জীবনের গল্প

জীবনের গল্প

ইদানিং বাড়িতে একটা নতুন আপদ তৈরি হয়েছে তাহলো আমার ছোট বোন স্বর্নার বান্ধবী মিলি।বয়স আর কতই হবে এই ২০-২১।বোনের বান্ধবী বাসায় আসা যাওয়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আজকাল সে আমার ব্যক্তিগত জিনিসেও হাত দেয়া শুরু করছে।কিছু বলতেও পারছিনা আবার সহ্য করতে পারছিনা।যেখানে আমার ঘরে স্বর্না আম্মুই দরকার ছাড়া ঢুকেনা খুব একটা সেখানে এই মেয়ে আজকে রুমে ঢুকে রুম গুছাইসে।রুমে ঢুকেই মেজাজ খারাপ আমার।

মিথির ছবিটা ডানপাশ থেকে সরিয়ে টেবিলের বাম পাশে রাখছে।রাগ কন্ট্রোল না করতে পারে জোরে চিৎকার করে ডাকলাম আম্মু আর স্বর্নাকে।মিলি তখনো স্বর্নার রুমে ছিল সেও চলে এসেছে।তারপর রাগে গজরাতে গজরাতে আম্মুকে বললাম আমার রুমে বাহিরের মানুষ কেন ঢুকবে??তুমি জান না আমি এইরুমে মিথি ছাড়া কাউকে কল্পনা করতে পারিনা।মিলির উদ্দেশ্যে বললাম এই মেয়ে পরবর্তীতে আমার রুমে যেন না ঢোকা হয়।বান্ধুবির কাছে আসছো ওর রুমেই থাকবা।সেদিন স্বর্নার চোখেও দেখেছিলাম অপমান হওয়ার কস্ট কিন্তু আমার কিছু করার ছিলনা।আমার সবকিছুতে শুধুই মিথির অধিকার।এমন রাগী গলায় নিষেধ করার পর ভেবেছিলাম সে হয়তো আর আসবেনা আমার রুমে।কিন্তু আমার চিন্তাধারাকে ভুল প্রমান করে আমাদের বাড়িতে ও আমার রুমে তার আনাগোনা গানিতিক হারে বেড়ে গেল।

অবশ্য আমি থাকতে খুব একটা আসতোনা।যখন অফিসে থাকতাম বেশিরভাগ সময় তখনি আসতো।আজকাল আম্মুর সাথে কিসের এতো গল্প করে জানিনা সারাদিন গুজুর গুজুর ফুসুর।কিন্তু এসব আমার একদম সহ্য হয়না। এটা শুধু আমার মিথির অধিকার এই মেয়ে কেন মিথির অধিকারে ভাগ বসাচ্ছে????তবে মেয়েটার একটা কাজ ভালো লেগেছিল। অফিস থেকে ফিরে দেখি মিথির সব ছবিগুলো দিয়ে সুন্দর করে সাজাইছে।সেদিনি প্রথমবারের মত মিলিকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম বোনের রুমে গিয়ে।আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব সৃষ্টি হলো।তবে আমার দিক থেকে সেটা শুধুই একটা বন্ধুত্ব মাত্র কিন্তু মিলি বিষয়টা এভাবে এগিয়ে নিয়ে ভাব্বে আশা করিনি।গতকাল অফিস থেকে ফিরে রুমে ঢুকেই দেখি একটা চিরকুট ভাজ করে রাখা।চিরকুট টা খুলে পড়ে রাগে আমার গা জ্বলে যেতে লাগলো।

রাগ কন্ট্রোল করে ছোট বোনরে ডাকলাম তারপর ওর থেকে মিলির ফোন নাম্বার নিয়ে মিলিকে আগামীকাল বিকেলে বাড়ির কাছের পার্কটায় দেখা করতে বললাম। পরেরদিন বিকেলে পার্কে গিয়ে দেখি আমার আগেই আসছে মিলি, পড়ে এসেছে একটা কালো শাড়ি খোলা চুলে।অনেক কস্টে নিজেকে বুঝ দিলাম রাগারাগি করে লাভ হবেনা ভালভাবে বুঝাতে হবে।তারপর মিলির পাশে গিয়ে বসলাম। মিলি কিছু বলতে চাইতেই আমি আটকে বললাম মিলি আমার জীবনে একটা অতীত আছে। সেটা আমি চাইলেই কোনদিনও ভুলতে পারবোনা।মিলি যথাসম্ভব নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে আমাকে জিজ্ঞাস করলো আমি শুনতে চাই পুরোটা।আমি বলা শুরু করলাম আমার সেই সোনালি দিন গুলোর কথা চোখ বন্ধ করেঃ মিথি চলে গেছে ৩বছর হতে চলল তবুও নিজেকে এখনো গুছিয়ে নিতে পারিনি।সত্যি বলতে এখনো অনুভব করি মিথি আমার পাশেই আছে।আমার আজো মনে সেই দিনটার কথা।ছিপছিপে বৃষ্টি পড়ছিলো। আমার কাছে বায়না ধরলো ফুচকা -চটপটি খাবে।

অবশ্য খুব বেশিদুর যেতে হবেনা বাসা থেকে একটু দুরেই পার্কটার কাছে ফুচকা মামার দোকান।মাঝখানে বিশ্বরোড।আমি সচরাচর মিথিকে রাস্তা পার হতে দেইনা।কেন জানি একটা অজানা ভয় কাজ করে যন্ত্র৷ দানব গুলোকে দেখে।ছাতা মিথির হাতে দিয়ে রাস্তার ওপারে গেছিলাম ফুচকা আনতে।ফুচকা মামা কেন জানি দেরি করতেছিলো ফুচকা।অন্যদিকে মিথি মেয়েটা এমনি বাচ্চা স্বভাবের ধৈর্য একটু কম। বারবার তাগাদা দিচ্ছে রাস্তার ওপাশে যাওয়ার জন্য। আমি হাত দিয়ে ইশারা দিয়েছিলাম ওপাশেই থাকতে আমি আসছি।কিন্তু মিথি মনেহয় বুঝেছিল উল্টোটা ও ভাবছে আমি হয়তো ওকে রাস্তা পার হতে বলেছি।ডানে বামে না তাকিয়েই পার হতে গেছিল।রোড ডিভাইডার পার হয়ে এপাশে এসেওছিল প্রায়।হঠাত একটা দ্রুতগামি মাইক্রোবাস ধাক্কা দিল।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার দুনিয়াটাই বদলে গেল।

ধাক্কা খেয়ে মিলি পড়লো পিচ ঢালা ভেজা রাস্তাটার উপর।পাগলিটার রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো রক্ত।সেদিনের মত চিৎকার আমি আর কোনদিনো করিনি মনেহয় শুধুমাত্র একটু হেল্প এর জন্য।কিন্তু কেউ দাড়ায়নি।উপায় না দেখে একটা রিক্সা ডেকে মেডিকেলে নিয়ে গেছিলাম।আমার আজো মনে পড়ে সেই রক্তভেজা মুখটা।হাসপাতালে পৌছে ডাক্তার ডাকার পর মিথিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল।আমার বারবার মনে হচ্ছিলো মিথির মায়াবি মুখটা।বারবার নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিলো কেন যে হাত দিয়ে ইশারা করতে গেলাম।বাসায় ফোন দিতেই আম্মু ছোটবোন আসলো কিছুক্ষনের মধ্যেই।সবার চোখে মুখে আতংক একটা হারানোর ভয়। এই মেয়েটাই আমার পরিবারটাকে মাতিয়ে রাখতো সবসময়।এরেঞ্জ ম্যারেজ ছিল আমাদের।আম্মুর বান্ধুবি মেয়ে।তারপর কিভাবে যেন পুরো পরিবারটাকেই নিজের করে নিলো খুব তাড়াতাড়ি। একটু পর ডাক্তার বের হলো অপারেশন রুম থেকে মুখ কালো করে।আমার কাধে হাত রেখে যে দুই বাক্যের কথাটা বলেছিলো তা আজো আমাকে ঘুমাতে দেয়না।

ইয়ংম্যান কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ, আমরা সাধ্যমত চেস্টা করেছি কিন্তু পারলাম না।এরপর জ্ঞান হারিয়েছিলাম।কিভাবে কি হয়েছে কিচ্ছু জানিনা।জ্ঞান ফিরেছিল ২দিন পর ততক্ষনে আমার মিথিকে কবরদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।আমি এমনি এক হতভাগা স্বামী যে তার স্ত্রীর মুখটাও শেষবারের মতোও দেখতে পারিনি।এরপর আমার দুনিয়াটা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসতে লাগলো।বেচে থাকার ইচ্ছাটাই মরে গেল।পরিবারের সাথে দুরুত্বটাও বেড়ে গেল সমানুপাতিক হারে।দিনে অফিস আর অফিস শেষে খাবার সময় ছাড়া রুম থেকেই বের হতাম না।আস্তে দিন গড়িয়ে মাস পার হলো কিন্তু আজো মিথিকে সেই আগের মতই অনুভব করি আমি।

প্রত্যেক শুক্রবার আমার রুটিন হলো সকালটা মিথির বাবা মার সাথে কাটানো।মানুষ দুইটা কেমন জানি হয়ে গেছে একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে।তারপর জুমার নামাজ আদায় করে জুরাইন কবরস্থানে যাই আমার মিথির সাথে দেখা করতে। ইশ মিথি যদি এতদিন বেচে থাকতো তাহলে আমাদের হয়তো বেবিও হতো।চোখ ফেটে জল আসে।মিথির জন্য আনা বেলি ফুলের মালাটা রেখে চোখ মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসি।আমি বলা শেষ করে মিলির দিকে তাকাতেই দেখি মেয়েটা কাদছে।কাদুক আমি আস্তে করে উঠে বাসার দিকে হাটা ধরলাম।ভেবেছিলাম মিলি দমে যাবে আর বিরক্ত করবেনা।কিন্তু আমাকে ভুল প্রমান করে সে আরো দ্বিগুন অনুপ্রেরনা নিয়ে শুরু করলো।গত মাসের শেষ শুক্রবারে সকালে মিথিদের বাসায় গিয়ে দেখি সেখানেও এই পাজি মেয়েটা হানা দিয়েছে।মিথির আব্বু আম্মুর সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।

অনেকদিন পর মানুষ দুইটাকে হাসতে দেখলাম প্রান ভরে।নাস্তার সময় আংকেল তো বলেই ফেলল বাবা এভাবে আর কতদিন??আমরাও তো বুঝি তুমি এবার নতুন করে শুরু করো জীবনটা।আমরা বেচে থাকতেই তোমার একটা গতি দেখতে চাই।সেদিন আংকেলের চোখে যে অসহায়ত্ব দেখেছি ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।এরপর থেকে মিথিদের বাসায় যাওয়াও কমিয়ে দিয়েছি।গেলেই মানুষ দুইটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবার বিয়ের কথা বলে।দ্বিতীয়বার অবাক হলাম আজকে নামায শেষে জুরাইন কবরস্থানে গিয়ে।মোনাজাত শেষে ভালভাবে তাকিয়েই দেখি একটা তাজা বকুল ফুলের মালা রাখা।আমার বোঝা শেষ এই কাজটা কে করেছে।তারপর আমার মালাটা দিয়ে চলে আসলাম।দিন দিন মেয়েটা মিথির জায়গাটা নিতে উঠেপড়ে লেগেছিল।নিজের কাছেই নিজেকে ছোট ছোট লাগছিলো।

সত্যি বলতে মিলিকে ভালোভাবে বুঝাতে হবে যে আমার সবকিছুতেই মিথি মিশে আছে।এবার আমি নিজেই ডাকলাম মিলিকে পার্কে বিকেলে।এবারো গিয়ে দেখি পাগলী মেয়েটা আগেই হাজির।এবার গিয়ে সরাসরি বলেই ফেললাম মিলি তুমি যেটা চাইছো সেটা কোনদিনো সম্ভব না।আমি মিথির জায়গাটা আমি কাউকেই দিতে পারবোনা।বলেই পার্ক থেকে বেড়িয়ে এসেছি।আনমনে হেটে হেটে যে মাঝ রাস্তায় এসেছি খেয়ালই করিনি।হঠাত কেজানি ধাক্কা দিল পড়লাম গিয়ে রোড ডিভাইডারের উপরে।পিছনে ফিরেই দেখি একটা মাইক্রোবাস মিলিকে ধাক্কা দিল।ধাক্কা খেয়ে মেয়েটা কয়েক ফুট দূরে গিয়ে পরলো।রাস্তা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।তবুও মেয়েটার চোখে মুখে একটা প্রশান্তি দেখতে পেয়েছিলাম।ফর্সা মুখটা রক্তে লাল হয়ে গেছে।এবার আর দেরি করিনি কোলে করেই নিয়ে গিয়েছি মেডিকেলে।

বারবার মনে হচ্ছিলো একটা মেয়েটার কিছু হলে আমি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা।আবার সেই অপারেশন রুম।ভয়ে মনটা বারবার কেদে উঠছে।কি জবাব দিবো মেয়েটার বাবা মার কাছে।ভয়ে ভয়ে বাসায় কল দিয়ে আম্মুকে জানালাম।অল্পক্ষনের মধ্যেই আম্মু, স্বর্না, মিলির আব্বু আম্মু সবাই চলে আসছে।ঘন্টা খানেক হলো ডাক্তার বেরোচ্ছে না কেন।ডাক্তার বেরিয়েই জিজ্ঞাস করলো পরাগ কে?? আমি বললাম আমি। উনি বল্লেন আপনি আপনি ভিতরে যান। রোগি বার বার আপনার কথা জিজ্ঞাস করছে।ভিতরে গিয়েই দেখি মেয়েটা চুপচাপ শুয়ে আছে।আমি পাশে গিয়ে বসলাম।ভালোভাবে দেখছে আমায় আমার কোন ক্ষতি হইছে কিনা।চোখের জল আটকাতে পারিনি সেদিন।বাচ্চাদের মত কেদেছিলাম মিলির হাত দুইটা ধরে।এরপর মিলি আস্তে আস্তে সুস্থ হতে লাগলো।শুক্রবারে দেখা করতে গেলাম মিথির বাবা মার সাথে।এবার

আংকেল আন্টিতো কেদেই দিলেন বারবার হাত দুটো ধরে বলছিলো বাবা এবার মেয়েটা ফিরুক হাসপাতাল থেকে।আমরা নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ে দিব তোমাদের।তুমি না বলিওনা।মিলিকে যেদিন মেডিকেল থেকে রিলিজ দেয় সেদিন মিলি ওদের বাসায় না গিয়ে মিথিদের বাসায় গেছিলো আগে।এরপর সবাই মিলে ধরে আমাদের বিয়েটা দিয়ে দিলো।নাহ মিথির জায়গা নেয়নি কেড়ে তার বদলে নিজে একটা আলাদা জায়গা বানিয়ে নিয়েছে।আজকে শু্ক্রবার আমি আর মিলি যাচ্ছি মিথিদের বাসায় দেখা করতে তারপর দুপুরে নামায পড়ে মিথির সাথে দেখা করতে যাবো জুরাইনে। দোয়া করবেন সবাই আমাদের জন্য।

গল্পের বিষয়:
জীবনের গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত