আড়ালে থেকে

আড়ালে থেকে

“ও মাই গড!”

“ভয় পাচ্ছ”?

“হুম। প্লিজ,নেভার শো মি দ্যাট এনিমোর”

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি কিন্ত বলেছিলাম তবে মুখের কথায় বিশ্বাস না করলে কি আর করা! ”

“ব্যাপারটা অভাবনীয় । ছোটখাটো ডেমো না দেখে বিশ্বাস করা সম্ভব নাকি?”

“হ্যা, হাসিল করেই নিলে। কাছে আসো ভয় কাটিয়ে দিচ্ছি।”

“হিহি।এখন কাছে যেতেও ভয় হচ্ছে”

“সেই জন্যেই বলেছিলাম।

অদেখাই ভালো।”

” তুমি চিট করেছো অনিক। আমাকে আগেই জানানো উচিৎ ছিল। বাসায় এ নিয়ে বেশ সমস্যা পোহাবো। মেয়ের বফ ভ্যাম্পায়ার! সেটা কোন বাবা-মা মেনে নিবে বলো!”

“তা ঠিক লিতা। তবে সত্যি বললে তো আমাকে ভালবাসতে না। এখন থেকে আমাকে এড়িয়ে চলবে বুঝি?”

“নাহ,, কোলে নিয়ে ঘুরবো সোনা।”

” তুমি ভেবে জানিও কি করবে।আমার এখন ভালো লাগছেনা। বাই”

“আচ্ছা, সাবধানে যেও।”

মন খারাপ হয়ে গেলো অনিকের। নিজ বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে এগুতে শুরু করে। লিতা হচ্ছে তাদের কলেজেপড়া সবচেয়ে ট্যালেন্ট ছাত্রী। দেখতেও খারাপ না। কলেজ থেকেই তাদের পরিচয়। অতঃপর প্রেম। লিতার সাথে তার প্রেম সম্পর্ক ৬/৭ মাস যাবৎ, তবে আজ তার অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করেছে। লিতাকে বারবার বললেও সে বিশ্বাস করেনি। তাই ভ্যাম্পায়ার বেশে নিজেকে উপস্থাপন করে অনিক। লিতা এখন তাকে মেনে নিবে নাকি এড়িয়ে চলবে সেটা অনিকের পক্ষে বোঝা মুশকিল। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে আর দৌড়াচ্ছে অনিক। মেইনরোড ছেড়ে জংগলের পথ ধরে এগুচ্ছে এখন। সাধারণত ভ্যাম্পায়ারদের বাড়িঘর জংগলের ভিতর হয়। অনিকদের গোত্রটাও এর ব্যতিক্রম নয়।

শহরের থেকে একটু দূরের এক জংগলে তাদের বসবাস । তবে দিনে মানুষ আর রাতের বেলা রক্তচোষা সেটা আজ প্রথম জানলো সাধারণ এক মানুষ।

দৌড়ের মাঝেই হঠাৎ বুকের উপর ঝাপিয়ে পরে রাহা। রাহা অনিকদের গোত্রেরই একজন ভ্যাম্পায়ার। খুব ভালোবাসে অনিককে। তবে অনিক তাকে বন্ধুর চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। অনিক কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠে, “কিরে তুই কি রাতকানা?”

“হ্যা,,, ইয়েয়,, আরে নাহ!”

” হ্যা আবার না কি? কোল থেকে নাম। এমনিতেই মেজাজ খারাপ আছে।”

“না নামবো না। আগে বল কি হইছে?”

“তুই নামবি নাকি ঘাড় মটকাবো? ”

“হুম দে,, আমি তো সেটাই চাই।”

“এহ্ কি সুন্দর কথা -বে বে বে”

“ভেঙাবিনা একদম। মার খাবি বুঝলি”

“সত্যি মন ভালো নাই। টেনশনে পড়েছি”

“আচ্ছা বাসায় চল। শেয়ার কর আমার সাথে।” বাসায় গিয়ে আস্তে ধীরে শেয়ার করতে শুরু করে লিতার বিষয়। রাহা লিতার ব্যাপার আগে থেকেই জানে। বেশ কয়েকবার বারণও করেছে অনিককে। কারণ এই সম্পর্কটা ভিত্তিহীন। রাহার লজিক, যে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই সেটা নিয়ে কেনো টানাহ্যাঁচড়া করবে অনিক! তাছাড়া মিথ্যার হাত ধরে স্থাপিত এই সম্পর্ক। বড় ধরনের ঝামেলা হতে পারে সেটাও জানিয়েছে রাহা। কিন্ত কে মানে কার কথা। অনিক তার পছন্দমত এগিয়ে যাচ্ছিলো। কতক্ষণ!

আজতো বলে দিতেই হলো। সত্যিকার ভালোবাসায় মিথ্যের আশ্রয় হয়তো ক্ষণিকের জন্যই।

“বাহ! তুই বলে দিয়েছিস সব? সম্পর্ক ভাঙবি সেটা ভালো কিন্ত নিজেদের উপর প্রেশার ফেলতে হবে কেনো?”

“মানে?”

“অনিক প্লিজ বাচ্চাদের মত বিহেভ করবিনা। মেয়েটা এখানে বেশ ক’বার ঘুরে গেছে। এখন যদি বলে দেয় তাহলে আমাদের কি হবে বুঝিস? একমাত্র তুই দায়ী থাকবি যদি সমস্যার সৃষ্টি হয়।”

“ভাবাইসনা তো। যা এখন প্লিজ। সেরকম কিছুই হবেনা।”

ব্যাপারটা নিয়ে একটু চেঁচামেচি করে রাহা। তারপর চলে যায় অনিকের বাসা থেকে। রাগ নিয়ন্ত্রণ হলে স্থির হয়ে ভাবতে শুরু করে রাহার কথা গুলো। খারাপও বলেনি! সত্যি যদি বলে দেয় তবেতো বিশাল সমস্যা। তাছাড়া মেয়েটার প্রতি সে খুব দুর্বল। তার এগেইন্সটে পদক্ষেপ নিতে মোটেই আগ্রহী না অনিক। অনিক গভির ভাবনায় ডুবে যাচ্ছে। আজ যেভাবেই হউক লিতার সাথে আবার দেখা করতেই হবে। অন্যদিকে লিতা তার বাসায় গিয়েই ব্যাপারটা শেয়ার করে ফেললো। লিতার বাবা অস্থির হয়ে উঠে।

সিদ্ধান্ত নেয় যেভাবেই সম্ভব অনিককে মেরে ফেলতে হবে। লিতার মাঝেও টেনশনের সৃষ্টি হতে থাকে। রাতে কোনো রকম ডিনার সেরে বিছানায় পরে কান্নাকাটি শুরু করে। সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরে লিতা। ঘুম ভেঙে যায় এক শীতল হাতের ছোঁয়ায় । ধীরেধীরে চোখ দুটো খুলে বেশ চমকে উঠে,,,,!

“অনিক?এতো রাতে এখানে কি?”

“তোমার জন্য রুপার তৈরি এই গোজ নিয়ে এসেছি। আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি আমাকে মেনে নিতে না পারো তাহলে গোজটা আমার বুকে বিঁধিয়ে দিবা।”

“আরে সিদ্ধান্ত নেয়ার কি আছে! আমিতো তোমাকে ভালোবাসি! ভয়ের কোন কারণ নেই”

“বুঝলাম। কিন্ত তোমার পরিবার সামলাবে কে?”

“ঘর জামাই হবে?”

” না, কেনো?”

“তাহলে পরিবার সামলানোর কি আছে। বোকামি করতে আসছে মাঝ রাতে। হুহ”

“কত্ত কিউট তুমি। একটু জরিয়ে ধরি?”

“শাট আপ। এবার কিন্ত গোজটা বিঁধিয়ে দিবো সত্যি!”

“হাহাহ, আচ্ছা ঘুমাও চলে যাই।”

লিতার রুমের জানালা দিয়ে বের হয়ে চলে গেলো অনিক। জানালা গ্রিড বিহীন। তাই সহজেই অনিক ঢুকতে পেরেছিলো। অনিক চলে গেলে লিতা এক গ্লাস পানি পানকরে নেয়। বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলো, যদিও চিৎকার করেনি। ওদিকে অনিক দৌড়োচ্ছে আর চিৎকার করছে। অত্যাধিক আনন্দের চিৎকার। সারাশহর আতংকিত করে ছুটতে থাকে এই ভ্যাম্পায়ার। তারপর বাসায় গিয়েই গভির ঘুমে মগ্ন হয়ে পরে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দুঃসংবাদ পায় অনিক। রাতে যেমনি উত্তেজিত হয়ে ঘুমিয়ে ছিল ঠিক তেমনিভাবে সকালে ঘুম থেকে উঠে চুপসে গেছে। লিতা আর বেঁচে নেই! অনিক ছুটতে শুরু করে লিতার বাসার উদ্দেশ্যে। অবশ্য সেখানে পৌছে লিতার ডেডবডি দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি ।

অনিকের উপর আক্রমণ করে লিতার বাবা-মা এবং প্রতিবেশীরা। অতঃপর জান বাঁচিয়ে ফিরে আসতে হয়। লিতা তার বাবা মাকে বিস্তারিত বলে দিয়েছে সেটা অনিক জানতোনা বিধায় এরকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। খুব অস্থির হয়ে উঠেছে । গতরাতেই তো দেখা হয়েছে, লিতা সুস্থ ছিল। তাহলে এভাবে চলে যাবার মানে কি! প্রশ্নের উওর মিলছেনা, ক্ষোভে চুল চেপেধরে বসে আছে অনিক। এছাড়া আরো একটা ব্যাপারে বিষণ্ণতায় ভুগছে। কলেজ হতে তার একজন বন্ধু কল করে লিতার ব্যাপারটা শেয়ার করে। সাথে আরো একটা সংবাদ দিয়ে চমকে দেয় অনিককে। লিতার বাবা-মা কলেজে ইনফর্ম করে দিয়েছে তার সম্পর্কে। অর্থাৎ কলেজে যাওয়ার আর কোনো চান্স নেই।

কয়েকদিন পর একটা বন্ধুর কাছ থেকে তথ্যপায়। লিতার মৃতদেহে একটা রুপার তৈরি গোজ বিধা ছিল। একদম পেট বরাবর। খবরটা পেয়ে আরো ভেঙে পরে অনিক। রুপার গোজটা সে নিজে নিয়ে গিয়েছিল। এর ব্যবহার এমনভাবে হবে সেটা হয়তো জানাছিল না। অনিক নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে, লিতা তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছিল? অনিককে কোন প্রকার ক্ষতি করতে চায়নি। এবং বাবা-মাকেও ম্যানেজ করতে পারেনি। তাই নিজেই চলে গেলো সব ছেড়ে? মনের অজান্তেই এক আর্তনাদ সৃষ্টি হয়। যে আর্তনাদে জংগলের সিংহরাও কেপে উঠে।

৬ বছর পরে,,,,,

“ঘুম থেকে উঠেই কোন ভাবনায় পরলে?”

“ভাবছি তোমার জায়গাটাতে লিতা থাকলে কেমন হতো। তাহলে কেমন হতো আমাদের সংসার জীবন!”

“দেখো অনিক যা হবার হয়ে গেছে। নিয়তি চায়নি তোমরা একসাথে হও। তোমার মিল আমার সাথে ছিল।”

“হুম রাহা ঠিক বলেছো। কিন্ত ব্যাপারটা কি ঘটে গেলো বুঝতেই পারলাম না।”

“এটাকে বলে ডিগবাজি। ছোটবেলা থেকে তোমাকে আমি ভালোবাসি আর সে উরে এসেই ঘাপটি মারবে? প্রকৃতিও মেনে নেয়নি। তাই যা হবার হয়েছে। ওর কথা মনে করোনা। আমার রাগ হয়”

“হ্যা রাগ তো হবেই। হিংসা তো ছিলোই লিতাকে নিয়ে।”

“মোটেইনা। কারণ আমি জানতাম ভ্যাম্পায়ার মেনে নিবেনা তারা। তখন এমনিতেই একজনকে দূরে সরে যেতে হবে। এখন ফ্রেশ হয়ে টেবিলে আসো।নাস্তা করবে।”

“অনিক ওয়াসরুমে গিয়ে ফ্রেশ হচ্ছে আর চিল্লাচ্ছে,,,,,,, এ কেমন ডিগবাজি,,, এ কেমন ডিগবাজি! ”

“খাবার টেবিলে বসে খিলখিল হাসছে রাহা।”

নোট- জগৎ এ ভালোবাসা পরিমাপ করার যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তবে ভালোবাসার মানুষ কে শুধু নিজের কাছে আগলে রাখার কিছু কালজয়ী গল্প রটে গেছে। এই গল্পেও তার ব্যতিক্রম কিছুনা।সে রাতে অনিক চলে আসার পরেই লিতার রুমে প্রবেশ করেছিলো রাহা। ততক্ষণে লিতা ঘুমিয়ে পরেছিলো। খুব সহজেই রুপার গোজ দিয়ে লিতার পেটে ঘা বসিয়ে ফিরে আসে রাহা। রাহা অনিকের পিছু ধরেই গিয়েছিলো। তবে তাদের কথোপকথন শুনেছিলো

“আড়ালে থেকে” খুব জেদ ধরেছিলো। কিন্ত দাঁত ফুটায়নি লিতার গলায়। কাজটা সুক্ষভাবে সম্পন্ন করেছিলো রাহা। আর সেজন্যেই লিতার বাবা-মা, আত্মীয়,তার ভালোবাসা অনিক এখনো বিশ্বাস করে সে আত্মহত্যা করে মরে গিয়েছে। লিতাকে হারিয়ে নিজের সব কিছু শুধরে নেয় অনিক। বুঝতে শুরু করে আসলে তার প্রকৃত ভালোবাসা “রাহা” মানুষের সাথে ভ্যাম্পায়ার একদম বেমানান। পরোক্ষণে রাহাকেই জীবন সাথি করে নেয় অনিক। তবু মাঝেমাঝে লিতার কথা মনে করলে শেয়ার করে রাহার কাছে। বিভিন্ন উপায়ে অনিককে বুঝালেও কে জেনো হেসে উঠে “আড়ালে থেকে”।

গল্পের বিষয়:
জীবনের গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত