কারাগারে বন্দী

কারাগারে বন্দী

মধ্যরাতে একটি মেয়ের মেসেজ। ভাইয়া আসসালামুয়ালাইকুম, ওয়ালাইকুমআসসলাম। আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো। জী বলুন। মেসেজে বলা যাবে না,আপনার মোবাইল নাম্বারটা পেতে পারি? নাম্বার? ভয় নেই আমি বিবাহিতা। ০১৭………… অতঃপর মেয়েটির ফোন আসলো। জী বলুন। আপনিতো গল্প লিখেন,আমার জীবনের একটি গল্প লিখে দিবেন? ভাবলাম দাম্পত্য জীবনের রোমান্টিক গল্প লিখতে বলবে ভালোই হবে।আচ্ছা বলুন,আমি চেষ্টা করবো আমি খুন করছি,আমি খুনী।গল্পটা খুনের। কি বলেন!গল্পটা পাবলিশ করলে তো আপনাকে কারাগারে বন্দী করতে পারে।

আমি কারাগারেই আছি,ভয় নেই। আচ্ছা বলুন।(একটু থমকে গিয়ে মেয়েটি একনাগারে বলতে শুরু করলো। বিয়ের আগে আমার একটি রিলেশন ছিলো।আমাদের পরিচয় হয়েছিলো ফেইসবুক নামক ভার্চুয়াল লাইফ থেকেই। ছেলেটি বেশ মিশুক এবং হাসিখুশি হওয়াতে সহজেই আমাদের সম্পর্ক টা বন্ধুত্বে রুপ নেয়। প্রতিটি ভার্চুয়াল লাইফের ভালোবাসার গল্পের মতই আমাদের রিলেশন শুরু হয়।চেটিং করতে করতে একসময় নাম্বার বিনিময় হলো।তারপর অনেক রাতের জ্যোৎস্না পোহানোর সাথে সাথে মোবাইলে কণ্ঠস্বর বিনিময় করতে করতে মনটাও বিনিমও হয়ে গেছিলো একসময়তবে হ্যাঁ মন তো ছেলেটি দিয়েছিলো।আমি শুধু সময় দিয়েছিলাম।ইংরেজিতে যাকে বলে টাইম পাস। ওর সাথে করা কিছু চেটিং এমন ছিলো। কেমন আছো বাবু? (সে) ভালো। খেয়েছো? হুম। কি করছো? শুয়ে আছি বা যা করতাম তাই বলতাম।

কখনও সে কেমন আছে, কি করছে,খেয়েছে কি না এসব জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করতাম না।একটা সকালেও আমি ওর ঘুম ভাঙিয়ে বলিনি শুভ সকাল।একটা রাতেও মিষ্টি সুরে বলিনি অনেক রাত হয়েছে ঘুমাও না হলে শরীর খারাপ করবে। কিন্তু ও আমার খুব কেয়ার করতো।সবসময় আমার খোঁজ নিতো।ওর ভালোবাসার মধ্যে ছিলো পবিত্রতা।কখনও আমাদের কথোপকথনে অশ্লীলতা ছিলো না। তারপর সচরাসচর সব রিলেশনে যা হয় আমাদেরও তাই হলো।ওকে বললাম আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার সাথে কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করবা না।সেদিন ও ওপাশ থেকে খুব কেঁদেছিলো।ও শব্দ করে অশ্রু ঝরাচ্ছিলো না তবে আমি বুঝতে পারছিলাম ও কাঁদছিলো। অনেক রিকুয়েস্ট করেছিলো আমায়।প্লীজ আমাকে ছেড়ে যেও না।আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো না।একটু সময় দাও কিছুদিন পরেই তো আমি পাশ করে থেকে বের হবো।

আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।আমার মতো করে কেউ তোমায় ভালোবাসবে না,প্লীজ যেও না।উত্তরে আমি একটা কথায় বলেছিলাম,এসব সিনেমাটিক ডায়ালোগ দেয়া বন্ধ করো,অসহ্য লাগে আমার। বাই,আমাকে আর ডিস্টার্ব করবা না। আমার কাছে সেদিন ওর কথাগুলোর কোনো মুল্য ছিলো না।ওর বুক চাপা কান্নায় বাঁধ ভাঙা চোখের জল আমার হৃদয়ে একটুও রেখাপাত করছিলো না। আজ বছর দুই আমার বিয়ে হয়েছে।আমার বর একজন সরকারি চাকুরীজিবি।মোটা মুটি বেশ ভালো বেতন পাই।আমার পরিবার এমন সরকারি চাকরিওয়ালা ভালো ছেলে হাতছারা করতে চেয়েছিলো না।আমিও ভালো থাকার আশায় রাজি হয়েছিলাম।ভালোবাসা নয় অর্থকে সুখের উৎস ভেবে আনান্দে বৈবাহিক জীবনে পা বারালাম। কিন্তু আমি সুখে নেই।আমার বর একজন পারফেক্ট চাকুরীজীবী ঠিকি কিন্তু সে পারফেক্ট জীবন সঙ্গী কখনও হতে পারিনি।

ছেলেটি বলতো বিয়ের পর আমাদের প্রতিটি সকাল হবে মিষ্টি সকাল।ঘুমের আলসিমিতে খোলা জানালা দিয়ে আসা মিষ্টি রোদ চোখের পাতায় এসে ধরা দিলে চোখ খুলে দেখবো আমার পীঠে তুমি।আমরা একসাথে ঘুম থেকে উঠবো একসাথে সকালের নাস্তা বানাবো,রান্না শেষে নাস্তার টেবিলে বসে দুজন দুজনকে খাইয়ে দিবো।ঝালে যখন তোমার মায়াবি মুখে লাল লাভার মত রুপ নিয়ে ঠোঁট দুটি কাঁপবে তখন তোমার গোলাপি ঠোঁটে ভালোবাসার লাল চুম্বন একে দিবো। নাস্তা শেষে কাজে বের হওয়ার আগে তোমার কপালে উষ্ণ ছোঁয়া দিতে একদিনও মিস হবে না। আর আমার বর অফিসের তারায় “খেয়ে নিও” এই কথা টা বলতেই ভুলে যাই। ছেলেটি প্রতি ঘন্টাই আমার খোজ নিতো।ও বলতো তুমি মিষ্টি হাতে আমার জন্য দুপুরের খাবার বানিয়ে দিবে।দুপুরে ফোন দিয়ে যখন জানবে আমি বাইরে থেকে খেয়ে নিয়েছে ইচ্ছে মত বকে দিও।আমি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলতাম আমি তো রান্নায় করতে পারি না।

এখন আমি রাঁধতে শিখে নিয়েছি।খুব ইচ্ছে করে বর টার জন্য টিফিন করে খাবার দিয়ে দিতে আর না খেলে বলতে বাসায় এসো আজ খবর আছে।কিন্তু বর মশাই তো অফিস টাইমে ফোন দিতে নিষেধ করছে,অযথা ফোন দিয়ে খোজ নিলেও বকা দেয়।দুপুরে বাইরে খেয়ে অভ্যস্ত সে।আমার ইচ্ছে পুরোন থেকে তার কাছে সামান্য অভ্যাস মূল্যবান। ছেলেটি বলতো ছুটির দিনের প্রতিটি পড়ন্ত বিকালে ভেজা ঘাস পিছনে ফেলে হাঠবো আমরা।সুযোগ পেলেই তোমাকে কাছে নিয়ে রোমাঞ্চিত হবো।ওর কথাগুলো ফিল্মি টাইপ লাগতো। কিন্তু এখন ইচ্ছে হয় বর টার সাথে ছুটির বিকালবেলা নিরিবিলি রাস্তাতে ওর মাসল দু হাতে শক্ত করে ধরে কাঁধে মাথা রেখে হাটতে,একটু ফিল্মি টাইপ হতে।এই আশায় ছুটির বিকেলগুলিতে ওর দেয়া নীল শাড়িটা পরে অপেক্ষা করি এই বুঝি বর টা বলবে চলো দুজনে হাত ধরে প্রথম দেখা হওয়া সেই চিরোচেনা জায়গাটাতে পদধূলি দিয়ে আসি।কিন্তু বরটা ছুটির দিনের প্রতিটা বিকেল ওর বন্ধুদের আড্ডায় কাটায়।

ছেলেটি বলতো রাতে লেটে যখন বাড়ি ফিরে দেখবো খাবার বেরে তুমি রাগ করে বসে আছো পিছন থেকে তোমায় জরিয়ে ধরবো।তুমি মুখ ভার করে আমায় দুরে ঠেলে দিবে।তখন তোমার প্রিয় রক্ত গেলাপ দিয়ে রাগ ভাঙাবো।তুমি আদর করে তখন আমায় বুকে জরিয়ে নিও।ফ্রেশ হয়ে রাতের খবার শেষে দু কাফ কফি হাতে বারান্দায় গিয়ে হিমেল হাওয়ায় চুল উড়িয়ে রাত দেখবো আমরা। তারপর মিষ্টি বউটিকে কোলে নিয়ে বিছানায় গিয়ে রোমান্টিক ঘুম।আচ্ছা ঘুম কখনও রোমান্টিক হয়!আমি ওর কথাগুলোকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। আমার বরটা রাতে লেটে ফিরলে আমি যদি না খেয়ে খাবার টেবিলে বসে থাকি বকা দেয় আমাকে।না খেয়ে ঢং করাটা নাকি তার পছন্দ নয়।আচ্ছা কথা না শুনিয়ে বরটা কি পারে না ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে আদর করে খাইয়ে দিতে,আমিও দু গাল খাইয়ে দিতাম। হয়তো পারে,কিন্তু কখনও ওর হাতে খাবার ভাগ্যা আমার হয়নি।

যেকোনো ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই বরটার ঝাড়ি শুনতে হয়।আমি যেন তার হাতে পরিচালিত একটা রোবটের ন্যায়। যা বলবে তাই করতে হবে।বরটা ভারী কণ্ঠস্বরে যখন কথা বলে ভয়ে বুক কেপে ওঠে।ঐ ছেলেটি কিন্তু এমন ছিলো না বি এফ হওয়া সত্ত্বেও যেন মনে হতো ঐ আমাকে দেখে ভয় পেত।বকা দূরে থাক আমার সাথে কখনও উচ্চস্বরে কথা বলতো না।সে আমাকে হুকুম করতো না কখনও রিকুয়েস্ট করতো সবসময়।ওর মন মানসিকতা বেশ উন্নত ছিলো।ও বলতো তুমি স্বাধীন তোমার কাছে যেটা ভালো লাগবে করতে পারো তবে অন্যায় করবে না কখনও।আপছস আমি ছেলেটির কথা রাখতে পারি নি।অন্যায় করেই ফেলছি। ছেলেটি বলতো,আমরা নদীর ধারে ছোট্ট একটা ঘর বাঁধবো।ভালোবাসার ঘর,ভালোবসার রংতুলি দিয়ে রাঙিয়ে আমরা সাজাবো সে ঘর।জ্যোৎস্না রাত গুলোতে আমার নদীর পারে বসে পা ভিজিয়ে রাত দেখবো।

আমি বলতাম ধুর পাগল নাকি তুমি।ছোট্ট ঘরে থাকা যায় নাকি?বড় অট্টালিকায় যে সুখ আছে তা সামান্য কুরেঘরে কীভাবে পাবে।তুমিও নিম্নমানের তোমার চিন্তাভাবনাগুলোও নিম্নমানের।আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। ছেলেটি আমার কথা গুলো নীরবে মেনে নিতো। আজ কিন্তু আমি বড় ঘরেই আছি।অর্থ কে সুখ ভেবে আপন করে ভালোবাসাকে পর করেছিলাম আমি।ভুল করেছিলাম আমি। আমার বড় ঘরে দামি আসবাসপত্র ঠিকি আছে তবে শুধু ভালোবাসা নেই। ছেলেটির বন্ধু একদিন ফোন করে বলে,ও টাকা বাঁচাতে মাঝে মাঝে কলেজ থকে হেঁটে বাড়ি যেত,আমরা যখন খেতে যেতাম সবাই ও যেতো না। বলতো ভালো লাগছে না তোরা যা।

ঐ টাকা দিয়ে ও আপনার সাথে রাত জেগে ফোনে কথা বলতো ঘন্টার পর ঘন্টা।যাতে আপনি রাগ না করেন।ওর বন্ধুর কথা গুলো সত্য ছিলো কারন আমি তো কখনও মিস ছাড়া কল দিতাম না।ওর বন্ধু আরও বলে আপনার বার্থডে তে আপনি আর আপনারবান্ধবিদের ট্রিট এর টাকা ম্যানেজ করতে গাধাটা সখের মোবাইল টা বিক্রি করে দিয়েছিলো।আর আপনি ওকেই ছেড়ে দিলেন।আমি উত্তরে বলেছিলাম দালালি করতে কি ফোন দিয়েছেন,একটি সুন্দরি মেয়ের সাথে কথা বলতে ছেলেরা কতকিছু করে আপনার বন্ধুও করছে,আমাকে আর বিরক্ত করবেন না। আজ আমার বর টার অবহেলাতে আমি ছেলেটিকে খুব মিস করি।ইচ্ছে করে ছেলেটির কাছে ফিরে যেতে।কিন্তু বাঙালি মেয়েরা একবার যাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেয় সারাজীবন তার পরিচয়ে তাকে আকরে ধরেই বাঁচে।আমার দুঃখের কারন আমি নিজেই।

আপনার তো সম্পূর্ণ দোষ না।আপনার পরিবারের চাপেই তো আপনি বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।(আমি) হ্যা,কিন্তু আমি ইচ্ছা করলে কিছু সময় ওর জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম। (মেয়েটি) আমি চুপ হয়ে গেলাম। মেয়েটি আবার বলতে লাগলো। ভুল ভুঝতে পারার পর ছেলেটির সাথে দেখা করে ক্ষমা চাইতে চেয়েছিলাম। ওর নাম্ব্র বন্ধ পাওয়াও ওর বন্ধুর মাধ্যমে যোগাযোগ করে একবার দেখা করার জন্য বলেছিলাম।সেদিন ও একটা কথা বলে আমার সব চেষ্টা থামিয়ে দিয়েছিলো “আমাকে খুজে আর লাভ নেই প্রিয়,আমি তোমার অবহেলায় হারিয়ে গেছি”।

তারপরেও অনেক খুজেছিলাম কিন্তু ছেলেটির কোনো খোঁজ পায় নি। অবশেষে মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বললো আমার এই পরিস্থিতির জন্য আমিই নিজেই দায়ি। আমি সত্যিকারের ভালোবাসাকে খুন করছি, আমি খুন করছি একজন ছেলের সপ্নকে, আমি খুন করছি আমার প্রাপ্য সুখ কে, আমি খুনি, তাইতো আজ প্রচুর অর্থে গড়া কারাগারে বন্দী। আমি লোভি,আমি পাপী, আমি খুনি,।

গল্পের বিষয়:
অনুপ্রেরণা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত