ভালোবাসা তোকে দিলাম ছুটি

ভালোবাসা তোকে দিলাম ছুটি

স্টেজে দরাজ কন্ঠে চলছে, “জাগরণে যায় বিভাবরী-
আঁখি হতে ঘুম নিল হরি
মরি মরি।।
যার লাগি ফিরি একা একা-
আঁখি পিপাসিত, নাহি দেখা,
তারি বাঁশি ওগো তারি বাঁশি
তারি বাঁশি বাজে হিয়া ভরি
মরি মরি।”

স্টেজ থেকে নামলো কৌশাণি ব্যানার্জী। এইচ আর হেড “সি এস এন্টারপ্রাইজ” নামক একটি কম্পানির, আজকে তাদেরই অনুষ্ঠিত একটি প্রোগ্রাম আয়োজিত করা হয়েছে নজরুল মঞ্চে। নতুন যাঁরা জয়েন করেছেন তাদেরকেও ডাকা হয়েছে আজকের অনুষ্ঠানে, ইন্ডাকশন হয়েছে আগের সপ্তাহেই। স্টেজ থেকে নেমে এগিয়ে যেতে চাইলেন, হঠাৎ একজন এমপ্লয়ি এসে হাত বাড়িয়ে বললেন, “অটোগ্রাফ প্লিজ”, একটু অবাক হয়েই,

-পেন আছে?

-হুঁ, এই নিন।

অটোগ্রাফ দিয়ে এগিয়ে যেতে যাবেন, শুনতে পেলেন,

-থ্যাংকস মৌ, গানটা ছাড়িস নি বল।

ঘুরে তাকিয়ে কৌশাণি বলে উঠলো,

-মৌ? আপনি….

-রাতুল, রাতুল মুখার্জী, মনে নেই তো?

-রাতুল?

-ক্লাস নাইন, জলপাইগুড়ি, এবার?

-না ঠিক মনে পড়ছে না।

-থাক মাথায় চাপ দিস না, ওহ আমায় না চেনা পর্যন্ত না হয় আপনি, আজ্ঞে টা করি, মনে পড়লেই সোজা তুই তে আসবো।

অনেকক্ষণ ভেবেও কিছুতেই মনে করতে পারলো না কৌশাণি ছেলেটাকে। এত ভুলো মন তো না ওর, তাহলে।

“ক্লাস নাইন, মানে সুমেধাও ছিলো সাথে”, সাথে সাথে সুমেধার নম্বরে ফোন করে বসলো কৌশাণি,

-আরে বড় বড় লোকেদের আজকে এরকম ক্ষুদ্র একজন মানুষ কে মনে পড়লো?

-ন্যাকা ন্যাকা কথা বলিস না, অফিসের প্রেশার যা, ফেটে হাতে আসার উপক্রম।

-একটা বাচ্চার মা, একটা ডাক্তারের বউ আর নিজে এত বড় একজন এইচ আর, মুখের ভাষা দেখো, কি হয়েছে, বল?

-রাতুল মুখার্জী…

-আবার একটা ছেলের প্রেমে পড়লি নাকি? উফফফ…

-না রে বাবা, আমাদের সাথে পড়তো নাকি?

-কে?

-রাতুল, রাতুল মুখার্জী।

-না, রাকেশ ছিলো রাজীব ছিলো, রাতুল! না মনে পড়ছে না তো।

-সেটাই তো রে, কী জানি? যাই হোক তা তোর হাফ বয়েলড বরের কি খবর?

-উউউ আমার হাফ বয়েলড, তোর বরের পেট টা দেখেছিস? স্টিয়ারিং ঘোরাতে গেলে এমনিই হর্ণ বেজে ওঠে।

-আহা চটছিস কেনো? এখনও এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ছিস তো?

-হুঁ তুই যেন সারারাত জাগিস? যাই হোক একদিন দেখা কর, জমিয়ে আড্ডা দেবো, খিস্তি মারবো, ছেলে দেখবো।

-হুঁ, নেক্সট উইক করবি?

-ডান নেক্সট উইক পাক্কা।

পরেরদিন অফিসে গিয়ে রাতুল কে দেখতে পেয়ে ডাক দিলো কৌশাণি,

-রাতুল বাবু একটু শুনুন এদিকে।

-ও এখনও আপনি হয়ে আছি? এই জন্যেই বলে ব্রেনোলিয়া খেতে।

-আপনি আমার স্কুলে পড়তেন না, দেখিনি আগে কখনো।

-কখন বললাম স্কুলে পড়তাম?

-মানে?

– ক্লাস নাইন, বাসব স্যার, ইংলিশ টিউশন।

-ও, তাই বল।

-যাক ফাইনালি তুই হলাম। সত্যিই মনে পড়েছে তো?

-সত্যি বলি?

-বল।

-না, মনে পড়ছে না।

-এবার বলি একটা কথা, কাউকে বলবি না, কথা দে।

-না, কী কথা?

-ফাইনাল পরীক্ষার আগে, হঠাৎ মাথায় কী চাপলো তোকে প্রপোজ করে বসে ছিলাম।

-তাই?

-হুঁ, সাথে সাথে না বলে দিলি।

-ধুর, তুই গুলিয়ে ফেলছিস, আমি না, অন্য কেউ, এসব হলে আমার মনে থাকবে না।

-সেই, হাঁটুর কাছে কাটা দাগ টা আছে এখনও?

এবার কৌশাণি আর মাথায় জোর দিলো না, মনে পড়ছে না তো পড়ছে না, নতুন করেই না হয় আলাপ হোক। আর ছেলেটা বেশ স্মার্ট, কথা বার্তা বেশ বুদ্ধিদীপ্ত, হাসিটা খুব মিষ্টি, সাথে বারবার চশমা ঠিক করে ওটাও বেশ ভালো লাগে কৌশাণির। ছেলেটা সেলস ম্যানেজার হিসেবে ঢুকেছে এখানে, ইস্টার্ন রিজিয়ন আর কলকাতা দেখছে, বিয়ে করেনি।

অফিস থেকে বেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে যাবে ট্যাক্সি ধরতে, আজকে ড্রাইভার ছুটি নিয়েছে বলে আর গাড়ি করে আসেনি ও। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো একটা গাড়ি, কাঁচ নামলো, ভেতরে বসে রাতুল।

-হেঁটে যাবি?

-না না, ট্যাক্সি নেব।

-নাটক করিস না, উঠে আয়, ছেড়ে দিচ্ছি,আয়, আরে আয়।

গাড়িতে উঠে বসে সিট বেল্ট টা লাগিয়ে নিলো কৌশাণি, গাড়িটা স্টার্ট করলো রাতুল।

-এই ছবিটা দেখ, ভালো করে দেখ।

অনেকক্ষণ হাতে নিয়ে দেখে কৌশাণি বলে উঠলো,

-তুই, ট্যাবলেট?

-শালা এতদিন ধরে চেষ্টা করিয়েও বোঝাতে পারলাম না, এবার চিনলি ফাইনালি।

-উফফ, বলবি তো, সেই ট্যাবলেট এখন এরকম স্মার্ট, এরকম হ্যান্ড..

-কী কী? বল আরেকবার, শুনি?

– প্রপোজ করেছিলিস আমায়, মনে পড়েছে, কি বলেছিলাম?

-ইসস যাতা অপমান করেছিলিস, ভুলবো না।

-সরি, আসলে বুঝিনি..

-বুঝলেও লাভ হতো না ম্যাম, মাইনে তোর থেকে ২৭০০০ টাকা কম পাই।

-তো?

-শালা সারাদিন তারপরে খোঁটা শুনতে হতো, শোনো যতই ঐ ছেলে মেয়ে এক ওসব কপচাও না কেনো, দিনের শেষে বরের কম ইনকাম মানে..

-বউ কথা শোনাবে? সবাই একরকম হয় নাকি রে?

-ছাড়, বর ডাক্তার বলতে ভালো লাগে একটা আলাদা গর্ব হয়, কি রে বল? হয় না?

-সেই ছাড় কফি খাবো, মাথা ধরেছে খুব।

দুজনে মিলে একটা ক্যাফে তে ঢোকে, নাম “ফিলিস”, কৌশাণি রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলে,

-কী খাবি?

-ব্ল্যাক কফি, উইদাউট সুগার।

-ইয়াক, এটা কেউ খায় নাকি? এটার থেকে জল খা, ইসসস।

-লাইফে কড়া জিনিস সবসময় অনেক কিছু শিখিয়ে দেয় আর রক্তে বেশি মিষ্টি গেলে মুস্কিল, বাবার সুগার ছিলো ক্লাস ১০ এ যখন উঠলাম ছেড়ে হুশ করে সোজা বৃন্দাবন পালালো।

-ও হ্যাঁ, তুই ক্লাস টেনে আর আসতিস না ঠিক বলেছিস, প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম, ট্যাবলেটের নিশ্চয়ই খারাপ লেগেছে, তাই..

-না রে বাবা নেই, মা কে নিয়ে কলকাতা এলাম কাকুর বাড়ি, ওখান থেকেই…. ছাড় নে খা।

সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষন ধরে শুয়ে শুয়ে ভেবেছে স্কুলের কথা, ট্যাবলেট ভাবলেও হাসি পায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খালি প্রেমের কবিতা লিখে শোনাত, ওরকম অগোছালো চুল, চশমা, তার ওপরে আঁতলামী সহ্যই হতো না, আর আজকে সেই ছেলে কত ভদ্র, কত সুন্দর কথা বলে, চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, শার্টের পিছনের মনটা বড্ড পরিষ্কার একটুও নোংরা না। আবার সুমেধা কে ফোন করে কৌশাণি,

-ট্যাবলেট কে মনে পড়ছে?

-কে রাহুল?

-রাহুল না রাতুল ছিলো নাম, তুইও ভুলে মেরে দিয়েছিস।

-হ্যাঁ তাই হবে, রবীন্দ্রনাথ তো? উফফ বাবা সেই কবিতা নিয়ে আসতো, বিরক্তিকর।

-চুপ কর, ভালো লিখতো, তখন বুঝিনি, কজন ওরকম প্রেমিক হয় বলতো? এখনও বিয়ে করেনি, তাকালেই বুঝি এখনও..

-এ বাওয়া, ডাক্তার কাকু আর ক্রস দেওয়া গাড়ির কি হবে? আচ্ছা তোর বরের ৫০ হতে আর কত মাস বাকি?

-তোর বরের ৬৯ হতে যতদিন, ঠিক ততদিন।

ধীরে ধীরে কৌশাণি সবসময়ই সাথে থাকতে চায় যেন রাতুলের, ইচ্ছে করে “ড্রাইভার আসেনি,”এই বাহানা করে বাড়ি ফেরে রাতুলের সাথে, সেদিন রাতুল হঠাৎ ঐ কথাটা বলবে কৌশাণি স্বপ্নেও ভাবেনি,

-মারা গেলো?

-কী?

-আমার মারা গেলো?

-কী হয়েছে?

-বিশ্বামিত্র থাকা আর হলো না, মা খুব জোর করছে হঠাৎ করে কেনো বুঝতেই পারছি না, বিয়েটা করতেই হবে রে।

-বাঃ, ভালো তো, সুখী হয়ে জীবন কাটাও বৎস।

-হুঁ, কাকে চাইতাম আর কি করতে হচ্ছে, যাই হোক ভালো পড়াশোনা করলে ডাক্তার হলে তাও একটা কথা ছিলো, কিন্তু..

-ঠুকছিস তো? খুব ভালো লাগে না কথা শোনাতে?

-না না মজা করছি।

-করিস না, মজা পাচ্ছি না একটুও।

-যাঃ, বাবা রেগে গেলি কেনো?

-রাগবো কেন?

-তাহলে এভাবে কথা বলছিস?

-এভাবেই বলি।

-মৌ সরি কৌশাণি সব লেখা থাকে জানিস তো, জন্ম, বিয়ে..

-জ্ঞান দিস না, এরকম বোকা বোকা কথা বলতিস বলেই লোকে ট্যাবলেট বলতো।

-হুঁ বুঝলাম।

সেদিনকে খুব মনটা খারাপ হয়ে যায় কৌশাণির, কিন্তু কেন? বিবাহিত একটি মেয়ে, বাচ্চা আছে তার এখন ওরকম স্কুল, কলেজের মেয়েদের মতন..

পরেরদিন থেকে রাতুল আর অফিসে আসছে না, কোনো মেল পাঠায়নি, কোন ফোন করেনি। রাতুল আবার অফিস এলো সপ্তাহ খানেক বাদে, উস্কো খুস্কো চুল, একগাল দাড়ি,মুখের সেই মিস্টত্ব টাই নেই, এসেই বললো,

-মৌ সরি কৌশাণি তিন মাসের স্যালারি এডভান্স পাওয়া যাবে?

-মানে? কী হয়েছে?

-খুব দরকার, মাসে মাসে টাকা মাইনে থেকে কেটে নিলে..

-কী হয়েছে বলবি?

-মাস তিনেক আগের ঘটনা, মা মাসির বাড়ি গেছে ঘুরতে, শিলিগুড়ি। থাকার কথা ছিলো দিন সাতেক, তিন দিনের মধ্যেই ফিরে এলো, এসেই দেখলাম আমার বিয়ে নিয়ে জোর করা শুরু করলো, আগেও করতো কিন্তু এরকম না, এবার যেন একটু বেশিই…
আগের মাসে অফিস থেকে ফিরে দরজা নক করছি কেউ খুলছে না। অনেকক্ষণ বাদে গাড়ির থেকে ডুপ্লিকেট চাবি টা নিয়ে এসে দরজা খুলে দেখি রান্নাঘরের সামনে পরে আছে, চোখে মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরলো, কথা না বাড়িয়ে নিয়ে গেলাম এপোলো হাসপাতালে, ওরা কয়েকটা টেস্ট করে এম আর আই করালো রেফার করলো “টাটা ক্যানসার হাসপাতালে”, ওখানে সবকিছু আবার করে দেখে আরেকটা এম আর আই করে ওরাও কনফার্মড করলো যে এটা ব্রেন টিউমার, তারপরে সপ্তাহ খানেক বাদে জানালো……

অপারেট করতে চাইলো না ওঁরা, বললো রিস্ক আছে, আপনি পারলে “ম্যাক আর্থার ক্যানসার সার্ভিস, সিডনি” নিয়ে যান।

-তা নিয়ে যা, দেরি করছিস কেন?

-মেল করেছিলাম কথা বলেছি, খরচা ৪৫ লাখ। আমার স্যালারিতে ২০ লাখের বেশি লোন হচ্ছে না, ফ্ল্যাটের লিফ্ট নেই চার তলায় থাকি বিক্রি যে করবো কেউ নেবেও না,নিলেও যা দাম পাবো..

-এডভান্স স্যালারি তে কিছুই হবে না, তোর তো..

-জানি,গাড়ি বেচে দিয়েছি আর এই টাকাটা পেলে তাও ফ্লাইটের টিকিট ভিসা এগুলো করে নিতাম আর একটা মর্গেজ লোন নিয়ে…

-কত লাগবে তোর?

-প্রায় সব মিলিয়ে ৫০।

-আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

-পাগল হলি নাকি রে? মা বাচঁবেও না হয়তো, মাঝে মাঝে ভাবি ইউথেনেশিয়া যদি সত্যিই লিগাল হতো দেশটায়…

-পাগলামি করিস না, আমার সাথে চল, দরকার আছে।

কৌশাণি ড্রাইভার কে ফোন করে, গাড়ি করে নিয়ে যায় রাতুল কে নিউ আলিপুরের একটা ইউনিসেক্স সেলুনে, সেখানে রাতুলের চুল দাড়ি কাটায় জোর করে, আসলে ওভাবে রাতুলকে দেখতে পারছিলো না ও। তারপরে নিয়ে যায় নিজের বাড়ি, ঘরে ঢুকে রাতুলকে নিয়ে যায় সোজা বেডরুমে, দরজাটা বন্ধ করে দেয়, দিয়ে আলমারি খুলে বার করে চেক বুক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এর জয়েন্ট এন আর ও একাউন্ট, সেখান থেকে লিখে দেয় রাতুলকে ৬৫ লাখ টাকার একটা চেক। রাতুল কৌশাণির পায়ে পরে কেঁদে দেয়,

-পারবো না নিতে, মৌ, প্লিজ ক্ষমা কর আমাকে।

-ওঠ, কেন এরকম করছিস?

-না, তুই কেন দিবি?

– আজকে যদি তোকে হ্যাঁ বলে দিতাম ক্লাস নাইনের সেই ছেলেটাকে বা ধর আমার ক্ষমতা থাকতো না আমার সাথে এরকম কিছু হলে তখন? তুই করতিস না? বল? তোকে দেখার পর থেকে জানিস রাতুল, খুব মন খারাপ হতো, মনে হতো একটা সত্যি কারের মানুষ একটা প্রেমিক কে আমি হয়তো নিজের অজান্তেই অবহেলা করে হারিয়েছি, আজ সব আছে আমার, আমার বর আমাকে সব দিয়েছে যত্নে রাখে, তাও আমি সুখী নই, খুঁজে বেড়াই কিছু একটা, হয়তো তোকে খুঁজি, মনে হয় কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে এই জীবনটাতে। কি রে কাঁদিস না রাতুল।

রাতুলের গালে হাত দিয়ে কৌশাণি আরও কিছুটা এগিয়ে আসে রাতুলের দিকে, দুজনের ঠোঁটের মাঝে একটু খানি দূরত্ব, ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়তে থাকে দুজনেরই, রাতুল মুখ সরিয়ে নেয়।

-এটা ঠিক না মৌ, তুই বিবাহিত, একটা বাচ্চার মা, আমি তোর পাস্ট, এটা..

-ও বিবাহিত বলে ভালোবাসার অধিকার নেই, নিঃশ্বাস নেওয়া আর বেঁচে থাকার মধ্যে পার্থক্য আছে এটা বুঝিস, অফিসের কৌশাণি একটা মেশিন রে, রোবট, নিজের জগৎ বলে ওর কিচ্ছু নেই, থাকবি আমার সাথে, কেউ জানবে না, খুব আড়ালে যত্নে রাখবো, কি রে থাকবি?

-মা, মা বাঁচবে না রে মৌ, চোখের সামনে দেখবো মা শুয়ে আছে সাদা চাদর জড়িয়ে, আমায় বাবাই বলে ডাকবে না, লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার পরে গন্ধ পেলে কেউ আর বকবে না, বলবে না খাস না ক্যানসার হবে, ক্যানসার সব শেষ করে দেয় বল?

-তুই যা, মা কে নিয়ে যা রাতুল, দেরি করিস না, আমি থাকবো তোর অপেক্ষায়, আমায় একটু জায়গা দিস তোর মনে ঐ ক্লাস নাইনের মতন একটা কবিতা লিখে শোনাস, একটা, কি রে?

-মা কে বাঁচিয়ে যদি আনতে পারি মৌ, আবার পুরোনো রাতুল হওয়ার চেষ্টা করবো, আবার তোরা ইয়ার্কি করবি দেখিস আমার প্রেম নিয়ে, আবার আমায় ডাকবি রবীন্দ্রনাথ বলে, থাকবো তোর সাথে, কিন্তু তোর বর টা খুব ভালো, সৎ লোক, ওঁকে কোনোদিন ছাড়িস না কেমন?

কেটে গেলো মাস খানেক, এতদিন রাতুলের কোনো খবর পাওয়া যায়নি, হঠাৎ ফেসবুকে একটা নিউ মেসেজ রিকোয়েস্ট, লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইজ ওয়েভিং এট ইউ। দেখে হেসে ফেলে কৌশাণি, বোঝে ফেক প্রোফাইল তাও একসেপ্ট করে, সাথে সাথে একটা মেসেজ ঢোকে,

-ও মৌ তুমি জানো না কি মাঝ রাতে, একঘেয়ে এই বিছানাতে, আজ কথা বলি কার সাথে? ভাবলাম রাতে না হোক দিনে তো কথা বলি, কেমন আছিস মৌ? ডাক্তার বাবু কেমন?

-মজা করছিস? রাতুল তো? আমায় বোকা বানানো এত সোজা? রবীন্দ্রনাথ দেখেই বুঝেছিলাম যে এ আমার…

-ট্যাবলেট?

-না এখন আর নেই, ট্যাবলেট..

-হুঁ, ট্যাবলেট এখন আর নেই, ঠিক বলেছিস, ক্লাস টেনে ঘরে ঝুলে যাওয়া ওর বডি পাওয়া গেছিলো, আমি সামনে থেকে দেখেছিলাম, ভাই ছিলো তো আমার।

-মানে?

-ফ্ল্যাশব্যাক, চল হুশ করে যাই তোকে নিয়ে দেখে নে, চট করে।

অমূল্য মুখার্জী আর শিখা মুখার্জীর দুই ছেলে, বড় ছেলে রাতুল মুখার্জী আর ছোটো ছেলে রাহুল মুখার্জী। রাতুল বরাবরই খুব মেধাবী আর হ্যাঁ শুধু পড়াশোনা নয় খেলাধুলা এমন কি কারুর কোনো অসুবিধা মানে প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়বে এই ছেলে, আর তিন বছরের ছোট ভাইটা ঠিক উল্টো, জন্ম থেকে অনেক রোগ আঁকড়ে ধরে ভাই টাকে, পড়া মনে রাখতে পারেনা, চোখে চশমা পাওয়ার মাইনাস নাইন, কথা বলতে গেলে আটকে যেতো, আমার সাথেও লজ্জা পেত কথা বলতে, আমি কতবার জিজ্ঞেস করেছি, “খেলতে যাবি?” উত্তর “না।”
“সিনেমা দেখতে যাবি?” উত্তর “না।”

ক্লাস টেন রাহুলের আর রাতুল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে,হঠাৎ একটা ফোন আসে রাতুলের কাছে,

-দাদা, আমি রাহুল।

-বল, কী হয়েছে?

-হেরে গেলে কী করিস দাদা?

-হারলেই তো ভালো রে বোকা, তাহলেই তো জেতার মজা পাবি।

-বারবার হারলে অভ্যাস হয়ে যায় না হারার?

-কী হয়েছে?

-আবার হেরে গেলাম জানিস দাদা,এবার, হাঁপিয়ে গেছি।

-কী হয়েছে রাহুল? বল আমাকে?

-কেউ বুঝবে না দাদা, ঠাকুরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবো, আমি, খালি আমিই কি এরকম দূর্বল কিছু পারলাম না, তোর মতন হতে চাইতাম রে দাদা, কিন্তু এবার মনে হয় না থাক, যাই, আবার ফিরবো, তোর মতন হয়ে, বাবা মা গর্ব করবে, পাড়ায় সবাই একডাকে চিনবে, কবিতার বই বেরোবে, আবার যখন ওঁর হাতটা ধরবো ও হেসে বলবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে সবচেয়ে প্রিয় কবি তুই আমার জানিস?

-আমি আসছি, দাঁড়া।

-দেরি হয়ে গেছে দাদা, মিস করবো তোদের খুব, ভুল বুঝিস না, নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, খুব। একটু ঘুমাই।

-রাহুল আসছি আমি, ফোন ধরে থাক, সব ঠিক করে দেবো, একটু সময় দে আমায় বাবু, একটু, কিচ্ছু হবে না, দেখিস।

-রাখলাম দাদা, মা বাবাকে দেখিস, তোর অকেজো ভাই কিছুই পারলো না, না ভালো ছেলে হতে, না ভালো ভাই হতে না ভালো কবি হতে, আসলাম।

ঘরে যখন রাতুল ঢুকলো, রাহুলের রুমটা বন্ধ ভেতর থেকে, এক ধাক্কায় খুলতেই, সামনে দেখলো দুটো পা ঝুলছে, রাহুলের ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ আর জিভ টার দিকে তাকিয়ে থাকলো একভাবে রাতুল।
ওরকম করে দরজা খুলে ঢোকাতে মা ও পিছনে পিছনে এসেছিলো, রাতুল ঘুরে কী দেখলো জানিস? পিছনের চেয়ারটায় মা বসে আছে চুপ করে, ছুটে মায়ের কাছে গিয়ে মাকে ধরতে গিয়ে দেখে নিজের দূর্বল ছেলেটার এই আত্মহত্যা মেনে নিতে পারেনি মহিলাটা, ছেলের হাতটা ধরতে নিজেও ছুটলো ছেলের পিছনে ঘুমের দেশে।

দুটো দেহ একসাথে বাবা ছেলে মিলে নিয়ে গেলাম, একসাথে ইলেক্ট্রিক চুল্লী তে জ্বললো ছেলে আর মা, বাবা আর বড় ছেলে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলো সেটা চুপ করে।

সংসারটা পুরো তাসের ঘরের মতন ভেঙে গেলো। রাহুলের রুমে গিয়ে বসে থাকতাম, হঠাৎ একদিন ওঁর পড়ার টেবিলে একটা ডায়েরি পেলাম,

[ “সিক্ত সোহাগ রিক্ত হাতে,
ফিরিয়ে দিলো নিঝুম রাতে।
ছুঁয়ে তোমার ঘুমের শরীর,
হারিয়েছি পথ অলিগলির।
হাত বাড়িয়ে আজও আছি,
তিস্তা নদীর কাছাকাছি।”]

রাহুল কবিতা লিখতো, কথা ভালো করে বলতে পারতোনা তাই রোজ ডায়েরি তে লিখে রাখতো নিজের কথা।

“আজ দেখলাম কৌশাণিকে, স্যার বলাতে গান গাইলো, ডাকনাম মৌ, আমিও গিয়ে অটোগ্রাফ চাইলাম, হেসেছিলো শুনে। কী মিষ্টি হাসি মৌয়ের। আমাকেও পছন্দ করে মনে হয়, না হলে হাসলো কেনো?”

“অযাচিত সম্মানিত,পুরস্কৃত মন,
যোগ বিয়োগের বৃষ্টি ভিজে কার্নিশে নির্জন।”

“ওর সাথে কথা বলতে গেলে দেখেছি কথা আটকায় না, কিন্তু বাকি বন্ধুগুলো খুব ইয়ার্কি মারে আমাকে নিয়ে, মজা ওড়ায়, ট্যাবলেট বলে এত মোটা চশমার জন্যে, আচ্ছা ও পছন্দ করে তো?”

“সত্যি কথা,ঝরা পাতা,
কুড়োচ্ছি রোদ্দুরে,
বোঝাচ্ছি মন, শেষ কথা শোন,
ডুবছি সমুদ্দুরে।”

“হ্যাঁ বলবে? হ্যাঁ বলবে তো? নিশ্চয়ই বলবে, নাহলে আমার হাত ধরতো কেনো? কেনো বলতো, “তুই আমার রবীন্দ্রনাথ”, কেন?”]

জানিস মৌ সরি কৌশাণি, এসবের পরে বহুদিন ও লেখেনি,

এরপরে লাস্ট লিখেছে যেদিন সুইসাইড করে সেদিন,

[মৌ তুই একদম ভালো না, আমি তো ভালোবেসেছিলাম, এরকম না করলেও পারতিস, না বলে দিতিস, চলে যেতাম, খালি না বলে দিতিস, ব্যস। দরকার ছিলো না আমাকে নিয়ে মজা করার, ছোট থেকে অপমানিত হয়ে আসছি, শেষে কি না তুইও?”]

কিন্তু ও সুইসাইড করলো কেন? তখনও জানিনা,অনেক খোঁজ নিয়ে সোহিনী বলে একটি মেয়ের সাথে আলাপ হলো, একই কোচিং এ ছিলো রাহুলের সাথে, ওর থেকে সব শুনলাম, যে রাহুল তোকে প্রপোজ করে, তুই হ্যাঁ বলে ছিলিস ওঁকে, কি তাইতো?

-না আসলে?

-চুপ, চুপ করে শোন, পরে কথা বলিস। ওঁকে তোদের স্কুলে নিয়ে যাস ইচ্ছে করে সরস্বতী পুজোর দিন, যাতে স্কুলের সব বন্ধুরা মিলে ওঁকে হ্যারাস করতে পারিস, তোর বয়ফ্রেন্ড নীল আর ওর সাঙ্গপাঙ্গরা, সবাই মিলে ওঁকে শাড়ি পরিয়ে সারা স্কুলে ঘোরায়, পায়ে ধরিয়ে ক্ষমা চাওয়ায় তোর থেকে, কি তাইতো?

-বিশ্বাস কর, তখন বাচ্চা আমি নিজেও, বুঝিনি..

-আসছি সেটাতেও পরে আসছি, খালি বল ও তোকে সত্যিই খুব ডিসটার্ব করতো? কোনোদিন সাহস করে কিছু হয়তো বলতো না, সুমেধা ওর ডায়েরি টা পেয়ে তোকে দেয়, তুই নিজে গিয়ে ইচ্ছে করে ওঁর সাথে ওরকম করলি? শুধু মজা? তাৎক্ষণিক আনন্দ? একটা দূর্বল ছেলে, কথাও ঠিক করে বলতে পারেনা, তাকে নিয়ে? ভালোবেসে কবিতা গুলো লিখতো তোকে নিয়ে, তাঁর সেগুলো নিয়ে এরকম ভাবে মজা করলি?

-শোন একবার।

-দাঁড়া, শেষ করি। বাবাকে গিয়ে বললাম, শুনে বাবা বললো, “কিচ্ছু করিস না রাতুল, রাগ টা আটকাতে শেখ, যা কিছু করে নে, রাহুল তো ফিরবে না আর, আর যদি কেউ অন্যায় করে থাকে তার শাস্তি ভগবান ঠিক দেবে। ”

ভগবান! ভগবানের বিজি শিডিউলে শাস্তি সবাইকে দিতে পারেনা, সেটা বুঝলাম বছর পাঁচেক বাদে। তোর সাথে রাহুলের একটা গ্রূপ ফটো ছিলো, রাস্তাঘাটে, শপিং মলে অনেকবার দেখেওছি তোকে, খুব রাগ হতো তবু কিছু বলিনি,কিছু করিনি। চাকরি পেলাম একটা হোটেলে সেলস ম্যানেজার হিসেবে, পাঁচতারা হোটেল, লবি তে দাঁড়িয়ে তরুণ নাগ বলে একটি ছেলের সাথে গল্প করছি, দেখলাম তুই আর তোর হাজবেন্ড হোটেলে ঢুকছিস, বেশ হ্যান্ডসাম তোর বর, বেশ শার্প চেহারা, অবাক লাগলো কি জানিস, দিন দুয়েক পরে সেই লোকটাকে দেখলাম আরেকটি মহিলার সাথে ঢুকছে হোটেলে, বুঝলাম তোর সাথেও একই ঘটনা ঘটলো, প্রেমে তুইও প্রতারনাই পেলি। তোর বর লোক হিসেবে ভালো নয়।

এবার গল্পে টুইস্ট, বাবার শরীর খারাপ, ডাক্তার দেখাতে গেলাম, ডঃ অমলেশ ব্যানার্জী, জেনারেল ফিজিশিয়ন, চেম্বারে ঢুকলাম, হঠাৎ পিছনে তুই এসেই বললি ডঃ ব্যানার্জী কে,

(-ক্রেডিট কার্ড টা দাও? এটা কাজ করছে না?

-ও সরি, এই নাও,ক্যাশ লাগবে?

-কার্ডটা দাও।)

এবার লক্ষ্য করলাম, ডঃ ব্যানার্জীর টেবিলে তোর আর ওঁর একটা ছবি। তার মানে লোককে বোকা মানে তোকে যাঁরা ভালোবাসে তাদেরকে বোকা তো এখনও বানিয়ে যাচ্ছিস।
বেরিয়ে বাবাকে বললাম, “বুঝলে, মনে হচ্ছে শরীরে ভগবান ভর করেছে, একজন কে শাস্তি না দিলেই নয়, তোমার কথা এতদিন ধরে শুনে রইলাম এবার একটু বোঝানো উচিৎ ভালো লোকগুলোর জন্যে ভগবান ঠিক শোনে, একটু দেরি হলেও শোনে।”

-মানে?

-মানে, এবার এই ভিডিও ফাইল টা খোল, এটা একটা এম এম এস, তোর আর সেই যাকে তোর বর ভেবেছিলাম, তার। কিন্তু খালি এম এম এস করে তোকে ফাঁসিয়ে লাভ হতো না, ভয় পেতিস মন ভাঙতো না, যদিও তোর মন নিয়ে সংশয় আছে এখনও, তাও মন ভাঙাটা জরুরি ছিলো, কিন্তু কি করে?

-রাহুল সেজে, আমাকে সেই স্কুলের মেয়েটা বানিয়ে দিয়ে, নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়ে..

-ব্রিলিয়ান্ট, তোর অফিস ১৩থ ফ্লোরে, জানলা খুললে পুরো কলকাতা দেখা যায়, আবার জানলা খুলে চাইলে তুই নিচেও নেমে আসতে পারিস, খুব সোজা এইসব সিচুয়েশনে এগুলো করা, আর নীচে নামতে তোর মতন কেউ পারেনা। ও হ্যাঁ আর দুটো কথা, তোর ভালো লিগাল বর তোর জন্যে ওঁর এন আর ও একাউন্টে টাকা জমাতো, রাজারহাটের নতুন ফ্ল্যাট টা বিক্রি করে সেই টাকাটাও ওখানে রাখলো, তুই হোটেলে হোটেলে গিয়ে গিয়ে লাগিয়ে টাকা নষ্ট করতিস তাই সেই টাকাটা নিয়ে একটা চ্যারিটি ফান্ডে দিলাম, যারা কথা বলতে বা শুনতে কিছুই পারেনা।

ভাবলাম তোর মেয়ে রিনির কথাও, কি হবে ওর তুই মরলে? এখানেও একটা ছোট্ট জিনিস, ডঃ বাবুকে তোর বেস্ট ফ্রেন্ড সুমেধা খুব ভালোবাসে এমনকি তোর মেয়েকেও খুব ভালোবাসে, নিজের বাচ্চা কাচ্চা নেই তো তাই।তাই এম এম এস টা আর ওঁকে পাঠাইনি, এসব দেখে ভাইকে বললাম মনে মনে, “যে ভাই খুব ভালো করেছিস, ভাগ্যিস এসব সম্পর্কে জড়াসনি, যেগুলো নামেই সম্পর্ক, ভেতরে খোকলা,” আর সাথে বুঝলাম বাবা ঠিকই বলতো শাস্তি ঠিক দেয় কেউ না কেউ, কর্মা বলেও তো একটা ব্যাপার হয় তো?” ভাইয়ের শেষ কবিতাটা শুনিয়ে রাখি, কাজে লাগবে তোরও,

“ভালোবাসা তোকে দিলাম ছুটি, বৃষ্টি ভিজবো বলে,

দলছুট আজ বুকের ভাষারা কাগজে কলমে জ্বলে

তবুও কোনো কিনারা হয়তো, দুপুরের রোদে পুড়ে,

নৌকাডুবির বিকেল ভুলবে, ডাস্টবিনে মন ছুঁড়ে।”

চল আস্তালাভিস্তা বেবি, বেঁচে থাক বা চাইলে….

পরেরদিন সারা পেপার জুড়ে খবর একটা সুইসাইডের, এক মহিলা সুইসাইড করেছেন, যদিও সুইসাইড নোটে লেখা, “কেউ দায়ী নয়।”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত