আলো আঁধারে সংসার

আলো আঁধারে সংসার

মা’ আজকেও আপনার ছেলে এখনো বাড়ি ফিরে নি।রোজ রাত করে বাড়ি ফিরে।আর আমি কিছু বলতে গেলেই আমাকে উল্টো কথা শুনিয়ে দেয়।

বিরক্তিকর কণ্ঠে রিয়া তাঁর শ্বাশুড়িকে কথাগুলো বলছে।রিয়ার কথা শুনে পাশের চেয়ারে বসে থাকা রিয়ার শ্বাশুড়ি বললো….

:-মা তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।অনেক তো রাত হলো,আর কতক্ষণ রাত জেগে থাকবে।আর আবির এতো রাতে এসে কিছু খাবে বলে আমার মনে হয় না।তুমি যাও ঘুমিয়ে পড়ো।

:-নাহ্ মা আপনি যান ঘুমিয়ে পড়েন।
আপনার অসুস্থ্য শরির নিয়ে আর বসে থাকতে হবে না।আমি আরেকটু দেখি আসে কি না।

অতঃপর রিয়া খাবার টেবিলে বসে রইলো একা একা।প্রিয়জনের বাড়ি ফেরার অপেক্ষাতে।

“একেঅপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো।দীর্ঘ ৩ বছর রিলেশনের পর দুটি পরিবারের সম্মতিতে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো।
একবছর হলো আবির আর রিয়ার বিয়ে হয়েছে।
এর ভিতরে যে কতবার তাঁদের ঝগড়া হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই।
কিন্তু হাজার ঝগড়া লাগলেও কেও কাওকে ছেড়ে একটামুহূর্ত থাকতে পারে না।
রিয়া মুখে যতই শাসন করুক না কেন,মনে মনে আবিরকে সে অনেক ভালোবাসে।
কিন্তু আবিরের কিছু কিছু বেখেয়ালিপনা কাজকর্ম সে একদম সহ্য করতে পারে না।
তাই মাঝেমাঝে রাগ করে বসে।
কিন্তু রিয়া রাগ করলেও সেই রাগটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না।
আবির মিষ্টি কথার ফুলঝুরি দিয়ে নিমিষেই পাহাড় সমান রাগ দুর করে দেয়।

কথা গুলো ভাবতে ভাবতে
পিছনে থাকা দেওয়ালটিতে ঝুলন্ত ঘড়িটার দিকে তাকালো রিয়া।
ঘড়ির কাটাটা বারোটার ঘর ছেড়ে একটার ঘরে পৌঁছিয়ে গেছে।
কিন্তু এখনো তার বরের বাড়ি ফেরার নাম নেই।
এখন খুব রাগ হচ্ছে রিয়ার।
আরো তো মানুষ অফিসে যাই,কোই তাঁরা তো এতোরাত করে বাড়ি ফিরে না।
সন্ধ্যা ৭-৮টার ভিতরে সবাই বাড়ি চলে আসে।
তাহলে উনি আবার কি এমন কাজ করে যে রোজ ১০-১১ টা বাঁজে বাড়ি ফিরতে।
আর আজকে আবার কি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে এতো রাত হয়ে গেলো এখনো ফিরছে না।

পাশে থাকা মোবাইলটা তুলে নিয়ে আবিরকে কল দিলো।

নাহ্ ফোনটাও বন্ধ করে রেখে দিছে।
রাগের পরিমানটা হুড়হুড় করে বেড়ে চলেছে রিয়ার।
আজকে বাড়ি ফিরলেই হয়ছে অনেক করে বকা দিবে তাঁকে।

খাবার টেবিলে বসে ঘুমন্ত চোখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে রিয়া।
এমন সময় কানে ভেসে আসলো গাড়ির হর্ণবাজানোর আওয়াজ।

রিয়া তাড়াতাড়ি করে উঠে গিয়ে দরজা খুললো।
দেখলো বাইরে তাঁর স্বামী পড়ে আছে।
ভারসাম্যহীন অবস্থাতে।শরিরে জড়িয়ে থাকা সাদা শার্টটা লাল হয়ে গেছে।
কপাল থেকে গাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সাদা শার্টের উপরে।

এমন অবস্থা দেখে রিয়ার সব রাগ নিমিষেই হারিয়ে গিয়ে ভয়ের ছাপ নেমে আসলো।
একটা চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো…

:-আবির”কি হয়েছে তোমার…!
বলেই দৌড়ে গিয়ে পড়ে থাকা শরিরটাকে জড়িয়ে ধরলো।

আবিরের মুখ থেকে কোনো কথা বার হচ্ছে না।
শুধু হাতটা তুলে অদুরে জ্বলতে থাকা চলন্ত একটা গাড়ির ব্যাকলাইটটা দেখালো।

রিয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবিরকে জিজ্ঞাসা করলো…
:-তোমার শরিরে রক্ত কেন?

আবির কোনো কথা না বলে চোখ দুটি বুজে ফেললো।
রিয়া চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো।
রিয়ার চিৎকার শুনে আবিরের মা’সহ আরো কয়েকজন মানুষ বের হয়ে আসলো।
সবাই মিলে আবিরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।

আবিরের মা আর রিয়া দু’জনের মুখে বিষণ্ণতার ছাপ।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে,,,
কারণ ভিতরে ডা. আবিরের চিকিৎসা করছে।
পরিবারে পুরুষ বলতে একমাত্র আবির ছাড়া আর কেও নেই।

এদিকে আবিরের এমন দুর্বিষহ ঘটনা শুনে রিয়ার পরিবারের লোকজন হাসপাতালে এসে গেছে।
রিয়া তাঁর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
সবাই রিয়াকে শান্তনা দিচ্ছে।
“সব ঠিক হয়ে যাবে”

কিছুক্ষণ পর ভিতর থেকে ডা. বার হয়ে আসলো।
সবাই তাড়াতাড়ি করে ডা. এর কাছে গিয়ে দাড়ালো।

আবিরের শ্বশুর ডা. কে জিজ্ঞাসা করলো…
:-ডা. আমার জ্বামায় কেমন আছে এখন?

রিয়ার বাবার কথা শুনে ডা. থতমত খেয়ে জবাব দিলো..

:-দুঃখিত পেসেন্টের দুটো পা ড্যামেজ হয়ে গেছে।
সে আর কখনো হাঁটতে পারবে না।

ডা. এর মুখে এমন ভয়াবহ কথা শুনে সবাই হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
আবিরের মা হার্টস্ট্রোক করে মারা গেলো খবর টা শুনে।
আর রিয়া জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়লো।

এতো অল্প বয়সে আবিবের এমন অবস্থার কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেলো।

রিয়ার চোখে পানির ছোটা মারতেই রিয়ার জ্ঞান ফিরে আসলো।
জ্ঞান ফিরতেই রিয়া দৌঁড়ে আবিরের কাছে গেলো।

আবির তখনো জ্ঞানশূন্যহীন অবস্থাতে বেডে সুয়ে আছে।
রিয়া আবিরের হাতদুটি ধরে চিৎকার করে কাঁদছে।

আবিরদের অবস্থা মোটামোটি স্বচ্ছল।
কিন্তু আবিরের এই অবস্থার কারণে অনেক টাকা ব্যায় হয়ে গেছে।
তবুও আবিরের পা দুটি আর ঠিক করা যাবে না বলে জানিয়ে দিছে ডা.।
একটা সুখি পরিবার দমকা হাওয়াতে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিলো।

আবির এখন পুরোপুরি সুস্থ্য,তবে দু পায়ে আর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারে না।
তার দুটি পায়ের চলার শক্তি হিসেবে তাঁর সাথে থাকা হুইল চেয়ারটাই তার ক্ষমতা যোগাই এখন।

আবির,রিয়া দু’জনেরই বয়স খুব অল্প।
আর এই অল্প বয়সে এমন কঠিন পরীক্ষার দিতে হচ্ছে দু’জনকে।
আবিরের এখন সারাদিন চার দেওয়ালের মাঝে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছে।
সারাক্ষণ একা একা থেকে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে এখন তাঁর।

রিয়ার ও বড্ড কষ্ট হয়, আবিরের এই অবস্থা দেখে।
কিন্তু সতকষ্ট হলেও মেয়েটা কখনো বুঝতে দেয় না।

শতকষ্টের ভিতরেও চোখের জল লুকিয়ে রেখে দিব্যি সবকিছু মেনে নিয়েছে রিয়া।

আবির তাঁর একাকিত্ততার বহন হুইলচেয়ারটিতে বসে ছিলো।
হঠাৎ দেখলো তাঁর শ্বশুর এসেছে।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর,রিয়াকে ডেকে নিয়ে রুমের ভিতরে গেলো।

তারা বাবা-মেয়ে ভিতরে কথা বলা বলি করছে।
পুরো বাড়িটা নিরব থাকাতে তাঁদের কথা গুলো অনিচ্ছা থাকলেও শোনা যাচ্ছে।

:-দেখ মা,জীবনটা এতোটা সহজ না।
আর তোর বয়সটা এখন কিছুই না।
আর এই অল্প বয়সে তোকে এভাবে কষ্টের ভিতরে থাকতে দিতে পারি না আমি।
:-তাহলে কি করতে বলছো তুমি?
:-তুই আবিরকে ছেড়ে দে।তোর আবার অন্যত্র ভালো জায়গাতে বিয়ে দিবো আমি।
:-বাবা এসব কি বলছো তুমি?
আবিরকে আমি ভালোবাসি।
:-শুধু ভালোবাসা দিয়ে জীবন চলে না,এখন আবিরের কোনো ইনকাম নেই।যা আছে তা দিয়ে কতদিন যাবে।আর তখন কি করবি।আর অভাব আসলে ভালোবাসা এমনিতেই হারিয়ে যাবে।
:-অভাবে পড়লে ভালোবাসা তাঁদের পালায়,যাদের ভিতরে ভালোবাসার কমতি থাকে।
আর আমাদের ভিতরে কখনো ভালোবাসার কমতি ছিলো না আর থাকবেও না।
:-দেখ রিয়া আবেগ দিয়ে জীবন চলে না,আর আমি তোর ভালো চাই।
:-দেখো বাবা তুমি যদি আমার ভালো চেয়ে থাকো তাহলে একটা কথা রাখবে আমার।
:-হ্যা বল…?
:-আমাদের এখানে আর কখনো এসো না।
আবির যেমনটাই থাকুক না কেন,ওতো আমার সামনে আছে।
আমার সাথে কথা বলছে এটাই আমার জন্য অনেক।

রিয়ার কথা শুনে রিয়ার বাবা রাগ দেখিয়ে আবিরদের বাসা থেকে চলে যাই।

আবির রিয়া আর তাঁর বাবার ভিতরে চলা সব কথা গুলোই শুনেছে।

আবিরের আজ নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে,যে বাবা একদিন হাসি মুখে তাঁর মেয়েকে সমর্পণ করেছিলো সারাজীবন বেঁধে রাখার জন্য।
আজ সেই বাবায় তাঁর মেয়েকে সরিয়ে নিতে চাচ্ছে।

কথাগুলো ভাবতেই আবিরের চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগলো হাটুর উপরে।
রিয়া চোখ দুটি মুছতে মুছতে বাইরে চলে আসলো। দেখলো আবিরে চোখে জল।আবির ও রিয়াকে দেখে তাড়াতাড়ি করে চোখের জল মুছে নিতে চাইলো কিন্তু পারলো না।

:-তুমি বাবার কথাতে কিছু মনে করো না প্লিজ।
:-কি মনে করবো,তোমার বাবা তো ঠিকি বলেছে।আমার সাথে থাকলে সারাজীবন কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পাবে নাহ্।
:-কষ্টটাকেই সুখ ভেবে বেঁচে থাকবো।
তবুও তোমাকে ছেড়ে অন্যকাওকে কখনো ভাবতে পারবো না।
:-এভাবে কতদিন থাকবে।
:-যততিদ বেঁচে থাকবো।আজ যদি এমন অবস্থা আমার হতো তাহলে তুমি কি করতে বলো তো। ছেড়ে চলে যেতে।
:-কি করতাম,,নিয়তি মনে করে মেনে নিতাম।
:-তাহলে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছো কেন?
আমিও নিয়তি ভেবে নিয়েছি।
আর আমি তোমাকে ভালোবাসি,শুধু সুখের জন্য ভালোবাসি নি।
বরং হাজার কষ্টের ভিতরে প্রিয়মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকতে চেয়েছি।।
তোমার চাকরি নেই তো কি হয়ছে,আমি তো লেখাপড়া জানি।
আমি চাকরি করবো।
তবুও কখনো তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবা না।
:-তবুও তোমার অনেক কষ্ট হবে।
:-চুপ আরেকটাও কথা বলবা না,বললে মুখে টেপ লাগায়ে দিবো।
চুপ করে বসো,আমি তোমার পছন্দের পায়েস বানিয়েছি;নিয়ে আসছি।

রিয়া রান্নাঘরে চলে গেলো।
একটু পর পায়েসের বাটি হাতে করে আসলো।
:-নাও এখন হা করো।
:-রিয়া তোমার খুব কষ্ট হয় তাই না।
:-তোমার এমন অবস্থা দেখে যতোটা কষ্ট হয়,তার থেকে দ্বিগুন কষ্ট হয় তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কেও বললে।
:-আচ্ছা আর কখনো বলবো না।
:-হুমম,,এখন হা করো।
:-আমি সব খাবো নাকি,আরেকটা চামচ নিয়ে আসো
তোমাকেও খাইয়ে দেয়।
:-আরেকটা কেন,একটাতেই হবে।

একেঅপরের মুখে পায়েস তুলে দিচ্ছে,আর অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
দু’জনের চোখেই অশ্রু
কিন্তু এ অশ্রু কষ্টের না।
বরং প্রিয় মানুষটার পাশে বসে সারাটাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা রাখার।

ভালোবেসে সুখে থাকার জন্য কিই বা লাগে আর,
দু’টি অবুজ মন নিবিড় ভাবে একেঅপরকে মন থেকে চাওয়া।
একসাথে সারাজীবন পাশে থেকে পথ চলা।
বেঁচে থাকুক এমন ভালোবাসা গুলো হাজার হাজার বছর ধরে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত