প্রতিদান

প্রতিদান

– এই ছেলে তোমার নাম কি?
– আবির
– বাসা কই?
– ফুটপাতে।
– বাবার নাম কি?
– জিজ্ঞাসা করতে হবে।
– মানে? কাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে?
– কোন মানে নেই। সৃষ্টিকর্তাকে।
– কেন?
– আমি জানি না যে কে আমার বাবা আর কিবা নাম তার।
– আচ্ছা তোমার মা কি করে?
– পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে।
– কেন?
– মা কি করে তা জানার জন্য।
– আহা এভাবে কথা বলতেছ কেন?
– ভালভাবে কথা বলার মোড নেই।
– আচ্ছা আজ সকাল থেকে দেখছি তুমি এখানে বসে আছ কিন্তু কেন?
– কারন আমি……

সত্য বলতে গিয়েও থেমে যায় আবির। আমাকে এখন যেতে হবে বলে উঠে দাড়ায় আবির। লোকটি তাকে থামাতে গেলে আবির ভয় দেখায় লোকটিকে। এই যে দেখেন আর একবার আমাকে থামানোর চেষ্টা করলে আমি চিৎকার করে লোক জড়ো করবো। বলবো আপনি আমায় ধরে নিয়ে যেতে চান। আবিরের মুখে এই কথাশুনে লোকটি থমকে যায়। বছর দশেকের এই সুদর্শন, মায়াবী, নিষ্পাপ ছেলেটি যে এইভাবে কথা বলবে লোকটি ভাবতেই পারেনি।

এই মুহুর্তে ছেলেটি যা বলল যদি তা কার্যকর করে তাহলে বিপদ হতে পারে তাই সে আর আবিরকে না থামিয়ে ওখান থেকে চলে যায়। আবির আজ সকালে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে। অবশ্য সে পালানোর জন্য একজন নার্সের সহযোগীতা পেয়েছিল। আর সকাল থেকেই এখানে ছিল। তাই হয়তো লোকটির নজরে পড়েছিল। আবির উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটছে। মনে কাল বৈশাখির ঝড়। চোখে ঝর্ণার ধারা বয়ে চলেছে অবিরাম। তবুও কেন জানি একদম ভয় ডরহীন আবির। হঠাৎ-ই অর্পিতার নিষ্পাপ মুখ ভেসে ওঠে আবিরের চোখে। স্মৃতিগুলো আছড়ে পড়ছে মনের মনি কোঠায়। এখন অর্পিতার মিষ্টি করে বলা ভাইয়া ডাকগুলো যেন কল্পনাতেই আবিরকে তীরের মত বিদ্ধ করতেছে। তাই দ্রুতই চোখের জল মুছে নিয়ে আবার হাপাতালের দিকে পা বাড়ায় আবির।

কি ভাবছেন? আবির মানসিক রোগী? সে মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে? আপনার ধারনা একদমই সঠিক নয়। আবির একদম সুস্থ ক্লাশ সিক্সে পড়ুয়া এক দুরন্ত বালক। আবিরের বয়স যখন সাত মাস তখন হারুন সাহেব এক এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়ে এসেছিলেন। কারন অর্পিতার জন্মের সময় ডাক্তার জানিয়ে ছিলেন হারুন সাহেবর স্ত্রী আর কখনো মা হতে পারবে না। যদিও হারুন সাহেবের স্ত্রী ছেলেটিকে দত্তক নেয়ার ব্যাপারে কখনই সহমত পোষণ করেনি। তাই আবিরের প্রতি কখনই তেমন যত্নশীল ছিলেন না হারুন সাহেবের স্ত্রী নিলুফার ইয়াছমিন। বাসার কাজের ভূয়া রহিমা বেগম আর হারুন সাহেবের মায়ের কিছুটা সাপোর্টে আবির ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।

-তবে বেশ কিছুদিন হলো নিলুফার ইয়াসমিন আবিরের প্রতি বেশ যত্নশীল হয়েছে। আবিরকে ভাল ভাল খাবার দিচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে। আবির যা চাচ্ছে তাই-ই এনে দিচ্ছে। বিষয়টা আবিরের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সে বেশ উপভোগ করছিল। মায়ের হাতের আদর যে কত আনন্দের এখন আবির বুঝতেছে।

কিন্তু এই ভালবাসার প্রতিদানে যে তাকে কি দিতে হবে তা আবিরের কাছে অনুমেয় ছিল না। নিলুফার ইয়াসমিনের এই বদলে যাওয়া তো বেশী দিনের নয়। এগার দিন হলো মাত্র। সেদিন আবিরকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল চেকআপ করানোর জন্য। তারপর ডাক্তার হেসে হেসে কি যেন বলল তাতেই নিলুফার ইয়াসমিনের আমুল পরিবর্তন। কিন্তু অর্পিতার অসুস্থতার কারনে কিছুদিন আগেও অস্থির ছিল নিলুফার ইয়াছমিন। বাসার সবার চেহারাতেও কেমন জানি বিষন্নতার ছাপ।

আবির হাসপাতালে বসে প্রথম জানতে পারে অর্পিতার দুটি কিডনি-ই নষ্ট হয়ে গেছে। নার্সের কাছ থেকে এখবর শুনে ভেঙ্গে পড়ে আবির। অর্পিতাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠলে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে বলে নার্স আবিরকে শান্ত করে। আর এও বলে দেয় যাতে সে একথা কারো কাছে না বলে। পরে সুযোগমত এসে আবির কে জানায় তার কিডনি নাকি কেটে অর্পিতাকে দেয়া হবে। আর সে মারা যাবে। ভয়ে আতকে উঠে আবির। নার্সের কথামত হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায় আবির।

আবিরকে হাসপাতালের গেটে ঢুকতে দেখে নিলুফার ইয়াসমিনের যেন প্রাণ ফিরে আসে। আবিরকে জড়িয়ে ধরে হাওমাও করে কাঁদতে থাকে নিলুফার ইয়াসমিন। আবিরের বুঝতে এতটুকু বাকি নেই যে এই কান্না তার জন্য নয়। শুধুই লোক দেখানো। পাশেই হারুন সাহেব আর কাজের ভূয়া দাড়িয়ে। দু জনেরই চেহারাতে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সারাদিন হয়তো তাকে হন্য হয়ে খোঁজেছে।

-কোথায় গিয়েছিলে জানতে চাইলে আবির জানায় এখানে একটা পার্ক আছে আমি বই-এ পড়েছিলাম। তাই দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে আসার পথে পথ ভূল করে বসি। আর আমার কাছে তখন টাকাও ছিল না তাই আসতে দেরি হয়েছে। অন্য সময় হলে হয়তো নিলুফার ইয়াসমিন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন। কিন্তু আজ কিছু বললেন না। হসপিটালের বেডে নিয়ে যাওয়া হল আবির কে আর বলে দেওয়া হল আর কখনই যেন কাউকে কিছু না বলে বাহিরে না যায়। পরের দিন আবির এক ফাকে নার্সের কাছে একটা কলম আর প্যাড চায়। নার্সও আবিরের কথামত একটা কলম আর প্যাডের ব্যবস্থা করে দেয়। আবির তার মাকে একটি চিঠি লিখে। নার্সের হাতে দিয়ে বলে যখন অর্পিতা ভাল হয়ে বাড়িতে যাবে তখন যেন তার মার হাতে এই চিঠিটা দেয়া হয়। প্রথমে নিতে রাজি না হলেও পরে রাজি হয় নার্স। অপারেশনের প্রায় দুই মাস পর অর্পিতা পুরুপুরি সুস্থ। হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে অর্পিতাকে নিয়ে সবাই বাড়ি চলে যাবে। আবিরের কথামত নার্স নিলুফার ইয়াসমিনের হাতে চিঠিটা তুলে দেয়। চিঠিটা না দেখেই ব্যাগে ভরে অর্পিতাকে নিয়ে বাসায় চলে আসে নিলুফার ইয়াসমিন।

সারা বাড়ি জুড়েই উৎসবের আমেজ। সকাল থেকেই লোকজন আসতেছে অর্পিতাকে দেখার জন্য। দিনশেষে সন্ধায় নার্সের দেওয়া চিঠির কথা মনে পড়ে নিলুফার ইয়াসমিনের। চিঠি খোলে পড়তে শুরু করে নিলুফার ইয়াসমিন…………

“প্রিয় মা,
প্রথমে আমার সালাম নিও। আসসালামু আলাইকুম। যখন এই চিঠি তোমার হাতে পড়বে তখন আমি এই পৃথিবী থেকে অনেক দুরে। চাইলেও আর দেখতে পাবে না। জান মা তোমাকে না আমার ভিষন মা ডাকতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু তুমি বারন করেছিলে বলে ডাকতে পারিনি। অর্পিতা যখন তোমাকে মা বলে জড়িয়ে ধরতো তুমিও তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে। তখন জান মা আমারও ভিষন ইচ্ছে হতো। পারতাম না বলে রাতে একা একা কাঁদতাম। দাদু ভাই, বাবা, অর্পিতা, মর্জিনা আন্টি আমায় আদর করলেও তোমার আদর খুব মিস করতাম। তুমি অর্পিতার জন্য অনেক কিছু কিনলেও আমার জন্য কিছু আনতে না। জান মা তখন খুব কষ্ট হতো কিন্তু কখনই মন খারাপ করে থাকতাম না। যদি অর্পিতা বুঝে যায়। তোমরা যে আমার আপন বাবা মা নও এটা আমি আগেই জেনেছিলাম। তখন আমি ক্লাশ ফোরে পড়ি। মনে আছে মা বড় খালার মেয়ে জান্নাতের জন্মদিনে যাওয়ার জন্য তোমরা রেডি হচ্ছিলে। বাবা আমার কথা বলতেই তুমি রেগে গিয়ে বলেছিলে আমি তোমাদের সন্তান নয়। আর আমার কোন জন্ম পরিচয়ও নেই। জান মা সেদিন তোমরা চলে যাওয়ার পর আমি রোমে গিয়ে সারাদিন কেঁদেছি। সেদিন কিছুই খাওয়া হয়নি আমার। যেদিন তুমি আমায় প্রথম সাথে করে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে সেদিন কি যে ভাল লেগেছিল আমার তোমায় বলে বোঝাতে পারবো না। তোমার আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, আমাকে খাইয়ে দেয়া, ভালভাল পোষাক কিনে দেয়া আর সাথে নিয়ে ঘুমানো কয়েকটা দিন আমার কাছে স্বপ্নের মত ছিল। জান মা ঐ কয়েকটা দিন আমিই ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ। হাসপাতালে যখন জানতে পারলাম অর্পিতার দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে আমি খুব কেঁদেছিলাম। কিন্তু নার্স আন্টির কথায় কাউকে বুঝতে দেয়নি। মা তুমি আবার কাউকে বলে দিয়োনা তাহলে নার্স আন্টির সমস্যা হবে। নার্স আন্টির কাছে যখন শুনলাম আমার রিপোর্ট আর অর্পিতার রিপোর্ট ম্যাস করেছে তখন কি যে ভাল লেগেছিল। কিন্তু নার্স আন্টি যখন বলল আমার দুটো কিডনিই অর্পিতাকে দিয়ে দেবে আর আমি মরে যাব। তোমার, বাবার আর দাদুর নাকি একই মত। তখন আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি অনেক ছোট তাই না মা, তাই আমার ভয় পাওয়ারি কথা। তাই নার্স আন্টির কথায় পালিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যখন প্রিয় বোন অর্পিতার মুখচ্ছবি চোখের সামনে বেসে উঠল তখন কিছুতেই পালাতে পারলাম না। মা তুমি বল তো আমার বোন আমার জন্যই মরে যাবে এটা আমি হতে দিতে পারি? তাই ফিরে এসেছি। ফিরে এসে তোমাদের মিথ্যা বলেছি, মা আমায় ক্ষমা কর। আচ্ছা মা তুমি কি মন থেকে চাইতে যাতে আমি আর তোমাদের মাঝে না থাকি? হয়তো তাই চাইতে? আর মহান সৃষ্টিকর্তা কখনই মায়ের চাওয়া অপূর্ণ রাখে না। আচ্ছা মা আমাদের দুজনকেই কি বাচিয়ে রাখা যেত না?

যাই হোক মা, তোমাদের ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারলাম বলে আজ আমি অনেক হ্যাপি। তোমাকে, আব্বুকে, দাদুকে, রহিমা আন্টিকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমায় ক্ষমা কর আর তাদেরকেও ক্ষমা করতে বল। মা আমার স্কুল ব্যাগের ভিতরের পকেটে পাঁচশ ত্রিশটা টাকা আছে। টিফিন থেকে জমিয়েছিলাম। স্কুলে শওকত মামার কাছ থেকে আইসক্রিম খেয়েছিলাম বাকিতে। পরে আর স্কুলে যেতে পারিনি বলে দিতে পারিনি। ত্রিশ টাকা পায় আমার কাছে। ওখান থেকে পাঁচশ অর্পিতাকে আর বাকি ত্রিশ টাকা অর্পিতাকে বল যেন শওকত মামা কে দিয়ে দেয়। টিফিন বক্সে দেখ অনেকগুলো চকলেট আছে। অর্পিতা প্রতিদিন চকলেট চাই তো বলে কিনে রেখেছিলাম। সবগুলো তাকে দিয়ে দিও। মা এখন ভিষন কষ্ট হচ্ছে। আর লিখার শক্তি পাচ্ছি না। চোখ থেকে লোনা জল আপন মনে বের হয়ে গাল বেয়ে মাটিতে নামছে। তোমরা সবাই ভাল থেকো।”

ইতি,
আবির।

চিঠি পড়তে গিয়ে নিলুফার ইয়াসমিনের চোখের পানিতে প্রায় অর্ধভেজা হয়ে গেছে। এমন সময় হঠাৎ অর্পিতার ডাক। মা কি হয়েছে তোমার কাদঁতেছো কেন? ভাইয়ার কথা মনে পড়েছে? মেয়ের এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই নিলুফার ইয়াসমিনের কাছে। কোন কথা না বলে আবিরের ব্যাগ থেকে টাকা আর চকলেট বের করে দেয় অর্পিতাকে। আর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অঝরে কাঁদতে থাকে।

গল্পের বিষয়:
জীবনের গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত