটা ছুটা বুয়া আছে। কাজ শেষে চলে যায়। আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষ থাকে গ্রামের বাড়িতে। শ্বশুর নাই। শ্বাশুড়ী সেই ভিটা ছেড়ে এক বিন্দু নড়তে নারাজ। তাই আমরা টোনাটুনি নিজেরাই সংসার বেঁধে নিয়েছি। আমার খুব পছন্দের একটা রেস্টুরেন্টে ইফতি আমাকে নিয়ে গেলো। যখন প্রেম করতাম এখানেই ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিতাম দুজন মিলে। আজ এখানে বিয়ের পর প্রথম আসলাম।
রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই সবাই বলে উঠলো
” হ্যাপি এনিভার্সেরি মিসেস ইফতি”

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সম্পূর্ণ রেস্টুরেন্টে শুধু আমি আর ইফতিই কাস্টমার .. বেলুন মোম আর ফুল দিয়ে সাজানো। অর্থাৎ ইফতি আগে থেকেই এসব প্লান করে রেখেছিলো।

একটা টেবিলে কেক রাখা। এসব কিছু দেখে আমি ইফতিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম

-তোমার সব মনে ছিলো? আমি ভাবসিলাম কাজের চাপে ভুলে গিয়েছো।

-কিভাবে ভুলি এদিনের কথা যেদিন তোমাকে আমি আমার করে কাগজে কলমে আর কলমা পড়ে পেয়েছি?

-এ যাহ একটা ভুল হয়ে গিয়েছে।

-কি? আমার জন্য গিফট নেও নি সেটা?

-এটা তো আছেই আরো একটা ভুল করেছি।

-কি?

-আমাদের বিয়ের দিনই তো সায়মার জন্মদিন .. আমি ভুলেই গেসিলাম। দাড়াও ওকে একটু উইশ করে নেই।

-আহা পরে করো। আসো কেক কাটো।

-দুইটা মিনিট জান। একটু অপেক্ষা করো।

ইফতি গিয়ে বসলো। আমি সায়মাকে ফোন দিলাম উইশ করতে

-দোস্ত হ্যাপি বার্থডে

-থ্যাংকস ..কেমন আছিস?

-এই তো দোস্ত ভালই। সরি একটু লেট হয়ে গেলো রে।

-আরে না ঠিক আছে। তুই কি বাইরে?

-হ্যাঁ রে ইফতি নিয়ে এসেছে বাইরে। আজ আমাদের বিবাহ
বার্ষিকী ভুলে গেসিস?

-ও হ্যাঁ তাই তো।

-আরে তোকে কি বলবো। আমিই তো ভুলে গিয়েছিলাম। হাহাহাহা … ইফতি সন্ধ্যার পর থেকে একের পর এক সারপ্রাইজ দিয়ে আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলল।

-ওহ ভালো তো। সুন্দর সময় কাটা। রাখি আমি।

-আচ্ছা বাসায় আসিস … কেমন? আল্লাহ হাফেজ।

ফোন কেটে আমি আর ইফতি একসাথে কেক কাটলাম। ইফতি শুরু থেকেই খুব রোমান্টিক … আমিই একটা ভেবলা। এসব কেন যেন আমাকে দিয়ে হয় না। বুঝি না আমি এমন কেন? আমরা একসাথে ডিনার করলাম। এরপর কিছুক্ষণ গাড়িতে ঘুরলাম। অনেক গুলা ছবি তুললাম। হাতির ঝিলের ব্রিজে দাড়িয়ে ইফতি আমাকে জিজ্ঞেস করলো

-আচ্ছা তনু তুমি কি চাও?

-কোন ব্যাপারে?

-গিফট কি চাও পাগলি?

-ওহ ওহ সরি। আমি চাইলে তুমি দিবে?

-হ্যাঁ দিবো তো। বলো।

-ইফতি আমাদের বিয়ের দুইবছর হলো। আমরা কি বাচ্চার ব্যাপারে প্লান করতে পারি?

ইফতি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল

-হ্যাঁ অবশ্যই পারি। তনু আমি নিজেও চাচ্ছিলাম আমরা এখন একটা বাবু নেই। তুমি আমার মনের কথাটা বলেছো ।

এই বলে ও আমার কপালে চুমু খেলো।
আমি অনেক সৌভাগ্যবতী তাই ইফতিকে আমার স্বামী হিসেবে পেয়েছি। ও অনেক ভালো মানুষ … আমি ওকে যতটা না ভালোবাসি তার চেয়ে বেশি ও আমাকে বাসে।
আর কিছুক্ষণ সেখানে দাড়িয়ে আমরা বাসায় চলে গেলাম। বাসায় ফিরে আমি আবার অবাক। কাজের বুয়ার কাছে বাসার এক্সট্রা চাবি সবসময় থাকে। উনাকে বলে ইফতি লোক দিয়ে আমাদের রুম টা সাজিয়েছে। একেবারে বাসর রাতের মত। এত সুখ কই রাখি আমি? কই রাখি?

আমি কেঁদে ফেললাম। বুয়া যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে বলল

-মা বেঁচে থাকো। এমন স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার্। এই স্বামীকে কখনো কষ্ট দিও না।

বুয়া না বললেও আমি জানি আমাকে ইফতি কতটা ভালোবাসে। এ আমাকে কারো বলতে হবে না। বুয়া চলে যাওয়ার পর ইফতি আমার পিছনে দাড়িয়ে আছে বিয়ের শাড়িটা নিয়ে।

-তনু আজ তোমাকে বউ সাজে দেখতে চাই। যাও না একটু সেজে আসো।

আজ ইফতি জান চাইলে জানটাও দিয়ে দিতাম। আর এত সামান্য শখ ওর।
বিয়ের শাড়ি পরতে আমি অন্য রুমে গেলাম। রুম থেকে বের হতেই ইফতি আমাকে কোলে তুলে আমাদের শোবার ঘরে নিয়ে গেলো।

-এই তুমি এমন কেন?

-কেমন তনু?

-এইযে আমাকে এত ভালোবাসো কেন?

-তা তো জানিনা। ভালো না বেসে উপায় আছে?

– এখন নামাও আমাকে। ব্যাথা পাবা।

-তোমাকে উঁচু করার মত শক্তি বুঝি আমার নাই?

-এখন থেকে প্রাকটিস করছো মরার পর আমার লাশ উঁচু করার?

-ধুর এমন কথা একদম বলবে না তনু। ভালো লাগে না। নামো তুমি নিচে।

ইফতি রেগে গেলো। সেই রাগ ভাঙ্গাতে আমার কত কিই না করতে হলো। কখনো কান ধরে উঠবস আবার কখনো গান গেয়ে নেচে তাকে স্বাভাবিক করা হলো। অবশেষে সকল রোমান্সের পর ঘুমিয়ে পড়লাম দুইজন।#বিশ্বাস

রাতটা যত রোমান্টিক কাটলো। সকাল টা আরো সুন্দর্। দুইবছরের বিবাহ বার্ষিকী তে আবার বাসর রাতের আমেজ। চোখ খুলে দেখি ইফতি রেডি হয়ে গিয়েছে।

-আল্লাহ সরি গো আমি আজ উঠতে পারলাম না কেন?

-তনু ঘুমাও তুমি। তোমার উঠতে হবে না। আমি ছোট বাচ্চা না। আমি একা রেডি হতে পারি তো। আর আমি নাস্তাও বানিয়েছি। তুমি আরো এক ঘন্টা ঘুমিয়ে তারপর লক্ষী মেয়ের মত নাস্তা করবে। আর তোমার জন্য অনেক কষ্ট করে ইউটিউব দেখে আমি ক্ষীর বানিয়েছি..

-তুমি ক্ষীর বানিয়েছো। বলো কি?

-হ্যাঁ ..সেটাও তুমি খাবে। আজকে বুয়া কে আসতে মানা করেছি। আমি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসবো। এরপর আমরা মুভি দেখতে যাবো।

-ইফতি এত ভালোবেসো না আমাকে জান।

আমি তখনো বিছানায় শুয়ে আছি। ইফতি আমার পাশে এসে বসে বলল

-আমি বাসবো না তো কে বাসবে?
তোমাকে ভালোবাসবো না তো কাকে বাসবো?

-আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ইফতি।

-আমিও অনেক ভালোবাসি। এখন আমি অফিসে যাই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ফিরি। তারপর আবার আদর হবে। তুমিও একটু রেস্ট নেও। আদর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে যাবা।

-যাহ ফাজিল। যাও যাও তাড়াতাড়ি যাও।

ইফতি কে আমি গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলাম। শাড়ি কোন রকমে এক পেচ দিয়ে বিছানা থেকে নেমেছিলাম। এত ভারী আমার শাড়িটা কি আর বলব?
ভাবলাম শাওয়ার নিয়ে আগে নাস্তা করি তারপর কিছুক্ষণ আবার ঘুমাবো।
এমন সময় আবার কলিংবেল এর আওয়াজ। নিশ্চয়ই ইফতি কিছু ফেলে গিয়েছে। দৌড়ে দরজা খুলতেই দেখি সায়মা।

-আরে দোস্ত তুই? এত সকালে?

-এইত মনটা ভালো ছিলো না। তাই ভাবলাম তোর সাথে একটু দেখা করে যাই।

আমার শাড়ি তখন শুধু শরীরে পেচানো। সায়মা যতই ভালো বান্ধবী হোক কেমন লজ্জা যে লাগছিলো আমার্। কি ভাববে ও? আমি লজ্জায় লাল টুকটুক।

-দোস্ত একটু বসবি? আমি একটু শাওয়ার নিয়ে আসি। তারপর এক সাথে নাস্তা করবো।

-তুই এই অবস্থায় নাস্তা বানিয়েছিস?

-আরে না রে ইফতি বানাইছে সব। আজকে তো সে আমার জন্য স্পেশালী ক্ষীর ও রান্না করছে।

-ওহ ভালো। তোদের ভালোবাসা দেখলে আমার খুব হিংসা হয়।

-মন খারাপ করিস না। দেখিস তোর ইফতির চেয়েও লক্ষী বর আছে কপালে।

-হুম বুঝলাম।

-তুই তো মন খারাপ করে আছিস। দাড়া তোকে ইফতির বানানো ক্ষীর খাওয়াই।

-তুই খাবি না?

-খাবো আগে তুই খা। আর বল আমার বর এর হাতের ক্ষীর কেমন?

আমি চামচ দিয়ে পেয়ালায় তুলে ক্ষীর আনলাম সায়মার জন্য। নিজের হাতে সায়মার মুখে তুলে দিলাম।

সায়মা ক্ষীর শেষ করে বলছে

-হুম ভালো রান্না করেছে। মজাই হয়েছে।

-হায়রে আমিই এখনো খেলাম না একটু .. আমি একটু ব্রাশ করে আসি। তুই বসে টিভি দেখ।

-একটু পানি দে তো।

আমি পানি আনতে রান্না ঘরে গেলাম। পানি হাতে ফিরে এসে যা দেখলাম তা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
সায়মা মাটিতে লুটিয়ে আছে। ওর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে …
আমি এক চিৎকারে ডেকে উঠলাম

-সায়মা কি হইসে তোর?

সায়মা গোঙ্গাচ্ছে। কিছুই বলতে পারছে না। আমি মোবাইল খুঁজে চলছি আমার… কোথাও পাচ্ছি না। মোবাইল টা গেলো কোথায়? কাল রেস্টুরেন্ট থেকে ফেরার পর আর মোবাইল বের করা হয় নি ব্যাগ থেকে। হারিয়ে ফেললাম না তো?
এখন কি করবো আমি?

সায়মা গোঙ্গাচ্ছে। কিছু হয়ত বলতে চাচ্ছে … ওর ব্যাগে হাত দিলাম মোবাইল বের করে ফোন নেওয়ার জন্য। ফোন বের করতেই স্ক্রীনে ভেসে উঠলো ইফতির নাম্বার। আমি তাড়াহুড়ো তে ফোন রিসিভ করতেই ইফতি বলে উঠলো

-সায়মা তুমি এখন আমার বাসায় যেয়ো না …সব প্ল্যান মোতাবেক হচ্ছে কেন সব নষ্ট করতে উঠে পরে লেগেছো?

আমি এপাশ থেকে কোন আওয়াজ করতে পারছিলাম না।
গলা শুকিয়ে আসছিলো।
নিজের কান কে বিশ্বাস দিতে পারছিলাম না। ইফতি ফোনটা কেটে দিলো।

আমার ঠিক সামনে সায়মা মাটিতে পড়ে গোঙ্গাচ্ছে। আমি ওর দিকে একবার তাকালাম এরপর ওর পাশ থেকে উঠে সোফায় গিয়ে বসলাম। সায়মার ফোনে সেই শুরু থেকে একটাই পাসওয়ার্ড সেটা আমার জানা ছিলো সেটা ছিলো ওর জন্মসাল। তাই ফোনের লক খুলতে খুব কষ্ট হয় নি। ফোন এর কল হিস্টোরি থেকে শুরু করে সব কিছুতে ইফতির ম্যাসেজ ,কিছু পার্সোনাল ছবি আরো কত কি!!

আমি গতরাতের ম্যাসেজ পড়ছিলাম ইফতির আর সায়মার।

-বৌ নিয়ে খুব মজা করার প্লান হচ্ছে? আমার আজ জন্মদিন ইফতি তুমি আমাকে রেখে ওর কাছে? তুমি না আমাকে ভালোবাসো কিভাবে কষ্ট দিচ্ছো আমাকে?

-সায়মা সব সময় জীদ ভালো লাগেনা। আমি যা করছি যা করবো সব আমাদের জন্য। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না সুইটহার্ট প্লিজ। আমার প্লান অনুযায়ী আমাকে এগুতে দেও।

আমি বিয়ের শাড়ি দিয়ে চোখ মুছসি আর ম্যাসেজ গুলো পড়ছি। ঐদিকে সায়মার গোঙ্গানী বেড়ে গেলো। কিন্তু আমার তাতে এতটুকুও মনোযোগ নাই।আমার মনোযোগ তখন ম্যাসেজে। আমি যখন অন্য রুমে বৌ সাজতে গিয়েছিলাম তখন ইফতি সায়মার সাথে কথা বলছিলো ম্যাসেজের মাধ্যমে।

-আমি তোমাকে আর এক বিন্দু বিশ্বাস করি না ইফতি । তুমি তনু কে নিয়ে বাইরে গিয়েছো। তাকে সারপ্রাইজ পার্টি দিচ্ছো? বাহ দারুন তোমার ভালোবাসা …

-সায়মা প্লিজ। তুমি শান্ত হউ। কালকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে প্রমিজ।

-স্ত্রীর সাথে বাসর করে আমার সাথে কি ঠিক করতে চাইছো তুমি?আমি সইতে পারসি না তুমি আজ তনুর সাথে কাটাবে।

-আমি বললাম তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

সারারাত সায়মা হয়ত তার অবৈধ প্রেমিকের সাথে তার বৈধ স্ত্রীর মিলনে ঘুমাতে পারে নি। তাই খুব ভোরে চলে আসলো আমাকে দেখতে।
সায়মার শেষ ম্যাসেজ আমার বাসায় বসে ইফতিকে পাঠিয়েছিলো

-তনুর গায়েও কি আজ আদরের দাগ বসেছে যেমনটা আমার গায়ে বসাও? আমি এসেছি তোমার বাসায় সব দেখতে।

আমার শরীর কাঁপছিলো। আমার সব কিছু ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছিলো।
সায়মার নাক বেয়ে রক্ত পড়ছে ।
হয়ত একটু পানি পান করলে আরাম পেতো। কিন্তু আমআর এতটুকুও মায়া লাগছে না।

আমি খুব আরাম করে আমার শরীরে আধ খোলা বিয়ের শাড়িটা জড়িয়ে সোফায় বসে সে দৃশ্য দেখসি।
সে জায়গাটায় আমার লুটিয়ে থাকার কথা ছিলো। আমার বৈধ স্বামী তার অবৈধ প্রেম ও প্রেমিকার জন্য আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো।

আমার মোবাইল টা ইচ্ছা করেই লুকানো হয়েছিলো যাতে আমি ফোন করে কারো কাছে সাহায্য না চাইতে পারি।
চোখের সামনে ভেসে উঠছে শুরু থেকে শেষ মুহুর্তের সব কিছু।
গতরাতের কথাগুলো।
বাচ্চা নেওয়ার প্লান টাও তাহলে অভিনয়?
আমি কান্না করতে চাইসি চিৎকার করে কিন্তু শক্তি পাচ্ছি না।

সায়মা একটু একটু করে দম ছাড়ছে আমি মনোযোগ দিয়ে দেখসি।
আমার চোখ লাল। সম্পূর্ণ আওয়াজ বিহীন চোখ দিয়ে পানি পড়ছে …

ঠিক তখন ইফতি সায়মার নাম্বারে কল দিলো।
কল টা রিসিভ করলাম আমি।

-সায়মা তুমি কিন্তু আমার বাসায় যেয়ো না। প্লিজ প্লিজ।

-হুশশশসশশশশ

ইফতি সায়মা ঘুমাতে যাচ্ছে। আস্তে কথা বলো। ওর নাক দিয়ে বেরিয়ে পরা রক্ত গুলো তোমার প্রতি আমার অন্ধবিশ্বাসের প্রমাণ দিচ্ছে। তুমি ক্ষীরে চিনির বদলে ভুলে বিষ মিলিয়ে ফেলেছিলে। যেভাবে মিলিয়েছো আমার বিশ্বাসে বিষ।

-তনু কি বলছো এসব? সায়মা কই?

আমি ফোনটা কেটে দিয়ে আবার আগের মত আরাম করে সোফায় বসে সায়মার আধ মরা শরীরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর বললাম

-আস্তে আস্তে মরে যা আমার সামনে। যেভাবে আস্তে আস্তে আমার সংসারে ঢুকে সব আস্তে আস্তে নষ্ট করেছিস ঠিক সেইভাবে… আস্তে আস্তে মরে যা।

সায়মা একটা বড় দম ছেড়ে বিদায় নিল।
ওর বিদায়ের পর ওর চেহারায় ভেসে উঠছিলো ইফতির দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা গুলো।
বিশ্বাস টা একটু বেশিই করেছিলাম।
আমার চোখ বেয়ে শুধু পানি পড়ছে কিন্তু চিৎকার করতে গিয়েও পারছি না।
সায়মার মৃত্যুর সাথে আমার বিশ্বাসের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটলো।

ইফতি সায়মার মোবাইলে ফোন দিয়েই যাচ্ছে।

আমি চোখ মুছে আবার সায়মার দিকে তাকিয়ে আছি পড়নে আমার বিয়ের শাড়িটা যা আধা খোলা আমার শরীরে। আমি সোফায় আর মাটিতে নিথর হয়ে পরে আছে আমার বিশ্বাস ঘাতক স্বামীর অবৈধ প্রেমিকার লাশ।

ভালোবাসা বেঁচে থাকুক শুধু এবইং শুধুই বিশ্বাসে।

(বি:দ্র – সব পুরুষ মানুষ খারাপ এধরনের কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন। এই গল্পে বিশ্বাসঘাতকতা শুধু একটা পুরুষ না মেয়ে মানুষ ও জড়িত ছিলো। সবাই যেমন খারাপ না তেমনি সবাই ফেরেশতাও না। গল্পকে গল্পের ন্যায় দেখুন। বাস্তব জীবনে অবৈধ সম্পর্ক থেকে কয়েক লক্ষ হাত দূরে থাকুন। এবং লেখা কপি করা থেকে বিরত হন। ধন্যবাদ)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত