ব্যারি নামের কালো ছেলেটি

ব্যারি নামের কালো ছেলেটি

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুল। একদিন এই স্কুলের শিক্ষিকা ইস ডারমাওয়ান তার ক্লাশে শিক্ষার্থীদের রচনা লিখতে দিলেন। রচনার বিষয় ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’। সহজ রচনাটা তারা লিখলো, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বৈমানিক হতে চায়। তবে একটা খাতা দেখে শিক্ষিকা ডারমাওয়ান একটু নয় বেশ খানিকটা অবাক হলেন, মজাও পেলেন। অবাক হবার মতোই। কারণ ব্যারি নামের কোঁকড়া চুলের ছোট্ট একটি ছেলে তার খাতায় লিখেছে- ‘আমি বড় হয়ে প্রেসিডেন্ট হতে চাই’।

তিন বছর পর। ১৯৭১ সালের কথা। সেই আজব ছেলেটি জাকার্তার একটি সরকারি স্কুলে ভর্তি হলো। এবারও শ্রেণী শিক্ষিকা ফারমিনা ক্যাটারিনা সিনাগা ছাত্রছাত্রীদের একই বিষয়ে রচনা লিখতে দিলেন। সেই কোঁকড়াচুলো ছেলেটি এবারও লিখলো ‘আমি প্রেসিডেন্ট হতে চাই’। ৩৭ বছর আগের এই ছোট্ট ঘটনাটা ষ্পষ্ট মনে রেখেছেন শিক্ষিকা কাটারিনা। ভিন্ন দেশের মানুষ হয়েও তিনি অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিলেন এবারের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে। কারণ তার সেই কোঁকড়াচুলো ছাত্রই যে এবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন তার প্রিয় ছাত্রটি তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে কিনা।

শুধু এই শিক্ষিকাই নন, তার মতো জাকার্তার আরও অনেকেই তাকিয়ে ছিলো নির্বাচনের ফলাফলের দিকে। এদের কেউ ব্যারির শিক্ষক কেউবা তার দুরুন্ত ছেলেবেলার বন্ধু কেউবা তার প্রতিবেশী। তারা সবাই জানতো ব্যারির মনের এই তীব্র ইচ্ছার কথা, তার ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা। না, ব্যারি কাউকেই হতাশ করেনি। সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ আমেরিকার নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান। সেই ছেলেটিই তোমাদের সবার পরিচিত আজকের বারাক ওবামা, আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট।

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ। এটি আমেরিকার একটি অঙ্গরাজ্য, যার রাজধানী হনলুলু। হনলুলু বিশ্ববিদ্যালয়ে সুদূর কেনিয়ার এক অজ পাঁড়া থেকে পড়ালেখা করতে এসেছিলেন বারাক ওবামার বাবা কৃষ্ণাঙ্গ বারাক হুসেন ওবামা সিনিয়র। এদিকে আমেরিকার কানসাস থেকে শেতাঙ্গ ডানহ্যাম পরিবার এসেছিলো সেখানে এসেছিলো জীবিকার সন্ধানে। এই পরিবারের মেয়ে স্ট্যানলি অ্যান ড্যানহামের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনাক্রমে পরিচয় হয় ওবামা সিনিয়রের। পরিচয় থেকে পরিণয়, তারপর দুজনে একদিন সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে শেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বিয়ে অবৈধ জেনেও তারা পিছপা হননি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তার ঘর আলো করে একটি ছেলে জন্ম নেয়। দিনটি ছিলো ১৯৬১ সালের ৪ আগস্ট।

বাবা-মা আদর করে ছেলের নাম রাখেন বারাক হুসেন ওবামা। ডাক নাম ব্যারি। বারাক অর্থ আশীর্বাদপ্রাপ্ত। কে জানতো এই কালো ছেলেটিই সবার আশীর্বাদে একদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবে! ভাবতেও পারেনি তারা এই ছেলেটিই একদিন ঘুচিয়ে দেবে আমেরিকান সমাজের ঘৃণ্য বর্ণবাদ প্রথা; এনে দেবে অবিস্মরণীয় এক পরিবর্তন। ভবিষ্যতের কথা কেইবা আগাম টের পায়, তাই বাবা-মাও ভাবতে পারেননি সেকথা। সে যাক, বাবা-মার আদরে বেড়ে উঠছিলো ছোট্ট ব্যারি। কেটে যাচ্ছিলো তার সোনালী দিনগুলো।

ব্যারি ওরফে বারাক ওবামা, যার এবারের নির্বাচনী শ্লোগানে ছিলো পরিবর্তনে আস্থা রাখুন, তার নিজের জীবনেতো পরিবর্তনের পালাবদল থাকবেই। আসলেই তার গোটা জীবন জুড়েই ছিলো উত্থান-পতন আর নানান পালাবদল। তাই এই স্বপ্নময় স্বাভাবিক জীবনে ছন্দপতন ঘটতে বেশি দিন লাগলো না তার। সে ভালোমত কিছু বোঝার আগেই বাবা মা একদিন আলাদা থাকতে শুরু করলেন। ব্যারির বয়স তখন মাত্র দুই বছর। দুজনের ডিভোর্স হতেও বেশিদিন লাগলো না। জীবনের এসব জটিল হিসেব বোঝার বয়স তার তখনও হয়নি। মায়ের কাছেই থাকতো কালো চামড়ার ছোট্ট ছেলেটি।

কিছুদিন পর মা অ্যান ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের লোলো সোয়েটরো নামের আরেক বিদেশি ছাত্রকে বিয়ে করেন। লোলো ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। ১৯৬৭ সালে এই দম্পতি হনলুলু ছেড়ে পাড়ি দেন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায়। সঙ্গে ছয় বছরের বারাক ওবামা ওরফে ব্যারি।

রাজধানী জাকার্তায় এসে নাম বদলে যায় ব্যারির। সৎ বাবার সাথে মিল করে তার নাম রাখা হয় ব্যারি সোয়েটরো। নামের সাথে সাথে তার জীবনও বদলে যায়। শহরতলীতে বাস করতো সোয়েটরো পরিবার। নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকদের এই আবাস এলাকার রাস্তাঘাট তখনও ছিলো মাটির। প্রায় গ্রামের মতো এলাকাটিতে ইট সিমেন্টের জঙ্গলের চেয়ে গাছগাছালিই ছিলো বেশি। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো জলাভূমি। এমন গ্রাম্য পরিবেশে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বেড়ে উঠতে থাকে ব্যারি।

কিছুদিন পর স্থানীয় একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয় ব্যারিকে। পড়ালেখার ব্যাপারে মা অ্যান ছিলো কঠোর। অবশ্য এমনিতে খুব আদর করতেন ছেলেকে। তাকে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করতে শেখাতেন প্রকৃতিপ্রেমী মা অ্যান। হয়তো কোনদিন আকাশ আলো করে উঠেছে ফুটফুটে চাঁদ। রূপালি আলোয় থৈ থৈ করছে পুরো চরাচর। অমনি মা ছুটলেন তার আদরের ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে। ইচ্ছে ছেলেকে জোসনা দেখাবেন। মা-বেটা এভাবে অনেক সময় কাটিয়েছে চাঁদের আলোয়। কিন্তু পড়ালেখায় ফাঁকি তিনি সহ্য করতেন না। এই নিয়মতান্ত্রিকতাই হয়ত প্রভাব ফেলেছিলো ব্যারিকে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে।

আর দশটা ছেলেদের চেয়ে একটু আলাদারকম ছিলো সে, চিন্তা-ভাবনাও অন্যরকম। সে ভাবতো, একদিন সে কোন এক দেশের প্রসিডেন্ট হবে। ঠিক যেনো রূপকথার কোন গল্প। যদিও সে ঠিকমত জানতো না কোন দেশের। মনের কথাটা সে ক্লাশের রচনায় লিখে অবাক করে দিয়েছিলো শ্রেণী শিক্ষিকাকে। সে কথা তোমাদের প্রথমেই বলেছি।

সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশের নতুন ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিবেশের মধ্যে এসে শুরু হয়েছিলো তার নতুন এক জীবন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সবাইকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে মাত্র ছয় মাসে সে ইন্দোনেশিয়ার ভাষা, আচার আচরণ শিখে ফেলে। তবে এতোকিছুর পরও শুধু গায়ের রঙ কালো হবার কারণে তাকে বেশ বিব্রত অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। তার বয়সী ছেলেরা তাকে নানাভাবে উত্যক্ত করতো। প্রথম প্রথম বেশ খারাপ লাগতো তার। কিন্তু যন্ত্রণা থেকে বন্ধুরা রেহাই দিতো না তাকে।

একদিন পাড়ার বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলছিলো ব্যারি। এ সময় অন্য পাড়ার কিছু ছেলে তাদের খেলায় বাঁধা দিচ্ছিলো। কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারছিলো না ওই পাজি ছেলেদের। ব্যারি সহ্য করতে না পেরে রেগেমেগে বাড়ি চলে যায়। সবাই ভাবলো, ব্যারি বোধহয় ভয় পেয়ে চলে গেল। কিন্তু না! তাদের ভুল ভাঙলো কয়েক মুহূর্ত পরই। সে আবার ফিরে আসে মাঠে। এবার তার সাথে একটা পোষা কুমিরের বাচ্চা। এই কুমিরের বাচ্চা নিয়ে সে ওই দুষ্টু ছেলেদের পিছে তাড়িয়ে ধরে। ছেলেগুলো ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। তারপর তাদের আর ব্যারিকে বা তার বন্ধুদের উত্যক্ত করা দূরের কথা ওই পাড়াতেই আসতে দেখা যায়নি। এই ঘটনার পর ব্যারিকে আপন করে নেয় তার পাড়ার ছেলেরা। বন্ধুদের নয়নের মণি হয়ে ওঠে সে ক্রমেই। ছাত্র হিসেবেও ব্যারি ছিলো মেধাবী আর চোখে পড়ার মতো। তাই তো এতো বছর পরও তার শ্রেণী শিক্ষক ও শিক্ষিকা এখনও তাকে ভোলেননি। তারা খুব ভালোমতই মনে রেখেছেন তাকে। এমনকি ছোট্টবেলায় সে যে রচনা লিখেছিলো সেটার কথাও তাদের স্পষ্ট মনে আছে।

এই শিক্ষকদের একজন কুসুনোকি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, “ওবামা তার ছাত্রদের মধ্যে মেধাবী আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন। সে ছিলো অন্যদের চেয়ে আলাদা। আমার ষ্পষ্ট মনে আছে, সে যেখানে হাত দিতো সেখান থেকেই সাফল্য নিয়ে আসতো।”

তার শ্রেণী শিক্ষিকা ফারমিনা সিনাগা ব্যারির মধ্যে ছোটবেলা থেকেই দেখেছিলেন নেতৃত্বের গুনাবলী। তিনি জানান, “ব্যারির শারীরিক গঠন ছিলো সুন্দর, আকর্ষণীয়। এজন্য সবাই তাকে খেয়াল করতো আর তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতো।”

আরেক দিনের ঘটনা। জাকার্তায় ব্যারির পাড়ার ছেলে জুলফান আদি। ছেলেমানুষী কারণে এই ছেলেটির সাথে একদিন ঝগড়া লেগেছিলো ব্যারির। কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি। হাতাহাতির এক পর্যায়ে আদি মাঠের পাশের জলাভূমিতে ফেলে দিয়েছিলো ব্যারিকে। সেই ছোট্ট আদির বয়স আজ প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। সে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানায়, “আমি এখনও ব্যারিকে ভুলিনি। সে খুব স্মার্ট আর মেধাবী ছিলো। কিন্তু সে এখানে যেমন হঠাৎ করে এসেছিলো তেমনি হঠাৎ করেই একদিন অদৃশ্য হয়ে যায় একদিন।” আসলে জাকার্তায় মাত্র চার বছর কাটিয়েছিলো ব্যারি। ১৯৭১ সালে হঠাৎ করেই পরিবর্তের ডাক আসে তার ১০ বছর বয়সের জীবনে। মা, সৎ বাবা আর প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে সে আবারও ফিরে আসে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে। এবার নানা-নানীর সাথে থাকতে শুরু করে বারাক ওবামা ওরফে ব্যারি। তার নানি ম্যাডেলিন ডানহ্যাম একসময় তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠে। তার জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন এই মানুষটি।

হনলুলুতে ফিরে এসে তার সাথে হঠাৎ করেই একদিন দেখা হয়ে যায় তার আসল বাবার সাথে। সংক্ষিপ্ত সেই সাক্ষাৎই ছিলো তার বাবার সাথে শেষ দেখা। কারণ এরপর তার বাবা হনলুলু ছেড়ে চলে যান। পরে ১৯৮২ সালে এক গাড়ী দূর্ঘটনায় মারা যান তিনি।

এরপর হনলুলুর নামকরা পুনাহো (চঁহধযড়ঁ) স্কুলে ভর্তি হয় ব্যারি। এখানেও বর্ণবৈষম্যের শিকার ছিলো সে। অনেকেই ভাবতো, ব্যারি বা তার বাবা হয়তো মানুষ খেকো। অনেকেই তাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে চাইতো। তা সত্ত্বেও স্কুলের বাস্কেটবলের সেরা খেলোয়ারদের তালিকায় ছিলো সে। কিন্তু শুধু গায়ের চামড়া কালো হবার অপরাধে এখানেও অবহেলিত হয়েছিলো সে। এই স্কুল থেকেই ১৯৭৯ সালে সে হাই স্কুল গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে।

বড় হল কালো ছেলেটি

স্কুল শেষ করে নানা-নানিকে ছেড়ে ব্যারি পাড়ি জমান আমেরিকার মূল ভূখণ্ড লস এঞ্জেলসে। সেখানে অক্সিডেন্টাল কলেজে ভর্তি হন। দুই বছর সেখানে পড়ার পর নিউ ইয়র্ক শহরের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হয়ে যান। এখানেই তার সাথে পরিচয় হয় মিশেল রবিনসনের সাথে। ১৯৮৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষে নিউ ইয়র্কে কিছুদিন বিজনেস ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশনে এবং নিউ ইয়র্ক পাবলিক ইন্টারেস্ট রিসার্চ গ্রুপ নামের দুটো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিন্তু এখানে মন টেকে না তার। শীগ্রই পাড়ি জমান আমেরিকার আরেক শহর শিকাগো-তে। ১৯৮৫ সালে এখানে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সাফল্যের সাথে তিন বছর এখানে কাজ করেন।

১৯৮৮ সালে ব্যারি প্রথমবারের মতো ইউরোপ ভ্রমণ করেন। এছাড়া একই বছর তিনি তার পিতৃভূমি কেনিয়ায় যাত্রা করেন প্রথমবারের মতো। সেখানে তার অনেক আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা হয় প্রথমবারের মতো। কেনিয়া থেকে ফিরে এসে জীবনকে নতুন করে উপলদ্ধি করেন ব্যারি। নিজের জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে নতুন করে ভাবতে থাকেন।

ওই একই বছর হার্ভাড ল কলেজে ভর্তি হলেন। কলেজে বছর শেষে তার ঝুলিতে অনেকগুলো সফলতা দেখা গেল। আর তার পুরষ্কার হিসেবে হার্ভাড ল রিভিউয়ের সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৯০ সালে সে ল’ রিভিউয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। ল রিভিউয়ের ১০৪ বছরের ইতিহাসে ওবামা প্রথম আফ্রো-আমেরিকান বংশোদ্ভুত তথা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। জীবনে সেই প্রথমবার পেলেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বাদ পেল। ১৯৯১ সালে হার্ভাড ল’ কলেজ থেকে জুরিস ডক্টর ডিগ্রি নিয়ে ওবামা শিকাগো শহরে ফিরে আসেন। এখানে শিকাগো ল’ স্কুল তাকে জাতিগত সম্পর্ক বিষয়ে একটি বই লেখার জন্য নিয়োগ করা হয়। ‘ড্রিমস ফ্রম মাই ফাদার’ নামের এই বইটি পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়েছিলো।

১৯৯২ সালে ওবামা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। স্ত্রীর মিশেল ওবামা (মিশেল রবিনসন)। এই ফাঁকে একটু জানিয়ে দেই, ওবামা-মিশেল দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় দুই মেয়ে। তাদের একজন মালিয়া অ্যান ওবামা (জন্ম ১৯৯৯) এবং আরেকজন নাতাশা ওবামা সাশা (জন্ম ২০০১)। শত ব্যস-তার মাঝেও ওবামা তার স্ত্রী বার সন্তানদের সময় দেন। আদর দিয়ে ভরিয়ে দিতে চেষ্টা করে সন্তানদের সোনালী শৈশব। এ কারণে জননেতা হওয়ার সাথে সাথে একজন ভালো স্বামী আর তার সন্তানদের চোখে তিনি একজন সুপারম্যান।

আসলে শুধু নিজের সন্তানদেরই নয় সব শিশুদের ওবামা খুব পছন্দ করেন। শিশুদের দেখে তিনি হারিয়ে যান তার ফেলে আসা নিজের শৈশবে। শিশুদের কাছে পেলে তাদের সাথে খুনসুটিতে মেতে ওঠেন তিনি। এবার নির্বাচনী প্রচারণায় তাই শিশুদের কাছ থেকে ওবামা পেয়েছে বিপুল সাহায্য সহযোগিতা। সে গল্পে পরে আসছি।

আগের কথায় ফিরে আসি। এরপর ওবামা প্রতিবছরই একটু একটু করে আরও সামনে এগিয়ে গেছেন লালিত স্বপ্নের দিকে। তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতার স্বাদ পেয়েছেন।

১৯৯২ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ স্কুলে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী একটানা বার বছর সেখানে আইন শিক্ষা দিতে থাকে। এসব সাফল্যের মাঝে এক গভীর দুঃখ এসে কাঁদিয়ে যায় তাকে। ১৯৯৫ সালের একদিন ছেলের সর্বোচ্চ সাফল্য দেখে যাবার আগেই ক্যান্সারে মারা যান ওবামার মা। এর আগেই হারিয়েছিলো বাবাকে। কাছের মানুষগুলোকে এক এক করে হারাতে থাকেন তিনি। তবে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েননি তিনি।

অনেক চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে সে ১৯৯৬ সালে ইলিনয়ের সিনেটর নির্বাচিত হন ওবামা। একইভাবে ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালেও তিনি পূণর্বার নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৪ সালে তার ঝুলিতে জমা হয় আরেকটি সাফল্য। সে বছর বোস্টনে ডেমোক্রেটিক দলের জাতীয় সম্মেলনে এক বক্তৃতা দেন তিনি। ওবামার শক্রপক্ষও স্বীকার করবে ওবামার বৃক্ততা দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করার ক্ষমতাকে। যাই হোক, সেই ভাষণে সে মার্কিন অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো পাল্টানোর কথা এবং ইরাক যুদ্ধে বুশ প্রশাসনের ঘৃণ্য ভূমিকার কথা বলেছিলেন। আরও বলেছিলেন, “উদারনৈতিক আমেরিকা বা রক্ষণশীল আমেরিকা বলে কোন কথা নেই। আমরা জানি আমেরিকা একটাই আর সেটা হলো ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।” তার এই যুগান-কারী ভাষণের কারণেই সেদিন জাতীয় এক ব্যক্তিত্ব বনে যায় ওবামা।

এরপর ২০০৪ সালে আমেরিকার সিনেট নির্বাচনে অংশ নিয়ে ওবামা ৭০% ভোট নিয়ে জিতে যান। এ জয়ের পেছনে তার ২০০৪ সালের বোস্টনের ভাষণের প্রভাব আছে বলে অনেকেই মনে করেন। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় তার বেষ্ট সেলার মর্যাদা পাওয়া বই ‘অডাসিটি অব হোপ’। এরপর ২০০৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান ডেমোক্রেটিক দল থেকে। তারপর এলো ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক ৪ নভেম্বর। সেদিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিপক্ষ রিপাবলিক দলের পদপার্র্থী জন ম্যাককেইনকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হন বারাক ওবামা। সেই সাথে সে হয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের মহানায়ক।

আজ থেকে প্রায় চারশত বছর আগে এই আমেরিকাতেই পা রেখেছিলো ওবামার পূর্বপুরুষরা। তবে শুনে অনেকেই অবাক হবে, আফ্রিকা থেকে আসা তার কৃষ্ণাঙ্গ পূর্বপূরুষরা ছিলো শেতাঙ্গদের দাস। সব রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত আর চরমভাবে নির্যাতিত ছিলো তারা। যার করুণ বর্ণনা পাওয়া যায় হ্যারিয়েট বিচার স্টো’র ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ বইটিতে। তারপর অনেকদিন চলে গেছে। অনেক সংগ্রামমুখর ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে কালো মানুষেরা নিজেদের শরীরের রক্ত দিয়ে। ভাবতেও অবাক লাগে, আজ সেই বর্ণবিদ্বেষী সমাজের মানুষের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

কয়েক দশক আগে যে বালক স্বপ্ন দেখতো, একদিন সে এক দেশের প্রেসিডেন্ট হবে, আজ সে সত্যি সত্যিই প্রেসিডেন্ট। এবং সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের। হাজারো মানুষকে শুভ পরিবর্তনের এক অদম্য স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন তিনি। তার স্বপ্ন স্পর্শ করেছে হাজারো মানুষের হৃদয়। আসলে ব্যারির লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে এইসব জনগনই। ওবামার সাফল্যের কাহিনী রূপকথাকেও হার মানায়। কিন্তু মসৃন পথে নয়, এতদূর তাকে আসতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের পথে। এবার সেই স্বপ্নমুগ্ধ হাজার হাজার মানুষের স্বপ্নপূরণের পালা এসেছে ওবামার। শুধু আমেরিকার স্বপ্নমুগ্ধ মানুষই নয়, কিম্বা তার বাল্যকালের শিক্ষক-শিক্ষিকা বা দুরন্ত বন্ধুর দলই নয়, তাদের সাথে বিশ্বের আরও অনেকেই স্বপ্ন দেখেছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের। সবাই এখন অসম্ভব এক আশাবাদ নিয়ে তাকিয়ে আছে এ কালের রূপকথার মহানায়কের দিকে। সন্দেহবাদী আর হতাশাবাদীরা এখনই বলতে শুরু করেছে, পরিবর্তন অতো সহজ কাজ নয়। কিন্তু তারা তো জানে না, শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসী আজ স্বপ্ন দেখেছে পরিবর্তনের। আর কে না জানে, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।

গল্পের বিষয়:
জীবনের গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত