ভয়ংকর হাত

ভয়ংকর হাত

ঘটনাটা গত সপ্তাহের। অনলাইনে একটা প্যান্টের অর্ডার করেছিলাম। অর্ডার করার তিনদিনের মধ্যেই খাগড়াছড়ি সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে বিকেল ৪টার দিকে আমাকে কল করে জানালো আমার পণ্য চলে এসেছে। অফিসের কাজ শেষ করে নিজের ব্যক্তিগত হাংক মোটরবাইক নিয়ে মাটিরাংগা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। মাটিরাংগা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব আনুমানিক ১৯ কি.মি. হবে। পথে রিসাং ঝরনা, আলুটিলা গুহা পরে। পাহাড়ি আকা-বাকা,উচু-নিচু রাস্তা। চাইলেও বাইক দ্রুত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

অক্টোবর মাস চলতেছে। বিকেল ৫টার পরেই অন্ধকার নেমে আসে চারপাশে। যাইহোক বাইক ধীরেসুস্থে চালিয়ে খাগড়াছড়ি পৌছাতে পৌছাতে ৫.৪০ বেজে গেলো। শাপলা চত্ত্বরের একটু পরেই কৃষি ব্যাংকের নিচেই সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস। সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে গিয়ে দেখি বেশ ভালোই ভীড়। উপজাতি এক আপুকে আমার আগমনের কারন বলতেই তিনি একটার পর একটা হলুদ প্যাকেট সরিয়ে আমার প্যাকেটটা খুঁজতে লাগলেন। পণ্য হাতে পেতে-পেতে আরো বিশ মিনিট চলে গেলো। ঠিক ৬টায় পণ্য হাতে পেয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে মাটিরাংগার দিকে রওনা দিলাম। এমনিতেই বিকেল পাঁচটার পর অন্ধকার হয়ে যায় তারপরে আজকে আকাশ মেঘলা থাকায় চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছে। শহরের ভেতর অন্ধকার তেমন একটা অনুভব না করতে পারলেও জিরো মাইলের পর এসে অন্ধকারটা বেশ ভালোই বুঝতে পাড়লাম। বাইকের আলো যতটুকু হয় তাতে যেনো অন্ধকার কাটতে চাচ্ছে না ।

সাবধানে বাইক চালাতে লাগলাম। জিরো মাইলের পর থেকে আলুটিলা পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই পাহেড়ের ঢালের উপরের দিকে উঠতে হয়। এমনিতেই পাহাড়ি রাস্তায় যানবাহন একটু কম থাকে। আজকে যানবাহন দেখাই যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে লোকাল ভাড়া বাইকগুলো সাঁইসাঁই করে আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। ওরা পাহাড়ি রাস্তায় বাইক চালিয়ে অভ্যস্থ। সেজন্য আমার থেকে দ্রুতই চলে যাচ্ছে। তাবেং চুমুই নামক জায়গায় আসার পর আমার বাইক আচমকাই বন্ধ হয়ে গেলো। বাইক বন্ধ হবার সাথে সাথেই আমার ভেতর একটা ভয় কাজ করতে লাগলো। অনেকবার বাইক স্টার্ট দেবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে গেলাম। শরীরটা ভয়ে শিরশির করতে লাগলো। আশেপাশে তাকিয়ে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না।

বাইকের ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে অন্য কোনো যানবাহনের অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার ডানপাশে উঁচু পাহাড় আর বামপাশে বিশাল খাদ। ভয়ে ভয়ে প্রায় বিশ মিনিট কাটিয়ে দেবার পরেও কোনো মানুষ কিংবা যানবাহনের দেখা পেলাম না। পকেট থেকে মোবাইল বের করে অফিসের হিসাবরক্ষকে কল করতে গিয়ে দেখি মোবাইলটাও আশ্চর্যভাবে বন্ধ হয়ে আছে। অথচ অফিস থেকে যখন বের হয়ে আসি তখনো ৬৫% চার্জ ছিলো দেখেছিলাম। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসতে লাগলো। বাতাস বইতে শুরু করলো। ভয় এবং শীতে আমার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো। হঠাৎই খেয়াল করলাম অত্যন্ত মিহিসুরে কেও একজন ডানপাশের পাহাড়ের উপর থেকে আমার নাম ধরে ডাক দিচ্ছে।চাকরিসূত্রে আমার খাগড়াছড়ি জেলায় আসা। এখানে আমাকে কেও চেনার কথা নয় যে এই অন্ধকারে আমাকে নাম ধরে ডাকবে।

ভয়ে গায়ের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেলো আমার। আবারো মিহিসুরে পাহাড়ের উপর থেকে কেও একজন আমার নাম ধরে ডাক দিলো।এবারের ডাকটা আগের থেকেও স্পষ্ট কিন্তু কাপাকাপা। আমি ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলাম..

-কে ওখানে? আমার নাম জানলেন কিভাবে? আমি কি আপনাকে চিনি?  আমার কথার উত্তরে খিলখিল একটা হাসির আওয়াজ ভেসে আসলো পাহাড়ের উপর থেকে। হাসির আওয়াজ অন্ধকার পাহাড়ের বুক চিরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো মনে হয়। হাসির আওয়াজ শেষ হতেই আবারো কাপাকাপা কন্ঠস্বরে মিহিগলায় নাজিম বলে কেও একজন ডাক দিলো।

এবারের ডাকের শব্দও পাহাড়ের উপর থেকে নয় মনে হলো আমার পেছন থেকে আসলো। ভয়ে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো মনে হয়। চিৎকার করে সাহায্য চাইতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম গলা দিয়ে চিঁ চিঁ ছাড়া আর কোনো শব্দই বের হচ্ছে না। ডান কাধের উপর ঠান্ডা একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। জড়বস্তুর মতো নড়াচড়া কর সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেললাম মনে হলো। ডান কাধের পর বাম কাধেও ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করলাম। বাইকের মায়া ত্যাগ করে দৌড় দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পা দুটো যেনো কেও সুপারগ্লু আঠা দিয়ে রাস্তার সাথে লাগিয়ে দিয়েছে মনে হলো।

ঠান্ডা দুহাতের স্পর্শ কাধ পেরিয়ে এবার গলায় অনুভব করলাম। হাত দুটো আমার গলা সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরলো। দম বন্ধ হয়ে চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়ে গেলো। শেষবারের মতো নিজের সন্তানের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। প্রিয় মুখটা আর দেখতে পারবো না ভাবতেই চোখ দিয়ে জল চলে আসলো। হঠাৎ নিজের মাঝে সাহস চলে আসলো। দোয়াদরুদ পড়ে খুব জোরে একটা ঝ্যাংটা মারলাম। ঠান্ডা হাত দুটো গলা থেকে ছুটে গেলো। বিসমিল্লাহ্‌ বলে বাইক দ্রুত স্টার্ট দিলাম। উপরওয়ালার রহমতে প্রথম চেষ্টাতেই বাইক স্টার্ট হয়ে গেলো। গিয়ারে ফালানো ছিলো আগেই বাইক। দ্রুত টান দিলাম সামনের দিকে। পেছন থেকে ভয়ংকর একটা চিৎকার ভেসে এলো। “এবারের মতো বেঁচে গেলি শব্দটা কানে ভেসে এসে বাতাসে মিলিয়ে গেলো”।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত