ব্যর্থতার নিঃশ্বাস

ব্যর্থতার নিঃশ্বাস

ভুল মানুষের সাথে বিয়ে, দুজন ব্যর্থ মানুষের জন্ম দেয়। আর দুজন ব্যর্থ মানুষ কি করে সুখী সুন্দর জীবন গড়বে? আবার উল্টোটাও হয় কখনো কখনো। দুজনই হয়তো তাদের নিজস্ব গণ্ডিতে স্বার্থক কিন্তু সংসার জীবনে সুখী হতে ব্যর্থ হয়। সম্রাট নিজের মনেই ভাবতে থাকে। সত্যিই সম্রাট আর মিলার বিয়ে একটা ভুল বিয়ে ছিল।

সংসারের বড় ছেলে হবার কারণে সম্রাটের দায়দায়িত্ব একটু বেশিই ছিল। ছোট দুই ভাইকে দেখাশুনা করা, বাবা-মার মৃত্যু পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগ দায়িত্ব তাকেই নিতে হয়। সম্রাট খুব ছোট একটা চাকরি করে। তাই দিয়ে এত সব কিছু ম্যানেজ করা সত্যি সে নিজেও জানে না কিভাবে করেছে। তার মধ্যে চাকরি পাবার কিছু দিনের মধ্যে মিলার সাথে পরিচয় এবং দুই পরিবারের অমতেই বিয়ে।

দশ বছর আগে, খুব কম সময়ের ব্যবধানে বাবা-মা তাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ছোট দুই ভাই এখন বেশ ভালো আছে। তারা নামি অফিসে কাজ করে, তাদের নিজেদের গোছানো ফ্ল্যাট, চকচকে গাড়ি। সম্রাটের ভালো লাগে তাদের দেখে। সে তো এমনই দেখতে চেয়েছিলো তার ভাইদের। তার ভীষণ ভালো লাগে তার ছোট দুই ভাই যখন লিফটে করে তাদের দামি ফার্নিচারে সাজানো ফ্ল্যাটে যায়, যখন গাড়িতে করে অফিস যায়। সম্রাট জানে সে স্বার্থক হয়েছে। শুরুটা তারা সম্রাটের হাত ধরেই করেছে, তার বাড়িতে থেকেই। আস্তে আস্তে তারা বড় ভাই এর হাত ছেড়ে এগিয়ে গেছে। এগোনোর প্রয়োজনেই তাদের ভাইয়ের হাত ছাড়তে হয়েছে, অথবা সম্রাটের সেই শক্তিই ছিল না যে ভাইদের সাথে সমান তালে দৌঁড়াবে। তাই তার হাত ছুটে গেছে। সম্রাট সেই দুই রুমের ছোট বাড়িতেই আছে। সেই পুরোনো রং নষ্ট হওয়া ফার্নিচার। সেই সিঁড়ি ভেঙে পাঁচ তলায় উঠা। বড্ডো সেকেলে। তার ভাইরা এখন এখানে বেমানান। তাই এ বাড়িতে আসেনা বললেই চলে। সম্রাট কিছু মনে করেনা। সত্যি তো, লিফটে চড়ে অভ্যাস যাদের, তারা কি করে এত সিঁড়ি বেয়ে উঠবে! সম্রাট জানে, ওপারে যেয়ে তার বাবা-মার সাথে দেখা হবে। তখন সে বলবে। তোমাদের ছোট দুই ছেলে খুব ভালো আছে, সুখে আছে। আচ্ছা ওপারে যেয়ে যদি মিলার বাবা-মার সাথে দেখা হয় আর তারা যদি তাকে বলে ‘আমাদের মেয়ে কেমন আছে ?’

সম্রাটের ব্যর্থতার শাখা- প্রশাখা বাড়তে থাকে যখন সে মিলার সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। এই আঠারো বছরের সংসারে তাদের আট বছরের একটি মেয়ে। আঠারো বছরে এটুকুই তার সঞ্চয়, এ ছাড়া মিলাকে আর কিছুই দিতে পারেনি সে। মিলার চোখ- মুখ – হাসি সবকিছুই বলে সে ভালো নেই। এই দুই রুমের ভ্যাপসা গরমে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তবুও সে হেসে মেয়ের সব দায়িত্ব পলিন করে। সম্রাট জানে এটা মিলার অভিনয়। সে ভালো নেই।

মিলা ইচ্ছে করলেই বিয়ের দুই চার বছর পরে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতো। বেশ সুন্দর ছিল দেখতে সে। কিন্তু কেন তা করলো না? সম্রাট একসময় মনে মনে এটাই চাইতো মিলা আবার নতুন করে শুরু করুক, কিন্তু মিলা যায়নি। কেন? ব্যাপারটা এমন নয় যে মিলা সম্রাটকে ভীষণ রকম ভালোবাসে। অনেকদিন আগেই তাদের এই ভালোবাসার ফাটল ধরেছে। তবুও মিলা থেকে গেল কিন্তু সম্রাট তাকে কিছুই দিতে পারলোনা। সম্রাট ব্যর্থ হলো।

মিলা নামের এই আদুরে ধনীর দুলালীকে যখন সম্রাট বিয়ে করেছিল তখন তার বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন খুশি মনে তার পাশে ছিল। সময়ের সাথে সাথে সবাই দূরে চলে গেছে। ব্যর্থতার দায় কেউ নিতে চায়না।
মিলাকে কিছু দিতে না পেরে সম্রাট কি ভালো আছে? সে হাসে না, ব্যর্থ মানুষদের কখনো হাসতে হয়না। তার কোনো আত্মীয় পরিজন বন্ধু নাই, ব্যর্থ মানুষের কোনো আত্মীয় বা বন্ধু থাকেনা। একজন ব্যর্থ মানুষ কখনও গল্পের নায়ক হতে পারেনা।

গল্পের বিষয়:
অনুপ্রেরণা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত