টিউশনি নাম্বার পনেরো

টিউশনি নাম্বার পনেরো

এ নিয়ে পাঁচটি টিউশনি চলে গেলো। মনে হচ্ছে টিউশনি করতে করতে একদিন সেঞ্চুরি হয়ে যাবে। এটা বড় কথা নয় বড় কথা হলো কাল থেকে আমাকে রিক্সা চালাতে হবে। আব্বা আমাকে লাস্ট একটা সুযোগ দিয়েছিলো কিন্তু সেটাতেও আমি ফেইল মারলাম। চুপিচাপি বাড়ি গিয়ে দেখলাম আব্বা নেই। রান্নাঘর থেকেই খাবার বেড়ে গফগফ করে খেয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে আছি। রাতে আব্বা দরজা ধাক্কা দিচ্ছে আর আমাকে অকর্মা, কুলাঙ্গার বলে বকছে। যা ভাবছিলাম তাই হলো। মাথার নিচ থেকে বালিশ বের করে কানে চেপে ধরলাম। কিন্তু অবশেষে আর না পেরে ভয়ে ভয়ে দরজাটা খুললাম। আব্বাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে আমি এতক্ষণ ঘুমের ভান ধরে শুয়ে ছিলাম। আব্বা পকেট থেকে চাবিরতোড়া বের করে আমার চোখের সামনে ধরে বললোঃ-

_এইগুলা কিসের চাবি জানিস.??
_না আব্বা। কিসের চাবি.?

_একটা রিক্সার চাবি আরেকটা রিক্সায় তালা লাগানোর চাবি আর ঐগুলা একেকটার কপি। তারপর আব্বা চলে গেলো।

সকালবেলা হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো বুঝতে আর বাকি রইলো না যে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। আল্লাহ্‌ এমন ভয়াবহ স্বপ্ন যেন বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়। ছোট বোন এসে বলে গেলো আমার যমজ ভাই নাহিদ চিটাগাং থেকে এইমাত্র বাড়ি ফিরছে। শুনে খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে। নাহিদ আসাতে আমার অনেক সুবিধে হয়েছে। প্রথমত আব্বা আমাকে রিক্সা চালানোর কথা বলতে পারবে না। আমরা দুই যমজ ভাই মানুষকে কত বোকা বানালাম।
নাহিদ আসাতে আব্বা আমারে রিক্সা চালানো থেকে রেহাই দিলো কিন্তু নাহিদ চলে গেলে আবার রিক্সা চালাতে বলবে। এর ভিতর আমাকে কিছু একটা করতে হবে।

কিছুদিন পর একটা টিউশনি বের করলাম। নিউ টেনে পড়ুয়া মেয়ে। যাইহোক প্রথমদিন মেয়েটাকে পড়াতে তাদের বাড়িতে গেলাম। মেয়েটার সাজগোজ দেখে আকাশ থেকে পরলাম। এতটাই মেকাপ করছে যে বিশ্রী দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার সাজগোজ দেখে নিজেকে পাত্রপক্ষ মনে হচ্ছে। মেয়েটার পা দেখেই বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা অতটা সুন্দর না। ঠিকমত মেকাপও করতে পারে না। কোথাও মেকাপ বেশি হয়ে গেছে আবার কোথাও মেকাপ কম হয়েছে আর কপালের টিপ ঠিক জায়গাতে লাগাতে পারেনি। এসব ভুলভাল দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। ইচ্ছে করে কপালের টিপটা ঠিক করে দেই। কিন্তু অচেনা একটা মেয়ের শরীর স্পর্শ করা কি ঠিক হবে.? না থাক। পড়ালেখায় কেমন হবে আল্লাহ্‌ জানে।

আমার অবাক মার্কা চাহনি দেখে মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে। হয়তো ভাবছে তাকে দেখে আমার ভালো লাগছে। যাইহোক তারপর মেয়েটার রুমে গেলাম।

মেয়েটা আমার সামনে বসে আছে কিন্তু মেয়েটার দিকে তাকালেই ইচ্ছে করে ঐগুলা ঠিক করে দেই তাই নিজের চোখকে সংযত রাখি। কিন্তু অবশেষে আর না পেরে বললামঃ-

_তোমার মেকাপ আর কপালে টিপ ঠিক করে আসো।

মেয়েটা বাথরুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছে ঠিকই কিন্তু কপালের টিপ ঠিক জায়গাতে লাগাতে পারেনি। মেকাপ ছাড়াই মেয়েটাকে অনেক সুন্দর লাগছে। উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটার টিপ ঠিক জায়গাতে লাগিয়ে দিলাম। আধা ঘন্টা পড়িয়ে বুঝলাম মেয়েটা পড়ালেখাতে ভালো। আর বাচালও বটে। আমি এক কথা বললে মেয়েটা দশটা কথা বলে। আমি এ পর্যন্ত যে কয়টা মেয়েকে টিউশনি পড়িয়েছে সব কয়টা মেয়ের কোনো না কোনো সমস্যা আছেই

এই মেয়েটা কথাবার্তা একটু বেশি বলে। বেশি কথা বলা মেয়েদের আমার পছন্দ না। আবার কম কথা বলাও মেয়েদেরকে পছন্দ না।

পরেরদিন মেয়েটা আবার সেই ভুলভাল সাজগোজ করে আমার সামনে বসে আছে। দেখে মেজাজ গরম হয়ে গেলো। আমার কথামত প্রতিদিনের মত আজকেও মেয়েটা ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসলো। এইভাবে পাঁচদিনের মাথায়ও মেয়েটা ভুলভাল সাজগোজ করে আসলো কিন্তু আমি কিচ্ছু বলিনা। মেয়েটা সেটা লক্ষ করে আমাকে বললোঃ-

_আচ্ছা স্যার আপনি কি আমার দিকে তাকাননা..?
_তাকাইনা মানে কি.?
_না মানে আপনি প্রতিদিনই বলেন আমার মেকাপ করা হয় না কিন্তু আজকে বলেননি যে.?
_তুমি কাল থেকে মেকাপ করবা না।
_কেন স্যার.?
_এমনি।
_আচ্ছা স্যার।
_এখন পড়ো।
_জ্বী, স্যার।

সাতদিনের মাথায় পড়াতে আসা মেয়েটা আমাকে চুপচাপ দেখে বললোঃ-

_কি হয়েছে স্যার.? শরীর খারাপ.? মন খারাপ.?
_না কিছু না।
_কিছু একটা হয়েছে। ধমক দিয়ে বললামঃ-

_চুপচাপ বসে বই বের করে পড়ো।

ধমক খেয়ে মেয়েটা অনেক ভয় পেয়ে গেছে। মেয়েরা এমনিতেই ভীতু। এমন ধমক দেওয়া ঠিক হয়নি। নিচু স্বরে বললামঃ-
_সরি।

_ইটস,ওকে, স্যার।

_আসলে এই টিউশনি চলে গেলে আব্বা আমাকে বলছে রিক্সা চালাতে হবে তাই ভাবছিলাম। রিক্সা চালানোর কথা শুনে মেয়েটা অবাক আবার মুচকি মুচকি হাসছেও।

_স্যার আম্মুও আমাকে বলছে এইবার এস এস সি তে ফেইল করলে রিক্সাওয়ালার কাছে বিয়ে দিয়ে দিবে। ভালোই হবে আপনি রিক্সা চালাইবেন আর আমি রিক্সাওয়ালার..

_তুমি রিক্সাওয়ালার কি…??
_না স্যার কিচ্ছু না।

_বড় হয়ে গেছো তাইনা.? দুইদিন আগে শুনছি তুমি বিছানায় হিসু করে দিছো আর এখন আমাকে বিয়ের কথা ভাবছো।

_স্যার আপনি কিন্তু.. এই বলে মেয়েটা বাচ্চা পোলাপানের মত হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেছি আর বলতেছি।

_কাইন্দো না কাইন্দো না। অতঃপর মেয়েটা চুপ হয়ে গেছে।কান্না শুনে পাশের রুম থেকে মেয়েটার আম্মু আসলো। ততক্ষণে আমি হাত উঠিয়ে নিলাম আর মেয়েটার কান্না আবার শুরু হুয়ে গেলো। মেয়েটার আম্মু বললো-

_কি হয়েছে.? কাঁদছিস কেন.? মেয়েটা বললোঃ-
_আম্মু স্যার আমাকে বলছে আমি নাকি বিছানায় হিসু করে দেই।
_আপনি মাস্টার মানুষ হয়ে ছাত্রীকে নিয়ে এসব কথা বলতে পারলেন.?
_আসলে আমি।

_আসলে আপনি খুব খারাপ একটা লোক। মেয়েটা সামনে তাই কিচ্ছু বললাম না। এক্ষুণি আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।

এটাই আমার টিউশনি। আমার টিউশনি পাঁচদিন, সাতদিন, আটদিন এর বেশি টিকে না। আজ রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবো তাও রিক্সা চালাবো না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত