আব্বা যখন প্রার্থী

আব্বা যখন প্রার্থী

কিছুদিন পরই জাতীয় নির্বাচন। বের হয়েছি নির্বাচনী প্রচারণায়। প্রার্থী আর কেউ নন, আমারই জন্মদাতা পিতা। মিছিল প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। ছোট ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে মাঝবয়সী, বৃদ্ধ সবারই দৃষ্টি থাকে মিছিলের দিকে। আব্বা বলে দিয়েছে প্রতিদিন বিভিন্ন যায়গায় কয়েকবার করে মিছিল দিতে।

আমাদের বিকেলের মিছিলটা আশানুরুপ বড় হয়েছে। স্লোগান দিচ্ছে ফুফা। ফুফা আবার চরাঞ্চলের মানুষ, গলায় যেমন জোর আছে, স্লোগানও খুব ভাল দিতে পারে। ফুফার স্লোগানের সাথে সবাই একসাথে জোর গলায় তাল মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটের অসংখ্য পথচারী দলে দলে এসে আমাদের সাথে মিছিলে জোগ দিচ্ছে। সবার এমন সমর্থন শেষ পর্যন্ত থাকলে আব্বার পাশ করা আর ঠেকায় কে?

ফুফা হঠাৎ করে স্লোগানে জোর গলায় বলে উঠল, দেশে কোন মার্কা আছে রে?
সবাই একসাথে বলল, আছে।

—হেই, কোন সে মার্কা?
—ছাগল
—জোরে বল!
—ছাগল
—আরও জোরে,
—ছাগল
—আরও জোরে,
—ছাগল
—ছাগল,
—ছাগল
—নির্বাচনে?
—আমজাদ ভাই।
—যাবেই যাবে?
—আমজাদ ভাই।

আব্বাকে ভাই বলে এই প্রথম ডাকছিনা গত দুই নির্বাচনেই ডেকেছি। অনেকেই মনে হচ্ছে হো হো করে হেসে দিয়েছে! নির্বাচনী প্রচারণায় তো আর কোন “বাপ-দাদা” থাকে না সব ভাই হয়ে যায়, তাই বাধ্য হয়েই ডাকতে হচ্ছে। এতে অবশ্য আমার খারাপ লাগে না, তাছাড়া প্রচারণার সময় ‘ভাই’ না বলে ‘আব্বা’ বললে কেমন শোনায়-
“আমজাদ আব্বার সালাম নিন, ছাগল মার্কায় ভোট দিন”।
আমারই হাসি পাচ্ছে তাহলে মানুষের কি অবস্থা হবে?

বন্ধু-বান্ধব ইদানীং পচানো শুরু করে দিয়েছে, কেউ আব্বাকে ভাই বলে ডাকার অনুভূতি কেমন, হাসতে হাসতে জানতে চাইছে, কেউ কেউ আবার আব্বাকে কি করে ভাই বলে ডাকছি, তা জানতে চাইছে।
পচানোর হাত থেকে রক্ষা পেতে যুক্তি দেখিয়ে বলি দেখ-

আদম(আ:) অনুযায়ী হিসেব করলে তো আমরা সব ভাই-বোন, তাই না? আব্বা-আম্মা, চাচা-চাচী, মামা-মামী সহ সবাইকে ভাই-আপা বলে ডাকা উচিত। আমার কথা শুনে বন্ধুদের কেউ কেউ এমন ভাবে হাসতে শুরু করে যে মনে হয় এমন কমেডি জাতীয় কিছু বলেছি, যাতে না হেসে উপায় নেই। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে রানী খুব চুপচাপ থাকে কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এমন সব কথা বলে উঠে যাতে পুরো উপস্থিত পরিবেশে গোলমাল বেঁধে যায়।

একদিন দুপুরের দিকে আড্ডার মধ্যে রানী বলে ফেলল, ‘আচ্ছা নিবিড় এই যে তুই সবাইকে গণহারে ভাই-আপা বলে ডাকতে বলা উচিত বলে বেড়াচ্ছিস, তুই তোর বাবাকে সামনা সামনি ভাই বলে ডাকতে পারবি? আচ্ছা একটু কল্পণা করে দেখত, তোর ছোট চাচা আংকেলকে ভাইয়া বলে ডাকছে, তুইও ভাই বলে ডাকতেছিস। আচ্ছা, সেটা বাদ দে, মনে কর তুই তোর মা’র ভাই, বয়সে যেহেতু তুই ছোট সেহেতু ব্যাপার টা হচ্ছে তুই হয়ে যাচ্ছিস তোর বাবার সালা? রানীর কথা শুনে সবাই বন্ধুরা সব বিকট শব্দে হাসতে শুরু করে দিয়েছে।

—আরে ধুর! কি বলিস এইসব? তাই হয় নাকি?
—তুই তো তাই ই বলে বেড়াচ্ছিস।
—তুই যেভাবে বলতেছিস ব্যাপারটা আমি ওমন ভাবে বলি নাই, সবাইকে ভাই-আপা বলতে বলছি এখানে আবার সালা এলো কোত্থেকে?
—আচ্ছা তাও বাদ দে, ভাবতো অনা’র সাথে যদি তোর বিয়ে হয় এরপর ব্যাপারটা কেমন হবে?
—কেমন হবে আবার, সংসার যেমন হয় তেমনই হবে।
—সেই কথা বলতেছি না, বিয়ার পর অনা তোর বাবাকে ভাইয়া বলে ডাকবে?

—(মনে মনে কল্পণা করে দেখলাম, খাবার টেবিলে আমি, আব্বা রাতের খাবার খাচ্ছি। অনা বিরিয়ানি তুলে দিচ্ছে আব্বার প্লেটে, “আব্বা বলছে- আর দিসনারে বোন, অনেক খাইছি”, “অনা মন খারাপ করে বলল, কেন ভাইয়া ভাল হয় নাই”? “আব্বা- নারে বইন অনেক ভালো হইছে, অনেক তো খাইলাম, দে আরেকটু দে, তোর ছোটভাইরেও দে”, কল্পণাতেই খুঁজে দেখলাম ছোট ভাই টা কে? আর কাউকে খুঁজে না পেয়ে বুঝলাম, ছোট ভাইটা আমিই। আব্বার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে অনা, আমাকে বলতেছে- ভাইয়া তোমাক দেই আরেকটু)। নাহ!

—ডাকবে না বলছিস?
—এমন চিপায় পরেছি, যদি বলি নাহ ডাকবে না, তাহলে সব মিলে পচানি দিবে, যদি বলি হুম ডাকবে তাহলেও পচানি দিবে। যেহেতু নির্বাচনের মরসুম চলছে সেহেতু থিওরিতে অনঢ় থাকতে হবে। রানীকে বললাম- হুম ডাকবে। (মনে মনে ডাকবে’র পর ‘না’ বলে নিলাম)

মাঝে মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণায় গিয়ে মেজাজ টা বিগড়ে যায়। ভোট চাইতে চাইতে দেখা যায়, এমন মানুষের কাছে গিয়ে চেয়ে বসেছি যে কিনা সবার সামনে হাসতে হাসতে বলে উঠল-
“আমজাদ! ওই ব্যাটা তো নিজেই একটা ছাগল”, নতুবা,
” সালার ব্যাটা দুইবার ফেইল কইরাও লজ্জা হয় নাই”।
এইসব শুনলে কার না মেজাজ খারাপ হবে?

কেউ কেউ অবশ্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আব্বার নির্বাচন করাটাকে বোকামী বলে উল্লেখ করেন, তারা মনে করেন- বর্তমানে নির্বাচনে পাশ করতে শুধুমাত্র দলীয় মার্কাটারই দরকার, ভোটের কোন মূল্য নাই। যেখানে ভোটের কোন মূল্য নাই সেখানে উনি সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে জিতবে কি করে?

আমারও অনেকের মতই মনে হয় দলীয় মার্কাটাই মানুষের কাছে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি যে প্রার্থী সম্পর্কে আগা গোড়া কিছুই জানে না, এরা মূলত প্রার্থীকে ভোট দেয় না ভোট দেয় মার্কাকে।
নির্বাচনী প্রচারণায় আসার পর থেকে আমার বিশেষ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে নির্বাচন মানেই, টাকা-পয়সার খেলা।

নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষ প্রতিনিয়িত বাড়িতে আসে, প্রত্যেকেই আসে আব্বার খোঁজে, আব্বাকে না পেলে আমার কাছেই তারা ক্লাব চালানোর খরচ চেয়ে বসে, আবার মিছিল দিলে সবাইকে কিছু চা বিস্কুট খাওয়াতে হয় সেই খরচের কথাও বলে।

প্রত্যেকের কথামত- ছাগল মার্কা নাকি ফর্মে আছে। ছাগল মার্কাই নাকি পাশ করবে, কিন্তু ক্লাব গুলো চালু রাখতে হবে, নিয়মিত মিছিল দিতে হবে, সেইজন্যে খরচ করতে হবে।

নির্বাচনী প্রচরণার অভিজ্ঞতা এইবারই প্রথম হলে ব্যাপারটা বুঝতাম না, মনে করতাম এরাই বোধহয় আব্বার প্রকৃত সমর্থক। এটা যেহেতু আমার তৃতীয় নির্বাচনী প্রচারণার অভিজ্ঞাতা সেহেতু বুঝতে পেরেছি, প্রকৃত পক্ষে এই লোকগুলো নির্বাচনে দাঁড়ানো বেশিরভাগ প্রার্থীরই সমর্থক। প্রার্থী তাদের এলাকায় গেলে টাকার বিনিময়ে কিছু ভাড়াটে সমর্থক জোগাড় করে মিটিংয়ের ব্যবস্থা করে। সমর্থন নয় টাকা কামানোটাই হচ্ছে এদের মূখ্য লক্ষ্য।
আব্বাকে ভাই বলে এইবার নিয়ে তিনবার ধরে ডাকছি। এসব নিয়ে আমার কোন কষ্ট থাকত না যদি আব্বা জয়লাভ করত, কিন্তু গত দুবার নমুনেশন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে সে যেহেতু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটই পায়নি সেহেতু এবারও কি পূর্বের ধারা বজায় থাকবে কিনা তা নিয়ে আমি সত্যি সন্দিহান।

রাতের মিছিলের জন্য অপেক্ষা করছি। রাতের মিছিলে আজ ছোট মামা, দুই চাচা, খালুরাও এসেছে। হঠাৎই ফুফা স্লোগান দিয়ে উঠল-

—দেশে কোন মার্কা আছে রে?
—আমরা সবাই একসাথে গলা ফাটিয়ে বললাম, আছে
—হেই, কোন সে মার্কা?
—ছাগল
—জোরে বল!
—ছাগল
—আরও জোরে,
—ছাগল
—ডাইনে দেখ,
—ছাগল
—বামে দেখ,
—ছাগল
—যাবেই যাবে?
—ছাগল
—নির্বাচনে?
—আমজাদ ভাই
—যাবেই যাবে?
—আমজাদ ভাই
—ছাগল,
—ছাগল।

ফুফা স্লোগানে ভেরিয়েশন আনতে গিয়ে স্লোগানের শেষের দিকে আব্বাকে ছাগল বানিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা অবশ্য আমি ছাড়া আর কেউ মনে হয় না বুঝতে পেরেছে। কেউ যেহেতু বুঝতে পারেনি সেহেতু ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই উত্তম বলে মনে হলো, তবে কিছুক্ষণ পর পর ফুফার স্লোগানের শেষাংশ মনে পরে যাচ্ছে-

—যাবেই যাবে?
—আমজাদ ভাই।
—ছাগল,
—ছাগল।

গল্পের বিষয়:
কৌতুক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত