নরকের মেয়ে

সুরুজ মিয়ার যখন বউয়ের সাঠে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয় তখন তার মাথা ঠিক মত কাজ করে না । গাড়ি চালানোর সময় বউয়ের উপর ঝড়তে না পারা রাগটা রাস্তার উপর দিয়ে দিতে চায় । তখন তার ইচ্ছে করে সামনে যা কিছু আসুক সেটাকে পিসে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে ।
আজকেও সুরুজ মিয়ার মেজাজটা বেশ খারাপ । একে তো বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বউয়ের সাথে ঝগড়া করে বের হয়েছে তার উপর বসের ঝাড়ি খেয়েছে একটু আগে । এখন তাই ঝড়ের বেগে সাপ্লাই ট্রাকটা চালাচ্ছে । সামনে যা আসবে তাকে পিসে ফেলতে মন চাইছে । অবশ্য এখন সেরকম সম্ভবনা কম । বনানীর এই রাস্তাটা রাতের বেলা একেবারে ফাঁকাই থাকে বলা । আর এখন মাঝ রাত । লোকজন নেই কেউ । সেটা সুরুজ মিয়াও ভাল করেই জানে । তাই তো এক্সসেলেটরে চাপ দিয়ে চলেছে । গাড়ি জোরে চালালে তার রাগ একটু কমবে !

সে যদি জানতো একটু পরে তার সাথে কি হবে তাহলে সে হয়তো এখনই গাড়ির গতি এখনই কমিয়ে ফেলতো । কিন্তু সুরুজ মিয়া

সেটা জানে না । গাড়ি সপ্লাই ভ্যানটার গতি ঝাকি দিয়ে আরেকটু যখন বেড়ে গেল তখনই সামনে দেখতে পেল চার রাস্তার

মোড়টা । লাল বাতি জ্বলে আছে । অবশ্য সুরুজ মিয়ার সেটা নিয়ে ভাবনা নেই । এতো রাতে এখানে কোন ট্রাফিক নেই, লাল বাতি

দেখে থামার কোন মানে নেই । সুরুজ মিয়ার মোবাইলটা তখনই বেজে উঠলো । সামনের দিকে চোখ রেখেই সে মোবাইলটা পকেট থেকে বের করলো । স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার মনটা ভাল হয়ে গেল ।

তার স্ত্রী ফোন করেছে । এখন ফোন দিয়ে কান্না কাটি করবে হয়তো । প্রত্যেকবার এমনই হয় । বের হওয়ার সময় ঝগড়া তারপর

রাস্তায় ফোন দিয়ে কান্নাকাটি । সুরুজ মিয়ার চোখ তখন সম্পূর্ন ভাবে মোবাইল স্ক্রিনে নিবদ্ধ । তাই সে লক্ষ্যও করলো না যে

চৌরাস্তার বাঁ দিক থেকে একটা ভ্যান আপন মনে ছুটে চলে আসছে । তার সিগনাল গ্রিন তাই সে খুব একটা চিন্তিতও হচ্ছে না । সুরুজ মিয়া যখন আবার চোখ তুলে সামনের রাস্তার দিকে তাকালো তখনই ভ্যানটাকে দেখতে । মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে

গেল আপনাআপনি । দুই হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে গায়ের সব শক্তি দিয়ে ব্রেকে চাপ দিল । কিন্তু সুরুজ মিয়া খুব ভাল করেই

জানে এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব না । একে তো তার ট্রাক ভর্তি মালপত্র তার উপর তার ব্রেকটা ওতো ভাল করে কাজ করে না যে

চাপার সাথে সাথেই থেমে যাবে । যত সময়ে থামবে তত সময় ভ্যান চালক আর ভ্যান মাটির সাথে মিসে যাবে । সুরুজ মিয়া আর

দেখতে চাইলো না । চোখ বন্ধ করার আগে হেড লাইটের আলোতে ভ্যান চালকের অবাক হওয়া চোখটা দেখতে পেল ।

চোখ বন্ধ করেই রইলো সে । অপেক্ষা করতেই লাগলো একটা সংঘর্ষের আওয়াজের জন্য । কিন্তু যে সময় ভ্যানটাকে আঘাত

করার কথা সে সময় পার হয়ে গেল অনেক আগেই । কোন সংঘ্সের আওয়াজ পাওয়া গেল না । সুরুজ মিয়া অবাক চোখ খুললো

। তাকিয়ে দেখে তার তার ট্রাকটা সেই সিগনাল পার হয়ে আরও কিছু দুর এসে দুরে এসে থেমেছে ।

কোন আঘাত লাগে না ভ্যানের সাথে । কিন্তু এমন হওয়ার কথা না । কোন ভাবেই ভ্যান চালক সংঘর্ষ এড়ানোর কথা না !

সুরুজ মিয়া ট্রাক থেকে নামলো । অবাক হয়ে দেখলো চৌরাস্তারটার বাঁ দিকের ল্যাম্পপোস্টের ভ্যানটা দাড়িয়ে আছে । ভ্যান

চালকের অবাক করা চোখটা এখন থেকেও সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে । এমন কিছু একটা হয়েছে যেটা সে বুঝতে পারছে না । সুরুজ

মিয়া যখন চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলো তখনই কিছু একটা হয়েছে ।

সুরুজ মিয়া ভ্যান চালকের দিকে এগিয়ে আরও একজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করলো । কালো রংয়ের হুডি আর জিন্সের প্যান্ট পরা

একজন । আরও কয়েক কদম এগিয়ে যেতে বুঝতে পারলো সেটা একটা মেয়ে । মেয়েটা সুরুম মিয়ার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই

আবার বাঁ দিকে রাস্তার দিকে দ্রুত হাটা শুরু করলো । মিলিয়ে গেল অন্ধকারে !

এতো রাতে একটা মেয়ে একা এই রাস্তায় থাকার কথা না কোন ভাবেই । সুরুজ মিয়া ভয়ে ভয়ে ভ্যান চালকের দিকে এগিয়ে যেতে

লাগলো । ভ্যান চালক এখন বমি করছে রাস্তার উপর বসে !

কম্পিউটার মনিটরের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে ইভাঙ্কা । তার সামনে আরও দুজন মানুষ বসে আছে । সবারই মুখ

গম্ভীর । একটু তারা তাকে একটা ভিডিও ক্লিপ দেখতে দিয়েছে । সেটাই দেখছে । কয়েকবার দেখা হয়ে গেছে এরই ভেতরে

। একটা ট্রাক একটা ভ্যানকে চাপা দেওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে একটা আলোর ঝলকানি সেটার সামনে আছে । তারপর ভ্যানটাকে

সেখান থেকে নিয়ে চলে যায় এবং দুর্ঘটনার হাত থেকে ভ্যানটা রক্ষা পায় ! চৌরাস্তায় ট্রাফিক সিগনালে লাগানো থাকা সিসি টিভি

ক্যামেরায় ধরা পরেছে ঘটনাটা । এরই ভেতরে ইউটিউবেও ছড়িয়ে পড়েছে । সাধারন গতিতে দেখলে কেবল আলোর ঝলকানী

ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না কিন্তু যদি স্লো-মোশনে দেখলে হালকা ভাবে বোঝা যায় একটা মানুষ এসে ভ্যানটাকে সেখান থেকে

সরিয়ে নিয়ে গেছে । সে যে স্বাভাবিক কোন মানুষ নয় সেটা বুঝতে কারো কষ্ট হয় নি ।

ইভাঙ্কার দিকে তাকিয়ে কালো পোষাক আর সাদা কলারের মানুষটা বলল

-কিছু বুঝতে পারছো ?
-পারছি ।
-তোমার কি মত ?
-হ্যা ! আপনারা যা ভাবছেন এটা সেই । কোথাকার ভিডিও এটা ?
-বাংলাদেশ ।
-বাংলাদেশ ? কিন্তু ….
কিছু একটা বলতে গেল ইভাঙ্কা তাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিল সামনে বসা মানুষটা । তারপর বলল
-আমি বুঝতে পারছি তুমি কি ভাবছো । তবে এটা অসম্ভব না কিন্তু ! তার অস্তিত্ব সব ধর্মেই আছে । কেবল ভিন্ন নামে ! আর কিছু না ।
-কবে যেতে হবে ?
-যত দ্রুত সম্ভব ! এসব দুনিয়া থেকে যত দ্রুত সম্ভব মিটিয়ে ফেলা যায় ততই ভাল । আমি সব ব্যবাস্থা করে ফেলেছি । তোমার সাথে সানিয়েল যাবে !

ইভাঙ্কা আর কোন কথা বলল না । চুপ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল । অনুভব করছে তার শরীরে একটা অজানা উত্তেজনা শুরু কাজ করা শুরু হয়েছে । প্রত্যেকবারই এমন ভাবে শুরু হয় । যতক্ষনটা ঐ নরকের কিটটাকে এই পৃথিবীতে থেকে বিদায় না করতে পারছে ততসময় তার এই উত্তেজনা কমবে না!

প্রথম ডাকটা লিলি ঠিক মত শুনতে পায় নি তবে ঠিকই বুঝতে পেরেছে বারটেন্ডার দিপক তাকে ডাকছে । লিলি গ্লাসটা নামিয়ে রেখে সেদিকে এগিয়ে গেল । দিপকের মুখে সব হাসি লেগেই থাকে । ওর দিকে তাকিয়ে আরেকবার হাসি দিল সে ।
-ডাকছিলে ?
-হুম । এটা টেবিল নাম্বার ১১ তে দিয়ে এসো । ভদ্রলোক তোমার নাম ধরে খোজ করছিলো । তোমাকে চেনে সম্ভবত ।
-তাই নাকি ?

লিলি বোতল আর গ্লাসটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল ১১ নাম্বার টেবিলকের কাছে । টেবিলটা বারের একেবারে কোনার দিকে । স্বাধারনত কাপলরা যখন আসে এদিকটাতে বসে । এগিয়ে যাওয়ার সময় ওর মনে একটা অন্যরকম অনুভুতি হতে লাগলো । এই অনুভুতিটা যখনই হয়েছে তখন কোন অস্বাভাবিক ঘটনা ওর জীবনে ঘটছে । অবশ্য ওর পুরো জীবনটাই অস্বাভাবিক । এতো চিন্তা করে লাভ নেই ।

১১ টেবিলে আসতেই লিলি মানুষটাকে দেখতে পেল । বারের ভেতরে কখনই উজ্জল আলো থাকে না । তবে এদিকটাতে আলো আরও একটু কম । তবে এই কম আলোতেই ছেলেটার চেহারা খুব ভাল করেই তার নজরে এল । অবশ্য লিলির আলো আন্ধকারে খুব একটা সমস্যা হয় না ।
২৫/২৬ বছরের একটা যুবক । কালো শার্ট ইন করে পরেছে কালো জিন্সের সাথে । চুল গুলো মাঝারি উচ্চতায় । সুন্দর করে আচড়ানো । তবে মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি । সেটাও চেহারার সাথে চমৎকার ভাবে মানিয়ে গেছে । এই দাড়ি না থাকলেই মনে হল চেহারাতে যেন কিছু একটা নেই । তবে সব থেকে লক্ষ্যনীয় যেটা, সেটা হল তার চোখ । এতো তীক্ষ চোখের দিকে লিলি আর আগে তাকিয়েছে কি না সেটা লিলি বলতে পারবে না ।
লিলি ভাল করে তাকিয়ে দেখলো । এই চেহারা সে আগে কোন দিন দেখে নি । এই বারেও সে এর আগে আসে নি সেটাও লিলি খুব ভাল করেই জানে । লিলির স্মৃতি শক্তি খুব ভাল । স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ভাল । অজানা একটা সংঙ্কায় লিলির মনটা ভরে উঠলো । বোতলটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে লিলি বলল

-আপনার অর্ডার !
যুবক বলল
-থ্যাঙ্কিউ আদ্রিতা !
লিলির মনে হল ওযেন খুব জোরে দেওয়ার সাথে একটা ধাক্কা খেল । ওর নাম আদ্রিতা এটা কেউ জানে না এখানে । কারো জানার কথাও না । লিলির মনে হল এখনই এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায় । নিজেকে খানিকটা অসহায় মনে হল ওর কাছে । যুবক আবার বলল
-ভয় পেয় না । আমি এখানে একাই এসেছি । আর তোমার কোন ক্ষতি করতে আসি নি ।
লিলি নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে বলল
-কে আপনি ? আমাকে কিভাবে চেনেন ?
-আমি কে এটা খুব বেশি জরুরী প্রশ্ন না । জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে তোমার সামনে বিপদ ঘনিয়ে আসছে ! এমন একটা বিপদ যেটা তুমি একা সামলাতে পারবে না ।
লিলির মনে হল এখনই এখান থেকে চলে যাওয়া দরকার । সে সব সময়ই জানে তার পেছনে কিছু মানুষ লেগে আছে । তাকে মারার জন্য । জন্ম থেকে সে এটা জানে । তখন থেকেই সে পালিয়ে বেড়াচ্ছা । এক শহর থেকে অন্য শহরে এক দেশ থেকে অন্য শহরে ।

সামনে বসা যুবক একটা মোবাইল বের করে একটা ভিডিও চালু করলো । যে ভিডিওটা গত কয়েকদিন থেকেই ইন্টানেটে ভাইরাল হয়ে আছে । এক অলৌকিক মানুষ একজন ভ্যান চালককে বাঁচিয়েছে তার অলৌকিক শক্তি দিয়ে ।
লিলি নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলল
-এটার সাথে আমার কি সম্পর্ক কি ?
কথা শুনে যুবক হাসলো । বলল
-কোন সম্পর্ক নেই ?
-না ! আর এটা একটা বানানো ভিডিও । সত্যি না ! সবাই এমন কথাই বলছে ।
যুবক আবারও বলল
-সবাই কি বলছে সেটা মুখ্য বিষয় নয় । কারন আমি যেমন জানি তুমি জানো যে ভিডিওটা সত্যি কি না । আর ভিডিওর যাকে সবাই সুপারম্যান বলে বলছে সে আসলে কোন সুপারম্যান নয় । সুপার গার্ল ! তার পরিচয় আমি যেমন জানি তুমিও জানো । জানো না ?
-না । আমি জানি জানি না !
যুবক এবার সত্যি সত্যিই হেসে ফেলল । লিলি কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না । একবার মনে হচ্ছে এখান থেকে দ্রুত চলে যেতে । কিন্তু সব কথা না শুনে যেতেও পারছে না । তার জানতে হবে সামনে বসা এই যুবক আর কি কি জানে ! হাসি থামিয়ে যুবক বলল
-যাই হোক । এটা যেমন আমার চোখে পড়েছে । আরও কিছু মানুষের চোখে পড়েছে । যাদের কাজই হচ্ছে অস্বাভাবিক সব কিছুকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেওয়া । তুমি এদের সাথে একা মোকাবেলা করতে পারবে না ।
-সেটা আমি দেখে নেব !

লাইনটা বলতেই লিলির ভেতরে একটা পরিবর্তন এল । সেটা লিলি নিজেও বুঝতে পারলো ভাল করে । এমনটাই হয় প্রতিবার । যখন তার ভেতরে জিনিসটা বাইরে আসতে চায় কিংবা ওর উপর নিয়ন্ত্রন নিতে চায় । লিলি লক্ষ্য করলো যুবকের মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে গেছে । যুবক বলল
-প্লিজ । ওটাকে তোমার নিয়ন্ত্রন নিতে দিও না । তাহলে কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে ! আমি জানি তুমি তোমার এই ক্ষমতা কোন দিন খারাপ কাজে ব্যবহার কর নি কিন্তু তুমি যতই এটা ব্যবহার করবে তোমার নিজের উপর নিয়ন্ত্রন ততটাই কমে যাবে । এটা তুমিও জানো খুব ভাল করে । জানো না ? দেখো তোমার চোখের রং পরিবর্তন হয়ে গেছে । আমার কথা শুনো !
-আপনি চলে যান এখান থেকে ! নয়তো ফল কিন্তু ভাল হবে না !
যুবক কিছু বলতে গিয়েও বলল না । লিলি বুঝতে পারছে ওর ভেতরে আস্তে আস্তে কিছু পরিবর্তন হচ্ছে । “আদরাত” আস্তে আস্তে ওর উপর নিয়ন্ত্রন নিতে শুরু করেছে ।
না ! এটা সে হতে দিবে না । তাকে এখনই চলে যেতে হবে । দুই সপ্তাহ আগেও সে গেছিলো সে রোমারির কাছে । এখনই এমন হচ্ছে । অথচ আগে মাস পার হওয়ার আগে এমনটা হত না । তাহলে কি আসলেই নিয়ন্ত্রন হারিয়ে যাচ্ছে ?
না ! এতো গুলো বছর তিল তিল করে নিজেকে নিজের নিয়ন্ত্রনে রেখেছে সে । কোন ভাবেই সেটা হারিয়ে ফেলতে দিবে না । অবশ্য ঐ ভ্যানওয়ালাকে বাঁচাতে না গেলে এমনটা হত না । প্রতিবারই যখন ও নিজের শক্তিটা ব্যবহার করে ও আদরাতের উপস্থিতিটা খুব ভাল করেই বুঝতে পারে । কুৎসিত তার চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে । যেন ওর দিকে তাকিয়েই সে হাসছে !
লিলি আর দাড়ালো না । সোজা দিপকের কাছে গিয়ে হাজির হল । তারপর তাকে বলে বাইরে চলে এল ।
রাত ১১টার মত বাজে । এখনও ঢাকার এই এলাকাটা জীবন্ত । যেন মনে হচ্ছে সবে মাত্র সন্ধ্যা হয়েছে । লিলি নিজের বাসার দিকে রওনা দিল । কালকেই ওকে আবার রোমারির কাছে যেতে হবে । যে কাজটা ওর করতে ভাল লাগে না সেটা আবারও করতে হবে।।

লিলি দৌড়াচ্ছে । লিলির তীব্র শীত করতে লাগলো । তাকিয়ে দেখে ওর শরীরে কোন কাপড় পড়া নেই । অন্ধকার জঙ্গলের ভেতরে ওর বিবস্ত হয়ে দৌড়াচ্ছে । কোন দিকে যাচ্ছে ওর ধারনা নেই । চারিপাশে অন্ধকার । ওর কিছু দেখতে পাওয়ার কথা না তবুও ও পরিস্কার সব কিছু দেখতে পাচ্ছে । ছোট বেলা থেকেই ওর ভেতরে অস্বাভাবিক ব্যাপারটা আছে । যেখানে অন্ধকারে কেউ দেখতে পায় না লিলি অন্ধকারের ভেতরে সব কিছু পরিস্কার দেখতে পায় ।
বাঁ দিকে তাকাতেই লিলি সেই প্রাণীটাকে দেখতে পেল । ছোট বেলা থেকেই প্রায় প্রতিদিন স্বপ্নে সে প্রাণীটাকে দেখে আসছে তবুও আজও ওটাকে দেখলেই ওর ভেতরে একটা তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয় । জানে, ওর হাত থেকে ওর মুক্তি নেই । ওর ভেতরেই সেটা বাস করে । আস্তে আস্তে বড় হয় । ওকে গ্রাস করার জন্য ।

আজকে যখন বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল চাইলো যেন দ্রুত ওটার থেকে দুরে সরে যেতে চাইলো । কিন্তু ক্রমশ ওটা আরও কাছে চলে আসছে । জানে ওকে ধরতে পারলেই ওর আর নিস্তার নেই । এই তো কাছে চলে আসছে । লিলি আরও জোরে দৌড়াতে চাইলো । কিন্তু কুৎসীত প্রাণটার সাথে যেন ও পেরে উঠছে না । আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়েই আসছে প্রাণীটা ।
লিলি ওটার দিকে তাকাতে চাইছে না কিন্তু ওটার দিক থেকে চোখও সরাতে পারছে না । ওটার দিকে তাকিয়ে দৌড়ানোর কারনেই হঠাৎ লিলি হোটচ খেয়ে পড়ে গেল । তীব্র একটা চিৎকার বের হয়ে এল মুখ থেকে । ঠিক তখনই ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল ।
বিছানা থেকে উঠে বসলো । সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছ । বুকে হাত দিয়ে দেখে এখনও সেটা লাফাচ্ছে । স্বপ্নটা ইদানিং আরও স্পষ্ট হয়ে আসা শুরু হয়েছে । লিলি জানে যত দিন যাবে সেটা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠবে । তার আগে ওকে যেতে হবে রোমারির কাছে । যে কাজটা ও সব থেকে অপছন্দ করে সেটাই করতে হবে ।
বাইরে তাকিয়ে দেখে সকালে আলো তখনও ফোটে নি । তবে একটু পরেই ফুটবে । শোবার ঘরের বারান্দায় এসে দাড়ালো । একটু একটু ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে । তবে সেটা ওর ভাল লাগছে । গরম কাল থেকে ঠান্ডাটাই ওর বেশি পছন্দ । সকালের দিনটা এভাবেই ওর শুরু হয় । দিনের সব সময়ের ভেতরে এই সকালটাই ওর কাছে সব থেকে বেশি পছন্দ । এখানে একটা পবিত্র পবিত্র ভাব আছে । তখন ওর নিজেকে নিজের কাছ থেকে কেমন যেন নিরাপদ মনে হয় । অন্য দিকে রাতে মনে হয় সব থেকে অনিরাপদ আর অস্বস্তিকর । দিন দিন এটা যেন বাড়ছেই । তার উপর গতকাল রাতেই ঐ আগন্তুত । ওর ব্যাপারে এতো কিছু জানে কিভাবে ?
লিলি কিছুই ভেবে পেল না । সময় এসেছে এখান থেকে চলে যাওয়া ! অন্য কোথায় !
অন্য কোন শহরে কিংবা অন্য কোন দেশে ।

যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই কেবল সে দৌড়ে বেরাচ্ছে । শহর থেকে থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহর কিংবা দেশে থেকে অন্য দেশে । ১৬ বছর পর্যন্ত তার সাথে একজন মানুষ ছিল । ওর মা । ওকে দেখা শুনা করতো কিভাবে চলতে হবে কি কি করতে হবে সেসব ওকে শিক্ষা দিত। মায়ের কাছেই ও ওর সব কিছু শিখেছে । ইংরেজি বাংলা হিন্দি সহ আরও কয়েকটা ভাষা ওর মা ই ওকে শিখিয়েছে । শিখিয়েছে কিভাবে একা একা চলতে হয় । কারন সেও জানতো সারা জীবন সে তার সাথে থাকবে না, একদিন হলও তাই । ওর যখন ১৬ বছর বয়স তখন ওর মা মারা গেল । কিভাবে মারা গেল সেটা লিলি আজও ঠিক মত জানেও না । তখন ওরা থাকতো বোস্টন শহরে । একটা পার্ট টাইপ কাজ করতো লিলি । কাজ থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেত । একদিন ফিরে দেখে নিজের ফ্ল্যাটে মরে পড়ে আছে সে । কোন রক্ত কিংবা যখমের চিহ্ন নেই । টেবিলের উপর ওর জন্য একটা নোট রাখা ছিল আর বেশ কিছু টাকা । চিঠিতে বলা ছিল ওকে এখান থেকে কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে । সেদিন থেকেই লিলির একা একা পথ চলা । বোস্টন থেকে পাকিস্তান তারপর ইন্ডিয়া তারপর মায়ানমার । এখন সে বাংলাদেশে । প্রত্যেক দেশে একজন করে মানুষ থাকতোই তাকে সাহায্য করার জন্য । এক শহর থেকে যখন অন্য শহরে সে যেত তখন সেই শহরের থাকা সেই মানুষটা তাকে পরের শহরের কার কাছে যেতে হবে সেটা বলে দিত ।

লিলি জানে তার জীবনটা এভাবেই কাটবে । তাকে ছোট বেলা থেকেই শেখানো হয়েছে তাকে মারা জন্য কেউ আছে । কেউ ওকে খুজে বের করার চেষ্টা করছে । সেই মানুষ গুলোর কাছ থেকে ওকে পালিয়ে বাঁচতে হবে । তবে ওর প্রধান শত্রু ওর ভেতরেই বাস করে । ওটাকে নিজের নিয়ন্ত্রন করতে হবে । কারন যদি একবার ওর ভেতরে পশুটা যদি ওকে গ্রাস করে ফেলে তাহলে কেবল এই তার জন্যই নয় এই পুরো পৃথিবীর জন্যই সেটা একটা অমঙ্গলকর ঘটনা হবে ।
লিলি আবার নিজে ঘর ফিরে এল । ফোন হাতে নিয়ে রোমারির নাম্বার ডায়েল করলো । একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভারি গলায় কেউ বলল
-হ্যালো
-কেমন আছো ?
-আমি তো ভাল আছি তবে তোমার কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছে না তুমি ভাল আছে ।
একটু সময় চুপ থেকে লিলি বলল
-আমার দাগ গুলো মুছে যাচ্ছে
-এতো দ্রুত !!
লিলি রোমারির কন্ঠের বিশ্ময়টা বুঝতে পারলো ।
-হ্যা !
-এমন তো হওয়ার কথা না ।
-আসলে আমি ঐদিন এমন একটা কাজ করেছিলাম যেটা আমার করার কথা না । সেটার জন্যই এমন হচ্ছে !
ওপাশ নিরবতা বিরাজ করলো কিছু সময় । তারপর রোমারি বলল
-কখন আসতে চাও ?
-আজকে সন্ধ্যায় !
-আচ্ছা আসো ! আমি সব কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি !
লিলি ফোন রেখে দিল । আবার সেই দিন চলে এসেছে । যন্ত্রনা ভোগ করার করার দিন । ওর মায়ের কথা মনে পড়লো । সে একবার তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো যে তাকে জীবনভর এমন কষ্ট ভোগ করতে হবে যেটার জন্য সে দায়ী নয় । দায়ী অন্য কেউ । অন্য কারো পাপের ফল তাকে সারা জীবন ভোগ করতে হবে ।
তিন

লিলি চাবুকের দিকে আরেকবার তাকালো । সব চাবুকই কালো রংয়ের হয়ে থাকে কিন্তু এই চাবুকটা সাদা । তবে এর সারা শরীরে কালো অক্ষরে অদ্ভুদ ভাষায় কিছু লেখা ছোট ছোট করে । চাবুকটার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । মনের ভেতরে একটা কথা বারবার উকি দিচ্ছে । এখান থেকে চলে যেতে বলছে সেটা । লিলি চিন্তাকে দাবিয়ে রাখলো । কোন ভাবেই এই চিন্তাকে জয়ী হতে দেওয়া যাবে না । কারন ওর ভেতরে যে প্রাণীটা আছে সেটা কেবল এই চাবুকটাকেই ভয় পায় ! আর ভয় পায় ঐ লোহার রিংটা । রিংটার মাঝে অদ্ভুদ একটা নকশা আকা । নকশাতে যাই বলা হোক না কেন সেটাকে ভেতরের এই প্রাণীটাকে খুব বেশি ভয় পায় । সেটা যখনই ওর শরীরের ছাপ ফেলে তখনই প্রাণীটার উপদ্রপ কমে আসে । একেবারে নিস্তবদ্ধ হয়ে যায় কিছু সময়ের জন্য । কিছু দিনের জন্য । লোহার রিংটা এখন আগুনে গরম করা হচ্ছে । একটু পরে সেটা দিয়েই ওর শরীরে ছাপ দেওয়া হবে । সব থেকে কঠিন পরীক্ষা এটাই ।
ভাবতেই পারছে না ঠিক দুই সপ্তাহ আগেই সে এখানে এসেছিল । প্রত্যেকবার এই রংটার গরম ছাপ ওর শরীরে মাস দেড়েক কিংবা দুই মাসের বেশি সময় থাকে । কিন্তু এইবার সব কিছু অলটপালট হয়ে গেছে ।
রোমারি ওর দিকে তাকিয়ে বলল

-তুমি রেডি ?
-হুম !
ঠিক একই অবস্থায় লিলি এর আগেও এসেছে । একই ভাবে তার দু হাত সিলিংলের সাথে বাঁধা শক্ত করে । পায়ের দিকটাও শক্ত করে মেঝের সাথে আটকানো । আগে ও মুখে কিছু পড়তো না কিন্তু চিৎকার করলে অনেকে শুনতে পাবে । পরে হয়তো সমস্যা হবে তাই এখন মুখে একটা মেডিক্যাল টেপও লাগিয়ে নেয় ! লিলির ঠিক সামনেই আগুন জ্বলছে । ওর সামনে রোমারি বসে মন্ত্র পড়া শুরু করলো !
প্রতিটা মন্ত্রের শব্দ ওর কানে যেতেই ও যেন অন্য জগতে চলে যাচ্ছে । একটু ঘোরের ভেতরে !
-রেডি ?
রোমারির কন্ঠটা বড় তীক্ষ হয়ে শোনালো !
ও মাথা ঝাকাতেই একটা শপাত করে আওয়াজ হল । সেই সাথে তীব্র একটা ব্যাথা ও অনুভব করলো ওর পেছনে । সেই সাথে আরও একটা অনুভুতি ওর ভেতরে আসলো । ওর ভেতরে কেউ যেন চিৎকার করে উঠছে । ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে । এই সময় লিলির হুস হারাতে থাকে । এই জন্য ওর হাত আর পা দুটো শক্ত করে আটকে রাখা দরকার হয়ে পড়ে !
লিলির যেভার প্রথম তার ভেতরের যন্তুটাকে বাইরে আসতে দিয়েছিলো তখন ওর বয়স আট বছর । ওর স্কুলের এক ছেলে ওকে মেরেছিলো । লিলি তখনই আবিস্কার করলো ওর ভেতরে অন্য কিছু আছে যা ওকে বলছে ছেলেটাকে শাস্তি দিতে । এর আগে ও স্বপ্ন দেখতো কিন্তু সেটা এতোটা প্রকট ছিল না যতটা ওর রাগের কারনে প্রকাশ পেল । স্কুল থেকে ফেরার পথে ও ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করছিল রাস্তার পাশে ঝোপের ভেতরে । তারপর ছেলেটাকে বাগে পেতেই ওর উপর হামলা করে বসে বসে । এমন ভাবে আক্রমন করে যে ছেলেটা ঠিক মত চিৎকার করার সুযোগ পায় নি । যখন লিলির হুস ফিরলো ও দেখলো ও ছেলেটার ঘাড়টা ভেঙ্গে ফেলেছে । নিজের চোখের নিজের কৃত কর্মটা ওর বিশ্বাস হচ্ছিলো না । তখনও ও দৌড় দিয়ে বাসার পৌছালো । এতো দ্রুত যে ও নিজেই অবাক হয়ে গেল । নিজেকে লুকিয়ে রাখলো ব্যাজমেন্টের ভেতরে । ও তখন ওর ভেতরের কন্ঠটা পরিস্কার শুনতে পাচ্ছিলো । যেটা বলছে ও যা করেছে সেটা ঠিকই করেছে । কিন্তু ওর মন সেটা মানতে নারাজ ছিল ।

সন্ধ্যায় সময় যখন ওর আম্মু বাসায় এল ওর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলেছিলো যে খারাপ কিছু হয়েছে । ওর মুখ থেকে সব শুনে একেবারে নিরব হয়ে গেল । ওর মা ওকে এর পর বলল ওকে কি কি করতে হবে এবং কেন করতে হবে ! ঐ টুকু বসয়েই লিলি বুঝতে পেরেছিলো ও যা করেছে সেটার জন্য ওকে শাস্তি পেতেই হবে । আর এটাই হচ্ছে ওর শাস্তি । ঐ ছেলেটার ঘাড় ভাঙ্গা দৃশ্যটা লিলির মনে আজও গভীর ছাপ ফেলে আছে যেটা ওকে কোন খারাপ কাজ করতে বাঁধা দেয় !
প্রায় আধা ঘন্টা চলল লিলির উপর চাবুক বর্ষন । একটা সময় লিলি অনুভব করলো ওর ভেতরের প্রাণীটা একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেছে । সেই সাথে রোমারিও লক্ষ্য করলো লিলির চোখের রংও স্বাভাবিক হয়ে এসেছে । এরপরেই আসল কাজ । গরম করা রিংটা নিয়ে এগিয়ে এল । মুখে মেডিক্যাল টেপ দিয়ে আটকানো সত্ত্বেও ও দাতে দাপ চেপে অপেক্ষা করতে লাগলো তিব্র একটা চিৎকার আটকানোর জন্য ।

দগদগে ঘাঁ নিয়ে লিলির শার্ট পরতে কষ্ট হচ্ছিলো । সারা শরীরে তীব্র ব্যাথা অনুভব করছে । তবে মনের ভেতরে একটা শান্তি কাজ করছে । আগামী কিছু দিন ও শান্তিতে থাকতে পারবে । রোমারি ওকে পোষাক পরতে সাহায্য করলো । তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-তোমার আরও সাবধান হওয়া উচিৎ ! আমি আগেই বলেছি তুমি যত তোমার শক্তিটা ব্যবহার করবে তত জলদি তোমার শরীরের এই দাগটা মিশে যাবে । আর আদরাত তত দ্রুত বেরিয়ে আসবে !
লিলি দুর্বল কন্ঠে বলল
-আই নো । কিন্তু ঐ লোকটা মারা যেত !
-গেলে যেত ! দুনিয়ার মানুষকে বাঁচানোর জন্য তুমি আসো নি ! এবার থেকে আরও সাবধানে থাকবে । ঠিক আছে ?
-আচ্ছা !
-তোমার উপর চাবুক চালাতে আমার কি ভাল লাগে বল !
লিলি আর কোন কথা বলল না । সোজা হাটা দিল দরজার দিকে । ওকে অনেকটা পথ আবার ফেরৎ যেতে হবে । পেছন থেকে রোমারি বলল
-যেতে পারবে তো ? নাকি পৌছে দেব !
-সমস্যা হবে না । পারবো !
এই বলে লিলি বেরিয়ে গেল !
লিলি বেরিয়া যাওয়ার কিছু সময় পরেই রোমারির দোকানে আবারও বেল বেজে উঠলো ।
রোমারি চিৎকার করে বলল দোকান বন্ধ হয়ে গেছে । কিন্তু বেলটা আরও কয়েকবার বেজে উঠলো । বিরক্ত হয়ে দরজা খুলতে গেল যে । এবং সেটাই জীবনের সব থেকে বড় ভুল ছিল ওর । দরজার সামনে কালো পোষাকের একজন চমৎকার চেহারার মেয়েরার মেয়ে দাড়িয়ে । চেহারা চমৎকার হলেও মেয়েটার চোখে অন্য রকম কিছু একটা ছিল যেটা রোমারির চিনতে ভুল হল না । ভয় পেয়ে দরজা বন্ধ করতে গেল কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে ।
মেয়েটি নিজের পিঠে আটকানো খাপ থেকে চকচকে তরবারিটা বের করে ফেলেছে !

পুরোটা দিন লিলি ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল । শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা ছিল । একট নড়লেও ব্যাথাটা ওকে কাবু করে ফেলছিল । তবে পরদিন বিকেলের মাধ্যেই অনেকটা সুস্থ হয়ে গেল । আয়নায় নিচের পিঠটা ভাল করে দেখে ছিল । একেবারে তাজা হয়ে আছে রিংয়ের ছাপ টা । এটা যতদিন থাকবে ততদিন ভেতরের ওটা বাইরে বের হতে পারবে না । লিলি নিজের কাছে কাছেই একটু নিরাপদ বোধ হল । ছোট বেলা থেকেই এই নিজের ভেতরের ভয়টা ওকে বারবার ধাওয়া করে এসেছে, ওকে হামলা করতে এসেছে । প্রতিবার পশুটাকে প্রহার করার পরের কটা দিন লিলির সময় গুলো খুব ভাল যায় । নিজেকে খুব স্বাভাবিক মানুষ মনে হয় । ওর শরীরে সহ্য করবে না নয়তো ও প্রতিদিনই এমন কাজ করতো । নিজের থেকে ঐ পশুটাকে দুরে রাখার জন্য ও সব কিছু করতে পারে !
বিছানা থেকে উঠে লিলি আয়নাতে নিজেকে আরেকবার দেখলো । পিঠের দাগ গুলো একেবারে ষ্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে । যে কেউ দেখলে মনে করবে ও পিঠে ট্যাটু একেছে । লিলির দাগ গুলোর দিকে আরও ভাল করে তাকিয়ে রইলো । এই দাগ গুলোর মাঝে কি এমন ক্ষমতা আছে যে ঐ পশুটাকে একেবারে নিস্তেজ করে রাখে । যতদিন এই দাগটা মুছে না যায় ততদিন আদরাত একেবারে শক্তিহীন হয়ে থাকে । দাগ গুলো আস্তে আস্তে মুছে যেতে থাকলেই ওটা দেখা দেয় নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করে !
লিলির আজকেও রোমারিও কাছে যেতে হবে । যে রিচুয়্যালটা আদরাতকে দমিয়ে রাখার জন্য করা হয় সেটার দুইটা পার্ট থাকে । একটা একটা ফিজিক্যাল অন্যটা আধ্যাতিক । কালকে একটা ভাগ গেছে আজকে অন্যটা করতে হবে । রাতে কাজ থেকে ফিরার সময় যেতে হবে রোমারীর কাছে ! তারপরেই বেশ কিছু দিন নিশ্চিন্ত ।
তবে লিলি খুব বেশি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না । বারে দেখা হওয়া সেই ছেলেটার কথা ভাবতে লাগলো । ছেলেটা ওর ব্যাপারে অনেক কিছুই জানে । অন্য সময় হলে লিলি দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যস্ট হয়ে যেত কিন্তু এই ছেলেটার বেলায় সেটা সে ভেতর থেকে অনুভব করলো না । বারবার মনে হল যে ছেলেটা ওর কোন ক্ষতি করবে না । কিন্তু ছেলেটা বলছিলো অন্য আসছে । তাহলে কি তারা আসছে ?
যাদের থেকে ও পালিয়ে বেড়াচ্ছে তারাই আসছে ? ওকে খুজে পেয়ে গেছে !
তার মানে আবার ওকে পালাতে হবে । আবারও নতুন কোন জাগয়াতে নতুন কোন পরিবেশ গিয়ে থাকতে হবে । লিলি ঠিক করলো আজকে রোমারির কাছ ব্যাপারটা খুলে বলবে । প্রতিবার এমনই হয় । রোমারির মত কারো খোজ নিয়েই তাকে নতুন জায়গাতে যেতে হবে ।
অন্ধকারে হাটতে হাটতে যখন রোমারির বাড়ির কাছে চলে এল তখনই মনে হল কিছু একটা ঠিক নেই । অন্য সময় হলে ও এই অনুভুতিটা আরও পরিস্কার ভাবে বুঝতে পারতো কিন্তু এখন সেটা অনুভব করতে পারছে না । রোমারির দরজার সামনে ক্লোজ লেখাটা দেখে একটু সন্দেহ হল । সকাল থেকে ও রোমারিকে ফোন দিচ্ছে কিন্তু একবারও ফোন ধরে নি । এমনটা খুব একটা হয় না স্বাধারনত । কেবল মাত্র যখন রোমারি যখন লম্বা ধ্যানে বসে তখন বাদে । তাহলে ও আজকে সারাদিন লম্বা ধ্যানে বসেছিলো ?
সেটাও তো এতোক্ষনে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা !
লিলি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো । দরজা খোলা দেখে ওর মনের সন্দেহটা আরও একটা বেড়ে গেল ।
ঘরে আবছাটা অন্ধকার হয়ে আছে । পরিচিত জায়গাটা কেমন অপরিচিত মনে হচ্ছে ! কেমন একটা অন্য রকম গন্ধও ছড়িয়ে আছে চারিদিকে । এদিক ওদিক চোখ দিতেই লিলির চোখটা পড়লো কাউণ্টারের শেষের দিকে ।
একটা হাত !
হাতটা চিনতে লিলির একদম কষ্ট হল না । এবং হাতটা এমন ভাবে পড়ে আছে যে লিলির বুঝতে কষ্ট হল না রোমারীর কপালে কি হয়েছে । সে আর কিছু দেখতে চাইলো না । চোখ ফেটে কান্না এল । এই শহরে কেবল এই একজনই পরিচিত মানুষ ছিল !
কে মারলো ওকে ?
কেনই বা মারলো ?
এখন কি করবে ও ?
নাহ ! সবার আগে ওকে এখান থেকে বের হতে হবে ! দরজা খুলে বের হয়ে এল । তারপর সোজা বাসার দিকে । নির্জন রাস্তায় দ্রুত পা চালালো । ভাবতে লাগলো এর পরে ও কোথায় যাবে ? প্রতিবার রোমারীর মত একজনের কাছ থেকে নতুন কারো খোজ পেত সেখানে গিয়ে তার সাথে যোগাযিগ করতো । সেই তার একটা ব্যবস্থা করে দিত । নতুন জায়গায় পালিয়ে যাওয়ার থেকেও ওর দরকার এমন একজন যে কি না ওর ভেতরে পশুটাক আটকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে ! যদি ওটা আটকানো না যায় তাহলে ও নিজের অস্তিত্ব আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাবে !
কি করবে ও !
আরও কিছু দুর যাওয়ার পরেই হঠাৎ করেই লিলি লক্ষ্য করলো জায়গাটা একেবারেই নির্জন হয়ে আছে । এমন কি কোন ঝিঝি পোকাও ডাকছে না । উত্তরার এই এলাকাটা একটু বেশি নির্জন । এখনও খানিকটা গাছ পালা আছে । বাড়ি ঘর গুলোও ফাকা ফাকা হয়ে আছে । শরের শেষ মাথায় একদম ! লিলি দাড়িয়ে পড়লো । ওর ভেতরে মন বলছে সামনে দিয়ে বিপদ আসছে । ওকে পালাতে হবে ! কোন দিকে যাবে !
-লিলি !
তীক্ষ স্বরে কেউ ডেকে উঠলো ! এক ঝটকাতে পেছনে ফিরে তাকালো । অন্ধকার থেকে একটা মেয়ে বের হয়ে এল । কালো আটসাট পোষাক পরা মেয়েটার এক হাতে একটা খোলা তরবারি ! অন্য হাতে একটা কালো রংয়ের চাবুক দেখা যাচ্ছে !
লিলির মনের ভেতরে থেকেই কেউ যেন বলে উঠলো পালাও ! এখনও পালাও !
গতকালকের আগে হলেও লিলি কোন চিন্তা করতো না । ওকে ধরতে পারে এমন ক্ষমতা কারো ছিলো না । কিন্তু আজকে ও একেবারে ক্ষমতা হীন । লিলি দৌড়াতে যাবো ঠিক তখনই সামনের মেয়েটি নিজের হাতের চাবুকটা তুলে ওর দিকে চালালো । নিজেকে বাঁচানোর জন্য ও দুরে যেতে চাইলো কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে । ওর একটা একটা হাতে এসে লাগলো চাবুকটা !
ঠিক যেন কাটা বিঁধে গেল । তীব্র একটা যন্ত্রনা বোধ করলো । অন্য হাতটা দিয়ে যখন ও চাবুকের মাথাটা সরাতে যাবে তখনই লক্ষ্য করলো অন্য আরেকটা চাবুকের মাথা একে অন্য হাতটা আটকে ফেলল । লিলি এবার সত্যিই সত্যিই ভয় পেল । তীব্র ভয়ের কারনে হাতের যন্ত্রনা ওর কাছে ঠিক মত অনুভুত হল না আর !
কালো আটসাট পোষাক পরা মেয়েটি ইংরেজিতে বলল
-তোমাকে আমরা অনেক দিন ধরেই খুজছি ! আর পালাতে পারবে না তুমি !
-আমি কারো ক্ষতি করি নি……।
লিলি বলার চেষ্টা করলো । মেয়েটি যেন ওর কথা শুনে বেশ হাসি পেল । তারপর বলল
-আজকে কর নি কিন্তু সামনে করবে ! তোমার ভেতরে যে আছে সে করবে ।
-আমি…..
লিলি অনুভব করলো ওর সময় শেষ । সামনের মেয়েটা পাশে আরও একটা লোক চলে এসেছে । তার কাছে চাবুকের আরেক মাথা দিয়ে মেয়েটি খোলা তরবারি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে । এবারই ওর সময় শেষ ।
লিলির চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এল । ওকে এখন মরতে হবে । ওকে মরতেই হবে ! লিলি চোখ বন্ধ করে ফেলল । তারপর ওর মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করলো । কেমন ছিল যেন সে !
কই কিছুই তো মনে পড়ছে না !
কিন্তু তারপর মনে হল কিছু একটা সমস্যা হয়েছে । ওর একটা হাতের চাবুকের টানটা ঢিল হয়ে এল ! চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে সামনের মেয়েটা থেমে গেছে । ওর অন্য পাশে যে লোকটা আরেকটা চাবুক ধরে ছিল সে মাটিতে পড়ে আছে । কেউ কিছু বুঝতে পারছে না !
লিলি তখনই দেখলে সেই যুবক এসে হাজির হল যেন অন্ধকার থেকে । ওকে দেখে লিলি যতটা অবাক হল সামনে খোলা তরবারি হাতে মেয়েটা তার থেকেও বেশি অবাক হল !
-রাফায়েল !
-ইভাঙ্কা ! কেমন আছো বেইবি ! লং টাইম নো সি !
-রাফায়েল !
সামনের মেয়েটা যার নাম সম্ভবত ইভাঙ্কা, বলল
-এখানে তোমার কোন কাজ নেই । এটা আমাদের ব্যাপার !
রাফায়েল যেন খুব মজা পেল । বলল
-উহু ! এখানেই আমার কাজ ! ভালই ভালই লিলিকে ছেড়ে দাও ! আমি ওকে নিয়ে চলে যাই । কারো কোন ক্ষতি হবে না । কিন্তু যদি ওর ক্ষতি করতে চাও তাহলে ফল ভাল হবে না !
ইভাঙ্কা বলল
-আমাদের ভেতরে ডিল হয়েছে । আমরা কেউ কারো পথে আসবো না ! তুমি আমাদের পথে আসছো !
-ভুল ! তোমরা আমার পথে আসছো !
-দেখ এর ফল কিন্তু ভাল হবে না ! পুরো এজেন্সি কিন্তু তোমার পেছনে লাগবে !
-তোমার এজেন্সিকে আমি ভয় পাই ? এটা তুমিও জানো ! আমি আবারও বলছি লিলিকে ছেড়ে দাও ! আর কোন ঝামেলা চাই না !
-একে ছেড়ে দিবো !
ইভাঙ্কার ভেতরে যেন খুনির জোক চেপে গেল । মেয়েটি তার তরবারি উপরে তুলে লিলির দিকে লাফ দিল । রাফায়েল নামের ছেলেটা তখনও বেশ খানিকটা দুরে । কোন ভাবেই সম্ভব না যে সে ইভাঙ্কাকে আটকাতে পারবো । লিলির মনে হল ওর সময় এবার আসলেই শেষ হয়েছে । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলো লাফ দেওয়া ইভাঙ্গা যখন ওর দিকে এগিয়ে আসছিলো তখনই মাঝ পথেই আটকে গেল । শূন্যের ভেসে রইলো কিছু সময় । লিলির মনে হল কেউ যেন শূন্য থেকেই ওকে আটকে রেখেছে । তারপর চোখের সামনেই ছুড়ে ফেলে দিলো কিছুটা দুরে ।
অন্য হাতের চাবুক ধরে রাখা লোকটাকেও কেউ যেন শূন্যে তুলে ছুড়ে ফেলে দিল । লিলি কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো । রাফায়েল কখন ওর কাছে চলে এসেছে ও লক্ষ্যই করে নি । ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-তুমি ঠিক আছো ?
-হ্যা ? হ্যা !
-তোমার হাত দিয়ে রক্ত পরছে !
তাকিয়ে দেখলো আসলেই রক্ত পড়ছে ।
রাফায়েল বলল
-চল আমাদের এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ ! দুরে তাকিয়ে দেখি ইভাঙ্কা মাটি থেকে উঠে দাড়িয়েছে । রাফায়েলের দিকে তাকিয়ে বলল
-এর ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে রাফায়েল !
-দেখা যাবে !
তারপর আর দাড়ালো না । বলতে গেলে লিলিকে এক প্রকারকোলে করে নিয়ে দৌড়াতে লাগলো । কিছু লিলি পেছন তাকিয়ে দেখলো ইভাঙ্কা কিংবা কেউ ওদের পিছু নিচ্ছে না । দাড়িয়ে রয়েছে ! লিলি বলল
-ওরা কেউ আসছে না ।
-এখন আসবে না ওরা ! কারন এখন ওদের রিসোর্স কম । ওরা কেবল তোমার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলো । আমাকে আশা করে নি । কিন্তু পরের বার যখন আসবে তখন আমার প্রস্তুতি নিয়ে আসবে ! তার আগেই আমাদের এখন থেকে চলে যেতে হবে !
-তুমি কে ?
-তোমার মতই কেউ ! চল ঐ যে আমাদের বাহন !
লিলি তাকিয়ে দেখলো একটা কালো রংয়ের বাইক রাস্তার উপর দাড় করানো রয়েছে । রাফায়েল ওখানে উঠতে বলল
-শক্ত করে ধরবে । আমাদের অনেকটা পথ যেতে হবে । সেই চট্টগ্রাম !
-এতো দুর কেন ?
-তোমাকে কারো কাছে রেখে আসবো !
-কে ?
রাফায়েল কোন কথা না বলে কেবল হাসলো । রহস্যময় হাসি ! লিলির এতো কিছুর পরেও রাফায়েলের হাসিটা কেন জানি ভাললাগলো । খানিকটা ভরশা দেওয়ার মত হাসি । এমন একটা হাসি যেটা দেখলে সকল দুঃচিন্তা চলে যায় । মনে হয় যে এ থাকলে কোন ভয় সমস্যা হতে পারে না!!

হিপি সর্দার নিজের হাতটা আরও একটু উচু করে করলো । মুখ অদ্ভুদ একটা অদ্ভুদ কিছু বলেই চলেছে । তার পেছনের দাড়ানো মানুষ গুলোও একই স্বরে একই কথা বলেই চলেছে । কারো উপাসনা করে চলেছে । কাউকে ডাকছে তারা ! কারো উপস্থিতি আহবান করেই চলেছে । আজকে তাদের বিগ ডে ! আজকে এই পৃথিবীতে মুলাকের আগমন ঘটবে ! আজকে মুলাক আসবে এই পৃথিবীতে । নিজের উত্তরসুরী রেখে যাবে !
হিপি সরদার মাথা নিচ করে ইশারা করলো । ডান দিকের লোকটা ভেতরে চলে গেল । ফিরে এল ঠিক তারপরই । সাথে একজন মেয়ে । কম বয়সী ! সবে মাত্র ১৮ পরেছে । মেয়েটাকে তারা খুজে পেয়েছে কদিন আগেই । নাম তার ক্যাথরিন । কদিন আগে ঘর ছেড়ে চলে এসেছে । তার নাকি তার এশিয়ান বাবার শাসন ভাল লাগে না । হিপি সর্দার তাকে সাহায্য করেছে । ক্যাথরিন নিজ ইচ্ছাতেই রাজি হয়েছে নিজের ভেতরে মুলাকের উত্তসূরী ধারন করতে । এ যে এক অপার সম্মানের ব্যাপারে এটা সে বুঝতে পেরেছে । তাকে বুঝাতে হিপি সর্দারের খুব একটা বেগ পেতে হয় নি । ঘর পালানো মেয়ে গুলো মানষিক ভাবে ভারসাম্য থাকে না । তাদের কে যা বুঝানো হয় তারা তাই বুঝে যায় সহজে !
ক্যাথরিনকে কিছু খাওয়ানো হয়েছে । সে ঘোরের ভেতরের চলে গেছে । কেবল কিছু আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে । কিছু মানুষ একই ধরনের কিছু শব্দ বলেই চলেছে । ক্যাথরিনকে উপুর করে একটা বেদীর উপর শোয়ানো হল । ক্যাথরিন ছেতনা অন্য জগতে চলে গেছে । কেবল অনুভব করতে পারছে ওর দিকে কেউ এগিয়ে আসছে ।
পুরোটা সকাল লিলি ঘুমিয়ে কাটালো । দুপুরের শুরুতে ঘুম ভাঙ্গলেও বিছানা থেকে উঠতে মন চাইছে না তার । বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লিলির সব সময় সব কাজ একা একাই করতে হয়েছে । সকাল বেলা নিজেকেই উঠতে হয়েছে নিজের বিছানা নিজেই গুছিয়েছে নাস্তা নিজেই কিনে এনেছে অথবা নিজেকঐ রান্না করতে হয়েছে । এমন কি যত ঝামেলায় সে পরেছে সেগুলো থেকেও নিজেই বের হয়েছে কারো সাহায্য ছাড়া ! রোমারির মত কিছু মানুষ অবশ্য ওর সাহায্যের জন্য ছিল তবে তারা কেবল মাত্রই তাকে বলে দিতো কি করতে হবে । কোথায় পালিয়ে থাকতে হবে । গতদিন রাফায়েলকে দেখে প্রথমবারের মত মনে কেউ এখনও একজন রয়েছে যে ওর জন্য লড়াই করেছে ।
নিজের ভেতরে একটা পরিবর্তন সে লক্ষ্য করছিলো । গতকাল রাতের পর থেকেই । মাত্র একদিনের পরিচয়ের একজন মানুষকে সে এর আগে এতোটা বিশ্বাস করে নি । বিশেষ করে ওর মন রাফায়েলকে বিশ্বাস করতে বলছে । বারবার মন বলছে যে এই মানুষটার দ্বারা ওর কোন ক্ষতি হবে না । বরং এই মানুষটা ওকে সব রকম বিপদ থেকে উদ্ধারের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে । প্রথম দেখাতে রাফায়েলের কাছ থেকে দুরে যেতে বললেও এখন মনে হচ্ছে ছেলেটার কথা শোনার দরকার ছিল !
গতকাল রাতেই বাইকের লম্বা জার্নি শেষ করে ওরা চট্রগ্রামের একটা জায়গাতে এসে থেমেছে ওরা । শহরের ঠিক কাছে নয়, পাহাড় ঘেরা টিলার উপর একটা একতলা বাড়ি । বাড়িটার সম্ভত রাফায়েলের নিজের । লিলি জানে না তবে জায়গা বেশ নিরাপদ সেটা বুঝতে পারছে ।
লিলি বিছানায় শুয়ে আছে সেই সকাল থেকেই । ঘুম ভাঙ্গার পরেও আরামদায়ক বিছানাতে শুয়ে আছে । উঠতে ইচ্ছে করছে না । মনে হচ্ছে আরও কিছুটা সময় শুয়ে থাকে । নিশ্চিন্তে আরও কিছুটা সময় !
দরজার শব্দ হতেই লিলি সেদিকে তাকালো । চিন্তায় ছেদ পড়লো । তারপর বলল
-দরজা খোলা !
দরজা খোলার আওয়াজ হল । তাকিয়ে দেখে রাফায়েল দরজার ঠেলে ভেতরে ঢুকলো ।
মুখে একটা হাসি লেগে আছে । ওর দিকে তাকিয়ে আরও একটু যেন হাসলো । বলল
-ঘুম হয়েছে ভাল ?
-হুম !
-দুপুরের খাওয়া তৈরি ! সকালে তো কিছুই খেলে না !
-সারা রাতের জার্নিতে ছিলাম তো !
-এখন ফ্রেশ হয়ে নাও ! দুপুর খাবার খেতে হবে !
-আপনি বলছিলেন কার সাথে আমাকে দেখা করাতে নিয়ে যাবেন ?
-হ্যা ! বলেছিলাম
-কে ?
-সেটা রহস্যই থাকুক ! আগে আমাদের অনেক কিছু নিয়ে কথা বলতে হবে ! খাওয়া দাওয়া করি । তারপর কথা হবে । ওকে ?
রাফায়েল আর কোন কথা না বলে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল । লিলি আর কিছু জনাতে চাইলো না ! বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে হাটা দিল । নিজের কাছে মনে হতে লাগলো সামনের ওর জীবনে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে !
-তার মানে আপনি বলতে যাচ্ছে রোমারি আমার বন্ধু ছিল না ?
-না ! সে তোমার বন্ধু ছিল না ! তবে সে তোমার শত্রুও ছিল না । বলতে পারো তোমার কাছে তার স্বার্থ ছিল বলেই সে তোমাকে সাহায্য করছিলো । আরও ভাল করে বলতে গেলে নিজেকে সাহায্য করছিলো !
লিলি খানিকটা হতবুদ্ধি হল । লিলির চেহারার ভাব দেখে রাফায়েল একটু হাসলো । খাওয়া দাওয়ার শেষ করে ওরা রাফায়েলর বাসার বারান্দায় বসেছে । লিলি সামনের খোলা পাহাড়ি সবুজ দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । শেষ করে সে এরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের দিকে মন দিয়েছে সেটা সে বলতে পারবে না । ওর পুরো জীবনটা কখনই এমন ছিল না । সারাটা সময় কেবল পালিয়ে চলা, প্রকৃতির দিকে তাকানোর সময় কোথায় !
রাফায়েল বলল
-ওদেরকে বলে ইয়োলো উইচ ! এদের কাজ হচ্ছে কালো জাদু আর নেগেটিভ যত শক্তি আছে সেগুলো নিয়ে উপাসনা করা, এদের শক্তি চুরি কিংবা অন্য কোন উপায়ে গ্রহন করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করা ! আর কালো শক্তি সংগ্রহের সব থেকে সহজ সোর্সটা হচ্ছে ডিম্যান ! তোমার মত যারা !
-আপনি বলতে চাচ্ছেন ডিমোন ?
-ঠিক ডিমোন না তবে ডিমোন শব্দটা এই ডিম্যান থেকেই এসেছে বসে অনেকের ধারনা করা হয় । ডেভিল আর ম্যানের সংমিশ্রনে শব্দটা তৈরি ! তোমার মা ছিলেন একজন মানুষ কিন্তু বাবা কোন মানুষ ছিল না । এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে তোমার অস্তিত্ব !
লিলি কি বলবে খুজে পেল না । এতোটা দিন সে কেবল পালিয়েই বেরিয়েছে । নিজের ব্যাপারে কোন কিছুই না জেনে । রোমারির মত একজন ওকে বুঝিয়েছিলো ছোট বেলাতে ওর উপর কোন অশরীর আসর হয়েছিলো । সেখানে থেকেই ও এমন !
রাফায়েল বলতে শুরু করলো !
-তো যা বলছিলাম । ঐ ইয়োলো উইচদের কাজই হচ্ছে তোমার শরীর থেকে নেগেটিভ শক্তি গুলো সংগ্রহ করে নেওয়া এবং পরবর্তিতে নিজেদের বিভিন্ন উপাসনাতে কাজে লাগানো !
-কিভাবে ?
-তোমাকে আঘাত করা ঐ হোয়াইট চাবুক ! আর রিংটা ! ওগুলো খুবই শক্তিশালী হয় । তোমার শরীর থেকে নেগেটিভ এনার্জি ঐ দুটো জিনিসে গিয়ে জমা হয় ! ঐগুলো তোমার শরীরের ভেতরে যে ডিমোনটা আছে সেটার শরীর থেকে চুরি করে নেওয়া শক্তি ! খুবই শক্তিশালী !
লিলি কি বলবে খুজে পেল না । চুপ করে রইলো । তারপর বলল
-আমার কি এখান থেকে মুক্তি নেই ?
রাফায়েল এই প্রশ্নটার কি জবাব দিবে খুজে পেল না । লিলির মনে হল এই প্রশ্নের জবাব রাফায়েলের কাছে নেই । তবে রাফায়েল আবারও বলা শুরু করলো !
-ডিম্যানরা দুই ধরনের হয় । এক, তো মানুষ ইচ্ছে করে নিজের শরীরের ভেতরে অন্য শক্তিকে ঢুকতে দেয়, স্বইচ্ছাতে নিজের আত্মার উপার নিয়ন্ত্রন আনতে দেয় । এই জন্য এরা একবার যদি পরিপূর্ন ভাবে ডিম্যান হয়ে যায় তাহলে তাদের ফিরিয়ে আনা বেশ কষ্ট সাধ্য, তবে সেটা সম্ভব । কিন্তু যারা তোমার মত ইনবর্ণ তাদের বেলাতে ব্যাপারটা ভিন্ন । তোমাদের যেহেতু কোন চয়েজ থাকে না ওটা জন্ম থেকেই তোমাদের সাথে বলতে গেলে তোমার আত্মার সাথে সংযুক্ত । তোমার অস্তিত্ব ছাড়া তোমার ঐ ডিম্যান সত্ত্বার কোন অস্তিত্ব নেই ঠিক তেমনি ভাবে সেটার ছাড়া তোমার কোন অস্তিত্ব নেই !
-তার মানে আমার কোন মুক্তি নেই ?
-এখানেই কিন্তু ট্রিকস ! যারা স্ব-ইচ্ছাতে এমন হয় তাদের আসলে কোন জোর থাকে না । ঐ শক্তি তাকে যেভাবে চলতে বলে সে ভাবেই চলে কিন্তু তোমার ব্যাপারটা ভিন্ন ! তুমি চাইলেই তোমার ভেতরের ঐ শক্তির পূর্ন নিয়রন্ত্রন নিতে পারো । তুমি যেভাবে চাও সেভাবেই ।
-কিন্তু আমি যে পারি না ! আমার নিয়ন্ত্রনে থাকে না !
রাফায়েল বলল
-এখন থাকে না তবে একটা সময়ে থাকবে । বয়স যত বেশি হবে তোমার তত তোমার জোর বাড়বে । কিন্তু তোমার নিজের মনটা অবশ্যই পিয়র থাকতে হবে । আর সেই সাথে এই পুরো সময়টা নিশ্চিত করতে হবে যেন তোমার ভেতরের ঐ নেগেটিভ ফোর্স যেন তোমার উপর নিয়ন্ত্রন নিতে না পারে !
-এটাই কথা । আমি ওটার সাথে পেরে উঠি না ! এই দেখুন গত পরশুদিন রোমারির কাছে আমি গিয়েছিলাম । আজকের ভেতরে দাগ গুলো অনেকটাই মুছে যেতে শুরু করেছে । এটা হয়েছে আমি গত কাল রাতে একেবারে মৃত্যুর মুখে চলে গেছিলাম । শরীর খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো । আমি এখন কি করবো ?
-একটা উপায় আছে অবশ্য ।
-আছে ?
রাফায়েলকে খুব বেশি খুশি মনে হল না । তার মানে উপায়টা খুব বেশি সুখকর না । বলল
-তবে সেটা অনেক বেশি কঠিন ! তোমার জন্য অনেক পেইনফুল হবে । এমন কি ঐ চাবুক আর গরম রিং থেকেও বেশি !
-কাজ হবে এতে ?
-হ্যা । হবে ! এটা এমন একটা উপায় যেটাতে তোমার ভেতরের আদরাত কোন ভাবেই বের হতে পারবে না ! কোন ভাবেই না !
-তাহলে আমি এটা করতে চাই ।
-কিন্তু তুমি সেটা সহ্য করতে পারবে না ! আগেই বলেছি সেটা….
লিলি একটু দৃঢ় কন্ঠেই বলল
-আমি এটা করতে চাই । যে কোন মূল্যেই ! আপনি জানেন না আমি কি পরিমান ভয়ে ভয়ে আমার এই পুরো জীবনটা পার করেছি । অন্য কারো কাছ থেকে যতটা না ভয় পেয়েছি তার থেকেও বেশি ভয় পেয়েছি নিজেকে ! নিজের ভেতরের এই পশুটাকে ! যদি এমন উপায় থাকে তাহলে আমি সেটা প্রয়োগ করতে চাই । যে কোন মূল্যেই !

ইভাঙ্কা নিজের ল্যাপটপের সামনে বসে আছে । স্কাইপিতে সেই কালো পোষাক আর সাদা কলারের ভদ্রলোককে দেখা যাচ্ছে গম্ভির মুখে ! তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে ইভাঙ্কার কাজে খুব একটা সন্তুষ্ট না ! একটু আগে সে গত দিনের কথা সব খুলে বলেছে ! তার যে কিছুই করার ছিল না সেই ব্যখ্যা সহ বলেছে । তবুও ভদ্রলোক খুশি হন নি !
তিনি বললেন
-এমন তো তোমার কাছ থেকে আশা যায় না ।
-রাফায়েল না আসলে এমন টা হত না ।
-রাফায়েল কিভাবে এল ওখানে ?
-আমি জানি না । তবে এবার কেবল লিলির পেছনে গেলেই হবে না । রাফায়েলের পেছনে যেতে হবে !
-বোকার মত কথা বল না । রাফায়েলের পেছনে যেতে হলে আমার পুরো এজেন্সির সবাইকে লাগাতে হবে । তাও তাকে কাবু করতে পারা যাবে কি না সন্দেহ !
-কিন্তু ঐ মেয়েটা রাফায়েলের সাথে আছে ।
-খুব বেশি দিন থাকবে না । রাফায়েল কোন দিন কাউকে সারা জীবন কাউকে সাথে রাখে না, এটা তার স্বভাব না । আর আমাদের কাছে খবর চলে আসবে রাফায়েল কার কাছে মেয়েটাকে রেখে আসবে । তোমার কাছে খবর চলে যাবে ! তৈরি থাকো । সব প্রস্তুতি নিয়ে থাকো !
জি, স্যার !
-মনে রেখো লিলিও কিন্তু অনেক শক্তিশালী একটা এনটিটি ! সরাসরি আদরাতের সৃষ্টি ! ওকে কাবু করতে হবে ওটার হিউম্যান ফর্মে থাকা অবস্থাতেই । যদি কোন ভাবে লিলি ডিম্যান ফর্মে চলে আসে তাহলে সেটাকে আটকানো আমাদের জন্য অনেক কষ্ট সাধ্য হয়ে যাবে !
-জি স্যার আমরা জানি !
ইভাঙ্গা ল্যাপটপের মনিটর বন্ধ করে দিল । মনে মনে সামনের দিনের পরিকল্পনা করে দিল । রাফায়েলকে ছেড়ে দিতে হবে দেখে মনের ভেতরে একটা সুপ্ত রাগ প্রবাহিত হল তবে নিজের রাগকে সে নিয়ন্ত্রন করে নিল । কারন তার বস তাকে যা বলেছে তার ভেতরে সত্যতা আছে । রাফায়েলকে ধরার চেয়ে ঐ মেয়ের পেছনে যাওয়া টাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে !
লিলির বুকের ভেতরে একটু একটু ভয় করছে । রাফায়েল ওকে বলেছিল এটা হতে যাচ্ছে ওর জীবনের সব থেকে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা । রাফায়েল রাজিই ছিল না কিন্তু একান্ত লিলির ইচ্ছাতেই সে রাজি হয়েছে ।
গত সাত দিন ধরেই ওর উপর আস্তে রিচুয়্যাল শুরু হয়েছে । আস্তে আস্তে ধীরে !
রাফায়েলের বাড়ির ব্যাজমেন্টেই ব্যবস্থাটা করা হয়েছে । বেশ বড় বেজমন্টটা । সেটার ঠিক মাঝেই একটা বড় সার্কেল তৈরি করা হয়েছে একটা অদ্ভুদ নকশা আকা ।
প্রথমদিন লিলির একটু অদ্ভুদ লাগছিলো । এভাবে পাদ্ম আসন করে হয়ে বসে থাকাটা কেমন যেন লাগছিলো । কিন্তু যখন রাফায়েল নিজের হাত কাটতে দেখলো তখন একটু নড়ে চলে বসলো ! রাফায়েলের হাতের রক্ত গিয়ে পড়লো সেই নকশার উপর । এবং লিলি অবাক হয়ে দেখলো রক্তটা আস্তে আস্তে পুরো নকশা টা ঘিরে ফেলল । লিলি তখনই বুঝতে পারলো কিছু একটা হচ্ছে ওর ভেতরে । ওর ভেতরের সেই পশুটার আওয়াজটা শুনতে পাচ্ছে সে !
রাফায়েল বলেছিল প্রথম দিন গুলোতে কোন সমস্যা হবে না । কেবল ধৈয্য ধরে থাকতে হবে । কিন্তু একেবারে শেষ দিনে সব থেকে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটবে ।
রাফায়েল মন্ত্র পড়তে শুরু করলেই লিলি আস্তে আস্তে ঘোরের ভেতরে চলে গেল । অন্য কোন এক জগতে চলে গেল যেন । যখন কাজটা শেষ হল লিলি নিজের শরীরে একদম শক্তি পাচ্ছিলো না । রাফায়েল ওকে কোলে নিয়ে বিছানাতে শুইয়ে দিল । পরদিন সকালে উঠে লক্ষ্য করলো ওর সারা শরীরে কতগুলো অস্পষ্ট উল্কি, ট্যাটু দেখা দিচ্ছে ।
রাফায়েলকে জিজ্ঞেস করতেই রাফায়েল বলল
-এটাই হচ্ছে তোমার শরীরের প্রটেকশন । বলতে পারো এটা একটা লক কিংবা জাল যেটা তোমার ভেতরে ঐ পশুটাকে তোমার ভেতরেই আটকে রাখবে । আগামী দিন গুলোতে এই উল্কি গুলো আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠবে ! এবং এটা একবারই । এটা কোন দিনই মুছে যাবে না যদি তুমি না চাও !
-আমি না চাইলে মানে ?
-মানে মনে কর তুমি চাইলে তোমার ভেতরের আদরাতটা বের হয়ে আসবে । তখন এই উল্কি গুলো আস্তে আস্তে মুছে যেতে থাকবে ! আবার যখন চাইবে তুমি তাকে চলে যেতে বলবে তখন এই গুলো ফিরে আসবে !
এরপর আস্তে প্রতিদিন রিচুয়্যাল চলেছে । এবং আস্তে আস্তে ওর শরীরের ট্যাটু গুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । আস্তে শেষ দিন এসে হাজির । আজকে লিলির জন্য সব থেকে কঠিন পরীক্ষা ।
রাফায়েল ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-তুমি নিশ্চিত তো ? আরেকবার ভেবে দেখ ! কারন একবার যদি শুরু হয় তাহলে কিন্তু এটা আর থামবে না ,
লিলি লম্বা একটা দম নিল । তারপর বলল
-আমি নিশ্চিত ।
এরপরেই লিলির মুখের ভেতরে কিছু কাপড় গুজে দিয়ে সেটা মেডিক্যাল টেপ দিয়ে বেঁধে দেওয়া হল । রাতের বেলা পাহাড়ি এলাকাটা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায় । সেখানে চিৎকার অনেক দুর পর্যন্ত যাবে এই জন্যই এই ব্যবস্থা !
তারপর ওর গলার কাছেও আংটা দিয়ে আটকে দেওয়া হল । লিলি এখন পুরোপুরি বন্দী । বিন্দু মাত্র নড়া চড়ার ক্ষমতা নেই অথবা একটু চিৎকার করার উপায়ও নেই ।
লিলি অপেক্ষা করতে লাগলো । ওর চারিদিকে আগুন জ্বলছে । ওর চোখ গুলো খোলা ! তবে সেটা সে বন্ধ করতে চাইছে কিন্তু পারছে না । কারন বন্ধ করলেই ওর ভেতরের একজনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে । সেই পশুটা ওকে চিৎকার করে বলার চেষ্টা করছে যেন রাফায়েল যেটা করছে সেটা যেন ও করতে না দেয় ।
লিলি বুঝতে পারছে ।
ঠিক সেই সময়ই লিলির কানে একটা মৃদু আওয়াজ এল । রাফায়েল কিছু মন্ত্র পড়ছে । আগুন গুলো যেন একটু বেশি উজ্জল্য দিয়ে জ্বলা শুরু করেছে । আস্তে আস্তে আওয়াজটা বাড়ছে । লিলি চোখ বন্ধ করে ফেলল । তখনই বুঝতে পারলো ও ভেতরের পশুটা চিৎকার করছে । তার আওয়াজটা পছন্দ হচ্ছে না ।
তারপরেই আওয়াজটা থেমে গেল হঠাৎ করেই । এরপর রাফায়েল কিছু একটা বলে উঠলো । তারপর বলে চললো । লিলির কাছে প্রথমে কিছু বুঝতে না পাড়লেও একটু পরেই রাফায়েলের মুখ থেকে বের হওয়া কথা গুলো বুঝতে শুরু করলো । এই পৃথিবীর কোন ভাষা এটা নয় তবে সে পরিস্কার ভাবেই বুঝতে পারছে ।
রাফায়েল কাউকে ডাকছে । গভীর ভাবে ডাকছে ।
তারপর লিলির শরীর উপর পানি জাতীয় কিছু এসে পড়লো ।
রাফায়েল ছিটিয়ে দিয়েছে তখনই মনে হল লিলির শরীর যেন কেউ ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে ফালি করে চিরে দিচ্ছে । লিলির মুখ দিয়ে চিৎকার বের হতে চাইলো কিন্তু কোন আওয়াজ বের হল না !
চাবুকের আঘাত এই যন্ত্রনার কাছে কিছু না !
লিলির কেবল মনে হচ্ছে সে মারা যাচ্ছে । তার শরীর সমস্ত কিছু তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে । আলাদা হয়ে যাচ্ছে ! লিলি চিৎকার করেই চলেছে কিন্তু সেই চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না ।
লিলি যখন আবার ঘুম থেকে উঠলো নিজেকে ঠিক মত চিনতে পারলো না । ও জানে কত সময় ও ঘুমিয়েছে । ঐদিনের পর আর কিছুই ওর মনে নেই । ওর কোন হুস ছিল না । কেবল মনে ছিল ও নিঃশ্বাস নিচ্ছে ।
লিলি তাকিয়ে দেখে বাইরে রোদ উঠেছে । পুরো ঘরটা আলোকিত হয়ে গেছে । নিজের শরীর দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো । ওর কোন কাপড় নেই । কম্বলের নিচে বাকি অর্ধেকটা শরীর ঢাকা পরে রয়েছে তবে উপরের পুরো শরীরা যেন অন্য কারো । ওর পুরো শরীর জুড়ে অদ্ভুদ কোন অক্ষরে আকাঝুকি গুলো একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । ও উঠে দাড়ালো । কেবল উপরের নয় পুরো শরীরেই এমন । তার সব আয়নাতে নিজেকে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো । ওকে দেখে মনে হচ্ছে ওর পুরো শরীরেই ট্যাটু আঁকা ! কোন দক্ষ শিল্পী যেন ওর পুরো শরীর জুড়েই নানান আল্পনা একে দিয়েছে । আরেকটা জিনিস ওর চোখে পড়লো । ওর গলাট কাছে একটা ব্যান্ড পরা । হাত দিয়ে দেখলো হাত দিয়েই বুঝলো এটা কোন ব্যান্ড নয় বরং স্টিলের কলার । কলারে সরু কিন্তু সেখানে অদ্ভুত কোন ভাষাতে কিছু লেখা আছে ।
দরজা শব্দ হল !
লিলি পেছন ফিরে তাকালো । দেখলো রাফায়েল ! ওর দিকে ঠিক তাকিয়ে নেই । কেন তাকিয়ে নেই সেটা লিলির বুঝতে কষ্ট হল না । লিলির ভেতরে কোন তাড়াহুড়া দেখা গেল না । অদ্ভুদ ভাবেই দেখা গেল না ।
রাফায়েল বলল
-ফ্রেস হয়ে বাইরে এসো ! তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে আছে ।
-কে ?
-সেটা গেলেই দেখতে পাবে !
-তার মানে আপনি আমাকে আর রাখতে চাইছেন না !
রাফায়েল ওর দিকে তাকালো । এই মাত্র কয়েকটা দিন । এর মাঝেই লিলি খুব ভাল করেই বুঝে গেছে যে এই একজন মানুষই আছে যার কাছে সে নিরাপদ থাকতে পারবে । এই ক’দিনেই রাফায়েলের প্রতি সে অন্য রকম একটা আকর্ষন বোধ করা শুরু করেছে । এমনটা এর আগে আর কারো প্রতি হয় নি ।
-ব্যাপারটা সেরকম না ! আমার সাথে আসলে কারো থাকার উপায় নেই । আমি একা চলি ! আমার সাথে সব সময় বিপদ লেগেই থাকে !
-থাকুক ! আমি আর কারো কাছে যেতে চাই না !
-ছেলে মানুষী করে না ! আসো ! তোমার সাথে আমার আরও কিছু কথা আছে !
লিলির মনটা খারাপ হল । জানতো এমন একটা দিন ঠিকই আসবে তবুও কেন জানি ওর মন খারাপ হল ! তৈরি হয়ে আবারও বারান্দায় গিয়ে হাজির হল । রাফায়েল আগে থেকেই সেখানে বসে ছিল । ও বসতে বসতেই বলল
-তোমার গলাতে এই লোকার রিংটা দেখছো না ?
লিলি হাত দিলো সেটা ! ওর মুখটা এখনও গম্ভীর হয়ে আছে । রাফায়েল বলল
-তোমার শরীর যে লেখা গুলো ফুটে উঠেছে সেটার সম্পর্ণ নিয়ন্ত্রন তোমার হাতে । অর্থাৎ তুমি যেমন ভাবে চাইবে এটা তোমার ভেতরের আদরাতকে আটকে রাখবে ! ও কোন ভাবেই এটা ভেদ করে বের হতে পারবে না । কিন্তু ও কিন্তু তোমার মনের উপর এখনও নিয়ন্ত্রন নিতে পরবে । আর সেই জন্যই এই রিংটা ! এটা থাকা মানে ওটা একেবারে ভেতরে বন্দী ! ঠিক আছে । তবে আমি চাইবো এটা যেন তোমার গলায় খুব বেশি দিন না থাকে । তুমি যত নিজের উপর নিয়ন্ত্রন নিতে শুরু করবে তত এই ফলার রিংটার প্রয়োজনীতা কম হবে ! কিন্তু এটা খুলে গেলে আদরাতের একটা চান্স থাকবে বাইরে আসা । বুঝলে ?
-হুম !
কিছু সময় কেউ কোন কথা বলল না । তারপর রাফায়েল বলল
-জানতে চাইছো না কার কাছে তোমাকে রেখে আসবো ?
-জানি না ! জানতে চাই না !
রাফায়েল বুঝতে পারলো লিলি কেন এমন কথা বলছে । ও অনেক কিছুই বুঝতে পারে তবে সব কিছু বুঝতে চাওয়া কিংবা প্রশ্রয় দেওয়া ওর সাজে না ! রাফায়েল বলল
-তোমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে !
লিলি অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল । মায়ের কথা শুনে অবাক হয়ে তাকালো রাফায়েলের দিকে । চোখের বিশ্ময় ।
রাফায়েল বলল
-হ্যা ! তোমার আসল মা । তুমি যাকে মা বলে জানো সে তোমার মা ছিল না । তোমার মায়ের কাছ থেকে তোমাকে সে চুরি করে নিয়েছিলো । সেই ছিল একজন ইয়োলো উইচ !
লিলি কথাটা নিতে বেশ খানিকটা সময় লাগলো ! ঠিক মত বিশ্বাস করতে পারছে না !
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই । চট্রগ্রাম কক্সবাজার সংযোগ সড়কের দিয়ে একেবেঁকে চলেছে ওদের গাড়িটা । ড্রাইভিং সিটের পাশে লিলি বসে বাইরের তাকিয়ে রয়েছে । বাইরে অন্ধকার হলেও লিলির আসলে দেখতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না । তবে সে কিছুই দেখছে না । তার ভাবনার জগতে অন্য কিছু খেলা করছে । এতোদিন জেনে এসেছে ওর মা মারা গেছে । কিন্তু এখন জানতে পারলো ওর মা আসলে মারা যায় নি । ওকে ছেড়ে চলে গেছে । ওকে ত্যাগ করে চলে গেছে ।
মা বেঁচে আছে এইভাবনা টা ওর মনে যতটা না আনন্দের অনুভুতি প্রকাশ করার দরকার তার থেকেও বেশি কষ্ট দিচ্ছে এই ভেবে যে ওর মা ওকে ত্যাগ করে চলে গেছে । ও যাই হোক যেমনই হোক মা তার সন্তানকে কিভাবে ফেলে চলে যায় !
ভাবনার ছেদ পরলো । ওদের গাড়িটা একটা লাল ইটের দুইতলা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামলো । বাইরে থেকেই বুঝা যায় বাড়ির মালিক বেশ অবস্থা সম্পন্ন মানুষ । এটা তার বাগান বাড়ি টাইপের কিছু সেটাও বুঝতে লিলির কষ্ট হল না । গাড়ি থেকে নামতেই লিলির কেমন একটা অদ্ভুদ অনুভুতি হল ।
এই বাড়িতে ওর মা থাকে । রক্তের সম্পর্কের মা যে ওকে জন্ম দিয়েছে !
ওদের আসতে দেখেই বাড়ির গেট খুলে একজন মানুষ বের হয়ে এল । ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলো । লিলি মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলো একভাবে !
মহিলাও লিলির দিকে তাকিয়ে রয়েছে একভাবে !

লিলি কি বলবে বুঝতে পারলো না । রাফায়েল অন্য দিকে তাকিয়ে আছে । লিলি তাকিয়ে আছে তার মায়ের দিকে ।
ওর নিজের মা !
চোখ দুটো একদম ওর মত । চুল টা অবশ্য কালো । ওর নিজের টা খানিকটা লালচে ধরনের !
লিলির মা ক্যাথরিন এগিয়ে এসে লিলিকে জড়িোয়ে ধরলো । তারপর বলল
-আই এম ভেরি সরি মাই চাইল্ড ! আমি ঐ সময় কি করবো বুঝে উঠতে পারি নি । আমার নিজের ভেতরে সেই বোধ বুদ্ধিও ছিল না । কিন্তু যখন বুঝতে শুরু করলাম তোমাকে আর খুজে পাই নি ।
লিলি দেখলো ক্যাথরিনের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে । সেটা যে একেবারে শত ভাগ নিঘাত সেটা লিলির বুঝতে কষ্ট হল না মোটেও । গতদিন থেকে পুষে রাখা রাগটা আর সে ধরে রাখতে পারলো না কোন ভাবেই । মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়লো ।
মা মেয়ের মিলনের বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেল । রাফায়েল তখন বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে । ওদের দিকে তাকিয়ে বলল
-আপনারা কখন রওনা দিবেন ?
ক্যাথরিন ফিরে তাকালো । লিলিও তাকালো রাফায়েলের দিকে । ক্যাথরিন বলল
-সপ্তাহ খানেকের ভেতরেই । কেবল লিলির কাগজ পত্র তৈরি হয়ে গেলেই । আর আমি লোক লাগিয়েছি । দুএক দিনের ভেতরেই সেটা হয়ে যাবে !
-লিলির পেছনে লোক লেগেছে । আমি আগেই বলেছি । তবে সম্ভবত তারা আপনাদের খোজ পাবে না । তবুও সাবধান থাকবেন !
-সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না ! আমার বাবা বেশ ক্ষমতাবান মানুষ ।
-আমি জানি ! তবে প্রতিপক্ষও কম শক্তিশালী নয় ।
ক্যাথরিন এবার রাফায়েলের কাছে এগিয়ে গেল । বলল
-আমি তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব সেটা বুঝতে পারছি না ।
-ধন্যবাদ দিতে হবে না । কেবল ওকে দেখে শুনে রাখবেন করবেন । তাহলেই হবে ! আমি তাহলে আসি এখন ! আর হয়তো দেখা হবে না !
লিলির একবার মনে হল রাফায়েলকে যেতে না দেয় । কিন্তু ওকে আটকানো যাবে না সেটা ভাল করেই জানে । রাফায়েল ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো কেবল । সেই হাসিতেই অনেক কিছু যেন বলা হয়ে গেল দুজনের ।
যখন রাফায়েল চলে যাচ্ছিলো তখন কেবল তাকিয়েই রইলো ওর চলে যাওয়া পথের দিকে । একা একা বড় হওয়া লিলির পুরো জীবনে অনেকেই সে ছেড়ে চলে এসেছে । কারো প্রয়োজনীয়তা কোন অনুভব করে নি । কাউকে ছেড়ে আসতেও খারাপ লাগে নি । কিন্তু আজকে লাগছে । মনে হচ্ছে দৌড়ে গিয়ে রাফায়েলের সাথে চলে যায় ।
-চল মা মামনি ! বাইরে ঠান্ডা !
লিলি শেষ বারের মত রাফায়েলের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে বাসার ভেতরে চলে গেল ।
লিলি চোখ খুলে তাকালো । চারিদিকে আবছায়া অন্ধকার । সেই সাথে মৃদু স্বরে কোথাও যেন ঢোল বাজছে । কেউ কিংবা কারা সেটা বাজাচ্ছে তালে তালে !
ও কোথায় আছে ?
খানিকটা চারিদিকে দেখার চেষ্টা করলো !
চারিপাশের দৃশ্য তার ঠিক পরিচিত মনে হল না । সে ঘুমিয়েছিলো তার মায়ের বাসায় কিন্তু ঘরটা অপরিচিত মনে হচ্ছে । চোখটা হাত দিয়ে পরিস্কার করতে গিয়েই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো সে সেটা করতে পারছে না ।
তখনই ওর পুরো শরীর জুরে একটা আতঙ্ক বয়ে গেল । ওর হাত বাঁধা !
আরও কিছু সময় পরে আবিস্কার ওকে ঘিরে অনেক গুলো মানুষ রয়েছে । তারা আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে আসছে ।
সবাই কিছু বলেই চলেছে । যেন কোন মন্ত্র একম ভাবে বলেই চলেছে ।
লিলি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো । কিন্তু পারলো না ।
কি হচ্ছে এখানে ?
কে এরা ?
লিলি মনে করার চেষ্টা করলো কি হয়েছে । গতকাল রাতে সে রাফায়েল চলে যাওয়ার পরেই সে মায়ের সাথে আরও কিছুটা সময় গল্প করছিলো । ঠিক তখনই খানিকটা অন্য রকম মনে হল ওর কাছে । ওর কাছে কেন জানি মনে হল একটু আগে রাফায়েলের সামনে ওকে যেরকম ভালবাসা দেখাচ্ছিলো এখন কেন যেন অন্য রকম লাগছে ।
তাহলে ওর মা কি ওকে পেয়ে খুশি না ।
নাকি অন্য কোন কারনে চিন্তিত !
লিলি ওর মাকে বলল
-আপনি ঠিক আছেন তো ?
কিছু একটা ভাবছিল । লিলির কথায় ফিরে এল । বলল
-হ্যা ঠিক আছি ! তোমার কথা ভাবছি !
-আমিও ঠিকই ছিলাম ।
তোমাকে একটা কথা বলব ?
-হ্যা বলুন !
-আমি তোমার মা । কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতির কারনে আমাকে তখন সেই কাজটা করতে হয়েছে । কিন্তু তোমাকে আমি কোন দিন নিজের মন থেকে একটা মিনিটের জন্য ভুলতে পারি নি । আমি সব সময় তোমাকে ভালবেসেছি ! সব সময় !
লিলি কোন কথা না বলে কেবল তাকিয়ে রইলো তার মায়ের দিকে ।
ক্যাথরিন বলেই চলল
-আমাদের জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন আমাদের কে এমন অনেক কাজ করতে হয় সেটা আমরা করতে চাই না । তার পরেও করতে হয় !
-আমি বুঝতে পারছি !
তারপর লিলি অবাক করে দিয়েই ক্যাথরিন ওকে জড়িয়ে ধরলো । লিলি অনুভব করতে করতে পারলো যে ওকে জড়িয়ে ধরে ওর মা কাঁদছে । লিলির মনটা সিক্ত হয়ে এল ।
রাতে ঘুমানোর সময় ক্যাথরিন লিলির কপালে একটা চুম খেল । তারপর বলল
-আমাকে ক্ষমা করে দিও তুমি ! কেমন !
-আপনি কেন এই কথা বারবার বলছেন !
কিছু বলতে গিয়েও ক্যাথরিন বলল না । আরেকবার লিলির কপালে চুম খেল ! তাররপ বলল
-আমি তোমাকে ভালবাসি ।
তারপর চোখে পানি নিয়েই ক্যাথরিন ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল । লিলি তার মায়ের আচরন ঠিক বুঝতে পারলো না ! তার একটু পরেই সে গভীর ঘুমে তলীয়ে পড়ে । আর চোখ খুলেই সে নিজেকে এখানে আবিস্কার করে !
তাহলে কি ওর মা !
এই জন্যই সে কাঁদছিলো !
লিলিকে শোয়ানো অবস্থা থেকে দাড় কড়ানো হল । শক্ত সামর্থ দুজন কালো আলখাল্লা পরা লোক ওকে তুলে ধরলো ! তারপর ওকে সিলিং থেকে নেমে আসা শিকলের সাথে ওর ওরক হাত দুটো আটকে দিল ।
লিলি চারিদিকে তাকাতে লাগলো ভীত হয়ে । সবাই কালো পোষাক পরে রয়েছে । সবাই যেন মুখ দিয়ে গুন গুন করে কি যেন পরেই চলেছে ।
কাউকে সে চেনে না । তবে এরা এখানে কি করতে এসেছে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না ।
ঐ তো সেই মেয়েটা ।
ঐদিন কালো তরবারি হাতে ওকে হত্যা করতে এসেছিলো সেদিন !
মেয়েটা আরও সবাইকে ছাপিয়ে ওর কাছে চলে এল । ওর কাছে এসে একটা ভয়ংকর হাসি দিয়ে বলল
-এবার তোমাকে আর কেউ বাঁচাতে আসবে না ! রাফায়েলও না !
লিলি কিছু বলতে গিয়েও বলল না । বললেও ওরা শুনবে না !
ইভাঙ্কা বলল
-তোমাকে আটকাতে বেশ কষ্ট হবে ভেবেছিলাম । কিন্তু আমাদের হয়ে রাফায়েল কাজটা অনেক সহজ করে দিয়েছে ! লুক এট দিস ট্যাটু !
ইভাঙ্কা শরীরের ট্যাটুর দিকে নির্দেশ করলো । ইভাঙ্কা বলল
-এমন কাজ কেবল রাফায়েলই করতে পারে । তুমি যদিও এখন সাধারন মানুষের মতই নিরাপদ তবে আমরা কোন রিক্স নিতে চাই না ! কারন ওটা এখনও তোমার শরীরের ভেতরে আছে । চাইলেই তুমি ওটা বের করতে পারো । মানুষের ক্ষতি করতে পারো । ওটা আমরা হতে দিতে পারি না !
রাফায়েল নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করছে । কিন্তু পারছে না । সামনের মানুষটাকে মনে হচ্ছে এখনই খুন করে ফেলতে । কিন্তু সেটা সে করতে পারে না । কোন রকমে বলল
-আপনি কিভাবে কাজটা করলেন ?
ক্যাথরিন কাঁদতে লাগলো । কোন কথা বলল না ।
-আপনি জানেন লিলি কি পরিমান কষ্ট সহ্য করেছে নিজের ভেতরে সেই পশুটাকে আটকে রাখার জন্য ! এমন অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যার জন্য সে নিজে দায়ী নয় আপনি দায়ী । আর আপনি কি ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলেন ! আমি আপনার উপর ভরশা করেছিলাম !
ক্যাথরিন বলল
-ওরা বলেছে ওরা ওকে মারবে না ! ওদের কি না উপায় আছে সেটা দিয়ে ওকে মুক্ত করবে !
-এমন কোন উপায় নেই । ওরা আপনাকে মিথ্যা বলেছে । ওরা কেবল লিলিকে মেরে ফেলবে ! আর কিছু না, স্রেফ মেরে ফেলবে ।
ক্যাথরিন মাথা নিচু করে কাঁদতেই লাগলো ! রাফায়েল বলল
-আপনি জানেন ওরা ওকে কোথায় নিয়ে যাবে ?
-না !
রাফায়েল আর সময় নষ্ট করলো না । বাইরে বর হয়ে এল । যদিও ঠিক ভরশা করতে পারছে না যে এবার ও লিলিকে বাঁচাতে পারবে কি না ! কত দুরে ওরা ওকে নিয়ে গেছে ওর জানা নেই ।
রাফায়েল সামনে একটা মাত্রই উপায় আছে । তবে সেটা প্রয়োগ করতে চায় না । কোন ভাবেই চায় না !
লিলির মনে হল ওরা মন্ত্রপাঠ শেষ হয়ে এসেছে । এখনই ওকে মেরে ফেলে হবে ! ঐ তো একজন তরবারি নিয়ে এগিয়ে আসছে । লিলির বুকের ভেতরে কেমন একটা উত্তেজনা অনুভব করলো । তাহলে এখানেই কি ওর জীবন শেষ হয়ে যাবে ! শেষ বারের মত ওর মায়ের মুখটা দেখতে ইচ্ছে করলো । ওর আসল মায়ের !
মনে মনেই ওর মাকে বলল, আম্মু আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি ! আমিও তোমাকে ভালবাসি অনেক ! কিন্তু ও জানে ওর মা এই কথাটা শুনতে পাবে না ! কোন দিন না !
ঠিক তখনই লিলির মনে হল ওর কানের কাছে কেউ কোন কথা বলল ।
লিলি !
লিলি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো এটা রাফায়েল !
আরও কিছু সময় পরে ও আবিস্কার করলো শব্দটা ওর মাথার ভেতর থেকে আসছে !
লিলি !
আবারো শব্দটা হল !
নিজের ভেতরে ফোকাস কর ! নিজের উপর নিয়ন্ত্রন নাও ! নিজের উপর । কোন ভাবেই ঐ আদরাট কে তোমার নিয়ন্ত্রন নিতে দিও না ! কোন ভাবেই !
লিলি ঠিক বুঝতে পারলো না কি বলতে চাইছে সে । কেনই বা এই কথা বলছে !
তারপরই কুট করে একটা আওয়াজ হল !
লিলি দেখলে ওর নিজের গলাতে যে রিংটা পরানো ছিল সেটা খুলে মাটিতে পরে গেল !
ঠিক তখনই লিলি বুঝতে পারলো কেন ওর ভেতর থেকে নিজের উপর নিয়ন্ত্রনের কথা বলছে রাফায়েল ! কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে । ওর ভেতরের কেউ বের হয়ে আসছে ।
সব কাজ শেষ । এবারই লিলিকে নরকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে । খোলা তরবারিটা হাতে নিয়ে ইভাঙ্গা ফুটন্ত হলি ওয়াটারে ডুবিয়ে দিল ! এবার লিলির দিকে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াবে তখনই অবাক করা একটা কান্ড হল । লিলির গলাতে যে রিংটা পরানো ছিল সেটা আপনা আপনি খুলে মাটিতে পড়ে গেল ।
লিলি তখনও সিলিংয়ের সাথে বাঁধা অবস্থাতেই রয়েছে । তবে একেবারে স্থির হয়ে গেছে চোখ বন্ধ করে আছে । ইভাঙ্গা অবাক হয়ে দেখলো ওর শরীরের উল্কি গুলো দ্রুত মুছে যাচ্ছে !
ইভাঙ্কা কি করবে বুঝতে পারলো না । ঘরেরই সবাই কেমন স্থির হয়ে গেছে । তারাও যেন কিছু বুঝতে পারছে না । ঘটনা এতো দ্রুত ঘটে যাচ্ছে যে তাদের হাতে যেন কিছুই নেই !
লিলিকে চোখ খুলতে দেখলো ইভাঙ্কা ! এবং যেটা ভয় করছিলো সেটাই হল । ঠান্ডা হলুদ চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে মেয়েটি ! সরাসরি ওর দিকে ।
জীবনে অনেক বারই এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছে ইভাঙ্কা, কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এসেছে কিন্তু আজকের মত অনুভুতি ওর এর আগে কোন দিন হয় নি । ইভাঙ্কার মনে হল আজকে ওকে এবং ওর সাথে থাকা বাকি সবঈ কাল সূর্যের মুখ দেখতে পারবে না ।
লিলি কিছু সময় একভাবে তাকিয়ে রইলো ইভাঙ্কার দিকে । ইভাঙ্কা লক্ষ্য করলো ওর দেহের উল্কি গুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে । ইভাঙ্কা নিজের তরবারিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলো । তারপর মন্ত্র পড়তে শুরু করলো ।
চারিপাশ থেকে সবাই এক সাথেই মন্ত্র পড়া শুরু করলো !
তুয়ায়ো সিয়ামা ডিকোস !
তুয়ামো সিয়ামা ডিকোস !
পুরো মাটির নিচের ঘরটা যেন গম গম করতে লাগলো ।
ইভাঙ্কা লক্ষ্য করলো লিলি মন্ত্রের আওয়াজে বিন্দু মাত্র বিচলিত হল না ! বাঁধা শিকলটা একটা ছুড়ে ফেলল । এটা থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠলো ওর শরীরে কি পরিমান শক্তি এসে হাজির হয়েছে । চোখের পলকে বাঁ দিকে কালো পোষাক পরা লোকটা কাছে গিয়ে হাজির হল । তারপর তাকে স্বজোরে ধাক্কা মারলো । এক ধাক্কা খেয়ে লোকটা গিয়ে পড়লো দশ বারো হাত দুরে !
এভাবে চোখের পলকে একেক জনের কাছ থেকে অন্য জনের কাছে গিয়ে হাজির হচ্ছে তার তাদের কে একেক ধাক্কাতে দুরে ফেলে দিচ্ছে
। চোখে পকলে কখন ইভাঙ্কার কাছে আসলো ইভাঙ্কা সেটা টেরই পেল না । হাতের তরবারি তোলার সময় পেল না । লিলি ইভাঙ্কার শরীরে ধাক্কা মারতেই ইভাঙ্কা বলতে গেলে উড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল পাশের দেওয়ালের সাথে ।
ইভাঙ্কার মনে তার জীবনে এতো জোরে কেউ ধাক্কা মারে নি । পাজড়ের কত গুলো হাড় ভেঙ্গেছে কে জানে ! হাত তুলতে গেল কিন্তু সেটা ঠিক মত নাড়াতে পারলো না । কিন্তু তার থেকেও বড় চিন্তার বিষয় ইভাঙ্কা দেখলো লিলি ওর দিকে এগিয়ে আসছে !
ওর সামনে দাড়িয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল
-তুই কি বলেছিলি ? আমাকে মেরে ফেলবি ? এতো সহজ ? আজকে সবার আগে আমি তোকে মেরে ফেলবো । আজকে তুই বুঝবি মানুষকে মারতে কত মজা !
এই বলেই একটা পা ইভাঙ্কার বুকের উপর তুলে দিতে গেল । কিন্তু ইভাঙ্কা তৈরিই ছিল । সরে গেল । তবে সরে যাওয়ার সময় বুঝতে পারলোওর পক্ষে আর খুব বেশি সময় টিকে থাকা সম্ভব না ! পরের লাথিটা সে আর এড়াতে পারলো না ।
আরও কিছু দুরে গিয়ে পড়লো । মুখ দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলো ।
ওর সময় শেষ হয়ে এসেছে বুঝতে অসুবিধা হল না । তবে সেটা নিয়ে দুঃখ নেই । দুঃখ একটাই কেবল যে পৃথিবী থেকে এই অপশক্তি গুলো সে দুর করতে পারলো না । ছোট বেলাতে যখন ওর বাবা আর মাকে এমনই এক অপশক্তির হাতে মরতে হয়েছিলো তখনই সে শপথ নিয়ে ছিল যে সারা জীবন এসবের বিরুদ্ধেই লড়বে । আজকে তার মরনটাও এদের হাতেই হল !
ইভাঙ্কা তাকিয়ে দেখলো হলুদ চোখের লিলি ওর দিকে এগিয়ে আসছে । হাতে বড় একট পাথর নিয়ে । ওটা দিয়ে ওকে চাপা দিবে !
ইভাঙ্কা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিল । উপরওয়ালার নাম নিল !
ঠিক তখনই ইভাঙ্কা একটা পরিচিত আওয়াজ শুনতে পেল !
রাফায়েল !
কিছু একটা পড়ছে !
তুয়ায়ো সিয়ামা ডিভিকোস !
তুয়ামো সিয়ামা ডিভিকোস !
তুয়ায়ো সিয়ামা ডিভিকোস !
তুয়ামো সিয়ামা ডিভিকোস !
ইভাঙ্কা চোখ মেলে চাইলো ! এই মানুষটার সাথে সারা জীবনে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে । তারা একে অন্যের প্রতিপক্ষ । বেশ কয়েকবার তাদের মুখমুখি সংঘর্ষও হয়েছে । কয়েকবার মারতেও চেয়ে ওকে ! তারপরেও রাফায়েলকে সে কোন দিন বুঝতে পারে নি ।
রাফায়েল মন্ত্র পড়েই চলেছে !
মুহুর্তের ভেতরে লিলি কেমন যেন দুলে উঠলো । তবে সেটা সামলে উঠতেও সময় লাগলো না । হাতে পাথরটা ফেলে দিল পাশে ।
রাফায়েল বলল
-লিলি ! আমি জানি তুমি ভেতরে আছো ! ওটাকে জিততে দিও না !
-না ! আমি…….
রাফায়ালের কন্ঠে এমন কিছু ছিল যা লিলিকে দ্বিধার ফেলে দিয়েছে । লিলি নিজের মাথা চেপে ধরলো । কয়েকবার এদিক ওদিক করতে করতেই দেওয়ালের সাথে গিয়ে ধাক্কা মারলো !
যেন ভেতরে ভেতরেই সে কারো সাথে যুদ্ধ করছে ।
রাফায়েল ওর দিকে কিছু ছুড়ে দিল । তারপর বারবারই সেই একই শব্দ গুলো উচ্চারন করতে লাগলো ।
ইভাঙ্কা তখনই দেখতে পেল লিলির শরীরের সেই উল্কি আর নকসা গুলো ফিরে আসছে । লিলি তখনও মাথা চেপে ধরে এদিক ওদিক হেটে চলেছে ।
রাফায়েল বলল
-তুমি জিতে যাচ্ছো ! তুমি জিতে যাচ্ছো !!
আরও বেশ খানিকটা সময় চলল এভাবে ! তারপর লিলি শান্ত হয়ে এল । শান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়লো চোখ বন্ধ করে । যখন আবার চোখ খুলল তখন ওর চোখ একেবারে স্বাভাবিক !
ও ফিরে এসেছে !
একটা সময় সব কিছু শান্ত হয়ে এল ! ইভাঙ্কা তাকিয়ে দেখলো অন্য সবাই আস্তে আস্তে উঠে দাড়াতে শুরু করেছে । তবে রাফায়েল আর লিলিকে ভীত চোখে দেখছে । ইভাঙ্কার উঠে দাড়ানোর মত অবস্থা নেই । সে শুয়েই রইলো ।
রাফায়েল পড়ে থাকা ওর গলার রিংটা তুলে নিয়ে গিয়ে ওর সামনে ধরলো ! বলল
-এটার মনে হয় আর দরকার নেই !
-হ্যা, নেই !
-আমি তোমাকে বলেছিলাম আগেই । তোমার থেকে শক্তিশালী আর কেউ নেই !
তারপর ওরা দুজনেই ইভাঙ্কার সামনে এল । লিলি নিজের বসলো ওর ওর কাছে । ওর আঘাত গুলো দেখতে লাগলো !
রাফায়েল বলল
-চাইলেই ও তোমাকে মেরে ফেলতে পারতো । আমিও তোমাকে নাও বাঁচাতে পারতাম । কিন্তু সবাই কিন্তু এক হয় না !
ইভাঙ্কা কোন কথা বলল না !
লিলি বলল
-আই এম সরি !
ইভাঙ্কা কোন কথা না বলে কেবল মাথা নাড়ালো । যেন বলার চেষ্টা করলো যে ও জানে কাজটা লিলি করে নি । অন্য কেউ করেছে ! কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ওর !
রাফায়েল বলল
-আশা করি এখন তোমরা আর ওর পেছনে আসবে না ।
ইভাঙ্কা মাথা নাড়ালো !
আর কোন কথা হল না । তাকিয়ে দেখলো দজনেই হাটতে হাটতে ওর চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল । ওর বুকে বেশ খানিকটা ব্যাথা করছে । একটু আগেও মনে হচ্ছিলো যে ও মারা যাবে । আর বুঝি ওর বাঁচা হল না কিন্তু ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেল !
পরিশিষ্টঃ
রাফায়েল আবারও কথাটা বলল
-তুমি নিশ্চিত তুমি তোমার মায়ের কাছেই থাকতে চাও ?
-হুম !
-এতো কিছু হওয়ার পরেও !
-হ্যা ! ঐদিন ঘুমানোর আগে আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো সে আমাকে ভালবাসে । এই কথাটাই আমি কেবল মনে রাখতে চাই । আর কিছু না !
রাফায়েল কিছু বলতে গিয়েও বলল না । বলা ঠিকও হবে না । গাড়িটা যখন আবার লাল রংয়ের বিল্ডিংয়ের কাছে থামলো তখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে । নির্জন রাস্তার পাশে বাড়িটা চুপচাপ দাড়িয়ে আছে । লিলি গাড়ি থেকে নেমে পড়লো । রাফায়েল গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল ওকে । গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে লিলি পেছন ফিরে তাকালো । ফিরে এসে জড়িয়ে ধরলো ওকে !
রাফায়েল বলল
-তুমি জানো আমি কোথায় থাকবো ! যে কোন দরকারে আমাকে ডাকবে ! আজ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর দিন শেষ !
লিলি হাসলো কেবল । তারপর রাফায়েলের গালে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে চলে গেল !
রাফায়েল কিছুটা সময় সেদিকে তাকিয়ে রইলো । আগের বার যখন লিলিকে এখানে রেকে গেছিলো মনের ভেতরে কেমন একটা অশান্তি লাগছিল তবে এখন আর সেটা মনে হচ্ছে না । মেয়েটা এবার ওর মায়ের কাছে নিরাপদে থাকবে !
# সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত