অবৈধ

অবৈধ

অবৈধ

আর লুকোচুরির কোন প্রয়োজন নেই দীর্ঘ দিনের টানাপোড়েনের পর আমি আজ সত্যিটা অরুনার সামনে কনফেশ করেছি। অরুনা আমার সোকল্ড ওয়াইফ,ওর সাথে আমার বিয়েটা বাড়ির চাপে। বাবা তার  বন্ধু বিভূতি বাবুর কাছে  কমিটেড ছিলেন তাই বলির পাঁঠা আমাকেই হতে হয়েছিল ,নইলে বাবা যদি বেঁকে বসে..আসলে  এই বিশাল প্রপার্টি হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে এই বরমাল্য গ্রহণ। আমার বাবা একটু একগুঁয়ে ও গুরু গম্ভীর টাইপের লোক, ওনার মুখের ওপর কথা বলার দুঃসাহস আমাদের কখনো হয়নি। কিন্তু বাবার এই অবিবেচকের মতো কাজ টা.. হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন ,ভাবছেন তো কি বেয়াদব ছেলে বাবা কে অবিবেচক বলছে..আসলে আমার পরিস্থিতি আমায় বাধ্য করছে।

আমি বরাবরই স্কুলে বেশ ভালো রেজাল্ট করতাম তাই  স্কুল ফাইনালের পর আমি কলকাতায় চলে আসি। এক নামি কলেজে চান্সও পেয়ে যায়। শহুরে আদব-কায়দা আয়ত্ত করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। কলেজ হোস্টেলে থাকার সময় আমার বিজয়ের সাথে বন্ধুত্বটা মাই ডিয়ার হয়ে ওঠে , যদিও ও হোস্টেলে থাকত না। একবার ছুটিতে ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম,ওই বাগবাজারের দিকে । ওরা বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের,সবার ফ্রাঙ্কলি বিহেভিয়ার আমায় ভীষন আকৃষ্ট করে । তারপর থেকে মাঝেমধ্যে ওদের বাড়ি যেতাম আর আন্টির হাতের ফিস কাটলেট উফ্ ভোলার নয়, আবার কখনো পোলাও কালিয়াও খেয়ে আসতাম।

আমাদের বাড়ি ছিল গ্রামে,নাম রূপনারায়নপুর, মুর্শিদাবাদ জেলায়..ওখানে আমার বাবা জগৎবন্ধু মল্লিক কে সবাই এক ডাকে চেনে,ওই অঞ্চলে আমরা একটু বেশি প্রভাবশালী অন্যদের তুলনায়। জমি, পুকুর চাকর ঝি কোন কিছুর অভাব ছিল না। আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি ,আমার বাবা-কাকারা একসাথেই থাকতেন সবাই ওই পৈত্রিক ব্যবসা ও সম্পত্তি সামলাতেন। অভাব যে কি জিনিস তা আমি কখনই বুঝিনি । না পাওয়ার যন্ত্রনা যে কেমন হয় এখন সেটা খুব বিভৎস ভাবে  বুঝতে শিখেছি।

সেদিন বিকেলে বিজয়ের বাড়িতে নতুন একজনের দেখা পেলাম। আমি যখন তাকে দেখলাম তখন সে ড্রয়িং রুমের সোফায় গানের এক জমাটি আড্ডায় বাড়ির সবার সাথে মেতে রয়েছে। বিজয় ওর সাথে আমার আলাপ করিয়ে দেয়, ও নন্দিতা বিজয়ের মাসতুতো বোন, যাদবপুরে থাকে। ছিপছিপে চেহারার মেয়েটির  নীল সলোয়ারের মধ্যে থেকে  যৌবন যেন ঠিকরে বেরোচ্ছিল। মেয়েটির সাজগোজে ফ্যাসানের চমক, বাদামী চুলের মাঝে ওর আঙুলের খেলা..আর কি সুন্দর গানের গলা। ওর ক্যাজুয়ালি কথাবার্তা ওর সমস্তটাই যেন আমার ওপর একটু ডিপলি এফেক্ট করেছিল। আমি তখন ফাইনাল ইয়ার আর ও সদ্য কলেজে ঢুকেছে। ওই দিন রাতে হোস্টেলে এসেও ওর চোখ ওর ঠোঁট ওর আঙুলের ইশারা ওর হাসি আমাকে ওর প্রতি দুর্বল করে তুলছিল।

আমি অরুনার দিকে একবার আড় চোখে  চেয়ে দেখলাম ও টেবিলে পড়ে থাকা এঁটো কুড়োচ্ছে ,  প্রতিদিন আমার খাওয়ার পরে ও খেতে বসে। কি খায় কতটা খায় বা কি ভাবেই বা খায় কখনো দেখা হয়ে ওঠেনি। বিয়ের পর প্রথম রাতেই সবটা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলা আর হল কোথায়,তারপরেই আমি কলকাতা চলে এলাম মা সাথে ওকেও গোছিয়ে দিল। আমাদের পাশের গ্রামে ও থাকতো, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। ঘরের প্রতিটা কাজ সে খুবই যত্ন নিয়ে করে । সারাদিন বাড়িতে থাকে, কি যে করে আই ডোন্ট নো..আর কোথায় বা ও যাবে কিই বা করবে,জানেতো না কিছুই। শুনেছিলাম পড়াশোনা জানে কিন্তু কতদূর জানে সেটা.. মনে পড়ছে না।

আমাদের  বিয়ের আড়াই  বছর হয়েছে এই আড়াই বছরে একবারের জন্যও ওকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়নি। অথচ নন্দিতা কে কতবার কতরকম ভাবেই ছুঁয়েছি ওর শত বাধাকে নিজের পৌরুষ শক্তি দিয়ে ভেঙে ছিঁড়ে তছনছ করেছি। ওর শরীরের গন্ধ  ওর ওই তৃষ্ণার্ত চোখের চাহনি আমায় মাতাল করেছে। আমি আজ সমস্ত টা অরুনার কাছে উজার করেছি মনে আর কোনো দ্বিধা নেই।  কিন্তু সেই সন্ধ্যের একটু আগে অরুনার সাথে কথা হয়েছিল, অথচ এখন রাত এগারোটা ওর মধ্যে কোন চেন্জ দেখলাম না। হাতের কাজটা সেরে ও  জলের গ্লাসটা আমার বেড সাইডে রেখে ও লাইট অফ করে পাশের রুমে চলে গেল।আমর এই দুই কামরার ফ্ল্যাটের পাশের রুমে ও থাকতো, আমিই বলেছিলাম থাকতে,সেই যেদিন প্রথম নিয়ে এলাম  সেইদিনই  ওর জায়গাটা ওকে দেখিয়ে দিয়েছিলাম।আমি ওর প্রয়োজন -পছন্দ -ভালোলাগার কোনো পরোয়ায় করিনি অথচ সে একটি বারের জন্যও‌ কোন প্রশ্ন করেনি এমনকি আজও সে একটি কথাও বলেনি শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছে।ও কি খুব বোকা ,না কি খুব লোভী.. হয়তো এই সুখ ছেড়ে যেতে ও ভয় পাচ্ছে??

যেদিন আমার বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়েছিল ওইদিন নন্দিতা ভীষণ ভাবে রিয়েক্ট করেছিল ,আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলতেও দুবার ভাবেনি , আমি ওকে আস্বস্ত করেছিলাম আমার বাবার ওই প্রপার্টির কথা বলে, ও.. হ্যাঁ ও তো এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল..নন্দিতাও তারমানে আমার মত লোভী…।না হতে পারে না,ও আমার ভালোবাসার মানুষ আর এই অরুনার জন্য আমি আজ আমার নন্দিতাকে ছোট করছি?? কি আছে এই অরুনার?? নন্দিতার নখের যোগ্যিও সে নয়,ওই তো চেহারার ছিরি..।একবার নিউমার্কেট গিয়েছিলাম ওকে নিয়ে..কি আর বলি.. দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের বাইরে,আমিও ওকে জোর করিনি। নন্দিতার সাথে বেরোলে সবাই একবার না একবার ঘুরে দেখতোই আহঃ রব নে বনা দি জোরি,আজও তাকাচ্ছিলো অনেকেই তবে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল তাই আর ওকে ভেতরে আসার কথা বললাম না। দোকান থেকে বেরিয়ে দেখি সোকেসে ঝোলানো একটা কমলা শাড়ির দিকে ও চেয়ে রয়েছে,আমি ওকে ফলো করেছি দেখে ও খুব লজ্জা পেয়েছিল।আমি বল্লাম কী ওই শাড়ি তোমার পছন্দ? ও ঘাবড়ে গিয়ে ঘাড় নেড়ে জানালো না,কিন্তু ওর যে পছন্দ তা আমি বুঝেছিলাম।ওই প্রথম আর ওই শেষ,আর কখনো কিছু দেওয়া হয় নি ওকে।

আজ যখন অফিস থেকে ফিরে ওকে সবটা জানালাম ও কি করে পারল সবটা শুনেও চুপ করে থাকতে? ওর জায়গায় আমি থাকলে সিরিয়াসলি বলছি জাস্ট মেনে নিতে পারতাম না,আমার ধারনা কোন মেয়ে পারবে না মেনে নিতে..তবে ও কী আমায় দয়া করছে না কী..কী ভাবে সে নিজেকে,..নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্বে মাতলাম।  আজ একবার পাশের ঘরে যেতে ইচ্ছে করল , কিন্তু এটা কি ঠিক! তবুও গেলাম দরজা আলতো ভেজানো ছিল..ঠেলা দিতেই খুলে গেল..ও কি ও মাটিতে শুয়ে কেন…ও ঘরে যে কোন বেড নেই..ঘরে তো কোন ফ্যানও নেই, ও থাকে কি ভাবে..তবে এতদিন ও এভাবেই….জোরে পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম..। কিচেনে গিয়ে দেখি ও খাবার খায়নি… সিগারেট ধরিয়ে বাইরে বেরোতে এসে দেখলাম ওর চটি জোড়াও ছিঁড়ে গেছে…আমার দু-চোখ ঝাপসা হয়ে এলো..এই সুখ ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছিলাম আমি! ছিঃ ছিঃ আমি এতটা নিষ্ঠুর এতটা হৃদয় হীন হলাম কীভাবে,যে মানুষ টা প্রতিদিন আমার জন্য রান্না করে,টিফিন গোছায়,আমার কাপড় কেচে পরিপাটি করে আমার জন্যে সাজিয়ে রাখে,যে আমার শত আঘাতেও রা কাটে না ,যে আমার জন্য খাবার আগলে বসে থাকে নিজে না খেয়ে,যে আমার বিছানা তৈরি করে নিজে মাটিতে শুয়ে থাকে তার প্রতি আমার এত অবহেলা.. ভালোবাসা না দিতে পারি একটু যত্ন একটু সম্মানও কি সে পাওয়ার যোগ্য নয়?কোন উওর নেই আমার প্রশ্নের।

জানি না কখন সকাল হয়েছে একটা কিছুর শব্দে ঘুম ভাঙলো, দেখি দরজায় অরুনা দাঁড়িয়ে হাতে ওর ওই পুরনো বাক্স খানা,যেটা ও সাথে করে নিয়ে এসেছিল। ও আমি কাল তো ওকে চলে যেতে বলেছি..। স্টেশনে যাওয়ার পথে আর কথা হয়নি আমাদের,ও আজ সেই কমলা শাড়িটা পরেছে,না ওকে তো মন্দ লাগছেনা ..ওর মধ্যেও সৌন্দর্য রয়েছে,আমি এতদিন খেয়াল করিনি..।আচ্ছা ও তো চলেই যাচ্ছে আর তো কোন বাধা রইলো না,কিন্তু কেন..কেন আমি খুশি হতে পারছি না.. কেন আমার গলার কাছটাই জমাট বাধা কষ্ট..তবে কি আমি ওকে….

স্টেশনে পৌঁছে দেখি খুবই ভীড় এত্ত মানুষের ঢল.. বোধহয় কোন মিটিং মিছিল বা সমাবেশ রয়েছে তাই সব হয়তো…। আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরলাম..কেন ওকে হারানোর ভয়ে?? জানি না.. তবুও ধরলাম..আমার বুকের বাঁপাশে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে..ও আমার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল..পারেনি..আমি পারতে দিইনি..ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে একটু বসলাম ওর পাশে.. –
-আচ্ছা অরুনা তুমি আমায় একবারও কিছু বললে না কেন? ঘেন্না করছে আমায়??
ও চমকে উঠলো..
-ছিঃ ছিঃ ..কি বলছেন আপনি..কেন গেন্না করবো আপনারে..?
-এই যে আমার অবৈধ সম্পর্কের জন্যে..।
অরুনা জানলার বাইরে প্লাটফর্মের দিকে তাকিয়ে ছিল
-শুনিছি আপনাদের সম্পর্ক‌ অনেক দিনের..আমাদের বিয়ের আগে তেকে..বিয়ে অয়নি বলে কি তা অবৈধ ওয়ে যাবে..। আপনাদের দুজনার মাজে আমি তিতীয়.. অবৈধ তো আমিই হলুম..তাই না!!
বিশ্বাস করুন একটা কথা বলতে পারনি আমি। ভেতরে-ভেতরে খুব কেঁদে ছিলাম । কতবড়ো ভুল করেছি সেটা ভেবে আফসোস করেছিলাম।যখন ট্রেন টা প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল আমার নিজেকে সর্বহারা মনে হচ্ছিল..ওই মেয়েটা আমায় সর্বস্ব উজার করে দিয়েও আমায় সর্বহারা করে চলেগেলে।

যখন  চোখ খুললাম,আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে , আমার মাথার কাছে বসে একজন খুব কাঁদছে যে মানুষ টা আমার ভালোবাসার মানুষ..আমার অরুনা… হ্যাঁ ওই দিন ফেরার পথে আমার কার অ্যাকসিডেন্ট হয়..জানি না কিভাবে ওর কাছে খবরটা পৌছেছিল…ও ছুটে এসেছিল ওর অবৈধ সম্পর্কের টানে…কোথাও সেদিন নন্দিতার দেখা পায়নি।

নন্দিতা আর কখনো আসেনি আমাদের মাঝে..।অরুনা কলেজে ভর্তি হয়েছে আর সংসারও সামলাচ্ছে একা হাতে..সত্যি ও কিছু জানতনা কারণ ও যা জানত ও যা পারতো তা অনেকেই হয়তো পারে না। আমি অরুনাকে না দেখলে না জানলে কখনো বুঝতাম না যে প্রতিটি মানুষ আলাদা একজনের মাঝে অপর জনকে খুঁজলে কখনো ভালো থাকা যায় না,ভালোবাসা যায় না।আমি খুব লাকি যে ওর মতো একজন মানুষ কে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে পেয়েছি। আমরা আমাদের এই অবৈধ সম্পর্কের মাঝেই পেয়াছি বেঁচে থাকার রসদ..আর এখানেই আমাদের সম্পূর্নতা আমাদের তৃপ্ততা।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত