অলৌকিক চিতা

অলৌকিক চিতা

লাস্যময়ী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সকলেই ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিত, অথচ ইশান ভাই বলত ভিন্ন কথা!”একটা মাত্র চুমু খাব, তুই রাগ করিস না প্লিজ? তোর রাঙা চরণ মাথায় নিয়ে আমার যে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে!”মেয়েটির আলতা রাঙা পা নিজের কোলের উপর টেনে নিয়ে ইশান ভাই গাঢ় আবেগমাখা গলায় মিনতি করত।

মুন্নি ভীতসন্ত্রস্ত হরিণীর মতো নিজের দুই পা গুটিয়ে নিতে নিতে কাতর গলায় বলত,”এই না-নাহ, ছিঃ!”
“না কেন? কেউ দেখবে কিছু, খাই একটা চুমু?”মুন্নি চোখের কোনা দিয়ে আমার দিকে ম্লেচ্ছ-জাতীয় একটা চাহনি ফেলে তাচ্ছিল্যমাখা গলায় বলব, “এই যে, এই পোলায় তো ঠিকই দেখবে। বাইরে গিয়ে জনে জনে বলে বেড়াবে!””আরে ধুর, অয় হল একটা হাবাগোবা। কাউকে বলবে না কিছু!””এখন না বলুক, দুইদিন পরে বলবে। কে জানে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে হয়ত তোর মতোই একদিন আমাকে ন্যাংটো করতে চাইবে!” মুন্নির আদিরসাত্মক কৌতুক শুনে ইশান ভাই হিহি করে হেসে উঠে।

আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে জানতে চায়,”বড় হয়ে তুমিও কি আমার মতো লুচ্চু হবা নাকি ভাইয়ু?” বড় হয়ে হাতি হব, নাকি ঘোড়া হব, সেই খবর তখনও জানা ছিল না। কিন্তু লুচ্চু হওয়া যে উচিৎ হবে না, এইটা ঠিকই বুঝতে পারতাম। তাই সজোরে মাথা ঝাকিয়ে বলি,”নাহ, আমি কাউকে বলব না কিছু!” ইশান ভাই তৃপ্ত গলায় বলত,”মিথুন আসলেই খুব ভালো ছেলে। এইজন্যই তো ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসি।”গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে মুন্নিদের বাড়িটা ছিল হিজল-করতে জঙ্গলের ঘেরা। বাড়িতে মুন্নির মা ছিল না। যক্ষ্মার করাল গ্রাসে শয্যাগত বাবা ছিল। আর ছিল একটা ছোট ভাই তানিম।

তানিম ছেলেটা বয়সে আমার চেয়ে দুই বছরের বড়। স্বভাবে ছিল সাংঘাতিক রকমের উড়ুনচন্ডী। তানিমের দিন কাটত দেওয়ান বাড়ির চৌহিদ্দিতে। দেওয়ান বাড়ির মেয়েদের ফুট-ফরমাশ, টুকিটাকি কাজ করে দিত। বিনিময়ে এঁটোকাটা যাই জুটে খেয়ে-দেয়ে ঐ বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গেই বাংলাঘরের বান্দায় শুয়ে-বসে গল্প-গুজবে এক ধরণের বাস্তুহারা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে।

এরফলে যক্ষ্মাগ্রস্থ বাবা ছাড়া মুন্নিকে আগলে রাখা কিংবা বাঁধা দেওয়ার মতো কোন মানুষ ওদের বাড়িটা ছিল না। কিছুটা অভাবে আর কিছুটা স্বভাবেই বোধহয় মুন্নি দিনে দিনে খুব বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় খুব কায়দা করে বুকের দিকটা উঁচু করে সামনের দিকে বাড়িয়ে রাখত। বেখাপ্পা ভাবে উঁচিয়ে থাকা বুকের ঢিপি থেকে ক্ষণে ক্ষণে শাড়ির আচল ছলকে পড়ত। বাইরে বাইরে সকলেই নাক সিটকে মেয়েটার সমালোচনা করত.. অথচ রাতের ঘটনাগুলি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত!

নটী বাড়িতে মানুষ যায় নিশিকালে, ইশান ভাই যেত বিকেলে। সাধারণ মানুষ খুব ভীতুর মেজাজে পা টিপে টিপে সামনে এগিয়ে যেত। ইশান ভাই যেত সশব্দে। ইশান ভাইয়ের ছোট একটা ডিসপেনসারি ছিল, স্টেথোস্কোপ এবং হাবিজাবি টেবলেট ভরা একটা ডাক্তারি ব্যাগও ছিল। সেই ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে উঁচু গলায় গল্প করতে করতে আমরা যখন মুন্নিদের বাড়িতে যেতাম, বাইরে থেকে সকলেই ভাবত, মুন্নির বাবাকে যক্ষ্মার ঔষধ খাওয়ানোর জন্য যাচ্ছি!”যক্ষ্মা হলে রক্ষ্মা নাই” শ্লোগানের যুগ ছিল সেইটা। মুন্নির বাবা যক্ষ্মায় মারা যাচ্ছে- এই কথা তখন সকলেই জান। ইশান ভাই বিত্তবান ঘরের ছেলে, ঘরে বউ আছে, বাচ্চা আছে- নষ্টা মেয়েদের গা ঘষটানোর মতো বিকারগ্রস্থ সে নয়.. এইটা প্রায় সকলেই বিশ্বাস করত!

এই ঘটনার মাস কয়েক পর মুন্নির গর্ভে হুট করেই সন্তান চলে আসল। সারা গায়ে আলোড়ন শুরু হয়ে গেল। গাঁয়ের মাতাব্বর শ্রেণীর মানুষ এবং বড় মসজিদের ইমাম সাহেব একদিন খুব আয়োজন করে মুন্নির ঘরে হামলা করেন।
যুবতী মেয়ের গর্ভে সন্তান চলে এসেছে- এই সন্তানকে তারা কিছুতেই মেনে নেবে না। মুন্নিকে হয় গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে, অথবা সন্তানের পিতা কে তার নাম বলতে হবে৷ তাকে বিয়ে করতে হবে!বেপোরয়া যৌন অভিজ্ঞতা কিছু কিছু মেয়েকে খুব দৃঢ় ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে ফেলে এই কথা আমি শহরে এসে বইপত্র পাঠ করে প্রথম জেনেছি। কথাটা যে মিথ্যে নয়- মুন্নির কথা মনে করে মেনে নিতেও বাধ্য হয়েছি!

সেবার আদর্শলিপি ছেড়ে গ্রামের স্কুলে আমি বোধহয় ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হয়েছি। বয়স পাঁচ কিংবা সাড়ে পাঁচ। সময়টা বসন্তকাল। একা যেতে ভাল্লাগেনা তাই পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দলবেঁধে স্কুলে যাই। বইখাতা হাতে নিয়ে দেওয়ানবাড়িতে গেলাম.. ওখান থেকেই যাত্রা শুরু হয় আমাদের। কিন্তু সেদিন দেখলাম ভিন্নচিত্র। দেওয়ানবাড়ির বাংলাঘরে একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। চারিপাশে প্রচুর মানুষ। মুন্নির পাশে বসা তানিম ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছে..!

গায়ের মাতব্বরেরা বসেছিল একপাশে। অন্যপাশে আমজনতা। আমজনতার ভিড় ঠেলে নিজেকে সামনের দিকে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসে কখন যে মুন্নির একেবারে হাতের নাগালে চলে গেছি টেরই পাই নি! মুন্নি আমার দিকে তাকিয়েছিল কিনা তাও মনে পড়ে না। কিন্তু ওর সেই কথাগুলা এখনো মনে পড়ে। ভুলে যাওয়ার  উপায় নেই… জীবনে ভুলবার নয়! বড় মসজিদের ইমান আজিমুদ্দিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে মুন্নি কান্নামাখা গলায় বলছিল,”আমার কথা তো আপনারা কিছুই বিশ্বাস করছেন না। আপনি একবার দয়াকরে এই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেন! ও সব দেখেছে, সব জানে!”

মুন্নি ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিল। ইমাম সাহেব সহ মজলিশের সবাই চকিতে ফিরে তাকাল আমার দিকে।
আমি তখনও কিছু বুঝতে পারি নাই। হ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছি ওদিকে। ইমাম সাহেব দুই পা এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলেন,”এই সেই ছেলে?” মুন্নি ঠোঁটের কোনায় তাচ্ছিল্যের একটা হাসি ফুটিয়ে মাথা ঝাকাল। মজলিশের কেন্দ্রে বসে ছিলেন আমার নানা আসকর আলী। তিনি ওদিকে তাকিয়ে কার সাথে যেন গল্প করছিলেন। হঠাৎ আমার দিকে ফিরে হুংকার দিয়ে জানতে চাইলেন,”তুই এইখানে কি করছিস? যাহ ভাগ!” ইমাম সাহেব মিনমিনে গলায় বললেন,”চলেই যখন এসেছে, আড়ালে নিয়ে আমি একবার..”

ইমাম সাহেবের কথা শেষ হবার আগেই নানাজান হুংকার দিয়ে থামিয়ে দিলেন ওকে। ধমকের স্বরে বললেন,”তোমার মত গণ্ডমূর্খ জীবনে দুইটা দেখি নাই! হারামজাদী কুত্তিনী কার সাথে শুয়েছে, কার বিছানায় গিয়ে মাতারি করেছে তার সাক্ষ্য দেবে আমার নাতি? কথা বলার আগে, কথা হিসেব করে বলতে শিখ মিয়া!” মজলিশ থেকে আমাকে বিদেয় করে দেওয়া হল। মুন্নিকে মাথা ন্যাড়া করে, আলকাতরা মাখিয়ে ঢাক-ঢোল-বাজিয়ে অসতী সাব্যস্ত করে গ্রামের সীমানা থেকে বের করে দেওয়া হল।

এত বড় শাস্তি ওর প্রাপ্য ছিল না। খুব বেশি হলে একঘরে কিংবা ভালোয় ভালোয় গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিত। মুন্নি মারা খেয়েছে ওর একরোখা জেদের কারণে। ওর গর্ভে যখন বাচ্চা আসে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা প্রথমেই বাচ্চার পিতার নাম জানতে চেয়েছিল। মুন্নি তা বলে নি। অস্বীকৃতি জানায়। সে বলে, আমার সন্তান আমি দেখব, আমিই খাইয়ে পরিয়ে বড় করব, আপনাদের এত ভাবতে হবে না! এতেই গ্রামের মানুষ গেছে ক্ষেপে। মুন্নিকে অচ্ছুৎ ঘোষণা করে গ্রাম ত্যাগের হুকুম করা হয়। মুন্নি তখন উল্টো বিগার দেখিয়ে জানতে চাইল,”বিগত দেড় বছরে কম হলেও পঞ্চাশজন পুরুষ আমার কাছে এসেছে। আমার সঙ্গে শুয়েছে। আমি কার কথা বলব? কাকে বাদ দিয়ে কাকে দোষারোপ করব হাহ?

এইসব ভেতরের খবর অবশ্যি তখনও আমরা জানতাম না। ক্রমে ক্রমে বড় হয়ে সব জেনেছি। বেপরোয়া মুন্নি ওর নিজের খেয়ালের গরম দেখাতে গিয়ে গায়ের মোড়লদের ক্ষেপিয়ে দিয়েছিল। শেষমেশ আর উপায় নেই দেখে বিভিন্নসব মান্যগণ্য পুরুষদের নাম বকতে শুরু করল। গ্রামের মানুষ সেইসব নাম শুনে আঁতকে উঠে। দ্বিতীয়বার শুনবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

নষ্ট বাচ্চা পেটে ধারণ করে মুন্নি পাগল হয়ে গেছে, এই অপবাদে তাকে গ্রাম ছাড়া করার ফায়সালা চূড়ান্ত হয়ে যায়।
কিছুতে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না দেখে মুন্নি তখন সন্তানের পিতা হিসেবে ইশান ভাইয়ের নাম বলে, সেই সঙ্গে আমার নামটাও জড়িয়ে দেয়, সাক্ষী হিসেবে! কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেদিন বিকেলেই জনসমক্ষে মেয়েটার মাথার চুল কেটে, গালে-মুখে আলকাতরা মাখিয়ে ধরে-বেঁধে কাউনের মাঠে ফেলে দিয়ে আসে।

কাউনের মাঠ থেকে মিনিট বিশেক হাঁটলেই ধরলা বাজার। মুন্নিকে কাউনের মাঠে ফেলে রেখে আসার সময় সকলেই ভেবেছিল সে ধরলার বাজারে গিয়ে আশ্রয় নেবে। খাতায় নাম লেখাবে।কিন্তু না, এই ঘটনার দুইদিন পরেই কাউনের মাঠের একপাশে হাউরা-ঘাসের বন-ঝোপের ভেতর মেয়েটার ক্ষত-বিক্ষত, বিপর্যস্ত, আলুথালু মরদেহ পাওয়া যায়।

কোন একজন বা একাধিক পুরুষের পাশবিক লালসার ঘায়ে মারা গিয়েছিল মেয়েটা! মৃত্যুর সময় মুন্নির বয়স হয়েছিল আনুমানিক একুশ। সেইসব বহুকাল আগের কথা। গ্রামের ছেলেবুড়োদের সঙ্গে দলবেঁধে মুন্নির লাশ আমিও দেখতে গিয়েছিলাম। বাল্যকালে আমাদের বলা হয়েছিল, কাউনের চিতাবাঘ আছে। মুন্নি মারা গিয়েছে চিতাবাঘের তাড়া খেয়ে!

দিনে দিনে যতই বড় হলাম, ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, কাউনের মাঠে কোন চিতাবাঘ নেই। কখনো ছিল না। জগতের সকল চিতা, সকল হায়েনা… শেয়াল, শকুন, ইঁদুর কুকুর সবই কাউনের মাঠের নাম করে পুরুষের মাথার ভিতরে চড়ে বেড়ায়!সবচাইতে বিস্ময় লাগে যখন ইশান ভাইয়ের কথা ভাবতে বসি… এমন কি এখনো ভেবে ভেবে অবাক হয়ে যাই।

যে মেয়েটির রাঙা চরণ মাথায় নিয়ে গোপনে কান্না করত সে, ছোট্ট একটা চুমুর জন্যে আকুলিবিকুলি করত… সেই মেয়েটার চরম দুঃসময়ে সে এতটুকু শব্দও করে নি, এতটুকু দুঃখবোধ তার ভেতরে দানা বাঁধে নি!

মুন্নি তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। কিন্তু ইশান ভাইয়ের এই পাশবিক বেঁচে থাকা এখনও আমাকে খুব লজ্জা দেয়।
ওর দিকে তাকালেই সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে যায়.. সেই যে কাউনের মাঠ… ক্ষতবিক্ষত এক যুবতীর লাশ… পিতাদের পাপ আর অলৌকিক এক চিতাবাঘ!

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত