জিবনের গল্প

জিবনের গল্প

গভীর রাত… মুয়াজ্জিন মাইকে ঘোষনা দিচ্ছে, “প্রিয় এলাকাবাসী.. ঘুম থেকে উঠুন, সেহরী খান, আজকে সেহরীর শেষ সময় ৩ টা বেজে ৩৯ মিনিট।” পাশ ফিরে উঠতে যাবো, তখনই খেলাম বড় ধরনের একটা ধাক্কা..! আবছা আলোতে দেখলাম আমার মত দেখতে পাশে একজন শুয়ে আছে। এইটা আবার কে..? ভয়ে ভয়ে তাকে নাড়া দিলাম, দেখলাম অচেতন। কোনো কথা বলছে না, শরীর ঠান্ডা। কিছুক্ষণ পরেই মনে হলো ভদ্রলোক মারা গেছেন। চিন্তা করলাম এই লাশটা এখানে কেন..? আবার দেখতে পুরোপুরি আমার মত..! স্বপ্ন দেখছিনা তো..? না.. সত্যিই তো অনেকক্ষণ চিৎকার করে সবাইকে ডাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এ কি! কেউই আসছেনা একটু পর দেখলাম বোন রুমের লাইট জালালো এবং ওই লাশটার কাছে এসে বললো, “ভাইয়া সেহরী খাবি না? ওঠ, সময় হয়েছে।”

আমিতো পুরোই অবাক, এইসব হচ্ছেটা কি..? ওর কাছে গিয়ে বললাম, “অই.. তোর কি মাথা খারাপ হইসে? লাশটা এই রুমে আসলো কিভাবে? এইটা কার লাশ?” দেখলাম, সে আমার কথায় কোন কর্ণপাতই করলো না। সেও লাশটা ধরে অবাক হলো এবং চিৎকার করে উঠলো মুহুর্তেই পাশের রুম থেকে আম্মু-আব্বু এসে স্তব্ধ। ধপ করে খাটে বসে লাশটাকে ধরে ঝাঁকাতে লাগলো এবং চিৎকার করতে লাগলো, “বাবা, কি হইসে তোর..? কথা বলছিস না কেনো..? কথা বল…।” আম্মু ব্যাপারটা বোঝার সাথে সাথেই বেহুঁশ। চিৎকারের আওয়াজে চাচা-চাচিরা, ভাবি, কাজিনরা সবাই জড়ো হলো। লাশটা দেখেই সবাই ইন্নালিল্লাহ পড়তে লাগলো। আশেপাশে কান্নার রোল পরে গেছে।

মুয়াজ্জিন বেচারা সেহরীর জন্য ডাকতে ডাকতে এমনিতেই হয়রান হয়ে গেছে, এখন আবার নতুন এলান করতে হবে মুয়াজ্জিন যখন আমার বাবার নাম নিয়ে বললো অমুকের ছেলে অমুক ইন্তেকাল করছে, তখন মনে হলো হাই ভোল্টেজের শক খেলাম। সবাই আমাকে বাদ দিয়ে লাশটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পরলো। কাউকেই বুঝাতে পারলাম না যে আমি বেঁচে আছি। মনে হলো সবাই পাগল হয়ে গেছে। এক কাজিনকে ক্ষেপে গিয়ে একটা ধাক্কাও মেরেছিলাম, সে দেখলাম বিন্দু পরিমাণ প্রতিবাদ করেনি।

ফজরের পর লাশটা গোসল দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। মুয়াজ্জিন সাহেব আরেক জনকে নিয়ে আসলেন গোসল দিতে। দুইজন বলাবলি করতে লাগলেন, “আরে.. মৃত্যু কার কখন আসে বলা যায় না। এইরকম তাগরা মানুষ মারা যাইবো কে ভাবসে, কাল বিকালেই তো আমাদের সাথে হাসিখুশী ভাবে কত কথা বললো।” আমি লাশটার পাশেই ছিলাম, দাঁড়িয়ে উনাদের কথা শুনছিলাম। গোসল দেয়ার পর কাফনের কাপড় পরিয়ে খাটাইয়ের ওপর লাশটা রাখা হয়েছে। লাশ ঢাকবার জন্য মসজিদ থেকে কালো রঙের কাপড়টা আনা হলো। সবাইকে শেষবারের মতো লাশ দেখার সুযোগ করে দেয়া হলো।

এখনো আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার না, কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসার আশেপাশে প্রচুর মানুষের ভিড়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই এসেছে লাশটাকে দেখতে। কত পরিচিত মানুষ কান্নাকাটি করছে। কিন্তু কাউকেই বুঝাতে পারলাম না, আমি মারা যাই নি, আমি বেঁচে আছি, এটা অন্য কারো লাশ। কেউ আমার কথা শুনতেই পারছে না।
যোহরের পর জানাজা। আযান হয়ে গেছে। লাশ নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আম্মু আর বোন লাশ ধরে সেকি কান্না। আত্মীয়রাও কেঁদে উঠলো। আহা! হৃদয়স্পর্শী এক দৃশ্য। অবাক ব্যাপার.. একদিন আগেও ঠান্ডা-সর্দী লেগে ছিলো, হাল্কা জ্বরও ছিলো, দু-এক দিন যাবৎ ঠিকমত তারাবীও আদায় করতে পারছিলাম না। কিন্তু আজ কিছুই মনে হচ্ছে না, আমি পুরোপুরি সুস্থ, আর শরীরটাও তুলার মত হালকা মনে হচ্ছে।

যাইহোক.. লাশ ঈদগাহ মাঠে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। ঈদগাহ মাঠ লোকে লোকারণ্য, একটুও জায়গা খালি ছিলো না। বাবা হালকা একটু কথা বলার পর ইমাম সাহেব একটু বয়ান করে জানাজা পড়ালেন।
জানাজা শেষে লাশ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে গিয়ে দেখলাম নানুর কবরের পাশেই একটা কবর খনন করা হয়েছে। ঠিকঠাক ভাবে লাশ দাফন করে সবাই আত্মার মাগফিরাতের জন্য দু’আ পড়তে লাগলো। মুনাজাত শেষে সবাই যার যার মত চলে গেলো কিন্তু বাবা বসে থাকলো। তাকেও জোর করে নিয়ে যাওয়া হলো।

অবশেষে আমার কাছে সব পরিষ্কার হতে লাগলো যে আসলেই আমি আর এই জগতে নেই। আহ! যদি আরেকটা সুযোগ পেতাম, তাহলে কত যে আমল করতাম, সব সময় মসজিদ মাদ্রাসাতেই পরে থাকতাম… কিন্তু তাতো আর হবার নয়। একটু পর দেখি আমি ওই বডিটার মধ্যে যাচ্ছি। আমি পুরোপুরি নিজেকে ফিরে পেলাম। এ কি..! চারদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার। অনেক ভয়ে আছি। হয়তো একটু পরই মুনকির-নাকির আসবে, বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাস করবে, না পারলেই শুরু হবে আযাব।

শুয়ে শুয়ে অন্ধকার ঘরে পুরো ঘটনাটা চিন্তা করলাম, ভাবলাম এগুলা হচ্ছেই, একদিন তো হবেই। হঠাৎ শোয়া থেকে উঠে বসলাম, শরীরের প্রতিটা লোম দাঁড়িয়ে গেছে। প্রতিটা মানুষের এভাবেই প্রতিদিন মৃত্যুকে স্মরণ করা উচিৎ।  তাহলে আশা করা যায় গুনাহ থেকে মনকে বিরত রাখা যাবে এবং কবরের প্রস্তুতি নেয়া যাবে সকলকেই অল্প সময়ের এই জীবনে মানুষের জন্য,দেশের জন্য ভালো কিছু করার মনোবল রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দান করুক ।

গল্পের বিষয়:
জীবনের গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত