রাক্ষসী ভূত

রাক্ষসী ভূত

রাত এখন ১২টা, বৃষ্টির কারনে বাসায় যেতে পারছি না। সারাদিন অফিসে কাজ করে অনেক ক্লান্ত লাগছে। সেই কখন থেকে বৃষ্টি হচ্ছে থামার নাম গন্ধই নিচ্ছে না। সিনেমার নায়ক হলে হয়তো আশেপাশে থাকা জিনিসপত্র দিয়ে ছাতা বানিয়ে নিতাম। এদিকেতো আবার আমার সাথে কোনো নায়িকাও নাই? থাক ভাই, আজ নাহয় নায়ক নাই’বা হলাম।

অন্যদিকে আবার ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ভেতর ৩য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে চলেছে । এইতো সামনেই একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। একটু ভিজে গিয়ে ওই বাড়িতে আজ রাত না হয় আশ্রয় নিলে ভালো হবে। আমারতো আবার বৃষ্টিতে ভিজলে সমস্যা করে। দোকানের সামনেই বা কতক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো? এই এলাকায় আমি নতুন এসেছি মাস খানেক হবে, পুরাতন হলে কিছু একটা ব্যবস্থা করাই যেত। আমি আবার ভূত ভয় পাইনা কিন্তু একা থাকলে খালি ভূতের কথা মনে পরে কেন? সেইদিন দাদাভাই গল্প করতেছিলো

-দাদাভাইঃ আমার বয়স যখন ১৮ তখনও আমি ভূত ভয় পেতাম না। বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে একরাতে কবরস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। রাতে বাসার সব ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে বালিশ-টালিশ নিয়ে বীরপুরুষের মতো কবস্থানে ঘুমানোর উদ্যেশে রওনা দিলাম। কিছুক্ষণ পরেই কবরে পৌঁছে গেছিলাম। রাত্রি গভীর হচ্ছে কিন্তু ভূতের কোনো নাম গন্ধই তো পাচ্ছিলাম না? তাহলে এখানকার ভূতেরা মনে হয় অবসরপ্রাপ্ত ভূত । কিন্তু না, একটু পরই আমি কিছু একটা লক্ষ্য করতে পেলাম।

আমি যেই কবরটার মধ্যে আছি তার থেকে কিছুটা দূরে একটা কবরস্থান থেকে লাশ বেড়িয়ে আসতেছে। কিন্তু এক করব থেকে ২টা লাশ কিভাবে বের হবে? তাও আবার একটা লাশ আরেকটা লাশকে টেনে করব থেকে বের করছে? ততক্ষণে আমার শরিরে ঘামের ঝর্ণা বইছে। বিষয়টা ভালো ভাবে দেখার উদ্দেশ্য করে সেই কবরের পাশে গেলে, একটা লাশ আমাকে দেখে আরেকটা লাশকে রেখে দৌড়ে পালায়। আমিও কিছু একটা মনে করে সেই লাশের পিছু পিছু দৌড়াচ্ছিলাম৷ একসময় সেই লাশটা হাতের নাগালে চলে আসলে আমি আর লাশকে কোনো প্রশ্ন করতে হয়নি,সেই বকবক করে সব বলে দিচ্ছিলো। হ্যাঁ এইটা কোনো লাশ ছিলো না,এইটা ছিলো কাফন চোর।

-দাদাভাইঃ-আজ তোর একদিন কি আমার একদিন
-চোরঃ- আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন,আমি পেটের যন্ত্রণায় এইসব করি
-দাদাভাইঃ- পেটের যন্ত্রণায় কি তুই এই দুনিয়ায় একা আছিস? বাকি যারা আছে কই তারাতো মেহনত করে খাচ্ছে। আর চুরি করলে অন্য কিছু কর মৃত ব্যক্তির জিনিসপত্র নিয়ে টানাটানি করিস কেন? আবার অন্য কিছু বলেছি বলে অন্য কিছু চুরি করতে যাস না।

-চোরঃ- আমার ১৪ গুষ্ঠির কসম, আমি আর চুরি করুম না ভাই আমারে ছাইড়া দিন।
-দাদাভাইঃ- ছাড়তে পারি, তবে আমার একটা শর্ত আছে। আজকের রাতটা তুই আমার সাথেই এই কবরে থাকবি তাহলেই তোকে ছেড়ে দিবো।
-চোরঃ- কিন্তু আপনার বাসা থাকতে আপনি কবরে থাকতে আসছেন কোন দুঃখে?
-দাদাভাইঃ- আর বলিস না, বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছি কবরে এক রাত থেকে যাবো আর ভূত দেখার ইচ্ছাও আছে আমার অনেক। আচ্ছা তুই কখনো ভুত দেখেছিস?

-চোরঃ- হ্যাঁ ভূত দেখেছি বটে কিন্তু কবরেতো ভূত থাকেনা, থাকলেও এগুলো ভালো ধরনের ভূত। যদি কখনো খারাপ ভূতের পাল্লায় পরেন তখন পাক-পবিত্র অবস্থায় কবরে চলে আসবেন। কেননা খারাপ ভূতেরা কবরে আসতে পারেনা।  (সাব্বাশ – চোরও দেখি অনেক বড় জ্ঞানী )  অতঃপর চুরের সাথে ওদিক-সেদিক হাটাহাটি করছিলাম। রাত প্রায় ৩টা, হঠাৎ কারো কারো হাটার মতো একটি আওয়াজ কানে ভেসে আসলো। আমিতো ভয়ে ততক্ষণে চোরটাকে জরিয়ে ধরে আল্লাহ আল্লাহ করতেছিলাম।

-দাদাভাইঃ- এইটা কার পায়ের আওয়াজ?
-চোরঃ- এইটা একটা খারাপ জ্বীনের পায়ের আওয়াজ।
-দাদাভাইঃ- তুমি কেমনে জানলে?
-চোরঃ- আমিইতো ডেকে আনলাম, আপনার না ভূত দেখার খুব শখ?

(যাহহ বাবা- এই চোরটা যে সাধারণ কেউনা আমি অনেক আগেই টের পেয়েছিলাম) এইগুলা ভাবতেছিলাম ওমনি সময় বিচ্ছিরী ও ভয়ংকর চেহারার একটি মেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। সাথে সাথে ভূত দেখার আহ্লাদও যেন বাচাও বাচাও বলে মন সাগরে সাতার কাটতে লাগলো। আমিতো ভাই সাথে সাথেই অজ্ঞান। পরেরদিন চোখ খুলে দেখি বাড়িতে নিজের ঘরে শুয়ে আছি আর আমার চারপাশে পরিবারের লোকজনের ভীড়। আমি এখানে কিভাবে আসলাম সেটা জানতে চাইলে তারা বলে, মাথায় টুপি-গায়ে পাঞ্জাবি আর উঁচু লম্বা একজন মানুষ নাকি আমাকে বাড়িতে দিয়ে গেছেন।

তারপরের কিছুদিন এই বিষয়টা নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে জানতে পারি ওই চোর কোনো সাধারণত মানুষ ছিলোনা। সেও জ্বীন-ভূত জাতীয় কিছু একটা ছিলো। হয়তো কবরস্থানে আমার কোনো খারাপ কিছু হয়ে যেত? সেই জন্যই হয়তো সৃষ্টিকর্তার হুকুমে এই অদ্ভুত লোকটির সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়ে যায়? হয়তো আমার সাথে পরিচয় হওয়ার জন্যই কবর থেকে লাশ বের করার দৃশ্যটা একটা বাহানা ছিলো মাত্র? এই গল্পটা শুনিয়ে দাদাভাই আমাদেরকে আরেকটি ভূতের গল্প শুনাতে চাইলো। আমার সহপাঠীরা সেখানে বসে থাকলেও আমি সেখান থেকে এক দৌড়ে এসে আম্মুর কোলে ঝাপ দিয়ে উঠে বসলাম। (দাদাভাইয়ের মুখে এই গল্পটা শুনে আমার একটানা প্রায় তিন দিন যাবত জ্বর ছিলো।) কিন্তু আজকের এই বিপদের দিনে আমার সাথে ভালো বা খারাপ কোনো ভূতেরই যেন দেখা না হয়।

ভূত তো ভাই ভূতই সেটা ভালো হোক বা খারাপ আমারতো ভয় করবেই। দূর! খালি ভূতের কথাই চিন্তা করছি কেন? এদিকে যে অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে আর আমাকেতো কিছু খেতে হবে, সেটা চিন্তা না করে খালি ভূত আর ভূত।
(এই কথাটা বলে নিজেই নিজেকে ভেটকাচ্ছিলাম। যতই বলুন না কেন- মনকে সাহস না দিতে পারলে, না হবে রাতে থাকার যায়গা না হবে খাবারের কোনো ব্যবস্থা। এইটা কিন্তু শুধুই আপনাদেরকে বললাম আপনারা আবার আমার মনকে এইসব বলতে যাইয়েন না, বেচারা অভিমান করবে।)  দেখি ওই বাড়িতে ঢুকে একটু আশ্রয় নিয়ে কিছু খাবার-টাবার পাই কি না? যদি সাহায্যে করতে বাড়িওয়ালার মন ঠেলাঠেলি করে, তারজন্য নাহয় টাকাও দিয়ে দিবো ।  এই কথা ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেই বাড়িটার দিকে। কিছুক্ষণ আগানোর পর লক্ষ্য করলাম, রাস্তার বাম পাশে থাকা ঝোপটা যেন নড়াচড়া করছে। যাহ্ বাবা, দাদাভাইয়ের সেই ভূত মেয়েটি এখন প্রতিশোধ নিতে এখানে চলে আসলো নাকি? পায়ের জুতা হাতে নিয়ে একটু বড় গলায় চিল্লাইয়া ফাল্লাইয়া বলতে লাগলাম

আমিঃ- আমি দাদাভাইয়ের নাতি নই,আমি দাদাভাইয়ের নাতি নই  (এই বলে আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা দৌড়। আমি আবার খুব বুদ্ধিমানও বটে।) যেই দৌড়াইতেছিলাম ওমনি একটা কারেন্টের পিলারের সাথে এমন জুড়ে ধাক্কা খেয়ে পাশে থাকা ছোট্ট গর্তে ধপাস করে পরে গেলাম। এমন ভাব নিচ্ছিলাম যেন আমি একটা আঘাতও পাইনি। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো,এখনতো অনেক রাত, ভাব নিয়ে লাভ কি? তার থেকে একটু উহহ আহ্ করতেই পারি কেউতো আর দেখবেনা। গর্তে শুয়ে শুয়ে উহহ আহহ করতে করতে ঝোপটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এখনো ঝোপটা অদ্ভূত ভাবে নড়াচড়া করছে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। আমি যদি সেই ভূত মেয়েটিকে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেই তাহলে হয়তো সে ভাববে,

-আমি এতো কুৎসিত থাকা সত্যেও ছেলেটা আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। তার মানে ছেলেটা আসলেই খুব ভালো।
এইগুলা ভেবে আমাকে ছেড়েও দিতে পারে। যদি পরবর্তীতে আমাকে বিয়ে করার জন্য উঠে পরে লাগে তখন আমি দুঃখিত বলে ফিরিয়ে দিতে পারবো।

(বাহহ আমিতো আসলেই বুদ্ধিমান? তাহলে একটু অপেক্ষা করি ভূতটি ঝোপের ভেতর থেকে তার কাজ শেষ করে বেরিয়ে আসার)  ঝোপটা নড়াচড়া করেই যাচ্ছিল কিন্তু সেখান থেকে কিছু বের হচ্ছিলনা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, হামাগুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে ঝোপের খানিকটা পাশে চলে যাবো। তারপর সেখান থেকে ভূত মেয়েটিকে মধুর কন্ঠে “ওগো শুনছো” বলে ডেকে দেখবো ভালো কিছু হয় কি না? এই ভেবে হামাগুড়ি দিচ্ছি। ইতিমধ্যেই আমি ঝোপের প্রায় পাশাপাশি চলে আসছি। যেই ঝোপের একদম কাছাকাছি চলে আসলাম, ওমনি সময় ঝোপের ভেতর থেকে একটি কুকুর বেড়িয়ে ঘেউঘেউ করে দৌড়ে পালালো। মনে মনে ভাবলাম  যাহ ভাই, তুই এতক্ষন আমাকে ঝালাচ্ছিলি? আমি আরো তোর ভয়ে ভূতকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিছিলাম। অন্যদিকে আবার আমার অর্ধেক অার্মির ট্রেনিংও শেষ হয়ে গেছে বোধহয়? অনেক হইছে সাহসীকতা এবার সেই বাড়িতে ঢুকেই ছাড়বো। তারপর আমি সেই বাড়িতে ঢুকে পরলাম। বাড়িতে ঢুকে বললাম

আমিঃ- বাড়িতে কেউ আছেন? ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই। আমি আবারো ঢাকলাম

আমিঃ- বাড়িতে কেউ আছেন? আবারো কোনো উত্তর আসলো না। আবার রেগেমেগে বলতে লাগলাম

আমিঃ- বাড়িতে কেউ আছেন? বাড়িতে কেউ আছেন? কেউ কি নাই? মরছে সবাই?

কিছুক্ষণ চিল্লাচিল্লি করার পর, একজন বয়স্ক মহিলা দরজা খুললেন। দরজা খুলে আমার মুখের দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছিলেন মনে হচ্ছিলো তিনি তার মেলায় হারিয়ে যাওয়া সেই প্রেমিক কে খুঁজে পেয়েছেন।

মহিলাঃ আমাকে কি কেউ শান্তিতে একটু ঘুমাতে দিবে না? একটু পরেইতো আমার মেয়েটিও খাবার দাও খাবার দাও বলে কাঁদবে।  (মহিলার কথা শুনে মনে হচ্ছিলো তার ছোট বাচ্চা আছে, কিন্তু এই বয়সে উনার বাচ্চা কেমনে থাকবে?)

আমিঃ আসলে আমার বাসা অনেক দূরে। বৃষ্টির কারণে আমি বাসায় যেতে পারিনি, এখন বৃষ্টি কমে গেলেও গাড়িঘোড়া কিছুই পাচ্ছিনা। ভাবলাম আপনার বাসায় এসে আজকের রাতটা পার করে দিবো। আমার না খুব ক্ষুধা লাগছে, কিছু মনে না করলে আমাকে কি একটু খাবার দিবেন?  (মহিলার মনে হয় আমার প্রতি মায়া লেগেছিলো। কিছু একটা মনে করে ভেতরে আসতে বললো।)

মহিলাঃ- কিন্তু তোমার গায়ে এতো কাদা কেন বাবা?

আমিঃ- আর বলিয়েন আন্টি, এই একটু অার্মির ট্রেনিং দিতে যেয়ে এই অবস্থা। ছাড়েনতো এইসব। আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো তার কোনো ভাষা আমার জানা নেই।

মহিলাঃ- আরে কি বলছো বাবা, তুমিতো আমার ছেলের মতোই। তোমার মতো আমার একটা মেয়েও আছে। সেও যদি এইভাবে বিপদে পরে তোমার কাছে যেত তাহলে কি তুমি সাহায্য করতে না?

আমিঃ- তাতো অবশ্যই করতাম।

মহিলাঃ- আচ্ছা বাবা, যাও তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো আমি তোমায় খাবার এনে দেই।  (তারপর আমি ফ্রেশ হতে বাথরুম চলে যাই।)

গোসল করার জন্য সব ব্যবস্থা করে নিলাম। গায়ে সাবান মেখে পানি দিতে লাগলাম, অবশেষে সব সমস্যার সমাধান পাওয়াই গেলো। এখন গোসল দিয়ে খেয়ে একটু ঘুমাবো। গায়ে পানি ঢালছিলাম, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম পানি রক্তের মতো লাল। আমি ভয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। তারপর ভালো করে তাকিয়ে দেখিলাম, কই রক্ত কই পানিই তো আছে?
তাহলে কি ভূতের ভয় এখনো যায়নি?

গোসল দেওয়া শেষ করে খাবার টেবিলে বসলাম। খাবার টেবিলে চেয়ার ছিলো ৩ টা। মহিলা আন্টি আমাকে একটায় বসতে বললেন। একটায় তিনি বসলেন আরেকটায় বসার জন্য কেউ একজনকে “আয় মা আয়” বলে ডাকতেছিলেন। কিন্তু শুধু তিনিই কথা বলে যাচ্ছেন এবং সাথে সাথে উত্তরও দিচ্ছেন। কই আমিতো মহিলা ছাড়া আর কাউকে দেখতে ও শুনতে পাচ্ছিনা? আমি চিন্তায় পরে গেলাম। আজকে কি হচ্ছে আমার সাথে? আমি মহিলাকে জিগ্যেস করলাম

আমিঃ- আন্টি, আপনি কার সাথে কথা বলছেন?

মহিলাঃ- কেন আমার মেয়ে? এইতো আমার মেয়ে। তখন তার কথাই তো তোমায় বলছিলাম। দেখনা বাবা, তোমাকে দেখে লজ্জায় আসতেছেনা।  (আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ নাই। কিন্তু মনে হচ্ছিলো, মহিলাটি অসুস্থতার কারণে এমন করছেন। হতেওতো পারে এইটাও কোনো না কোনো একটা রোগ?)  আমি সব দেখেছি এই ভ্যান করে বলতে লাগলাম

আমিঃ- আরে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আপনি আসতে পারেন।

( তারপর মহিলা আন্টি মুচকি হাসি দিলেন। মনে মনে ভাবলাম হয়তো কাজ হয়ে গেছে?) তারপর আমাকে খাবার তুলে দিলেন এবং তিনিও নিলেন। কিন্তু তিনি যাকে মেয়ে বলছেন তার খাবার আর মহিলা আন্টির খাবার যেন ভিন্ন? অনেক বিশাল বিশাল মাচ ভাজা, আস্ত একটা মুরগী। বিষয়টা খুব অদ্ভুত লাগলো আমার কাছে। মনে হচ্ছিলো ল অনেকদিনের উপোস করে আজ খেতে বসেছে। এদিকে আমি ক্ষিধের যন্ত্রণায় চুপচাপ খেয়ে আন্টিকে বললাম আমার রুম দেখিয়ে দিতে। আন্টি রুম দেখিয়ে দিলে আমি তাড়াহুড়ো করে রুমে চলে গেলাম এবং বিছানায় শুয়ে পরলাম। এখন খানিকটা আরাম লাগছে। রাত ৩ঃ৫৫ কিছুক্ষণ পর সকাল হয়ে যাবে, তাহলে আমি বাসায় চলে যেতে পারবো। দুই-এক ঘন্টা ঘুমালে মাথা থেকে সব চিন্ত-ভয় চলে যাবে। এইভেবে ঘুমাই পরলাম। ৫ মিনিট পর হটাৎ ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে দেখি আমি বিছানার নিচে।

-একি হলো? আমি বিছানার নিচে কিভাবে আসলাম। হয়তো ঘুমের মধ্যেই কোনো ভাবে চলে আসছি। কিন্তু এমনটাতো এর আগে কোনোদিন হয়নি? আর আমিতো গড়াগড়িও তেমন একটা করিনা। যাই হোক আবার উঠে ঘুমাই পরি৷

তারপর আমি বিছানার নিচ থেকে উপরে উঠে আগের মতো ঘুমিয়ে পরলাম। কিছুক্ষণ পর আবারো ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে দেখি আমি বিছানায় ঠিকই আছি কিন্তু আমি সহ বিছানা ছাদের সাথে লেগে আছে? মনে মনে ভয় কাজ করলেও কেন জানিনা মনে হচ্ছিলো আমার ভেতরে সুপার পাওয়ার চলে আসছে। পরিক্ষা করতে আবার চোখ বন্ধ করে খুলে দেখি আমি একটা জংগলে শুয়ে আছি। এইটা কি হলো? আবার চোখ বন্ধ করে মনে মনে বললাম।

-নিবিই যখন আমেরিকায় নিয়ে যাহ।

তারপর চোখ খুলে দেখি আমি আবার আগের মতোই বিছানার নিচে। এখন আমার মনে ভয় কাজ করতে লাগলো। আমি বিছানার নিচ থেকে বেরিয়ে দরজার দিকে যেতে চাইলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আমি চিৎকার করতে থাকি। কিন্তু আমার এইগুলা দেখে কে যেন হাসছিলো, তাও মেয়েলী কন্ঠে? আমিও একদিকে ভয় পাচ্ছিলাম অন্যদিকে সেই মেয়েটির সাথে তাল মিলিয়ে হেহেহে করে হাসতেছিলাম। আমার হাসি শুনে মেয়েটি নিজের হাসি বন্ধ করে দিলো। তখন আমি বললাম

আমিঃ- কি হলো? হাসি বন্ধ করে দিলেন যে? জানেন আপনার হাসিটা খুব মিষ্টি  (আমার কথা শুনে মেয়েটি আবার হেসে দিলো। এবার যেন খুব মধুর কন্ঠে হাসিটা আমার কানে ভেসে আসলো)

আমিঃ- এইভাবে লুকিয়ে না থেকে দেখা দিন, আমি জানি আপনি কোনো মানুষ না।

(এই কথাটা বলে নিজেকে খুব জ্ঞানী আর সাহসী প্রমাণ কর‍তে চাচ্ছিলাম। কিন্তু এদিকে হাটু দুইটার কাঁপুনি যদি কেউ দেখতো তাহলে নিশ্চয়ই বলতো আমি নাচতেছি) আমার মুখে সেই কথাটি শুনে, ছোট্ট কন্ঠস্বরে মেয়েটি উত্তর দিলো

মেয়েটিঃ- আপনি কিভাবে জানলেন?

আমিঃ- সেটা পরে বলা যাবে। আগে আপনাকে দেখার ভাগ্য করে দিন?

তারপর মেয়েটি অদৃশ্য হতে দৃশ্যমান হয়ে আমার চোখের সামনে চলে আসলো। আমারতো প্রায় অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। একদিকে মেয়েটি একটা ভূত, আবার অন্যদিকে চেহারা এতো কুৎসিত আর ভয়ংকর আগে জানলে দেখতেই চাইতাম না। (তখনতো লজ্জায় সামনে আসছিলো না,এখন দেখি এখানে এসে ঠাট্টা করা শুরু করে দিছে? কি দিন আইলো রে বাবা, এখন ভূতেরাও লজ্জা পায়।) মেয়েটিকে দেখে আমি পালাতে চাইলে মেয়েটি আমাকে পালাতে দিচ্ছিলোনা।

মেয়েঃ- জানতাম আমাকে দেখে তুই ভয় পেয়ে যাবি। তুই কি ভেবেছিস, তুই অনেক বড় জ্ঞানী? আমি তোকে এতক্ষণে মেরে তোর রক্ত খেয়ে নিজের ক্ষুধার জ্বালা মিঠাইতাম। কিন্তু তোকে মারিনি কেন জানিস? তোকে দেখে আমার মায়া লেগে গেছিলো। এই প্রথমবার কোনো মানুষ দেখে আমার মায়া লেগে গেছে।  (এই মেয়েটি কি সেই মেয়ে যার কথা দাদাভাই বলেছিলো? নাকি ওই মহিলা আন্টি দাদাভাইয়ের গল্পের ভূত আর আমার গল্পে মহিলার মেয়ে? সব ভূতেরা কি আমার দাদা-নাতির পিছনে পরলো? আমি এদিকে ভয়ে কাঁপছিলাম, সিদ্ধান্ত নিলাম আন্টিকে ডাক দিবো। আন্টিকে ডাক দিতে চাইলে মেয়েটি আমায় বলে উঠে)

মেয়েঃ- মা কে ডেকে লাভ নেই, মা-ও তোমাদের মতো মানুষ না। তবে তোকে আমি মারবো না যদি তুই আমাকে কিছু দিয়ে দিস।

আমিঃ- কি চান আপনি?

মেয়েঃ-প্রতিদিন আমাকে মানুষের তাজা রক্ত দিতে পারবি? তাহলে তোকে আমি ছেড়ে দিবো।  (এইটা ভূত না রাক্ষস আল্লাহ জানে)

আমিঃ- আর কোনো রাস্তা নাই আমাকে ছেড়ে দেওয়ার? আচ্ছা আমাকে কি কয়েকটা রাস্তা দেওয়া যায়না?আপনার কণ্ঠটি কিন্তু খুব সুন্দর। (এইবার ভূতের মুখে বিচ্ছিরি হাসি দেখে অজ্ঞান হবার অবস্থা)

মেয়েঃ- তুই সত্যিই খুব চালাক। যা তোকে কিছু দিতে হবেনা তুই শুধু আমাকে তোর বউ বানিয়ে ফেল।
(খাইছে রে, এতোক্ষণ যা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো সেটাই হয়ে গেলো? শেষ পর্যন্ত একটা ভূত আমার বউ হতে চলেছে? তাও এমন রাক্ষসী ভূত। না বাবা আমার প্রয়োজন নাই। এমন ভূতকে বিয়ে করার থেকে আমি সারাজীবন দেবদাস হয়েই কাটিয়ে নিবো। )

আমিঃ- কিন্তু আমিতো বিবাহিত, আমার ৩-৪টা বাচ্ছা আছে। আমার শশুড়-শাশুড়ির কি হবে? আমার না অনেক বয়স হয়ে গেছে, আমি খুব তাড়াতাড়ি মরে যাবো। আমায় বিয়ে করে লাভ নেই। আপনি বরং আপনার জাতিও কাউকে বিয়ে করে নিন। (ভয়ের কারণে উল্টা পাল্টা বকছিলাম। হুদাই মিত্যা বলে বাচতে চাইছিলাম) ততক্ষণে ভূতটি রেগে গিয়ে আরো কুৎসিত রুপ ধারণ করে বলতে লাগলো

-মেয়েঃ- তোকে দয়া দেখাইছি বলে তুই আমার সাথে যা ইচ্ছে তাই করবি? এখন আর তোর কোনো নিস্তার নেই। এখন তোকে মরতেই হবে।

তারপর মেয়েটি খুব দ্রুতই রেগেমেগে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। আমি ভয়ে পালাতে চাইলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। ততক্ষণে মেয়েটি আমায় ধরে ফেললো, অতঃপর ফজরের আযান হয়ে গেল এবং সাথে সাথেই সেই ভূত মেয়েটিও অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি আর দেরি না করে বাড়ি থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাড়ি থেকে বের হয়ে যখন দৌড়াচ্ছিলাম তখন রাস্তায় পরে থাকা পাথরের সাথে ধাক্কা লেগে একটা গাছের পাশে পরে গিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম। সেখানে থাকা অবস্থায় কাঁদতেছিলাম। একটু পর মনে হলো কে যেন আমার কাঁধে হাত রেখেছে। আমি ভয়ে আরো কেঁপে উঠলাম। আমি ভেবেছিলাম হয়তো সেই ভূতের কবল থেকে আমি রক্ষা পেয়ে গেছি কিন্তু না। এই মেয়েটিতো আমার পিছনে লেগেই আছে। আজ হয়তো এই ধরায় আমার শেষ দিন। পিছনে তাকিয়ে দেখি একজন হুজুর আমার কাঁধে হাত রাখছেন। আমি ততক্ষণে উনাকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। তিনি হয়তো বুঝতেই পারছিলেন আমি ভয়ে কান্নাকাটি করছিলাম। তিনি আমাকে বললেন

-হুজুরঃ- কি হয়েছে বাবা? (তারপর আমি হুজুরকে সব খুলে বললাম।)  হুজুর বললেন

-হুজুরঃ- এরা হলো জ্বীন শয়তান। ভাগ্যিস তোমার হায়াত তাকায় এবং ফজরের আযান হওয়ায় তুমি সেখান থেকে বেচে ফিরেছো। নাহয় ওরা যে তোমার সাথে কি করতো আল্লাহ মালুম। তাছাড়া এই বাড়িটি অনেক পুরোনো আর ভৌতিক। মাঝে মাঝে এই বাড়ি থেকে মানুষের রক্তের গন্ধ আশেপাশে থাকা প্রতিবেশীরা পেয়ে থাকে। অনেক সময় আবার সেই বাড়ি থেকে খাবার দাও খাবার দাও বলে চিল্লাচিল্লির আওয়াজ ভেসে আসে। স্থানীয়রা বলেছেন বছরে একটা না একটা লাশ সেখান থেকে পুলিশ উদ্ধার করেই থাকে। এদেরকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনেক বড় বড় জ্বীন সাধকরাও হার মেনে চলে যায়। অভিজ্ঞদের মতে এরা শুধু তাদের বাড়ির ভেতরেই শক্তি দেখাতে পারে। বাড়ির বাহিরে আসলে তেমন একটা শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনা। প্রতিদিন নানান ভাবে এরা মানুষকে ফাঁদে ফেলে বাড়ির দিকে আহবান করে। এখানকার সবাই এই বিষয়টি জানে তাই সবাই খুব সতর্ক হয়ে চলে। বিশেষ করে তারা তোমাদের মতো এখানে নতুন আশা মানুষদের ছলনার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।

(হুজুরের থেকে কথাগুলো শুনে বুঝতে পারলাম আমি জীবনের বাচা বেচে গেছি। লক্ষ কুটি শুকরিয়া আল্লাহর দরবারে) তারপর হুজুর আমাকে উনার বাসায় নিয়ে জান। আমি সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিজের বাসায় চলে যাই। হুজুর বলেছিলেন কোনো সমস্যা হলে যেন আমি উনার কাছেই আসি। কিছুদিন অসুস্থতায় দিনকাল কাটলো। মাঝে মাঝে সেই মেয়েটি আমাকে খুব ঝালাইতো। একা থাকলে মনে হইতো মেয়েটি আমার পাশে বসে আছে।কখনো কখনো আবার হাসাহাসির শব্দ পেতাম আমি। আমি আর দেরি না করে সেই হুজুরের কাছে চলে যাই। হুজুর আমাকে একজন ভালো কবিরাজের কাছে যেতে বললেন। হুজুরের কথামতো আমি কবিরাজের কাছে গিয়ে চিকিৎসা করালাম। কিছুদিন পর সুস্থও হয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে সব ভুলে গিয়ে আবারো সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করতে লাগলাম।

সেই ঘটনার পর দেখতে দেখতে আজ প্রায় তিন বছর কেটে গেল। এদিকে আবার অফিসে আমি প্রমোশনও পেয়ে গেছিলাম। আজকেও অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার সময় বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমি ৩ বছর আগের সেই দোকানটায় দাঁড়ালাম। তৎক্ষনাৎ তিন বছর আগের সেই ঘটনা মনে পরে গেলো। আমি সেই বাড়িটির দিকে তাকাচ্ছিলাম আর ভাবতেছিলাম জীবন বাচিঁয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা। এখন রাত ১১টা বাজে, এখানে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণ পরেই দৌড়াতে শুরু করলাম। কিন্তু এইবার আর কোনো ভূতের পাল্লায় পরে দৌড়াচ্ছি না। এইবার আমি বৃষ্টিতে ভিজেই দৌড়াচ্ছিলাম। দোকানেতো দাঁড়িয়েছিলাম জরুরি ফাইলগুলো যাতে বৃষ্টিতে না ভেজে সেই ব্যবস্থা করতে। ভূতের পাল্লায় পরা থেকে বৃষ্টিতে ভিজে একটু জ্বর আর ঠান্ডা লাগাও ভালো। আজকেও সেইদিনের মতো খুব ক্ষুধা লাগছিলো।  কিন্তু এখন আমি কারনে-অকারণে সময়ে-অসময়ে নিজের সাথে টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে রাখি। আগেই বলেছিলাম আমি কিন্তু খুব বুদ্ধিমান। এইভাবে নিজেই নিজের প্রশংসা করতে ভিষণ ভালো লাগে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত