আলেয়া

আলেয়া

বনগাঁ অঞলের এক ছােট্ট গ্রাম। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ইছামতী নদী। তারই ধার ঘেঁষে ছােট্ট একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারদিক বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা। বাড়ির পাশে একটা ছােট্ট কুটীর। কুটিরের পাশে একটা গভীর জলের টিউবওয়েল। বাড়ির সামনে ছায়াঘেরা বাঁধানো উঠোনে একটা ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন মণীশ দত্ত। রিটায়ার্ড অফিসার। ভেবেছিলেন বহুদিন কলকাতায় কাজ করে তাে কাটিয়ে দিলেন, বাইরে কোথাও একটা বাড়ি কিনে শেষ জীবনটা আরামে কাটিয়ে দেবেন। একটা মাত্র মেয়ে, এখনও বিয়ে হয়নি। হােস্টেলে থেকে এম, এ পড়ছে। পাশ করলে বিয়ে করলে না, কেরিয়ার তৈরি করবে। মণীশবাবুর আপত্তি থাকলেও মেয়ের ইচ্ছেতে বাধা দেননি।

ভাবলেন, ও ওর মতাে থাক আমি আমার মতাে। এই সময় খবরের কাগজে দেখালেন খুব সস্তায় বনগাঁ অঞ্চলের এই বাড়িটা বিক্রি আছে। বাড়ির মালিক মৈনাক মুখােপাধ্যায় কলকাতারই বাসিন্দা। মণীশবাবু মৈনাকবাবুর সঙ্গে দেখা করলেন। এর দিন কুড়ি- পঁচিশ বাদেই মণীশবাবু এ বাড়িটার মালিক হয়ে গেলেন। কিন্তু কিছু বিপেয়ারের দরকার ছিল। মণীশবাবু সেই কাজটা শুরু করে দিলেন। মৈনাকবাবুর কাছেই তিনি শুনেছিলেনতাঁর দুজন কেয়ারটেকার বাড়ির দেখাশোনা করে। ওরা ঐ বাড়ির পাশের কুটীরেথাকে। মণীশবাবু তাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন। রাম আর লক্ষ্মণ দুই ভাই। মৈনাক বাবু এই দুটি অনাথ ছেলেকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ঐ কুটীরে। সেই থেকে তারা এখানেই রয়ে গেছে। মণীশবাবু বাড়ি সারানাের দায়িত্ব ও দেখাশােনা করার জন্যে এই দুই ভাই রাম-লক্ষ্মণকে পুনরায় বহাল করলেন। তারপর বাড়ি সারানাে শেষ হতে স্ত্রীমলিনাকে নিয়ে তিনি এখানে এসে পৌঁছলেন। পরের দিন ঋতা মানে ওঁদের একমাত্র মেয়েও এসে হাজির হল। বলল—ক’দিনের জন্যে ছুটি নিয়ে এলাম বাবা। বাঃ বেশ করেছিস মা। কদিন তােকে পেয়ে আমাদের যে কত ভাল লাগবে কি বলব।’

রান্নাঘরে মলিনাদেবী আর ঋতা গল্প করছে। মণীশবাবু বাইরে বসে ওদের হাসির শব্দ শুনছেন চোখ বুজে, আর বাইরের এই শান্ত নির্মল পরিবেশটকে উপলব্ধি করছেন। হঠাৎ সোঁ সোঁ শব্দ। ঝড় উঠল নাকি? কালবৈশাখির ঝড়? হতেই পারে। সময়টা তাে চৈত্রের শেষ। সােজা হয়ে বসেন মণীশবাবু। বড় বড় তাল, অশ্বথ গাছগুলাে ভীষণভাবে দুলছে। আম গাছের মাথার ওপরটাও ভয়ঙ্কর নড়ছে। যেন ক্ষেপে গেছে। ছােট ছােট আমে ভর্তি হয়ে গেছল গাছটা। কত আম যে পড়বে তা ঠিক নেই। কুটীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রাম-লক্ষ্মণ। মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে।

মণীশবাবুর কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। মণীশবাবুর মুখেও বিস্ময় ! ঝড় উঠল। তাদের গায়ে হাওয়া লাগবে, চারদিকে ধুলােয় ভরে যাবে কিন্তু আশ্চর্য একফোটা হাওয়া তাঁর গায়েও লাগছে না। সন্ধের অন্ধকার নেমেছে। আকাশে মেঘ নেই, দূরে কোথাও এতটুকু কালাে মেঘও জমেনি। তাহলে? তাকালেন রাম-লক্ষ্মণের দিকে। কিন্তু একি! রাম-লক্ষ্মণের মুখটা সাদা কেন! ওরা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাড়ির সামনে দাঁড়ানাে মােটা গাছের গুঁড়ির গায়ে ঝােলান হারিকেনটার দিকে। মণীশবাবু কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন—কিন্তু পারলেন না। পরিষ্কার দেখলেন লণ্ঠনের আলােটা বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। দু’বার দুলে উঠল। মণীশবাবুর মনে হল আলােটা তাকে ডাকছে, তাকে আকর্ষণ করছে। উনি উঠে পড়াতেই আলােটা এগিয়ে চলল বাড়ির এলাকা ছাড়িয়ে সামনের বিশাল অন্ধকার মাঠের দিকে। মণীশবাবু সম্মােহিত হয়ে এগিয়ে গেলেন। চিৎকার করে উঠল রাম- লক্ষ্মণ।

-বাবু যাবেন না—যাবেন না—ফিরে আসুন। থমকে দাঁড়ালেন মণীশবাবু। আলােটাও দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু মণীশবাবু পেছন ফিরে তাকালেন না। একদৃষ্টে আলাের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে চললেন। আলােটাও চলতে শুরু করল। রাম-লক্ষ্মণ বহুদিন এখানে আছে। ওরা জানে—আলেয়ার আলাে যাকে টানে তাকে শেষ করে দেয়—আর যারা ধরতে যায় তারাও শেষ হয়ে যায়।

মণীশবাবুর পেছন পেছন ওরা বাবু বাবু বলে ডেকে চলল কিন্তু আটকাতে ভয় পেল। ওদের জিবনেও ওরা একবার দেখেছিল একজনকে আলেয়ায় টেনে নিয়ে যেতে। আর শুনেছে তাদের গ্রামের বুড়াে চক্রবর্তীকেও নাকি আলেয়া ধরেছিল। ওদের চিৎকার শুনে দৌড়ে এলেন মলিনা দেবী আর ঋতা। একটু দূরে দূরে ঘর হলেও নিস্তব্ধ জায়গায় রাম-লক্ষ্মণের চিৎকার অনেকের কানে গিয়েছিল। বেশ কয়েকজন জড়াে হয়েছে। একজন বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন—ওরে কেউ তােরা ওকে বঁাচা রে-ঠাকুরের নাম কর।

একথা শুনে ভয়ে চিৎকার করে ছুটে গেলেন মলিনা দেবী। কয়েকজন যুবতী বউ ঝি ওকে চেপে ধরল—মাসিমা যাবেন না।—গেলে আপনিও মরবেন। ঋতা আজকালকার মেয়ে। অত্যন্ত সাহসী। তাছাড়া কোনাে কুসংস্কার মানার প্রশ্নই ওঠে না। তার বাবার বিপদ এটাই বড় কথা। সবার চোখ এড়িয়ে ও ছুটে গেল মণীশবাবুর দিকে। মণীশবাবু মন্ত্রমুগ্ধের মতাে ফাঁকা মাঠের ধারে ঝােপঝাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছেন। বৃদ্ধ আবার চিৎকার করে উঠলেন, ঝােপের মধ্যে ঢুকলেই ওঁকে মেরে ফেলবে আলেয়া।

ঋতা শুনল সে কথা। তাই প্রাণপণে ছুটে সে পৌঁছে গেল তার বাবার কাছে। মণীশবাবু ঠিক সেই মুহুর্তে পা বাড়িয়েছেন ঝােপের দিকে। ঋতা বাবা বাবা বলে চিৎকার করে ঝাপিয়ে পড়ল বাবার ওপর। রাম-লক্ষ্মণ ঋতাকে আটকাতে ছুটে এসেছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে দেখল ঋতা মণীশবাবুর ওপর ঝাপিয়ে পড়তেই কে যেন ছুঁড়ে দিল ঋতাকে দূরে। ঋতা অজ্ঞান হয়ে গেল। আর মণীশবাবু ঠিক ঝােপের মুখটায় এসে হঠাৎ থমকে গেলেন। সম্বিত ফিরে পেলেন। ভাবলেন, এখানে আমি কি করছি! তারপরই পেছন ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। এত লোক কেন? একি! ঋতা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। রাম-লক্ষ্মণ তার চোখে মুখে জল দিচ্ছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ঋতার জ্ঞান ফিরল। প্রায় ভ্যাবাচাকার মতাে তাকিয়ে বলল— কি হয়েছে আমার? তােমরা সব আমায় ঘিরে আছ কেন?

রাম-লক্ষ্মণ বলল–তুমি মা আজ তোমার বাবার প্রাণ রক্ষা করেছ। ঋতার যেন কি মনে পড়ল, বলল–হা আমি তাে বাবাকে চেপে ধরতে গেছি— কিন্তু প্রচণ্ড ইলেকট্রিক শক লাগার মতাে লাগল। কে যেন আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সকলে বলাবলি করতে লাগল -এর আগে কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। আজ মেয়ের জন্য বাপের প্রাণ বাঁচল। মলিনা দেবী কিন্তু হঠাৎ কেমন চুপ করে গেলেন। তাঁর মনে পড়ল সন্ন্যাসীর কথা। সে কথা তিনি আজ অব্দি কাউকে বলেননি। প্রতি শনিবার তিনি ভগবতী দেবীর মন্দিরে পুজো দিতে যান। গত শনিবারও গিয়েছিলেন-পুজো দিয়ে বেরিয়ে দেখলেন এক জটাজুটধারী সাধু তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। মলিনা দেবী কাছে আসতেই ডাকলেন সাধু- একবার এদিকে আসুন তো।

মলিনা দেবী সাধুর কোমল স্বরে মুগ্ধ হয়ে বললেন-“আপনি আমায় ডাকছেন বাবা? সাধু বললো—মাগাে, সামনে আপনার একটা বিপদ দেখতে পাচ্ছি। আপনি এই মৃত্যুঞ্জয় ফুলটা বাড়ি নিয়ে খান। এটিকে ভাল করে সুতা দিয়ে বেধে স্বামীর হাতে বা গলায় পরিয়ে দেবেন। সব বিপদ কেটে যাবে। নাস্তিক মানুষ মণীশবাবু। সে কথা জানতেন মলিনা দেবী। বললেন –বাবা, আমার স্বামী এ সবে বিশ্বাস করেন না। উনি পরবেন না। আমি পরলে কাজ হবে? সন্ন্যাসী একটু চোখ বন্ধ করে কি যেন চিন্তা করেন, তারপর বলেন—মা, আপনার ছেলে মেয়ে আছে? মলিনা দেবী বললেন–আমার একটা মেয়ে। কলকাতায় থাকে। এখন আমার কাছে এসে রয়েছে। সন্ন্যাসী বললেন—তবে শুন মা, সন্তান হল পিতামাতার আত্মা। আপনি ওকে পরিয়ে দিন।

—কিন্তু ও তাে আবার কলকাতায় ফিরে যাবে।

কবে? প্রশ্ন করেন সন্ন্যাসী। একটু ভেবে বলেন মলিনা দেবী–দিন পনেরাে পরে। সন্ন্যাসী মাথা নেড়ে বললেন—ঠিক আছে, এখন তাে থাক পরে দেখা যাবে। মলিনা দেবী বাড়িতে এসে ঋতাকে বলতে তা খুব রেগে গেল। বলল, মা, আমি এসব একদম বিশ্বাস করি না, আমি এসব পরব না।

মলিনা দেবী খুব চিন্তিত মুখে বললেন-“শােন ঋতা-সন্ন্যাসীকে জিগ্যেস করেছিলাম, আপনাকে কত টাকা প্রণামী দেব এর জন্য? সন্ন্যাসী বলেছিলেন—এক পয়সাও না। আপনি শুধু বিশ্বাস রাখুন। বলতে পারিস এ ফুল দেওয়ার পেছনে সন্ন্যাসীর কি স্বার্থ আছে। তাের বাবার জন্যে কটা দিন তুই এটা গলায় পরে থাকতে পারবি না? এরপর ঋতা আর আপওি করেনি, মলিনা দেবী জানেন—আজ তার স্বামীর প্রাণ বাঁচার পেছনে ঐ সন্ন্যাসীর অবদান সবচেয়ে বেশি। ঋতার গলায় যদি মৃত্যুঞ্জয় কবচ না থাকতো তাহলে আজ স্বামী-মেয়ে দুজনকেই হারাতে হত। মলিনা দেবী ঠিক করলেন আগামী কাল তিনি ওদের নামে পুজো দিতে ভগবতী মন্দিরে যাবেন তার সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করবেন। মলিনা দেবীকে চুপচাপ থাকতে দেখে অবাক হলেন মণীশবাবু। বললেন-“কিগাে- তুমি অবাক হওনি?

—কি জন্যে বল তাে! মলিনা দেবী না বােঝার ভান করলেন।

মণীশবাবু একটু দুঃখ করে বললেন-এই যে, তােমার মেয়ের জন্যে আমার প্রাণ বাঁচল। ঋতার মধ্যে এত শক্তি আছে? ম্লান হাসলেন মলিনা দেবী। বললেন–আমি আর কি বলব বল। তুমি তাে নিজেই বুঝতে পারছ। স্বামীর কাছে সমাসীর গল্প বলে লাভ নেই। মলিনা দেবী জানেন মণীশবাবু বিশ্বাস তাে করবেনই না বরং রাগারাগি করবেন ঋতাকে গলায় মৃত্যুঞ্জয় ফুল পরানাে হয়েছে বলে। ঋতাও বাবাকে জানে। তাই মাকে বাঁচাতে সেও কোনাে কথা বলল না। মণীশবাবুর কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না পুরাে ব্যাপারটা। এর মধ্যে ভূতুড়ে কোনাে ব্যাপার বা অলৌকিক কোনাে ব্যাপার আছে বলে তার মনে হচ্ছে না। পুরােপুরি ব্যাপারটা বিজ্ঞানভিত্তিক বলে তার ধারণা। ঝােপঝাড়ের মধ্যে পচা জিনিস থেকে ফসফরাস তৈরি হয়ে হয় মার্স গ্যাস। এই গ্যাস থেকেই আগুন জ্বলে ওঠে ধপকরে।

লােকে না বুঝে সেটাকে আলেয়া বলে। এখানেও নিশ্চয়ই ঐ ঝােপের মধ্যে পচা কিছু থেকে ফসফরাস হয়ে গ্যাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু সব ব্যাপারটাই দুয়ে দুয়েচার হচ্ছে না মণীশবাবুর কাছে। আর একবার ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন মণীশবাবু। জলা জায়গা আর বহুদিনের ফেলা পচা দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা থেকে এরকম গ্যাস জ্বলে এটা ঠিক। তবে কি তিনি ঐ ধরনের কিছু দেখে ছুটে গিয়েছিলেন? তঁার আশ্চর্য লাগছে ঝড়ের ব্যাপারটা। অত হাওয়া, গাছের মাথা দুলছে অথচ নীচে একফোটা হাওয়া নেই। দ্বিতীয়ত, উনি নিজের চোখে দেখলেন লণ্ঠনের আলােটা বেরিয়ে এলাে তার সামনে। তৃতীয়ত, তার নিজের কী হয়েছিল? তিনি যে আলাের পেছনে ছুটছিলেন সেটা কিন্তু একবারও বুঝতে পারেননি। হাওয়ার ব্যাপারটা নয়, অনেক সময় হাওয়ার গতিবেগটা দ্রুত হওয়ায় গাছের মাথাগুলাে বেশি দোলে আর নীচে হাওয়াটা সব কিছুতে বাধা পায় বলে হয়তো ছুটতে পারে না।

আর আলােটা লগ্ন থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারটা…না এসবের কোনাে ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। তবে লােকে যে বলে আলেয়ার পেছনে দৌড়ে মানুষ মরে যায়। এটা নয় মানা যেতে পারে। পচাগন্ধ থেকে গ্যাসের তীব্রতা অনেক সময় মানুষের প্রাণহানিও ঘটাতে পারে। কিন্তু তাঁর নিজের তাে কোনােদিন ঘুমের মধ্যে হাঁটার রােগ নেই যে ভাববেন ঘুম ভাব ছিল—তাই কিছু একটা কল্পনা করে দিব্যি হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিলেন। আর ঋতার বাঁচানােটা। যতই তিনি বলুন না কেন বেশ ভাল রকমই জানেন এটা একটা কো- ইনসিডেন্স। যারা ঘুমের মধ্যে হাঁটে তাদের ধাক্কা দিয়েই জাগাতে হয়। ঋতা তাই করেছে। আর তাতেই তার ঘাের কেটে গেছে। রাম-লক্ষ্মণকে ডেকে একটা কথা জিগ্যেস করলেন মণীশবাবু–হ্যা রে, ঐ ঝােপের মধ্যে কি গরু ছাগল মরে গেলে ফেলা হয়?

–গরু ছাগল কি বলছেন বাবু! মানুষ। মানুষ বলুন বাবু। এখন তাে খুনখারাপি লেগেই আছে, সব ফেলা হয় ঐ ঝােপে। ঐ জন্যে তাে ওটাকে গ্রামের লােকেরা বলে মৃত্যুপুরী। তেনারা তো ওখানেই থাকেন-ওখান থেকে আসেন আবার ওখানেই ফিরে যান।

—বােগাস। আমি এসব বিশ্বাস করি না। সেদিনও সন্ধে হয়ে এসেছে। সামনে ফাঁকা মাঠ আর একটু দূরে বয়ে যাওয়া ইছামতীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নানাকথা ভাবছিলেন মণীশবাবু তাঁর প্রিয় ইজিচেয়ারে বসে। রাম-লক্ষ্মণ দূর থেকে দেখে এগিয়ে আসে। বাবু—ভর সন্ধেবেলা আপনি এমন করে বাইরে বসে আছেন কেন? ঘরে যান বাবু।

—কেন? কি হবে বসে থাকলে ভূতে ধরবে!

রামরাম! এ সব নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা ঠিক নয় বাবু-তেনারা শুনলে এক ধমক দিলেন মণীশবাবু—চুপ-চুপ-একদম চুপ বলছি। আমি তােমাদের আর একটা কথাও শুনতে চাই না। যাও তােমরা ঘরে যাও। যত সব গেঁয়াে ভূত জুটেছে।

ওরা চলে গেলেও বসে থাকেন মণীশবাবু। ঘরের মধ্যে মলিনা আর ঋতা গল্প করছে। মণীশবাবু ভাবলেন কত আর একা বসে থাকা যায়—যাই না হয় ঘরে গিয়ে ওদের সঙ্গে একটু গল্প করি। মণীশবাবু উঠে দাঁড়ান। ঠিক তক্ষুনি এক মহিলা এসে দাড়ালেন তার সামনে। মাথায় ঘােমটা। অন্ধকারে মুখটা ভাল দেখা যাচ্ছে না। তবে দেখে ঠিক গ্রাম্য বলে মনে হল না। মণীশবাবু অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন—কি চাই মা? কিছু বলবে? এত রাতে কোনাে বিপদ হল নাকি! মহিলাটি কিন্তু উত্তর দেয় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। খুব অস্বস্তি লাগে মণীশবাবুর। উনি ভাবলেন মহিলা যখন, নিশ্চয়ই মেয়েদের কাছে কিছু বলবে—পুরুষকে বলতে লজ্জা পাচ্ছে। উনি বাড়ির দিকে মুখ ঘুরিয়ে ডাকলেন– মলিনা, ঋতা একবার বাইরে এস তাে। মলিনা-ঋতা দুজনেই বাইরে বেরিয়ে এল। রাম-লক্ষ্মণও এল। মণীশবাবু বললেন- দেখ তাে ইনি কি বলছেন।

—কে! অবাক হয়ে জিগ্যেস করল ঋতা।

—বাবা, তুমি কার কথা বলছাে?

—কেন—এই তাে….। মণীশবাবু অবাক হয়ে দেখলেন কেউ কোথাও নেই।

বললেন–এই তাে এইমাত্র ছিল, গেল কোথায়? রাম-লক্ষ্মণের মুখ শুকিয়ে গেছে। বলল-বাবু ভেতরে চলুন। বারবার বলছি। আবার ধমক দেন মণীশবাবু—আবার আরম্ভ করছিস! রাম বলল “বাবু শুধু শুধু বলছি না। কারণ আছে। হাসলেন মণীশবাবু—ওঃ আবার কারণও খুঁজে বার করেছে। তা কি কারণ শুনি?

—এখন না বাবু, কাল সকালে বলব। লক্ষ্মণ বলল।

—এখন বললে কি হবে?

–না বাবু, রাতে বলা যায় না এ সব কথা। তেনারা পছন্দ করেন না।

—এই চুপ। নাকি সুরে তেনারা তেনারা করবে না বলছি।

–ঠিক আছে বলব না। তবে বাবু, আপনাকে যা বলার আমরা কাল সকালে বলব।

না কিছুতেই ওদের মুখ দিয়ে একটা কথাও বার করা গেল না সে রাতে। মণীশবাবু একটু অবাক হলেন—মহিলাটি এলই বা কেন আবার চলেই বা গেল কেন? পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে, খবরের কাগজটা একটু উল্টোচ্ছিলেন মণীশবাবু। রাম-লক্ষ্মণ এসে হাজির হল। বলল—বাবু আপনার সব কথা জানা দরকার, নয় তাে কোনদিন বড় বিপদে পড়বেন।

ভ্রু কুঁচকে তাকালেন মণীশবাবু। বললেন—কি রকম! বিপদে পড়ব মানে? হাতের কাগজটা পাট করে সরিয়ে রেখে প্রশ্ন করলেন মণীশবাবু। রাম-লক্ষ্মণ মণীশবাবুর কাছেই বসল। তারপর বলতে শুরু করল। রাম বলল—বাবু, এই বাড়িটার অনেক ব্যাপার আছে। সবটা না শুনলে আপনি বুঝতে পারবেন না। আপনি কেনার আগে আর এক বাবু এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছিলেন। মণীশবাবু একটু অবাক হলেন। বললেন—কিন্তু আমি তাে কেনার আগে করপােরেশনে সার্চ করেছিলাম। এমন কোনাে খবর তাে পাইনি। লক্ষ্মণ বলল—কি করে পাবেন বাবু! ওঁরা তাে মাত্র সাতদিন ছিলেন।

—সেকি, সাতদিনের জন্যে এসেছিলেন?

—আগে সবটা শুনুন বাবু, তাহলে সব বুঝতে পারবেন। এ বাড়ির আসল মালিক ছিলেন রামসদয় মুখার্জী। তার সংসারে কেউ ছিল না। হরি বলে এক উড়িয়া চাকর তার দেখাশােনা করত। মারা যাবার সময় তিনি নাকি উইল করে বাড়িটা হরির নামে করে দিয়ে যান। কিন্তু অবাক কাণ্ড, ক’দিন পরে হরিকে কে বা কারা যেন হত্যা করে রেখে যায়। প্রথমটা সকলে মনে করেছিল চোর ডাকাতের ব্যাপার। পরে জানা গেল—হরির জাত ভায়েরাই তাকে গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁস টেনে মারে।

—সেকি? কেন? এর কারণ কি? মণীশবাবু একটু উত্তেজিত হয়েই জিগ্যেস করেন। রাম-লক্ষ্মণ পালা করে বলে চলল শােনা গেল হরির জাত ভায়েরা হরির কাছে ঘনঘন আসছিল এ বাড়িটাতে ভাগ বসাবে বলে। হরি রাজি হয়নি। ওর ইচ্ছে ছিল বিয়ে-থা করে সংসারী হয়ে বাড়িটা ভােগ করবে। তাছাড়া বুড়াের টাকাপয়সাও কিছু কম ছিল না। সেগুলাের ওপর হরির খুব লােভ ছিল। কিন্তু যারা হরিকে মারল তারা কিন্তু পয়সাকড়ি কিছু খুঁজে পেল না। কারণ টাকা কোথায় লুকিয়ে রাখতেন রামসদয় বাবু তা একমাত্র হরিই জানত। হরির মৃত্যুর পর থেকে কেউ আর এ বাড়িতে থাকতে পারতাে না। ওর জাতভায়েরা চেষ্টা করেছিল কিন্তু বাড়ি দখল নিতে পারেনি। যে যতবার এসেছে সবকটা মরেছে আলেয়ার কবলে পড়ে।

—আলোয়া— আবার প্রশ্নটা না করে পারলেন না মণীশবাবু।
-হা বাবু, যে আলেয়া আপনাকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

যারাই এসেছে তাদেরই হরি মেরে ফেলেছে আলেয়া হয়ে। এ বাড়ির ওপর দখলটা ও ছাড়তে চয়নি বহুদিন। বাড়িটা ভূতুড়ে বাড়ি বলে পড়েছিল বছরের পর বছর। এর পর হঠাৎ একদিন দেখা গেল বাড়িটা ভাঙাভাঙি শুরু হয়েছে। মিস্ত্রি কাজ করছে। মৈনাক মুখার্জী এসে বললেন তিনি নাকি রামসদয়বাবুর ভাইপো। সুতরাং এ বাড়ি আইনত তার। সঙ্গে সশে হরির দল এসে হাজির। খুব গােলমাল করল ওরা।

এটা হরির বাড়ি। মৈনাকবাবু শক্ত লােক, বললেন কোর্টে এর প্রমাণ হবে। নাঃ, হরির দল কোনাে কাগজপত্র দেখাতে পারল না। বাড়িটা মৈনাকবাবুর প্রমাণ হল। তারপর শান্তি-স্বস্ত্যয়ন চলল পনেরাে দিন ধরে। তারপর মৈনাকবাবু আমাদের দুজনকে কেয়ারটেকার রেখে কলকাতায় চলে গেলেন। কোনাে গণ্ডগােল নেই। বেশ চলছিল। এই সময় ভুজঙ্গ দত্ত বলে এক ভদ্রলােক তার স্ত্রী জয়ন্তীকে নিয়ে বেড়াতে এলেন। মাত্র এক বছর হল ওঁদের বিয়ে হয়েছিল। জয়ন্তী দিদি খুব সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু মুশকিল হল উনি সবসময় গা-ভর্তি গয়না পরে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন আমরা গিয়ে ওঁদের দুজনকেই বললাম—এ গ্রামে মাঝে মধ্যে কিন্তু ডাকাতি হয়। জয়ন্তীদিদি আপনি যদি এত গয়না পরে থাকেন তাহলে কিন্তু আপনার সব যাবে। তারচেয়ে আপনি গয়নাগুলাে খুলে সরিয়ে রাখুন দিদি।

কথাটা শুনে কেমন যেন হয়ে গেলেন জয়ন্তী দিদি। চোখ বড় করে দুহাত দিয়ে নিজের গয়নাগুলােকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলে ওঠেন-“না না—এসব আবার কি কথা! আমার গয়না নিলে আমিও বাঁচব না। এগুলাে আমার প্রাণ। আমি কিছুতেই এগুলাে খুলবাে না। দেখি কে আমার গা থেকে গয়না খােলে। আমরা আর কি বলব, যা বলার বলেছি। এর বেশি তাে আমাদের আর কিছু করার ছিল না। সেদিন রাতে হঠাৎ ভুজঙ্গবাবু দেখলেন ঝােপের মধ্যে আগুন জ্বলছে নিভছে। উনি ভাবলেন বুঝি ডাকাত আসছে। জয়ন্তী ঘুমােচ্ছিল। মাথার কাছে বাক্সের মধ্যে সব গয়না খুলে রেখে শুয়েছিল। ভুজঙ্গা বাবু ডাকাতের ভয়ে পুরাে বাক্সটা নিয়ে গিয়ে রান্নাঘরের কয়লার গাদার মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন। সকালে জয়ন্তীদি ঘুম থেকে উঠে গয়না না দেখতে পেরে ভাবলেন ডাকাতে তার সব গয়না নিয়ে গেছে।

সঙ্গে সঙ্গে তার মাথাটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। এতে ওঁর একটা শক-এর মতে হল। ভুজঙ্গবাবু যত বলেন, চিন্তা কোরাে না, সব গয়না আমার কাছে আছে—জয়ন্তীদি কোনাে কথাই কানে তােলেন না। শুধু আমার গয়না’ ‘আমার গয়না বলে ছুটে বেড়াতে লাগলেন সারা বাড়ি। তারপর সন্ধেবেলা একটা শব্দ শুনে ছুটে এসে দেখি জয়ন্তীদিদি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। সেই থেকে প্রায়ই দেখা যায় একটা বউকে। হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়, কারাে কোনাে ক্ষতি করে না। আমাদের ধারণা এই জয়ন্তীদিদি গয়নার খোজ করে চলেছেন এখনও। মণীশবাবু বললেন—আর ভুজঙ্গবাবু, তার কি হল? রাম-লক্ষণ বলল — যতদূর শুনেছি উনি কলকাতাতেই আছেন। মণীশবাবু বললেন, যদিও আমি এসব বিশ্বাস করি না তার চিন্তা হচ্ছে আমার মেয়ে-বৌয়ের জন্যে। ওরা কিন্তু এসব শুনলে বিশ্বাস তাে করবেই, এখানে থাকতেও চাইবে না। দেখা যাক কি হয়।

ঋতার এবার ফিরে যাবার কথা হােস্টেলে। মণীশবাবু আর মলিনা দেবীর মন খারাপ। ঋতারও মন খারাপ, কিন্তু হঠাৎ সন্ধেবেলা থেকে ঋতা কিরকম অদ্ভুত একটা। আচরণ করতে লাগল। মুখের চেহারাটাও অন্যরকম, বাড়ির চারদিকে কি যেন খুঁজছে। কারাে সঙ্গে কথা বলছে না। মণীশবাবু ঋতাকে চেপে ধরলেন। বললেন-ঋতা মা, কি হয়েছে আমাকে বল। ঋতা মণীশবাবুর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে—আমার গয়না। তারপরেই মণীশবাবুর হাত ছাড়িয়ে ছুটে যায়। মণীশবাবুর মুখটা কালাে হয়ে গেল। এ তাে ঋতার কণ্ঠস্বর নয়—এ কার গলা! তা ছাড়া ঋতার গায়ে এ কি অমানুষিক শক্তি! তবে কি সব সত্যি! ঋতার মধ্যে জয়ন্তীর ভূত ঢুকেছে। সারা রাত ওঁরা জেগে বসে পাহারা দিলেন ঋতাকে। সকাল হতেই মলিনা দেবী ছুটলেন সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করতে। সন্ন্যাসী তাে সব শুনে অবাক। বললেন—এমন তাে হবার কথা নয়, ওর গলায় তাে আমার দেওয়া রক্ষায় আছে। কাঁদতে কাঁদতে মলিনা দেবী বললেন সেটা আর নেই বাবা। আমার দোষেই গেছে।

—সেকি! কি ভাবে! খুব বিরক্ত হলেন সন্ন্যাসী। মায়ের মন্ত্রঃপূত ফুল দিয়ে আমি ওর গলায় রক্ষামন্ত্র দিয়েছিলাম। মলিনা দেবী কাঁদতে লাগলেন। বললেন–ঋতার গলায় সুতােটা একটু ছােট হয়ে গিয়েছিল। আমি রাত্তিরে খুলে রেখে জানলার ধারে রেখেছিলাম। মনে করেছিলাম সকাল হলে ওটা ঠিক করে পরিয়ে দেব। আমাদের বাড়িতে মেঠো ইঁদুরের বড় উৎপাত মহারাজ। হরদম এটা-ওটা টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার একবারও মনে হয়নি এই ফুলটাও ইঁদুর খেয়ে ফেলতে পারে।

সন্ন্যাসী গম্ভীর হয়ে কি ভাবলেন। তারপরে বললেন—এখন ঋতাকে মুক্ত করতে গেলে একমাত্র উপায় মারণ যজ্ঞ। আর একটা কাজ তােমাদের করতে হবে মা- ভুজঙ্গবাবুকে খুঁজে বার কর। বল, যজ্ঞের সময় জয়ন্তীর গয়নার বাক্সটা নিয়ে তাকে হাজির থাকতে। মণীশবাবু বিশ্বাস করুন বা না করুন মেয়ের জন্য তাকে যেতেই হল কলকাতায় মৈনাকবাবুর কাছে। তাকে সব কথা বলতে মৈনাকবাবু বললেন—ঠিক আছে। ভুজঙ্গ আমার অফিসের জুনিয়ার, ওকে সব কথা বলে আমি কাল সকালেই আপনাদের কাছে পৌঁছে যাব। চিন্তা করবেন না। আপনি ফিরে যান–ঋতা মা-র যেন কোনাে ক্ষতি না হয়। খবর রটে গেল গ্রামময়। মণীশবাবুর বাড়ির সামনে লােক ভেঙে পড়েছে। মারণ যজ্ঞ দেখার জন্যে সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এ সব যজ্ঞ বাড়ির ভেতরে হয় না। তাই উঠোনেই যজ্ঞের আয়ােজন হয়েছে। ইট দিয়ে ঘিরে তৈরি হয়েছে হােমকুণ্ড।

তার একপাশে সন্ন্যাসী—অন্য পাশে ঋতা। ঋতা খুব অস্থির। তার চোখ দুটো ঘুরছে  এদিক-ওদিক। ওকে ধরে বসে আছেন মণীশবাবু আর মলিনা দেবী। শুরু হল যজ্ঞ। দাউ দাউ করে ধরে উঠল হােমের আগুন। সন্ন্যাসী মন্ত্র পড়ে একটা করে ঘি মাখানাে বেলপাতা ঐ আগুনে ছুঁড়ে দিচ্ছেন আর প্রত্যেকবার ঋতা কেঁপে কেঁপে উঠছে। পালাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু সন্ন্যাসীর জন্য পারছে না। যজ্ঞ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসী একটা পােড়া জ্বলন্ত কাঠ হাতে তুলে নিলেন। উঠে দাঁড়ালেন। ঋতার কাছে এগিয়ে এলেন। ঋতা যে ভয় পেয়েছে বােঝা গেল। সন্ন্যাসী পােড়া কাঠ হাতে তুলে ঋতার দিকে আগিয়ে এনে বললেন-তুই কে বল।

—আমি জয়ন্তী। ঋতা উত্তর দিল।

শােন জয়ন্তী, তােমার সমস্ত গয়না রয়েছে তােমার স্বামীর কাছে। একটাও খােয়া যায়নি। তবে এসব পার্থিব বস্তু। আর তােমার ভােগে লাগবে না। এখনও তুমি এর মায়া করছ কেন? তার চেয়ে নিজের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা কর। তুমি লােভ- মােহ ত্যাগ করে মনটাকে তুলে নাও পৃথিবী থেকে, তবেই তােমার মুক্তি। দেখবে মুক্তি পেলে তুমি কত শান্তি পাবে। আর এরকম নরকযন্ত্রণা ভােগ করতে হবে না। তুমি ফিরে যাও জয়ন্তী। ঋতার সর্বনাশ কোর না। সন্ন্যাসী দেখলেন ঋতার মধ্যে কোনাে পরিবর্তন এলাে না। রূঢ় হলেন সন্নাসী। ভুজঙ্গবাবুর দিকে ফিরে বললেন—বাক্সটা খুলে ওর গয়নাগুলাে ওকে দেখান।

ভুজঙ্গবাবু ঋতার সামনে দাঁড়িয়ে গয়নার বাক্সটা খুলে দেখালেন। ঋতার চোখ দুটো ধক ধক করে জ্বলে উঠল আনন্দে। সন্ন্যাসী বললেন—গয়নাগুলাে তুমি নেবে? নিতে পার। নাও। ঋতা গয়নাগুলাের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল। সন্ন্যাসীর কথায় মাথা নেড়ে জানাল সে গয়না নেবে না। খুশি হল সন্ন্যাসী। বললেন—তাহলে শােন। দশ গােনার সঙ্গে সঙ্গে যদি ঋতাকে ছেড়ে না দাও তবে এই জ্বলন্ত পােড়া কাঠ তােমার পিঠে পড়বে। আর শুনে রাখ, না ছাড়লে আমার মন্ত্র তােমাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলবে। হাজার মুক্তি চাইলেও আর কোনােদিন মুক্তি পাবে না। আমি গুনতে শুরু করছি। এবার দেখ তুমি কি করবে। সন্ন্যাসী চেঁচিয়ে বললেন—সবাই বল এক। সকলে চেঁচিয়ে উঠল এক বলে। একটু সময় নিয়ে সন্ন্যাসী বললেন, দুই। সমবেত জনতাও চিৎকার করে উঠল দুই বলে। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে সকলে–কি হয়। জয়ন্তী ঋতাকে মুক্তি দেবে কি না।

সন্ন্যাসীর সমস্ত শরীর রাগে লাল হয়ে গেছে। তিনি চেলাকাঠটা তুলে ঋতার কাছে আসতে আসতে বলে ওঠে—সবাই বল, সাত। সকলে চিৎকার করে ওঠে, সাত। হঠাৎ একটা শোঁ শোঁ শব্দে সব থমকে গেল। গাছের মাথাগুলাে জোরে জোরে দুলতে লাগল। অথচ নীচে কোনাে হাওয়া নেই। মণীশবাবুর মনে পড়ল সেই আলেয়ার দিনের কথা। তা অজ্ঞান হয়ে এলিয়ে পড়ল মণীশবাবুর কোলে। একটা ঝনঝন শব্দ। কেউ যেন ভুজবাবুর হাত থেকে ফেলে দিল গয়নার বাক্সটা মাটিতে। দু-চারটে গয়না ছড়িয়ে পড়ল। ভুজঙ্গবাবু তুলতে যাচ্ছিলেন, সন্ন্যাসী ইশারায় বারণ করলেন। দেখা গেল, কোন এক অদৃশ্য শক্তি গয়নাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।

গলার হারটা শূন্যে উঠে দুলতে লাগল। কেউ যেন গলায় পরে দেখল। কিন্তু মন ভরল না। সব গয়না একে একে বাক্সয় ভরল কেউ। ভালা বন্ধ করল। তারপর বাক্সটা উঠে এল ভুজঙ্গবাবুর হাতে। দর্শকরা নির্বাক। এসব যে জয়ন্তীর অশরীরী আত্মাই করছে তাতে কোনো আর সন্দেহ রইল না কারাের মনে। সন্ন্যাসী মন্ত্রঃপূত জল ছিটিয়ে দিলেন ঋতার গায়ে। চোখ মেলে তাকাল ঋতা। এত লোক দেখে ভয় পেয়ে গেল। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল—মা, আমি এখানে কেন? মলিনা দেবী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন–না মা, ওসব কিছু না—আমরা একটু হােম করলাম। তুমি মা সন্ন্যাসী ঠাকুরকে প্রণাম কর। ঋতা প্রণাম করতেই সন্ন্যাসী মলিনা দেবীকে বললো– ওকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিন। ওর একটু বিশ্রাম কার। ভুজঙ্গবাবু, মৈনাকবাবু ফিরে যাবার আগে মণীশবাবুকে বললেন—যাক্, সব সমস্যার সমাধান হল তাহলে।

ভুজঙ্গবাবু বললেন–কিন্তু একটা সমস্যা তাে রয়েই গেল। মৈনাকবাবু বলেন—কি বলুন তো? ভুজঙ্গবাবু বললেন-কেন আলেয়া? যেটা দেখে আমি ডাকাত আসছে বলে মনে করেছিলুম–আর তাইতেই তাে এতবড় সর্বনাশটা হয়ে গেল । ভুজঙ্গবাবুর চোখের কোণ দুটো জলে চিকচিক করে উঠল। মণীশবাবু ভুজঙ্গবাবুর পিঠে হাত রেখে বলে ওঠেন—এটা কিন্তু কোনাে সমস্যা নয় ভুজবাবু—যদি মনে করতে পারেন এটা একটা বৈজ্ঞানিক সত্য। ভুজঙ্গবাবু আর মৈনাকবাবু দুজনেই একসঙ্গে মাথা নেড়ে বলে ওঠেন—ঠিক। বলেছেন, একদম ঠিক।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত