নকুলের অতৃপ্ত আত্মা

নকুলের অতৃপ্ত আত্মা

“আমি শুনেছিলাম মনীশ দা নাকি কাপালিক। মরা মানুষের মাংস খাওয়া তার অভ্যাস। কাপালিকদের অসাধ্য সাধন করতে অনেক কিছুই করতে হয়। মরার মাংস খাওয়া তো ছেলেখেলা”। কথা গুলো এক নিশ্বাসে নকুল কে বললাম আমি।

অনেকক্ষণ থেকে একটা মরার আশায় বসে আছি আমি আর নকুল ঘোষ। আষাঢ় মাসের বন্যায় অনেক মরাই দাহ বা কবর না দিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয় মানুষজন। আজ একটা মরা লাগবে। মনীশ দা খুব করে বলেছে। যদি একটা মরা দিতে পারি তাহলে গলা পর্যন্ত তাড়ি খাওয়াবে।

নদীর এই বাঁকটার প্রত্যেকবার বর্ষায় প্রচুর মরা ভেসে আসে। দিনে মরা চুরি করা যাবে না। মানুষজন দেখলে সন্দেহ করবে। আর মরা চুরি করেই বা হবে কি?মনীশ দা যে এতো মরা দিয়ে কি করে! এর আগের বর্ষায় তিন তিনটে মরা দিয়েছি। তার মধ্যে ছিল দুটো শিশু আর একটা বুড়ির মরা। একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি। মনীশ দা কম বয়সী মরা পেলে খুশি হয়। আর সেটা যদি হয় কোনো যুবতী মেয়ের মরা তাহলে তো কোনো কথাই নেই।

নদীর এই বাঁকটায় মরা এসে ভিড়ে। টাটকা মরা, বাসি মরা। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে বসে আছি। নদীর স্রোতে ভেসে আসা মরার অপেক্ষায়। বাতাসের সাথে নদীর স্রোত বয়ে চলেছে। অথচ মরার দেখা নাই। এরমধ্যে নকুল ওর ভাঙ্গা হাড়ির মতন গলার মধ্যে দিয়ে বলে উঠলো ” কি’গো বিষ্ণুদা? আজ কি কোনো মরা আসবে না নাকি গো! তাড়ির জন্য মনটা কেমন ছটফট করছে। একটা মরা পেলে তুলে নিয়ে গিয়ে মনীশদাকে দিলেই তো পেট ভরে তাড়ি গিলতে পারতাম”। আমি বিড়িতে শেষ টান দিয়ে নকুল কে বললাম ” সবুর কর, বাতাস বাড়ছে। মরা এলে শেষ রাতের আগেই আসবে”।

নকুল হচ্ছে আমাদের গায়ের সেরা তাড়িখোর। এক চুমুক তাড়ির জন্য মরার মাংস খেতেও ওর রুচিতে বাঁধবে না। ছোটবেলায় গলায় একটা অসুখ হলে পরে ওর কণ্ঠস্বর বদলে যায়। কথা বললে মনে হয় মানুষ নয়। মাটির ভাঙ্গা হাড়ির মধ্যে থেকে শব্দ বেরিয়ে আসছে। আজ ওকে তাড়ির কথা বলার সাথে সাথে মরা চুরি করতে চলে এসেছে।

হঠাৎ বাতাসের সাথে একটা তীব্র পঁচা গন্ধ নাকে ভেসে এলো। নকুল বলে উঠলো ” বিষ্ণুদা, কপাল আমাদের খুলেছে, বলেই ওর ভাঙ্গা গলায় হাসতে শুরু করলো”। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে পাশের মাটিতে রাখা মশালে আগুন জ্বালালাম। লুঙ্গি কোমরে প্যাঁচ দিয়ে দুজন নেমে গেলাম নদীর পানির মধ্যে। যতোই পানিতে নামছি ততোই শরীর ডুবে যাচ্ছে পানির মধ্যে। গভীর রাতে নদীর পানির মধ্যে দুজন এভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। পাশেই রয়েছে গোবিন্দগড়ের শ্মশান। বুক পানিতে যেতেই নকুল বলে উঠলো ” বিষ্ণুদা, এতো দেখছি মানুষের মরা না, একটা গরুর মরা । কিন্তু গন্ধটা তো মানুষের মরার মতন ছিল। ধ্যাত! চলো, উপড়ে গিয়ে বিড়ি টানি। আমি বললাম “না, আর উপড়ে গিয়ে কাজ নেই। আমার কানের উপরে যে বিড়িটা আছে ওটা মশালের আগুনে ধরিয়ে নে। এর মধ্যে যদি কোনো মরা আসে। বারবার পানিতে নামতে ইচ্ছে করে না”।

বুক পানিতে নেমে মশাল হাতে নিয়ে দুজন বিড়ি টানছি এমন সময় ঠিক দুজনার মাঝখানে একটা মরা ভেসে উঠলো। হঠাৎ এভাবে মরা ভেসে উঠায় দুপা পিছিয়ে গিয়েছিলাম। নকুল ব্যাপার টা লক্ষ্য করে হেসে উঠলো। বিড়িটা ফেলে দিয়ে মরাটার কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা ছেলের মরা। মশালের আলোয় মরার গায়ের রঙ দেখে শরীরের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ বয়ে গেলো। মানুষের শরীর এতো কালো হয়! সময় নষ্ট না করে মরার পা ধরে নদীর ধারের দিকে টানা শুরু করলাম। আমি মরা টানছি পিছুপিছু নকুল মশাল নিয়ে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ পিছনের মশালের আলো নিভে গেলো। পানির মধ্যে ডুব দিলে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমনি একটা শব্দ শুনতে পেয়ে পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখি নকুল নেই। অন্ধকারে কয়েকবার নকুল নকুল করে ডাকলাম। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। কাককালো অন্ধকার, তারমধ্যে মাঝ নদীতে একটা মরার পা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। পিছন থেকে নকুলও উধাও। ভয়ে আমার পা কাঁপতে লাগলো। কাঁপা কাঁপা গলায় আবার ডাকতে লাগলাম, নকুল! নকুল! স্রোতের মতন আমার ডাক নদীর চারপাশে ভেসে যেতে লাগলো। তাড়াতাড়ি বুক পকেট থেকে কাঠি ম্যাচ বের করে মরার পা ছেড়ে দিয়ে আগুন জ্বালাতে লাগলাম। সেই আগুনের মৃদু আলোয় চারপাশে নকুলকে খুঁজতে লাগলাম। নেই আশেপাশে নকুল নেই। হঠাৎ মরার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। এতক্ষণ এ আমি কার পা ধরে টেনে এনেছি । এটা যে নকুলের পা। নকুল কি মারা গেছে?

সাথে সাথে মরার পা ছেড়ে নদীর ধারের দিকে দৌঁড়ে যেতে লাগলাম। নদীর স্রোত বেড়ে গেলো। নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তীরের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু স্রোত বয়ে যাচ্ছে আমার বিপরীতে। আমি বারবার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু পারছি না। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে এগিয়ে যেতে দিচ্ছে না। হঠাৎ পিছন থেকে নকুলের গলা শুনতে পেলাম। নকুল তারা ভাঙ্গা গলা দিয়ে বলছে ” বিষ্ণু দা! ও বিষ্ণু দা! আমাকে সাথে নিবে না? আমি কি মরা না?

ভয়ে আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে এলো। চিৎকার করতে লাগলাম। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে তীরের দিকে ছুটতে লাগলাম। পিছন থেকে শুনতে পেলাম নকুলের সেই অপার্থিব হাসি। তীরে পৌঁছে বাড়ির দিকে লক্ষ্য করে দিলাম এক দৌঁড়। অর্ধেক রাস্তায় এসে পায়ের সাথে কিছু একটার হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারালাম।

পরদিন জ্ঞান ফিরলে শুনলাম। শেষরাতে গ্রামের মাঝিরা নদীর রাস্তায় আমাকে খুঁজে পায়। নকুল বেঁচে নেই। কয়েকদিন আগে তাড়ি খেয়ে পানিতে ডুবে মরেছে। আজ সকালবেলা ওর গলিত লাশ নদীতে ভেসে উঠছে।

তাহলে গতরাতে আমার সাথে কে নদীতে নেমেছিল? নকুল, না নকুলের অতৃপ্ত আত্মা?

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত