ধমকা হাওয়া

ধমকা হাওয়া

হল থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে মুন্নী চত্বরের পাশে চলে এল রিসা। ভার্সিটির সব লেকের চেয়ে চারুকলা ভবনের পাশের লেকটাই ওর বেশি প্রিয়। যখন মন খারাপ থাকে তখন লেকের ধারে বসে লেকের টলমলে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে ও। কেন জানিনা অনেক মন খারাপ থাকলেও তখন মন ভাল হয়ে যায় ওর।

তবে আজকে ওর একটু বেশিই মন খারাপ। লেকের ধারে এসে একটু নির্জন জায়গায় বসে পড়লো ও।বিকেলের নরম এক চচিলতে রোদ এসে পরেছে ওর মুখে। চারিদিকে গোধূলির আলো মনটাকে আরো বিষণ্ণ করে তুলছে।চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইছে। মনের ভেতর জমানো কষ্টগুলো কয়েক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু হয়ে অঝর ধারায় ঝরছে।
মনে করার চেষ্টা করছে পুরোনো সেই স্মৃতি গুলো।

আর ভাবছে আমার জীবনে কি শুধু কষ্টই আছে। সুখের ছোঁয়া পেয়েও কেন হারিয়ে ফেলি বারবার। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েও কেন সবাই আবার দূরে ঠেলে দেয় আমাকে? কি দোষ করেছি আমি?
হাহ্, আদৌ কি এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে? নাকি এগুলো শুধু প্রশ্ন হয়েই থেকে যাবে……

এত বন্ধুত্বপূর্ণ কেন ও? সবাইকে কেন এত তাড়াতাড়ি বন্ধু ভেবে বসে। ও যেভাবে বন্ধুত্বকে দেখে তারা কেন সেভাবে দেখেনা?
গভীর ভাবনায় ডুবে যায় ও।ভাবতে থাকে পুরোনো সব কথা….

ছোটবেলা থেকেই একাকীত্ব ওর একমাত্র সঙ্গী।।একা থাকতেই পছন্দ করে ও।অবসর সময় কাটায় বই পড়ে আর বই হলো ওর সবচেয়ে ভাল বন্ধু। এতকিছুর পরেও স্কুল আর কলেজ লাইফে অনেক ফ্রেন্ড ছিলো ওর আর এখনো আছে। কিন্তু এমন কোনো ফ্রেন্ড নেই যেমনটা ও চায়। যে হবে সবচেয়ে ভাল ফ্রেন্ড যাকে চোখ বন্ধ করেই বিশ্বাস করা যায়, সবকিছুই যার সাথে শেয়ার করা যায়। কিন্তু নেই, জানে হবেওনা। রিয়েল লাইফে ফ্রেন্ড করেছিলো কয়েকজনকে, বেষ্ট ফ্রেন্ড। কিন্তু ও যেমনটা চাইতো তেমনটা কেউ ছিলোনা।মেয়ে দুজনকে করেছিলো, হা হা….তারা তো ওর খোঁজ নিতোই না উল্টু ও নিতে চাইলে নানা অজুহাত দেখিয়ে বলতো ব্যস্ত আছি।এরপর বয়ফ্রেন্ডের সাথে গল্প শুরু করতো।

একসময় ওর ক্লাসেরই একটা ছেলে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়।বলে বেষ্টফ্রেন্ড হতে চায়।ও ভাবলো মেয়েরা স্বার্থপর হলেও হয়তো ছেলেরা হবেনা।ও।নিজেও বাড়িয়ে দেয় বন্ধুত্বের হাত।

তবে বন্ধুত্বটা অতটা ছিলোনা যেমনটা ও চাইতো। তবুও চলতে থাকে ওদের ফ্রেন্ডশিপ আর একসময় ছেলেটা সবাইকে বলতে থাকে যে ও রিসার বয়ফ্রেন্ড।রিসা এতে রেগে যায় আর বন্ধুত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে এখানে।এরপর আর ও রিয়েল লাইফে কাউকে ফ্রেন্ড করেনাই আর ছেলেদেরকে বিশ্বাসও করেনা।

কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস…. অনলাইনেই একটা ছেলের সাথে ওর পরিচয় হয় আর সেখান থেকে বন্ধুত্ব। ধীরেধীরে বাড়তে থাকে বন্ধুত্বের গভীরতা। একসময় ওরা বেস্টফ্রেন্ড হয়ে উঠে একে অপরের আর এটা তেমন একটা ফ্রেন্ডশিপ হয় যেমনটা চেয়েছিল রিসা।সময়গুলো ভালভাবেই কাটতে থাকে কিন্তু রিসা ওর ফ্রেন্ড অন্য মেয়ের সাথে কথা বলবে সেটা ও সহ্য করতে পারেনা কারন বন্ধুত্বের ভাগ ও কাউকে দিতে চায়না।

ফ্রেন্ডটাকে বলে সে কথা আর সেও সবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।এরপরেও ভালভাবেই কাটছিলো সবকিছু কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ ওর ফ্রেন্ডটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠতো। ঠিকভাবে কথা বলতোনা, মুড অফ করে ফেলতো আর যেটা ওর সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগতো।ও সেটা তাকে বললেও সে বলতো, কই স্বাভাবিকভাবেইই তো আছি। এরকমভাবে চলতে থাকে আর ওর খারাপ লাগাটাও বাড়তে থাকে। আর আজ……. ওর ফ্রেন্ডশিপ টাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অথচ ওরা কথা দিয়েছিল সারাজীবন পাশে থাকবে…..

এখন রিসার বন্ধুত্বের উপর থেকেই বিশ্বাস উঠে গেছে।ঘৃণা করে ও বন্ধুত্ব নামক কিছু একটাকে।
প্রতিজ্ঞা করেছে, জীবনে কখনওই আর বন্ধুত্ব করবেনা।

ভাবতে থাকে ও,’বন্ধুত্ব হলো একটা দমকা হাওয়া, হুট করে এসে আবার চলে যায়। হয়তোবা সেটা শুধু ওর ক্ষেত্রেই।’
অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে ও, যদিও ওর সেই ফ্রেন্ডটা সেটা দেখবেনা, বুঝবেনা ওর কষ্টটা……

আর ওর ডাইরিতে, ‘ফ্রেন্ডশিপই সব, ফ্রেন্ড ছাড়া জীবন অর্থহীন। ‘ এই কথাটার পরেই আরেকটা কথা যোগ হয় আর সেটা হলো,’ বন্ধুত্ব হল দমকা হাওয়া, কোনোভাবেই সেটাকে প্রশ্রয় দিতে নেই.’

গল্পের বিষয়:
জীবনের গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত