রক্তনেশা

রক্তনেশা

রক্তের ধারাটা খুব সুক্ষ্ম একটা ধারার আকারে এ অব্দি এসেছে। একটু সামনে লক্ষ্য করলেই বোঝা যাচ্ছে কিছু দূরেই অনেকটা রক্ত একত্রে দেখা যাবে। ইন্সপেক্টর নিবিড়ের আশঙ্কা একদম খাপে খাপে মিলে যেতেই তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন,”হুররা স্যার,আমরা পাজলটা সলভ করতে পেরেছি,লাশটা এখানেই পাওয়া গেছে!” পাজল সলভ করে লাশ পাওয়ার কারনে ইন্সপেক্টর নিবিড়ের মুখে আনন্দের আভাস পাওয়া গেলেও গোমরা হয়ে রয়েছে এসিপি আশরাফ মাহমুদের মুখ।

এ নিচে পাঁচটা খুন হলো,অথচ তদন্ত করে কিছুই পাওয়া গেলো না। খুনী বারবার একটা ধাঁধা ছেড়ে যায়,আর সে অনুযায়ী তারা লাশ খুঁজে বের করে। ব্যাপারটা ওপরমহলেও নাড়া দিয়েছে। এবার খুন হয়েছে অস্ট্রীয়া থেকে আসা আলেকজান্দ্রা। সে ডেঙ্গু রোগের ওপর গবেষনা করতে এসেছিলো এ দেশে। এসে নিজেই যে কারো অপারেশনের থিম হয়ে দাড়াবে তা কে জানতো? এবার বিদেশীনি খুন হয়েছে, তাই ব্যাপারটা সাংঘাতিক রূপ নিকে পারে। এসিপি আশরাফের চাকরীটাও নড়ে যেতে পারে। বলা যায় না!

মেয়েটার শরীরটা অপসেট কাগজের মতো ধবধবে হয়ে আছে। তার শরীরে এক বিন্দু রক্তও নেই। ছুড়িটা চালানো হয়েছে সরাসরি গলাতে। তবে ধারনা করা হচ্ছে মৃত্যুর পর ছুড়িটা চালানো হয়েছে মৃত্যু কনফার্মেশনের জন্য। পোস্টমর্টেমে ঘাড়ের পাশে একটা ক্যানেলা পুশ করার দাগ পাওয়া গিয়েছে। সম্ভবত এখান থেকেই শরীরের রক্ত সব শুষে নেয়া হয়েছে। কিন্ত কি এমন জিনিস ছিলো আলেকজান্দ্রার রক্তে!

এ নিয়ে পাচঁটা মেয়ে খুন হলো। প্রথমে খুন হলো এক খামাড়ির মেয়ে ময়না। গরীব ঘরের মেয়ে ছিলো। তাই তার কেসটা তেমন বেশীদূর আগায়নি। কে জানি গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে গিয়েছিলো। তা অনেক আগের কথা,ছ’মাস হয়েছে। তারপর আরো তিনটা মেয়ে মারা গেলো। একইরকম ভাবে। তাদের কারো ভেতরই কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ গরীবের মেয়ে,কেউ গৃহীনি,কেউ আবার কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী। ছ’মাসের মধ্যে চারজন মহিলা খুন হওয়াটা চাট্টিখানি কথা না। এসিপি আশরাফের কপালের ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। চাকরী বাঁচাতে তিনি খুবই চিন্তিত। দেশে তো এমন হারহামেশাই হয়! কত মেয়ে মারা যায়,কে কার খোঁজ রাখে?কিন্ত এবার মরেছে এক বিদেশীনি। মিডিয়া কোমর বেধে নামলে এসিপির চাকরীর বারোটা বেজে যাওয়া অসম্ভব কিছু না!

বারান্দায় রকিং চেয়ারটা শন শন করে দোল খাচ্ছে। তার কোলের উপর ছোটো একটা স্পাইরাল বাইন্ডিয়েং খাতা। অফিসাল ইম্প্যরটেন্ট ডকুমেন্টস সে সেখানটাতেই টুকে রাখে। কলমের নিবটা সে কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে রকিং চেয়ারে দোল খাচ্ছে। কপালের চামড়ার ভাঁজ দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত!

চার চারটে খুন হলো অথচ ভিক্টিমদের মধ্যে পারস্পারিক কোনো সম্পর্ক নেই। কেবল লাশগুলোর শরীরে রক্ত প্রায় ছিলোনা বললেই চলে এবং খুনগুলি একই অস্ত্র দ্বারা করা হয়েছে! এটুকুই ক্লু? অদ্ভুত! কিকরে খুনিকে খুঁজে পাবে সে। বাতাসে ফরফর করে খাতার পৃষ্ঠাগুলি উল্টে গেলো। সেখানে কিছু পাজল লেখা, যা সমাধান করেই লাশগুলোর সন্ধান পেয়েছে তারা। রহস্যের জাল ঘিরে ধরেছে তাদের, যে জাল থেকে বেড়ুনোর কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ করেই ইন্সপেক্টার নিবিড়ের ছোটো ছেলেটা রুমে ঢুকলো। দরজার আওয়াজ শুনে খানিকটা চমকে গেলেন তিনি। ছেলেটাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললেন,

-পড়া শেষ আব্বু? কাল কি পরীক্ষা?
-ম্যাথ। ছেলের মুখটা গম্ভীর দেখে তিনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
-কি হয়েছে? মুখটা এমন শুকনা কেনো?
-মা।

তখনই এক হাওয়ার ঝাপটায় স্পাইরাল বাইন্ডিয়ের পাতলা খাতার পৃষ্ঠাগুলি ফরফর করে উল্টে যেতে থাকলো। জনাব নিবিড় সামান্য কেঁপে উঠলেন।

-তোমার ছেলেটাকে একটু শাসন করো তো। বড্ড দুষ্টু হয়েছে।
-কেনো? কি হয়েছো?
-কাল পরীক্ষা আর আজ সে পিসিতে গেম খেলছে। বকেছি তাই মুখটা ভার করে আছে।

মিসেস ছায়া বেলকনিতে ঢুকতেই তাদের ছোটো ছেলেটা দৌড়ে বের হয়ে গেলো। চাঁদের আলো এসে পরেছে মিসেস ছায়ার শরীরে। তাকে দেখলে কেউ বলতেই পারবে না বয়সটা এবার পয়ত্রিশের ঘরে পরবে। তাকে দেখলে এখোনো ২০ বছর বয়স্কা যুবতী মনে হয়!

-আজ চাঁদ তো আমার মিসেস কে দেখে লজ্জা পাবে! এত সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায়।
-কাল তোমার আনা টোটকা টা কাজ করেছে। আগেরগুলোর চাইতে ঢের ভালো।
-বিদেশী টোটকা! দেখতে হবে তো!
-বসো তুমি আমি চা নিয়ে আসছি।

মিসেস ছায়া চা আনতে রান্নাঘরে চলে গেলেন। জনাব নিবির স্টোররুমে গিয়ে সেখানে রাখা তালা মারা পুরোনো সিদ্ধুকটা খুলে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন খাজাকিস্তানের ছুড়িটার উপর। লোকটার কাছ থেকে খুব কড়া দামেই এই ছুড়িটি কিনেছিলেন জনাব নিবিড়। এমন ছুড়ি এদেশে পাওয়া যায় না। যদিও বুদ্ধিটা মিসেস ছায়ারই ছিলো! যুবতিদের রক্তে স্নান করলে নাকি সৌন্দর্য ঠিকরে বের হয়।

প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি লাগতো জনাব নিবিড়ের। ইদানিং আর তার তেমন লাগে না। যুবতীদের খুন করার সময় তাদের কোমল শরীরের সংস্পর্শ যেনো সব খারাপ লাগা শেষ করে দেয়। শুধু গলায় ছুড়িটা চালানোর সময় একটু অবশ্য খারাপ লাগে তার। কিন্ত তার সুন্দরী স্ত্রীর বায়না! না মেনে উপায় কি? “ছায়া সত্যিই দিনদিন রুপবতী হচ্ছে!” নিজের স্ত্রীর এত সৌন্দর্য দেখে খুব পুলকিত মনেই আবার পাঁচ নম্বর ধাঁধা লিখতে লিখতে রকিং চেয়ারে দোল খেতে লাগলেন জনাব নিবিড়।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত