ঘুরে দাঁড়ানো

ঘুরে দাঁড়ানো

রূপা জানো জীবনে প্রথম আমি কি চুরি করে খেয়েছি?(আমি) নিশ্চই আম! আমি তো ছোট বেলায় পাশের বাগান থেকে কত আম চুরি করে খেয়েছি। (রূপা) রূপার কথা শুনে মুচকি হাসলাম। ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম না রূপা জীবনে প্রথম আমি ভাত চুরি করে খেয়েছি! কথাটা শুনেই রূপার মুখটা কেমন যেন চুপসে গেল। ও আমার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন স্যার? নাহ রূপা সত্যি বলছি। আমার চুরি করা প্রথম জিনিসটা ভাত ছিল। কেন জানো? রূপা তখনও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

আমি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললাম পেটের দায়ে সেদিন ভাত চুরি করে খেয়েছিলাম। ধরাও খেয়েছিলাম। খুব মেরেছিল ওরা। আমার মা বাবাও বাদ রাখে নি। এই যে মাঝে মাঝে আমি অজ্ঞান হয়ে যায় কেন জানো?  ওই দিন আমার সৎ মা বাঁশ দিয়ে আমার মাথায় এত জোরে একটা বাড়ি দিয়েছিল যে আমি ৩ দিন অজ্ঞান ছিলাম। তার পর থেকেই মাথায় খুব যন্তনা হত। পেটে ক্ষুধার টান পরলেই মাথা ঘুরে পরে যেতাম।  বিশ্বাস কর রূপা আমি চোর নয়। ওরা আমাকে চোর বানিয়েছে। সেদিন আমি চুরি করতে চাই নি ওরা আমাকে বাধ্য করছে।

আমার মাকে সেই ছোট বেলায় দেখেছি। চেহারাটা ভাল করে মনে নাই। মার কি যেন অসুখ হইছিল। আমার মা মারা গেল। আমার বয়স তখন ৪। ভালমত বুঝতে শিখি নি তখনো। বাবা মাকে রোজ এসে মারত।আর মা কাঁদত।মায়ের দেখাদেখি আমিও কাঁদতাম।বাবা খালি মাকে একটা কথায় বলত “বাপের বাড়ির থেকে কি নিয়ে আসছস? বসে বসে খাস, যা বের হয়ে যা” মায়ের কষ্টটা তখন একটু আধটু বুঝতাম।মা মারা যাওয়ার পর আমি খালি দিন রাত কাঁদতাম।  জানো রূপা যখন ক্ষুধা লাগত তখন মায়ের কথা সব থেকে বেশি মনে পরত। মা আমাকে সময় মত খাইয়ে দিত। তখন কেউ দিত না। আমি একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম। এমন দিন নেই যে মার খাই নি।

কাজ করে ভাত খেতে হত। আমার সৎ মা বলত “কাজ না করলে ভাত দিব না, কাজ করলে ভাত পাবি” কি করব পেটের দায়ে কাজ করতাম। রূপা তুমি বলতে পার একটা আট বছরের বাচ্চা কিভাবে কাপড় চোপড় কাচে,ঘর মুছে,বাসন ধয়?  আমি ঘরের সব কাজ করতাম বলে বন্ধুরা আমাকে হিজড়া বলত। উঠতে বসতে মার খেতাম। একটু ভুল হলেই মার খেতাম।সৎ মা খুব মারত আর বাবা একটু কম। সেই চার বছর বয়স থেকে মার খেয়ে আসছি। রোজ রাতে মায়ের কবর ধরে কাঁদতাম। আর বলতাম “মা তুমি কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে? আমাকে কেন তোমার সাথে নিলে না” আমার ডাক মা শুনত না। ওই উপর আল্লাও শুনত না।

আমার বন্ধুরা সবাই স্কুলে যেত। আর আমি বাড়ির কাজ করতাম। আমি বাবাকে বলেছিলাম আমি স্কুলে যাব। সৎ মা শুনে বলেছিল “তুই স্কুলে গেলে কাজ করবে কে?” বাবার হাতে পায়ে ধরলাম যেন আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। অনেক কষ্টে রাজি করালাম।  আমি স্কুলে যায় বলে সৎ মা সহ্য করতে পারত না। সে জন্য ঠিক মত খেতে দিত না। শুধু এক বেলায় খেতে পেতাম। রাতে ক্ষুধার পেলে কল থেকে জল খেতাম। জানো রূপা স্কুলে সবাই টিফিন নিয়ে যেত শুধু আমি ছাড়া। বন্ধুরা যখন বলত “কিরে তোর টিফিন কই?” আমি তখন ক্ষুধা পেট নিয়েই বলতাম “আমার এ সময় ক্ষুধা লাগে না।” তখন দৌড়ে যেতাম স্কুলের টাইম কলে জল খেতে। একটা স্যার আমার জল খাওয়া দেখে বুঝে গিয়েছিল আমি খুব ক্ষুধার্ত।

স্যারটা আমাকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়ায়। জানো আমি সেদিন ৩ প্লেট ভাত খেয়েছিলাম।বলতে পারো একটা ৮ বছরের বাচ্চা কিভাবে ৩ প্লেট ভাত একবারে খেতে পারে? স্যার আমার খাওয়া দেখে খুব অবাক হয়েছিল।তিনি আমাকে সাহায্য করতেন। খাতা কলম কিনে দিতেন। স্কুল থেকে এসেই স্কুল ড্রেস পরেই কাজ করতাম।কাজ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। সন্ধ্যার পরে আবার পড়তে বসতাম। রোজ প্রর্থনা করতাম যেন আমাকে কালকের দিন না দেখতে হয়।  আমার যখন সৎ ভাই হল আমার বয়স তখন ১০। এখন আমি সব বুঝতে শিখেছি। আমার ভাইটা হামাগুরি দিতে শিখেছে। একটু একটু কথা বলতেও শিখেছে। প্রত্যেকবার পূজায় ওকে নতুন জামা কিনে দিত। আমাকে দিত না। আমি পুরানোটা দিয়েই চালিয়ে নিতাম। বয়স ১০ হলে কি হবে মার তখনও খেতাম। মার খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম। তখন মারলে ব্যাথা লাগত না।

একদিন স্কুল থেকে আসতে দেরি করেছিলাম।সৎ মা আমাকে পায়ের জুতা খুলে পিটাইছিল। বলেছিল “গাজা টানতে গেছিলি না?” বসে বসে খাস,, কাজ কি তোর মা এসে করে দেয়?” সেদিন আমাকে ভাত দেয় নি। জল খেয়ে ছিলাম। রাতের বেলা যখন আর থাকতে পারলাম না তখন সিন্ধান্ত নিলাম আমি চুরি করব।  বিশ্বাস কর রূপা ওটাই আমার জীবনের প্রথম চুরি। পাশের বাসা থেকে ওয়াল বেয়ে ঘরে ঢুকে আমি ভাত চুরি করে খায়।

আমি খাচ্ছিলাম আর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। আমি চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেছিলাম। তার শাস্তি আজোও পোহাতে হয়। সপ্তাহে দূ বার চেক আপ করাতে হয়। বেশিক্ষন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।ওরা যদি সেদিন আমার ঠিকমত চিকিৎসা করত তবে আমার এমন সমস্যা হত না। ডাক্তার বলেছিল অপারেশন করাতে ওরা করতে দেয় নি। এই নেমখারাম দুনিয়ার মুখে লাত্থি মেরে সেদিন পালিয়ে এসেছিলাম। কিসের মা কিসের বাবা? শত কষ্টের মাঝে লেখা পড়াটা ছাড়িনি।

দিনের গার্মেন্টেসে কাজ করে রাতে পড়তাম। এর ওর পায়ে ধরে থাকার জন্য ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম।সে দিন থেকে একটাই প্রতিজ্ঞা ছিল জীবনে কখনো বিয়ে করব না। ওখান থেকেই শুরু। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। আজ আমি দেশের সেরা একজন বিজনেস ম্যান। কি নেই আমার?

ঢাকায় তিনটা বিশাল বাড়ি, ব্যায়বহুল গাড়ি, টাকা পয়সা ধন দৌলত সব আছে আমার।শুধু ওরা নেই। ওদের কে খুব মিস করি জানো? ওদের কে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। আজ ১৮ বছর হয়ে গেছে ওদের মুখ দেখি না। শুনেছি ওরা সেইখানেই থাকে যেখানে ওরা আমায় বাঁচতে দেয় নি। কিন্তু ওদের সামনে যায় নি কখনো। আর কখনো যাব না। ভাল থাকুক ওরা।

রূপা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদঁছে। আমিও কাঁদছি। আজ রূপাকে সব বলতে পেরে বুকের পাথরটা সরাতে পারলাম। মেয়েটার কান্না দেখে আরো জোরে কান্না পাচ্ছে। মেয়েটা আমার অফিসের ম্যানেজার হলেও ওর জন্য খুব মায়া লাগছে। ও আমাকে ভালবাসে কিন্তু কখনো বলতে পারে নি। ওর জীবন আমার মতই ছিল। কি করব বুঝতে পারছি না। আজ নিজেকে আর একা মনে হচ্ছে না। আমার জন্য কেউ তো একজন কাঁদছে।

গল্পের বিষয়:
অনুপ্রেরণা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত