এক গোমরা মুখোর গল্প

এক গোমরা মুখোর গল্প

ফোন নাম্বার টাও নেই যে ফোন করে খবর নিবো।ইচ্ছে করলেই ওর বন্ধুদের কাছে থেকে নাম্বারটা নেওয়া যায় কিন্তু ওর বন্ধুরা কি মনে করবে, তাছাড়া অর্নব ওর বন্ধুমহলে খুব সম্মানের সাথে চলাচল করে জানি, আমার জন্য যদি ওর সম্মানের কোন ব্যাঘাত ঘটে, না না নাম্বার লাগবে না।কিন্তু অর্নবকে দেখার জন্য যে মনটা আশফাস করছে।কি জালায় পরলাম!!
আজ আর ক্লাসে মন বসবে না বাসায় চলে যাওয়াই ভালো।

বাসায় এসে আরেক টেনশন, বাড়ি নাকি ছাড়তে হবে তাও আবার কালকের মধ্যেই ! কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বাসা কোথায় পাবো? বাবা খুব টেনশনে পরে গিয়েছে। হঠাৎ আমার বান্ধবীর ফোন ওকে সব বলতেই ও একটা বাসার নাম্বার দিয়ে বললো এ বাসাটা ভাড়া দিবে, অঙ্কেল কে বল যোগাযোগ করতে।যেহেতু এবাসা ছাড়তেই হবে এবং আর কোন বাসা পাওয়া যাচ্ছে না সেহেতু এই বাসাটাই দেখতে হবে। আমি বাবাকে বাসার নাম্বার দিয়ে পাঠালাম।
.
বাবা বাসা পছন্দ করে সব ঠিকঠাক করে এলো।পরেরদিন সকালেই আমরা নতুন বাসায় চলে এসেছি।নতুন বাসা গোছগাছের ব্যাপার আছে তাই আজ আর কলেজে যাওয়া হয়নি কিন্তু অর্নবকে খুব মিস করেছি অনেক মনে পরেছে ওর কথা।সারাদিন ঘর গোছাতে গোছাতেই চলে গিয়েছে সন্ধ্যায় দোতালার বারান্দায় দারিয়ে আকাশের চাঁদ দেখছিলাম।আজকের সন্ধ্যাটা সত্যি খুব সুন্দর চারিদিকে জোনাকি পোকা মিটিমিটি আলো নিয়ে ছুটাছুটি করছে।ঝিঝি পোকারে কেমন একটা ছন্দ টানছে।চাঁদটা তার সর্বশ দিয়ে পৃথীবির বুকে স্নিগ্ধ আলোর ঝড়না ঝরাচ্ছে।
.
খটখট শব্দে দৃষ্টি আকাশ থেকে সোজা মাটিতে।দারোয়ান চাচা বাহিরের গেট খুলছিলো।গেট খুলতেই এক লোক বাসা বরাবর আসতে লাগলো।খানিকটা দোতলার বারান্দার দিকে চেয়ে বাসায় ঢুকে পরলো।দেখতে অবিকল অর্নবের মত!!
কি সর্বনাশ আমি অর্নবকে এখন সব জাইগাতে দেখছি নাকি??দৌড়ে নিজের রুমে চলে এলাম।সকালে ফ্রেশ হয়ে ঘরথেকে বের হতেই মনে হলো ছাদের গেট টা খুলা।আমার আবার খুব সকালে ছাদে উঠতে ভালো লাগে।তাই ছাদের দিকে হাটা দিলাম।
ছাদে উঠতেই দেখি পুরোছাদটা গোলাপ গাছ ভরা। অসংখ গোলাপ ফুটে আছে আবার কোন কোনটা নতুন সূর্যের পরশ পেয়ে ফুটতে শুরু করেছে।কি অপুরুপ দৃশ্য, এমন সুন্দর সকাল আমি আগে কখন উপভোগ করিনি। ভদ্র লোক নিচু হয়ে গাছ গুলোতে পানি দিচ্ছে।
.
-আপনি কি এ বাগানের মালী??
-জ্বি বলাযেতে পারে।
– আরে এর কন্ঠটাও তো অবিকল অর্নবের কন্ঠের মত!! অদ্ভুত আমার সাথে কি হচ্ছে,আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি??আমি ছাদ থেকে নামতে যাবো ওমনি লোকটা বলে উঠল
-কি ব্যাপার চলে যাচ্ছেন যে, আমার বাগান আপনার পছন্দ হইনি??
.
-পেছনে ঘুরেই যা দেখলাম সেটার জন্য মটেও প্রস্তুত ছিলাম না।অর্নব!!! মাথার মধ্যে কয়েকটা চক্রর খেলাম,চোখটা ঘোষে মুছে আবারো লোকটার দিকে তাকালাম। আমি কি দিবা সপ্ন দেখছি নাকি।এটা কি করে সম্ভব।আপনি এখানে কিভাবে এলেন??
-আমার বাড়ি আর আমি থাকবো না!
– আপনার বাড়ি মানে??
-মানে আমি এ বাড়ির মালিক।
– আমি অর্নবের কথায় হা হয়ে গিয়েছি। আমি মনে মনে যা চেয়েছি সেটা নিজের অজান্তে এভাবে চলে আসবে কল্পনাতেও ভাবি নি।এখন থেকে প্রতিটা সূর্যোদয় এবং সূর্যঅস্ত অর্নবকে সাথে নিয়েই হবে।কলেজ ছাড়াও প্রতিটা মুহুর্ত ওর সাথে কাটবে।ভবতেই খুশিতে মন পেখম মেলছে।
.
এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ আমি।ভালোবাসার সবচেয়ে সুখের মুহুর্ত কোনটা জানো?? যখন তুমি জানবে তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষটির কাছাকাছি থাকতে পারবে।এভাবে ভালোই চলছিলো সময়টা,যদিও আমার ভালোবাসার কথা অর্নব কিছুই জানে না।তার পরেও নিজের ভিতরে একটা স্বর্গীয় সুখ অনুভব করি।
একসাথে কলেজে না যাওয়া হলেও ফিরাটা প্রাই একসাথে হতো।সবসময় সিরিয়াস মুড নিয়ে চলাফেরা করে।আচ্ছা মানুষ ! একটা মেয়ে যে এত চেয়ে থাকে এত ভালোবাসে সেটা কি ও বোঝেনা নাকি বুঝতে চায় না? আমি যে এই গোমরা মুখোটাকে এত ভালোবাসি এটা কি গোমরা মুখোটা কখন জানবে, নাকি কোনদিন জানতেই পারবে না??
.
রাতে খেয়ে ঘুমাতে যাবো এমন সময় রুমে
মা-বাবা হাজির।এরপর তারা যেটা বল সেটা শুনার জন্য মটেও প্রস্তুত ছিলাম না।পরশু দিন নাকি আমার বিয়ে!! ছেলে বাবার পূর্ব পরিচিত তাই আমাকে আগে কিছু বলেনি।বিয়ে ঠিক করে এখন বলছে।বাবা-মা বলেই চলে গেলো আমার মতামত টুকু জানার প্রয়োজন মনে করলো না।কিন্তু আমি যে একজন কে খুব ভালোবাসি সেটা তাদের কিভাবে বলি।একজন কে ভালোবেসে অন্য জনের সাথে সুখের ঘর কিভাবে বাধব? সাড়া রাত অঝরে চোখের পানি ফেলে কেটে গেলো।না এভাবে বসে বসে কাঁদলে চলবে না অর্নবকে সব কথা জানাতে হবে।সকাল হতেই ছাদে চলে গেলাম কিন্তু সেখানে অর্নবের দেখা নেই ! ভাবলাম কলেজে যাই সেখানে যেয়ে ভালোমত বলতে পারবো।ছাদ থেকে নামার সময় আন্টি মানে অর্নবের মায়ের সাথে দেখা।
.
-কি গো বিয়ের কোণে কেমন আছো?
– আমি অবাগ হয়ে আন্টির দিকে তাকিয়ে আছি।আন্টি জানে তার মানে কি অর্নবো জানে??
– কি লজ্জায় কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে নাকি?
– আমি কিছু না বলেই চলে এসে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে কলেজে চলে এলাম।
কলেজে এসে অর্নবকে অনেক খুজাখুজি করেছি কিন্তু পাইনি।ওর কয়েকটা বন্ধুদের কাছেথেকে জানতে পেলাম কোন বিশেষ কাজে ও কোথাও একটা গিয়েছে। ফোন দিয়েও লাভ হয়নি ফোন বন্ধ বলছে।প্রতিটা মিনিটে মিনিটে ফোন করেছি কিন্তু সুইজস্টোপ বলছে!
.
রাতে নিজের রুমের এক কোনে বসে আছি, কষ্টে বুকটা ভেজ্ঞে যাচ্ছে।তাহলে কি আমার সব সপ্ন ধূসর অন্ধকারে ঢেকে যাবে।বড্ড রাগ হচ্ছে অর্নবটার উপর প্রতিদিন কয়েক বার করে দেখা হয় কিন্তু আমার এমন একটা বিপদের দিনে খুজেই পাচ্ছি না।না আর পারছি না শেষ বারের মত চেষ্টা করে দেখি, কিন্তু আন্টি যদি জিজ্ঞেস করে কেনো এসেছো তাহলে কি উওর দিবো, আমার বিয়ে ভাজ্ঞার জন্য অর্নবকে খুজছি! ছি ছি আন্টি কি মনে করবে।এমন ভাবতে ভাবতে কখন যে অর্নবদের ফ্লাটে সামনে এসে পরেছি খেয়ালো করি নি।
.
কাপা কাপা হাতে কলিং বেলে চাপদিতেই আন্টি দরজা খুলে দিয়
– আরে রোদেলা তুমি?
– হুম।
– এসো এসো ভিতরে এসো।
– না আন্টি থাক,অর্নব ভাইয়া বাসায় আছে??
– হ্যাঁ, কিন্তু ও তো খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পরেছে।
– একটু কথা বলা যাবে না??
-এখন মনেহয় ঘুমিয়েই পরেছে, কি তোমার বিয়ের দাওয়াত নিজের মুখে দিতে চাও??
– না মানে,আমার কথা শেষ হতে না হতে….
– আমি অর্নবকে বলেছি ও থাকবে তোমার বিয়েতে।
.
আমি আন্টির মুখের উপর আর কিছুই বলতে পারলাম না।আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে লাগলো,অনেক আটকানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু পারি নি।
-এই পাগলি মেয়ে কাঁদছো কেনো??
-আমি আন্টিকে খুব শক্ত করে জরিয়ে ধরলাম।
-কি হয়েছে রোদেলা আমাকে বল??
– আন্টিকে কিছু না বলেই চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে রুমে চলে এলাম।
বিয়ের সাজে পাথরের মূর্তির মত বসে আছি।একটু পরি আমার সপ্ন সব ধূসর অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যাবে। আমার সব ইচ্ছা মাটিচাপা দিয়ে চলেযেতে হবে অন্য কারো সাথে যেখানে হয়ত আমি কখনই ভালো থাকতে পারবো না।
.
হঠাৎই আমাদের ড্রইং রুমে অর্নব ফ্লিমই স্টাইলে এন্ট্রি নিলো।এসেই সারাসরি আমার সামনে দাড়িয়ে বল
আমার কিছু কথা আছে যেটা সবাই শুনার পরি এ বিয়ে হবে! কথা গুলো পুরু ফ্লিমের হিরোদের মত বল।রাগে আমার মেজাজ গজগজ করছে এই ব্যাটাকে দুদিন পাগলের মত খুজেছি আর আজ বিয়ের ঠিক আগমুহূর্তে এসে ফ্লিমি ডাইলগ মারছে।
.
রোদেলা প্রথম যেদিন তুমি আমাকে ক্লাসের কথা জিজ্ঞেস করেছিলে সেদিনি প্রথম তোমার উপর ক্রাশ খেয়েছিলাম।তোমাকে দেখে বুকের ভিতরে অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করেছিলো যা আগে অন্য কোন মেয়ের ক্ষেএে হয়নি।যখন প্রজেক্টে গ্রুপিং কাজ করছিলাম তখন একটু একটু করে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।আর ফাইনালের দিন তোমাকে নীল শাড়িতে দেখে তো আমি আর আমাতে নেই।অসাধারন লাগছিলো তোমাকে,তোমারদিকে চোখ পরতেই কেমন জেনো সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিলো।এমন ইনপটেন্ট দিনে সব ঘেটে-ঘো হয়ে যাবার ভয়ে তোমাকে সাজ মুছাতে ঐ খারাপ ব্যবহার। এতে তুমি যতটা না কষ্ট পেয়েছো তার থেকে আমি খুব বেশি কষ্টপেয়েছি।তার পর দু’দিন কলেজ বন্ধদিয়েছি সেটাও নিজের ইচ্ছাতেই,দেখতে চেয়েছিলাম ঠিক কতটা ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে ।ঐ দু’দিন আমার কাছে দু’যুগ মনে হয়েছিলো।পরিশেষে বুঝতে পারলাম তোমাকে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকা সম্ভব না।তাই বাদ্ধ হয়েই তোমাদের বাড়িওয়ালাকে বলে তোমাদের বাসা ছাড়তে বলি।আর তোমার বান্ধবিকে আমিই বলেছিলাম আমাদের বাসার ঠিকানা দিতে।
.
আমি গোমরা মুখোটার কথা শুনে টাসকি খাচ্ছি।বেটার পেটে পেটে এএএত!!
.
আসলে তোমাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি তাই হারাতে চাই না।তুমিও আমাকে ভালোবাসো জানতাম কিন্তু সিউর ছিলাম না। তা না হলে ক্লাস বাদ দিয়ে,বান্ধবিদের সাথে আড্ডা বাদ দিয়ে প্রজেক্টের কাজ বাদ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে না।
(লাজ-লজ্জা বলতে নেই এত গুলা মানুষের সামনে আমার কথা বলার কি দরকার ছিলো??)
কাল রাতে যখন তুমি আমার খোজ করছিলে এবং না পেয়ে মাকে ধরে কেঁদে দিয়েছিলে তখন নিশ্চিত হলাম যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো।কারন একটা মেয়ে বিয়ের আগের রাএে একটা ছেলেকে খুজেও না আর না পেয়ে চোখের পানিও ফেলে না।এটা অবশ্য আমার মায়ের কথা।কারন মেয়েরা নাকি মেয়েদের মন ভালো বুঝে।
.
অর্নবের কথা শেষ হওয়ার পর আমার বিয়ে হয়েগেলো! এখন আমি আস্ত এক ফুল বাগানে মাঝে বসে আছি পাশে গোমরা মুখোটা !! আমি এখনো বিশাষই করতে পারছিনা যে গোমরা মুখোটার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।সব কেমন জেনো কল্পনার ঘোর মনে হচ্ছে।
– কি ভাবছো??
– ভাবছি আর একটু দেরি করে এন্ট্রি নিলে না, আমাকে এতখোনে ঐ লোকটা বিয়ে করে নিয়ে চলে যেতো।
-ভালোবেসেছি মেডাম হারানোর জন্য না।
– অর্নবের কথায় লজ্জায় লাল হয়ে ওর বুকে নিজের মুখ লুকিয়ে সাড়া রাত নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিলাম।
____________সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত