আত্না

আত্না

আমি যখনি মৃদুলের ছবিটা আকিঁ! অমনি মৃদুল সাদা একটা চাদর মুড়িয়ে কোথা থেকে যেন বাতাসের সাথে ভেসে চলে আসে।মৃদুল মারা গেছে আজ প্রায় ১ বছর হয়ে গেল তাও এক সড়ক দুর্ঘটনায়।সেদিন রাত ১১ টা বাজে আমার মোবাইলে এক অচেনা ফোন কল আসে।দৌড়ে গিয়ে রিসিভ করলাম ভাবলাম আজ সারাদিন যেহেতু মৃদুলের খোজঁ নেই তাহলে হয়ত মৃদুলই ফোন দিয়েছে।কিন্তু অচেনা নাম্বার দেখেও কি মনে করে যেন রিসিভ করলাম কারন সচরাচর আমি অচেনা ফোন কলগুলো রিসিভ করি না। যাই হোক, ফোনটা রিসিভ করার সাথে সাথে মৃদুলের কন্ঠ ভেসে আসল।কেমন যেন এক কান্না মিশ্রিত কাপাঁ কাপাঁ করুন কন্ঠ ছিল মৃদুলের।ও বলে উঠল,

_মিথি,খুব মনে পড়ছে তোমায়।মাথার বা পাশটায় কেমন যেন খুব বিশ্রী একটা ব্যাথা হচ্ছে।ব্যাথা হবে না কেন বলো!মাথার খুলিটা বোধ হয় বা পাশ থেকে একেবারেই ভেঙ্গে গেছে। সেখান থেকে কিছু মগজও বোধ হয় পিচডালা রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে।খুব কষ্ট হচ্ছে মিথি।আর বোধ হয় বাচাঁ হলো না,আর তোমার সাথে ছোট্ট একটা সংসারও বাধা হলো না।প্লিজ মাফ করে দিও মিথি! সারাজীবন বলেছিলাম পাশাপাশি থাকব এই প্রতিশ্রুতিটা আর রাখতে পারলাম না।কিন্তু মিথি ভালবাসি!

_কি ব্যাপার মৃদুল! কি বলছ তুমি এগুলো?ঠিক আছ তো তুমি?কি হইছে তোমার? হ্যালো! হ্যালো!

_নাহ্,ফোনটা কেটে গেল।এই মৃদুলটা যে কেন মাঝেমাঝে এমন অদ্ভুত আচরন করে আজো বুঝলাম না।কিন্তু যেই ঐ ফোনে কল দিতে গেলাম সাথে সাথে ফোনটা সুইচ অফ বলছে।ওর এই অদ্ভুত অদ্ভুত পাগলামি আর ভালো লাগে না। সেই বিকেল থেকে ওর নাম্বারটা ও সুইচ অফ। সাথে সাথে ফোন দিলাম ওর ক্লোজ ফ্রেন্ড রেহানের কাছে।

_হ্যালো রেহান! মৃদুলের কোন খোজঁ নেই সেই বিকেল থেকে। ফোনটাও সুইচ অফ।তুমি কি ওর কোনো খোজঁ জানো?

_হ্যা,আসলে মিথি তোমাকে ফোন দেইনি।

মৃদুল আজ গুরুতর ভাবে এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে।রোড পাড় হচ্ছিলাম ও আর আমি। হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা ট্রাক এসে ওকে চাপা দিয়ে চলে গেল।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার আমার কিছুই হলো না। মাথায় অনেকটা আঘাত লেগেছে ওর।ও এখন হসপিটালে ভর্তি আছে।

_সাথে সাথে এক অজানা কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।মনে হচ্ছিল দমটা বুঝি এখনি বের হয়ে যাবে আমার!সাথে সাথে রেহানের কাছ থেকে হসপিটালের ঠিকানা নিয়ে ঐ রাতেই বের হলাম কাদঁতে কাদঁতে। না জানি মৃদুল কতটা কষ্ট পাচ্ছে।কিন্তু এতক্ষন খেয়ালই করিনি যে বাহিরে প্রচুর বৃষ্টি আর বাতাস হচ্ছে।এতরাতে এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে আমি গাড়ি কোথায় পাব?বাসার নিচে ছাতা হাতে কাঁদতে কাঁদতে মাত্র এসে দাড়ালাম। এর মধ্যে হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা সাদা রঙ্গের সি এন জি এসে হাজির হলো।সাদা রঙের সি এন জি দেখে চমকে গেলাম।সত্যিই কি সাদা রঙ্গের সি এন জি হয় নাকি?যাই হোক কাঁদতে কাঁদতে বেশী একটা খেয়াল ছিল না।তাই উঠে বসলাম।

হঠাৎ ৫ মিনিটের মধ্যে সি এন জি আমাকে সেই হসপিটালের সামনে নিয়ে আসল অথচ আমি তাকে ঠিকানাই বলিনি।কিভাবে নিয়ে আসল সে, এটা জানতে চাইতেই বলল মৃদুল নাকি তাকে পাঠিয়েছে। কিন্তু মৃদুল তো অসুস্থ কিভাবে ও আমাকে ফোন দিল আবার সি এন জি পাঠালো?কিছু মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ যেই দৌড়িয়ে হসপিটালে ঢুকতে যাব ঠিক তখনি পিছন থেকে সেই সি এন জি চালকটা বলে উঠল আপা সাদা সি এন জি দেখে অবাক হয়েছেন তাই না! আরে আপা সাদা রং হচ্ছে মৃত্যুর প্রতীক।সামনে এক কঠিন মৃত্যু! এই বলে লোকটা এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে গাড়ি নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।আর কিছু প্রশ্ন করার সময়ই দিল না।

সাথে সাথে আমি মৃদুলের বেডে চলে গেলাম।ও পুরো অচেতন হয়ে পড়ে আছে সাদা রংয়ের বেডে।পাছে ওর বাবা মা সবাই বাহিরে কাঁদছে। আমিও কাঁদতে কাঁদতে ওর রুমে ঢুকলাম।ইস কি নিদারুন কষ্ট পাচ্ছিলাম ওকে দেখে।ওর হাতটা ছুঁতে গিয়েই হঠাৎ কে যেন অলৌকিকভাবে আমার হাতে জোরে একটা চিমটি কাটল।হঠাৎ হাত থেকে অঝোরে রক্ত বের হতে লাগল।সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে নার্সকে আর ডক্টরকে ডাকলাম। ওর বাবা মাও সাথেসাথে দৌড়িয়ে চলে আসল।আর হ্যা ওর সাথে আমার তিন মাস পর বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল তাই ওর ফ্যামিলির কেউ কিছু বলেনি আমাকে।

কিন্তু বাকি অবাকটা আমি তখনই হলাম, যখন দেখলাম আমার হাত থেকে প্রচুর রক্ত বের হচ্ছে কিন্তু কেউ এটা দেখছে না,এমনকি একটুপর সেখানে সাদা একটা দাগ হলো সেটাও কেউ দেখছে না আমি ছাড়া। এত সাদা রঙ দেখতে দেখতে আমি নিজেই পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।এরমধ্যে হঠাৎ মৃদুলের সেন্স ফিরে এলো।ও বলতে লাগল

_মিথি খুব কষ্ট হচ্ছে আমার! প্রানটা কেন যেন বের হচ্ছে না।

ওর কথা শুনে আবারো কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছিল।সত্যিই কি তাহলে মৃদুল মারা যাচ্ছে? হঠাৎ মৃদুল আমার হাতটা স্পর্শ করল আর বলল, আমি মরে যাচ্ছি মিথি।আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।খুব কষ্ট হচ্ছে আমার! এই বলে আমার হাত ধরে ও ছটফট করতে করতে হঠাৎ মারা গেল।প্রকৃতির নিয়মে ওকে দাফন করে কবরে রাখা হলো।তারপর ওকে একটা নজর খুব দেখতে ইচ্ছে হত।বুকের মধ্যে ধকধক করত।কিভাবে একটা তাজা মানুষ হেটে কবরে চলে গেল!

আমি ছোটবেলা থেকেই কিভাবে যেন যাকে দেখতাম হুবুহু তার ছবি আঁকতে পারতাম।ওর মৃত্যুর পর ওকে খুব মনে পড়েছিল তাই একদিন মাঝরাতে মোমবাতির আলোতে ওর ছবি আকতেঁ বসলাম।যেই ওর ছবি আকাঁ শেষ হলো ওমনি হঠাৎ জানালা দিয়ে জোরে একটা দমকা হাওয়া এসে আমার ঘরের সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে গেল।হঠাৎ মোমবাতিটাও নিভে গেল।আচমকা ভয় পেয়ে গেলাম।কিন্তু সেই ভয়টা কাটতেও দেরী হলো না।কারন হঠাৎ আমি ঝাপসা ঝাপসা মৃদুলকে দেখতে পেলাম সাদা একটা চাদর মুড়িয়ে হঠাৎ আমার সামনে এসে দাড়াল।আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে ছুতেই ও দূরে চলে গেল।

_মৃদুল তুমি! তুমি এখানে কিভাবে এলে?তুমি কি তাহলে বেচেঁ আছো?আর দরজা তো লাগানো তুমি কিভাবে রুমে আসলে?

_নাহ্ মিথি আমি বেচেঁ নেই।আমাকে এভাবে সবসময় মনে করলে আর ডাকলে আমি কিভাবে থাকব তোমাকে ছাড়া?জানো মিথি ঐ অন্ধকার কবরে থাকতে খুব ভয় হয় আমার! এরকম আরো অনেক কথা হলো ওর সাথে। আমাকে ছাড়া থাকতে নাকি ওর খুব কষ্ট হয়।তাই ও অন্ধকার কবরেও নাকি সঙ্গী হিসেবে আমাকেই চায়।

ও আমাকে বলেছে যখনি আমি মাঝরাতে ওর ছবি এঁকে ওকে ডাকব ও চলে আসবে মানে ওর আত্নাটা চলে আসবে আমার কাছে।এভাবে প্রায় একবছর ভালোই কাটছিল আমার আত্নারুপি মৃদুলের সাথে।তারপর ভেবে নিয়েছিলাম আর বিয়ে নামক বন্ধনে কারো সাথে জড়াবো না।কিন্তু ফ্যামিলির চাপে হঠাৎ একদিন বিয়ে করে নিলাম।আর ওকে মাঝরাতে ডাকার সুযোগ পেলাম না।একদিন হঠাৎ স্বপ্নে ও চোখ ছলছল করে আমার সামনে এসে দাড়িয়েছিল কিন্তু কোন কথা বলেনি। হয়ত ও অভিমান করেছিল।ঐ একদিনই তারপর আর ও স্বপ্নেও আসেনি।হয়ত আমাকে স্বার্থপর ভেবে নিয়েছিল কিন্তু আমি ছিলাম বাস্তবতার স্বীকার।যেটাকে মেনে না নিয়ে পারিনি।কিন্তু ওর সাথে যখনই দেখা হত কিছু কথা জানতে চাইতাম খুব করে ওর কাছে।আর সেগুলো হলো সেই প্রথমদিনের ফোনকল, সাদা রঙ্গের সি এন জি আর আমার হাতে সবার অলক্ষ্যে সেই চিমটি আর দাগের কথা।

কিন্তু কেন যেন ওর সামনে আসলে আমি মাতালের মত হয়ে যেতাম। বাস্তব জীবনের কিছু মনে থাকত না আমার।তাই আজো সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি। কিন্তু আজো মাঝরাতে যখনি আমি ওর কথা মনে করি আমার হাতের সেই সাদা দাগটা হঠাৎ টকটকে লাল বর্ণ ধারন করে সবার অলক্ষ্যে। যেটা আমি ছাড়া আজো আর কারো চোখে পড়েনি।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত