শিগব

শিগব

১.

প্রায় এক ঘন্টা মেয়েদের হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খুব সুখকর নয়।

তবু স্বপনকে ৫৫ মিনিট শামসুরনাহার হলের সামনে দাড়িয়ে থাকতে হল। ৫৫ মিনিটে স্বপন ১৭ বার ঘড়ি দেখল।

সময় যেন কাটতে চায় না। ঘড়ির কাটা যত এগোতে থাকে স্বপনের মেজাজ তত নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে থাকে।

স্বপন দাঁড়িয়ে আছে তৃষার সাথে দেখা করার জন্যে। তৃষা এমনিতে খুব গোছানো একটা মেয়ে।

তবে একটুও সময় মেনে কোন কাজ করতে পারে না। স্বপন অনেক চেষ্টা করেও তৃষার এই অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারেনি।
তৃষা হল থেকে বেরুতেই স্বপনের রাগটা লাগাম ছাড়া হয়ে যায়। স্বপন রেগে গেলে তৃষা সাধারনত মিষ্টি একটা হাসি দেয়।

তারপর বারবার সরি বলতে থাকে। তাতেই রাগ কমে যায় স্বপনের। এত মিষ্টি মেয়ের উপর রাগ করে থাকা যায় না।

কিন্ত– আজ স্বপনের প্রচন্ড রাগ দেখেও তৃষা চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

স্বপন যতই কথা বলতে থাকে তৃষার মাথা ততই নিচু হতে থাকে। এক সময় স্বপন লক্ষ্য করল তৃষার চোখে পানি।

খুব সাবধানে চোখের পানি মুছল তৃষা। দৃশ্যটা দেখে বুকটা হাহাকার করে উঠে স্বপনের। তৃষাকে এতটা বলা উচিত হয়নি।
স্বপন: সরি তৃষা। তোমার চোখে পানি কেন? বোকা মেয়ে! চলো টি.এস.সি. তে বসি।”
তৃষার দিকে ভালভাবে তাকিয়ে স্বপন চমকে উঠল। ওর গলায় বড়সড় একটা ক্ষত চিহ্ন। কপালে কাটা দাগ।

কেন জানি ওকে একজন বিধ্বস্ত মানুষ বলে মনে হচ্ছে। চোখে মুখেও কেমন একটা আতংকের ছাপ।
স্বপন উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “তৃষা কি হয়েছে তোমার? গলায় কেটেছে কিভাবে?”
তৃষা জবাব দেয় না। স্বপন আবারও তৃষার চোখে পানি দেখল। স্বপন তৃষার হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলল “প্লিজ বলো কি হয়েছে?”
তৃষা ফিসফিস করে বলল, “কাল রাতে ও এসেছিল।”
: কে?!!
: সেই শয়তানটা।
: তৃষা, আমি তোমাকে বারবার বলেছি এসব তোমার কল্পনা।
: না, স্বপন, না। গত রাতে ও আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো।
তৃষা জোরে কেঁদে উঠে। স্বপন তৃষাকে শক্ত করে ধরে বলে, “প্লিজ তৃষা শান্ত হও। আমাকে বল কাল রাতে তোমার কি হয়েছিল?”

বেশ কিছুক্ষন পর তৃষা শান্ত হয়। তৃষা বলতে শুরু করে,
–“কাল রাতে রুমে আমি একা ছিলাম। লীনার বাসা থেকে খবর আসায় ও বরিশাল চলে গেছে। একা থাকতে আমার ভালো লাগে না।

এজন্য সোহানার রুমে চলে যাই। রাত একটা পর্যন্ত দুজনে গল্প করি। এরপর আমি আমার রুমে চলে আসি।

রুমে ঢুকতেই আমার কেমন যেন অন্যরকম লাগতে থাকে। গায়ে কাঁটা বিধতে থাকে।

আমি বুঝতে পারি আজ ওই শয়তানটার সাথে আমার দেখা হবে। আমি লাইট জালিয়ে শুয়ে পড়লাম। সারাদিন বেশ ব্যস্ত ছিলাম।

তাই অনেক টেনশনের মধ্যেও ঘুম এসে গেল। কতক্ষন পার হয়েছে জানিনা, হঠাৎ মনে হলো আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

আমার মনে হচ্ছে আমার বুকের উপর পাথর চাপা দেওয়া। আমি চোখ মেলে দেখলাম বদমাশটা আমার বুকের উপর বসা।

এক হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে আছে। হাত ভর্তি লোম। মুখটা কালো কাপড়ে ঢাকা। শরীর হিম শীতল। সে বলল, “চল।

আমার সাথে চল।” আমি নিজেকে ছাড়াতে চাইলাম। অসহ্য যন্ত্রনা হতে লাগল।

তখন ওই শয়তানটা আমার গলায় ও কপালে আঘাত করে। রক্ত ছিটকে যায় । শয়তানটা ঠোঁট দিয়ে রক্তটুকু চুষে নেয়।

আমি প্রচন্ড গোঙাতে থাকি। চিৎকারও করেছিলাম বোধ হয়। পাশের রুম থেকে বিপাশা ছুটে আসে।

শয়তানটা হঠাৎ করেই যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। বিপাশা সারারাত আমার রুমে বসে থাকল।”
তৃষা আর কিছু বলতে পরে না। প্রচন্ড ক্লান্তি যেন ওকে ঘিরে ধরছে।

স্বপন তৃষাকে বলে, “এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল, প্লিজ।

এসব তোমার মনের কল্পনা। তুমি নিজেই নিজেকে আঘাত করেছ। তুমি বড় কোন মানসিক অসুখে ভূগছ।”

কথাগুলো শুনে প্রচন্ড রেগে যায় তৃষা।

বলে ওঠে, “তুমি যখন আমাকে বিশ্বাস করো না, আমি তোমার সাথে আর কথা বলতে চাই না।” তৃষা উঠে দড়ায়।

হাঁটতে শুরু করে। স্বপন ও তৃষাকে থামাতে দ্রুত ওর পেছনে হাটতে থাকে। হঠাৎ তৃষা দাড়িয়ে পড়ে।

চোখ বড় বড় হয়ে যায় ওর। তৃষা চিৎকার করে উঠে, “ স্বপন ওই যে, ওই যে বদমাশটা।”

তৃষা আঙ্গুল দিয়ে দূরের একটা লোককে দেখায়। স্বপন একটা দৌড় দেয়।

লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছে না, কালো কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকা। স্বপনের দৌড় দেখে লোকটাও দ্রুত হাঁটতে থাকে।

হঠাৎ স্বপনের চোখেরে সামনেই লোকটা মানুষের মধ্যে মিশে গেল। অনেকটা অদৃশ্যই হয়ে গেল।

স্বপন আবার তৃষার কাছে ফিরে আসে। তৃষা স্বপনকে জড়িয়ে ধরে বলে, “প্লিজ, স্বপন আমাকে বাঁচাও।

শয়তানটা আমাকে মেরে ফেলবে।” স্বপনের বুকটা ভেঙে যায়। কি করা উচিত বুঝতে পারে না।

তৃষার কানে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “কেউ তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, আমি বেঁচে থাকতে না।”

২.

স্বপনের একটা চাকরি খুব দরকার। গত বছর মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে স্বপন। সপ্তাহে দু’ একটা ইন্টারভিউ দিচ্ছে।

কিন্ত– সোনার হরিন চাকরি মিলছে না। এসব নিয়ে মনটা বেশ খারাপ থাকে স্বপনের।

তার উপর তৃষার এই ভয়াবহ সমস্যায় নিজেকে আরও অসহায় লাগে স্বপনের।

কি করবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আনোয়ারের কথা মনে পড়ে। আনোয়ারও ঢাবি থেকে অর্থণীতিতে মাস্টার্স করেছে।

তবে স্বপনের মত চাকরি খোজার সময় তার নেই। তার জীবনটা পুরো অন্যরকম।

অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় আনোয়ার রহস্যের পিছে ছুটে ছুটে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে।

ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ে আনোয়ার প্রায়ই দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়াত।

যেখানেই রহস্যের সন্ধান পেত সেখানেই আনোয়ার ছুটে যেতো।আনোয়ারের বাবার অর্থকড়ির অভাব নেই।

তাই আনোয়ারের অ্যাডভেঞ্চার কখনই বাধাগ্রস্থ হয়নি।
আনোয়ারকে বাসায় পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার এটা স্বপন জানে। তবু আনেয়ারকে ফোননা করেই ওদের বাসায় গেল স্বপন।

আনোয়ারদের বিশাল তিন তলা বাড়ী। আনোয়ার অবশ্য বেশিরভাগ সময়ই ছাদের চিলেকোঠায় থাকে।

স্বপন তাই সরাসরি ছাদে চলে গেল। আনোয়ার রুমে বসে আয়েশ করে সিগারেট টানছে।

স্বপনকে দেখে ওর মুখ হাসি হাসি হয়ে যায়।
: “স্বপন, দোস্ত। কেমন আছিস?” হাসিমুখে জিজ্ঞেসা করল আনোয়ার।
: এই আছি ভালই।
: তোর তো ভাল থাকারই কথা তৃষার মত মেয়ের সাথে প্রেম করিস। ভাবাই যায়না।

…অসাধারন মেয়ে। আমার কপালটাই খারাপ। প্রেম হলো না।
: তুইতো প্রেম করিস রহস্যের সাঙ্গে।
: হা হা হা । ভালোই বলেছিস।
: তা এখন তুই কি নিয়ে আছিস?
: মাগুরায় একটা অনেক পুরোনো জমিদার বাড়ীর সন্ধান পেয়েছি ওখানে যাওয়ার ধান্দায় আছি।”
একটু থেমে আনোয়ার বলল, “ দোস্ত তা তুই কি মনে করে? এই অধমের কাছে তো কেউ সমস্যায় না পড়লে আসে না।”
: হ্যাঁ দোস্ত। আসলেই সমস্যায় আছি। তোকে কিভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না।
: ধীরে সুস্থে বল। আমার তাড়া নেই। সিগারেট খাবি?
:“খাব!” স্বপন সিগারেটে টান দেয়।
: দোস্ত সমস্যাটা তৃষাকে নিয়ে। ও আমাকে যা বলে তা আমি বিশ্বাসও করতে পারি না আবার ফেলতেও পারি না।”
: কি সমস্যা ?? ঝেড়ে কাশ।
: তৃষা মাঝে মাঝে একটা মানুষকে দেখতে পায়। কালো কাপড় পরা। মানুষটা তৃষাকে কোথায় যেন নিয়ে যেতে চায়।

তৃষা ইউনিভার্সিটিতে ফাস্ট-ইয়ারে পড়া অবস্থায় প্রথম লোকটা আসে। প্রথম প্রথম তৃষা বিষয়টা স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিত।

কিন্তু প্রায় প্রতি পূর্নিমা আমাবস্যার রাতে লোকটা তৃষার কাছে আসতে থাকে। অনেক সময় দূর থেকে তৃষাকে লক্ষ্য করে।

সেদিন তৃষাকে অনেক আঘাত করেছে শয়তানটা।
: লোকটা কি তৃষাকে কখনও কিছু বলেছে?
: লোকটা কথা বলে অল্প। প্রায় দিনই বলে,“আমার সাথে চল। আমি মরিনি। কবরে যাবো না। তুই যাবি।”

আর একদিন বলেছে “আমার নাম আসগর। এসেছি এসেছি। তুই চল। চল।”
আনোয়ার চিন্তিত মুখে বলে, “তার মানে লোকটা বলতে চায় সে মরেনি। সে কবরে যেতে চায় না। তৃষাকে নিয়ে যেতে চায়।”
হঠাৎই আনোয়ার চমকে উঠে স্বপনের দিকে তাকায়।
: স্বপন তৃষার খুব বিপদ। খুব বড় বিপদ।
: মানে?!!!
: এমন ঘটনার সাথে আমি অনেক আগে থেকেই পরিচিত। তোকে বিষয়টা বলছি মন দিয়ে শোন।

ঘটনাটা আজথেকে পাঁচ ছয় বছর আগের। ইউনিভার্সিটিতে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি।

হঠাৎ জানতে পারলাম যশোর সীমান্তবর্তী একটা গ্রামে একজন মৃত মানুষ ফিরে এসেছে। দুজনকে নাকি মেরেও ফেলেছে।

বেশ নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমি রওনা দেই। সাথে ছিল আমার এক চাচাত ভাই রাকিব।

গ্রামে গিয়ে ভয়াবহ এ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। গ্রামের সবার মধ্যেই আতংক। সন্ধার পর কেউ ঘর থেকে বের হয় না।

মৃত ওই মানুষটার নাম সেলিম। বেঁচে থেকেও নানাভাবে মানুষকে যন্ত্রনা দিত লোকটি।

লোকমুখে জানতে পারলাম বেঁচে থাকতে সেলিম তার দুই বউকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।

গ্রামের মানুষের ভাষ্য অনুযায়ী সেলিম বদমাস ফিরে এসেছে মৃত মানুষ অনেক বছর পর ফিরে এলে তাদেও বলা হয় জোম্বি।

তবে এখানে পরিস্থিতি অন্যরকম। এই সেলিম জোম্বি নয়। তার থেকেও ভয়ংকর।

প্রায় প্রতি পূর্ণিমা আমাবশ্যার রাতে সেলিম বের হয়। বের হওয়ার পর তার চেষ্টা থাকে মানুষকে ধরে নিয়ে জীবন্ত কবর দেওয়ার।

সেলিম সবচেয়ে বেশি আক্রমন করেছে গ্রামের লীনা নামের এক তরূণীকে। প্রায়ই লীনার ঘরে আসে সেলিম।

ওর সাথে যেতে বলে। পাশের গ্রামের এক তান্ত্রিকের সাথে আমার কথা হলো। সে আমাকে জানাল, “এটা এ ধরনের অপদেবতা।

এদের নাম “শিগব“। এই অপদেবতারা কবর থেকে মুত্তি চায়। এজন্য কোন বিশেষ তরুণীর দিকে এরা হাত বাড়ায়।

ওই তরুণী জীবন্ত কবর দিতে পারলেই শিগবের মুক্তি ঘটবে। তখন এটি হবে আরও শক্তিশালী। আরও ভয়ানক।

এদের মারার একটা পদ্ধতি আছে। প্রথমে শিগবটার কবর দুই তৃতীয়াংশ খুঁড়তে হবে। তারপর কিছু কাঠ রাখতে হবে।

এরপর কেরোসিন ঢেলে আগুন জালাতে হবে।” আমি বেশ বুঝতে পারলাম কবরটাই শিগবের শক্তি।

তাই বারবার বেড়িয়েও কবরেই ফিরে আসতে হয়। তাই কবরটায় তান্ত্রিকের কথা অনুযায়ী আগুন দিতে হবে।

পরের ঘটনা সংক্ষেপে বলি। কোন এক পূর্নিমার রাতে গ্রামের কিছু সাহসী মানুষকে নিয়ে আমি সেলিমের কবরের কাছে যাই।

সাথে নেই কাঠ কেরোসিন কোদাল, শাবল। আর সবার হাতেই ছিল ছোটখাট অস্ত্র।

কবরের কাছে গিয়ে দেখি একটা লোক কালো কাপড় পরে বসে আছে।

আমরা কাছে যেতেই লোকটা কিভাবে যেন কবরের ভিতরে ঢুকে গেলো। তখন আমরা দ্রুত কবর খুড়তে লাগলাম।

শিগবটা বাধা দিতে লাগল নানাভাবে। আমরা সংখ্যায় ছিলাম অনেকে। তবু বেশ কয়েকজন আহত হলো।

কবর অনেকখানি খুড়ে আমরা কাঠ, কেরসিন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিই। হঠাৎই কবরটা যেন কেপে উঠে।

কেউ একজন চিৎকার করতে থাকে। পোড়া গন্ধে চারদিক ভরে যায়। সেলিম বদমাসটা এভাবেই ধ্বংস হয়।

….৩.

: একটা ব্যাপার হচ্ছে শিগবদের বিশেষ এক প্রকার তরুণীর প্রতি আকর্ষন থাকে।

এদের ধারনা ওই তরূণীকে জীবন্ত কবর দিলেই তারা মুক্তি পাবে। তৃষাও হয়ত সেই বিশেষ তরুণী।

আসগর নামের শিগবটাও হয়ত তৃষার মাধ্যমে মুক্তি পেতে চায়।
: কিন্তু এযুগে বসে এসব বিশ্বাস করি কিভাবে!!!
: এই তোর এক সমস্যা।
: সরি দোস্ত, আমি বিশ্বাস করছি। তুই তৃষাকে বাঁচা।
: শোন, তৃষাকে বলবি সাহস নিয়ে শিগবটার সাথে কথা বলতে। শিগবটার কবর কোথায় তা জানা প্রয়োজন।
: আচ্ছা আনোয়ার তুই যে বললি বিশেষ এক ধরনের তরুণী। এই বিশেষ তরুণীর বৈশিষ্ট কি?
: এটা আমি জানি না। কোটি কোটি মানুষ থেকে এরা একজন তরুণী বা কিশোরী বেছে নেয়।

কিভাবে বেছে নেয় তা জানি না। স্বপন, আজ থেকে তুই খুব সাবধান থাকবি।
: কেন?
: তুই তৃষাকে বাচানোর চেষ্টা করছিস। তার মানে তুইও শিগবটার শক্র হয়ে গেছিস। শিগবটা তোর কাছে ও আসতে পারে।
: কি বলিস?!! সত্যি!!
: হ্যাঁ।
: তোর কোন বিপদ হতে পারে না?
: আরে ধূর। আমি মানসিকভাবে খুবই শক্তিশালী। আর আমার শ’খানেক মন্ত্র মুখস্ত।

আমার হাতে কত রকম তাবিজ দেখছিস। শিগবটা আমার কাছে আসতে সাহস পাবে না।
: আনোয়ার আমার খুব টেনশন হচ্ছে। খুব ভয় লাগছে।
: ভয় পাওয়া কোন কাজের কথা নয়। মনে সাহস রাখ। এখন থেকে কালো কোন কাপড় পড়বি না।

পূর্নিমা, আমাবশ্যার রাতে বাসা থেকে বের হবি না। রাতে আয়নায় মুখ দেখবি না। সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকবি।”

স্বপন মাথা নিচু করে থাকে। কথাগুলো ঠিক মাথায় ঢুকতে চায় না। এমন বিপদের মাঝে পড়েছে বুঝতেই পারেনি স্বপন।

যদি সত্যিই শিগব আসে? কি হবে তখন? চিন্তা করার শক্তি যেন হারিয়ে যায় স্বপনের।
: আচ্ছা আনোয়ার শিগব সম্পর্কে আর কিছু জানিস?
: হুঁ। ইন্টারনেটে ও এদের সম্পর্কে বেশ অনেক তথ্য পেয়েছি। শিগবের গন্ধ শক্তি প্রবল। এরা কয়েক মাইল দূর থেকেও গন্ধ পায়।

অর্থাৎ তোর শরীরের গন্ধ একবার শুকে থাকলে, অনেক দূর থেকেও বুঝতে পারবে তুই কোথায় আছিস।

প্রচন্ড জোরে দৌড়াতে পারে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিছু নেই। যে কোন জিনিস ভেদ করে যেতে পারে।
: শিগব কি অদৃশ্য হতে পারে?
: না, তবে যে কোন জিনিসের সাথে মিশে যেতে পারে। অনেকটা অক্টোপাসের মত রং বদলায়।

কোন জিনিসের সাথে মিশে গেলে তুই কোনভাবে একে আলাদা করতে পারবি না।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে অনেক সময় যানবাহনের সাহায্য নেয়।
: তার মানে সে দিন তৃষাদের হলে শিগবটা রং বদলে ঢুকেছিল।
: হ্যাঁ। হতে পারে।
: আচ্ছা, আনোয়ার আজ যাই। মাথা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
: চিন্তা করিস না। আমি তো আছি। যে কোন সমস্যায় ফোন করিস।
স্বপন আনোয়ারের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। নিজের বাসার দিকে রওনা দেয়।

বাসস্ট্যান্ডে অনেকক্ষন দাড়িয়ে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে উঠে স্বপন।

হঠাৎ ডানদিকে একটু তাকাতেই স্বপন দেখতে পেল একটা কালো কাপড় পরা লোক দাঁড়িয়ে আছে।

লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। স্বপনের বুকটা কেপে উঠে।

আজই কি শিগবের সাথে দেখা হয়ে যাবে? স্বপন নিজেই নিজেকে সাহস দেয়।

এই দিনের আলোতে তার কি করবে বদমাসটা? কালো কাপড় পড়া লোকটির দিকে এগিয়ে যায় স্বপন।

তখনই লোকটা একটা চলন্ত বাসে উঠে পড়ল।

স্বপন একটু আস্তে আস্তে বলল,“আমি তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছি শিগব, তুমি আমার বা তৃষার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।”

৪.

কিছুদিন পরে এক বিকালে তৃষার সাথে দেখা হয় স্বপনের। তৃষার চেহারায় কেমন যেন একটা অসুস্থ ভাব চলে এসেছে।

হাঁটছে এলোমেলোভাবে। দেখে মনে হচ্ছে দাঁড়াতে ও যেন খুব কষ্ট হচ্ছে।
স্বপন : কি হয়েছে তোমার?
: মৃত্যুর প্রহর গুনছি।
: ছিঃ! কি বলছ এসব!
: বদমাশটা আবার এসেছিল। বলেছে আমি ওর সাথে না গেলে আমাকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না।
: ও তোমাকে বাচিয়ে রাখবে, তৃষা। কারন তোমার মাধ্যমেই ও মুক্তি পাবে।

তোমাকে সাধারনভাবে মেরে ফেললে শয়তানটা মুক্তি পাবে না।
: ঠিক বুঝতে পারছিনা।
: আমি আনোয়ারের কাছে গিয়েছিলাম। তুমি তো জান এসব বিষয়ে আনোয়ারের আগ্রহের কথা।
: তুমি আনোয়ার ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলে!
: হ্যাঁ তৃষা। তুমি একদম চিন্তা করবে না। আমি তোমাকে জীবন দিয়ে রক্ষা করব। আর আনোয়ার তে আছেই।

তোমাকে এখন শক্ত হতে হবে। শিগবটার সাথে কথা বলতে হবে।
:এটা কিভাবে সম্ভব?
: অবশ্যই সম্ভব। তুমি শিগবটার সাথে কথা বলে বের করবে ওর কবরটা কোথায়।
: আমি পারব না। আমার ভয় করে।
:“তোমাকে পারতেই হবে, তৃষা, পারতেই হবে।”
স্বপনের বুকে মাথা রেখে তৃষা বলে,“আমি চেষ্টা করব, স্বপন । আমি চেষ্টা করব।” সেদিন বিকালটা ওর খুব ভালো কাটল।

সকল দুঃস্বপ্নকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করল।

হলে ফেরার পথে হঠাৎ তৃষা স্বপনকে ফিসফিস করে বলে উঠে, “আমি না তোমাকে খুব ভালবাসি।”
:আমি জানি।” হাসতে হাসতে বলল স্বপন।
:এভাবে সারাজীবন অমাকে আগলে রাখবে। ঠিক আছে?
:ঠিক আছে।”

তৃষা তার রুমের সামনের বারান্দায় চুপচাপ দাড়িয়েছিল। হঠাৎ বিপাশার সাথে দেখা হলো।

বিপাশা উৎফুল্ল গলায় বলল, “তৃষা জানিস তো আজ পূর্নিমা। আজ সারারাত অনেক মজা করব।

সাদিয়া, রুপা, সাথী, শিমু সবাই মিলে আড্ডা হবে। আর আজ সিগারেট খাওয়ার ট্রাই করা হবে।”

বিপাশার কথা শুনে বুকের ভেতর ধক করে উঠে তৃষার। আজ পূর্নিমা?!!! তবে কি আজ শিগবটা আসবে?

তৃষা যদি বেশি মানুষের সাথে থাকে তবে শিগবটা নিশ্চই আসবে না। বিভিন্ন চিন্তায় আচ্ছন্ন হয় তৃষা।

যে করে হোক শিগবের সাথে কথা বলে জানতে হবে ওর কবর কোথায়।

এই প্রথম শিগবের সাথে দেখা করার ব্যাপারে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করে তৃষার মধ্যে।

বিপাশার দিকে তাকিয়ে তৃষা বলল, “না রে বিপাশা। আজ রাতে কোন মজায় আমি নেই।

আমার শরীরটা একটু ও ভাল নেই। আজ আমি নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘুমাব।”
সন্ধ্যা হতেই নিজের রুমে চলে আসে তৃষা। রক্তে রক্তে শিহরণ হতে থাকে। স্বপনকে ফোন করে তৃষা।
: স্বপন আজ না পূর্নিমা।
: আমি জানি তৃষা।
: ভয় লাগছে স্বপন।
: কোন ভয় নেই তৃষা।
: যদি আমার কিছু হয়ে যায় তবে তুমি………….
: ছি:! বোকা মেয়ে! এসব বোলো না। তোমার কিছু হবে না। উল্টো ওই শয়তানটা মরবে।”
রাত বারোটার বেশি বাজে। তৃষা তার রুমে খাটে বসে বই পড়ছে। পড়া মাথায় ঢুকছে না।

মূলত কোন একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছে তৃষা। হঠাৎ কেউ তৃষার কাধে হাত রাখল।

শীতল একটা হাত। তৃষার সমস্ত শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠে। পিছনে ফেরার সাহস পায় না তৃষা।
শিগবটা সামনে এসে বসে, “চলো………..। যেতে হবে…………।”
: কে তুমি? কে???
: আসগর। আসগর আমি। আসগর…………।
: কোথায় থাক তুমি?
: কেন? কেন?? …………..।
: তোমার সাথে যেতে বলছ অথচ আমাকে কিছুই বলবে না।
: পিরোজপুর। মঠবাড়িয়া, পাতাকাটা গ্রাম। মঠবাড়িয়া……….পাতাকাটা……….
: না । না । অমি যাব না।” শিগবটা প্রচন্ড জোরে তৃষাকে আঘাত করে। তৃষার ঠোট কেটে রক্ত পড়তে থাকে।

শিগবটা তৃষার গলা চেপে ধরে। উচু করে ফেলে এক ঝটকায়। যন্ত্রনায় চিৎকার করতে চায় তৃষা।

কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হতে চায় না। শিগবটা বলতে থাকে, ‘মেরে ফেলব। মেরে ফেলব…। চল…..চল…..।”

তৃষাকে দেওয়ালের উপর আছড়ে ফেলে শিগব। প্রচন্ড ব্যাথায় জ্ঞন হারিয়ে ফেলে তৃষা।

রাত দুইটার দিকে তৃষার ঘরে আলো জ্বলতে দেখে উকি দেয় বিপাশা। বিপাশা দেখতে পায় তৃষার মাথা শরীর রক্তাক্ত।

একটা চিৎকার দেয় বিপাশা। তৃষাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে।
ঠিক রাত তিনটায় স্বপনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘরে একটা বোটকা গন্ধ পায় স্বপন। ঘরটা কেমন যেন আশ্চর্য রকম শীতল।

স্বপনের কেমন যেন একটা আতংকের অনুভূতি হতে থাকে।

ডিমলাইটের আবছা আলোয় স্বপন দেখতে পেল কেউ তার খাটের দিকে এগিয়ে আসছে। মূর্তির মত স্থির হয়ে যায় স্বপন।

নি:শ্বাস আটকে যায় ওর। ও বুঝতে পারে শিগবটা এসছে। স্বপন কিছু বুঝে উঠবার আগে শিগবটা স্বপনের উপর ঝাপিয়ে পড়ে।

স্বপন শক্তি খাটায়। কিন্তু শিগবের শক্তির সাথে পেরে ওঠে না। স্বপনকে এলোপাতাড়ি অঘাত করতে থাকে শিগব।

যেন একটা আক্রেশের বিষ্ফোরন ঘটেছে।
স্বপন: দূর হ………। চলে যা………….. ।”
ঝাটকা মেরে শিগবটাকে সরিয়ে দেয় স্বপন। শিগবটা উঠে দাড়ায়। স্বপনও লাফ দিয়ে উঠে পড়ে।

স্বপন টেবিলের উপর রাখা টেবল ল্যাম্পটা হাতে তুলে নেয়। সজোরে শিগবের মাথায় আঘাত করে। শিগবটা কিছুটা পিছু হাঠে।

এমন সময় স্বপনের মায়ের কন্ঠ শোনা যায়।
“স্বপন, বাবা তোর কি হয়েছে? এত শব্দ কিসের?” শিগবটা হঠাৎ কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।

স্বপন বুঝতে পরে শিগবটা এই ঘরেই আছে। কি শক্তি শিগবের!পুরো শরীরটা নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। প্রচন্ড দুর্বল লাগতে থাকে স্বপনের।

রাতটা মায়ের কোলে মাথা রেখে কাটায়, ও। স্বপনের কি হয়েছে বুঝতে পারেনা মা ।

তবে এটুকু বুঝতে পারেন তার ছেলে বড় কোন বিপদে পড়েছে।
সকালে বিপাশার ফোন পেয়ে পাগলের মত ঢাকা মেডিকেলে ছুটে যায় স্বপন।

তৃষার কিভাবে এতবড় জখম হলো হলের কোন মেয়ে তা বুঝতে পারে না। তবে স্বপন পুরো ব্যপারটাই বুঝতে পারে।

নিশ্চয়ই কাল রাতে তৃষার কাছে শিগবটা এসেছিল। ক্রোধে, রাগে ফেটে পড়ে স্বপন। তৃষার মাথা, হাতে, পায়ে ব্যান্ডেজ।

কথা বলার শক্তি নেই। স্বপন তৃষার কাছে গিয়ে বসে। “ তৃষা, একি অবস্থা তোমার।” চোখে পানি চলে আসে স্বপনের।

তৃষা হাসার চেষ্টা করে। বহুকষ্টে স্বপনকে ডাকে তৃষা, “স্বপন………।”
: বলো তৃষা।
: পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার পাতাকাটা গ্রাম…………।
: মানে ?!
: ওখানেই শিগবটার কবর।
: কি বললে? সত্যি?!!
: হ্যাঁ। কাল রাতে আমি জেনেছি………..।”
: আচ্ছা আচ্ছা। তোমার আর কথা বলার দরকর নাই। বিশ্রাম নাও।”
ডাক্তারের সাথে কথা হয় স্বপনের। ডাক্তার অভয় দিয়ে বলেন “ ভয়ের কিছু নেই। দুদিন পরেই রিলিজ করে দেব।”

৫.

আনোয়ার এবং স্বপন পাতাকাটা গ্রামে গিয়ে হাজির হলো। অন্য দশটা গ্রামের মতই একই রকম চেহারা পাতাকাটা গ্রামের।

স্বপন গত কয়েক রাত ঠিকমত ঘুমতে পারে নি। মনের ভিতর সবসময় শংকা কাজ করছে শেষ পর্যন্ত কি শিগবের সাথে ওরা পারবে?

তৃষা এখন শারীরিক ভাবে অনেক সুস্থ। তবে মানসিকভাবে অনেক অসুস্থ। কড়া ঘুমের ঔষধ ছাড়া ঘুম আসতে চায় না।

ঘুমালে ভয়াবহ সব সপ্ন দেখে।তৃষা নারায়নগঞ্জে ওদের বাসায় চলে গেছে।

স্বপন নিজেকে নিয়ে যতটা না চিন্তা করে তার চোখে বেশি চিন্তা করে তৃষাকে নিয়ে।

শিগবটার কবর পাতাকাটা গ্রামে এই তথ্য শুনে স্বপন খুব অবাক হয়েছে।

কারন তৃষার শৈশব এবং কৈশরের অনেকটা দিন কেটেছে পাতাকাটা গ্রামে। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত তৃষা

এই গ্রামে তার দাদাবাড়ীতে থাকত। ক্লাস সেভেনে উঠার পর তৃষা নারায়নগঞ্জে তার বাবা মার কাছে ফিরে যায়।

তৃষা পাতাকাটা গ্রামে বড় হলেও সে আসগর নামে কাউকে চেনে বলে মনে করতে পারে না।

সবকিছু শুনে আনোয়ার বলে,“দেখেছিস সব মিলে যাচ্ছে । শিগবটা হয়ত অনেক আগে থেকেই তৃষাকে চেনে।”
: হতে পারে। কিন্তু এখন আমাদের করণীয় কি?
: আগে আমাদের জানতে হবে গ্রামে শিগবের কোন উৎপাত আছে কি না।

যদি শিগবের উৎপাত থাকে তবে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে শিগবটাকে ধ্বংশ করব।”
আনোয়ার এবং স্বপন গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়ীতে থাকার সুযোগ পেল। চেয়ারম্যান কাশেম মোল্লা হাসিখুশি মানুষ।

বয়স পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্নের মধ্যে। গ্রামের মানুষের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত।
আনোয়ার : চেয়ারম্যান সাহেব, আপনাদের গ্রামে কি কোন সমস্যা হচ্ছে?
: সমস্যা মানে কি সমস্যা?
: মানে, কোন রহস্যজনক কিছু? ভূত প্রেত?
: না না আমরা খুব শান্তিতে আছি। আমাদেও এখানে ভূত প্রেতের কোন সমস্যা নেই। তবে বিদ্যুত না থাকায় অনেক সমস্যায় আছি।
স্বপনঃ আমরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিভিন্ন জরিপের কাজ করি। এখানেও জরিপের কাজ নিয়ে এসেছি।
: সে আপনারা যে কাজেই আসেন, কোন সমস্যা নেই। যত দিন ইচ্ছা থাকেন।
: আচ্ছা, চেয়ারম্যান সাহেব আপনাদের গ্রামে আসগর নামে কাউকে চেনেন?
: আসগর?!!!
: আসগর নামে তো আগেও অনেকে ছিল, এখনও অনেকে আছে। এক আসগর ছিল ডাকাত এবং ভাড়াটে খুনী।

একবার ডাকাতি করতে গিয়ে গন পিটুনিতে মারা পড়ল। ওর জানাজাও গ্রামবাসী পড়েনি।

জানাজা ছাড়াই ওকে কবর দেওয়া হয়। আরেক অসগর ছিল কাপড়ের ব্যবসা করত।”
আনোয়ার স্বপনকে ফিসফিস করে বলল, “সম্ভবত ওই খুনী ডাকাত আসগরই শিগব হয়েছে।
স্বপন চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে বলল,“আচ্ছা চেয়ারম্যান সাহেব ওই ডাকাত আসগরের কবরটা কোথায়?
: ওটা তো বটতলা কবরস্থানে। তা আসগরকে নিয়ে কোন সমস্যা নাকি?

হঠাৎ আসগরকে নিয়ে এত প্রশ্ন?!! আমাকে বলতে পারেন।”
স্বপন চেয়ারম্যানের হাত ধরে বলল,“ চেয়ারম্যান সাহেব, আপনার সাহায্য আমাদের দরকার। খুব বেশি দরকার।”
:ছি: ছি: এভাবে বলছেন কেন? আপনাদের জন্য আমি সবকিছু করব।
:আমরা খুবই দু:খিত, আমরা আপনাকে মিথ্যা বলেছি। আমরা আসলে জরিপের কাজে আসি নি। ঘটনাগুলো আপনাকে বলছি…..।”
স্বপন এবং আনোয়ার চেয়ারম্যান সাহেবকে সব বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে।

ওদের ধারনা ছিল চেয়ারম্যান সাহেব হয়ত সব বিশ্বাস করবে না। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব সব বিশ্বাস করলেন।
চেয়ারম্যান সাহেব বল্লেন,“ তৃষা মা কে তো আমি চিনি। জামিল সাহেবের নাতনী। আগে তো মেয়েটা গ্রামে অনেক আসত।

কিন্তু দাদা দাদীর মৃত্যুর পর আর গ্রামে আসে না। আসগরের বাচ্চা মরে গিয়েও মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না।

আপনারা চিন্তা করবেন না এবার ওরে শেষ করবই।”
আনোয়ারঃ প্রথমে আমাদের আসগারের কবরটা দেখতে হবে। আর আমাবস্যার বা পূর্নিমার দিনে কবর খুড়ে আগুন দিতে হবে।
: আমাবস্যার তো দেরী নেই। আগামীকালই আমাবশ্যা।”
স্বপন এবং আনোয়ার দুজনেই মাথা নাড়ায়্। কাল কি হবে কে জানে।

৬.

পরদিন রাতের বেলা আনোয়ার, স্বপন এবং চেয়ারম্যানের পাঁচজন লাঠিয়াল রওনা দেয় বটতলার কবর স্থানের দিকে।

সবার হাতেই ছোট খাট অস্ত্র। আনোয়ারের হাতে বড় মশাল।
আনোয়ার: “আমাদের সবার চেষ্টা থাকবে খুব সাবধানে কবর খুড়ে আগুন জালানো।” সবাই সম্মতির স্বরে মাথা নাড়ায়।

কবরস্থানে এসে সকলের লোম খাড়া হয়ে যায়। ভয়টা বেশি ছড়িয়ে পড়ে লাঠিয়ালের মধ্যে।

তারা হঠাৎ বলে ওঠে, “আমরা এসব ঝামেলার মধ্যে নেই। আমরা ফেরত যাবো। যা করার আপনারা করেন।

কবর খোড়াখুড়ি, কবরে আগুন দেওয়া এসব কাজে আমরা নাই।”
আনোয়ার খেপে উঠে বলল, “চেয়ারম্যান সাহেব না আপনাদের পাঠাল।”
: আমরা আসতে চাইনি। আমাদের জোর করে পাঠিয়েছে।
: আচ্ছা, আপনাদের থাকতে হবে না। জিনিসপত্রগুলো দিয়ে চলে যান।” সবাই আনোয়ার এবং স্বপনকে ফেলে চলে যায়।
স্বপন: শুধু আমরা দুজন যাব!!!
:হ্যাঁ, এতদূর এসে পিছিয়ে যাওয়া যায়না। চল কবরটার কাছে যাই।”
আমাবশ্যার রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভালো করে কিছু দেখা যায় না।

মশালের আরোতে কবরস্থানকে অপার্থিব কোন জায়গা মনে হয়। ধূর থেকে কুকুরের ক্রুদ্ধ গর্জন শোনা যায়।

স্বপনের বুকটা কেপে ওঠে। আনোয়ারের হাতে শাবল, মশাল এবং কেরসিনের বোতল।

আর স্বপনের হাতে কোদাল, দিয়াশলাই এবং বেশকিছু কাঠ।

সকালবেলায় স্বপন এবং আনোয়ার আসগরের কবরটা খুঁজে বের করেছে।

তবু এই অন্ধকারে কবরটা খুজেপেতে বেশ কষ্ট হলো ওদের। কবরটার সামনে দাঁড়িয়ে আনোয়ার বলল,“আমি কবর খুড়ছি।

তুই মশাল ধরে দাঁড়িয়ে থাক।” আনোয়ার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে থাকে। প্রচন্ড ঘাম হতে থাকে ওর।

নি:শ্বাস দ্রুত হতে দ্রুততর হতে থাকে। আনোয়ারের মন্ত্র পড়ার গতি ও বেড়ে যেতে থাকে। আনোয়ার কবর খুড়তে শুরু করে।

হঠাৎ চারিদিক কেমন যেন স্তদ্ধ হয়ে যায়। আনোয়ার বলশালী পুরুষ। দ্রুত কবর খুড়তে থাকে।

গতকাল বৃষ্টি হওয়াতে মাটি বেশ নরম।

বেশ কিছুক্ষন পর আনোয়ার বলল, “সাবধান, স্বপন। আমি টের পাচ্ছি শিগবটা কবরের মধ্যেই আছে।”
কবরটা আরও অনেকটা খুঁড়তেই কিছু একটা যেন লাফিয়ে কবর থেকে বেরুল।

জিনিসটা এক ঝাটকায় আনোয়ারকে কয়েকহাত দূরে ছিটকে ফেলল। স্বপন অসহায় বোধ করে।

ওর ইচ্ছা করছিল পালিয়ে যেতে। আনোয়ার উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করে। শিগবটা এবার স্বপনের দিকে আসতে থাকে।

স্বপন জ্বলন্ত মশাল দিয়ে শিগবটাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। শিগবটা কযেক পা পিছিয়ে সরে যায়।

হঠাৎই শিগবটা রক্ত হিম করা শব্দ করে ওঠে। আনোয়ার পেছন থেকে শাবল দিয়ে শিগবটাকে আঘাত করে।

শিগবটা আনোয়ারকে শূন্যে তুলে নেয়। আনোয়ার চিৎকার করে বলে, “স্বপন, তুই কবরটার কাছে থাক।

আগুন জ্বালা। শিগবটাকে কবরে ফিরতেই হবে। তাড়াতাড়ি কর। আমি ওকে ব্যস্ত রাখছি।”
শিগবটা আনোয়ারকে নিচে ফেলে দেয়। আনোয়ার আবার শিগবটাকে পেছন থেকে অঘাত করে।

এরপর দৌড়ানোর চেষ্টা করে। অন্ধকারে আন্দাজের উপর ভর করে দৌড়ানোর চেষ্টা করা খুব কঠিন ব্যপার।

শিগবটা ওর পিছু নেয়। হঠাৎ একটা নতুন খোড়া কবরের মধ্যে পড়ে যায় আনোয়ার।

শিগবটা হঠাৎ খুশি হওয়ার মত একটা আওয়াজ করল। শিগবটা দ্রুত মাটি ফেলতে শুরু করে।

আনোয়ার বুঝতে পারে এই কবরটা শিগব খুড়েছে এবং শিগবটা চেষ্টা করছে তাকে জীবন্ত কবর দিতে।

এদিকে উত্তেজনায় , ভয়ে স্বপনের হাত পা কাঁপতে থাকে। এবার আগুন দেওয়ার পালা।

জ্বলন্ত মশাল দিয়ে কবরে রাখা কাঠে আগুন লাগিয়ে দেয় স্বপন। হঠাৎ শিগবটা থমকে দাড়ায়।

কেমন যেন পাগলের মতো হয়ে যায়। গুলির বেগে কবরের দিকে আসতে থাকে। কবরের মধ্যে ঢুকে যায় শিগবটা।

পোড়া গন্ধে চারিদিক ভারী হয়ে যায়। শিগবটা আর্তনাদের পর আর্তনাদ করতে থাকে।

একবার বলে ওঠে, “মারিস না ……মারিস না…….আমারে বাচা……..।” স্বপন আনোয়ারের কাছে ছুটে যায়।

স্বপনের সহায়তায় হাতড়ে হাতড়ে কবর থেকে উঠে আসে আনোয়ার। হাতে পায়ে প্রচন্ড ব্যথা ওর।

শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। স্বপনের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ায় আনোয়ার।
আনোয়ার: বর্তমানে কবরটাই শিগবটার শক্তির উৎস। কবরটার কোন ক্ষতি হলে শিগবটা বাচতে পারবে না।

এজন্য শিগবটা দ্রুত কবরের কাছে ফিরে আসে।আমরা পেরেছি স্বপন। আমরা পেরেছি।”

ওরা দ্রুত কবর স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ে। হঠাৎ কেউ যেন চিৎকার করে বলে উঠে, “আমি ফিরে আসব……..।

আসব…….।আসব। প্রতিশোধ নেব…………। প্রতিশোধ।” প্রচন্ড আর্তনাদের শব্দে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে ওদের।
পরিশিষ্ট:
একটা ফোন কোম্পানীতে বেশ ভাল একটা চাকরি পেয়েছে স্বপন। স্বপন আর তৃষার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে।

স্বপন আর তৃষা এখন বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে খুব ব্যস্ত। একদিন আনোয়ারের সাথে বসুন্ধরা সিটিতে দেখা হয় স্বপন এবং তৃষার।

দুএকটা ভদ্রতার কথা বলেই চলে যায় স্বপন আর তৃষা। যেন আনোয়ারকে ওরা ভালোভাবে চেনেই না।

আনোয়ার বুঝতে পারে ওদের জীবনে তার কোন স্থান নেই। কিংবা অতীতের দুঃসপ্ন ওরা আর মনে করতে চায় না।

আনোয়ারের মনটা একটু খারাপ হয়। জীবনে কিছুই পাওয়া হল না ওর।

রহস্যের পেছনে পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনটা শেষ হয়ে যাবে তার। আগামীকাল আনোয়ার কুয়াকাটা যাচ্ছে।

সেখানে নাকি এক অদ্ভুত জন্তুর আগমন ঘটেছে। সত্য মিথ্যা যাই হোক আনোয়ার যাবেই।

তবে স্বপন আর তৃষার আনোয়ারকে আবার প্রয়োজন হবে। কারন শিগবটা আবার ফিরে আসবে।

ফিরে আসবে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। নির্মম প্রতিশোধ …!!!!

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক · রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত