উপলদ্ভী

উপলদ্ভী

সবার জীবনের শুরুটা একরকম হয় না!এই মায়াভরা জীবন পথে সবাই একভাবে চলে না!নিজের জীবনটাকে পার করার জন্য প্রতিটা ব্যাক্তিই নিজস্ব একটা হাঁটার পথ বেঁছে নেন বা তৈরি করে নেন!আর ব্যাক্তি তার তৈরি করা পথেই হেঁটে যায় জীবনের শেষ বয়স অবদি!

ইমতিয়াজ আহমেদ তার এই বয়সে এসে উপলদ্ভি করতে পারছেন যে, জীবন যুদ্ধে ওনার চলার পথটা সঠিক ছিলো না!একদমই সঠিক ছিলো না!সারাটা জীবনই ওনি ভূল পথে হেঁটে এসেছেন!আর সেজন্যই আজ ওনি একা,ভিষন একা!যে বয়সে এসে একটা মানুষ তার স্ত্রী, সন্তান,নাতি নাতনী সবার সঙ্গ আশা করে, সবার সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে মাতিয়ে রাখতে চায়,সেই বয়সে এসেই ওনার কাছে আজ কেউ নেই!ওনার এতো সব ব্যাংক, ব্যালেন্স, সয়-সম্পওি সবই আজ মূল্যহীন!কোনো দাম নেই এসবের!এই টাকা-পয়সা, ব্যাংক, ব্যালেন্সের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ যে কিভাবে তার মূল্যবান সময়গুলো,দিনগুলো, হারিয়ে ফেলে ওনি তার চাক্ষুস প্রমান!ইমতিয়াজ আহমেদের মাঝে মাঝে মনে হয় এই সব কিছুর জন্য একমাএ দায়ী ঐ উপরওয়ালা!যিনি সৃষ্টির মূলে রয়েছেন!ইমতিয়াজ আহমেদের খুব করে ইচ্ছে করে ঐ উপর ওয়ালার দিকে প্রশ্নের বাণ ছুঁড়ে দিতে!যে,হে আল্লাহ,তুমি মানুষকে সৃষ্টি করেছো তোমার গুন গান গাইতে, সব সময় তোমার উপাশোনা করতে!তবে কেনো তুমি সেই মানুষের মনেই এতো আকাঙ্গা দিলে?কেনো এতো লোভ দিলে? কেনো এতো চাহিদা দিলে?

কিন্তুু হায়।কোনো প্রশ্নই সে করতে পারে না।এই সব প্রশ্নের উওরই যে তার জানা।মানুষ নিজেকে খারাপ কাজ থেকে, পাপাচার থেকে সংযত করতে পারে না এটা আল্লাহ তা’আলার দোষ নয় এটা তার নিজদোষ!
ভেবেই বড়সড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি।

প্রায় সন্ধা হয়ে গেছে।জানালা দিয়ে কৃএিম শহরটাকে ঝলমল করতে দেখা যাচ্ছে!বিছানা থেকে নেমে জানালার পর্দাটা হালকা একটু সরিয়ে দেয় ইমতিয়াজ আহমেদ।সাথে রুমের ডিম লাইটের আলোটাও জ্বালায়!বেশি আলো সহ্য হয় না ওনার।নিজেকে খুব বেশি বেমানান লাগে।ড্রয়ারে বেশ কিছু পুরোনোএলবাম ছিলো!সেগুলোই ধীরে ধীরে বের করলেন ওনি।এখন এই পুরোনো কিছু ফটোই ওনার একমাএ সম্বল!রাতে ঠিকমত ঘুম হয় না!এই ফটোগুলো দেখে দেখেই অভিশপ্ত রাত গুলো পার করতে হয়!ইমতিয়াজ আহমেদকে সব থেকে বেশি যে ফটো টা টানে সেটা হলো কালো কাগজে মুড়ানো এলবামটার প্রথম পেইজের গ্রুপ ফটো টা!যেটাতে ওনি,ওনার মা-বাবা,ওনার স্ত্রী রেহেনা বেগম,বড় ছেলে অর্নব আহমেদ,মেঝো ছেলে জয় আহমেদ ও ছোট মেয়ে তানিয়া আহমেদ।কত সুন্দর হাসি খুশি একটা পরিবার।ইসসস,এই সময়টাতে যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম।বিজ্ঞান তো প্রতিনিয়ত কত কিছুই আবিষ্কার করে চলেছে, এমন কিছু কেনো আবিষ্কার করছে না এখনো?নাকি করেছে?যখন জটিল থেরাপি নামক অদ্ভুত আবিষ্কার করতেও সক্ষম হয়েছে বিজ্ঞান, কি জানি কোনো কালের কালে হয়তো এমন কিছুও আবিষ্কার করে ফেলবে!!তখন কি আমরা আদৌ বেঁচে থাকবো?
আজগুবি চিন্তা ভাবনার অন্ত ঘটিয়ে ফের এলবামে মননিবেশ করেন ওনি!

ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো যে কবে কবে এত বড় হয়ে গেছে বুঝতেও পারি নি।ছেলে মেয়েগুলো কতো যুক্তিগতপূর্ন কথা বলতে শিখেছে,বড় বড় দায়িত্ব পালন করতে শিখেছে, একেক জন তো নিজেরাই মা,বাবা হয়ে গিয়েছে।ভেবেই কিছুটা তৃপ্তির হাসি পায় ইমতিয়াজ আহমেদের।এলবামের পরের পৃষ্টা টা উল্টানোর সময়ই ক্যার ক্যার জাতীয় এক প্রকার শব্দ কানে এসে পৌছায় তার।এমন শব্দের উৎপওি সাধারনত দরজা খোলার সময়ই হয়ে থাকে।ইমতিয়াজ আহমেদ দরজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন।দরজার সামনে একটা নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে।যদিও মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না,তবুও ওনি জানেন এই নারীমূর্তি টা কার।ইমতিয়াজ আহমেদের ভাবনাকে সত্যি করে ওনার স্ত্রী রেহেনা বেগম দরজা ঢেলে ভেতরে প্রবেশ করে।রেহেনা বেগম রুমে ঢুকে প্রথমেই পাশের দেওয়ালে থাকা সুইচ বোর্ডের দিকে এগিয়ে যায়। তখনই ইমতিয়াজ আহমেদ নিচু স্বরে বলে,

– থাক না।আলো জ্বালানোর কি দরকার।এভাবেই তো ভালো লাগছে।রেহেনা বেগম ইমতিয়াজ আহমেদের দিকে ঘুরে তাকায়!ক্ষীণ স্বরের নিষেধাজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে আলোটা টা জ্বালিয়ে সোঁজা ইমতিয়াজ আহমেদের সামনে গিয়ে দাঁড়ান তিনি।এরপর বেশ কিছুসময় অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।রেহেনা বেগম সময় নিয়ে ইমতিয়াজ আহমেদকে পর্যবেক্ষক করে।

যে লোকটার ভয়ে পুরো ফ্যামিলিতে একটা মানুষও টু শব্দ করার সাহস পেতো না,সেই লোকটাই আজ এতো বড় একটা বাড়িতে এক কোনার একটা রুমে চুপচাপ পড়ে থাকেন!যে মানুষটা সব সময় বাঘের মতো হুঙ্কার ছেড়ে কথা বলোতো সেই মানুষটাই আজ ছোট ছোট করে কি বলে বুঝা কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়,এতো বড় সুঠাম দেহের অধিকারী লোকটা আজ শুকিয়ে কঙ্কাল প্রায়,রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় চোখের নিচে তিব্র কালো রেখা পড়ে গেছে মানুষটার!নিজের স্বামীর এমন করুন পরিনিতি দেখে রেহেনা বেগমের বুকটা হুহুহুহু করে কেঁদে উঠে প্রতিদিনের মতোই।,চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ে।এছাড়া আর কিই বা করতে পারে সে?সে নিজেই তো অসহায়!কতবারই তো বুঝিয়েছে মানুষটাকে!কোনো লাভ হয়নি!একটা মানুষ যদি নিজেই নিজেকে কষ্ট দিতে দিতে শেষ করে দেয় সেখানে দ্বিতীয় বা একাধিক ব্যাক্তির কি করার থাকে!তবে আজকে এর একটা বিহিত করতেই হবে।রেহেনা বেগম নিজের চোখের জল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছেন।এরপর কড়া গলায় বলেন,

– এই, এদিকে তাকাও।তাকাও বলছি!

রেহেনা বেগম দাঁড়ানো থেকে ইমতিয়াজ আহমেদের মুখোমুখি হয়ে বসে। ইমতিয়াজ আহমেদের ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোতে টেনে নিয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে শুরু করে,

– আমার দিকে তাকাও না প্লিজ।কেনো নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো?কেনো নিজেকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছো?দুটো বছর!দুটো বছর যাবত তুমি নিজেকে এত বড় একটা বাড়ির এক কোনার একটা রুমে বন্ধি করে রেখেছো!কারো সামনে গিয়ে দাড়াও না!কেউ তোমার সামনে এলে চোখ তুলে পর্যন্ত কথা বলো না!কেনো,এতো কিসের অপরাধবোধ তোমার?কি করেছো তুমি যে তোমার নিজেকে এতো বেমানান লাগে?ইমতি, তুমি এমন কোনো কিছুও করো নি যেটা ক্ষমার অযোগ্য! বিশ্বাস করো, আমি মন থেকে বলছি,তোমাকে নিয়ে আমার বা আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।

তোমার ছেলে মেয়েরাও অনেক আগেই তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে!হ্যাঁ,হয়তো অভিমানটা এখনো রয়েই গেছে ওদের।কিন্তুু ওরাও চায় ওদের বাবা আবার ব্যাক করুক।আগের ইমতিয়াজ আহমেদকে খুব মিস করি আমরা, খুব।তুমি দু’বছর আগের সেই দিনটা এখনো ভূলতে পারো নি তাই না?সে জন্যই তুমি নিজেকে এভাবে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়ে যাচ্ছো তাই তো?আচ্ছা তুমি নিজেই একবার ভাবো তো,তুমি যদি ঐদিন তোমার ছেলে মেয়েদের জায়গায় থাকতে তাহলে তুমি কি করতে?আর যদি ধরো আমার কথা।আমি তোমাকে ভালোবাসি ইমতি।শুধু মাএ তোমাকে ভালোবেসে আমার বাবা,মা আমার পরিবারের সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমি তোমার হাত ধরে চলে এসেছিলাম।তখন, যখন তোমার কিছুই ছিলো না।না ছিলো টাকা পয়সা।না ছিলো ব্যাংক, ব্যালেন্স।

বিশ্বাস করো সেই ভালোবাসাটা এতো দিনে এতটুকুও কমে নি!বয়সের সাথে সাথে ভালোবাসাটাও হাজার গুন বেড়ে দাঁড়িয়েছে।দু’বছর আগের সেই দিনটায় হয়তো আমার জায়গায় আমি ঠিক ছিলাম!কিন্তুু বিশ্বাস করো!আমি তবুও চাই নি ওমন কিছু করতে!কোথা থেকে কি হয়ে গিয়েছিলো আমি কিছুই বলতে পারি না!তবুও তুমি যদি তোমার আত্মতৃপ্তির জন্য চাও আমার এই হাতটা কেঁটে ফেলতে পারো!এতে আমি বিন্দুু মাএও বিদ্রোহ করবো না বিশ্বাস করো,আমার সামান্যতম আপত্তিও থাকবে না এতে।তবুও তুমি নিজেকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিও না।আমার কষ্ট হয়!ভিষন কষ্ট হয়!দম বন্ধ হয়ে আসে আমার! আর পারছি না আমি তোমায় এভাবে দেখতে।পারছি না আর।কথাগুলো অনূর্গল বলে ইমতিয়াজ আহমেদের বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়েন রেহেনা বেগম।

ইমতিয়াজ আহমেদ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।যদিও এখানে অপ্রস্তুত হওয়ার মতো কিছু নেই!তবুও দীর্ঘকাল পর ওনি রেহেনা বেগমকে ওনার জন্যই এভাবে কাঁদতে দেখছেন।আজ থেকে ঠিক ২৭ বছর আগে এভাবেই ওনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদেছিলেন রেহেনা বেগম।সেটা এমন এক কান্না ছিলো যে,ইমতিয়াজ আহমেদ প্রায় বাধ্য হয়েছিলেন ঐদিনই রেহেনা বেগমকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে।আসলে মেয়েদের এই ফ্যাচফ্যাচ করে কান্না করার স্বভাব টা আমাদের কাছে খুবই পরিচিত।তাই মেয়েদের এই কান্নাকে সাধারন কান্না ভেবে কেউ কেউ আমরা বড় মাপের ভূল করে বসি।মেয়েদের কান্না মোটেও কোনো সাধারন কান্না হতে পারে না।মেয়েরা তাদের এই কান্নাকেই সময় ভেদে ধারালো অস্ত্রের মতো কাজে লাগায়।

আজ আবার সেই কান্নারই পুনরাবৃত্তি। ইমতিয়াজ আহমেদের একটু হাসিই পায় রেহেনা বেগমকে এই বয়সে এসে এভাবে বাচ্চাদের মতো করে কাঁদতে দেখে।মনের ভেতরের দলবদ্ধ কুয়াশাগুলো ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে ইমতিয়াজ আহমেদের।কিছু ভালো অনুভূতির আভাস পাচ্ছেন ওনি।এক হাত দিয়ে রেহেনা বেগমকে আকড়ে ধরে,অন্য হাত দিয়ে রেহেনা বেগমের মাথায় হাত বুলাচ্ছে সে।রেহেনা বেগমও বুঝে নিচ্ছেন তার স্বামীর দেওয়া আশ্বাস।যে আশ্বাস বলছে,কেঁদো না তুমি।তুমি তো জানো আমি তোমার কান্না সহ্য করতে পারি না।একদম কাঁদবে না।সব ঠিক হয়ে যাবে।সব আগের মতো হয়ে যাবে।আমি সব ঠিক করে দিবো।

দরজায় লাগাতার নকের শব্দে ইমতিয়াজ আহমেদের সকালের ঘুমের পরিসমাপ্তি ঘটে।হাত ইশারায় এপাশ ওপাশ করে পাওয়ারের চশমা খুজায় ব্যাস্ত হয়ে পড়েন ওনি।কিছুক্ষন এপাশ ওপাশ হাতাহাতির পর চশমার হুদিস মিললে কোনো মতে সেটা চোখে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ান।সাধারনত গত দু’বছরে এতো সকাল বেলায় এই দরজায় কাউকে কড়া নাড়তে দেখা যায় নি!তবে আজ কে?সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ইমতিয়াজ আহমেদ যেই দরজাটা খুলেছেন,তখনি কয়েকজন মিলে হুরমুরিয়ে এসে ঝাঁপটে ধরে তাকে।ইমতিয়াজ আহমেদ হতভম্ব হয়ে রয় কিছুক্ষন।ঘটনার পরিপেক্ষি বুঝতে একটু সময় লাগে ওনার।ওনারই তিন সন্তান ওনাকে ঝাঁপটে ধরে বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে যাচ্ছে।এমন অনুভূতির সাথে পরিচিত নন ইমতিয়াজ আহমেদ।একদম নতুন অনুভূতি এটা।ইমতিয়াজ আহমেদের চোখে আনন্দঅশ্রু জমতে শুরু করে।ভেতরের সমস্ত অনুভূতিরা বের হয়ে আসে অনন্দঅশ্রু হয়ে।

নতুন করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে জেগে উঠে।বারবার মনে হতে থাকে, কিছুই শেষ হয় নি।সব আগের মতোই আছে।এটা আমারই সংসার যেটা আমি নিজ হাতে একটু একটু করে তৈরি করেছিলাম।এখানে সবাই আমার এক একটা অংশ।এমন এক অংশ যা নিজের থেকে কোনো ভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয়।দরজার সামনে আরো একজনকে ঝাঁপসা দেখতে পান ওনি।রেহেনা বেগম!সেও চোখে জল,মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে ওনার দিকে!নিজের দুহাত উঁচু করে রেহেনা বেগমকেও আঁকড়ে ধরার আহব্বান জানান তিনি!রেহোনা বেগম এক সেকেন্ডও বিলম্ব করে না।সন্তানদের সাথে সাথে নিজেও স্বামীর বাহুডোরে জায়গা করে নেন।ইমতিয়াজ আহমেদ নিজের করা খারাপ কর্মগুলো অনেক আগেই উপলদ্ভী করতে পেরেছিলেন!এখন ওনি নতুন করে এও উপলদ্ভী করছে যে,ওনার কিছু ভালো কর্মেরও কর্মফল বাকী পরে ছিলো।যা সুধে আসলে ফিরে পেতে যাচ্ছে সে!!!

গল্পের বিষয়:
অনুপ্রেরণা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত