আমার অভিমান

আমার অভিমান

আদনান ভাই এর সাথে যখন শিমু আপাকে কিডন্যাপ করে এই পুরান বাড়িতে নিয়ে আসি তখন আমার মনের দরজায় একটা ভয়ংকর ভয় এসে হাজির হয়। শিমু আপার চেহারায় করুন মায়া মাখানো আবদার “ছেড়ে দাও আমায়।” কিন্তু এই শেষ বিকেলের বিচ্ছিন্নতায় শিমু আপার চোখের জল আর মনের অব্যাক্ত কথা গুলা আদনান ভাই বুঝতে সক্ষম হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আমি আদনান ভাইকে বললাম “এখন কি করবেন ভাই?” আদনান

ভাই কিছুক্ষন চুপ করে থেকে গম্ভীর হয়ে বললো “মাইরা ফেলি?” আমি নিশ্চুপ হয়ে আদনান ভাই এর দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার নিশ্চুপ থাকা দেখে আদনান ভাই আবার বললো “ মুখের টেপ টা খুলে দে” আমি শিমু আপার মুখে লাগানো টেপ খুলে মুখের ভিতর রুমালটা বের করতেই শিমু আপা কয়েকটা জোরে জোরে দীর্ঘশ্বাস নিল। আমি চুপ করে থাকি। অপেক্ষা করি শিমু আপা কি বলে। কিন্তু শিমু আপা কিছু না বলে কান্না করতে থাকে। হঠাৎ করেই আমার চোখের মাঝে সব কিছু ঝাপসা হতে লাগলো। বিকেলের নিশ্তব্দতায় পৃথিবীটা যেন রাতের মত ঘুমিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের জীবনে বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মাঝে একটা শূণ্যতা ভর করে। এই শূণ্যতার মাঝে আমরা ফিরে তাকাই, ভাবি ফেলে আসা কত কিছুকে। আমি কখনো ভাবিনি আদনান ভাই এর সাথে এমন একটা কাজ করে ফেলবো। আদনান ভাই শিমু আপার কাছে গিয়ে গালে স্পর্শ করে বললো “মানুষ কিভাবে রং পরিবর্তন করে দেখেছো? আমাকে দেখে বুঝতে পারছো?” শিমু আপা তার ভেজা চোখ নিয়ে আদনান ভাই এর দিকে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। তারপর একটা চিৎকার দিয়ে বললো “আমাকে মেরে ফেলো, মেরে ফেলছো না কেন? তুমি যদি আজ আমাকে না মারো আমি নিজেই নিজেকে মেরে ফেলবো।”

এটা বলেই শিমু আপা আবার কান্না করতে লাগলো। আদনান ভাই একবার আমার দিকে তাকায়। আমার শরীরটায় অলসতা ভর করে। আমি চুপ করে অনুভব করি ভালোবাসার স্পর্শে মানুষ কিভাবে কেপে ওঠে। আমি আদনান ভাইকে বললাম “বৃষ্টির মাতাল গন্ধ যখন মনে প্রবেশ করে তখন বৃষ্টির শীতল জলস্পর্শে আমরা নিজেকে পুলকিত করতে চাই। কিন্তু আমরা তখন অনুভব করি না এই জলস্পর্শে ভিজে চুপসে গেলে গায়ে জ্বর আসতে পারে। এমন কেন আমরা?” তারা দুজনেই আামর দিকে তাকালো। শিমু আপার চোখ দেখে বুঝতে পেরেছি শিমু আপা আামার কথার মর্মটা বুঝতে সক্ষম হয়েছে। শিমু আপা কান্না থামিয়ে আমাকে বললো “আমার হাতের বাধনটা খুলে দিবি একটু?” এমন কথা শুনে আমি আদনান ভাই এর দিকে তাকালাম। আদনান ভাই এর চুপ থাকা দেখে আমি ধীর পায়ে হেটে হেটে শিমু আপার হাতের বাধনটা খুলে দেই। শিমু আপা একটা স্বস্থির নিশ্বাস নেয়। আদনান ভাই শুধু চুপ করে এই দৃশ্যটা তার চোখে এঁকে নিচ্ছে। স্বস্থির নিশ্বাস নেওয়া হয়ে গেলে শিমু আপা আমাকে বললো “তুইও ওর সাথে

জড়িত হয়ে সঙ্গ দিতে পারলি? মানছি সে পাগল হয়ে গেছে, তার সাথে তুইও পাগল হবি জাহেদ?” আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না। আমার ভিতরটা ধক করে ওঠে। আমি কিছুক্ষন ভেবে বললাম “মানুষটা তোমাকে ভালোবাসে শিমু আপা।” শিমু আপা আমার কথা শুনে গালে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে বললো “এটাকে ভালোবাসা বলে? ভালোবাসলে কেউ এমন কাজ করতে পারে? ভালোবাসাটা নিজের মাঝে যত্ন করে রাখতে হয়। যত্ন নেওয়া ভালোবাসাটা যখন পাহাড়ের সমান হয় তখন সেই পাহাড়ের একদম চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ভালোবাসার মানুষটাকে ডাকতে হয়। চিৎকারের প্রতিধ্বনি যখন কানে ভেসে আসে তখন এই ভালোবাসার তৃপ্তি পাওয়া যায়। কিন্তু দেখ এই তৃপ্তিটা আমার শরীরে মাখাতে পারলাম কই?” থাপ্পড় খেয়ে আমি চুপ করে থাকি। অনুভব করি ভালোবাসাটা কি আসলেই এমন? বিকেলের এই বিষন্নতার সাথেও আমার মাঝে এক বিষন্নতা তৈরি হয়। আদনান

ভাই একটা কান্নার ঘোংরানি দিয়ে আমাকে বললো “ওরে বলে দে, ও আমার না হলেও আমি এই শহরের ছায়ায় দিব্যি বেঁচে থাকবো। ওকে শুধু এখানে এনে বুঝাতে চেয়েছি চাইলে আমিও অনেক কিছু করতে পারি কিন্তু এমনটা আমি করবো না। ওরে বাসায় দিয়ে আয়। আর এটাও বলে দে সব মেয়েদের মত সস্থা মার্কা কথা যেন না বলে।” এটা বলেই আদনান ভাই এই পুরাতন বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। আমি চুপ করে থাকি। শিমু আপাও চুপ করে আদনান ভাই এর চলে যাওয়ার দিকে গুরু গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ভালোবাসার মানুষগুলোর গল্প যখন অসমাপ্ত থেকে যায় তখন আমি মাঝে মাঝে অনুধাবন করি জাদুর মত কি কোন কিছু নেই যার আলোড়নে গল্প গুলোকে সমাপ্তের রুপ দেওয়া যায়।

শিমু আপাকে আমি বাসায় পৌছে দিতে দিতেই সন্ধ্যার আলোটা চারপাশে ছড়িয়ে যায়। সন্ধ্যার আলো আর ফুটপাথের হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় এই সন্ধ্যার শহরটা যেন নতুন বউ এর মত সেঁজেছে। বা বলা যায় কোন এক পাত্র এই সন্ধ্যার শহরটাকে দেখতে এসেছে। আর এই আলোর মাঝে নিজেকেও একটু অন্য রকম মনে হচ্ছে। শিমু আপাকে কিডন্যাপ করাতে আমাকে কি ভেবেছে আমি জানি না। আদনান ভাই কিছুদিন আগে যখন উত্তেজিত হয়ে টেবিল থেকে কাচের গ্লাস নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে ভেঙ্গে ফেললো আমি অনেকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি ইতস্তত হয়ে বলেছিলাম “কি হয়েছে ভাই?” আদনান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললো “আমাকে বালের বুঝ দেয় বুঝছোস? সস্তা মার্কা কথা বলে আমাকে। এতো বুঝলে প্রেম করছিল ক্যান আমার সাথে। আমি ওরে প্রথম আমার ভালো লাগার কথা বলছিলাম? নাকি সে আমাকে পছন্দ করতো। আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করলো। আমাকে বলে

কি জানোস? বলে “তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ফ্যামিলি মেনে নিবে না। তুমি আমার থেকে অনেক ভালো মেয়ে পাবা। ভুলে যাও প্লিজ। ফ্যামিলি থেকে আমার বিয়ে ঠিক করেছে।” আমিও বলে আসছি খুব খারাপ করে ফেলবো। সম্পর্কতে ঝামেলা আসলে মেয়েরা এই একটা কথা ছাড়া কিছু বলতে পারে না?” আমি অসহায় দৃষ্টিতে আদনান ভাই এর দিকে তাকিয়েছিলাম আর ভাবছিলাম কি বলা যায়। আমিও একজনকে পছন্দ করি। মেয়েটার নাম ইবনাত। একদিন অনেক অনেক চিন্তার পর ইবনাতকে আমার ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলাম। সে খুব সুন্দর ভাবে বলে দিয়েছিল “দুঃখিত জনাব।” তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। আমি অনুধাবন করি রাতের রুপালি আলো আর শুভ্র সকালে যে ছায়াটা দেখা যায় সেটা আমার না।আমার এটা বুঝার উচিত ছিল আমার মত একজন ছেলেকে কি ভালোবাসা যায়? ভালোবাসার অধিকার কি আমি রাখি? আদনান ভাই আমার সাথেই ব্যাচেলর থাকে। তার পৃথিবী

বলতে তার বোন আর মা। তিন জনকে নিয়েই তার রঙ্গিন জীবন। এদিকে এই পৃথিবীর সাগর পারে আমার কেউ নেয় বললেই হয়। আদনান ভাই একটা চাকরি করে। পরিবারকে একটু হাসি খুশি রাখতে তাকে এই শহরের সাথে সারাটা দিন খাটতে হয়। আর অন্য দিকে শিমু আপারা আদনান ভাইদের থেকে আলাদা। শিমু আপার বাবা একজন ব্যবসায়ী। এই এলাকায় শিমু আপার বাবার অনেক নাম কাম আছে। আমি এটা কখনো বুঝে উঠতে পারিনা আদনান ভাইকে ভালো লাগলো কি করে শিমু আপার? অবশ্য ভালো লাগা কি বলে আসে? বাসায় যখন শিমু আপার বিয়ের কথা চলছে আর তখনি শিমু আপা আদনান ভাইকে জানায়। শিমু আপারও কিছু করার নেই আমি জানি। তার বাবাকে সে প্রচন্ড ভয় পায়। আমি আজ বুঝলাম ভালোবাসা যখন ভিতর থেকে আসে তখন এইসব ভয় কি মানে? কিন্তু একটা সময় মানুষ গুলো দ্বিধায় পড়ে যায় কি করবে। আর এই কারণেই আদনান ভাই এর এসব কিছু করা।

এই জায়গাটায় আসলে আমার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। আমার মায়ের কবরের পাশে আমি নিস্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয় এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে। এই শহরের বুকে কোথাও আমার জন্য একটু ভালোবাসাও নেই। যেই মানুষটা আমার কেউ না, আমাকে নিজের সন্তানের মত লালন পালন করেছে, আমাকে ভালোবেসেছে সেই মানুষটাই একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আমি সেই মানুষটার কবরের পাশেই এখন। মরিয়াম বেগম। আমি উনাকে মা বলে ডাকি। আমাকে যে জন্ম দিয়েছে, আমার আপন মা সে এখনো বেঁচে আছে। তবে তার সাথে আমি থাকি না। আমার বাবার কি যেন একটা অসুখ হয়েছিল। আমি তখন অনেক ছোট। বাবা প্রায় বলতো বুকে ব্যথা। একদিন হুট করে বাবাকে এই ব্যথাটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল। এরপর আমার মা বছর খানেক পর আবার বিয়ে করে। কয়েকটা মাস আমি আমার মায়ের সাথেই ছিলাম। শুধু দেখতাম

আমার নতুন বাবা, মায়ের সাথে কি যেন নিয়ে খুব চিৎকার চেচামেচি করতো। তারপর একদিন আমাকে একটা এতিম খানায় দিয়ে দেয়। আমি তখন একটা সাত বছরের বাচ্চা। আমি সারাটা দিন এতিম খানায় কান্না করতাম। সেখানে মরিয়াম বেগম চাকরি করতো। একদিন আমাকে বললো “কি হয়েছে খোকা, তুমি সারাদিন শুধু কান্না করো কেন?” আমি চুপ করেছিলাম। তারপর কান্না করতে করতে বলেছিলাম “আমার মায়ের কাছে যাবো। মায়ের কাছে নিয়ে যাও।” এরপর দিনই মরিয়াম বেগম আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। বলে “তোমাকে নিয়ে আসছি কেন জানো? তোমার মত আমার একটা ছেলে ছিল। একদম তোমার মত। আমরা তখন কক্সবাজারে থাকতাম। ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল একটা ভয়ানক রাত। রাত বারোটার নাগাদ উপকূলে আছড়ে পড়ে হারিকেন নামক এক ঘূর্ণিঝড়। সাথে জলোচ্ছ্বাস। আমার ছেলে আর স্বামীকে আমি ঐদিনই হারিয়ে ফেলি। কত খুঁজেছি পাইনি। আমার

সাথে থাকবে আমার ছেলে হয়ে?” তখনো আমি কান্নাকাটি করতাম আমার মায়ের কাছে আসার জন্য। এরপর একটা সময় আমি মরিয়াম বেগমের সাথে থেকে যাই। আমার নতুন মায়ের সাথে। আমাকে পড়ালেখা শেখানো, আবার নতুন করে স্কুলে ভর্তি করা, রাতে ঘুমানোর সময় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে গল্প বলে শোনানো। আমি যেন আমার দত্তক নেওয়া মায়ের জীবনের সাথে মিশে গিয়েছিলাম। এরপর অনেকটা বছর কেটে গেছে। আমি ভার্সিটিতে পদার্পন করি।ভুলেই গিয়েছিলাম আমার জীবনের সব কথা। গত দুই বছরের মাঝামাঝি সময়ে আমার মা মরিয়াম বেগম ইন্তেকাল করেছে। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এই মানুষটাকে খুব ভালো রেখো আল্লাহ। জীবনে এই মানুষটা না আসলে সন্তানের কাছে মায়ের ভালোবাসা কি যে দামী আমি বুঝতামই না।

মাঝে মাঝে যখন মন খারাপ থাকে আমি রাস্তায় বের হয়ে একা একা হাটি। আজকেও আমি হাটতে বের হয়েছি। মন খারাপের সময় মনের ভিতর যে বিষন্নতা ভর করে কিছুক্ষন হাটাহাটি করলে এই বিষন্নতা কিছুটা হলেও কমে যায়। হেটে হেটে শহর দেখি, এই শহরের মানুষ, যানবাহনের শব্দ, প্রকৃতির বাতাস সব মিলিয়ে যেন ভালোই লাগে। হাটতে হাটতে পড়ন্ত বিকেলের আবছায়াটা যখন আমার গায়ে এসে পড়লো তখন আমার ইবনাতের কথা মনে পড়ে। মেয়েটাকে আমার কেন যেন খুব ভালো লাগে। সে আমাকে যত অবজ্ঞা করে চলে আমি তার থেকেও বেশি ভালোবাসতে শুরু করি। সে কখনো বুঝতে চেষ্টা করেছে কিনা জানি না যে, তাকে আমি কতটা চাই। আমি মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি সে সাদা শাড়ি, ঠোটে লাল টকটকে লিপস্টিক, মায়া মায়া চোখ জোড়াতে কাজল, আর কপালের

ঠিক মাঝখানটায় একটা লাল টিপ পড়ে, চুল খোলা রেখে আমার সামনে ঘুরে বেড়ায়। আমাকে বলে ছেলে হাত ধরো। এতো বোকা কেন তুমি? ভালোবাসার মানুষটার সাথে হাটার সময় হাত ধরে রাখতে হয়।” কিন্তু কেন যেন আমি হাতটা ধরতে পারি না। হাত ধরার আগেই প্রত্যেক বার আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। এটা নিয়ে আমি খুব আফসোসবোধ করি। ভার্সিটিতে সে আমার সাথেই পড়ে। মাঝে মাঝে সে আমার সাথে অল্পস্বল্প কথা বলে। একদিন আমাকে বললো “জাহেদ তোমার তাকানোতে আমি কিন্তু খুব বিব্রতবোধ করি। কেমন করে যেন আমার দিকে তুমি তাকাও। যখনি তুমি আমার দিকে তাকাও আমার প্রত্যেকবার মনে হয় তুমি আমাকে আজই প্রথম দেখেছো। যেন চিড়িয়াখানার এক জন্তু আমি। আমার অসস্থি লাগে। এমন করে তাকাবানা কেমন?” আমি একটু হেসেছিলাম। বলতে চেয়েছিলাম মেয়ে

তোমাকে আমি যতবারই দেখি ততবারই একটা স্নিগ্ধতা আমাকে ছুয়ে যায় আর ঠিক ততবারই মনে হয় তুমি নতুন রুপে আমার সামনে হাজির হয়েছো। আর এই স্নিগ্ধতাটাকে আমার চোখে বন্ধি করতে চাই। যখন তুমি আমার সামনে থাকবে না। তখন চোখ বন্ধ করে এই স্নিগ্ধতাটাকে আমি অনুভব করবো, তোমাকে দেখবো। কিন্তু এই কথাগুলা আমি তাকে বলিনি। তাকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিলাম “আচ্ছা ঠিকাছে এমন ভাবে আর তাকাবো না।” তবে একটা ব্যাপার আমার ভীষন ভালো লাগে মাঝে মাঝে ও বাসা থেকে আসার সময় রুটি আর মাংস নিয়ে আসে। আমাকে খেতে দেয়। ঠিক তখনি আমার মনে হয় ঝকঝকে শান্ত নীল আকাশটা একান্তই আমার। অনেক অনেক দিন অতিক্রম হওয়ার পর একদিন আমার ভালো লাগার শব্দের অভিধান গুলো তার ছায়ায় ঢেলে দিয়েছিলাম। কিন্তু বড়ই দুঃখের ব্যাপার আমার শব্দের অভিধান গুলো হয়তো তার জন্য ছিল না। এই রকম একটা ভয়ংকর দিনের সাথে

আমি পরিচিত হতে যাচ্ছি সেটা আগে থেকেই মানসিক ভাবে প্রশ্তুতি নিয়েছিলাম যে এরকম একটা কিছু হতে পারে। অবশ্য কাউকে ভালো লাগলে সেটা বলতে হয়। আমার বলাটা না হয় আমি প্রকাশ করেছি। যেদিন ওকে বলেছিলাম সেদিনের পর থেকেই নিজেকে লজ্জিত বোধ করেছি। যতবার ওর সামনে পড়েছি ঠিক ততবার নিজের উপর ঘৃনা বোধ তৈরি হয়েছে। এরপর ওর থেকে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়িয়েছি এবং এখনও বেড়াচ্ছি। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওকে আর নিজের মত করে চাইবো না। ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবো না। থাকুক না ও নিজের মত। আমাকে তার কেন ভালোবাসতে হবে? এই ভালোবাসার অধিকার কি আমার আছে? আর এই ভালোবাসার কি নামই বা দিব আমি? ঠিকি তো একদিন আদনান ভাই এর মত শেষে বিষাদ ছায়ায় হামাগুড়ি খেতে হবে। তার চেয়ে আমি না হয় আমার বাস্তবতা ঘিরেই বেঁচে থাকি।

আগামীকাল জুলাই এর ২৮ তারিখ। শিমু আপার বিয়ে। এ কথা ভাবতেই আমার কেন যেন আদনান ভাই এর জন্য মায়া হয়। রাত গভীর হয়। এই অন্ধকার ঘরে আমার বুকের অতল গভীরে শূন্যতা ভর করে। আমি অনুধাবন করি এই মুহুর্তে আদনান ভাই এর বুকটা কি ধকধক করছে? তার মনে কি বিষাদে তলিয়ে গেছে? এগুলা ভাবতেই দরজায় সজরে আঘাত করে শব্দ করতে লাগলো কে যেন। আমি উঠে বাতি জ্বালিয়ে দরজা খুলতেই দেখি শিমু আপা। আমি খানিকটা অবাক হলাম। শিমু আপা আমাকে বলে “দাঁড়ায় আছিস কেন জায়গা দে ভিতরে ঢোকার।” ততক্ষনে

আদনান ভাই আমার পিছনে এসে বলে “তুমি এখানে কেন আসছো? কেন আসছো এখানে? ও আমার মনের অবস্থা এখন কেমন এটা দেখার জন্য?” আমি দরজার কাছ থেকে সরে গেলাম। শিমু আপা কিছুক্ষন চুপ করে রইলো। তারপর বললো “আমি চলে আসছি।” আদনান ভাই একটু অবাক হয়েছে। তারচেয়ে মনে হয়ে আরও বেশি অবাক হয়েছি আমি। আদনান ভাই বললো “চলে আসছো মানে?” শিমু আপা বললো “আমি একেবারেই তোমার কাছে চলে আসছি। আমরা পালাবো।” এ কথা শোনার পরই আদনান ভাই কষে একটা চড় লাগালো শিমু আপার গালে। তারপর শার্ট পড়ে শিমু আপাকে নিয়ে শিমু আপার বাসার দিকে হাটা দিল। কি হচ্ছিল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আচ্ছা ইবনাত যদি এই রকম করতো আমি কি ওকে নিয়ে পালিয়ে যেতাম? এই সাহস কি আামার আছে? আমি আদনান

ভাই এর পিছন পিছন শিমু আপার বাসায় গেলাম। থাপ্পড় খেয়ে শিমু আপা একটা আওয়াজও করলো না আদনান ভাই এর সাথে। শিমু আপার বাবাকে দেখে আদনান ভাই বললো “এই নিন আপনার মেয়েকে। পালানোর চিন্তা করছে আমার সাথে।” আমি গালে কষে একটা লাগিয়েছি। আমি চলে গেলে আপনি আরও দুটো লাগাবেন। তারপর আন্টিরে বলবেন আরও দুটো লাগাতে। আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।” এরপর শিমু আপার বাবাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আদনান ভাই বের হয়ে গেল। শিমু আপা শুধু চুপ করে ছলোছলো চোখে তাকিয়েছিল। আমি বুঝতে পারলাম না আদনান ভাই কেন এমনটা করলো। বাসায় এসে যখন আদনান ভাইকে বললাম “ভাই আপনি এমনটা করলেন কেন?” আদনান ভাই এই কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে বললো “আগামীকাল সকালেই বাড়িতে চলে যাব।” আমি একটু ইতস্তত হয়ে বললাম “আপনি শিমু আপার গালে থাপ্পড় মেরেছেন সেটা উনার বাবাকে বলেছেন। এখন

আপনাকে তো উনি ছাড়বে না। এটার ভয়ে বাড়িতে চলে যাবেন?” আদনান ভাই আমার দিকে কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন। তারপর বললো “আগামীকাল ওর বিয়ে। এই শহরটা তখন আমার থাকবে না। এই শহরের বিষাদ নীল ছায়াটা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। তুই একবার ভেবে দেখেছিস আমি যদি তার সাথে পালিয়ে যেতাম আমি একটা মানুষের জন্য সে তার কয়জন মানুষকে হারাতো। তার বাবা, মা, ছোট ভাইটা, তার আত্বীয়স্বজন। আমি তো এমনটা হতে দিব না। আমি কি এতোটাই স্বার্থপর? চাইলে তো ওকে নিয়ে আরও আগে পালাতে পারতাম। আমি এমনটা কখনও করবো না। আমার ভিতরটায় কুড়ে কুড়ে যে যন্ত্রনাটা জ্বলছে নিস্তব্দতা হয়ে সেটা না হয় নিস্তব্দতা হয়ে জ্বলতে থাকুক।” আমি এই কথার কি উত্তর দিব ভেবে পেলাম না। শুধু কাছে গিয়ে আদনান ভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। আদনান ভাই কান্না করতে থাকলো। আমি জড়িয়ে আদনান ভাইকে বললাম “আমাকেও নিয়ে যাবেন ভাই আপনার সাথে? গ্রামের সবুজ আলো বাতাসে তেমন মিশার সুযোগটা হয়নি।”

সকালে গ্রামের সবুজ আলো বাতাসের সাথে যখন পরিচিত হওয়ার জন্য নিজের ভিতরে একটা প্রশ্তুতি নিচ্ছিলাম তখনি একটা কান্ড ঘটে গেলো। আমার মা আামার সাথে দেখা করতে এসেছে। কতবছর পর আমার মাকে আমি দেখলাম। শুভ্র এই সকাল বেলা তার চোখে যখন আমার চোখ পড়লো আমার নিজের ভিতর একটা ভয়ংকর রাগ এসে জমা হলো। আমি আমার মায়ের চেহারা ভুলিনি। কলেজে পড়াকালীন সময়ে উনাকে একদিন আমি চুপিচুপি

দেখতে গিয়েছিলাম। দুর থেকে দেখে আমি শুধু চোখ ভিজিয়ে চলে এসেছি। আমার বুকটা ধরফর ধরফর করে কাপছে। আমি উনাকে না চেনার ভান করে বললাম “কাকে খুঁজছেন? উনি খানিকটা চুপ করে রইলো। তারপর ইতস্তত হয়ে বললো “আমি তোমার মা” কথাটা শুনেই আমার ভিতরটা ধক করে উঠলো। আমি স্বাভাবিক হয়ে একটু হেসে বললাম “আমার মা তো দু বছর হয়েছে মারা গিয়েছে। আপনি হয়তো অন্যকারো সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন।” ঠিক সেই মুহুর্তে তিনি কান্না করতে লাগলো। আমার দু গাল আলতো করে স্পর্শ করে বললো “অনেক বড় হয়ে গেছো।” উনি যখন আমাকে স্পর্শ করলো আমার ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিল। প্রচন্ড কান্না আসছিল আমার”

উনি আমাকে আামার পিছনের ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে লাগলেন। আমি বললাম “মাফ করবেন আমার কিছু মনে নেই। আমার মা একজনি, যিনি দু বছর আগে মারা গিয়েছেন, মরিয়াম বেগম।” উনি আমার গাল থেকে হাত সরিয়ে আবার কান্না করতে লাগলো। আমি কিছু না বলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলাম। আদনান ভাই পিছন থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। আমার মা বলতে লাগলেন “আমার প্রতি তোমার অনেক অভিমান তাই না? তুমি তোমার মাকে চিনতে পারছো না। তোমাকে নিয়ে বাসায় রোজ ঝগড়া হতো। বুঝতে পারলাম ঝামেলা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। তোমাকে এতিম খানায় দিলাম। এর দুদিন পর যখন তোমাকে দেখতে গেলাম শোনলাম তোমার মা যিনি মারা গিয়েছেন তিনি তোমাকে নিয়ে গেছে। আমার ভয় লাগলো খবরটা শুনে। আমি ছুটে গেলাম। দুর থেকে

দেখলাম সে তোমাকে কত আদরই না করলো। দেখেই আমার কেন যেন স্বস্থি লাগছিল। এটা ভেবে যে তুমি এখানে খুব ভালো থাকবে। তবে তোমাকে আমি মাঝে মাঝে দেখে যেতাম লুকিয়ে লুকিয়ে। আমার কেন যেন সাহস হতো না তোমাদের মা ছেলের মাঝে আসতে।” আমি চুপ করে রইলাম। কি বলা যায় ভাবছিলাম। আমার চোখে হয়তো এখনি জল গড়িয়ে আসবে।” আমার মা আবার বলতে লাগলেন “কোথাও বের হবে?” আমি মাথা দিয়ে হ্যাঁ সূচক ইশারা দিলাম। উনি ও আচ্ছা নামক শব্দ উচ্চারণ করে বললেন “ঠিকাছে তোমাকে আমি আর ডিস্টার্ব না করি কেমন? হয়তো তোমার আসলেই কিছু মনে নেই। ছোট ছিলে তো। অনেক ভালো থেকো আমার ছেলেটা” এটা বলেই উনি শাড়ির আচল মুখে দিয়ে কান্না করতে করতে চলে যায়” চলে যাওয়ার সময় আমি বললাম “শুনুন” আমার মা আমার

দিকে ফিরে তাকায়। আমি মনের ভিতর জমানো রাগ নিয়ে একটু জোড়েই বললাম ” এতোদিন আমার সামনে আসতে আপনার সাহস হয়নি, আজ কোন সাহসে আসলেন? এতো সাহস কি দিয়েছে আপনাকে? আমার ভিতরটা যে এতোবছর ধরে পুড়ছে সেটা কি আপনি জানেন? আজ যে সাহসটা আপনি দেখিয়েছেন এই সাহস ভুলেও আর কখনো দেখাবেন না। চলে যান আপনি আমার সামনে থেকে।” আমার মা কান্নার শব্দ করে চলে যায়। আমিও কান্না করতে থাকলাম। আদনান ভাই আমার কাছে এসে আমার কাধে হাত রেখে শান্তনা দিতে লাগলো। আমি আদনান ভাইকে জড়িয়ে ধরে বললাম “আমার মায়ের মুখটা স্পর্শ করতে খুব ইচ্ছে করছিল। তাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আমার এতো বছরের জমানো অভিমান গুলো কি এতোই সস্থা বলেন?” আমি বাচ্চা ছেলের মত হাউ মাউ করে কান্না করতে লাগলাম।

 

সকালের আলোটা আস্তে আস্তে হারিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার আলোকে যখন আমন্ত্রন জানালো তখন আমি আদনান ভাই এর কুমিল্লা শহরে। গ্রামের বাতাস আর আবছা ছায়া আমার শরীরে মিশাতেই মনে হলো আমি কোথাও যেন হারিয়ে গেছি। এরপর দিন সকালে আদনান ভাই যখন ঘুমিয়ে থাকলো তার ছোট বোন বিন্তি এক জগ পানি ঢেলে বললো “ভাইয়া উঠো না। আর কত ঘুমাবা হ্যাঁ?” আদনান ভাই ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে বলে এটা কি করলি তুই?” এটা বলতেই বিন্তি দৌড় দেয়। আদনান ভাইও উঠে তার পিছনে দৌড় দেয়। এই দৃশ্যটা আমি চুপ করে অনুভব করতে লাগলাম। আমি অনুধাবন করি ভাই বোনের ভালোবাসা গুলা কি এমন? বিন্তি ক্লাস ছয় এ পড়ে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলকে যখন স্পর্শ করলো আমি বিন্তির কাছে গেলাম। ও ক্ষেতের মাঝখানে হাটছিল। বললাম “আমার সাথে ঝগড়া করবি মেয়ে?” ও আমার কথা শুনে হা করে তাকিয়ে থাকলো। আমি কিছুক্ষন চুপ করে রইলাম। ওর মুখের এমন অবস্থা দেখে বললাম “না থাক ঝগড়া করা লাগবে না। এমনি বলেছি। আমার বোন নেই তো আমি বোনের ভালোবাসাটা বুঝি না।” এরপরই ও আমাকে ক্ষেতের কাদা মাটিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলে “আমার সাথে না ঝগড়া করবা? পারলে আমাকে ধরোতো” এটা বলেই দৌড় দেয়। আমি কাদা মাটিতে নিশ্তব্দ হয়ে

চেয়ে থাকি। আমার চোখ দিয়ে জল আসে। মনে মনে বলি এই রকম একটা বোন যদি আমার হতো? আমার চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। আমি ওকে বললাম “এই দাঁড়া। দাঁড়া বলছি।” বিন্তি আমাকে মুখ বাকিয়ে আবার পালায়। এদিকে আদনান ভাই এর মনের অবস্থা ভালো না। কেমন যেন বিষণ্ণতা নিয়ে থাকে। চুপ করে ঘরে গুটি মেরে সব সময় শুয়ে থাকে। খালা আমাকে বলে “আমার ছেলেটার কি যেন হয়েছে বাবা। এবার বাড়িতে হঠাৎ করেই আসলো। ছেলেটা কেমন যেন চুপ হয়ে গেছে। আমার ছেলেটা তো এমন না। আমি তো মা, বুঝি তো। আমার ছেলেটার কি কিছু হয়েছে?” আমি চুপ করে থাকি। এই কথার কি প্রত্যুত্তর দিব আমি বুঝতে পারলাম না।

কিভাবে কিভাবে যেন তিনটা দিন আদনান ভাই এর শহরে থেকে পার করে দিলাম। এই তিনটা দিন আামার মনে হয়েছিল আমি একটা স্বর্গে ছিলাম। এই রকম শহরের জন্য আমার মায়া হয়। সকালে চট্টগ্রাম শহরে পৌছাতেই আমার ভিতরটা আবার ধক করে উঠে। এরপর দিন আমি ভার্সিটিতে গেলে ইবনাত আমাকে দেখে বলে “এই ছেলে না বলে কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়েছিলে? আমি চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। সে আমার চুপ করে থাকা দেখে আবার বললো “মাথা ফাটায় দিব চুপ করে থাকলে। আর এভাবে দেখো কেন? তোমাকে না বলেছি এভাবে তাকায় থাকলে আমার অস্বস্থি লাগে। চোখ নামাও।” আমি চোখ না নামিয়ে ওর দিকে তারপরও তাকিয়ে থাকলাম। সেও চুপ করে তাকিয়ে থাকলো। এর একটু পর ইতস্তত হয়ে বললো “আমাকে মিস করোনি? আর আমার থেকে ইদানিং

লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছো কেন?।” আমি একটু হাসলাম। বললাম “আমি যাই কেমন ভালো লাগছে না।” এটা বলেই যখন আমি হাটা দিলাম সে আমার হাতটা ধরে বললো “যাচ্ছো মানে?” আমি কিছুক্ষন আমার হাত ছোয়ার মাঝে তাকিয়ে থাকলাম।তারপর ওর হাতটা সরিয়ে বললাম “তোমাকে নিয়ে আমার কেন যেন আর ভাবতে ইচ্ছে করে না ইবনাত। সমাজটা অনেক নিষ্ঠুর। আমাকে যে অনুভুতিটা আচ্ছোন্ন করেছিল আমার ভিতরের মাঝেই সেটা পচে গেছে। আমি এখন শূন্যের পথে হাটি।” এটা বলেই আমি চলে আসি। ইবনাতকে ফিরিয়ে দিতেই আমার শির ধারায় কিছু একটা বয়ে যায়। সে নিশ্চুপ হয়ে আমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো ইবনাত কি আমাকে নিয়ে ভাবে? আমাকে নিয়ে একটু হলেও কি ভালো লাগা কাজ করে? আমি ভার্সিটি থেকে বের

হয়ে ফুটপাথের উপর হাটতে থাকি। যেদিন চট্টগ্রাম শহরে আসলাম সেদিন দুপুর বেলা শিমু আপার বাবা এসে আদনান ভাইকে বললো “তুমি তো অনেক ভিতু একটা ছেলে আমার মেয়েকে না নিয়ে একাই পালালে। এমন বোকামী কাজ দ্বিতীয় বার করবে না। আমি তোমাকে নিয়ে অনেক ভেবেছি এবং আমি বুঝেছিও। খুব শিঘ্রই শিমুর সাথে দেখা করবে ঠিকাছে?” আমি অবাক হয়ে শুধু অনুভব করছিলাম এই শহরের মানুষের অনুভূতিকে নিয়ে। আমি হাটতে লাগলাম, আমার ভিতরটা অভিমানে ভরে গেছে। আমার বাস্তবতার সামনের পথটা অনেক কঠিন, এই কঠিন পথটার মাঝে ইবনাত কে নিয়ে কেন যেন অগ্রসর হতে মন চায় না। আমার চোখে জল আসে। অভিমানের জল। আমি হাটতে হাটতেই অর্থহীনের গান গুন গুন করতে থাকলাম…

চাইছো কেন তোমরা সব যা নেই আমার দেবার
শুনবে তোমরা কিভাবে এই বোবার চিৎকার,
জানালার ঐ পাশটাতে ছিল আকাশ নীল
আটকে দিলে তোমরা আমায় ঘরে একাকী,
তবে কেন চাও তোমরা ফিরে আমাকে?
পেতে চাই না আর কিছু হারানোর ভয়ে
তবে কেন চাও তোমরা ফিরে আসি আজ?
গানের খাতায় থাকলো পরে আমার অভিমান…

সেই অভিমান নিয়েই আমি হাটতে থাকি। একদিন আমি এই অভিমানের শহর ছেড়ে পালাবো। দিনের শেষে রাত্রির রুপালি চাঁদের আলোর মাঝে নিজেকে তলিয়ে দিব। যেখানে আমাকে এই শহরের বিষাদের অভিমান স্পর্শ করতে পারবে না, একটুও না…

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত