অতিপ্রাকৃত গল্প

অতিপ্রাকৃত গল্প

একটা ছোট জমিদারবাড়ি, পুরানো। কিন্তু, কয়েকটা ঘর থাকার উপযুক্ত করে ঠিকঠাক করে নেওয়া হয়েছে।
বাড়ির সামনে দিয়ে একটা খুব সাধারন শান্ত নদী টলমল বয়ে চলেছে।

গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি সিঁড়ির ছোট ছোট ধাপগুলো একেবারে নদীতে গিয়ে মিশেছে।
এর পাশেই একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছের কয়েকটা ডাল পানি ছুয়ে আছে।
উত্তরের আকাশ মেঘে ঢাকা। যখন তখন বৃষ্টি নেমে আসবে।
দমকা হাওয়ায় গাছটার ডাল পানিতে মৃদু ঢেউ সৃষ্টি করছে।

ডালে বসে থাকা একটা বাজপাখি ডানা ঝাপটিয়ে আকাশে উঠে চক্রাকারে ঘুরছে শিকারের আশায়।
মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে একজন মাঝবয়সী লোক এই বজ্রপাতের ভেতর শান্ত, চুপচাপ বসে একটু পরপর হাতের তালুর কাটা জায়গাটায় হাত বোলাচ্ছেন।

খুব কাছেই একটা বাজ পড়লো, আশেপাশের কাকগুলোর চিৎকারে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।
দিনের বেলাতেই আকাশের একপাশ কালো করে রাতের মতো আঁধার নেমে আসায়, দিনের আকাশের চাঁদটার আলো ছায়ার খেলায় নদীতে যেন মিহি জোছনা নেমেছে।

যিনি এভাবে ভাবলেশহীন আসন গেড়ে গাছের নিচে বসে আছেন, তিনি আসলে একজন ডাক্তার।
ডাক্তার বললে ভুল হবে, সঠিক পরিচয়ে তিনি একজন সফল চিত্রপরিচালক।
পানশালকার!
উনার নাম।

আগের অংশটুকু জুড়ে দিলে পুরো নামটা হবে বিজয় নারায়ন পানশালকার।
অতি জনপ্রিয় কয়েকটা চলচিত্র পরিচালনা করে, হুট করে একদিন পরিচালনা করা ছেড়ে দিলেন।
তার শেষ সিনেমার কাজটা হচ্ছিলো এখানেই, ঠিক এমন সময়ে…
আকশে মেঘ আসি আসি করে হুট করে ঝড়ো বৃষ্টি শুরু হওয়া মৌসুমে।

দূর থেকে ভেসে আসা খালি গলায় মুয়াজ্জিনের আজানের সুর একটা প্রকাণ্ড জমিদার বাড়ির দেয়ালে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করছে।

ফজরের ওয়াক্ত!
প্রায় বৃদ্ধ নওয়াব চৌধুরীর শূন্যে বাড়িয়ে ধরা বাম হাতে একটা বাজ পাখি এসে বসলো, পোষা বাজটার গায়ে কয়েকবার হাত বুলিয়ে, একটা মাংসের টুকরা শূন্যে ছুঁড়ে দিলেন তিনি।
বাজটা শূন্যে ছুটে গিয়ে টুকরোটা কামড়ে ধরে দালানের উপরে গিয়ে বসলো।
কিছুক্ষন পর তিনি রওনা হবেন এই মৌসুমের খাজনা আদায়ে।
এই জমিদার বাড়িতে তিনি একাই থাকেন, সাথে পাহারাদার আর কিছু সেবক আছে যথারীতি।
জমিদার সহ সবাই, এক প্রকারের কালো আলখাল্লা জাতীয় পোশাক পরেন।
দেখে সাধক সাধক মনে হয়।
সাথী হিসেবে একজন রক্ষিতা আর একটা কালো ঘোড়া আছে।
রক্ষিতা হলেও এই মেয়েটাকে অসম্ভব পছন্দ করেন তিনি।
খাজনা প্রদানে ব্যর্থ, কোন এক গরীব চাষার ঘরের মেয়ে।
মহিষের চর এলাকার খাজনা আনতে গিয়েই মেয়েটাকে নজরে পড়ে তার।
এত রুপের অধিকারী একটা মেয়ে এই ঘরে ঠিক মানায় না।
প্রায় কোন রকম বাধা ছাড়াই মেয়েটাকে তুলে আনেন তিনি।
ওই কৃষক অথবা তার পরিবারের কেউ আর মেয়েটার খোঁজ নিতে আসেনি।
হয়ত গ্রাম ছেড়েই অন্য কোথাও চলে গিয়েছে।

 

লোকেশানটা দেখতে এসেই পানশালকারের মন ভরে যায়।
এত সুন্দর! এত সুন্দর জায়গা!
লোকালয় থেকে প্রায় মাইল পাঁচেক দূরে। ঘন জঙ্গলের ভেতর।
পরিত্যাক্ত?!
গুগল ম্যাপের নিকট চিরকৃতজ্ঞ পানশালকার।
এখানের পুরো সিনেমার সেট সাজিয়ে বসেন তিনি।

কঠোর বাস্তববাদী মানুষ হওয়া স্বত্বেও সিনেমার শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে, তিনি ভাবনায় হারিয়ে যেতেন। কখনো কখনো শ্যুটিং ই বন্ধ করে দিতেন।

জমিদার বাড়িটার দেয়াল ধরে ধরে তিনি এঘর থেকে ওঘরে হাঁটতেন। কয়েকটা পুরানো ভাঙা আলমারি, ঘুণে
ধরা পালঙ্ক, একটা মলিন আয়না; একদিন রান্নাঘরটায় কিছু মাটির হাঁড়িপাতিল দেখে, তিনি যেন হারিয়ে যান এই জমিদার বাড়িতে অতীতে বসবাসকারী মানুষগুলোর প্রতিদিনের স্মৃতির ভেতর।

তিনি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন রান্নাঘরের মাঝখানটায়, তার চারপাশের ব্যস্ত মানুষ জন প্রতিদিনকার রুটিন কাজকর্ম করে চলেছে।

ওই যে বাড়ির বৃদ্ধ মা একপাশে বসে দেখছেন রান্না বান্নার আয়োজন, এইদিকে কাজের মানুষজন ছুটোছুটি করছে।
আহ!

এই বাড়িটা ঘিরে একসময় কত ব্যস্ততা ছিলো, যুগের পর যুগ; কয়েক প্রজন্মের গল্প এই বাড়িতে সময়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় জমা হয়ে আছে।
আজ এখানে শুনশান নীরবতা।
এই মানুষগুলোর গল্প কোথাও লেখা নেই, কেউ জানবেও না তাদের নাম।
এই হাহাকার অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে পৃথিবী।

ভাবতে ভাবতেই পানশালকার যেন মিশে গেলেন অন্য এক অতীতে, তিনি মোহগ্রস্থের মত হাঁটছেন জমিদার বাড়িটার চারপাশ ঘিরে, ঠিক পিছন দিকে একটা ছোট পুকুর, কচুরি পানার ফুলে ভরপুর। তার পাশেই একটা পুরানো কবরস্থান। শেষ কবে কবর খোড়া হয়েছিলো এখানে? কার জন্য।

পানশালকার ভাবছেন, ভাবছেন…
গরমে মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে, পৃথিবী দুলদুল করছে…

একপাশের আকাশ কালো হয়ে এলো, ঝড় আসবে নাকি? দমকা হাওয়া শুরু হল, কাছেই বাজ পড়লো কোথাও…
আহ! প্রেশারটা কমে গেলো নাকি আবার?

তিনি একটু জোরে কারো নাম ধরে ডাকলেন, ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা… নামটা একটা মেয়ের।
দীপা!

 

পাশবিক, নিষ্ঠুর জমিদার হিসেবেই নাওয়াব চৌধুরীকে চেনে সবাই।
খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে, অত্যাচার করে মানুষ খুন পর্যন্ত করেন তিনি।

জমিদার বাড়ির পেছনের ছোট পুকুরটাতে জ্যান্ত চুবিয়ে প্রচুর মানুষ হত্যা করে, পাশের কবর স্থানেই কবর দেন বলে গুজব আছে।

এই জমিদার বাড়িতে একবার ঢুকলে, আর বের হওয়ার উপায় নেই।
খাজনা আদায়ের দিন।
শনিবার সন্ধ্যা!
শ্রাবণ মাসের ২৯ তারিখ।
অমাবস্যা।

হাতে বন্ধুক উচিয়ে একটা কুমারী মেয়েকে ঘোড়ায় বেঁধে জমিদার বাড়ির আঙিনায় পৌঁছান নওয়াব চৌধুরী।
চিলেকোঠা থেকে জমিদারের রক্ষিতা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সম্মোহিতের মতো।

পুকুরে একটা ডুব দিয়ে উঠে মেয়েটাকে কাঁধে বয়ে দালানের মাটির নিচের বদ্ধ একটা ঘরে বন্দী করে সে।

 

পানশালকার যখন ঠিকমত হুঁশ ফিরে পেল, তখন প্রায় সন্ধ্যা।
আশ্চর্য! এতক্ষণ একটা লোকও তাকে খুঁজতে আসেনি!
তার মাথার ভেতর একটা নাম ঘুরঘুর করছে দীপা, দীপা…
ধুর! এইটা আবার কে?

পানি খাওয়ার জন্য দালানে ঢুকতে যেয়েই, সে হকচকিয়ে গেল!
বাহিরে কয়েকজন পাহারাদার সেকেলে বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই একটা কালো ঘোড়া বাঁধা।
কি মনে করে ঘোড়াটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলো পানশালকার।

তাকে দেখা মাত্র কালো আলখাল্লা পড়া লোকগুলো নতজানু হয়ে সালাম ঠোকা শুরু করলো।
আরে! ঘটনাটা কি!

নিশ্চিত এটা প্রডাকশান ম্যানেজার আতার কাজ।
হতচ্ছাড়া কে আজ পেলেই হয়েছে।
থাকে সবসময় ফ্যান্টাসির মধ্যে, তাই বাস্তবেও ফাজলামো শুরু করে দিয়েছে।
টাকা আসে কোথা থেকে কোন খবর নেই!
আশ্চর্য! বাড়িটাও নতুন নতুন মনে হচ্ছে।
করেছেটা কি বদমায়েশটা।
শরীরটা ভালো না। কাল সকাল হোক, তারপর দেখাচ্ছি তোমার ফ্যান্টাসি।
কিলিয়ে কিলিয়ে পয়সা উসুল করবো।
তার ভয়ে সবগুলো ভেগেছে কোথাও।
উফ আর পারা গেলো না, এদের নিয়ে।

ইশারায় সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে একগ্লাস পানি দিতে বলে, রান্নাঘরের পাশের রুমটাতেই ঘুমিয়ে গেলেন তিনি।
পানি নিয়ে আসা লোকটা একটু ইতঃস্তত ভাবে পানি দিয়ে প্রায় পালিয়ে গেল।

 

এক প্রকার তরল জাতীয় নেশা পান করে দালানের মাটির নিচের ঘরটাতে প্রবেশ করলেন নওয়াব চৌধুরী, সমস্ত পাহারাদারদের বিদায় করে দিয়ে।

নারীদের জন্য বানানো এক প্রকার বিশেষ আলখাল্লা পরানো হয়েছে মেয়েটাকে।
ঘরে আর কেউ নেই।
ঘরের একপাশে পুঁজোর বেদীর মতো উচু স্থান।
সারা ঘরের দেয়ালে ছোট ছোট হরফে কিছু লেখা।
মেয়েটার চুল চেপে ধরে, ক্রুশের মতো একটা কাঠের খণ্ডের সাথে বেঁধে ফেললো নওয়াব।
মেয়েটাকে মাদকাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে।
কোন প্রতিরোধ নেই।

এরপর কয়েকটা বড় গজালাকৃতি পেরেক প্রথমে বাম হাত, তারপর ডান এরপর ডান পায়ের পাতা, এরপর বাম পাশেরটায় ধীরে ধীরে গেঁথে দিতে লাগলো সে চক্রাকারে… চক্রাকারে।
মেয়েটা মাঝেমধ্যে গুঙিয়ে ওঠে শুধু।

 

মাঝরাতে পানির তৃষ্ণায় পানশালকারের ঘুম ভেঙে গেল।
বাহ! হাতের কাছেই রাখা পানি।
ঢকঢক করে পুরো গ্লাস খালি করে দিলো সে।
দুপুরে যে বৃষ্টি হয়নি, সেটাই সম্ভবত এখন নামবে।
চমৎকার বাতাস বইছে।
পাইক পেয়েদা, সং গুলো কই?
ঘুমাচ্ছে নিশ্চয়ই পড়ে কোথাও।
আতার কথা মনে পড়তেই মেজাজটা আবার খিচড়ে গেলো।
ধুর! এসব চিন্তা এখন থাক।
এমন সময় একটু নদীর পাড়ে না বসলে হয়?
খালি পায়েই রওনা দিলো পানশালকার।
এ এক অন্য অভিজ্ঞতা।
অমাবস্যার রাতেও নদীর স্বচ্ছ পানিতে রাতের আকাশের তারাগুলো দেখা যাচ্ছে।
ইচ্ছে করলেই যেন গোনা যাবে।
এই যাহ! বৃষ্টি শুরু হল জোরেশোরে।
এর মাঝেই, দূর কোথাও থেকে কারো গুনগুন গানের শব্দ ভেসে আসছে।
ঠিক প্রার্থণার মতো।
কনফিউজিং!
শুধু সুর না, কেউ একজন গোঙাচ্ছে তীব্র যন্ত্রণায়।
পানশালকার কৌতুহলে উঠে দাঁড়ালো। খুঁজে দেখা যাক তো, ঘটনাটা কি?
দালানের পেছন দিকটায় এসে চমকে গেল সে।
কবরস্থানের পাশের দিকটাতেই, আওয়াজটা তীব্র হয়ে আসে আবার চলে যায়।
পানশালকার কয়েকবার বাড়িটার চারপাশে চক্রাকারে ঘোরে।
নাহ ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কোনদিক থেকে আসছে আওয়াজটা।

বাহিরে কোথাও হবে ভাবতে না ভাবতেই ঠিক যেন তার পায়ের নিচ থেকেই একটা তীব্র চিৎকার ভেসে আসলো।
ভয়ে পানশালকারের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার জোগাড়।

একটু ভালমত তাকাতেই দেখল, দালানের নিচের দিকে একটা সুড়ঙ্গমত পথ , প্রবেশমুখে একটা নকশা আঁকা দরজা।

সাবধানে দরজা খুলে আবছা আলোয় হাত বাড়িয়ে, সে শব্দের উৎসের দিকে হাঁটা শুরু করলো। তার অজান্তেই তাকে অনুসরন করে আর একটা ছায়ামূর্তি একই পথ ধরে প্রবেশ করলো। হাতের ডানে বামে অজস্র খুপরির মত ঘর, ঘরগুলোতে জালির মতো অজস্র খোপ খোপ ফুটো আর তীব্র

অস্বাভাবিক বোটকা ঘ্রাণে বাতাস ভারি হয়ে আছে। কয়েকটা ঘরে মূর্তির মতো কি যেন বসানো। সর্বডানের ঘর থেকে মৃদু আলো আসছে।

আরে! ঘরে মানুষ আছে।

একজন পুরুষ ঘুরে ঘুরে মন্ত্রের মত করে কি যেন পড়ছে। সামনে একটা মূর্তী।
মূর্তীটার পাশেই একটা বাজ পাখি বসে আছে, একটু পরপর ঠোকর দিচ্ছে মূর্তীর গায়ে।
পানশালকার সেই কামরাটার পাশের ঘরের ফুটো দিয়ে সাবধানে উঁকি দেয়া মাত্র, তীব্র ভয়ে জমে গেল। এক পা ও নড়তে পাড়ছে না সে।

মূর্তি নয়। একটা অল্প বয়সী মেয়ে।

তার সারা গায়ে খোদাই করে বিচিত্র ভাষায় কিছু লেখা রক্তে ভেসে উঠেছে।
মেয়েটার সারা শরীর ক্রুশের সাথে পেরেক দিয়ে গাঁথা।

চক্রাকার চাকার মতো ক্রুশটা ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরছে। মেয়েটার শরীরের ক্ষত থেকে রক্ত ছিটকে দেয়ালে পড়ে সেই বিচিত্র ভাষার বর্ণের মতো হয়ে যাচ্ছে।

লেখাগুলো যেন ডাইমেনশান জাতীয় কোন কিছুর ভেতর আঁকা, অনেকটা গ্রাফের ভেতর, আমরা যেমন তিন মাত্রার আঁকি ঠিক সে রকম, কিন্তু এখানে ডাইমেনশান অসংখ্য, জীবন্ত!
অবিশ্বাস্য সৃষ্টি!

সেই সাথে এক প্রকার সুর করে মন্ত্র পড়ে ঘড়ির কাটার উলটো দিকে চক্রাকারে ঘুরছে এক মাঝ বয়সী উপাসক।
সে জীবিত মানুষের মাধ্যমে কোন এক দেবতার উপাসনা করছে।
একসময় পুরো দেয়াল লেখায় ভরে গেল।

মেয়েটা সম্ভবত মারা গিয়েছে।

ঘুর্নায়মান ক্রুশটা স্থির হওয়ার পর উপাসক ধারালো দুমুখো ছুরি দিয়ে মেয়েটার শরীর থেকে লেখাসহ চামড়া ছিলে নিয়ে, সেই লেখাটা দেয়ালের যেই লেখার সাথে মিলে, ঠিক সেখানে বসানো শুরু করলো।

পানশালকার ভয়ে ভয়ে চারপাশের দেয়ালে তাকালো। পুরো দেয়ালজুড়ে মানুষের চামড়া দিয়ে কিছু একটা লেখা।
এতক্ষণ যেগুলো ভেজা মাটি মনে হচ্ছিলো।
আশ্চর্য এই চামড়াগুলো থেকে যেন এখনো রক্ত ঝরছে, এগুলো শুকোয় নি কেন!
নাহ! মেয়েটা মরে নি। ওই তো একটু নড়ে উঠলো।

যা করার এখুনি করতে হবে। মেয়েটার পাশেই আর একটা ধারালো ছুরি দেখা যাচ্ছে।
পানশালকার সুযোগের অপেক্ষায় আছে, চামড়া কেটে দেয়ালে লাগানোর সময় যেই লোকটা পেছনে ফিরবে সাথে সাথে আঘাত করতে হবে।

লোকটা পিছু ফেরার সাথে সাথে পানশালকার যেই ওই ঘরের কাছাকাছি গেল, ঠিক তখন অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা একজন মহিলা বড় ছুরি জাতীয় একটা ভারী ধারালো অস্ত্র উপাসকের পিঠ বরাবর ঢুকিয়ে দিলো।
উপাসক চিৎকার করে সাহায্যের জন্য দীপা নামের কাউকে ডাকলো।
যেন দীপা তার পরম বিশ্বাসের কেউ।

এরপর মহিলাটার দিকে ঘুরে, তার চেহারা দেখার পর তীব্র অবিশ্বাসে চুপ হয়ে গেল।
দীপা আরো কয়েকটা আঘাত করে পালানোর জন্য অন্ধকার গলির দিকে দৌড় দিল, গলির মুখেই পানশালকারকে দেখে ভয়ে রক্তহীম করা চিৎকার দিয়ে তার দিকে হাতের অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিলো।
পানশালকারের হাতের তালুতে এসে ছুরিটা গেঁথে গেল।

অপুর্ব রূপসী এক মানবী!
পানশালকার মেয়েটাকে ধরার চেষ্টা না করে, উপাসনার ঘরের দিকে দৌড় দিলো।
যে মেয়েটার উপাসনা করা হচ্ছিলো মেয়েটা মারা গিয়েছে।
পাশেই উপুড় হয়ে পড়ে আছে উপাসক।

দেয়াল থেকে মশালটা খুলে উপাসকের চেহারার কাছাকাছি নিতেই পানশালকার দীপা নামের মেয়েটার তীব্র ভয়ের কারণ বুঝতে পারলো।

উপাসক দেখতে একদম তারই মতো। সে পানশালকারকে দেখে, খলখল করে হাসা শুরু করলো তীব্র আনন্দে। নাক মুখ বেয়ে রক্ত বেরুচ্ছে।

পানশালকারের ভেতর থেকে কেউ একজন তাকে সাবধান করে দিলো, তার পালানো উচিত এখন। ঠিক এমন সময় মশালটা নিভে গেল।

মাটির নিচের ঘর, ঘুটঘুটে আঁধার।
এর মধ্যেই পানশালকার অন্ধকারে এঘর থেকে অন্য ঘরে ছুটোছুটি করা শুরু করলো।
তাকে তাড়া করে ফিরছে উপাসকের খলখল হাসি।
সে পাগলের মত ছুটছে ছুটছে… পথ খুঁজছে।
তার একটা কোদাল দরকার, লাশগুলো চাপা দিতে হবে, চাপা দিতে হবে উপাসকটাকে।
তার চারপাশে সময় যেন ঘুরছে, টলমল জলের মতো পৃথিবী দুলছে।

১ (খ)

সকালে প্রডাকশান ম্যানেজার আতা আবিষ্কার করে পানশালকার কবরস্থানের পাশেই শুয়ে আছে, হাতে একটা কোদাল। হাতে রক্ত দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলো সে। ডাক্তার ডেকে এনে চিকিৎসা করাতে হল।

এরপর পানশালকার শুটিং ক্যান্সেল করে দিয়ে, এই জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করলো। প্রথম প্রথম লোকজন আসত দেখতে। আজকাল আর কেউ আসে না। সে একাই থাকে এখানে।রাত গভীর হলে একের পর এক কবর খোঁড়ে। সেই সময়, তার মাথার উপর চক্রাকারে একটা বাজ পাখি উড়ে বেড়ায়, কাছে আসতে চায়। তিনি হাত নাড়িয়ে বিরক্ত হয়ে পাখিটাকে তাড়িয়ে দেন।

সবগুলো কবরেই একটা জিনিস বেশ মিল আছে। লাশগুলো দেখলে যেন মনে হয়, শুধু হাঁড় কবর দেয়া হয়েছে এখানে। রক্ত মাংসের মানুষ নয়।

ওই মাটির নিচের ঘরগুলোয় কিছুই নেই, দু’একটা ইঁদুর তেলাপোকা আর সাপ ছাড়া।
পানশালকার দিনের পর দিন কবর খুঁড়ে যায় দুটো লাশের আশায়, যেগুলো রক্ত মাংস সহ এখানে কবর দেয়া হয়েছিলো।

একটা অল্প বয়সী কিশোরীর আরেকটা তার নিজের!

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত