বেদনার রং নাকি নীল!

বেদনার রং নাকি নীল!

অনেককেই বলতে শুনেছি বেদনার রং নাকি নীল। দুঃখ-কষ্ট, ব্যাথা-বেদনা আর যন্ত্রনা তো দেখতে পারা যায়না, শুধু অনুভব করা যায়।
তবে কিভাবে মানুষ এর রং নির্ধারণ করে? ব্যাপারটা আমি ভাল বুঝিনা। এই ঝটিল ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকেনা। এটা দেখতে পাবার মত কোন বস্তু নয়, এটা অনুভব আর অনুভুতির বিষয়। পৃথিবীর সব মানুষের অনুভুতি একরকম নয়। মানুষে মানুষে এর পার্থক্য রয়েছে অনেক। সবাই কষ্টকে সমানভাবে অনুভব করেনা। যাদের অনুভুতি শক্তি তীব্র আর প্রখর হয় তারা কষ্ট পায় বেশি।

কিন্তু, আমার মত যাদের অনুভুতি শক্তি অত্যান্ত নিম্নমানের আর অচল, তারা কখনো সহজে কষ্ট পায়না। দুঃখ কষ্ট তাদের কিছুই করতে পারেনা। আমি জীবনে কখনো কষ্ট বেদনা জাতীয় কিছুই পাইনি। আমার দুই চোখ থেকে কখনো দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরেছে কিনা তা মনে পরেনা। আমার ধারনা আমি কখনোই কাঁদিনী, এমনকি জন্মের সময়ও না। তার মানে হল জন্ম থেকেই আমার অনুভুতি শক্তি নেই আর থাকলেও তা নিতান্তই নিম্নমানের। লজ্জাবতী গাছের তীব্র অনুভুতি শক্তি আছে তাই কোনকিছুর ছোঁয়া পেলেই চোপসে যায়। অন্যান্য গাছেরও অনুভুতি শক্তি আছে, বিজ্ঞান তার প্রমাণ দেয়। কিন্তু অন্যান্য গাছের অনুভুতি শক্তি হয়ত অত্যান্ত নিম্নমানের তাই কারো সামান্য ছোঁয়াই ওরা কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়না। ঠিক তেমনি আমার অনুভুতি শক্তি থেকে থাকলেও তা ঐরকম নিম্নমানের। তাই আমি দুঃখ কষ্ট পেলেও কাঁদিনা বা কাঁদতে পারিনা, এটা আমার একটা বদভ্যাস।

আমি কাউকে কখনো ভালবাসিনি। ভালবাসাটাও হয়ত অনুভবের বিষয় আর তাই হয়ত এই মহান বিষয়টির সাথে আমি আজও পরিচিত হতে পারিনি।
এতকাল পর্যন্ত আমার ধারনা ছিল আমার অনূভুতি শক্তি মোটেও নেই। কিন্তু এখন ক’দিন থেকে মনে হচ্ছে আমারও অনুভুতি শক্তি আছে। কারন ইদানিংকালে আমি প্রায় একটি মেয়েকে নিয়ে ভাবছি। ওকে ভেবেভেবে অযথাই সময় ব্যায় করছি। মেয়েটিকে আমি যতই দেখছি ততই ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পরছি। এতে আমার অনুভুতি শক্তি আছে বলেই প্রমাণ করে।
আমি মেয়েটির ঠিকানা জানিনা, এমনকি তার নামটিও জানিনা। তবে এতটুকু জানি ও কলেজে পড়ে। প্রতিদিন আমার বাসার সামনে দিয়ে নুপুরের মাতাল করা ছন্দে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে ও কলেজে আসে। আমি তখন বারান্দায় বসে পলকহীন চোখে মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখি। আবার কলেজ থেকে ফেরার সময়ও তীর্থের কাকের মত পথের দিকে তাকিয়ে থাকি । মেয়েটি রিক্সায় করে চলে যায় আমি তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে থাকি পলকহীন চোখে।

আমার তাকিয়ে থাকা আর মেয়েটির চলে যাওয়া এভাবেই কাটে দিন। মেয়েটি জানেনা যে, কেউ একজন তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়ে থাকে তার দিকে। কখনো কখনো ইচ্ছা হয় ওর গতিরোধ করে দাড়াই আর বলি, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। আমি তোমাকে ———–। কিন্তু আমার মনের সেই তীব্র ইচ্ছাটা মনেই থেকে যায়।

আমি সেই মেয়েটির নাম জানিনা অথচ তার নাম জানা আমার জন্য মারাত্মক রকমের জরুরী। কিন্তু কিভাবে জানব? কোন উপায় খোঁজে পাইনা আমি। তারপরও আমি হাল ছাড়িনি। একাগ্রতার সাথে উপায় খোঁজতে থাকি। একবার ভেবেছিলাম রাস্তায় দাড় করিয়ে ওর নাম জানতে চাইব। কিন্তু ব্যাপারটি যেন আমার কাছে কেমন অশুভনীয় মনে হল। তাই এই পরিকল্পনাটি আর বাস্তবায়িত করা হলনা। আমি আবার নতুন নতুন কত পরিকল্পনা সাজাই কিন্তু কোনটাই কাজে পরিণত করতে পারিনা। মেয়েটির নামও জানা হয়না আমার।
সেদিন শনিবার ছিল। সকালবেলা ঘুম হতে জেগেই কোন একটা কারনে আমাকে বাজারে যেতে হল। বাসা থেকে বাজার মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। আমি বাজারে পৌছার পরপরই শুরুহল প্রচন্ড রকম বৃষ্টি। সাধারণ বৃষ্টি নয় রিতীমত বিড়াল-কুকুর বৃষ্টি। বৃষ্টি দেখে সহসাই আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ আর বান্দায় বসে মেয়েটিকে দেখতে পাবনা। ধ্যাত্তরী, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, বৃষ্টি পরার আর সময় পেলনা। যা হবার তাতো হলই, দুপুরের আগে আর বাসায় ফিরবনা বলে মনস্থির করলাম।

আমাদের বাজারের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে একটি ক্লাব আছে। না, কোন রাজনৈতিক দলের দলীয় ক্লাব নয়। এটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ আর শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চা আর খেলাধুলার জন্য ক্লাব। এই ক্লাবের যারা সদস্য তারা সবাই গ্রাজুয়েট। আমি যখন দশম শ্রেনীর ছাত্র তখন বন্ধুরা সবাই মিলে ক্লাবটির গোরাপত্তন করেছিলাম। সেই ক্লাবে ঢুকতেই দেখলাম আমার এক বন্ধু বসে আছে একা একা। ও অবশ্য ইচ্ছা করে ক্লাবে আসেনি, এসেছে বৃষ্টির তাড়া খেয়ে, বাধ্য হয়ে। যাহোক, দুজনে বেকার বসে না থেকে দাড়িয়ে গেলাম কেরাম খেলায়। খেলা শুরু হল। আমরা দুজনই ভাল খেলুয়াড়, একথা বন্ধু মহলের সবাই জানে। তাই বলে আমার প্রতিপক্ষ বন্ধু কোনদিন আমাকে হাড়াতে পারেনি। অবাক করা ব্যাপার, আজ আমি শুধু খারাপ খেলছিনা, বরং মারাত্মক খারাপ খেলছি। একটার পর একটা গেম হাড়তে লাগলাম অনায়াসে। নিজের উপর নিজেরই খুব রাগ হচ্ছে। মাথার চুলগুলো টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে। ধ্যাত্তরী, কিছুই ভাল লাগছেনা।
বেরিয়ে এলাম ক্লাব থেকে। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় আড়াই ঘন্টা পূবে। ক্লাব থেকে বাইরে এসে সামান্য হাঁটতেই আমার দৃষ্টি স্থীর হয়ে গেল সামনের একটি বইয়ের দোকানে। দোকানে দাড়িয়ে আছে আমার কল্পনার রানী, নিশীদিনের স্বপ্নচারীনি সেই মেয়েটি, যার নাম আমি আজও জানিনা। ওকে কাছে থেকে একবার দেখার লোভ আমি সামলাতে পারলামনা। তাই এক পা দু’পা করে চলে এলাম বইয়ের দোকানে। দোকানের মালীক আমার পরিচিত। আমি কাছে আসতেই সে হেন্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে। দোকানের কর্মচারী কয়েকটি নম্বরপত্র (ট্রান্সক্রিপ্ট শীট) লেমেনেটিং করা শেষ করে নাম মিলিয়ে সেই মেয়েদেরকে দিচ্ছিল। কর্মচরীটি এবার একটি শীট হাতে নীয়ে প্রশ্ন করল, রিতু কে? সেই মেয়েটি কোমল দুটি হাত বাড়িয়ে শীটটি গ্রহন করল।
পাঠক পাঠিকাবৃন্দ, বুঝতেই পারছেন এই শুভক্ষনে আমি তার নাম জানতে পারলাম, যে আমার হৃদয় কেড়েছে । হ্যা, মেয়েটির নাম রিতু। এই মূহুর্তে আমার খুব ভাল লাগছে। আমার প্রতিটি শিরা উপশিরায় যেন কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে। এখানে সময় নষ্ট না করে একটা রিক্সা ডেকে তাতে চেপে বসে বাসায় চলে এলাম। বাসায় ঢুকেই মেজাজটা বিগরে গেল। বারান্দায় কে যেন কতগুলো সাদা কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখেছে। হঠাৎ একটা কাগজে আমার দৃষ্টি আটকে গেল। কাগজখানি হাতে তুলে নিলাম। চমৎকার হাতের লেখা।

নোয়াখালী সরকারি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়
মোছা: রিতু রহমান
রোল নং- –

কতগুলো ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে কি মেয়েটি কোন কারনে আমাদের বাসায় এসেছিল? হ্যা, তাই হয়েছে। কলেজে আসার পথে দুই তিনজন মেয়ে বৃষ্টির কারনে বাধ্য হয়েই আমাদের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিল। ব্যাপারটি আমি জানতে পারি আমার একমাত্র ভাবির কাছে। আর এখানে ভেজা খাতার কাগজ দেখে বুঝতে পারি যে, আমার প্রাণের ময়না পাখি শুন্য খাঁচায় ঢুকে খানিক সময় থেকে আবার চলেও গেছে-

কতগুলো ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে কি মেয়েটি কোন কারনে আমাদের বাসায় এসেছিল? হ্যা, তাই হয়েছে। কলেজে আসার পথে দুই তিনজন মেয়ে বৃষ্টির কারনে বাধ্য হয়েই আমাদের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিল। ব্যাপারটি আমি জানতে পারি আমার একমাত্র ভাবির কাছে। আর এখানে ভেজা খাতার কাগজ দেখে বুঝতে পারি যে, আমার প্রাণের ময়না পাখি শুন্য খাঁচায় ঢুকে খানিক সময় থেকে আবার চলেও গেছে।



দেখছেন আমি কতোটা বোকা- এখনো আপনাদের সাথে পরিচয়ই হয়নি—
আমি সাহিদ


এইমুহুর্তে মনে হচ্ছে সকালবেলা বাজারে যাওয়াটা আমার জন্য চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল। মনে হচ্ছে বিধাতাও অতি চমৎকার করে আমার সাথে একটা নিখুঁত কারচুপি করলেন। যদি তাই না হবে তবে আমি বাজারে যাবার সাথে সাথেই বৃষ্টি হবে কেন? অনেকবার ব্যাপারটা খেয়াল করে দেখেছি, আমি যখন ভাল কিছু পেতে যাই তখনই বিধাতা আড়াল থেকে বাঁধ সাধেন। যেমনটি করলেন আজ। আজকে যদি আমি বাসায় থাকতাম তবে অন্তত দুচারটি কথাতো নিশ্চয় বলতে পারতাম। কিন্তু এতটুকুও যখন কপালে জুটলনা তখন সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কি-ই-বা করার আছে?

রিতু কলেজের নিয়মিত ছাত্রী। ছাত্রী হিসাবে ও অত্যান্ত ভাল। লেখাপড়া ছাড়া রিতু কিছুই বুঝেনা। সে দেখতে আহামরি সুন্দরী নয় আবার কুচকুচে কালও নয়। পদ্মদিঘীর মত টানা টানা চোখ। কমলার কোষের মত দুটি ঠোঁট, উন্নত নাক আর মাথায় কোকিলকাল চুল। সবমিলিয়ে ও যে কতটা সুন্দরী, তা কলমে কাগজে লিখে প্রকাশ করা আমার সাধ্যের অতীত। যে কোন সুস্থ পুরুষকে দিশেহারা করার জন্য ওর রূপ মারাত্মক রকমের যথেষ্ট। রিতু যখন হাসে তখন ওর দুই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে মুক্তার মত সাদা কয়েকটি দাঁত ভেসে ওঠে। মনে হয় যেন বিদ্যুতের ঝলকানী। ওর হাসিতে যেন হাজার তীরের বিষ রয়েছে। ওর একটিমাত্র হাসি একজন পুরুষকে পাগল করা জন্য যথেষ্ট। যেমনটি হয়েছি আমি। আমার অনুভূতিশক্তি ছিলনা, রিতুই আমার সুপ্ত অনুভূতিশক্তিটাকে জাগিয়ে তুলেছে। এই শ্যামলা বর্ণের মেয়েটি আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে। এইজন্য আমি ওর কাছে ঋনী।


দুই বছর হল আমি মাস্টার্স (বাংলা) শেষ করেছি। এখন আমি বেকার, তবে শিক্ষিত বেকার। নানান জায়গায় চাকরীর চেষ্টা করছি আর ইচ্ছা হলে মাঝে মধ্যে ভাইয়ার ব্যবসা দেখাশুনা করছি। চাকরীর জন্য একটি প্রাইভেট কলেজে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। হয়ত চাকরীটা হয়ে যেতে পারে। অবশ্য ভাইয়ার ইচ্ছা ছিল আমি ব্যবসা করি। কিন্তু ব্যবসা ব্যাপারটি আমার কাছে বড়ই জটিল মনে হয়। যদিও ব্যবসা করায় স্বধীনতা আছে তবুও কেন জানি আমার কাছে ভাল লাগেনা। হয়ত চাকরী করাও আমার ভাল লাগবেনা কারন বাংলা পড়াতে হলে নিশ্চয় একটা অনুভূতিশীল মন থাকা প্রয়োজন। আমার মন থাকলেও তা যে কতটা অনুভূতিশীল একথা আমি পূর্বেই বলেছি। আমি বাংলা অর্থাৎ সাহিত্যের ছাত্র হলেও জীবনে কখনো দুই লাইন কবিতা বা গল্প লিখতে পারিনি। তারপরও দেখি যদি ভাল লাগে তবে চাকরীটা করব যতদিন ইচ্ছা হয়।

নিরবে সময় চলতে থাকে। সময় বয়ে যেতে যেতে হারিয়ে যায় মহাকালের অতলগর্ভে। ইতিমধ্যে আমার কলেজের চাকরীটা হয়ে যায়। আমি এখন নিয়মিত কলেজে পড়াচ্ছি। ভেবেছিলাম আমাকে দিয়ে হয়ত এ চাকরী করা হবেনা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভালইতো লাগছে। আমার মধ্যে হয়তবা ধীরে ধীরে অনুভূতির পরাগ ডানা মেলছে। অনুভূতির বন্ধ জানালাগুলো হয়ত ধীরে ধীরে খোলতে শুরু করেছে। কিন্ত হলে কি হবে আজ পর্যন্ত আমি রিতু কে আমার মনের একান্ত গোপন কথাটি বলতে পারিনি। তবে অনেক কষ্টে রিতু-র ঠিকানা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এখন মনে হচ্ছে ঠিকানা দিয়েই বা কি হবে? ওকে তো কথাটি বলা চাই। কিন্ত কিভাবে বলি, কোন পথ খোঁজে পাইনা আমি। এদিকে ভাইয়া ভাবি আমাকে বিয়ের জন্য পিড়াপিড় করছে । ভাবি একদিন জানতে চেয়েছিল আমার পছন্দের কেউ আছে কিনা। সেইদিন ভাবির প্রশ্নের কোন জবাব দিইনি আমি। কি জবাব দিতে পারতাম আমি! এখন মনে হচ্ছে ভাবিকে কথাটি বলা প্রয়োজন কিন্তু কিভাবে বলি। আমি ভাবির সাথে ততটা ফ্রী নই যতটা ফ্রী হলে এসব কথা বলা যায়। আমি সহজে মনের কথা অন্যকে বলতে পারিনা। এটাও আমার একটা দোষ। অবশ্য ভাবি প্রথম প্রথম আমার সাথে ফ্রী হবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু আমার গম্ভীর স্বভাবের কারনে সেটা সম্ভব হয়নি। তারপরও ভাবিকে আমার কথাটা বলতে হবে তা যেভাবেই হোক।
অনেকদিন থেকে রিতুকে দেখিনা। ওকে দেখতে প্রচন্ড ইচ্ছা হচ্ছে কিন্তু কিভাবে সম্ভব তা বুঝতে পারছিনা। এই মূহুর্তে আমার চাকরীটার প্রতি ভীষন রাগ হচ্ছে। কর্তব্যের জন্য, হ্যা শধুমাত্র কর্তব্যের জন্যই কতদিন ওকে দেখতে পাচ্ছিনা। আমি সকালবেলা কলেজে চলে যায় ফিরি সেই সন্ধ্যায়। এ কারনেই ওর সাথে আমার দেখা হচ্ছেনা। ওকে শেষ কবে দেখেছিলাম একথা ভাবতেই আমি ভয়ানক রকমের চমকে ওঠি, সা–ত দিন! আশ্চর্য, ওকে না দেখে আমি এতদিন কাটালাম কি করে? নিজে নিজেই বিস্মীত হই আমি। না, আজ যেভাবেই হোক অন্তত একবার ওকে দেখতেই হবে, মূহুর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিই আমি। মোটর বাইকটি নিয়ে ওদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। রিতুূদের বাসা আমি চিনি, বাসার কাছে গেলে দূর থেকে অন্তত একবার হয়ত ওকে দেখতে পাব। আচ্ছা, ও কি আমাকে দেখে বুঝতে পারবে যে, আমি শুধুমাত্র ওকে এক নজর দেখার জন্যই এখানে এসেছি। হয়ত বুঝতে পারবেনা। আর বূঝতে পারার কথাও নয়। কেমন করে বুঝবে, আমিতো ওকে কখনো আমার মনের কথা বলিনি। আমি মনেমনে এসব ভাবছিলাম আর মোটরবাইকটি ছোটে চলছিল। হঠাৎ মিটারবক্সে দৃষ্টি পড়তেই মাথাটায় ঝিম ধরে গেল, নব্বই কিলোমিটার! আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা যে আমি বাংলাদেশের রাস্তায় বাইক চালাচ্ছি। আমি আর ভাবতে পারিনা। মাথার ভিতর রকমারী হর্ণ বাঁজতে থাকে বি-র-তি-হীন। আমার চোখ দুটি আচমকাই বন্ধ হয়ে যায়। মেরুদণ্ডের উপর দিয়ে শীতল বাতাস অনুভব করতে থাকি। এরপর আমি কিছুই জানিনা।

রাত আনুমানিক দশটার সময় নিজেকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের বিছানায় আবিষ্কার করি। বুঝতে পারি আমার হাতে, পায়ে, মাথায় বেন্ডেজ বাঁধা রয়েছে। সমস্ত শরীরে প্রচণ্ড রকমের ব্যাথা করছে। তবে কি ট্রাকটি আমার উপড় দিয়েই তার চলার পথ করে নিয়েছিল? না, এরকমটি নয়। এরকম হলেতো আমার প্রাণপাখি খাঁচায় থাকার কথা নয়।
আমার মাথার কাছে বসে আছেন মাতৃসমতূল্য ভাবি। ভাবিকে আমি মনভরে শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি। যিনি আমাকে সন্তানের মত ভালবাসেন তাকে কি শ্রদ্ধা না করে থাকা যায়? পাশেই একটি চেয়ারে ভাইয়া বসে রয়েছেন। ওনাদের দুজনের চোখেই কষ্টের সুস্পষ্ট ছাপ। আমি ভাবিকে কিছু বলতে চাই কিন্তু পারিনা। কে যেন আমার কন্ঠ সজোড়ে চেপে ধরে রেখেছে। তাই চোখ বড় বড় করে ভাবির দিকে চেয়ে থাকি।
ভাবির হৃদয়নিংড়ানো স্নেহমাখা সেবা আর ডাক্তারদের সঠিক চিকিৎসা পেয়ে আমি মাত্র দশদিনের মাথায় প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠি। এখন আমি নিজে নিজেই হাটাচলা করতে পারছি। জেলখানার কয়েদির মত কাটিয়ে দিলাম অনেকগুলো দিন। এই কয়দিন আমি ভাইয়া ভাবির মুখে হাসির চিহ্নমাত্র দেখতে পাইনি। কি করে হাসবে? সন্তানকে অসুস্থ রেখে মা বাবা কি হাসতে পারে? আমি যে তাদের কাছে সন্তানের মতই। আমি যখন মাতৃগর্ভে তখন বাবা মারা যান, জন্মের দুই বছর পর মা। মানুষ মরে গেলে কি হয় তখনো আমি তা বুঝতে শিখিনি অথচ আমি মা বাবা দুজনকেই হারাই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার বাবার দায়িত্ব পালন করছেন আমার ভাইয়া আর ভাবি পালন করছেন মায়ের দায়িত্ব। ভাইয়া ভাবির কোন সন্তান নেই। কে জানে, হয়তবা আমার কথা ভেবেই ওনারা সন্তান নেননি।

ভাইয়া আমার মোটরবাইক চালানোর উপড় কড়া নিষেধ জাড়ি করেছেন এমনকি অর্ধভাঙ্গা বাইকটি মেরামত করে ইতিমধ্যে বিক্রিও করে দিয়েছেন। বাইকের জায়গায় এসেছে নতুন গাড়ি। ভাইয়ার কথায় চাকরী ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করতে যাচ্ছি। দূঘটনার পর থেকে ভাইয়া-ভাবি আমার উপড় কড়া নজরদারী করছেন মনে হচ্ছে। ভাবির সাথে আমার যে দূরত্বটা সৃষ্টি হয়েছিল তার অস্তিত্ব এখন আর খোঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।

বিকেলবেলা। আমার শরীরটা আজ একশভাগ সুস্থ মনে হচ্ছে। বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। ভাবি এক গ্লাস দুধ হাতে নিয়ে সামনে দাড়ালেন। আমি জানি আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য এইমূহুর্তে ভাবি দেবেনা। তাই অহেতুক বাক্য ব্যয় না করে বাধ্য খোকার মত হাত থেকে দুধের গ্লাসটি নিয়ে এক নিঃশ্বাসে শুন্য করে দিলাম। শুন্য গ্লাসটি নিয়ে ভাবি চলে যাচ্ছিল, আমি ডাকলাম।
– ভাবি,
– হুম, কিরে কিছু বলবি?
– ভাবি তুমি সেদিন একটা কথা জানতে চেয়েছিলেনা?
– কোন কথাটা যেন? ভাবি মিষ্টি হেসে আমার মাথার চুলে কোমল হাত বোলাতে বোলাতে প্রশ্ন করলেন।
– ভুলে গেলে! সেই মেয়েটির ব্যাপারে, আমি ভাবিকে মনে করাতে চেষ্টা করি।
– ও– হ্যা মনে পড়েছে, তা তোমার পছন্দের মেয়েটি কে? ওকে কি একনজর দেখানো যাবে? নাকি আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখবে, মিষ্টি হাসলেন ভাবি।
– কি-যে বলনা ভাবি, ওর সাথেতো আমার পরিচয়ই হয়নি এখনো। শুধু নাম ঠিকানা জানি, তবে তোমাকে দেখানো যাবে, চল আমার সাথে।
এখন সময় নয়টা। ভাবির হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসে সবকথা খুলে বললাম। তারপর দুজনে তীব্র আগ্রহ নিয়ে পথের দিকে চেয়ে থাকি অনেকটা সময়। কিন্তু আমাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়না। এগারোটা বেজে যায়, বুঝতে পারি আজ আর সে আসবেনা। পরের দিন দুজনে মিলে আবারো অপেক্ষা করি কিন্তু সেদিনও রাধার সন্ধান মেলেনি। অবশেষে তৃতীয়দিন রিতু কলেজে আসে। ভাবি ওকে রাস্তা থেকে ডেকে নিয়ে নিজের ঘরে বসিয়ে লম্বা সময় নিয়ে কি যেন সব গল্প করেন তা জানিনা। একসময় রিতু চলে যায়, আমার আর কথা বলার সৌভাগ্য হয়না।

রিতু চলে যাবার পর ভাবি আমার কাছে এসে বলেন, আমিতো জানতাম তুমি রসকষহীন একটা মানুষ। এই আবেগহীন মানুষটার ভেতর হঠাৎ এতো রস আসল কোথা থেকে। ভাবি আরো কত কি বলতে থাকে কিন্তু আমি তার কোন কথার জবাব দিতে পারিনি। আমি বুঝতে পারি রিতু কে ভাবির পছন্দ হয়েছে। সুতরাং এব্যাপারে আমার আর কোন টেনশন থাকলনা।
মাত্র তিনদিনের মধ্যেই ভাবি, ভাইয়াকে নিয়ে সবকিছু প্রাই চুরান্ত করে ফেললেন। ভাইয়া, ভাবি ওদের বাড়িতে গিয়ে আলোচনা করে সব ঠিক করেছেন। বিয়ের তারিখ চুরান্ত হবার পর আমি এসব ভাবির কাছ থেকে শুনতে পাই। আমার কত সৌভাগ্য আমি রিতু কে স্ত্রী হিসাবে পাচ্ছি। ওকে আমি আমার করে পাব একথাটি ভাবতেই আমার সমস্ত মন ও শরীর খুশিতে আন্দোলিত হয়। এ যেন এক অচেনা শিহরণ।
দেখতে দেখতে সেই চির আকাংখিত দিনটি চলে আসে আমার দ্বারপ্রান্তে। বিকেলবেলা আমরা রিতুদের বাসায় যাই বরযাত্রিরূপে। বিয়ের সকল নিয়ম কানুন শেষ করে বউ নিয়ে আমরা আনুমানিক রাত দশটার সময় ফিরে আসি নিজ বাড়িতে। এরিমধ্যে আমি দুই একবার রিতুর কোমল হাতের স্পর্ষ অনুভব করেছি। প্রথম যখন আমার শ্বশুর সাহেব ওকে আমার হাতে সমর্পণ করছিলেন তখন। আবার গাড়িতেও দু’একবার নিজের অজান্তে, অবচেতন মনে আমার অবাধ্য হাতটি চলে গিয়েছিল তার হাতের উপড়। আমি রিতুর হাতে মৃধু কম্পন অনুভব করেছিলাম।

বিয়ে উপলক্ষ্যে আসা মেহমানদের বিদায় দিতে গিয়ে চলে গেল অনেকটা সময়। রাত প্রায় বারোটা। রিতু আমার জন্য ফুল সয্যায় বসে অপেক্ষা করছে। আমি বাসর ঘরে প্রবেশ করেই আশ্চর্য হই। রিতু ঘুমিয়ে আছে! আমি ওকে ডাকি, রিতু -এই–, রিতু—-
রিতু কোন কথা বলেনা। আমি ওর মাথায় হাত রাখি। এবার আমার বুকের ভিতরটা হঠাৎই মোচর দিয়ে ওঠে। রিতুর মাথাসহ সমস্ত শরীর প্রচণ্ড রকম ঠাণ্ডা হয়ে আছে। ওর হাতে হাত রাখতে যেতেই আমি ফ্রিজ হয়ে যাই। রিতুর হাতের মুঠোয় একটি কাগজ শক্ত করে আটকে আছে। কাগজখানি বের করে আনি আমি। মহিমা তবু কোন প্রতিবাদ করেনা। আমার সাথে মহিমা অভিমান করেছে হয়ত। আমি কাগজের ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরি-



সাহিদ”
আপনাকে অবহেলা করার সাহস আমার জীবন থাকতে হলনা। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে এ পাপের পথ বেছে নিতে হল। আপনি হয়ত আমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবেননা। এ জগতের সবাই হয়ত ঘৃনায় আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তারপরও আমার হাতে অন্য কোন বিকল্প পথ ছিলনা। আপনি, আপনার ভাইয়া, ভাবি আপনারা সবাই ভালমানুষ। আমার সম্পর্কে ভালমন্দ না জেনে, আপনি আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বউ করে ঘরে নিচ্ছেন। আমি কি করে আপনার মত একজন ভাল মানুষকে ঠকাব বলুন। আমি আপনাকে ঠকাতে পারিনি।
আমি একজনকে ভালবাসতাম। ভালবাসতাম মনপ্রাণ উজাড় করে। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধু একজনই ছিল। কিন্তু সেই ছেলেটি আমার ভালবাসার দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমাকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করেছে। আমি আমার আমিত্বকে ওর মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলাম। সামান্য ভালবাসা পাবার আশায় আমি আমার সবকিছুকে ওর পায়ে বিস্বর্জন দিয়েছিলাম। আমার বলতে কিছুই আমি রাখিনি। তারপর সেই ছেলেটি একদিন আমাকে ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে সুখি হয়েছে।
এবার বলুন শুন্য হাতে কি করে আমি আমার অপবিত্র দেহটাকে নিয়ে আপনার সামনে দাড়াতাম। বাসী ফুল দিয়েতো আর দেবতার পুঁজা হতে পারেনা। তাই আমি আপনার জীবনটাকে কলংকিত করতে চাইনি। আমার কলংক আমারই রইল।
এই জন্য আমি আপনার কাছ থেকে, এ পাপময় সমাজ সংসার থেকে চির বিদায় নিলাম। আবার যদি মানুষ হয়ে জন্ম পাই তবে আপনার মত একজন মানুষকে বিধাতার কাছে ভিক্ষা চাইব।
-ইতি,
-রিতু।



চিঠিটা পড়েও আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা রিতু নেই। আমি ওর দিকে তাকাই, ও তাকিয়ে আছে। পাথর চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর চোখে পলকহীন দৃষ্টি। চোখ দুটো সাদা ফ্যাকশে রঙের হয়ে গেছে। মহিমা সাদা চোখে দেখছে আমায়। আমার মনে হচ্ছে এক্ষুনি মহিমা বলবে, অন্তর আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালকবাসি। আমি তোমাকে ভালবাসি সাহিদ।
কিন্তু না, রিতু একথা বলেনা। সে শুধুই চেয়ে থাকে সাদা চোখে।
আমি কখনো কাঁদিনি। এখনো কাঁদছিনা। আমার ধারনা আমি জন্মের সময় প্রথম কান্নাটাও কাঁদিনি। আমার চোখ হতে দু’ফোটা পানি ঝরেনি কখনো কোনদিন।


…………………………………………………….সমাপ্ত……………………………………………………

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত