কবরস্থানের কান্না

কবরস্থানের কান্না

আমার রোজ অফিস থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আমি যে রাস্তা দিয়ে আসি সেখানে এত রাতে কোনো রিক্সা পাওয়া যায়না বলে হেটেই বাসায় ফিরতে হয়।
পথে একটা কবরস্থান আছে, তার পাশে একটা বিশাল
বটগাছ। রোজ যখন কবরস্থান পার হতে যাই ঠিক তখনই সেখানে অনেক মহিলার গুনগুন করে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই! এভাবে আসা যাওয়া করতে করতে আওয়াজটা গা সওয়া হয়ে গেছে। একদিন হঠাৎ

করে অনেক দেরি হয়ে গেলো অফিস থেকে ফিরতে। আমি গাড়ি থেকে নেমে হাটতে থাকলাম, দেখলাম একটা পাঞ্জাবী পরা লোক আমার পেছনে হেটে আসছে, মনে মনে খুশিই হলাম একজন সঙ্গি পেয়ে। আমি একটু আস্তে আস্তে হাটছি যাতে লোকটি আমার কাছে চলে আসতে পারে। একসময় লোকটি আমার কাছাকাছি আসলে আমি নিজেই আলাপের সুরে কথা বলতে শুরু করি।
:আপনি কোন বাসায় যাবেন?
লোকটি শুধু হাসলেন কিছু বললেন না। আমিও হাসি হাসি মুখে বললাম রোজ একা চলাফেরা করিতো তাই আজ আপনাকে দেখে ভালো লাগলো। লোকটি বিনিময়ে আবারও হাসলো। আমি তাকে তার নাম জিগ্যেস করলাম, প্রতিত্তোরে উনি বললেন,
:আমার নাম সাজিদ।
: আমি রোহান
: আমি থাকি ৫৯ নম্বর বাসায় আর আপনি?
: এইতো আপনার বাসার কাছেই।
: বেশতো, আমরা তাহলে একসাথেই যাচ্ছি।
: হ্যা তাতো বটেই।
: আচ্ছা একটা কথা বলি?
: অবশ্যই!
: এইযে কবরস্থানের সামনে দিয়ে যখন আপনি যান, তখন কি কোনো আওয়াজ শুনতে পান?
: কিরকম আওয়াজ?
: এ ধরুন অনেক মহিলার কান্নার আওয়াজ।
: হ্যা শুনিতো রোজই!
: তারমানে ঘটনা সত্য?
: হ্যা
: এরকম করে কারা কাঁদে?
: হয়তো ওখানকার মৃত আত্মারা।
: মৃত কেউ কি কখনও কাঁদতে পারে?
: পারবেনা কেন? অবশ্যই পারে।
: আপনি জানেন এ ব্যাপারে?
: হ্যা জানিতো, একসময় আমিও আপনার মত এসব বিশ্বাস
করতাম না কিন্তু এখন সবই বিশ্বাস করি।
: হাহাহা!! আচ্ছা আপনার সাথে কথা বলতে ভালোই
লাগছে।
এভাবে কথা বলতে বলতে কখন যে কবরস্থান পেড়িয়ে
আমার বাসার সামনে এসে পড়লাম বুঝতেই পারিনি।
লোকটি কথার মাঝখানে বলে উঠলো।
:আপনার বাসার সামনে চলে এসেছি।
আমি অবাক হলাম, এটা আমার বাসা উনি জানলেন
কি করে? লোকটি মুচকি হেসে বিদায় নিলো। আমিও
বিদায় নিয়ে বাসায় ঢুকে পড়লাম। এরপর থেকে
প্রতিদিনই লোকটির সাথে দেখা হতো কিন্তু এরপর থেকে কবরস্থানে আর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাইনি কখনও।

এভাবে দুই সপ্তাহ কেটে গেলো। একদিন লোকটি আসলোনা, এভাবে তিনদিন উনি আসলেন না। আগামাীকাল আমার ছুটির দিন, তাই ভাবলাম উনার
বাসায় গিয়ে খোঁজ নিবো কালকে। বাসায় ঢুকে ফ্রেশ
হয়ে খাওয়ার পর্ব শেষ করে শুয়ে পড়লাম।
#পরদিন
জুম্মার নামাজ শেষ করে ৫৯ নম্বর বাসার দিকে রঁওনা
দিলাম….
দারোয়ানকে জিগ্যেস করলাম……
:সাজিদ সাহেবের বাসায় যাবো উনি কত নম্বর ফ্লোরে
থাকেন?
: ৩ তলায় যান স্যার!
আমি ৩ নম্বর ফ্লোরে উঠে কলিং বেলের সুইচ টিপলাম।
দরজা খোলার শব্দ পেলাম। দরজার সামনে একজন মধ্য বয়স্ক ভদ্র মহিলা দাড়িয়ে আছেন।
: জ্বি আমি সাজিদ সাহেবের বন্ধু উনার সাথে দেখা করতে এসেছি।
: জ্বি ভেতরে আসুন।
: জ্বি ধন্যবাদ
এই বলে ভদ্র মহিলা আমাকে ভেতরে বসতে দিলেন। আমি এদিক ওদিক দেখছি, বেশ গোছানো ড্রইংরুম। ভদ্র মহিলা বোধহয় বিধবা, সাদা কাপড় পরে আছেন। উনি আমার জন্য শরবত আর ফল নিয়ে আসলেন। আমি আপত্তি জানালে উনি বললেন,
:আপনি আমার স্বামীর বন্ধু আজ প্রথম এলেন। তাছাড়া আপনি বোধহয় জানেন না উনি গত দুই সপ্তাহ আগে মারা গেছেন।

আমি বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম মহিলাটির কথায়।
উনাকে শান্তনা দিবো নাকি গত দিনগুলোর কথা বলবো বুঝতে পারছিনা। আমি একটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে সবকিছু খুলে বললাম ভদ্র মহিলাকে। উনি সব শুনলেন উনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে উনি বিশ্বাস করলেন। উনি বললেন,
: উনি খুব বন্ধুসূলভ ছিলেন, তবে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে সেটা আমি ভাবিনি। উনি আসলে মারা যাননি, উনাকে খুন করা হয়েছিলো।
:আপনি এ ব্যাপারে কাকে সন্দেহ করেন?
: আমি আসলে বুঝতে পারছিনা, কে এমন সৎ লোককে খুন করতে পারে? পুলিশ এখনও কাউকে সন্দেহ্ করেনি, তদন্ত চলছে।
: আচ্ছা আমি তাহলে পুলিশের সাথে এ ব্যাপারে কথা
বলবো। মহিলা ডাক্তার দেখাতে যাবেন বলে আমাকে
জানালেন,
আমি ভদ্র মহিলাকে আবার আসবো জানিয়ে বিদায়
নিলাম। বাসায় ফিরে গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলো
আওড়াচ্ছিলাম, এজন্যই হয়তো আমি না বলতেই উনি
আমার বাসা চিনে ফেলছেন। আর ভাবতে পারছিনা,
ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নে দেখলাম সাজিদ সাহেবকে, উনি
হেটে যাচ্ছেন পেছনে দুটি লোক উনাকে দেখিয়ে
ফিসফিস করে কিছু বলছিলো, একজনের বা চোখের
কোণে ক্ষতের দাগ অপরজন একটু খুুড়িয়ে হাটছিলো।
তারপর হঠাৎ ওরা পিস্তল বের করে সাজিদ সাহেবকে পথ আটকে দাড়ালো, উনার হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে
টানাটানি শুরু করে দিলো। এক পর্যায়ে লোকগুলো
সাজিদ সাহেবকে গুলি করলো। সাজিদ সাহেব কাতরাতে কাতরাতে ওখানেই মারা গেলো। মৃত্যুর আগে উনি আমার নাম ধরে শুধু বললেন বাবা আমাকে সাহায্য করো, ওদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দেও। তারপরই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি ঘেমে নেয়ে একাকার, ঘড়িতে দেখলাম সঁন্ধ্যা ৬:৪৩ বাজে। আমি ফ্রেশ হয়ে আবারও ৫৯ নম্বর বাসার দিকে রঁওনা দিলাম। ভদ্র মহিলা আমাকে দেখে অবাক হলেন, আমাকে ভেতরে ডেকে বসালেন।
আমি সব কিছু খুলে বললাম, উনি অবাক হয়ে সব শুনলেন। আমি উনাকে আমার সাথে থানায় যেতে বললাম। তার আগে একটি মিথ্যে গল্প বানালাম যে এই খুন আমিই করতে দেখেছি। যদি ওসি জিগ্যেস করে এতদিন কেনো বলিনি বলবো আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মহিলাটি আমার কথায় সায় দিলো। উনাকে নিয়ে থানায গেলাম আর আমার স্বপ্নে দেখা সব ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি বলে ওসিকে জানালাম, ওসিকে আরও বললাম ওদের একজনের চোখে ক্ষতের দাগ আরেকজন খোঁড়া মত
ছিলো। ওসি সাহেব শকড্ খেলেন মনে হয়, উনি বলে
উঠলেন,
: এরা সেলিম আর মাসুদ ছাড়া আর কেউ না। উনি ফোর্স রেডি করতে বললেন। সাথেই ওদের দুজনের বাসায় দু’টি টিম ঘেরাও করে ওদের অাটক করলো। সাথে টাকাভর্তি ব্যাগটিও উদ্ধার হলো। এরপরদিন ওদের কোর্টে চালান দিলো, আমাকে সাক্ষী করে মামলার রায়ে ওদের ফাঁসি হলো। এভাবেই সাজিদ সাহেবের হত্যা মামলায় সুবিচার পেলাম। উনার স্ত্রী আমাকে উনার আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাকে নিজের ছেলে বলে সম্বোধন করলেন। আমাকে বললেন, মা বলে ডাকতে। আমি
উনার কথায় সায় দিলাম। এরপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সারাদিন মামলা নিয়ে ছুটাছুটি করেছি তাই ক্লান্ত ছিলাম, খেয়ে দেয়ে শুয়ার সাথে সাথেই ঘুম চলে এলো। স্বপ্নে দেখছি আমি নদীর ধারে ঘাসের উপর বসে আছি, সাজিদ সাহেব আসলেন। উনি সেই পরিচিত হাসিমাখা মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আস্তে অাস্তে বাতাসে মিলিয়ে গেলেন।
,
……………………………………………সমাপ্ত………………………………………..

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত