কিউরিও ঘর

কিউরিও ঘর

বিরাট ব্যবসায়ী কোটিপতি নবেন শীলের একমাত্র ছেলে নবরূপ শীল। ছােটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় নবরূপের একেবারেই মন দেই। ও বুঝতে পেরেছিল তার বাবার যা টাকাপয়সা তাতে তাকে আর কষ্ট করে পড়াশােনা করে চাকরি করে খেতে হবে না। আর ব্যবসা! এর জন্য তো আর পড়াশােনা লাগে না, লাগে বুদ্ধি। সেটা ওর যথেষ্ট আছে বলে তার ধারণা হয়েছিল। মা অল্প বয়সেই চলে গেছেন। আর ব্যবসার খাতিরে বাবা নরেন শীলকে থাকতে হয় বেশির ভাগ সময় বাইরে। সুতরাং বখে যাওয়া ছেলের দিকে তার নজর দেবারও সময় ছিল না। ছােটবেলা থেকেই নিজের বন্ধু-বান্ধব আড্ডা নিয়ে কাটিয়ে দিত নবরূপ। অবশ্য লেখাপড়া যে একদম করেনি তা নয়। স্কুল ফাইনালটা কোনােরকমে পেরিয়েছিল। নরেন শীলও হয়তাে মনে করতেন ব্যবসায়ীর ছেলে ব্যবসায়ী হবে সেই তো কাম্য।

আর সেইজন্যেই হয়তাে নবরূপ যখন বলল সে একটা ঘর প্রাচীন দুপ্রাপ্য জিনিস দিয়ে সাজাবে তখন হয়তাে নরেন শীল ভেবেছিলেন আইডিয়াটা মন্দ নয়। ভবিষ্যতে কিউরিও জিনিসের দাম দেশের বাজারে বা আক্তর্জাতিক বাজারে দশগুণ লাভ এনে দেবে। সুতরাং মােটা মােটা টাকা দিয়ে ছেলের এই কিউরিও করার শখটাকে তিনি জিইয়ে রাখলেন।

নবরূপেরও এটা একটা নেশার মতাে হয়ে গেল। পার্ক স্ট্রীটের দোকানগুলােতে তাকে প্রায় দেখা যেতে লাগল, কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল নবরূপের কিউরিও ঘর রীতিমতাে ভরে উঠেছে। নবরূপের বিশাল অট্টালিকা। ওর নিজেরই তিনখানা বড় বড় ঘর। তারই মধ্যে যেটা বারান্দার এককোণের ঘর সেটাই তার কিউরিও ঘর। যত লােকজন আসে নিজের হাতে কিউরিও ঘর খুলে সবাইকে দেখায়। কি নেই তাতে। কতরকম পাথর, বিভিন্ন রকমের কলম, নানান দেশের টাকাপয়সা, বিভিন্ন দেশের অদ্ভুত অদ্ভুত সব মৃর্তি, কাটগ্লাসের নানারকম জিনিসপত্র, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাচীন নিদর্শন, বেশ ভালই সংগ্রহ করেছে নবরূপ। কিন্তু এতেও তার মন ভরেনি। সে রােজ বিকেলে বেরিয়ে দোকানে দোকানে ঘােরে কয়েকটা দোকানের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বও হয় গেছে। বিশেষ করে স্যামুয়েল সাহেবের সঙ্গে। সেদিনও নবরুপ তার নিজের ফিয়েটে করে হাজির হল স্যামুয়েলের দোকানে। স্যামুয়েল সেই মুহূর্তে দোকানে ছিলেন না।

নবরূপ দেখল ঘরের এককোণে একটা ছােট প্যাকিং বাক্স, তখনও খােলা হয়নি। নবরূপ দোকানের কর্মচারীকে ডেকে জিগ্যেস করল—ওটা কি? কি আছে ওতে?

—জানি না স্যার। মালটা ঘণ্টাখানেক আগে এসেছে। একজন বিদেশী ওটা নিয়ে আসার পর, স্যামুয়েল সাহেব ওকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেলেন। আর বলে গেলেন উনি না ফেরা পর্যন্ত যেন পার্সেলটা খোলা না হয়। তাই বুঝতে পারছি না ওতে কি আছে।

দোকানের কর্মচারীরা সকলেই নবরুপকে চেনে। নবরূপ তাই বলল—উনি এলে বােলাে আমি এলে যেন জিনিসটা খোলা হয়।

লােকটা বলল—কিন্তু সাহেব যদি…।

নবরুপ একটু হেসে ওকে থামিয়ে বলল-“তুমি আমার নাম করবে।

বলেই লােকটার হাতে একটা একশাে টাকার নােট গুঁজে দিল। লােকটা আর কোনাে কথা না বলে সরে গেল। ফিরে এসে স্যামুয়েল সাহেব যখন শুনলেন নবরূপ ওটা খুলতে বারণ করে গেছে—তখন স্যামুয়েল এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। কারণ বহুদিন ধরেই তাে তিনি নবরূপকে দেখছেন। বড়লােকের ছেলে। যা বলবে তাই করবে। তাছাড়া স্যামুয়েল খুব চালাক ব্যবসায়ী।

উনি ব্যবসা করতে জানেন। তাছাড়া খবর আছে ঐ বাক্সে যা আছে তার দাম কমপক্ষে চার-পাঁচ লাখ টাকা। এত টাকার জিনিস কেনার মতাে খদ্দের হাতে গােনা যায়। নবরূপ ঐ খদ্দেরদের মধ্যে একজন। স্যামুয়েল প্রথমটা এ মাল রাখতে রাজিই হননি। কিন্তু যখন শুনলেন মালটা বিক্রি না হলে ওরা ফেরৎ নিয়ে যাবে তখন রাজি হয়ে গেলেন।

কিন্তু বলে দিলেন—সাতদিনের মধ্যে না বিক্রি হলে তােমরা নিয়ে যাবে। ওরা তাতে রাজি হওয়ায় স্যামুয়েলও আর আপত্তি করেননি। এখন নবরূপের যদি নজর পড়ে যায় তাে ক্ষতি কি। ত্রিশ পার্সেন্ট কমিশন পেলে তাে তাঁর মন্দ লাভ হবে না। আর দরাদরি তাে হবেই সুতরাং সামুয়েল ঠিক করলেন উনি দামটা দু’লাখে রাখবেন। তারপর যদি কমে সে আর কত কমবে।

নবরুপের জন্যে বসে বসে যখন রাত দশটা বাজতে চলেছে, স্যামুয়েল মনে করছেন এবার দোকান বন্ধ করবেন, ঠিক সেই সময় নবরূপের গাড়িটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।

গাড়ি থেকে নেমে লজ্জিত নবরূপ বলল—সরি স্যার, একটু দেরি হয়ে গেল। তা পার্সেলে কি এসেছে বলুন তাে। ওটা আবার কোথাও পাচার করে দেননি তাে।

স্যামুয়েল উল্টো চাপ পেয়ে থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন—সে কি স্যার, আপনি বলে গেছেন বলে আমি পার্সেল খােলার ঝুঁকিটাও নিইনি। এই কে আছিস! পার্সেলটা খুলে আগে ওনাকে দেখা।

ঘটা করে পার্সেল খােলা হল। তার ভেতর আবার একটা প্যাকিং। এত যত্ন করে যখন নিশ্চয়ই খুব দামী কিছু হবে। নবরূপ হুমড়ি খেয়ে প্যাকিং বাক্সর ওপর থেকে লক্ষ্য করছিল আর ছটফট করছিল। অবশেষে জিনিসটা দেখা গেল। ছােট্ট একটা সােনার সাপ, তার মাথায় আটকানাে একটা নীলকান্ত মণি। কি অসাধারণ তার দ্যুতি। পাগল হয়ে গেল নবরূপ। এ জিনিস সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারবে না।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল বাক্সর ভেতর আর একটা কি যেন দেখা যাচ্ছে। স্যামুয়েলের লক্ষ্য ছিল সেদিকে। ও হাতে করে তুলতেই দেখা গেল বহু পুরনো কাগজ। তখনকার দিনে যাকে বলা হত প্যাপাইরাস রীড, নলখাগড়া থেকে তৈরি কাগজ তার ওপর অদ্ভুত ধরনের কালি দিয়ে লেখা কোনাে পুঁথি। এই কালি তৈরি হত জলগঁদের আঠা আর রান্নাঘরের ঝুল মিশিয়ে। নবরূপ পুঁথিটা দেখে বলল—ওটা কি কোনাে ম্যাপ ?

স্যামুয়েল বললেন, মনে হচ্ছে কোনাে পুরনাে দলিল। হয়তাে এই সাপটার সম্পর্কে কিছু লেখা আছে।

—ওটাও আমার চাই। বলল নবরূপ।

স্যামুয়েল বললেন- কিন্তু স্যার আপনি তাে মিশরের ভাষাও জানেন না, লিখতে পড়তেও জানেন না—এ নিয়ে আপনার কি লাভ!

নবরূপ বিরক্ত হয়ে বলল—আর ওটা আমি না নিলে আপনার কি লাভ পরিষ্কার করে বলুন তাে দেখি।

স্যামুয়েল হেসে বললেন—আমার কোনাে লাভ নেই। তবে অবশ্য ম্যাথিউসের লাভ হতে পারে।

—ম্যাথিউস আবার কে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল নবরুপ।

স্যামুয়েল বললেন—খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত মানুষ। তারপর একটু চাপা গলায় বললেন—যে আমাকে এসব জোগাড় দেয়। ম্যাথিউস একজন ইন্টারন্যাশন্যাল স্মাগলিং দলের লিডার। হ্যা, আর একটা কথা। লােকটা টাকা পয়সার ব্যাপারে একেবারে পিশাচ।

নবরূপ আর এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে রাজি নয়-যা টাকা নেয় নিক কিন্তু ঐ পুঁথির মানেটা কি? আপনি দয়া করে ম্যাথিউস সাহেবের সঙ্গে একটু পরামর্শ করার সুযােগ করে দিন আমাকে। আমাকে জানতেই হবে-ওটা কি? ওটা কি দামী সাধারণ ? আমি জানতে চাই। আর আমার কিউরিও ঘরের মধ্যে হবে ওর সসম্মানে প্রতিষ্ঠা।

স্যামুয়েল বললেন—ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে তাে বুঝলাম। ওর কি কোনো আসার ঠিক আছে? সাতটা—আটটা নটা-দশটা কোনাে ঠিক নেই।

নবরুপ বলল–যত রাত হােক আমি থাকবই। জানতে আমাকে হবেই।

রাত দশটার পর এসে হাজির হলেন ম্যাথিউস। স্যামুয়েল একটা আলাদা ঘরে ওদের নিয়ে গিয়ে বসালেন। বললেন—নির্ঘাৎ জমে যাবেন আপনারা। কথা বলুন। আমি বরং চা পাঠিয়ে দিচ্ছি আপনাদের জন্যে।

নবরূপ বলল, মিঃ ম্যাথিউস, বাক্সর মধ্যে যে পাণ্ডুলিপি দেখলাম ওটাও আমার চাই, এবার বলুন সাপ আর পাণ্ডুলিপি সব নিয়ে কত দেব।

ম্যাথিউস বললেন—আপনি ওটা নিয়ে কি করবেন? আপনি তাে ওই ভাষা পড়তেও পারবেন না, বুঝতেও পারবেন না।

নবরূপ বলল কিন্তু আমি ওটা পড়ার জন্যে ঐ ভাষা শিখে নেব অথবা কোনাে মিশরীয়কে দিয়ে ট্রানস্লেট করিয়ে দেব। মােট কথা ওটা আমার চাই। আপনার আপত্তি কেন? আপনি তাে টাকা পাবেন।

ম্যাথিউস বললেন—দেখুন মিঃ শীল। টাকাটা এখানে সব নয়। টাকার সঙ্গে এর কোনাে তুলনাই হয় না। এটা ছিল কোথায় জানেন? মেন পিরামিডের মধ্যে একটা মেন কু-রে এর নীচে। আমাদের ধারণা এই পুঁথিতে আরও অনেক তথ্য আমরা পাওয়ার আশা করছি, এটা আপনার কোনাে কাজে লাগবে না কিন্তু আমাদের কাজে লাগবে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন—আমাদের একটা বিরাট দল আছে।

–হ্যা জানি। কিন্তু আপনি জানেন না। ছােটবেলা থেকে পুরনাে জিনিস সংগ্রহ করে ঘর সাজানাে আমার নেশা। তাই আমিও আপনাদের মতাে আরও অনেক কিছুর সন্ধান চাই। এমন অমূল্য সম্পদ আমি আরও চাই।

ম্যাথিউস বললেন—বেশ তাে, সেজন্যে তাে আমরা আছি।

নবরূপ বলল—দেখুন, টাকার আমার অভাব নেই। আমি নিজে মিশরে যেতে চাই। পিরামিড দেখতে চাই। শুধু দেখা নয়, ওর নীচে গিয়ে অমূল্য সম্পদগুলাে দেখতে চাই।

ম্যাথিউস বললেন—আপনি একা এটা করবেন ভাবছেন?

নবরূপ একটু চুপ করে থেকে বলল সেটা সম্ভব নয় জানি, তাই তাে পুঁথিটা আমার কাছে রাখতে চাই। কারণ, এই পুঁথির লােভে অনেকেই আপনার মতাে এগিয়ে আসবে আমার কাছে। ঐ পুঁথির আকর্ষণে।

ম্যাথিউস হাসলেন। বললেন—অবশ্য আপনার বুদ্ধিটা মােটেই খারাপ নয়। আমি ভাবতে পারিনি ঐ পুঁথির জন্যে আপনি এত লালায়িত হবেন। তাহলে প্রথমেই সরিয়ে ফেলতাম। শুনুন মিঃ শীল—আপনি যদি সত্যি মিশর যেতে চান, সব নিজের চোখে দেখতে চান আমি আপনাকে সাহায্য কর। কিন্তু তার বদলে একটা শর্ত আছে। সেটা যদি মেনে নেন তাে আপনারও লাভ আমারও লাভ।

নবরূপ একটু ভেবে বলল—শর্তটা কি?

ম্যাথিউস বললেন, শুনুন মিঃ শীল, আপনার তাে মিশর দেখার খুব ইচ্ছে। আমি আপনাকে নিয়ে যাব মিশরের রাজধানী কায়রাের কাছে গিজেতে। গিজেতেই রয়েছে পাঁচ হাজার বছরের পুরােনাে সব পিরামিড। সেই সময় মিশরের রাজাদের উপাধি দেওয়া হত ফারাও’ বা ‘ফেরাে’। তৃতীয় রাজবংশের প্রথম ফেরাে ছিলেন জোফেস। সবুজ মাঠের শেষে যেখান থেকে মরুভূমির শুরু হয়েছে সেখানেই পিরামিড তৈরি হয়েছিল। এই জোসেফের পিরামিড ছিল প্রথম। তাই আশা করা হয় এই পিরামিডের তলায় অসংখ্য জিনিস আছে। সেসব জিনিস জোসেফ ব্যবহার করতেন। একটা পিরামিড আমাদের বড়লােক করে দেবে।

নবরূপ ম্যাথিউসকে থামিয়ে বলে তাহলে এতদিন করেননি কেন?

ম্যাথিউস নবরূপের কথাটা লুফে নিয়ে বলে ওঠেন—সেই কথাই তাে বলতে যাচ্ছি শুনুন। ঐ পিরামিডের অনেকটা ঢুকে গেছে বালির নীচে। প্রথমত সেটা খুঁড়ে বার করা যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি খরচের ব্যাপার। তাও করতাম কেননা সব খরচের টাকা দশগুণ হয় ফিরে আসত। কিন্তু একটা সাংঘাতিক বাধা আছে।

—কি বাধা? জিগ্যেস করে নবরূপ।

—বাধাটা হল কোনাে মিশরীয় ঐ পিরামিডের দরজায় হাত দিতে পারবে না। যে হাত দেবে তার জীবনে নেমে আসবে মৃত্যু। ঐ দরজা যে খুলবে, ভেতরের জিনিসে হাত দেবে, জোসেফের প্রেতাত্মা তাকে ভর করবে। তাই আমরা ওটাতে হাত দিতে পারিনি। আপনি ভারতীয়। আপনি ঐ দরজা খুলে আমাদের সাহায্য করবেন। তারপর বাকি যা করার আমরা করব। কিন্তু দরজায় হাত দেওয়া বা কোনােভাবে স্পর্শ করা চলবে না।

নবরূপ বলল—আর ঐ জিনিসগুলাে! সেগুলাে তাে স্পর্শ করতে পারবেন?

ম্যাথিউস বললেন—দেখুন মিঃ শীল, প্রত্নতাত্ত্বিক সব জিনিসই হল অভিশপ্ত। আপনি যে সাপ নিয়ে যাচ্ছেন ঘরে এও কিন্তু অভিশপ্ত। কিন্তু আপনি যদি শুদ্ধ থাকেন তাে এই সাপ আপনার বড় একটা ক্ষতি করবে না। আর একটা কথা–এই পুঁথিটা আপনি চাইলেন। এটা আমি আপনাকে দেব। তাছাড়া পিরামিডের নীচে থেকে দুর্লভ বস্তু হিসেবে যা পাওয়া যায় তার অর্ধেক আপনাকে দেব—ভবিষ্যতে আপনাকে আর পাগলের মতাে অমূল্য সম্পদ খুঁজে বেড়াতে হবে না। কিন্তু শর্তটা মানতে হবে। সেটা হল ঐ দরজা খােলার দায়িত্ব আপনার। যদি না পারেন, তাহলে ধনে বংশে মারা যাবেন। আর যদি পারেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের মধ্যে একজন হবেন। এবার আপনি ভাবুন কি করবেন। অবশ্য যদি আপনি ভয় পান তাহলে আলাদা কথা।

কথাটা তীরের মতাে বিঁধল গিয়ে নবরূপের বুকে। সে ভীতু! আজ অব্দি একথা কেউ কোনােদিন তাকে বলেনি। সে কিছু না ভেবেই তখুনি বলে দেয়, আমি রাজি। আপনি যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।

ম্যাথিউস লােকটা কিন্তু প্রচণ্ড স্বার্থপর আর লােভী। ও নবরূপকে মিথ্যে কথা বলল শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে। জোসেফের পিরামিডের ব্যাপারে অভিশাপের কথা সবাই জানে। শুধু মিশরের লােক বলে নয়। যে মানুষ ঐ দরজা খুলবে সেই জোসেফের কোপে পড়বে। না জেনে নবরূপ এগিয়ে চলল বিপদের মুখে।

ম্যাথিউস বললেন—এটাই কি আপনার শেষ সিধান্ত? না কি ক’দিন সময় নেবেন? দেখুন একবার হ্যা বলে দিলে কিন্তু এগিয়ে চলতেই হবে—ফিরে আসার উপায় নেই।

নবরূপ দৃঢ়স্বরে বলল—আমি যা বলি তাই করি, পরে আর ফিরে আসি না।

ম্যাথিউস বললেন—ঠিক আছে, ঠিক সাতদিন পর আমরা মিশরের রাজধানী কায়রাের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব।

নবরুপ বলল, আমরা কিসে যাব—প্লেনে না জাহাজে।

হাসলেন ম্যাথিউস—এটা কোনাে প্রশ্ন হয়! আমরা প্লেনে যাচ্ছি।

নবরূপ বলল, এত তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা হয়ে যাবে? ভিসা-পাসপাের্ট…..

ম্যাথিউস হেসে বললেন—আমার ভেতরে লােক থাকে। আপনি এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু আপনার পাঁচখানা হাফবাস্ট কালার্ড ছােট ফটো আমাকে পাঠিয়ে দেবেন কাল।

নবরূপ বলল—কোথায় দেব আপনাকে ফটোটা আর তাছাড়া টাকাও তাে লাগবে।

ম্যাথিউস বললে—টাকা এখন থাক, পরে হিসেব হবে। ফটোটা আপনি কালকের মধ্যে স্যামুয়েল সাহেবের কাছে জমা করে দেবেন। তারপর কখন কোথায় কি ভাবে মিট করব আমি ফোনে সব বলে দেব।

কথাবার্তা হয়ে যাবার পর সােনার সাপটাকে বাক্সয় ভরে এক মুখ হাসি নিয়ে নবরূপ  বাড়ি আসে। এসেই সােজা কিউরিও রুমে ঢুকে যায়। যত সহজে বলা হল অত সহজে কিন্তু কিউরিও রুমে ঢােকা যায় না। খুব দামী দামী জিনিস রাখা থাকে বলে ঘরটা পুরােপুরি লকারের মতাে সুরক্ষিত করা। ঘরটা দোতলার এক কোণে। ঘরে দুটো জানলা। খুব বড় নয় মাঝারি সাইজের। তা এই জানলা দুটো বন্ধ করতে না জানা থাকলে নাজেহাল হতে হবে কাউকে। প্রথমত গ্রিল দেওয়া। তারপর কাঠের পাল্লা। এই পাল্লার ওপর মােটা পরদা দেওয়া। তার ওপর কাচের সার্সি। এবার ওই কাচের সার্সির গা দিয়ে সরু সরু তার লাগালাে। কানেকশান করলেই সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিফায়েড হবে, যে ছোঁবে তার মৃত্যু। এবার ঘরের দরজা। সেটা মােটা সেগুনকাঠের তৈরি দুটো বড় বড় ফালি দরজার মাপে কেটে বসানাে। এর বাইরে আছে কোলাপসিবল গেট। তাতেও বৈদ্যুতিক তার দেওয়া। তার ওপর হাত দিলেই মৃত্যু। ভেতরে কাঠের দরজায় আবার অটোমেটিক গডরেজ লক দেওয়া। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা যে মশা-মাছিও ঢুকতে পারবে না। এবার দরজার ওপর নীচ সব দিকে বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে যােগাযােগ হয়ে রইল। পাছে অজানা লােক আসে সেজন্য ঘরের বাইরে একটা পার্টিশান গেট রাখা হয়েছে। নবরূপ যতক্ষণ বাইরে থাকে কারেন্ট চালানাে থাকে, আবার যখন বাড়িতে থাকে কারেন্ট খােলা থাকে। কারণ গেটের বাইরে তার বাবা তাে একজন সিকিউরিটি রেখে দিয়েছেন, তাছাড়া সে নিজেও থাকে। রাত্তিরে ঘুমােতে যাবার আগে সে আবার চালু করে দেয়। কেননা ঘুমের ঘােরে সে হয়তাে টের পেল না কি হচ্ছে সেজন্যে। বাবা অবশ্য অনেকবার বলেছেন একটা ওয়াচডগ রাখতে। নবরূপই রাখেনি ইচ্ছে করে। ওসব ঝামেলা তার ভাল লাগে না।

সাপটা নিয়ে কারেন্ট বন্ধ করে কিউরিও রুমে ঢােকে নবরূপ। একদিকে দেওয়ালের সেলফের ওপর মাঝারি সাইজের সব জিনিস সাজানাে আছে। নবরূপ ঐ সেলফেই সাপটা রাখল। হঠাৎ মনে হল সাপের মাথায় মণির দুতিতে চারদিক যেন আলােয় আলাে হয়ে গেল। নবরূপ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল। দেখল সাপের চোখ দুটো কি অস্বাভাবিক ভাবে জ্বলছে। মাথার মণিটা থেকে কখনও লাল, কখনও নীল, কখনও হলুদ আভা বেরচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে দেখে দেখে একটা পরম তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল নবরূপ। আর চোখ দুটো কি চুনির নাকি কে জানে।

অত লাল অত উজ্জ্বল। সাপটার কেমন যেন সম্মােহনী দৃষ্টি। নবরূপ কিছুতেই তার জায়গা থেকে নড়তে পারছে না। মনের জোর এনে ও চোখটাকে ঘুরিয়ে নিল দরজার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটাও ঘুরে গেল। স্থির হয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর নবরূপ টলতে টলতে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। ঘরের দরজা বন্ধ করে ইলেকট্রিক কারেন্ট চালিয়ে চলে গেল ঘরে।

খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমােতে যেতে দেরি হয় নবরূপের। আজও রাত তখন বারােটা। নবরূপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর একটা খসখস খুটখাট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল নবরূপের। তাড়াতাড়ি ঘরের আলাে জ্বালিয়ে ও ছুটে গেল পার্টিশানের ওপাশে। না, দরজাও বন্ধ, কারেন্টও চালু—তবে শব্দটা এল কোথা থেকে? অনেক অনুসন্ধান করেও ও কিছু পেল না। ঘুমও পেয়ে গিয়েছিল। নবরূপ শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম সব গেল কোথায়। বড় বড় চোখ করে নবরূপ ভাবতে লাগল সাপের কথা। অত দামী জিনিস তার কিউরিও রুমে একটাও নেই। তাই হয়তাে মনে মনে ভয় পাচ্ছে যদি কেউ নিয়ে নেয়। হয়তাে বা মনের অবচেতন কোণে ভয়ও ছিল তাই ঘুম আসছে না, আসছে চিন্তা। আবার ঘুমিয়ে পড়ল নবরূপ। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না। কি একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে ঘুম ভেঙে গেল তার। ওর মনে হল কেউ একজন ঘরে ঢুকেছে। পর্দার ওপাশটা যেন নড়ে উঠল। তাহলে কি তার ভয়টাই সত্যি হল!

ঘরের বড় আলাে জ্বেলে, ঘরের কোণে রাখা একটা লাঠি হাতে নিয়ে সব জায়গায় ঠুকে ঠুকে দেখল নবরূপ। কই, কোথাও তাে কিছু নেই। শুধু বেডল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নবরূপ শুয়ে পড়ল। সামনের দিকে তাকাতেই দেখল সেই আধাে অন্ধকারে একটা মস্ত বড় সাপ তার পায়ের কাছে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নবরূপ একটু নড়লেই বোধ হয় কাল ছোবল দেবে। নবরূপ দিকবিদিক্ জ্ঞান হারিয়ে বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে ভারী অ্যালার্ম ক্লকটা ছুঁড়ে মারল সাপের দিকে। ঘড়িটা ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। সাপটার কিছু হল না। কিন্তু নবরূপ পরিষ্কার দেখেছে ঘড়িটা সাপের গায়ে গিয়ে লেগেছে কিন্তু যেন মনে হল সাপের শরীরের ভেতর দিয়ে ওটা বেরিয়ে গেল। ঠিক যেন ছায়ার মতাে। সাপটা কিন্তু তাকে ছােবল মারল না। অথচ ইচ্ছে করলেই ঘড়ি ছোড়ার আগেই সে ছােবল মারতে পারত। সাপটা তার চোখের সামনে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে ভাের পাঁচটা বাজল।

নবরূপ বিছানা থেকে উঠে ঘরের আলাে জ্বেলে তন্নতন্ন করে সব খুঁজতে লাগল। নাঃ, সাপকে খুঁজে পাওয়া কি অত সােজা! কিন্তু এ তাে যে সে সাপ নয়—সে পরিষ্কার দেখেছে সাপের মাথার মণিটা জ্বল জ্বল করছে। আর ঐ চোখ! টকটকে লাল চোখ, সেও কি মিথ্যে! মনে পড়ল ম্যাথিউসের কথা। এগুলাে সবকটাই অভিশপ্ত। নবরুপ এসব বিশ্বাস করে না। সে এযুগের ছেলে। ও জানে সাপটাকে নিয়ে এত চিন্তার করার ফলে সে চোখের সামনে সাপটা দেখল। নয়তাে সাপটা জ্যান্ত হয়ে ওর শােবার ঘরে চলে আসবে একথা এই বিংশ শতাব্দীতে কেউ বিশ্বাস করবে না। এ আর কিছুই নয়, হ্যালুসিনেশন। মনের ছবিটাকে যাতে সত্যি বলে মনে হয়। মনের দুর্বলতা কাকে বদলাতেই হবে। আসলে ম্যাথিউসের কথাগুলাে তাকে ভেতর ভেতর দুর্বল করে দিচ্ছিল বােধহয়। ওসব কুসংস্কার সে মানে না। নবরূপ ঠিক করল মিশর তাকে যেতেই হবে। এমন সুযােগ সে আর জীবনে পাবে না। তবে একটা ব্যাপার। বাবাকে সে তার মিশর যাওয়ার আসল উদ্দেশ্যের কথা কখনই বলবে না। কেবল বলবে সে মিশরে যাবে কিছু দুষপ্রাপ্য জিনিস কিনে আনার জন্যে। তার ব্যবসায়ী বাবা এতে খুশিই হবে। এ ব্যাপারে নবরূপ একেবারে নিশ্চিত।

চুপচাপ শুয়ে ভবিষ্যতের প্ল্যান করছিল নবরূপ। মনে হল একবার কিউরিও ঘরে যাবার দরকার। কেন জানি না, তখন থেকে মনটা খচখচ করছে। যদিও ও এসব বিশ্বাস করে না। কিন্তু তবু মনে হচ্ছে একবার সাপটা দেখে আসে। নাঃ, আর বসে থাকতে পারল না, কিউরিও ঘরের দিকে এগিয়ে চলল। কিউরিও ঘরের চাবি আর সুইচ লুকনাে থাকত পাশের দেওয়ালের মধ্যে খাপ করা ঢাকা দেওয়া একটা লুকনাে গর্তে। বাইরে থেকে দেখে দেওয়াল বলেই মনে হয়, কিছু বােঝা যায় না। কারেন্ট বন্ধ করে কিউরিও ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নবরূপ। সােজা এসে দাঁড়াল সেই সাপটার সামনে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সাপের মাথার মণিটার এককোণে একটা সরু ফাটার দাগ দেখা যাচ্ছে না! এত সূক্ষ্ম যে খালি চোখে বােঝা যায় না। টেবিলের ড্রয়ারে ম্যাগনিফাইং গ্লাস ছিল। নবরূপ সেটা তাক করে তার মধ্যে দিয়ে দেখল—সে ঠিকই দেখেছে একটা সরু দাগ, কিন্তু এটা তাে ছিল না, হল কি করে? তবে কি সেদিন ওর ঘরে টেবিলক্লকের ধাক্কায়…না না এ সে কি ভাবছে! সে কি ক্রমশ কুসংস্কারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে নাকি! তাহলে এটা কি করে হল! নররুপ নিজের মনেই বলে, হয়তাে ছিল আগে থেকেই ওর চোখে পড়েনি। সে যাই হােক মিশরে সে যাবেই। কোনাে রকম ভাবেই কোনাে কিছু বা কেউ তাকে আটকাতে পারবে না।

মাথিউস করিৎকর্মা লােক। সাতদিনের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। নবরূপ বলল—মিঃ ম্যাথিউস, আমার একটা অনুরোেধ আছে। বেশ তাে বলুন। ম্যাথিউস বললেন।

নবরুপ বলল দেখুন, মিশর যখন যাচ্ছি–আমার ইচ্ছে মিশরের সবটা ঘুরে আসা। এ খরচটা আমার। অবশ্য এর জন্যে যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।

ম্যাথিউসের এখন একমাত্র উদ্দেশ্য কার্যসিদ্ধি করা। ম্যাথিউস রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, ঠিক আছে, আমরা পাের্ট সৈয়দ পর্যন্ত প্লেনে যাব। তারপর দেখি ওখান থেকে কীরকম কী ব্যবস্থা করা যায়।

লােহিত সাগর পেরিয়ে ভূমধ্যসাগর। এই দুয়ের মধ্যে রয়েছে সুয়েজ খাল। ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার লেসেপস এটা কেটে নাম দিলেন কেনেল। এটাই এখন সুয়েজ খাল নামে বিখ্যাত। সুয়েজ ক্যানেল নদীর মতাে। খুব একটা চওড়া নয়। দুটো জাহাজ পাশাপাশি যেতে পারে এই পর্যন্ত। ক্যানেলের দু’ধারে গাছের সারি। যেতে যেতে ওটা যখন গিয়ে হ্রদে পড়েছে তখন এ জায়গাটা খুব চওড়া হয়ে গেছে। অপূর্ব দৃশ্য। দু’ধারে পাহাড় তার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্যানেলের জল। এই ক্যানেলটা গিয়ে যখন ভূমধ্যসাগরে পড়েছে সেইখানেই গড়ে উঠেছে পাের্ট সৈয়দ। ছােট্ট একটা শহর। ভারি সুন্দর মনােরম। কিন্তু প্রাকৃতিক রুক্ষতাও প্রচণ্ড। ওদের দেশে যাবার সময় ডান দিক দিয়ে আর ফেরার সময় বাঁ দিক দিয়ে ট্রাফিক চলে। আমাদের দেশের ঠিক উল্টো।

সারা শহরে ছড়িয়ে আছে ফরাসী আর ইউরােপীয় প্রভাব। এখান থেকে কায়রাে ১৩০ মাইল ভেতরে। পাের্ট সৈয়দ ঘুরে ওরা কায়রাের দিকে যাত্রা করল। বিখ্যাত নীলনদের বদ্বীপ। বদ্বীপের কাছটায় শুধু তৃণলতা আর গুল্ম-তারপর যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। কায়রাে থেকে আর ২০ মাইল দূরে পাঁচ হাজার বছরের পুরনাে নগর মেমফিস। মেমফিসের কাছে পৃথিবীর ঐতিহ্যময় শহর ব্যবিলন। রােমানরা মিশর জয় করে এখানেই দুর্গ করে থাকতাে। রােমানদের পর এল খ্রিস্টান। তারপর এলেন খালিফা এল, মুইজ—তিনি এখানে এল-কাইরাে বলে একটা নগর তৈরি করলেন। সবাই এল-কাইরােকে বলতে লাগল লে-কাইরে। তার থেকে পরে নাম হয় কয়রাে’। সপ্তম শতাব্দীতে খলিফা ওমর ব্যবিলন অধিকার করে এলফাসটাট বলে একটা রাজধানীও তৈরি করলেন। এই রকম অসংখ্য ঘটনা দিয়ে গড়া ঐতিহ্যপূর্ণ দেশ কায়রাে ব্যবিলন।

কায়রাে পৌঁছে ওরা একটা হােটেলে উঠল। পাঁচতারা হােটেল। দুটো এয়ারকন্ডিশান রুম নিলেন ম্যাথিউস। ওদের দুজনের জন্যে। সন্ধের পর নীচের লবিতে নাচগান খাওয়া- দাওয়া চলতে লাগল অনেক রাত অব্দি। পরদিন সকালে ম্যাথিউস বললেন—এবার আমরা আমাদের আসল লক্ষ্য স্থল গিজেতে রওনা হব। আপনার আর কিছু দেখার নেই তাে।

নবরূপ বলল—একটা দিন আমায় সময় দিন। আমি কাল শুধু দোকানগুলাে ঘুরে ঘুরে দেখি।

ম্যাথিউস হাসলেন, দেখতে চান দেখুন—কিন্তু যে জিনিসের সন্ধান আমি আপনাকে দেব তা কিন্তু কোনাে দোকানে আপনি পাবেন না।

নবরূপ বলল—আমি কিনব না—খালি দেখব।

—বেশ, আমরা তাহলে পরশু দিন ভাের রাতে রওনা হব গিজে শহরের দিকে।

রাস্তায় যেতে যেতে আর একবার পুরনাে কথা ঝালিয়ে নিতে বললেন ম্যাথিউস— এর আগে আপনাকে আমি আমার পরিচয় দিয়েছি। আসলে আমি হলাম দলের নেতা, আমার সঙ্গে বহু লােক কাজ করছে, এরা কিন্তু সব সময় সব কিছু লক্ষ্য রেখে যাচ্ছে। কোনােদিন কেউ কোনাে বেইমানি করতে পারবে না। যে করবে তাকে বালির নীচে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে। আমরা মিশরীয়রা বেইমানি সহ করতে পারি না।

জিপে করে ওরা এগিয়ে চলল গিজের দিকে। ঠিক অন্যগুলাের মতাে, সামনেটা একটু সবুজ তারপরই সীমাহীন বালি।

ম্যাথিউস বললেন—ঐ দেখুন দূরে গিজে, বালির ওপর বড় বড় কতগুলাে পিরামিড দাঁড়িয়ে আছে। তারপর একটু দূরে একটা ছােট্ট পিরামিড দেখিয়ে বললেন—ঐ যে দেখছেন ছােট্ট পিরামিড আমরা ওখানেই যাব। ওটাই আমাদের গন্তব্যস্থল। আমাদের লক্ষ্যবিন্দু, তৃতীয় রাজবংশের প্রথম ফেরাে জোসেফের পিরামিড।

নবরূপ বলল——ওটা তাে দেখছি খুবই ছােট্ট।

ম্যাথিউস বললেন সামনে যে পিরামিডগুলাে দেখছেন ওগুলাে কি ছােট না বড়? কি মনে হয় আপনার?

নবরূপ বলল—ও, ও-তাে বিশাল।

ম্যাথিউস বললেন—ঠিক ঐ অত বড় পিরামিড জোসেফের ও। কিন্তু অর্ধেকটা ঢুকে গেছে বালির নীচে। আমাদের লােক সব খুঁড়ে বার করবে। কিন্তু মনে আছে তাে, দরজা খােলার কাজটা আপনার।

নবরুপ ঘাড় নেড়ে বলল—মনে আছে।

ম্যাথিউস বললেন—আগেই বলেছি। এখনও বলছি, আমাদের সঙ্গে রয়েছে বিরাট দল। মেশিন, গাড়ি সব রেডি। এখন চলুন, আমরা কোনাে বড় হােটেলে আশ্রয় নিই। রাত বারােটার পর হবে আমাদের অভিযান শুরু।

–রাত বারােটা ? কেন ? এ কি রকম নিয়ম এদেশে? নবরূপ একটু বিরক্ত হয়েই বলল কথাগুলাে ।

ম্যাথিউস চালাক লােক। একদম রাগলেন না। বললেন—গভীর রাতই তাে প্রশস্ত। কেউ কোথাও থাকবে না কেউ ঝামেলা করবে না।

সে রাতটা নবরূপের জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ওরা যখন পিরামিডের কাছে গিয়ে পৌঁছল ম্যাথিউসের লোক তখন পিরামিডের তলাটা বার করে ফেলেছে। সে বিরাট একটা যন্ত্র পরিষ্কার করে ফিরে চলে গেল। নবরূপ দেখল, বালির তলায় পিরামিডের দরজা। সােনার পাত দিয়ে মুড়ে দিয়েছে দরজাটা। দরজার মাথার ওপর নকশা। দরজার গায়ে সে যুগের কারুকার্য। ছােট্ট দরজা একমানুষ সমান কিন্তু প্রচণ্ড ভারী। দরজায় হাত দিতে গিয়ে হাত সরিয়ে আনল নবরূপ। দরজার মাথায় কি লেখা। নবরূপ তাে আর মিশরীয় ভাষা পড়তে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে জিগ্যেস করল ম্যাথিউসকে—ওখানে কি লেখা আছে! ম্যাথিউস ভগবানকে প্ৰণাম জানালেন। ভাগ্যিস নবরূপের মিশরীয় ভাষায় দখল নেই, নয় তাে ঠিক পড়ে সে বলত ওকে কি আছে।

ম্যাথিউস খানিকটা পড়ার ভান করে বললেন—এই আমি আপনাকে যা বলেছিলাম, সেই কথা। মিশরীয় কেউ এই দরজায় হাত দিলে জোসেফের আত্মা তাকে ছাড়বে না। আসলে যেটা লেখা ছিল সেটা হল এই রকম –

“এখানে তৃতীয় রাজবংশের প্রথম ফেরাও শান্তিতে রয়েছেন। কোনাে মানুষ, জন্তু বা যে কোনাে জীব যদি এই শান্তি ভঙ্গ করে তবে তার মৃত্যু অনিবার্য। বন্ধ দরজা হল শান্তির দ্বার। সেই দরজায় যে আঘাত হানবে, জোসেফের পরলােকগত আত্মার অভিশাপে সে হবে অভিশপ্ত। তার মৃত্যু অবধারিত।”

ম্যাথিউসের কথা বিশ্বাস করে নবরূপ এগিয়ে চলল দরজার দিকে। একা নবরূপ এগিয়ে চলেছে, চারপাশের কর্মীরা লক্ষ্য করছে। তারাও ম্যাথিউসের কথা বিশ্বাস করেছে। ম্যাথিউস তো যে কোনাে লােককে দিয়ে দরজা খােলাতে পারতেন। নবরূপকে ধরলেন কেন। আসলে তার কারণ আর কিছুই নয় যে কোনাে লােক লাগিয়ে কাজ করালে যে করাচ্ছে পাপটা তারই হয়। এজন্য মােটা টাকা খরচ করেও ম্যাথিউস বাঁচতে পারতেন না। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উল্টো। নবরূপ এখানে উদ্যোক্তা। তার ধনসম্পদ চাই। সে পিরামিড খুলে অর্ধেক পাবে ভেবেই এগােচ্ছে তার নিজের স্বার্থে। এখানে ম্যাথিউস শুধু গাইড। পথপ্রদর্শক। পাপ তাকে স্পর্শ করবে না।

নবরূপ এগিয়ে গেল। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে তার। পিরামিডের লুকানাে দরজা খুলছে ও, একি কম কথা। কোনােদিন কলকাতায় কেউ এমন কথা ভেবেছে। হাত দিতেই একটা ইলেকট্রিক শকের মতাে লাগল নবরূপের। ছােট্ট একটা ধাক্কা সামলেও নিল সে। মুখ ফিরিয়ে নিজেই বলল নবরূপ, প্রচণ্ড কারেন্ট লাগল। ম্যাথিউস ওপরে দাঁড়িয়েছিলেন। ওঁর চোখ দুটো লােভে শিয়ালের চোখের মতাে আগুন বেরচ্ছে। নবরূপ বলল—মিঃ ম্যাথিউস, আমি ভয় পাচ্ছি। আপনি বরং অন্য
লােককে ডাকুন ।

ম্যাথিউসের মুখখানা থমথম করছে। বললেন, খুলতে তােমাকে হবেই। শুধু শুধু এত টাকা খরচ করে তােমাকে এনেছি?

ম্যাথিউসের গলার স্বরের এই পরিবর্তন ভয় পাইয়ে দিল নবরূপকে। তবু সে  বলে ওঠে—তােমার এত লােক আছে তাদের বলতে পার না!

মুহুর্তের মধ্যে ম্যাথিউস নেকড়ে বাঘের মতাে বালির পাঁচিল থেকে নীচে ঝাপিয়ে পড়লেন নবরূপের সামনে। নবরুপ দেখল—তার দিকে দু দুটো বন্দুক তা করে রেখেছে ম্যাথিউস। তঁার দুহাতে দুটো বন্দুক। ম্যাথিউসের এরকম রূপ এর আগে দেখেনি নবরূপ। চাপাস্বরে বলে ওঠেন ম্যাথিউস – হয় মর। আর নয় এখুনি দরজা খুলে দাও।

নবরূপ একা এসেছে। তার কোনাে দলবল নেই। এই মুহূর্তে সে ম্যাথিউসের কথা না শুনলে এই বালির তলায় ওরা ওকে শুইয়ে দেবে চিরদিনের মতাে। আশে পাশের লােকগুলাে ওর দিকে তাকিয়ে আছে শ্যেনদৃষ্টিতে। না বলার কোনাে আর উপায় নেই। গায়ের জোরে ঠেলল নবরূপ দরজাটাকে। নাঃ, একটুও নড়ল না। এবার রীতিমতো ধাক্কা দিল নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে। দরজাটা বােধহয় আধ ইঞ্চির মতাে খুলল। একটা ঠান্ডা কনকনে জোরালাে অশরীরী হাওয়া ধাক্কা দিয়ে গেল। ও পড়ে যাচ্ছিল, সামলে নিল কোনাে রকমে। ভেতরটা পুরােপুরি অন্ধকার। ম্যাথিউস আবার চেঁচালেন, দরজাটা পুরােপুরি খুলে যায়নি। আরও জোরে টানা দরকার।

পাথরের দরজা, খােলা কি কম কথা! নবরূপ আবার দু’হাত দিয়ে দরজাটা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। আর একটু ফাক হল। এখন কোনােরকমে একটা লােক ঢুকতে পারে। ম্যাথিউস বললেন—-মিঃ শীল—আমরা কিন্তু কেউ আপনাকে সাহায্য করব না। আপনি কি মনে করেন দরজা খুলেছেন?

ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হল না নবরূপের। অর্থাৎ আরও চওড়া করে দরজা না  খুললে ওরা সবাই ঢুকবে কি করে। ঘাম ছুটে যাচ্ছে নবরূপের। এবারে সে পিঠ দিয়ে ঠেলতে লাগল। একটা দিক হাট করে খুলে গেল। বড় বড় মশাল জ্বেলে ম্যাথিউস বললেন—এবার দেখা যাক ভেতরটা। মিঃ শীল, আপনি আগে চলুন।

মশালের আলােয় অন্ধকার গুহা আলাে হয়ে গেল। একটা বড় কারুকার্য করা কফিন। তার ভেতর শুয়ে রয়েছেন জোসেফ। চারদিকে অসংখ্য ঘর-গৃহস্থালীর জিনিস। তাঁর প্রিয় শৌখিন জিনিস। তার ব্যবহার্য পায়ের জুতাে, জামাকাপড় থরে থরে সাজানাে। যা কিছু দেখা যাচ্ছে সব সােনা আর দামী দামী পাথর বসানাে জিনিসপত্র। ম্যাথিউস ফিসফিস করে বললেন—আপনি যা নেবার নিন তারপর আমরা নেব।

কি নেবে তাই ভেবে পাচ্ছে না নবরূপ। সােনার ফুলদানি, সােনার মুকুট, সােনার থালা-বাটি-গ্লাস কোনােটা তার মনে ধরল না। এসব নিয়ে সে কি করবে। তার চাই বিশেষ কোনাে বস্তু যা দুর্লভ আবার অমূল্য যেটা সে তার কিউরিও রুমে রাখতে পারবে। নবরূপ দেখছে আর ভাবছে। আর তার চারধারে ম্যাথিউসের দল নিস্পন্দ নিথর হয়ে তাকে লক্ষ্য করছে। কারণ কবরের নীচে শব্দ করা বারণ। হঠাৎই চোখে পড়ল নবরুপের এক অদ্ভুত ধরনের পাখি। লম্বা ঠোটটা ক্রমশ সরু হয়ে এসেছে। পাখির শরীরটা গােল আর পা দুটো সরুসরু লম্বা। পাখিটা সােনার। ওর চোখ দুটো আসল হীরের, গায়ে পালকের মতাে আঁচড় কাটা সােনার ওপর লাল-সবুজ মিনে করা। মাত্র আট ইঞ্চিলম্বা আর পাঁচ ইঞ্চি চওড়া জিনিসটা সত্যিই অপূর্ব। নবরুপ বলল—এবার তােমরা যা খুশি কর। আমি যা নেবার নিয়ে নিয়েছি। আর আমি কিছু নেব না।

পাখিটা হাতে নিয়ে পিরামিডের তলা থেকে বেরিয়ে এলাে নবরূপ। ওদিকে ভাের হয় হয়। সব জানাজানি হয়ে গেলে দেশের লােক তাদের ছাড়বে না। তাড়াতাড়ি করে আবার জোসেফের পিরামিড বালির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে লাগল ম্যাথিউসের লােকেরা। ম্যাথিউস বেরিয়ে এসেছেন। ওঁর হাতে মস্ত বড় একটা থলি।

নবরূপ ম্যাথিউসকে ডেকে বলে—এবার তুমি বল আমি কবে দেশে ফিরব। কিসে ফিরব। আর এই পাখিটাকে যদি কাস্টমসে ধরে তখন কি করব।

ম্যাথিউস খুব খুশি ছিলেন নবরূপের ওপর। উনি ভাবতেই পারেন না এত টাকার লােভ ভারতীয়রা সামলায় কেমন করে। এখন সে প্রচুর টাকার মালিক হবে। ম্যাথিউস বলে ওঠেন তাড়াতাড়ি, তােমাকে ফেরানাের দায়িত্ব আমার। কাস্টমস চেকিংও হবে তুমি সােজা জিনিস নিয়ে বাড়ি চলে যাবে।

ম্যথিউস যা বলেছেন ঠিক তাই করেছেন। নির্বিঘ্নে নবরূপ চলে গেল কলকাতায় নিজের বাড়িতে। সুটকেসের মধ্যে রয়েছে জিনিসটা। সেটা খুলে নবরুপ গেল বাবাকে দেখাতে সেই ছােট্ট পাখিটা। উনি বললেন—করেছিস কী! এ তাে অমূল্য সম্পদ। বাজারে তাে এর দাম কম করে কুড়ি লাখ টাকা। বেচে দিবি?

অবাক হয়ে গেল বাবার কথা শুনে নবরূপ। মানুষটা কি ব্যবসা ছাড়া আর কিছু বুঝতে পারে না, নাকি বুঝতে চায় না। কে জানে।

তিনদিনও গেল না, বাড়ির মধ্যে অস্বাভাবিক সব কাণ্ড ঘটতে লাগল। রােজ রাত্তিরে কিউরিও ঘরের মধ্যে থেকে নানা ধরনের শব্দ হতে লাগল। কখনও ডানা ঝটপট কখনও হিস হিস শব্দে। নবরূপ দরজা খুলে উঁকি মেরে দেখল। কই কিছু তাে নেই। সব ঠিকঠাক যেমন ছিল তেমনি আছে। চারদিনের দিন গভীর রাতে আবার ঘুম ভেঙে গেল নবরূপের প্রচণ্ড মারামারির শব্দ। তার সঙ্গে আস্বাভাবিক মোটা গলার গোঁ গোঁ শব্দ। এবার আর কোনাে ভুল নেই শব্দটা আসছে দেওয়ালের ভেতর দিক থেকে। নবরূপ কিউরিও ঘরটা খুলে লক্ষ্য করতে লাগল কিন্তু কোনােরকম অস্বাভাবিক কিছু দেখল না। চিন্তিত মনে চলে আসছিল হঠাৎ থমকে দাঁড়াল নবরূপ। ফিরে গেল যেখানে সাপটা ছিল । হ্যা, সে নিশ্চিত যেখানে সে সাপটা রেখেছিল সেখানে সাপের বদলে বসে আছে সেই সরু লম্বা ঠোট পাখিটা। আর পাখিটার জায়গায় বসে আছে সাপটা। অবাক হয়ে গেল নবরূপ।

এঘরে ও ছাড়া আর কেউ ঢােকে না। এঘরের চাবি কোথায় থাকে সেটাই কেউ জানে না। তাহলে এরকম অঘটন ঘটল কি করে! সে কি তবে ভুল করে… অসম্ভব। মনে মনে ভাবল নবরুপ….তার পরিষ্কার মনে আছে ঠিক জায়গায় সে ঠিক জিনিস রেখেছিল। এবার নবরূপ সত্যিই ভয় পেল। ঘরের মধ্যে দাপাদাপি ছােটাছুটি কোনােটাকেই সে যেন আর উড়িয়ে দিতে পারল না। আরও একটা ঘটনা হল, কদিন ধরে নবরুপ অনুভব করছে—কেউ যেন সবসময় তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। সবসময় সে দেখতে পাচ্ছে কিন্তু ধরতে পারছে না। বাড়িতে তাে অনেক চাকর লােকজন। তাহলে কি কানা ঘুষােয় রটে গেছে তার কাছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। আর সেইজন্যেই হয়তাে কেউ তাকে খুন করার চেষ্টা করছে! না, এ সে কিছুতেই হতে দেবে না, একটা কিছু ব্যবস্থা তাকে করতেই হবে। ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল নবরূপ।

হঠাৎ মনে হল কে যেন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘুমটা ভেঙে গেল। প্রথমে মনে করেছিল স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্ন নয়, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কালাে এক ছায়ামূর্তি। জলদগম্ভীর স্বরে সে বলল—আমার সম্পত্তিতে হাত দেবার অধিকার কে তােমাকে দিয়েছে? আমার কবরের শান্তি তুমি ভেঙেছ। হাজার হাজার বছর ধরে রাখা আমার জিনিস তুমি নিয়ে এসেছ। এই পাপের শাস্তি তােমাকে পেতেই হবে। তুমি জান না আমার কবরের গায়ে লেখা ছিল যে এই দরজায় হাত দেবে তার মৃত্যু অনিবার্য? তারপরেও তােমার এমন অন্যায় কাজ করতে আটকাল না?

-না, এতে আমার কোনাে দোষ ছিল না। আমাকে ম্যাথিউস বলেছিল। তাছাড়া আমি মিশরের ভাষা পড়তে পারি না। ম্যাথিউস আমাকে বলেছিল কোনো মিশরবাসী ওতে হাত দিতে পারবে না। আমি তো ভারতীয়। হাত জোড় করে বলল নবরূপ।

ছায়ামূর্তি ঠিক তেমন গলাতেই বলে ওঠে—তােমার মধ্যে লােভ ছিল। লােভ মানুষকে মৃত্যুর পথে টেনে নিয়ে নয়। ম্যাথিউস তােমার ঐ লােভকে কাজে লাগিয়েছে। সেও পার পাবে না। এখন তুমি প্রস্তুত হও। শােন, তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয়বস্তু নিয়ে এসেছ। ছায়ামূর্তি বলতে বলতে নবরূপের সামনে একেবারে কাছে এসে গেল। নবরূপ পরিষ্কার দেখছে—এটা মমি নয়। মমি যে কাঠের বাক্সে রাখে তার আকৃতিটা হয় ঠিক মানুষের মতাে। মিশরের এটাই বৈশিষ্ট্য। সাতফুট লম্বা একটা কাঠের মূর্তি। তার নাক-মুখ-চোখ সব আছে। (দু হাত জড়াে করে বুকের ওপর রাখা। পায়ের কাছটা জড়াে করা। সমস্ত গায়ে অসাধারণ কারুকার্য করা। এমনকি মনে হয় যেন রঙিন জামাকাপড় পরানাে।) এই মূর্তি সেইরকম অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে নবরূপের কাছে।

নবরূপ বলল—তােমার প্রিয় কি জিনিস আমি এনেছি! আমি তো কিছু নিইনি শুধু একটা পাখি।

ছায়ামূর্তি লেল—হ্যা, ঐ পানি ছিল আমার পেশা। সব চেয়ে প্রিয়। ওকে ছাড়া আমি একমুহূর্ত থাকতে পারতাম না। তাই আমার মৃত্যুর পর এ পাখিকেও আমার সঙ্গে মমি করে রাখা হয়েছিল।

নবরূপ বলল—না না, ও তাে মমি নয়, ওটা সােনার।

নবরূপ লক্ষ করল কাঠের মূর্তির মধ্যে চোখ দুটো জীবন্ত। তার ভেতর থেকে যেন আগুন বেরচ্ছে। বলল- হ্যা, সােনা দিয়ে ওকে বাধানো হয়েছিল।

নবরূপ তাড়াতাড়ি বলে উঠ, ঠিক আছে তুমি নিয়ে নও তােমার প্রিয় পাখি। অকে ছেড়ে দাও।

ছায়ামূর্তি হাসল। সারা ও কেঁপে উঠল সে হাসিতে। বলল, –সে তো আমি নেই। কিন্তু আমার সমাধিতে শান্তিভঙ্গ করার অভিশাপটাও তোকে বরণ করতে হবে। তােমার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু।

ছায়া মূর্তি এগিয়ে এল। নবরূপ ঘর থেকে বেরিয়ে কিউরিও রমের দিকে এগিয়ে গেল। তার মুখে একটাই কথা -আমি আমার সব কিছু তােকে দিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমার মুক্তি দাও… মুক্তি দাও। এস তুমি.. এস আর কিউরি ঘরে দেখ এসে। তুমি যা চাও সব নাও—কোটি কোটি টাকার জিনিস আছে সব নাও। বলতে বলতে নবরূপ কিউরিও ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। পেছনে ছায়ামূর্তি টি তখনও হেসে চলেছে।

বুকের মধ্যে থরথর করে কাঁপছে নবরূপের। হাত-পায়ের ঠিক নেই। রাত তখন গভীর। চারদিক নিস্তত্ব। ছায়ামূর্তি প্রায় ওর শরীরের ওপর এসে পড়েছে। নবরূপ ভুলে গেল কিউরিও ঘরে কারেন্ট চালানাে আছে। সুইচ না নিভিয়ে চাবি না নিয়ে ও অন্যমনস্কের মতাে দরজায় হাত দিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে গেল।

পরের দিন সকালে দেখা গেল নবরূপের কাঠ হয়ে যাওয়া স্থির শরীরটা কিউরিও ঘরে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটা সবাই মনে করেছিল বন্ধ ঘরের সামনে নবরুপ কি করছে দাঁড়িয়ে ? পরে ব্যাপারটা বোঝা গেল।

একমাত্র নরেন শীল–নবরুপের বাবা জানতেন মিশর থেকে ছেলে কি এনেছে। সাপটাও তাকে দেখিয়েছিল নবরূপ। কিন্তু পরে যখন খোজা হল দেখা গেল সব কিছু যেমন ছিল তেমন আছে। শুধু সাপ আর ঐ পাখিটাকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত