রাতের বিভীষিকা

রাতের বিভীষিকা

ছর পাঁচেক আগের কথা। আমি ভাই ও দিদির সাথে সোদপুরে গিয়েছিলাম সার্কাস দেখতে। কোনোদিন সার্কাস দেখা হয়নি আমাদের আর ছোটো থেকেই শুনে আসছি শীতকালে সোদপুরের “দ্য গ্রেট আফ্রিকান সার্কাস” নাকি খুব বিখ্যাত এবং উপভোগ্য। তাই এবারের সু্যোগটা আর হাতছাড়া করলাম না আমরা। আমাদের বাড়ি রাণাঘাটের তিনটে স্টেশন আগে শিমুরালিতে। এখান থেকে সোদপুর একটু দূর বটে কিন্তু আমি আর দিদি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছি, তাই একা যাতায়াতে কোনো সমস্যা হবে না। আর কিছু না ভেবে সার্কাস দেখতে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম।

আমার ও দিদির কলেজ এবং ভাইয়ের স্কুল থাকায় নাইট শোটাই ঠিক করেছিলাম আমরা। এতে সুবিধে এই যে রাতের দিকে ট্রেন ফাঁকা থাকবে তাই বাড়ি ফিরতে তেমন কোনো সমস্যাই নেই। শুধু স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তাটা অত রাতে একদম শুনশান হয়ে যায়, তাই বাড়িতে সবাই চিন্তা শুরু করে দিলেন আর আমাদের বারন করতে লাগলেন। বাবা বললেন, অনেকে নাকি রাত করে বাড়ি ফেরার সময় অদ্ভুত সব আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন, মাঝরাতে ঐ রাস্তাটি ভালো নয়। কিন্তু আমরা এসব বুজরুকি বলে উড়িয়ে দিলাম, প্রথমবার সার্কাস দেখতে যাওয়ার আনন্দে আমরা তখন আত্মহারা। আমাদের জেদ দেখে আর কিছু বললেন না, শুধু মুখটা ভারী করে সাবধানে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। উফফ আমাদের আনন্দ আর দেখে কে, দিন গুনতে শুরু করে দিলাম।

দেখতে দেখতে নির্দিষ্ট দিন উপস্থিত হল। হৈহৈ করে আমরা তিন ভাইবোনে ট্রেন ধরে চললাম সোদপুর। সার্কাস প্রাঙ্গনে যখন পৌছলাম তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। টিকিট কেটে দিদি কিছু বাদাম আর চিপসের প্যাকেট কেনার সাথে সাথেই আগের শো শেষের ঘন্টা বেজে গেল। আমরা তড়িঘড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম তারপর ধীরে ধীরে সারীবদ্ধভাবে সার্কাস তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। ভিতরে ঢুকতেই এক অনন্য অনুভূতিতে আমাদের মন নেচে উঠলো। এ যেন এক পৃথক জগৎ, চারিদিকে কত আলো, সবাই কত্ত খুশি। উত্তাল ছন্দে একটা গান বেজে চলেছে, আর তার মনমাতানো সুরের মূর্ছনায় ভেসে গিয়ে নির্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট হলাম, ভাগ্যক্রমে একদম সামনের সারিতেই বসার সুযোগ পেয়েছি আমরা।

একটু পরেই সার্কাস আরম্ভ হল, অবাক চোখে তিন ভাইবোনে দেখতে লাগলাম সুপটু কলাকুশলীদের অভাবনীয় সব কার্যকলাপ। সেসব অবিশ্বাস্য উপস্থাপনা দেখে আমার মনে হতে লাগল অসম্ভব জিনিসকে সম্ভব করার অপর নামই যেন সার্কাস। কত অদ্ভুত খেলা- জিমন্যাস্টিক, চোখ বন্ধ করে অব্যর্থ লক্ষভেদ, মরণকূপে মোটরসাইকেলের ভয়াবহ ঘূর্ণন ইত্যাদি, খেলার ফাঁকে ফাঁকে জোকারদের হাস্যরসাত্মক অঙ্গভঙ্গি বেশ মজাদার। তবে আমাদের সবচেয়ে ভালো লাগলো পশুপাখির খেলা – নানা ধরনের পাখিদের কি সুন্দর প্রশিক্ষিত আচরণ আমাদের মুগ্ধ করল। এছাড়াও ছিল হাতি, জেব্রা, ঘোড়া প্রভৃতি, আমাদের দিকে একটা বিশালবপু জলহস্তী এমনভাবে এগিয়ে এল যে আমরা ভাবলাম এই বুঝি গুঁতো মারে আর কি, কিন্তু সঠিক সময়ে প্রশিক্ষক তাকে ফেরত নিয়ে যায় আর আমরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। এভাবেই হাসি মজা এবং বিষ্ময়ের মধ্যে দিয়ে কখন যে তিনটি ঘন্টা কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।

এক অভূতপূর্ব অনুভূতি নিয়ে যখন সার্কাস তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালাম তখন দশটা বেজে গেছে। তাঁবুর একপাশের ছাউনিতে ক্লান্ত হাতি ঘোড়াগুলো সারাদিনের মনোরঞ্জনের পর বিশ্রামের তোড়জোড় করছে, কিছু বাচ্চা একটু তফাতে খুব মজার সাথে তাদের দেখছে। ঐ জলহস্তীটাকে আর দেখতে পেলাম না, ভালোই হয়েছে কখন আবার তেড়ে আসে বলা যায় না। একেবারে রাতের খাওয়া সেরেই ফেরার ট্রেন ধরবো এরকমটাই ঠিক ছিল, তাই স্টেশন লাগোয়া ‘পেঙ্গুইন রেস্টুরেন্ট’-এ ঢুকে তিনটে মটন বিড়িয়ানির অর্ডার দিলাম।

খাওয়া সেরে স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সন্ধ্যেটা তখনও অব্দি দারুণ ভালো কাটছিলো কিন্তু অদৃষ্টের মনে হয় আমাদের জন্য অন্যরকম কিছু পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ এই অসময়ে ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল, সাথে আরম্ভ হল বিদ্যুৎ চমকানো ও বজ্রপাত, যে কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামতে পারে। যথেষ্ট গরম পোষাক পরে থাকা সত্ত্বেও শীতের রাতে এই ঝড় আমাদের কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। অসময়ের বৃষ্টি নাকি কবিদের মনে প্রেম জাগায়, কিন্তু সেই রাতে আমাদের ভয় করতে লাগল। এক তো বাড়ির হাজার বারণ উপেক্ষা করে একাকী সার্কাস দেখতে এসেছি তার ওপর যদি এই দুর্যোগে ট্রেনের গোলমাল হয়ে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায় তাহলে আর রক্ষে নেই। একবার বিকট শব্দে কাছেই কোথাও একটা বাজ পড়ার সাথে সাথেই ট্রেনের হেডলাইটের আলো দেখতে পেলাম। বেশিকিছু আর না ভেবে উঠে পড়লাম ট্রেনে।

কথায় আছে না অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়ে যায়, তেমনি আমাদের কপালেও দুর্ভোগ লেখা ছিল। নৈহাটী স্টেশনের পর ট্রেন আর নড়ে না। জানতে পারলাম এদিকে প্রচুর ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় ওভারহেডের তার ছিঁড়ে গেছে, সেটা সারাই না হলে ট্রেন ছাড়বে না। আমরা প্রমাদ গুনলাম, এবার কি হবে? বাড়িতে তো বকা খাবই উপরন্তু বাড়ি যাওয়ার সেই অদ্ভূতুড়ে পথটা, অত রাতে একা ফিরতে হবে ভেবে বুকটা একবার ধ্বক করে উঠলো।

অবশেষে ঘন্টাদুয়েকের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ট্রেন গড়ালো, শিমুরালি যখন পৌঁছলাম আমরা তখন রাত দেড়টা। স্টেশন একদম ফাঁকা, যে গুটিকয়েক যাত্রী আমাদের সাথে নামলেন তারাও যে যার মতো অন্যদিকে চলে গেলেন। পাণ্ডববর্জিত স্টেশনটি আমাদের তিনজনকে সাথে নিয়ে এই পৌষের বৃষ্টিভেজা শীতের রাতে একাকী দাঁড়িয়ে রইলো, সামনের প্লাটফর্মে কয়েকজন ভবঘুরে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। একটা কুকুর আমাদের দেখে মুখ তুলে তাকিয়ে আবার শরীরের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়লো। ঠান্ডাও যথেষ্ট পড়েছে তাই আর কালবিলম্ব না করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম আমরা। সারা রাস্তা অন্ধকার, বুঝলাম ঝড়ের জন্য লোডশেডিং। ভাগ্যিস টর্চটা এনেছিলাম সাথে, সার্কাসের কথা আলোচনা করতে করতে আমরা তিনজন এগোতে লাগলাম। আমাদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাতে একটা বাঁশবাগান পড়ে, ওই রাস্তাটা নির্জন বটে কিন্তু অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছনো যায়। এতো রাত হয়ে গেছে, বাড়ির লোক খুব দুশ্চিন্তা করছেন তাই আর কিছু না ভেবে ওই রাস্তাটাই আমরা বেছে নিলাম। এখন বুঝি ওটাই আমাদের কত বড় ভুল ছিল সেদিন।

আকাশে মেঘ সরে গিয়ে ত্রয়োদশীর চাঁদ উঠেছে, সেই আবছা চাঁদের আলোতে অন্ধকার বাঁশবাগানটা আরো বেশি ভূতুড়ে লাগছিলো। রামনাম জপ করতে করতে আমরা বাঁশবাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হঠাৎ মনে হলো আমাদের পায়ের আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে আরো একটা আওয়াজ ক্রমাগত চলেছে আমাদের সাথে। আমি দিদি ও ভাইকে জিজ্ঞাসা করতে তারাও বললো ব্যাপারটা উপলব্ধি করেছে। কিন্তু পিছনে টর্চের আলো ফেলে কাউকেই দেখতে পেলাম না। পরীক্ষা করার জন্য একটু হেঁটে দাঁড়িয়ে পড়লাম, আমরা থামতেই আওয়াজটাও অদ্ভুতভাবে থেমে গেলো, শুধু হাওয়ার ধাক্কায় বাঁশে বাঁশে ঠোক্কর লাগার আওয়াজ হতে লাগলো। আবার হাঁটা শুরু করলাম, আবারও সেই আওয়াজটা শুরু হলো, বুঝতে পারলাম কিছু একটা গন্ডগোল তো নিশ্চই আছে এখানে। তাহলে কি এই রাস্তা নিয়ে যে বদনাম আছে সেটা সত্যি আর আমরা তারই কবলে পড়েছি, হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দিলাম। যে সাহসে ভর করে রাতে সার্কাস দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেই সাহসের ছিটেফোঁটাও তখন আর অবশিষ্ট ছিল না আমাদের মধ্যে।

একটু এগোতেই হঠাৎ মাটির গভীর থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়া উঠলো আর তাতে একটা বাঁশ হুড়মুড় করে ঠিক একদম ভাইয়ের সামনে রাস্তায় ভেঙে পড়লো, ইঞ্চিদুয়েকের জন্য ভাই বেঁচে গেলো। অনেকক্ষন ঝড় বন্ধ হয়ে গেছে আর তাছাড়াও এরকম একঝটকার হাওয়ায় এতো বড় একটা বাঁশ কিভাবে ভেঙে পড়ে? আমরা প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম, বাঁশটাকে ডিঙিয়ে এবার উর্দ্ধশ্বাসে দৌঁড়োতে শুরু করলাম আমরা। বেশ খানিকটা দৌড়ে এসেছি হঠাৎ দিদি চিৎকার করে উঠলো, “ছোটভাই কোথায় গেল?” আমি পিছন ফিরে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই দিদি ভয়জড়ানো কণ্ঠে বললো, “ছোটভাইকে তো আর দেখতে পাচ্ছি না। আমার সাথেই তো ছিল এতক্ষণ, আচমকা অন্ধকারে কোথায় গেলো ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না।”

দিদির মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। চারিদিকে টর্চের আলো ফেলে কোথাও দেখতে পেলাম না ভাইকে। একদিকে ভাই নিখোঁজ অন্যদিকে পাশের বাঁশঝাড়গুলো এসময় খুব অস্বাভাবিকভাবে দুলতে শুরু করল যেন আমাদের এই দুরবস্থা দেখে কেউ বাঁশগুলোকে উথালপাথাল করে তার আনন্দ প্রকাশ করছে। আমাদের দুজনের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠলো, এতক্ষন ভয়টাকে প্রশমিত করে রাখলেও এবারে সেটা অবরুদ্ধ কান্নার রূপ নিয়ে দলা পাকিয়ে গলা দিয়ে উপরে উঠে এলো। সেটাকে সামলে নিয়ে কোনোরকমে দিদিকে বললাম, “দেখো দিদি, আমার কান্ডকারখানা বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। আমাদের বেশি দেরি করা ঠিক হবে না, জানি না এখন ভাইয়ের কি অবস্থা হয়েছে। এদিকের বাঁশঝাড়গুলো অন্য সবদিকের তুলনায় একটু বেশি নড়ছে, ওদিকটা একবার খুঁজে দেখতে হবে বুঝলে।” দিদি কেঁদে ফেললো, “কি কুক্ষণে এতো রাতে সার্কাস দেখতে গেছিলাম, আমার খুব ভয় করছে। কি হবে এবার আমাদের?”

“আঃ তুমি কেঁদো না, মনে সাহস আনো কিছু হবেনা আমাদের। তুমি কিন্তু আমার সাথে থাকো, কোনোদিকে যাবে না ঠিকাছে।”

দুজনে দুটো ছোট কঞ্চি তুলে নিয়ে টর্চের আলোতে ডানদিকের বাঁশঝাড়গুলোর মধ্যেকার মেঠো রাস্তাটায় নেমে গেলাম আর নামতেই বৃষ্টিতে ভেজা মাটিতে পা ঢুকে গেলো আমাদের। কোনো রকমে পা টেনে টেনে চলতে লাগলাম, দিদির জুতো কাদায় আটকে রইলো। ঐভাবে কিছুদূর এগোতেই দেখলাম ভাই মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আমরা যেই না ওর দিকে এগোতে যাবো, আরেকটা অঘটন ঘটে গেলো। টর্চের আলোটা দুবার দপদপ করে নিভে গেলো, বুঝলাম ব্যাটারী ইস্তফা দিয়েছে। এই ভুতুড়ে রাস্তায় ওই আলোটুকুই আমাদের শেষ সম্বল ছিল, কিন্তু সেটাও আর রইলো না। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আমরা দুজনে চাঁদের ক্ষীণ আলোয় ভাইকে যেখানে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম সেদিকটা আন্দাজ করে এগিয়ে গেলাম। আর ঠিক তখনই আশেপাশের বাঁশগাছগুলো আচমকা উথাল পাথাল করতে লাগলো। হাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই অথচ বেশ কয়েকটা বাঁশ মড়মড় শব্দে এদিকে ওদিকে ভেঙে পড়ল। দিদি ভয়ে আমার হাতটা শক্ত করে জাপ্টে ধরলো, দিদির হাত ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে। হঠাৎ আমার সামনে দিয়ে অন্ধকারে কি যেন একটা দ্রুত সরে গেলো, আমি ভয়ে পিছোতে গিয়ে দিদির সাথে ধাক্কা লেগে হুড়মুড় করে কাদায় পড়লাম দুজনে।

“এতো রাতে এখানে কি করছিস তোরা ?”

অকস্মাৎ এক ভারী গলার আওয়াজে আমরা চমকে উঠলাম আর ভয়টাও দ্বিগুন বেড়ে গেলো, আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। হৃদপিন্ডের গতি এত বেড়ে গেছে যে মনে হল এই বুঝি সেটাও ফেটে যায়। দিদির অবস্থাও অনুরূপ তাও আমতা আমতা করে বললো, “আমরা বাড়ি ফিরছিলাম, কিন্তু এই বাঁশবাগানে ঢোকার একটু পরেই ভাই হারিয়ে যায়, ওকে খুঁজতেই এখানে এসে পড়েছি?” দিদি কথাটা বলতেই একটু সামনে থেকে ভাই ‘দিদি’ বলে ডেকে উঠলো।

“ওই যে তোদের ভাই। ওকে নিশিতে টেনেছিল, ভাগ্য ভালো তাই এ যাত্রা বেঁচে গেছে। আর কোনোদিন রাতে একা এই রাস্তায় আসবি না। যা ওকে নিয়ে সাবধানে বাড়ি চলে যা, আর তোদের কোনো বিপদ হবে না।”

“কে আপনি”, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিছুটা সাহস ফিরে পেয়েছি।

কথাটা শুনেই রেগে গেলেন উনি, আমাকে ধমকে বলে উঠলেন, “সেটা জেনে তুই কি করবি হে ছোকরা! নে এই টর্চটা রাখ।” আমার পায়ে একটা ধাতব জিনিস এসে ঠেকলো, বুঝলাম ওটা একটা টর্চ। সেটা তুলে জ্বালাতেই আলোকিত হয়ে উঠলো চারপাশ, কিন্তু সেই অদ্ভুত রাশভারী লোকটার কোনো চিহ্নই দেখতে পেলাম না আর। তখন আমাদের সেসব ভাবার মানসিকতা নেই। তাড়াতাড়ি ভাইকে টেনে তুলে ফেরার পথ ধরলাম, দিদির হাত ধরে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটছিল ও, বোধহয় খুব ভয় পেয়েছে বেচারা। আশ্চর্যজনকভাবে বাঁশ বাগানের সমস্ত দাপাদাপি বন্ধ হয়ে একটা মৃদু বাতাস বইতে শুরু করেছে।

নাহ বাকি পথে আর আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। বাড়ি ফিরে সব ঘটনা বলতে তিরস্কারের পরিমাণটা কিছুটা লঘু হয়েছিল। মা দ্রুত ঠাকুরঘর থেকে গঙ্গাজল এনে আমাদের মাথায় ছিটিয়ে দিলেন। ভাইয়ের কথা শুনে সবাই তো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন আর বারংবার ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানাতে লাগলেন শেষ অবধি আমাদের সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু যে যাই বলুক না কেন দিদি ও আমার দুজনেরই দৃঢ় বিশ্বাস ঐ অদ্ভুত মানুষটির জন্যই আমরা এইবারের মত প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরতে পেরেছি। আচ্ছা উনি কি সত্যিই মানুষ? উনি উপস্থিত হওয়ার পরেই সমস্ত ভৌতিক কার্যকলাপ নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু আলো জ্বালার পর তাকে আর দেখতে পেলাম না কেন! হঠাৎ একটা কথা ধাঁ করে মনে পড়ে গেল আমার। তৎক্ষণাৎ প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করলাম জিনিসটা, আমাদের উদ্ধারকর্তার দেওয়া স্টিলের টর্চটা। কিন্তু সেটা বের করতেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল, দেখলাম টর্চের ভেতরটা পুরো ফাঁকা, সেখানে ব্যাটারির কোনো অস্তিত্ব নেই। তাহলে কি উনিও………

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত