কলিজার টুকরা

কলিজার টুকরা

–ভাইয়া ৫০ টাকা দেতো
— এই তুই কালকে না ১০০ টাকা নিলি, এতো তারাতারি শেষ হলো??
— ওটা দিয়ে আমি চকলেট খেয়েছি, এখন টাকা দে।
— আমার কাছে আর টাকা নেই তুই যা।
— তার মানে তুই টাকা দিবি না তাই তো??
— হ্যা দেবো না যা এখান থেকে।

— ঠিক আছে, আমি আম্মুকে গিয়ে বলছি যে আমি কালকে সন্ধায় ছাদে কাকে যেন সিগারেট খেতে দেখেছি, মুখটা একটু চেনা চেনা লাগছিলো।

— আরে আপু আমিতো মজা করছিলাম তোর সাথে। আয় আমার কাছে আয়, তোর টাকা লাগবেতো, এই নে।
— না থাক লাগবে না।
— আরে না, আমার আপুটা স্কুলে যাবে কিছু না খেয়ে থাকবে কি রকম লাগে না, এই নে টাকা।
— এখন ১০০ টাকা লাগবে।
— এই তুই একটু আগে না বললি ৫০ টাকা??
— হুম, এখন ওটা সুদ সহ ১০০ টাকা হয়েছে।আরও দেরি করলে আরো বাড়বে।
— থাক লাগবে না এই নে টাকা।
— ধন্যবাদ ভাইয়া,উম্মা।
— হয়েছে, মাঝে মাঝে তোর চুমুটাও মনে হয় ব্লাকমেইলের একটা অংশ।
— না, না এটা একদম ফ্রি।
— হয়েছে, যা এখন।

ও আপনাদেরতো পরিচয় দিলাম না। আমি মনির, আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। আর যে আমাকে ব্লাকমেইল করে টাকা নিয়ে গেল সে আমার ছোট বোন মুনিয়া। দেখতে মিষ্টি হলেও সবসময় আমার পেছনে লেগে থাকবে। রোজ সকালে আমার রুমে আসবে আর যেকোনো ভাবে আমাকে ব্লাকমেইল করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে যাবে। আরে ভাই আমি আম্মুর কাছ থেকে কত মিথ্যা বলে যে টাকা নেই সেখানে ও ভাগ বসিয়ে রোজ টাকা নিয়ে যাবে। তবে বোনটা আমার খুব ভালো খুব ভালোবাসে আমাকে।

— এই ভাইয়া কই তুই, আয়।।

ও আপনাদের সাথে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল, বোনকে স্কুলে দিয়ে আবার আমাকে কলেজ যেতে হবে।

— হ্যা, দারা আসতেছি।

পরে বোনকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আমি চলে আসলাম কলেজে। এসে ক্লাশ করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে আবার বোনের স্কুলে গিয়ে ওকে বাড়িতে আসলাম। এসে ফ্রেস হয়ে একটু রেস্ট নিচ্ছি। একটু পর মুনিয়া আসলো হাতে একটা লাঠি। কি ব্যাপার কোনো ভুল করলাম না কি।

— কিছু হয়েছে আপু??
–………..(কোনো কথা নেই শুধু রাগি লুক নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে)

— কি হয়েছে আপু তোর।(একটু ভয় ভয় লাগছে কারন একবার যদি ও কান্না শুরু করছে তাহলে আম্মু আমার বারোটা বাজিয়ে দেবে)

— আমার আইস্ক্রিম কোথায়?
এই রে কলেজ থেকে এসেতো আমি ওর আইস্ক্রিম খেয়ে ফেলেছি।

— আআমি কেন তোর আইসক্রিম, তুই কোথায় রেখেছিস তোর আইসক্রিম সেখানে গিয়ে দেখ।

— আমি দেখেছি নেইতুই আমার আইসক্রিম খেয়ে ফেলেছিস।আমার আইসক্রিম দে।
এই রে কেদে দিয়েছে ।

— আপু কাঁদিস না রে, চল তোকে তোর আইসক্রিম আমি নিয়ে দিচ্ছি তারপরেও তুই কাঁদিস না।
— হুম চল।

তারপর ওকে নিয়ে গেলাম দোকানে।ভাইরে একটা আইসক্রিমের বদলে চারটা আইসক্রিম নিয়েছে সাথে আরও চকলেট নিয়েছে সুদ হিসেবে। আরো যানি কি কি নিলো। আমার পকেট পুরাই ফাঁকা। তারপর ওকে নিয়ে বাসায় আসলাম। রাতে খেয়ে ঘুমাতে গেলাম।

— এই কোলবালিশ দিলাম, এইপাশে আমার যায়গা ওইপাশে তোর।
— এ বললেই হল তুই পিচ্চি একটা মেয়ে তোর এতো যায়গা লাগে, আমার ওইপাশে এইপাশে তোর।
— আমি যা বলছি তাই,,,,
— ঠিক আছে তাহলে তুই আমায় আজকে জরিয়ে ঘুমাতে পারবি না।
— আমার বয়েই গেছে তোকে জরিয়ে ধরে ঘুমাতে।
— ঠিক আছে দেখে নেবো।

তারপর ও মুখ ভেংচিয়ে অন্য পাশে ঘুরে শুয়ে পড়লো।ও আপনাদেরতো বলিনি আসলে আমার বোন আমার সাথেই থাকে। শুধু কলেজ টাইম ছাড়া আমার পিছু ছাড়বে না। আর রাতে ও আমাকে জরিয়ে ধরে ঘুমায় তাই অমন করে বললাম। ও বিছানায় শুধু এপাশ ওপাশ ঘোরা ঘুরি করছে।আমি বুঝতে পারছি কেন ও এমন করছে, আপনারা কি বুঝতে পারছেন??

— হয়েছে আর ভাব দেখাতে হবে না, আয় আমার কাছে।
বলতে দেরি কিন্তু আসতে দেরি নেই। এসে আমাকে জরিয়ে ধরল।
— i love you ভাইয়া। আমার লক্ষি ভাইয়া,উম্মা।
— হয়েছে হয়েছে,, এখন ভালোবাসিস সকালে উঠে আবার শুরু করবি।
— না আর করবো না।
— জানি, তুই রোজ এক কথা বলিস কিন্তু সকালে উঠে সব ভুলে যাস। এখন ঘুম যা।

তারপর ও আমাকে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো। আসলে আমার বোনটা হলো আমাদের বাসার জীবন। ওর কিছুর প্রয়োজন হলে মুখে বলতে দেরি কিন্তু সেটা আনতে দেরি নেই। আসলে বাসার সবাই ওকে খুব আদর করে।যাই হোক অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমাই।

— ভাইয়া এই ভাইয়া।
–হুম,
— ভাইয়া ওঠ না।
— একটু পর উঠি বোন।
— ওই যে আম্মু আসতেছে।
— এইতো আমি উঠে পরেছি।
— খুব ভালো, এখন ৫০০ টাকা দে।
–এই তুই ৫০ টাকা থেকে একবারে ৫০০ তে গেলি।
— হুম। লাগবে দে টাকা দে।
— টাকা নেই যা।
— ঠিক আছে, তবে সকালে উঠে নীলা আপুর সাথে কথা বললাম,আহা কি মিষ্টি কথাগুলো। আম্মুকে বলতেই হয়।
— বোন শোন, একটু কম করা যায় না।
— আরো দেরি করলে সুধ বাড়বে কিন্তু
— না থাক লাগবে না।এই নে, কাল আম্মুর কাছ থেকে বলে ৭০০ টাকা নিয়েছি তাও তুই নিয়ে নিলি।
— হুম, গুড বয়।
এই আপু কই তুই চল।
— ভাইয়া আমি আজকে স্কুলে যাবো না।
— কেনো?
— আমার জর আসছে ।– আর কতো মিথ্যা বলবি।

জানি ও যখন একবার না বলেছে তখন ওকে আর স্কুলে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ছোট মানুষ তাই বাড়ি থেকেও কিছু বলে না। আমি চলে গেলাম কলেজে। ক্লাশ করে এসে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে আছি । একটু পর মুনিয়া আসলো।

— ভাইয়া দেখি তোর হাতটা।
— কেনো??
— দিতে বলেছি দেনা।
— এই নে।
— (একটা ঘড়ি হাতে পড়িয়ে দিলো)। হ্যাপি বার্থ ডে ভাইয়া।
ও আজতো আমার জন্মদিন। আমি ভুলেই গেছি।
— ধন্যবাদ আপু, এটা কোথা থেকে আনলি।
— আব্বুর সাথে মার্কেট থেকে এনেছি। এটা হাতে যখনই দেখবি তোর আমার কথা মনে পড়বে।
আমি ওকে জরিয়ে ধরে একটা চুমু খেলাম।
— ভাইয়া আয় আমার সাথে।
–কোথায়??
— আসতে বলেছি আয়।

মুনিয়া আমাকে টানতে টানতে ছাদে নিয়ে গেলো।আমি গিয়ে দেখি সবাই কেক নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি কেক কেটে সবাই মিলে আনন্দ করে বাসায় আসলাম। সবাই খেয়ে রুমে গেলাম। মুনিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো।

— ভাইয়া,,,
— হুম, বল,
— আমি তোকে অনেক জালাই
— না রে বুড়ি। এটাতো তোর ভালোবাসা। আমার পাগলি বোন কি আমাকে জালাতে পারে।
— আমি তোকে এত্তগুলা ভালোবাসি ভাইয়া।
— আমিও তোকে এত্তগুলা ভালোবাসি আপু। এখন ঘুম যা।
— ঠিক আছে, উম্মা

— হয়েছে, এটা টাকা নেওয়ার ধান্দা তাই না।
মুনিয়া হাসতেছে।

— এখন ঘুম যা।

তারপর ঘুমিয়ে গেল। এভাবেই চলতেছে আমাদের ভাই বোনের ভালোবাসা আর ব্লাকমেইল। একদিন বাবা বলল দাদুর বাসায় যেতে কিসের একটা কাগজ আনতে। আমিও যেতে রাজি হলাম। আমি রুমে রেডি হচ্ছি এমন সময় মুনিয়া আসলো।

— ভাইয়া কোথাও যাচ্ছিস???
— হ্যা রে দাদুর বাসায় যাচ্ছি। আব্বু যেতে বলল।
— ঠিক আছে যা, আসার সময় আমার জন্য চকলেট আর দাদুর গাছের আম নিয়ে আসবি।
— ঠিক আছে, আমার বোন যখন বলেছে তাহলেতো আনতেই হবে।

তারপর আমি চলে গেলাম। যেতে রাত হয়ে গেল। তাই দাদুর বাসায় থাকলাম। সকালে উঠে আম পারলাম। মুনিয়া নিয়ে যেতে বলেছে না নিয়ে গেলে আবার মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে।আম পেরে সব কিছু গোছগাছ করছি, হঠাৎ আকাশের ফোন(আমার ফ্রেন্ড)

— হ্যা আকাশ বল।
— কোথায় তুই ???
— আমিতো দাদুর বাসায়, কেনো??
— তারাতারি বাড়িতে আয়, মুনিয়া কান্না করতেছে,
— ওকে দারা আমি ওকে ফোন করতেছি।
— না, ও ফোনে কথা বলবে না, তুই এক্ষুনি চলে আয়।
— আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসতেছি।

তারপর আমি কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। রাস্তায় মুনিয়ার জন্য চকলেট নিলাম। তারপর বাড়ির দিকে রহনা দিলাম। কি ব্যাপার বাড়িতে এতো মানুষ কেনো। ওইতো আকাশ,,,

— কি রে আকাশ বাড়িতে এতো মানুষ কেনো রে??
— ভেতরে চল।
— আরে তুই কান্না করেছিস না কি, তোর চোখ ফোলা কেনো।
— ও কিছু না তুই চল।

দরজায় দেখলাম বাবা কান্না করতেছে, আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে আরো জোরে কান্না করতেছে।

— কি হয়েছে বাবা তুমি এই রকম কান্না করতেছো কেনো??
— বাবা রে তোর বোন আমাদের সবাইকে ফাকি দিয়ে চলে গেছে রে।

— চলে গেছে মানে,, ও এখনো ছোটো ও আবার কোথায় চলে যাবে।
আমি ভেতরে গেলাম, দেখলাম কিছু মহিলা একখানে কি যেন ঘিরে ধরে বসে আছে। আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আকাশ আমাকে ধরে আছে, আমি যতই সামনে যাচ্ছি ততোই আমার হার্ট বিট বেড়ে যাচ্ছে। আমি গিয়ে দেখলাম মাঠিতে কাকে যেন শুয়ে রেখেছে উপরে একটা চাদর দেওয়া। আমার কলিজাটা কেন যেন কেপে উঠলো। আকাশ চাদরটা সারাতে বলল। কে যেন চাদরটা সরিয়ে দিল। আমার হার্টবিট বেড়েই চলেছে। চাদর যেই সড়িয়েছে আমার পায়ের নিচের মাঠি সরে যাচ্ছে। এ যে আমার কলিজার টুকরা সুয়ে আছে। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। আমি কাছে গেলাম।

— বোন এই বোন তুই কি ঘুমিয়ে আছিস। এই দেখ তোর ভাইয়া এসেছে। ওঠ না বোন, দেখ আমি তোর জন্য আম নিয়ে এসেছি, চকলেট নিয়ে এসেছি নিবি না ওঠ। এই বোনতুই কি তোর ভাইয়াকে একলা রেখে যেতে পারিস, এই বোন আমাকে শাসন করবে কে। প্রতিদিন সকালে আমার কাছে এসে টাকা চাইবে কে। আমি যে তোকে ছাড়া থাকতে পারবো নারে বোন। হে আল্লাহ তুমি আমার কলিজায় হানা দিয়ে আমার কলিজার টকরাকে এইভাবে কেড়ে নিলে। আমি কেমন করে থাকবো আল্লাহ। বোন তুই আমাকে ছেড়ে কিভাবে গেলিরে, তোর ভাইয়াকেও সাথে নিয়ে যা। আমার বোনের ছোট্ট সরিলটাতে সারা গায়ে রক্ত লেগে আছে। কিভাবে হল আমার কলইজার টকরার এমন।

— স্কুলে তোর আব্বু দিয়ে এসেছে, আসার সময় একাই আসছিলো। রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেনি।ওখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

— ইস আমার এই ছোট্ট আপুটা কি কষ্ট পেয়েছে। এই আপু তোর ভাইয়াকে ছেরে থাকবি তোর কষ্ট হবে না। তুই তো আমার সাথে ছাড়া ঘুমাস না। তাহলে আমায় ছেড়ে একলা কিভাবে থাকবি তুই।তোর কষ্ট হবে না। আমার আপুটাকে সাদা কাপড় পড়িয়ে রেখেছে। ওকে সবাই মিলে নিয়ে যাচ্ছে আমার কলিজাটা যেন ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছে সবাই । আমার বোনকে একাই একটা অন্ধকার কবরে শুয়ে রাখছে। আমার বোন থাকতে পারবে না ও ভয় পাবে তোমরা ওকে ওখানে রেখো না।

— মনির শান্ত হ,,,, তোর বোন আর আসবে না তোর কাছে, ও সবাইকেফাকি দিয়ে গেছে না ফেরার দেশে।
আমার বোনটাকে সবাই একটা অন্ধকার কবরে রাখলো। আমার বোনটা মনে হয় খুব ভয় পাচ্ছে। বোন তুই কোথায় গেলি তোর এই ভাইয়াটাকে রেখে। তোর ভাইয়ার কাছে ফিরে আয় বোন তোর ভাইয়াটা যে থাকতে পারছে না তোকে ছাড়া ,,,, হে আল্লাহ আমার কলিজার টকরাকে তুমি ফিরিয়ে দাও আমার কাছে আল্লাহ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত