অন্তিম ডাক

অন্তিম ডাক

সোনাই তুমি যদি এক্ষুনি না ঘুমাও তাহলে কিন্ত হালুম বুড়ো এসে ধরবে । পাশের ঘর থেকে অভীক বলল ” মিতু সবে মাত্র রাত আটটা এখনি কি ও ঘুমাবে , শুধু শুধুই তুমি চেষ্টা করছো । বাদ দাও ,ওর যখন ঘুম পাবে ও ঠি ক ঘুমাবে । ”

মিতুর মুখের ডগায় কথা তৈরীই ছিল । একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল ” তোমার তো সবেতেই বাদ দাও । বাদ দিয়ে দিয়ে তো এই অবস্থা হয়েছে । বিয়ের আগে বললে তোমার বাবাতো আর বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবেনা তাই আগে বিয়েটা সেরেনি , তারপর চকরিটা পালটে নেবো । তা বিয়ের পরেও প্রায় হাফ যুগ হতে তো বেশী বাকি নেই আর কিন্ত কোথায় কি ? এখানে সাত মাইলের মধ্যে কোন জন মানুষ নেই , খালি পোঁকামাকড় আর জীব জন্তু । রাত আটটাতেই মনে হচ্ছে রাত বারোটা । আর আমি একবছর দেখবো । আমি কিন্ত এখানে সোনাইকে বড়ো করবো না । আমি কোলকাতায় চলে যাবো ।

আমি তো চেষ্টা করছি মিতু । অভীক গলার স্বর কয়েক ধাপ নামিয়ে এনে বলল ” আমারও কি ছাই এখানে থাকতে ভালো লাগে ? তুমি তো জানো আমি কেমন হুল্লোর বাজ ছেলে আমি । আমারো কি বন জঙ্গলে পড়ে থাকতে ভালোলাগে ? এখানের একঘেয়ে জীবনে আমিও হাপিয়ে উঠেছি । আমি চেষ্টা করছি মিতু । ওদিকে মিতু তখনও সোনাইকে ঘুম পাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছ ” হালুম বুড়ো আয়তো সোনাই কে ধরে নিয়ে যা । এক বছর সাত মাসের সোনাই তখন অ্যা অ্যা এ্যা এ্যা আওয়াজ করে ঘরের চারপাশে চোখ ঘুড়িয়ে হালুম বুড়োকে খুঁজে চলেছে ।

অভীক দুপুরের খাবারটা সাধারণত বাড়ীতেই খায় । আজ অবশ্য দুপুর বললে বেশি বলা হবে । সূর্য আজ বড়ো অভিমানী তাই দেখা দেয়নি , তা অভিমানী হবে নাই বা কেন ? তিন দিন ধরে সেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তা আর থামবার নামই নেই। এমনিতেই উত্তর পূর্ব ভারতের এই এলাকায় বৃষ্টির পরিমান বেশী । সারাবছরই ছিঁচকাঁদুনে ঘ্যনঘ্যনে বাচ্চাদের মতো মুখ ভার করে আছে । বছরের বেশি সময়টা রেনকোট আর গামবুট পড়ে ঘুড়তে হয় । হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টির মুখোমুখি হওয়াতে সর্বক্ষন একটানা সোঁ সোঁ আওয়াজ । তাতে ইন্ধন জোগায় বড়ো মাঝারি গাছগুলো । একটানা বৃষ্টিতে মানুষের মতো তাদের কোন অভিযোগ নেই , তারা যেন ধ্যান মগ্ন নত মস্তক শিষ্য । চারিদিক এক দুর্বদ্ধ ধূসর রঙের চাদরে ঢাকা পড়ে রয়েছে সবকিছু ।

কখনও মুশলধারে বৃষ্টি তার সঙ্গে কোন অচেনা প্রানীর কর্কশ উল্লাশ ধবনি আবার কখন বৃষ্টির ঝাপটা কম হতে হতে একটানা ঝিঁ ঝিঁ দের একঘেয়ে অস্থিত্ব । অভীক দুপুরে বাড়ীতে ফিরে দেখল মা আর ছেলের রাম রাবনের যুদ্ধ হচ্ছে । সোনাই খানিক ভাতের দলা মুখে নিয়ে সারা বাড়ী ঘুরছে , ওর পিছনে ওর মা । সেও ঘুরছে । মুখে যুগ যুগ ধরে যত কাল্পনিক দৈত্য দানব আছে তাদের ডাকাডাকি হচ্ছে । সোনাই তাদের থোড়াই না ডড়ায় , সেও যে কম বীরপুরুষ নয় আজ সেটা ও প্রামান করেই ছাড়বে । সে হাতে প্লাস্টিকের লাল ব্যাটটাকে অনেকটা তরোয়ালের মতো করে ধরে নিয়েছে , ভাবটা এমন সম্রাট আকবর আজই সারা ভারত জয় করে বাড়ী ফিরবেন । আর মুখে অনর্গল অবধ্য ভাষা , যার মানে উদ্ধার করা ভগবানেরও সাধ্য নেই , ওর বাবা মাতো কোন ছাড় ।

আধভেজা জামাকাপড় পাল্টে নিতে অভীক বাথরুমে ঢুকলো । মনে মনে ঠি ক করে নিল আজ আর অফিস যাবেনা । ঝড় বৃষ্টিতে গাছপালা ভেঙে পড়ার খবর এলে তখন দেখা যাবে , একবার রাউন্ড মেরে আসা যাবেখোন । আপাতত খিচুরি আর ডিম ভাজা খেয়ে গায়ে কাঁথটা টেনে টানা একটা ঘুম মারবে । যদি ছেলে ঘুমাতে দেয় । ওর হিজিবিজি চিন্তায় ছেদ পড়ল বাথরুমের দরজা ধাক্কানোর আওয়াজে । ও বলল ” কি হয়েছে ? ”

মিতু বলল ” তাড়াতাড়ি এসো “আসলে সোনাই এতো দুষ্টু যে অভীকের সব সময় টেনশন থাকে ওঁকে নিয়ে । তাই ও ভাবল নিশ্চই সোনাইয়ের কিছু হয়েছে । দরজা খুলে মিতুর কোলে সোনাইকে দেখে সে ভুল ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে একটু নিশ্চিত হল । মিতু কোন ভূমিকা ছাড়া শোবার ঘরের জানলাটার দিকে আঙ্গুল তুলে বলল ” ওখানে কেউ আছে ” অভীক অবাক হয়ে বলল ” মানে ? ওখানে কে থাকবে ? এই বৃষ্টির মধ্যে কে আসবে লোকের বাড়ী চুরি করতে দিন দুপুরে । আর আমি তো এই মাত্র বাইরে থেকে এলাম । মিতু জোড় দিয়ে বলল ” না আমি স্পষ্ট শুনেছি , ওখানে কেউ আছে । “এবার অভীক একটু বিরক্ত হল বলল ” চারিদিকে তো খালি বৃষ্টির আওয়াজ তার মধ্যে কোথা থেকে কি শুনেছো তার ঠি ক নেই । আর জানলা দরজাতো সব বন্ধ ভেতর থেকে । চোর এলে যা চায় দিয়ে দেবো । “মিতু অভীকের হাতটা চেপে ধরল । চোখে অস্বভাবিক রকমের ভয় । হাতটা ঠান্ডা । বলল ” না গো , আমি শুনলাম । আগেও শুনেছি ।”

অভীক মিতুর অবস্থাটা বুঝতে পারে । সাউথ কোলকাতার মেয়ে ও । ওদের বাড়ী থেকে দুপা গেলেই গড়িয়াহাট । ও এভাবে কোনদিন থাকেনি । এই জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে শুধু ওঁকে ভালোবাসে বলে । তারমধ্যে ছেলেটাও হয়েছে অসম্ভব দুষ্টু । অভীক মিতুর ঠান্ডা হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরে বলল ” সামনের মাসে তুমি একটু কোলকাতা থেকে ঘুরে এসো মিতু । আমি টি কিট করে দি ? মিতু রেগে গিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল । বলল ” তুমি কেন বিশ্বাস করছো না ? আমি সত্যই শুনেছি ? অভীক বলল ” কি শুনেছো ?”

সেদিন দুপুরে সোনাই ঘুমাচ্ছিল না । আমি ওঁকে জুজুবুড়ীর ভয় দেখালাম । বললাম না ঘুমালে কিন্ত আমি জুজুবুড়িকে ডাকবো । অভি তুমি না শুনলে বিশ্বাস করবে না । আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম কেউ বলল আসছি । ”
অভীক অত্যাশ্চর্য হয়ে বলল ” মানে ? কে আসবে ? ” মিতু এমনিতেই খুব ফর্সা আর চোখ গুলো বড় বড় । অভীক দেখল মিতুর ফর্সা গাল উত্তেজনায় লালচে লাগছে । চোখদুটো ভয়ে যেন আরো বড়ো বিস্ফোরিত হয়ে রয়েছে । মিতু বিরক্ত হয়ে বলল ” উফ্ তুমি বুঝতে চাইছোনা কেন ? আমি যেমন মিথ্যা মিথ্যা করে সোনাইকে ভয় দেখাই হালুম বুড়ো আয়তো সেরকমই ডাকলাম জুজু আয় তো । বাইরে যেন কিছুটা দূর থেকে কেউ ক্ষণা ক্ষণা গলায় কাঁপা স্বরে বলল আসছি ই ই ই । আজ তুমি বাড়ীতে আছো তাই ভাবলাম সাহস করে আরেকবার বলে দেখিই না কি হয় । আজও সেই এক জিনিস বিশ্বাস কর । ”

আসলে এখানে আশেপাশের বহু গরীব মানুষ বনের মধ্যে শুকনো কাঠ কুড়োতে আসে । তারা মজা করে থাকতে পারে । তবে এই বৃষ্টির মধ্যে আর কে কাঠ কুড়োতে আসবে ? মিতুও ভয় পেয়ে ভুল শুনে থাকতে পারে । অভীক তাই মিতুকে আসস্থ করার জন্য বলল ” তুমি আমার জন্য বেশী করে কাঁচা লঙকা দিয়ে ডবল ডিমের একটা ওমলেট বানাও দেখি । আমি ততক্ষন বাইরেটা ঘুড়ে দেখে আসি । ছাতাটা এনে দাও । ”

অভীক ছাতা মাথায় গামবুট পড়ে যখন বাইরে পা দিল দেখল বৃষ্টি বেশ খানিকটা ধরে এসেছে । ও বেড়নোর সময় হাতে একটা মোটা লাঠিও নিয়ে এসেছে । বলাতো যায়না কোন বদমাইস লোক হয়ত করছে । কার কি উদ্দেশ্য কে জানে । অভীক শুধু ওর কোয়ার্টারসের চারপাশটাই দেখল তা নয়ে বেশ খানিকটা অঞ্চল ঘুরে দেখল । দূরে মজুমদারের কোয়ার্টারসটা দেখাস যাচ্ছে ।

ও ঠি ক করল কাল অফিসে গিয়ে মজুমদারকে কথাটা বলতে হবে । দরকার হলে নজরদারি বাড়াতে হবে । গাছ কেটে জঙ্গলের পর জঙ্গল সাফ করে দিচ্ছে প্রকৃতির শত্রু কিছু মানুষ । এসব তাদেরই কাজ নয়তো । ওঁকে ভয় দেখিয়ে এখান থেকে সরানোর ধান্দা নয় তো ? কারন ও এখানে আসার পর খুব কড়া হাতে এগুলো বন্ধ করেছে । এখন কাঠ চোরাচালান অনেকটাই বন্ধ । অভীক ঠি ক করল মিতুকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দেবে কয়েকদিনের জন্য । এসবই হাবিজাবি সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ও প্রায় নিজের কোয়ার্টাসের কাছা কাছি চলে এসেছে । শুনতে পেল সোনাই জোড়ে চিৎকার করে কাঁদছে । এটা অবশ্য কিছু নতুন নয় তবুও অভীক জোড়ে পা চালাল ।

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অভীক বলল ” মিতু বাইরে তো সেরকম কিছু দেখলাম না , আমি কাল তোমার জন্য কোলকাতার টি কিট করে দিচ্ছি , কদিনের জন্য ঘুরে এসো । অভীক কথা সম্পুর্ণ করতে পারলো না সোনাই টলমল পায়ে বাবার গলার আওয়াজ শুনে আগের থেকেও উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এলো । সোনাইকে কোলে তুলে নিয়ে অভীক বলল ” মা কোথায় সোনা ? মিতু উ ” মিতুর কোন আওয়াজ পেলোনা অভীক । ও ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াল । মিতুকে পেল ঘরের মাঝখানে । মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে । চোখ দুটো সিলিং দেখছে । না আর কোন অস্বাভাবিকতা নেই ওর শরীরে শুধু প্রানটা নেই ওই শরীরে ।

অনুরাধা দেবী প্রায় এক ঘন্টা ধরে চেষ্টা করে সোনাইকে একদলা ভাতও খাওয়াতে পারেনি । নাওয়া খাওয়া ছেড়ে বিশ্ব ভ্রমনে বেড়িয়েছে এমন ভাব নিয়ে সোনাই তার পছন্দের তিনচাকার লাল সাইকেলটায় চড়ে নিয়েছে তারপর সারা বাড়ী সেটা চড়ে ঘুড়ে বেড়াচছে , মাঝে মাঝে সাইকেলের সামনের প্লাস্টিকের হর্নটা ওর নরম হাতের তালুর চাপ পেয়ে বেজে উঠছে । ঠামুর কাছে এসে মাঝে মাঝে ভাতের দলা মুখে নিচ্ছে কিন্ত কিছুটা দূরে গিয়ে সেটা মুখ থেকে টুক করে ফেলে দিচ্ছে ।

অনুরাধা দেবী কপট রাগ দেখিয়ে বলল গাছ থেকে কিন্ত ব্রেমৰদততি সব দেখছে । সোনাই এখন নতুন কথা বলা শিখেছে তাই সবার সব কথা ওর রিপিট করা চাই । ব্রমভদততি শুনে ও বেশ কয়েকবার বলার চেষ্টা করল । সোনাই যতো বড় হয়ে উঠছে ততো দুষ্টু হচ্ছে । অনুরাধা দেবীর পক্ষে ওঁকে সামলানো খুব মুসকিলের । মিতুর ওভাবে হঠাৎ করে চলে যাওয়াটা ওরা কেউই মেনে নিতে পারছেনা । অভীক চেয়েছিল সোনাইকে ওর মার কাছে মনে অনুরাধা দেবীর কাছে পাঠিয়ে দেবেন । কিন্ত অনুরাধা দেবী তাতে রাজি হলনা । বলল ” না অভি তুই চাকরি বদল কর । ততদিন আমি তোর এখানে থাকবো । তুই একা এখানে থাকবি সেটাই বা কিভাবে সম্ভব ? অল্প বয়সে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে মেয়েকে স্কুল টিচারি করে একা হাতে মানুষ করেছেন । শেষ বয়সে একটু শান্তি পাবেন ভেবেছিলেন , কিন্ত একি অঘটন ।

তাও তো মৃত্যুটা কেমন যেন অদ্ভুত । সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে তার হঠাৎ করে হার্ট এটাক্ হয়ে গেল ? দুষ্টু লোকজন মজাও তো করতে পারে । এতে এতটা ভয় পেল ও । মিতুর কথা ভাবলেই অনুরাধা দেবীর হাজারো চিনতা মাথায় আসে । যেগুলোর সহজ হিসাব মেলাতে পারেন না উনি । সারাজীবন একা একা লড়াই করে এসব কুসংস্কার অন্ধবিশ্বাসে বিশ্বাসী নন উনি । আত্মীয়পরিজন মধ্যে সাহসী বলে ওনার সুনাম আছে । সেখানে এমন একটা অদ্ভুত ঘটনা উনি কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না । উনি এবার সোনাইকে বললেন ” তুমি যদি এক্ষুনি না খেয়ে নাও আমি কিন্ত জুজুকে ডাকবো । “সোনাই আধো আধো স্বরে বলল ” কুতায় ঝু ঝু ? এবারে অনুরাধা দেবী ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা অনুভব করলেন । মনে মনে নিজেকে স্থির করলেন আর বললেন ” জুজু আয় তো । অনুরাধা দেবীর দেখাদেখি সোনাইও আধো আধো স্বরে বলে উঠল ” ঝু ঝু আইতু ” ।

সন্ধ্যাবেলা অভীক যখন বাড়ী ফিরল , দূর থেকে দেখল বাড়ীতে তখন আলো জ্বলেনি । ওর নিজের অজান্তেই ওর হাঁটার গতি দ্রুত হল । দরজার সামনে থেকে ঘরের মধ্যে ও সোনাইয়ের লাল সাইকেলের হর্নের একটানা প্যাঁয় য় য় আওয়াজ শুনতে পেল । কাছে গিয়ে দেখল সোনাই সাইকেলের সীটে বসে আছে আর ওর মাথাটা সাইকেলের হর্নের উপর উপুর হয়ে পড়ে রয়েছে আর তাতেই এক অজানা জগত থেকে সন্ধ্যার নিস্তবতাকে খান খান করে কিসের যেন এক করুন ভয়ানক বার্তা পাঠাচ্ছে বিশ্ব সংসারে । মজুমদার বলল পৌঁছে একটা খবর দিও । তোমার বৌদি রাতের খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে খেয়ে নিও । নিজেকে একটু শক্ত কর অভীক । কি আর বলল বলো তোমাকে ?অভীক আর কিছু চিনতা ভাবনা করার মতো অবস্থায় নেই । ও চাকরিতে রিজাইন দিয়ে দিয়েছে । ও কাল কোলকাতা ফিরে যাবে ।

অভীক বলল ” আমার জন্য চিনতা করবেন না । আমি ঠিক আছি । হাতের গ্লাসে বড়ো করে চুমুক দিয়ে অভীক বলল আপনি আর দেরি করবেন না । রাত হলে বৌদি চিন্তা করবে । মজুমদার গ্লাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে বলল ” হ্যাঁ আজ তাহলে উঠি বুঝলে । কাল সকালে তুমি যাওয়ার আগে একবার আসবো । বাড়ীর বাইরে পা দিয়ে মাজুমদার বলল ” আজ ঝেঁপে নামবে বুঝলে । আজ মনে হচ্ছে প্রলয় হবে । দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে অভীক বলল ” কি করে বুঝলেন ” আরে দেখছোনা আকাশের রং জমাট বাঁধা রক্তের মতো লাল । গাছ গুলো অপেক্ষা করছে প্রকৃতির নির্দেশের জন্য । নির্দেশ পেলেই তান্ডব শুরু হবে । তুমি ঘরে যাও । দরজা বন্ধ করে দাও । ” অভীককে শুভ রাত্রি জানিয়ে মজুমদার নিজের বাড়ীর দিকে দ্রুত পা বাড়াল ।

অভীক কিন্ত ঘরে গেলনা । যার নিজের জীবনের উপর দিয়ে প্রলয় বয়ে গেছে , তান্ডবে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে জীবনটা তার কাছে প্রকৃতির এই ইচ্ছা মতো চোখ রাঙানি এক সাধারন ঘটনা ছাড়া আর কিছু না । মা মিতু সবকিছু হারিয়ে ওঁকে আজ আর কোন পৃথিবীর শোক তাপ আনন্দ স্পর্ষ করতে পারেনা । অভীক চিৎকার করে উঠল ” সোনাই ই ই ” । অভীকের সেই চিৎকার জমাট বাঁধা রক্তের মতো লাল আকাশের গায়ে ধাক্কা মেরে ফিরে এলো তান্ডবের জন্য অপেক্ষারত গাছগুলোর গায়ে । সেখান থেকে দূরে আরো দূরে একসময় বিন্দু হতে হতে মিলিয়ে গেল চিৎকারটা । কিন্ত কোন সারা এলোনা শুধু হাওয়ার দ্রুত থেকে দ্রুততর বয়ে যাওয়ার আওয়াজ ছাড়া ।

অভীক এবার প্রবল ক্রোধে চিৎকার করল ” জুজু আয় তো ? ” চারিদিক কাঁপিয়ে খুব কাছে কড়্ কড়্ শব্দে কোথাও একটা বাঁজ পড়ল । বাঁজ পড়ার আওয়াজের রেশটুকু রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে রাতের অন্ধকারের বুক চিড়ে অভীকের কানে আরেকটা আওয়াজ এসে ধাক্কা মারলো । সে আওয়াজ ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ। মানুষের শরীরের মধ্যে গিয়ে তা যেন মানুষকে চলত শক্তিহীন করে দেয় । কিন্ত অভীক মনে মনে প্রস্তুত হয়েই ছিল । ও দৌড়ে বাড়ীর মধ্য ঢুকে গেল রান্নাঘর থেকে সবচেয়ে বড়ো ছুটিটা নেওয়ার জন্য ।

ও যেতে যেতে আরো একবার চিৎকার করল ” জুজু আয়তো ? এবারে অভীকের বাড়ীর খুব কাছ থেকে আওয়াজটা বলল ” আসছি ই ই ” । অভীক হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে উত্তেজনায় ছুড়ি হাতে বাইরে বেড়িয়ে এলো । কাঁপতে কাঁপতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল ” কোথায় তুই আয় দেখি ” । কোথাও কোন আওয়াজ হলনা একটানা হওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ ছাড়া । দুমিনিট অপেক্ষা করে কোথাও কোন আওয়াজ না পেয়ে অভি বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে আগের থেকেও দ্বিগুন জোড়ে বলল ” জুজু আয় তো । ” অভীকের পিছনে ঘরের মধ্যে থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় খুব শান্তভাবে কেউ বলল ” এসেছি ।।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত