শাঁখিনী

শাঁখিনী

হাসানুজ্জামান টের পায়, তার মুখে একটা হাসি ফুটে আছে। সেটা এই পরিস্থিতিতে তাকে খুব একটা সাহায্য করবে না, তা সে জানে, কিন্তু হাসিটা মুছতে গিয়ে কষ্ট হচ্ছে তার ।

হাসানুজ্জামান দাঁড়িয়ে আছে জয়দেবপুর মােড় থেকে একটু পশ্চিমে, রাস্তার পাশে একটা অঘােষিত স্ট্যাণ্ডে। উত্তরের হিমেল হাওয়া বড় বড় কারখানার ভবনের ফাঁকে একটু খােলা জায়গা পেয়ে এসে হামলে পড়ছে তার ওপর। তবে হাসানুজ্জামানের গায়ে মােটা উলের সােয়েটার, গলায় মাফলার, কান পর্যন্ত ঢাকা টুপি, শীত তাকে কাবু করতে পারবে না। রাতের এই অন্ধকারকেও ভয় পাচ্ছে না সে, হাসানুজ্জামান নিজেও নিশাচর।

তাকে যেতে হবে এলেঙ্গা বাজার। এখন অনেক ট্যাক্সি চলাচল করে টাঙ্গাইল রােড ধরে, মাথাপিছু একটা ভাড়া দিতে হয়। বাসে চড়ার ঝক্কি পােষায় না যাদের, কিংবা কোনও কারণে ভরসা পায় না, তারাই ট্যাক্সি বেছে নেয়। আর এ চর্চাটা আছে বলেই হাসানুজ্জামান মাঝে মধ্যে হাতে কাজ না থাকলে এই সড়কে ছিনতাই করে।

তার ব্যাগের মধ্যে একটা বিদেশি পিস্তল আছে । গুলিভরা, ব্যবহারের জন্য তৈরি। তবে আজ রাতে রাস্তায় ছিনতাইয়ের জন্যে দাঁড়ায়নি সে। এলেঙ্গা বাজারে গিয়ে একটা খ্যাপ নিয়ে কথাবার্তা সারতে হবে। কালিহাতিতে এক দুর্ভাগার বড়ি ফেলার খ্যাপ, মক্কেল অনেক পয়সাওয়ালা লােক, আশ্বাস দিয়েছে এলেঙ্গা বাজারের পার্টি, হাসানুজ্জামানকে টাকা নিয়ে দরাদরি করতে হবে না বেশি।

সব ট্যাক্সি অবশ্য এই স্ট্যাণ্ডে থামে না। নানা হিসাব কিতাব আছে। ভেতরে মস্তান প্যাসেঞ্জার থাকলে লাইনের ট্যাক্সিও না থেমে চলে যায় । অনেক সময় লাইনের অন্য লােক ট্যাক্সি নিয়ে এসে এসব স্ট্যাণ্ড থেকে বােকাসােকা লােকজনকে তােলে, কালিয়াকৈর পৌঁছানাের আগেই কাজ হাসিল করে নির্জন কোনও জায়গায় মারধর করে নামিয়ে দেয় শিকারকে। বেশি তেড়িয়াপনা করলে বডি ফেলে দেয় অনেকেই।

হাসানুজ্জামানকেও একবার ফেলতে হয়েছিল। তবে সবকিছু সিস্টেম হয়ে গেছে এখন । ছােটখাটো দাও মারলে যাত্রী-পুলিশ-সাংবাদিক কেউ গা করে না। লাইনে নতুন আসা রুস্তমরা কিছু না বুঝেই মেশিন চালিয়ে বডি ফেলে দেয়, তখন কয়েকদিনের জন্য একটু সমস্যা হয়। ঘাপলার কোনও শেষ নেই, এসব ঠেলেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়। পর পর দুটো লােক বােঝাই ট্যাক্সি সা-সঁ করে স্ট্যাণ্ড পেরিয়ে চলে যায়।

হাসানুজ্জামান শরীরের ভর বাম পা থেকে ডান পায়ে নিয়ে দাঁড়ায়। সে একটা হােটেলে মুরগি দিয়ে ভাত খেয়েছে ঘণ্টাখানেক আগে, কিন্তু আবার মৃদু খিদে পাচ্ছে তার। স্ট্যাণ্ডের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে, কিন্তু এখন সেটা বন্ধ। হয়তাে দোকানি এই ঠাণ্ডার রাতে আজ একটু জলদি বাড়ি ফিরে কাঁথার নীচে ঢুকে বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে চায়। আর দোকানটা বন্ধ বলেই হয়তাে হাসানুজ্জামানের চায়ের তৃষ্ণাটা এক লাফে অনেকখানি বেড়ে গেছে। দূরে একটা গাড়ির আলাে দেখে আবার একটু এগিয়ে দাঁড়ায় সে। আয় বাবা ট্যাক্সি, এলেঙ্গা বাজার নিয়ে যা জলদি জলদি। বাজার থেকে গরম এক কাপ চা খেয়ে পার্টির সাথে আলাপ-সালাপ শুরু করি।

নাহ, এটা প্রাইভেট গাড়ি। উল্কাবেগে স্ট্যাণ্ড পেরিয়ে চলে যায় গাড়িটা টাঙ্গাইলের দিকে। দামী জিনিস, হয়তাে কোনও বড়লােকের ছেলে যমুনা  ব্রিজের রাস্তায় বেশি জোরে গাড়ি চালানাের লােভে বেরিয়েছে। সে হাসানুজ্জামানকে চায়ের জন্যে আর মনে মনে হা-হুতাশ কূর্বার সুযােগ না দিয়ে এবার স্ট্যাণ্ডে এসে থামে একটা ট্যাক্সি । ইয়েলাে গর্ব, তার মানে ভেতরে যারা আছে তারা ভালাে পয়সা খরচ করেই যেখানে যাওয়ার যেতে ইচ্ছুক। কালাে ক্যাবের ভাড়া ইয়েলাে ক্যাবের তুলনায় অনেক কম হয়, হাসানুজ্জামান যে শ্রেণীর মানুষের পরিচয় ঊড়িয়ে ছিনতাই করে, তারা কখনও ট্যাক্সি চড়লে কালাে ক্যাবেই চড়ে।

গাড়ির ভেতর থেকে নারী কণ্ঠের চড়া প্রশ্ন শুনতে পায় হাসানুজ্জামান, ‘এইখানে থামাইলেন ক্যান? অ্যাই ড্রাইভার, এইখানে থামাইলেন ক্যান?

হাসানুজ্জামান একটু ঝুঁকে নিজের গােবেচারা চেহারাটা দেখায় গাড়ির
চালক আর পেছনের সিটে বসা আরােহীদের । সে দেখতে একেবারেই নিরীহ, মােটাসােটা, একটু খাটো, চোখে বিনা পাওয়ারের রূপালি ফ্রেমের চশমা, জড়সড় ভিতু অভিব্যক্তি চোখেমুখে । ছিনতাই করতে বেরােলে সে শিকারের সাথে আগে গল্প জমিয়ে তার ভেতরে জমে থাকা শঙ্কাটা গলিয়ে দূর করে, নিজেকে তখন দূরের কোনও মিল বা ফ্যাক্টরির অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টোরকিপার বলে পরিচয় দেয় হাসানুজ্জামান। নানা গল্পগুজবের পর শিকার যখন একেবারে ঢিল দিয়ে দেয়, তাকে হানি সাধনে অপারগ কোনও কেরানী ধরে নেয়, তখনই ছােবল মারে সে। নিজের কাজে মন্দ নয় হাসানুজ্জামান, চড়থাপড় থেকে খুনখারাপি কোনােটাই সে মন্দ চালাতে জানে না। অ্যাকশনের সময় তার সস্তা রূপালি ফ্রেমের ওপাশে চোখদুটো সরীসৃপের চোখের মতাে ঠাণ্ডা হয়ে ওঠে, সেটাই অর্ধেক কাজ সেরে ফেলে বেশিরভাগ সময় ।

পিস্তলটার চেহারা বাকি পঞ্চাশ শতাংশ উসুল করে নেয়। কুড়িটা ঠ্যাক দিলে একটায় হয়তাে প্রতিরােধ আসে, তখন পিস্তল কথা বলে। বিগলিত কণ্ঠে সালাম দেয় হাসানুজ্জামান, ‘মালিকুম! ভাই কি এলেঙ্গা বাজার পর্যন্ত যাবেন?

পেছনে নারী কণ্ঠ আবার উঁচু, চোখা গলায় বলে, অ্যাই ড্রাইভার, আপনি এইখানে ক্যান থামাইছেন গাড়ি?

ড্রাইভার লােকটা সাধারণ ক্যাব ড্রাইভারের মতই দেখতে, সে পেছনে না ফিরেই বিরক্ত হয়ে বলে, আপা, আমার এক সিট এখনও খালি। আরেকজন প্যাসেঞ্জার লমু।’

নারীকণ্ঠ আরেক পর্দা চড়ে বলে, ‘প্যাসেঞ্জার নিবেন মানে? আমরা আপনার সাথে চুক্তি করছি, আপনি আবার আরেকজনরে লইকন ক্যান?

হাসানুজ্জামান একটু ঝুঁকে পেছনের সিটে আরােহীদের দেখে। ট্যাক্সিতে চড়ে এই রােডে মেয়ে নিয়ে ফুর্তিতে বের হওয়া খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে পেছনের সিটে যারা বসে, তাদের দেখে-ওই কেস বলে মনে হয় না। বছর তিরিশেকের এক যুবতী বসে, তার পাশে শান্ত শিষ্ট গােবেচারা

চেহারার এক মাঝবয়সী লােক। মেয়েটার সাজগােজ বেশ্যাদের মত নয়, বেশ মার্জিতই বলা চলে, রইস ঘরের মেয়েদের মতই, দুইজন বসেও আছে ভদ্র দূরত্বে। অবশ্য আগে কী হচ্ছিলাে কে জানে?

হাসানুজ্জামান সালাম দেয় আবার। স্নামালিকুম। ম্যাডাম, আমি একটু এলেঙ্গা বাজার যাব । আপনারা যদি পারমিশন দেন, তা হলে আপনাদের গাড়িতে একটু শেয়ারে যেতাম। আমার খুব জরুরি দরকার, ইমার্জেন্সি আছে একটা। কথায় ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে দেয় সে সযত্নে, ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে তুলির শেষ দাগ হিসেবে।

মহিলা তবুও একঘেয়ে চিৎকার করে, আমরা আপনার সাথে চুক্তি করছি, আপনি তবুও রাস্তার মাঝখানে থামাইলেন ক্যান? এইসব কী?’

পাশে বসা লােকটা ভারি গলায় বলে, ‘সােনিয়া, থামাে তাে! ড্রাইভার বেশি কথা বলে না পেছনের আরােহীদের সাথে। হাসানুজ্জামানের দিকে তাকিয়ে বলে, এলেঙ্গা বাজার পর্যন্ত দুইশাে টাকা । যাইবেন?’

হাসানুজ্জামান চোখেমুখে একটা হতাশ বিরক্তি আর অনুনয়ের মিশেল ফোটানাের চেষ্টা করে। দুইশাে টাকা? দেড়শােতে চলেন ভাই…’ দুইশাে টাকা খরচ করতে তার তেমন আপত্তি নেই, কিন্তু দরাদরি না করে উঠে পড়লে এরা সন্দেহ করবে।

ড্রাইভার মাথা নেড়ে গাড়িতে স্টার্ট দেয় আবার । হাসানুজ্জামান হতাশ মুখে ক্যাবের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে।

ড্রাইভার বলে, “দরজা জোরে টান দেন, লাগে নাই পুরাপুরি।’

হাসানুজ্জামান দুর্বল হাতে আবার টান দেয় দরজাতে। গাড়ি এবার ঢাকা-টাঙ্গাইল রােডে উঠে পড়ে।
পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাসানুজ্জামান বলে, আপনাদের বিরক্ত করার জন্য খুব দুঃখিত । কিন্তু আমার একটা ইমার্জেন্সি…’

মাঝবয়েসী লােকটার চেহারা ক্ষণিকের জন্য একটা কারখানার সদর দরজায় জ্বলতে থাকা আলােয় দেখতে পেয়ে একটু থতমত খায় হাসানুজ্জামান। লােকটার চেহারা শান্ত, কিন্তু সে টের পায়, লােকটা নিরীহ নয়। মজবুত চোয়াল, শীতল চোখ, ঘন ভুরু, ভারি গলায় লােকটা বলে, “আমাদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না।’

হাসানুজ্জামান লােকটার পাশে বসে থাকা যুবতীর দিকে ক্ষমা প্রার্থনার হাসি হাসে। ‘ম্যাডাম বােধহয় খুব বিরক্ত হয়েছেন।’

সােনিয়া নামের মহিলার চেহারা রাস্তার পাশের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত আলােয় এক এক ঝলক দেখতে পায় সে। দেখতে ভালােই, কোনাে বাড়তি সাজগােজ নেই, কিন্তু মনে হয় ক্ষেপে আছে, পিঠ সােজা করে বসে আছে, লােকটার মত হেলান দিয়ে আয়েশ করছে না ।

হাসানুজ্জামানের কথার কোনও জবাব দেয় না সােনিয়া। ড্রাইভারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে পরিস্থিতি বােঝার চেষ্টা করে হাসানুজ্জামান। ড্রাইভারের অভিব্যক্তি বােঝার উপায় নেই আবছা আলােয়, নিবিষ্ট মনে গাড়ি চালাচ্ছে সে। সামনের পৃথিবীর অন্ধকার কয়েক গজ দূরে ঠেলে রেখেছে হেডলাইটের আলাে।

পেছনে বসা লােকটা নিচু গলাতেই বলে, আপনি কি একাই যাচ্ছেন এলেঙ্গায়?’

হাসানুজ্জামান কিছুটা বিস্মিত হয় কথাটা শুনে। লােকটা কি ভাবছে সে আরও সাঙ্গপাঙ্গ ডেকে আনবে পেছন পেছন? নাকি নিতান্তই সাধারণ কৌতূহল থেকেই প্রশ্নটা করল?

ঘাড় ফিরিয়ে হাসানুজ্জামান বলে, “জী। একটা ফ্যামিলি সমস্যা। খুব ইমার্জেন্সি কাজ। তাই রাতেই যেতে হচ্ছে।’

লােকটা সিটে হেলান দিয়ে বসে ছিল, খুব ধীর ভঙ্গিতে পিঠটা সিট ছেড়ে তুলে ঝুকে বসে হাসানুজ্জামানের মুখের কাছে মুখ এনে অনুচ্চ গম্ভীর গলায় বলল, আপনার সঙ্গে আর কেউ যাচ্ছে এখন? নাকি আপনি একাই যাচ্ছেন?

হাসানুজ্জামান বাম হাতে গােপনে নিজের ব্যাগের ভেতরে রাখা পিস্তলটার স্পর্শ নিল একবার । এই লােক আসলে কী জানতে চায়? এরা ছিনতাই পার্টি তাে? এই লাইনে ছিনতাই করে এমন সবাইকেই সে কমবেশি চেনে, আর সাথে মেয়ে নিয়ে ছিনতাই করার মত লােক খুব বেশি নেই এদিকটায়।

তার মুখের হাসিটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল বলেই বােধহয় লােকটা একটু আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাসে, কিন্তু হাসানুজ্জামানের অস্বস্তিটা দূর হয়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, জী একাই যাচ্ছি। আর  কেউ নাই সাথে ।

সােনিয়া মুখ খােলে এবার, আপনি এত রাতে ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আপনার ভয় লাগে না?’

স্বাভাবিক কথার দিকে আলাপ মােড় নিচ্ছে জেনে হাসানুজ্জামান একটু স্বস্তি অনুভব করে। জী, ম্যাডাম, রাতের বেলা একটু ভয় তাে লাগেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে যেতে হয় তাে, অভ্যাস আছে।’

সােনিয়া বলে, আমি প্রায়ই পেপারে পড়ি, এদিকে ছিনতাই হয়।’

হাসানুজ্জামান বলে, জী, ম্যাডাম। আমাকেও একবার ছিনতাই করেছিল কয়েকজন ইয়াংম্যান। তা ছাড়া…’ নাটকীয় একটা বিরতি দেয় সে। সােনিয়া বলে, তা ছাড়া কী?

হাসানুজ্জামান ঘাড় ঘুরিয়ে সােনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এদিকে কিছু খারাপ জায়গা আছে, ম্যাডাম।’

লােকটা বলে, ‘খারাপ জায়গা মানে?

হাসানুজ্জামান বলে, ‘নানা রকম কথা শুনি, স্যর! ভূতপ্রেত, জিন-পিশাচ, এই সব আর কী।

লােকটা চুপ করে যায়। সােনিয়া খনখনে গলায় বলে, হাইওয়েতে ভূতপ্রেত থাকে নাকি? ওগুলাে তাে জানতাম গ্রামে-গঞ্জে থাকে!’

হাসানুজ্জামান হাসে। বলে, হাইওয়ের দুই পাশে গ্রামই তাে, ম্যাডাম ভিলেজ এরিয়া।

লােকটা বলে, ‘খারাপ জায়গায় কী হয়?’

হাসানুজ্জামান এই গল্প তার অনেকেরে সাথেই করেছে। কিছু লােকের ভেতরে সহযাত্রীকে নিয়ে ভয় দূর হয় না, তখন তার মনে জিন- ভূতের ভয় ঢুকিয়ে দিতে হয়। শিকার তখন গায়েবী শত্রুকে নিয়ে চিন্তিত থাকে, তখন এক ঝটকায় পিস্তল বের করে গলায় চেপে ধরে তার জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতে হয়। মাঝেমধ্যে অবস্থা বুঝে কয়েকটা কিলঘুসি, কপাল খারাপ থাকলে গুলি। সে সােৎসাহে বহুল ব্যবহৃত গল্পগুলাে বলে যায়। এ আমি চাক্ষুষ কিছু দেখিনি, স্যর। মানে, সবসময় তাে শোকজন থাকে সাথে। বাসে বা ট্যাক্সিতে করে একা একা তাে যাওয়া যায়। কিন্তু শুনেছি মাঝেমধ্যে জিন এসে লােক তুলে নিয়ে যায়। মানে, একা যদি পায়। আবার কিছু গাছ আছে রাস্তার পাশে, সেটাতে পিশাচ বাসুরে। আশপাশ দিয়ে একা কাউকে যেতে দেখলে তুলে নেয়।’

সােনিয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় । লোকটা ঘোৎ করে একটা শব্দ করে।

হাসানুজ্জামানের ভালাে লাগে এদের অস্বস্তিতে ফেলতে পেরে। লােকটাশুরুতেই একটা আচানক প্রশ্ন করে তাকে চমকে দিয়েছিল। এখন কেমন লাগে, চান্দু?

‘আমার এক কলিগের ফ্রেণ্ড, স্যর, এইখানেই হাইওয়ের পাশে একটা মিলে, স্যর, চাকরি করত। ব্যাচেলার মানুষ, স্যর, মিলের একটা হােস্টেলেই থাকত। একদিন সে রাতে একটু হাঁটতে বের হয়েছিল, স্যর। একটু বেসামাল ছিল আর কী হে-হে-হেঁ, মানে একটু ড্রিঙ্ক করেছিল আর কী। তাে তাকে, স্যর, একটা গাছের উপর পাওয়া যায় পরে । ডেড অবস্থায়। একদম ডেড।’

লােকটা বলে, ‘সােনিয়া, বাসায় বাজার আছে?

সােনিয়া বলে, না, বাজার করা দরকার ছিল। করব?

প্রসঙ্গ থেকে এরা সরে যাওয়ায় হাসানুজ্জামান একটু মনক্ষুন্ন হয়, কিন্তু মনােযােগটাকে পেছনের সিটের দিকে রেখে সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায় ।

শুনতে পায়, লােকটা বলছে, হঁ্যা, বাজার করাে। ড্রাইভার সাহেব, আমরা বাজার করব।’

হাসানুজ্জামানের কাছে একটু অদ্ভুত লাগে কথাগুলাে। এত রাতে কোথায় বাজার করবে এরা? কালিয়াকৈরের আগে তাে বাজার নেইও ধারে কাছে। ড্রাইভারের অভিব্যক্তিও বােঝা যায় না অন্ধকারে, সে শুধু সংক্ষেপে বলে,

‘আচ্ছা।’

প্রশ্নটা হাসানুজ্জামানকে ভাবায়, এবং চিন্তায় ক্ষণিকের জন্যে ডুবে গিয়েছে সে। পেছনের সিট থেকে হঠাৎ ভেসে আসে কড়া মিষ্টি একটা গন্ধ।

ওটার প্রতি এই পৃথিবীতে যতটুকু মনােযােগ দিলে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে টানা দাগটা খেয়াল করা যায়, ততটুকু মনোেযােগ দিতে ব্যর্থ হয়।

পেছনের সিট থেকে চুড়ি পরা একটা হাত সাঁড়াশির মত হাসানুজ্জামানের গলা আঁকড়ে ধরে, আরেকটা হাতে ধরা রুমাল চেপে বসে তার নাকের ওপর। মালটা ভেজা, তাতে একটা অসহ্য মিষ্টি গন্ধ।

হাসানুজ্জামান টের পায়, যতটুকু বাধা সে দিতে পারত, ততটুকু বাধা দেয়ার ক্ষমতা তার আর নেই। ক্রমশ তার কাৰ্ছে ভারী হয়ে আসছে পৃথিবী, হাতের ও মনে হচ্ছে একশাে কেজি। সে দুর্বলভাবে তার বাম হাতটা দিয়ে ব্যাগটা খােলার চেষ্টা করে, ওর ভেতরে আছে তার পিস্তলটা, গুলিভরা, শুধু সেফটি ক্যাচটা অফ করে ট্রিগারে টান দিলেই হবে। কিন্তু বাম হাতটা চলতেই চাইছে না, পৃথিবীটাও মনে হচ্ছে একটা বিরাট ঢেউয়ের ওপর ভাসছে, কানে আসছে আবছা শশা-শো শব্দ।

হাসানুজ্জামান টের পেল, ড্রাইভার লােকটা বাম হাতে একটা প্রচণ্ড কিল মারল তার পাঁজরের ঠিক নীচে, ফুসফুসের সব বাতাস বেরিয়ে গেল সে আঘাতে। হাসানুজ্জামান আবারও নিজের অজান্তেই বুক ভরে শ্বাস নেয়, সেইসাথে বুকে টেনে নেয় রুমালের অনেকখানি ক্লোরােফর্ম। ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছেড়ে সে তলিয়ে যায় অচৈতন্যে।

 

ঠাণ্ডা !
চৈতন্য ফিরে পাবার পর হিমের অনুভূতিই হাসানুজ্জামানের সমস্ত মনােযােগ গ্রাস করে। অন্ধকার এসে হিমের জায়গাটা দখল করে কয়েক সেকেণ্ড পর। হাসানুজ্জামান অনুভব করে, ঠাণ্ডা আর অন্ধকার কোথাও শুয়ে আছে সে। তার চোখের সামনে একেবারে নিকষ অন্ধকার। সে কি অন্ধ হয়ে গেল?

উদ্বেগটা মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল রক্তস্রোতে। হাসানুজ্জামান, একটা হাত দিয়ে নিজের চোখ স্পর্শ করতে গিয়ে শিউরে উঠল ব্যথায় । তার পাজড়ের পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা। কিন্তু ঘাড়ে আঘাত লাগার কথা স্মরণ করতে পারছে না। চোখে কোনও বাধন নেই। কিন্তু চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকার। হাসানুজ্জামান নিজের আঙুল দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।

একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার গা থেকে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, ঘাবড়ে গেলে চলবে না। শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে আবার। সে হাসানুজ্জামান, এলেঙ্গাবাজারে এক পার্টির সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল, কালিহাতিতে একজনকে মার্ডার করার ব্যাপারে। পথে ট্যাক্সিতে তার নাকে ওষুধ ঠেসে ধরে অজ্ঞান করে ফেলে সােনিয়া নামের মেয়েটা। এই কাজে ট্যাক্সি ড্রাইভার সােনিয়াকে সাহায্য করছিল। তার মানে পেছনের সিটের ওই লােকটা, সােনিয়া আর ড্রাইভার, তিনজন একই পার্টির লােক। তারা অজ্ঞান পার্টি, সন্দেহ নেই। বাজার করার কথা বলছিল লােকটা। ওটাই সঙ্কেত। বাজার করতে বললেই রুমালে ওষুধ ঢেলে শিকারের নাকে চেপে ধরবে সােনিয়া।

কিন্তু সে এমন অন্ধকার জায়গায় কেন? মনে হচ্ছে এটা কোনও ঘর। অজ্ঞান পার্টির লােক তাকে রাস্তার ধারে ফেলে রেখে যাবে, এমনটাই স্বাভাবিক। সে এখন কোথায়?

হাসানুজ্জামানের শরীর কেঁপে উঠল ঠাণ্ডায়। সে আবিষ্কার করল, তার হাতটা নগ্ন । সােয়েটার নেই, শার্টও নেই।

হাসানুজ্জামান হাতড়ে হাতড়ে একটা কাঁথা পেল শরীরের ওপর। একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে সে। তার নীচে তার শরীর বিবস্ত্র। হাত বাড়িয়ে জাঙ্গিয়া স্পর্শ করে থেমে গেল হাসানুজ্জামান। না, ওটা আর খােলেনি বদমায়েশগুলাে। কিন্তু তার সােয়েটার, শার্ট, প্যান্ট, সবই খুলে নিয়ে গেছে।

এ কেমন অজ্ঞান পার্টি? ওগুলাে তাে মােটেও দামি কিছু ছিল না। উঠে বসতে গিয়ে ঘাড়ের ব্যথাটা বিদ্যুতের গতিতে ছােবল দিল গােটা পিঠে। এভাবে কতক্ষণ শুয়ে ছিল সে?

হাসানুজ্জামান টের পেল, তার শরীরের নীচে মাটি নেই। স্বাভাবিক বিছানাও নেই। খসখস শব্দ আর খোচা তাকে স্মরণ করিয়ে দিল খড়ের কথা। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাে সে একবার, হ্যা, খড়-ই।

খড়ের গাদার ওপর তাকে প্রায় ন্যাংটো করে কাথা পেঁচিয়ে ফেলে রেখে গেছে অজ্ঞান পার্টির দল। একটা ক্ষীণ গােঙানির শব্দ শুনতে পেল হাসানুজ্জামান। ‘উ!

ডানদিকে ঘাড় ঘােরাতে গিয়ে ব্যথাটা হাসানুজ্জামানের ঘাড়ের পেশির ওপর দংশন করল আবার। অনেক দূরে কয়েকটা কমলা বিন্দু ধিকিধিকি জ্বলছে। গােঙানির আওয়াজটা সেখান থেকেই আসছে।

অন্ধকার ইতিমধ্যে হাসানুজ্জামানের চোখে খানিকটা সয়ে এসেছে, আগুন দেখে তার মনে একটা হালকা স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল, যাক, তার চোখের কোনও ক্ষতি হয়নি। একই সাথে হাসানুজ্জামান টের পেল, সে অনেক বড় একটা ঘরের মাঝে আছে । জ্বলতে থাকা আগুনটুকু ঘরের অন্ধকার দূর করার বদলে তা আরও ঘন করে তুলেছে।

বাম হাত বাড়িয়ে দিতে গিয়ে পিঠের ব্যথাটা খচ করে ঘাই দিয়ে উঠল, কিন্তু হাতের তালুতে ঠাণ্ডা, কঠিন ও শুকনাে দেয়ালের স্পর্শটা সে ব্যথার উপস্থিতিকে ম্লান করে দিল। হাসানুজ্জামান দেয়ালে হাত বোেলাল। ইট নয়, পাথুরে দেয়াল, একেবারে ঢালাই করা। কোনও খাজ নেই। বরফের মত শীতল।

কোথায় এনে ফেলেছে ব্যাটারা তাকে?

গােঙানির শব্দটা আবার ভেসে এল আগুনের কাছ থেকে, হু-হু!’

হাসানুজ্জামান মুখ খুলে ডাক দিতে গিয়ে আবিষ্কার করল, কোনও শব্দ বেরােচ্ছে না তার গলা দিয়ে। ঠাণ্ডা ঘরে উদোম গায়ে একটা মেটো কাথা গায়ে শুয়ে থাকলে গলা বসে যাওয়াই স্বাভাবিক। কেশে গলা পরিষ্কার করে নেয় সে একবার, তারপর গলা চড়িয়ে ডাকে, ‘কে ভাই? কে ওখানে? গােঙানির শব্দটা এক পর্দা চড়ে যায় এবার, ঊ! ঊ! উঁ!’

হাসানুজ্জামান ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত বেদনা আর, মনভরা অস্বস্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, কাথাটা ভালমত জড়িয়ে নেয় শরীরে, তারপর এগােতে গিয়ে চমকে ওঠে। তার পায়ের নীচে বরফের মত শীতল মেঝে। শালারা তার জুতাে আর মােজাও খুলে নিয়ে গেছে। সে আরও অনুভব করে, মাটি নয়, পাথুরে মেঝে তার পায়ের নীচে। দেয়ালের মতই, হিম আর শুষ্ক।

অন্ধকার চোখে সয়ে গেলেও ঘরের পরিসর আন্দাজ করতে পারে না হাসানুজ্জামান। ডানে বা বাঁয়ে ঘরটা কতদূর গেছে, বােঝার উপায় নেই। শুধু বেশ খানিকটা দূরত্বে কয়লার মিটিমিটি আগুন জ্বলছে, তার পেছনে আবার গাঢ় অন্ধকার। কোনও গুদাম ঘর হতে পারে, কোনও কারখানার স্টোর হয়তাে। কিন্তু আলাে নেই কেন?

‘কে ভাই, ওইখানে? আবার গলা চড়িয়ে ডাকে সে, তার পা বেয়ে মেঝের হিম উঠে আসে কণ্ঠস্বর পর্যন্ত । কে আপনি? গােঙানির শব্দটা আগের মতই মৃদু হয়ে ভেসে আসে, উঁহু!” হাসানুজ্জামান অস্বস্তিভরে দুই পা এগােয়। কী ব্যাপার? মুখ বেঁধে রেখেছে নাকি লােকটার? গােঙাচ্ছে কেন? কথা বলে না কেন? কে? আপনি কে? এখানে কী করেন?

এবার দূর থেকে একটা রিনরিনে, কাঁপা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘আমি” হাসানুজ্জামান চমকে ওঠে কথাটা শুনে, কারণ কণ্ঠস্বরটা নারীর। অল্পবয়স্কা কোনও মেয়ের গলা। এখানে মেয়ে আসবে কোত্থেকে? এরা কি নারী-পুরুষ সবাইকে অজ্ঞান করে নিয়ে আসে নাকি?

হাসানুজ্জামানের বুকটা আবারও ধুকধুক করে ওঠে, রক্তস্রোতে মিশতে থাকে অ্যাড্রেনালিন। ট্যাক্সির আবছায়ায় দেখা সােনিয়ার অবয়ব আর সেই লােকটার গম্ভীর চেহারা মনে পড়ে যায় তার। এরা সাধারণ অজ্ঞান পার্টি নয়।

নানা গুজবের কথা তার একসাথে মনে পড়ে। মানুষজনকে ধরে নিয়ে গােপনে অপারেশন করে কিডনি, কলিজা খুলে বিক্রি করে দেয়া হয়, এমন একটা খবর এসেছিল না কাগজে? হাসানুজ্জামান শুনেছে, লাশও নাকি এসিডে ধুয়ে কঙ্কাল বের করে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক রকম বিজনেস নাকি আছে মানুষের বড়ি নিয়ে। এরা কি সেরকম কোনও পার্টি? মেয়েদের ধরে ভারতে পাচার করা হয়, সে জানে, কিন্তু সেসব মেয়েদের জোর করে বা অজ্ঞান করে ধরে আনে না কেউ, তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বেশি বেতনে কাজের লােভ দেখিয়ে, তারপর দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়, সেখান থেকে মেয়েরা চলে যায় বড় শহরের বেশ্যা পাড়ায়। কিন্তু এরা কেন অজ্ঞান করে ধরে আনছে মানুষকে?

বিদ্যুত চমকের মত নিজের ব্যাগটার কথা মনে পড়ে তার। পরক্ষণেই হতাশায় ডুবে যায় হাসানুজ্জামান। জামা-জুতােই যেখানে খুলে নিয়ে গেছে ব্যাটারা, তাে পিস্তলটা যে তার নাগালের মধ্যে রেখে যাবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। হাতের কাছে পিস্তলটা থাকলে ভরসা পায় সে, অন্যরকম একটা সাহস পায় বুকের ভেতর। অন্ধকার, ঠাণ্ডা ঘরের ভেতর উলঙ্গ শরীরে কথামুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে হাসানুজ্জামান নতুন করে দুর্বল বােধ করে। গােঙানির শব্দটা এবার কয়েক পর্দা চড়ে, হুহুহু হুহু!’ হাসানুজ্জামান মাপা পায়ে সাবধানে সামনে এগােয়. অন্ধকারে কোনও কিছুর সাথে ঠোকর বা হোঁচট খেয়ে চোট পেতে চায় না সে। কিন্তু তার কেন যেন মনে হয়, এই ঘরটা একেবারেই খালি। আর কিছু এখানে রাখা নেই।

ঘরের দরজাটা খুঁজে পেতে হবে। সম্ভাবনা শতভাগ যে দরজাটা বন্ধ থাকবে, তারপরও দেখে রাখা প্রয়ােজন। এক সময় না এক সময় দরজা খুলবে ব্যাটারা, তখন একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। স্টোররুমের জানালাগুলাে সাধারণত ছাদের কাছে হয়। হাসানুজ্জামান ওপরের দিকে তাকায়, কোনও জানালার আভাস তার চোখে পড়ে না। আলাে দরকার। কয়লার আগুনে কিছু খড় দিলে আগুন পাওয়া যাবে। হাসানুজ্জামান সাবধানে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কে? এখানে কীভাবে আসছেন?’

রিনরিনে তরুণী কণ্ঠ আবার বলে ওঠে, আমি! হাসানুজ্জামান সন্তর্পণে এগােয়। কয়লার মিটমিটে আগুনের পাশে একটা অন্ধকারের স্তুপ, কেউ একজন বসে আছে আগুনের পাশে। আগুন থেকে গজ পাঁচেক দূরে থেমে যায় হাসানুজ্জামান। আপনি কে? নাম কী আপনার? এখানে কীভাবে আসছেন?

আগুনের কাছেই বসে আছে মেয়েটা। হাসানুজ্জামান দেখে, তারই মত একটা কথা জড়ানাে মেয়েটার গায়ে। মেয়েটার শরীরের রেখা বােঝা যাচ্ছে, মাথায় চুল অবিন্যস্ত হয়ে আছে, মাথা নিচু করে বসে আছে মেয়েটা। হাসানুজ্জামান আরও দুই পা এগােয়। কী নাম আপনার? বাড়ি কোথায়?

মেয়েটা কাঁপা গলায় কী যেন একটা নাম বলে, স্পষ্ট শুনতে পায় না সে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করে হাসানুজ্জামান, সখিনি? আপনার নাম সখিনি?

মেয়েটা মাথা ঝাঁকায় !

হাসানুজ্জামান মাথা নাড়ে। গ্রামের মেয়েদের এমন নাম হত আগে, এখন গ্রামেও মেয়েদের নাম রাখে নায়িকাদের নামে। বাড়ি কোথায় আপনার?’

মেয়েটা আবার গােঙায, ‘উ!

হাসানুজ্জামান টের পায়, মেয়েটা শীতে কাঁপছে। একটা সন্দেহ খেলে যায় তার মাথার ভেতর। সে গলা খাকরে কয়েক পা সামনে এগিয়ে মেয়েটাকে ভাল মত দেখার চেষ্টা করে। তার মতই একটা কথা গায়ে জড়িয়ে বসে আছে মেয়েটা, কথার ফাঁক দিয়ে একটা ফর্সা পা দেখা যাচ্ছে হাঁটু পর্যন্ত।

এরা কি এই মেয়েটারও জামাকাপড় খুলে নিয়েছে? হাসানুজ্জামান একটু তপ্ত বােধ করে ভেতরে ভেতরে। অন্ধকার রাতে কাথা জড়ানাে অপরিচিতা নগ্নিকার সান্নিধ্য তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। সে অভয় দেয়ার জন্যে বলে, আমার নাম হাসানুজ্জামান। ঢাকায় থাকি, বাড়ি মানিকগঞ্জে। আপনার বাড়ি কই, বললেন না?

মেয়েটা একটু গুটিসুটি হয়ে বসে বলে, “এইখানেই।

হাসানুজ্জামান হেসে বলে, “এইখানে মানে? এই জায়গাটা কোনখানে? এবং প্রশ্নটা তার মাথায় প্রথম বারের মত বাড়ি কষায়। কোন জায়গায় আছে তারা? ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে কোনদিকে, কতদূরে এই ঘর? মেয়েটা প্রশ্নের উত্তর দেয় না, নড়েচড়ে বসে আবার গােঙায়, উ! উ! উ!’

হাসানুজ্জামান ঘরের চারদিকে তাকায়। সবদিকেই নিকষ অন্ধকার। কয়লা জ্বলছে ঘরের আরেক প্রান্তে, একটা চুলার মত গর্তে। গর্তটা ইট দিয়ে পাকা করা। মেয়েটার পেছনে আবার আস্তে আস্তে গাঢ় হয়ে গেছে অন্ধকার। ঘরটা অনেক বড়, সন্দেহ নেই।

খড় এনে কয়লার ওপর ফেললে অনেক ধোয়া হবে। এই ঘরের দরজা জানালা কোন দিকে, তখন একটা আন্দাজও হয়তাে পাওয়া যাবে। বড় ঘর, ধোয়ায় শ্বাস বন্ধ হওয়ার কথা না। হাসানুজ্জামান গলা খাকরে বলে, আপনাকে কখন নিয়াসছে এইখানে? আজকে? নাকি আরও আগে? মেয়েটা বলে, হুঁ! -হু!’

হাসানুজ্জামান মনে মনে একটু বিরক্ত হয়। কী আজব রে বাবা! মাথা খারাপ নাকি ছেমরির? একটা কথারও ঠিকমত জবাব দিতে পারে না। নামটা শুধু বলতে পারে, কোথেকে আসছে, কবে আসছে কিছুই বলে না ঠিকমত।

অন্ধকারে ফুটে থাকা মেয়েটার ফর্সা পায়ের দিকে চোখ পড়তে হাসানুজ্জামানের রাগ একটু পড়ে আসে। হয়তো কড়া কোনও ওষুধ দিয়ে অজ্ঞান করেছে মেয়েটাকে, সেটার ধকল হয়তাে এখনও সামলাতে পারছে না বেচারি। কিংবা হয়তাে খিদে লেগেছে তার। কয়দিন ধরে এখানে আছে কে জানে?

খিদের কথা মনে হতেই নিজের পেট মােচড় দিয়ে উঠল হাসানুজ্জামানের। কতক্ষণ ধরে এখানে আছে সে? রাতে হােটেলে খাওয়া ভাত তাে হজম হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

কয়লার আগুনের দিকে চোখ পড়তেই হাসানুজ্জামানের মনে টোকা দিল নতুন প্রশ্ন, আগুনটা জ্বালিয়েছে কে? কয়লায় আগুন ধরতে সময় লাগে, তবে অনেকক্ষণ ধরে জ্বলে। জ্বলতে থাকা কয়লার স্তুপ দেখে মনে হয়, অনেকক্ষণ ধরেই জ্বলছে আগুন। কেউ একজন আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে নিশ্চয়ই।

হাসানুজ্জামান মাথা নিচু করে বসে থাকা মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিল, মেয়েটাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবে না সে। এখন যা জানার, তা তাকে নিজেরই মাথা খাটিয়ে জানতে হবে।

এই ঘরের ভেতর তারা দুইজন মানুষ যখন আছে, তার মানে ঘরের একটা দরজা আছে। দরজাটা খুঁজে বের করতে হবে। তারপর সেটা দিয়ে কীভাবে বের হওয়া যায়, তা ভেবে বার করতে হবে। আপাতত এটাই প্রথম কাজ। আর এই কাজের জন্যে লাগবে আলাে। আলাে পাবার আপাতত একটাই উপায়, কিছু খড় এনে কয়লার আগুনে ফেলে আগুনটাকে উচু করা, তারপর খড় পাকিয়ে মশালের মত বানিয়ে ঘরটা ঘুরে দেখা। হাসানুজ্জামান গলা খাঁকরে বলল, বসেন দেখি, কী করা যায়। আপনার কি খিদা লাগছে?

মেয়েটা খিদের কথায় একটু যেন চমকে ওঠে। তারপর মুখ তুলে বলে, কয়লার আগুনের আবছা আলােয় মেয়েটার মুখ দেখে বুকের ভেতরে রক্ত ছলকে ওঠে একবার। চোখ বুজে আছে মেয়েটা, কিন্তু তার প্রতিমার মত সুন্দর, ধারালাে চেহারাটা বােঝা যাচ্ছে মেয়েটা অনেক ফর্সা, সন্দেহ নেই। খাড়া নাক, ভরাট ঠোট, সুডৌল চিবুক, কিন্তু অভুক্ত মানুষের মুখে যে ক্লিষ্ট ভাব থাকে, সেটা পুরাে আছে।

হাসানুজ্জামান জিভ দিয়ে শুকনাে ঠোট চেটে বলে, আপনি বসেন এইখানে। আমি দেখি একটু আগুন জ্বালাই।

মেয়েটা আবারও মাথা নিচু করে গােঙাতে থাকে, ‘উ! হু-হুঁ!’

হাসানুজ্জামান পেছন ফেরে, তার খড়ের শয্যার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যে। তখনই একটা আবছা আলাে ছড়িয়ে পড়ে ঘরের ভেতর। সে ঝট করে ঘুরে তাকায় আলাের উৎসের দিকে। দূরে, ছাদের কাছে একটা চৌকো অংশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একটা জানালা, বাইরে থেকে সামান্য আলাে আসছে ঘরের ভেতর। হাসানুজ্জামান শুনতে পায়, মেয়েটা এখনও গােঙাচ্ছে।

হাসানুজ্জামান শরীরে কাঁথাটা জড়িয়ে একটি গিঠ মেরে নেয় । হারামিগুলাে ভাল বুদ্ধিই বের করেছে, পালাতে পারলেও ন্যাংটো অবস্থায় বেশি দূর যাওয়ার উপায় নেই এই শীতের মধ্যে। মানুষ কত বদমায়েশ হতে পারে, তা সে ভালাে করেই জানে। কিন্তু এই ধরনের বদমায়েশির সাথে সে পরিচিত নয় মােটেও।

আলােটা ঘরের অন্ধকার মােটেও দূর করেনি, কিন্তু অন্ধকারে থেকে হাসানুজ্জামানের চোখ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তার সামনে ঘরের আকার মােটামুটি স্পষ্ট হয়ে এসেছে এই আলােয়। অনেক বড় একটা ঘর, তার এক কোনায়, ছাদের কাছে জানালাটা। ঘরের দেয়াল এদিকে ইটের, ঢালাই করা নয়। এবং এদিকে ঘরটা পুরােই খালি। হাসানুজ্জামান চারপাশে তাকায়, আলােটা খুব বেশিদূর ছড়ায়নি, ঘরের বাকি অংশ অন্ধকারেই ডুবে আছে। কিন্তু তার মনে হয়, এটা একটা প্রকাণ্ড খালি ঘর, ওদিকেও কিছু নেই, খড়ের স্তূপ ছাড়া।

 

হাসানুজ্জামান দ্রুত পায়ে এগােয়। ইটের খাঁজে ভর করে যদি জানালা পর্যন্ত ওঠা যায়, তা হলে জানালা দিয়ে বের হওয়ার একটা উপায় হয় কি না দেখতে হবে। জানালাটা যথেষ্ট উঁচুতে, লাফ দিয়ে নামতে গেলে হাত-পা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেক্ষেত্রে কথাটা ঝুলিয়ে নামতে হবে কিন্তু কাঁথার দৈর্ঘ্যও তাে বেশি নয়। অবশ্য মেয়েটার গায়ের কথার সাথে তার কথাটা গিঠ দিয়ে দিলে বেশ লম্বা একটা দড়ির মত হবে। সেটার একমাথা কোথাও বেঁধে ঝুলে কিছু দূর নেমে বাকিটা পথ লাফিয়ে নামা যাবে। কাঁথার নীচে মেয়েটার ফর্সা পা হাসানুজ্জামানুের চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার শরীরের রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠল আবার মেয়েটা অনেক সুন্দর। মাথা ঝাঁকিয়ে মেয়েটার চিন্তা মাথা থেকে দূর করে দিল হাসানুজ্জামান। এখন পালাতে হবে, সবার আগে ওটাই কাজ।

জোর পায়ে এগিয়ে ঘরের কোনায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। মেঝে কিছুটা এবড়ােখেবড়াে এখানে, ঘরের অন্য অংশের মত সমতল নয়। জানালার আলাে তির্যকভাবে পড়েছে ঘরের ভেতরে, এখানটায় অন্ধকার। ইটের দেয়ালে হাত বুলিয়ে খাজ খোজে হাসানুজ্জামান। হ্যা, দেয়ালটাও এখানে অমসৃণ। কোথাও ইট সামান্য বেরিয়ে আছে, কোথাও আবার গর্ত।

জানালা পর্যন্ত এরকম হলেই হয়। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ওপরে তাকিয়ে জানালাটা দেখে সে, তারপর হাঁটুর উচ্চতায় দেয়াল থেকে একটু সামনে বেরিয়ে থাকা একটা ইঁটের ওপর পা রেখে সাবধানে নিজের শরীরের ভর চাপায় হাসানুজ্জামান। পুরনাে দেয়ালের ইট হঠাৎ হড়াস্ করে ভেঙে পড়তে পারে। এখন সেরকম কিছু ঘটলে নাগালের ভেতর পালানাের একমাত্র সুযােগটাও মাঠে মারা পড়বে। আর হাড়গােড় কয়টা ভাঙবে কে জানে?

পেছনে মেয়েটার গােঙানি শুনতে পায় সে আবারও, ‘উ! ঊ!’ পাত্তা দেয় না হাসানুজ্জামান। গুনগুন করুক মেয়েটা। আগে জানালায় পৌছাতে হবে।

একটু একটু করে ঘরের কোণে দুই পাশের দেয়ালে ইটের খাঁজে পা রেখে উঠতে থাকে সে। কিছুদূর উঠে সাবধানে হাত বাড়িয়ে খাজ খুঁজতে হচ্ছে তাকে, শরীরটাকে মিশিয়ে রাখতে হচ্ছে দেয়ালের সাথে। একটু উনিশ- বিশ হলেই টাল হারিয়ে নীচে গিয়ে পড়তে হবে তাকে। কত উচ্চতা হবে এই ঘরের? পনেরাে ফুট? কুড়ি ফুট? এরকম উঁচু থেকে বেকায়দায় নীচে পড়লে হাত-পা ভাঙবে নিশ্চিত।

হাসানুজ্জামান টের পায়, তার হাত আর পায়ের পেশিতে খুিল ধরে যাচ্ছে। ইটের খাজে হাত রেখে উঠতে গিয়ে থরথর করে কাঁপছে আর বাহুর পেশি। এসব কাজের অভ্যাস নেই তার। সে মানুষ হিট কার নির্জনে বা গােপনে, সেখান থেকে শান্তভাবে নিরীহ পথচারীর মত পিস্তল লুকিয়ে হেঁটে চলে আসে। দৌড়ঝাপ তাকে তেমন একটা করতে দেয় না এই কাজে। দেয়াল বেয়ে ওঠা তাে দূরের কথা।

হাসানুজ্জামান দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিজ্ঞা করে এখান থেকে ভালয় ভালয় উদ্ধার পেলে সে নিয়মিত ব্যায়াম করবে, সকালে উঠে দৌড়াবে কোনও পার্কে।

ওপরে ওঠার সময় নীচের দিকে তাকাতে হয় না, কে যেন বলেছিল, স্মরণ করতে পারে না সে। ঘাড় আর পিঠের পেশিতে ব্যথাটা আবার কামড় দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায় তাকে। হাসানুজ্জামান দরদর করে ঘামে, পিপাসায় তার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, টের পায় সে। ঘরের ভেতরে কোথাও কি পানি আছে? একটু পানি খাওয়া বড় প্রয়ােজন। থেমে থেমে, বিশ্রাম নিয়ে জানালা থেকে একটু নীচে এসে হাতে মসৃণ দেয়ালের স্পর্শ পায় হাসানুজ্জামান। এবড়াে খেবড়াে ইট আর নেই, তারপর মসৃণ, ঠাণ্ডা পাথুরে সমতল দেয়াল।

একটা অসহনীয় ক্রোধ তার মাথার ভেতরে আগুন জ্বেলে দেয় । শুয়ােরের বাচ্চা, দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে গালি দেয় সে। হারামির দল একেবারে তীরের আগে তরী ভােবানাের কায়দা করে রেখেছে! খুব সন্তর্পণে ইটের শেষ খাজটায় পা রেখে আরেকটু ওপরে ওঠে হাসানুজ্জামান। জানালার নীচের প্রান্ত ছাড়িয়ে কোনওমতে মাথাটা ওপরে তুলতে পারে সে।

জানালার ওপারে আকাশ দেখার প্রত্যাশা ছিল তার মনে, কিন্তু জানালার ওপাশে একটা ছােট ঘর। ঘরটার অর্ধেক দেখা যাচ্ছে কেবল। বামে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে, আর ডানে একটা সােফা দেখা যাচ্ছে খানিকটা। ঘরটায় আলাে জ্বলছে, কিন্তু সে আলাে ঘরের অন্য প্রান্তে। আর জানালাটা সাধারণ জানালার মত নয়। একটা কাচের পাত দেয়ালের মধ্যে বসানাে শুধু, কোনও খাজ নেই, কবজা নেই, কপাট নেই। হাসানুজ্জামানের হাত খাজ আঁকড়ে ধরে আছে, তার শরীরের অর্ধেক ভর তার হাতের ওপর, সে হাত আলগা করার সাহস পায় না। কাচের জানালায় মাথা ঠোকে সে, টপটপ শব্দ হয়। সাধারণ কাচ নয়, টের পায় হাসানুজ্জামান।

জানালার ওপাশে দেখা ঘরটা ভালমত দেখার চেষ্টা করে সে। সােফায় কেউ বসে নেই, কিন্তু একটু পর পর নীলচে আলাে এসে পড়ছে সােফার গদির ওপর, সম্ভবত টিভি দেখছে কেউ। সিঁড়িটার পাশে একটা সাইকেলের চাকা দেখতে পাচ্ছে সে, সাইকেলটা দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা। সাইকেল এত উঁচুতে ঘরের ভেতর তুলে এনে রেখেছে কেন ?

প্রশ্নের উত্তরটা তাকে চাবুকের মত আঘাত করে। হাসানুজ্জামান হঠাৎ বুঝতে পারে, এই বিশাল ঘরটা মাটির নীচে। এটা একটা পাতালঘর। ধারণাটা তাকে দুর্বল করে তােলে হঠাৎ। এই লােকগুলাে তাকে একটা পাতালঘরে এনে ফেলে রেখেছে একটা মেয়ের সাথে। এতবড় পাতালঘর যারা ম্যানেজ করতে পেরেছে, তারা সাধারণ অজ্ঞান পার্টি নয়। এরা অনেক গভীর জলের শিকারী মাছ, সে এদের তুলনায় নিতান্তই চুনােপুঁটি। এরা নিশ্চয়ই তার ব্যাগ খুলে পিস্তলটা পেয়েছে। এরা জানে, হাসানুজ্জামান সাধারণ কেউ নয়। নিশ্চয়ই এরা যথেষ্ট তৈরি হয়েই আসবে আবার। উলঙ্গ শরীরে ক্ষুধা আর পিপাসায় কাবু হাসানুজ্জামান কাঁথা জড়িয়ে কী-ই বা প্রতিরােধ করতে পারবে? আক্রমণ করা তাে আরও দূরবর্তী বিকল্প বলে মনে হচ্ছে এখন।

হাসানুজ্জামান হিম দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। তৃষ্ণায় তার বুক জ্বলছে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, বুদ্ধি হারালে চলবে না।

আবার মাথা তুলে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে সে। জানালায় কোনও ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করে সেটা ভাঙা যাবে কি? কাঁচটা অনেক পুরু, খালি হাতে আঘাত করে ভাঙার প্রশ্নই আসে না। যদি ভাঙতেও পারে সে, লােকগুলাে শুনতে পাবে, পালানাের সুযােগ পাবে না সে। জানালা দিয়ে পালানাে যাবে না। দরজাটা খুঁজতে হবে, যে দরজাটা দিয়ে ওরা তাকে আর সখিনিকে ভেতরে ফেলে রেখে গেছে।

সখিনির গােঙানি শুনতে পায় হাসানুজ্জামান, ধীরে ধীরে অতি সাবধানে নীচে নেমে আসতে থাকে সে। পাঁজরে বাড়ি দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড, একটু পানির জন্যে চিৎকার করছে শরীরের সব কোষ। এরা ঘরের কোণে আগুন জ্বালিয়ে রেখে গেছে, একটু পানি কি রেখে যায়নি কোথাও?

লাফিয়ে নীচে নামার ইচ্ছাটা বহু কষ্টে দমন করে সাবধানে নামতে লাগল হাসানুজ্জামান। কিছুক্ষণ পর নেমে আসতে পারল। মাটিটা এবড়াে খেবড়াে এখানে, কোথাও কোনও ধারালাে কিছুর ওপর লাফিয়ে পড়লে পায়ে চোট পেতে পারে সে। এখন খুব সাবধানে থাকতে হবে, আহত হলে চলবে না। সখিনি আগুনের পাশেই বসে আছে। হাসানুজ্জামান কপাল থেকে ঠাণ্ডা ঘাম মােছে কঁাথার খুঁট দিয়ে। দেরি করা চলবে না। যত সময় কাটবে, তত কাবু হয়ে পড়বে তারা। মেয়েটা তাে কথাই বলতে পারছে না খিদের চোটে। আগুন জ্বেলে দরজাটা খুঁজতে হবে এখন।

হাসানুজ্জামান হনহন করে এগিয়ে যায় খড়ের বিছানার কাছে। দরজাটা মনে হয় এপাশেই কোথাও হবে। অন্তত উল্টোদিকে কোনও দরজা নেই, টের পেয়েছে সে। একটা দরজা থাকবে এদিকে কোথাও, তারপর একটা সিঁড়ি। দরজা খুললেই চলবে না, সেটার ওপারে কারা পাহারায় আছে কে জানে, তাদেরও ফাঁকি দিয়ে পালাতে হবে।

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে খড়ের স্তৃপ খুঁজে বের করে দুই হাতে পাঁজাকোলা করে এক বাণ্ডিল খড় তুলে নিল হাসানুজ্জামান। খড় পাকিয়ে মশাল বানাতে হবে আগে।

দুর থেকে সখিনির গােঙানি ভেসে এল, ‘উ! হাসানুজ্জামান খড়ের বাণ্ডিল হাতে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় কয়লার আগুনের দিকে। বিপুল উদ্বেগ তার ভেতরে একটু একটু করে বড় হচ্ছে, কুলকুল করে ঘামছে তার শরীর। বিপদ, অনুভব করে সে, মস্ত বিপদের মাঝে রয়েছে সে।

সখিনি চুপ করে বসে আছে, তাকে না ঘটিয়ে কয়লার আগুনের ওপর সাবধানে, এক মুঠো এক মুঠো করে খড় চাপায় হাসানুজ্জামান। খড়টা শুকননা, পলকেই লকলকে আগুন জ্বলে ওঠে কয়লার ভিতর। এক মুঠো খড় হাতে নিয়ে পাকিয়ে দড়ির মত তৈরি করার চেষ্টা করে সে, ওটাতে আগুন ধরিয়ে মশাল বানাতে হবে। শুকনাে খড় খুব দ্রুত জ্বলে ওঠে, শক্ত করে পাকিয়ে নিলে পুড়তে সময় লাগবে।

আগুনটা উঁচু হয়ে উঠতেই সখিনি চমকে ওঠে, সে ছিটকে সরে যায় দূরে। সখিনির ক্ষিপ্রতা হাসানুজ্জামানকে বিস্মিত করে। মেয়েটা আগুন ভয় পাচ্ছে কেন এই শীতের মধ্যে?

বুকের ভেতর পিপাসাটা আবার টোকা দেয়, হাসানুজ্জামান সখিনিকে বলে, এইখানে কোথাও পানি আছে? খাওয়ার পানি? সখিনি মাথা দোলায়। ঊ!’

হাসানুজ্জামান বড় শ্বাস নেয়, তার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে তৃষ্ণায়। হাতের খড়-পাকানাে মশালটার এক প্রান্ত আগুনে গুঁজে দেয় সে, তারপর বাকি খড়টুকু চাপিয়ে দেয় কয়লার আগুনের ওপর।

গনগনে আগুনের শিখায় অনেকখানি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঘরের এ প্রান্ত, হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় হাসানুজ্জামান। সে দেখে, সখিনি উঠে দাঁড়িয়েছে।

হাসানুজ্জামান সবিস্ময়ে দেখে, সখিনি অনেক লম্বা। তার মাথা ছাড়িয়ে আরও হাতখানেক ওপরে উঠে গেছে সখিনির মাথা। প্রায় সাড়ে ছয়ফুটের মত লম্বা মেয়েটা, কঁাথাটা তার শরীরকে ঠিকমত ঢাকেনি, ফর্সা একটি উরু অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, কাঁথার আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে সুপুষ্ট একটি স্তনের বলয়ভাগ।

কোথাও সমস্যা আছে, হাসানুজ্জামানের মস্তিষ্ক তাকে ফিসফিসিয়ে বলে। সখিনির পেছনে আগুনের শিখায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ঘরের অনেকখানি। ঘরটা শূন্য। কোনও আসবাব নেই, কিছু নেই, শুধু দেয়াল আর মেঝে। সেই মেঝেতে সখিনির ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। সেই ছায়ার মধ্যে নড়ছে একটা কিছু।

মশালটা বাড়িয়ে ধরে হাসানুজ্জামান। আগুনের শিখায় সখিনির অপূর্ব মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

হাসানুজ্জামান প্রথমবারের মতাে দেখতে পায়, সখিনি আসলে ফর্সা নয়। সখিনির শরীরটা ফ্যাকাসে, মৃত মানুষের মত। মেয়েটা সটান দাঁড়িয়ে আছে, তার দীর্ঘ হাত দুটি শিথিল, ঝুলছে শরীরের দুই পাশে, কিন্তু সেই হাতের শেষ প্রান্তে লম্বা আঙুলগুলাে বাঁকা হয়ে আছে থাবার মত, আঙুলের শেষ প্রান্তে নখ। মানুষের নখের মত নয় সে নখ, শ্বাপদের পায়ের নখের মত। সখিনির মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে আছে, দেখে হাসানুজ্জামান। মেয়েটার চোখ বন্ধ।

খড়গুলাে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আগুনের উচ্চতা একটু একটু করে নামছে, সখিনির পেছনে আস্তে আস্তে এদিকে এগিয়ে আসছে ঘরের অন্ধকার। সেই ক্রমবর্ধমান অন্ধকারে সখিনির ছাঁয়ায় নড়তে থাকা জিনিসটা কী, সেটা বুঝতে পেরে হাসানুজ্জামানের হাঁটুর কাছটা দুর্বল হয়ে ওঠে। একটা লেজ!

সখিনির কোমরের কাছে একবার এসে ঝাপটা মারে লেজটা, সাপের লেজের মত।

সখিনি প্রথমবারের মত চোখ খুলে তাকাঁয় হাসানুজ্জামানের দিকে। মশালের আলােয় সে চোখ দেখে হাসানুজ্জামানের শরীর কেঁপে ওঠে থরথর করে। সখিনির চোখে সাদা অংশের মাঝে উল্লম্ব সরু একটা মণি, মানুষের চোখের মত নয়, সাপের চোখের মত।

সখিনির মুখের বিচিত্র হাসিটা ক্রমশ ভয়াল হয়ে ওঠে, হাসানুজ্জামান দেখতে পায়, ধীরে ধীরে হাঁ করছে সে। তীক্ষ দুই পাটি শদন্ত বেরিয়ে আসে, তার মাঝে দুই সারি এবড়াে খেবড়াে হলদে দাঁত। মেয়েটার অনিন্দ্য সুন্দর চেহারাটাকে ঢেকে দেয় অপার্থিব জান্তব হাসিটা। একটা খলখল হাসিতে ভরে ওঠে ঘর। সে হাসি মানুষের নয়।

একই সাথে ঘরের ছাদের কাছে জ্বলে ওঠে একটা আলাে। হাসানুজ্জামান এবার সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। বিশাল একটি ঘরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে, তার মুখােমুখি সখিনি নামের ওই জিনিসটা। তার শরীর থেকে কাঁথা খসে পড়েছে, ফ্যাকাসে উলঙ্গ একটা শরীর বেরিয়ে পড়েছে। শরীরটা মানুষের, দীর্ঘদেহী ফ্যাকাসে কোনও তরুণীর, কিন্তু শরীরের অনুপাত মানুষের মত নয়। অনেক দীর্ঘ এই জীবটির।

সখিনি তীক্ষ্ণ, কর্কশ গলায় পেঁচিয়ে ওঠে, খিদা!”

হাসানুজ্জামান অনুভব করে, তার মাথার পেছনের সব চুল খাড়া হয়ে উঠেছে। এক অপরিসীম আতঙ্কে তার হাত থেকে খড়ের মশালটা মেঝেতে পড়ে যায়।

সখিনি দুই পা সামনে বাড়ে, তারপর পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। হাসানুজ্জামান সম্মােহিতের মত দেখে, সখিনির দুই পায়ের ফাঁকে বাতাসে ছােবল দিচ্ছে লেজটা। তার হাত দুটো কনুইয়ের কাছে একটু ভাঁজ হয়ে এসেছে, আঙুলগুলাে উদ্যত, তাদের প্রান্তে কর্কশ, পাথুরে নখ। হাসানুজ্জামান অস্ফুটে বলে, ‘শাখিনী!’

সখিনি নয়। জীবটা তার আসল পরিচয়ই দিয়েছিল তখন শাখিনী । যারা মানুষ টেনে নিয়ে যায় মাটির নীচে, গাছের গর্তে, জলের নীচে, তারপর কড়মড়িয়ে খায়। ছেলেবেলায় অনেক গল্প সে শুনেছে বটে। ছিনতাই করার সময় শাখিনীদের গল্পও সে করেছে তার শিকারদের সাথে।

সখিনি, বা শাঁখিনী, আরও এক পা এগিয়ে এসে একটু ঝুঁকে দাঁড়ায়। তার উরুর পেশীর দিকে তাকিয়ে হাসানুজ্জামান বােঝে, লাফ দেবে জীবটা। হাসানুজ্জামান মেঝে থেকে মশালটা কুড়িয়ে ছুঁড়ে মারে শাঁখিনীর মুখের ওপর, তারপর ঘুরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগায় ঘরের কোণের দিকে। জানালাটার কাছে পৌছাতে হবে, যে করেই হােক!

পেছনে একটা তীব্র আর্তনাদ শুনতে পায় সে, কিন্তু ঘুরে তাকায় না। ঘরের কোণে এবড়ােখেবড়াে হঁটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাসানুজ্জামান, হাত আর পায়ে খামচে ধরে দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকে। যে করেই হােক জানালার কাছে পৌছতে হবে।

দেয়াল বেয়ে উঠতে উঠতে হাসানুজ্জামানের মস্তিষ্ক আবার ফিসফিস করে ওঠে। কিছু একটা ঠিক নেই।

বাজার নেই, বলেছিল সেই লােকটা। সােনিয়াকে বলেছিল বাজার করতে। কার জন্যে বাজার?

হাসানুজ্জামানের বুকে বাড়ি খাচ্ছে তার হৃৎপিণ্ড, হাপরের মত হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকে সে। মেঝেতে থপথপ শব্দ শুনতে পায় হাসানুজ্জামান, শব্দটা দ্রুত এগিয়ে আসছে এদিকে। পেছন ফিরে তাকায় না সে, মরিয়া হয়ে উঠতে থাকে দেয়াল বেয়ে। হঁটের খাজে লেগে থেঁতলে যাচ্ছে তার হাত আর পায়ের আঙুল, কিন্তু হাসানুজ্জামান থামে না, সারা দেহের শক্তি সম্বল করে সে উঠতে থাকে।

এটা একটা পাতালঘর। এই ঘরে একটা শাখিনী আছে। এই ঘরে তাকে নগ্ন করে ফেলে রেখে গেছে ওরা। হাসানুজ্জামানকে তার মন ফিসফিস করে বলে, এই শখিনীর জন্যেই বাজার করে এনেছে সেই লােকটা, সােনিয়া আর ইয়েলাে ক্যাবের ড্রাইভার। বাজার সে নিজে । শাঁখিনীর জন্যে খাবার। হাসানুজ্জামান দেয়ালে নখের কর্কশ আঁচড়ের শব্দ শুনতে পায়, তার শরীরের সব রােম উদ্যত হয় আতঙ্কে। দেয়াল বেয়ে উঠে আসছে শখিনী, তার পিছু পিছু!

একটা কর্কশ হুঙ্কার ঘরের ভেতরটাকে কাঁপিয়ে তােলে, ‘খিদা! হাসানুজ্জামানের চোখ ফেটে জল গড়ায়, সে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে আসে জানালা বরাবর।

কাচের ওপাশে তিনটা শান্ত, মনােযােগী মুখ দেখতে পায় সে। সেই লােকটা, তার শক্ত চোয়াল, চোখে নির্লিপ্ত দৃষ্টি তার বাম পাশে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি চালক, একই রকম ভাবলেশহীন চেহারা, কিছু একটা চিবােচ্ছে সে। পান? চুইয়িং গাম? লােকটার ডান পাশে কাঁচের জানালার সাথে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সােনিয়া, তার পরনে রাতের পােশাক। সােনিয়ার মুখে একটা দুষ্টু হাসি, চোখে সরীসৃপের ক্রুরতা নিয়ে গভীর অভিনিবেশ নিয়ে সে দেখছে পাতালঘরের ভিতরের দৃশ্য।

হাসানুজ্জামান কপাল ঠোকে জানালায়, তারপর ডান হাত তুলে কিল মারে সে মােটা কাচের ওপর।
বাঁচান! চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। আল্লাহর দোহাই লাগে, বাঁচান আমারে! ভাই গাে, বাঁচান গাে ভাই! বাঁচান!

হাসানুজ্জামানের কয়েক ফুট নীচে ঘড়ঘড়ে কর্কশ একটা রুদ্ধ অস্ফুট হুঙ্কার ঘরের কোণকে অনুরণিত করে, খিদা! খিদা! খিদা!

হাসানুজ্জামান শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ঘুসি মারে কাচের ওপর, কিন্তু আগের মতই শীতল, কঠিন থেকে যায় কাঁচের পাত। ওপাশে দাঁড়ানাে তিনটি মানুষের মুখের অভিব্যক্তিতেও কোনও পরিবর্তন আসে না । হাসানুজ্জামান উপলব্ধি করে, এই দৃশ্য এরা বহুদিন ধরে দেখছে। এরা জানে, এমনটা হয়। এরা জানে, এমনটাই হয়! তিনজনই একটু ঝুঁকে আসে সামনে। সােনিয়া জিভ বের করে তার ঠোট চাটে, ট্যাক্সি ড্রাইভার চিবানাে বন্ধ করে ঢোক গেলে, আর মাঝখানের লােকটার মুখে ফুটে ওঠে একটা পাতলা হাসি।

একটা ধারালাে থাবা প্রচণ্ড হ্যাচকা টানে হাসানুজ্জামানকে খসিয়ে আনে দেয়াল থেকে। যন্ত্রণা নয়, একটা বিষাদ গ্রাস করে হাসানুজ্জামানকে, অভিকর্ষের হঠাৎ অস্তিত্ব বিষাদকেও মুছে দেয় তারপর।

ওপরে চকচক করে ওঠে তিনজোড়া চোখ, নীচে পাতালঘরের মেঝেতে হাসানুজ্জামানকে ছিড়েখুঁড়ে খায় শাঁখিনী ।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত