অশুভ আত্মা

অশুভ আত্মা

কিছুদিন আগে একজন আমাকে প্রশ্ন করেছিল –
“আচ্ছা সত্যিই কি প্রেতযোনি প্রাপ্ত কোনো অশুভ আত্মা জীবিত কোনো মানুষকে possess করতে পারে”?

কথাটা একটু হাস্যকর শুনতে লাগলেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আজকাল অনেক হলিউড মুভিতেই এরকম দেখা যায় যে নায়িকা কোনো ডিমন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং অবশেষে exorcism এর দ্বারা তাকে ঠিক করা হয়। তাছাড়া আমাদের গ্রাম বাংলাতেও আগেকার দিনে মা ঠাকুমারা যুবতী এবং পোয়াতি মেয়েদেরকে সন্ধ্যেবেলা বা ভর দুপুরে গাছের তলা দিয়ে বা নির্জন মাঠঘাট দিয়ে যেতে বারণ করতো। বলা হয় এতে নাকি মন্দ বাতাস লাগতে পারে।

এইসব তথ্যের সত্যতা কত সেটা যাচাই করা যদিও বেশ কঠিন, কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে এরকম অনেক গল্প বা ঘটনা কিন্তু সত্যিই দেখা যায়। চলতি বাংলায় যাকে আমরা বলি “ভুতে ধরা”।

“পরীতে আছর দেওয়া” বলে একটা কথা আছে। এ পরী কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় পড়া fairy tales এর সেই সুন্দরী ডানাওয়ালা পরী নয়। পরী বলতে ওরা খুব সম্ভবত মেয়ে জীন বা ভুতকে বোঝায়। শুনেছি পরীরা সাধারণত সুন্দর দেখতে এবং একলা ছেলেদেরকে নিজের রূপ এবং মিষ্টি ব্যবহারে ভুলিয়ে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। আমাদের হিন্দু ধর্মেও “হাকিনি” বলে এক সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাই, যারা ওই একই কাজ করে।

তবে আমার অশেষ দুর্ভাগ্য যে আমার প্রতি কখনো কোনো সুন্দরী “পরী” বা “হাকিনি” তার কৃপা দৃষ্টি দেয়নি। তাই তাঁদের কথা থাক, বরং আমার ছোটবেলায় শোনা একটা ঘটনার কথা বলি।

সেবারে পুজোর ছুটিতে প্রায় এক মাসের জন্য মামাবাড়ি গিয়েছিলাম। তখনও স্কুল গুলোতে পড়াশুনার এতটা চাপ ছিল না। পুজোর সময় স্কুলে ছুটি পড়লেই মা তল্পিতল্পা নিয়ে আমায় সাথে করে মামাবাড়ি গিয়ে উঠতো। দাদু, দিদা, দুই মামা, ভাই বোনেরা – একটা মাস যে কোথা দিয়ে কেটে যেত টেরই পেতাম না।

সেবারে কিন্তু মামাবাড়ি গিয়ে এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হলাম। শুনলাম পিটার দাদু কে নাকি ভূতে ধরেছে!

আমার মামাবাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই খ্রিস্টান পাড়া বলে একটা জায়গা আছে। রেল লাইনের ধার বরাবর কিছুটা জায়গা নিয়ে একটা গীর্জা আর তাকে কেন্দ্র করে কয়েক ঘর খ্রিষ্টান পরিবারের বাস। আর এক পাশে একটা ছোট্ট কবরখানা। এই খ্রিস্টান পাড়াতেই পিটার দাদু থাকতো। তাঁর পুরো নাম কি ছিল জানা নেই, তবে আমরা কচিকাঁচার ওঁকে পিটার দাদু বলেই জানতাম। রেল লাইনের ধরে ওনার এক ছোট্ট মুদি খানার দোকান ছিল। আমি মামাবাড়ি এলে মাঝে মাঝেই মামাদের কাছ থেকে আট আনা কি এক টাকা আদায় করে পিটার দাদুর দোকানে ছুটটাম বাদাম কি লজেন্স কেনবার জন্য। সেই সূত্রেই বেশ ভাব হয়েছিল ওঁর সাথে।

সেবার মামাবাড়ি পৌঁছে পিটার দাদুর দোকানে গিয়ে দেখলাম দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। আসে পাশে জিজ্ঞাসা করে জানলাম পিটার দাদুর নাকি কি একটা সমস্যা হয়েছে। বেশ কিছুদিন হলো দোকানটা বন্ধ রয়েছে।

পিটার দাদুর সাথে আমার ভালোই ভাব হয়েছিল। তাই মামাবাড়ি ফিরে দাদাকে নিয়ে খ্রিস্টান পাড়ায় এলাম ওঁর খোঁজ নিতে। এসে কিন্তু অন্যরকম একটা ব্যাপার জানতে পারলাম। শুনলাম পিটার দাদু কে নাকি ভূতে ধরেছে। কয়েকদিন যাবৎ উনি নাকি অদ্ভুত আচরণ করছেন। একটা 2-3 বছরের ছোট্ট বাচ্ছা যেরকম করে ঠিক সেরকম। অসংলগ্ন কথা বলছেন, হাসছেন একা একা, কান্না করছেন ইত্যাদি। ব্যাপারটায় প্রথম দিকে তেমন কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল বয়সকালে বুড়োর মাথা খারাপ হয়েছে। নইলে একজন সত্তরর্ধ বৃদ্ধ এরকম আচরণ করবে কেন। ডাক্তারও দেখানো হয় কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।

পরে একটা ব্যাপার জানবার পর সবাই বুঝতে পারে ব্যপার টা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। শুনলাম যেদিন থেকে উনি এইরকম আচরণ করতে শুরু করেছেন, তার ঠিক আগের দিন রাত্রে ওনাকে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা পুরোনো কবরের উপরে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। ব্যাপারটা এইরকম –

রাতে প্রাকৃতিক কাজের প্রয়োজনে বেরিয়েছিলেন। বাড়ির পেছনেই একটা বাগান ছিল, ঝোপঝাড়, আগাছায় ভরা। প্রায় প্রতি রাতেই উনি ওখানটায় প্রাকৃতিক কাজ সারতে যেতেন। সে রাতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক্ষন ধরে না আসায় ওনার ছেলের সন্দেহ হয়। সে লণ্ঠন হাতে বাগান গিয়ে খোঁজাখুঁজি করে, কিস্তু খুঁজে না পেয়ে বাগান ছাড়িয়ে কিছু দূরে পাশের বন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে দেখে ওর বাবা একটি উঁচু ঢিপির উপরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন অচেতন অবস্থায়। ওই ঢিপিটা ছিল ও বাড়িরই এক মৃত শিশুর কবর। তখনকার দিনে গ্রামের দিকে বাড়ির ভিটাতে জায়গা থাকলে লোকেরা বাড়ির জমিতেই দাহ করা বা কবর দেওয়ার কাজ করতো। এই কবরটিও ছিল এ পরিবারেরই এক ছোট্ট সদস্যের, তবে বহু পুরোনো। কিন্তু অতো রাত্রে পিটার দাদু প্রাকৃতিক কাজ করতে গিয়ে কেন যে বাগান ছাড়িয়ে ওই কবরটার উপরে পরে গেলেন, সেটা কোনোভাবেই বোঝা গেল না।

পরের দিন থেকেই শুরু হলো সমস্যা। প্রথমে চুপচাপ থাকতেন, কথা বলতেন না বিশেষ কারুর সাথে, দোকানে বসা বন্ধ করলেন। কিভাবে সে রাতে ওই কবরের উপর পরে গেলেন, কেন ওখানে গিয়েছিলেন সে কথা জিজ্ঞাসা করেও লাভ হয়নি কোনো। মাঝে মাঝে একা একা বিড়বিড় করতেন, হাসতেন। বাচ্চারা যেভাবে কথা বলে সেই ভাবে কথা বলতেন।

ডাক্তার অবশ্য বলেছিল, প্রচন্ড পরিমান মানসিক ভয় এবং চাপের কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু ওষুধে কোনো কাজ হলো না।

দিনদিন বেড়েই চললো সমস্যা। লোকজন দেখলেই তেড়ে আসেন, গালাগালি দেন, মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে গ্যাজলা উঠে অজ্ঞান হয়ে যান। মাঝে মাঝেই রাতের দিকে দরজায় নখ দিয়ে আচড়াতেন আর বলতেন ‘দরজা খোল… আমি কবরে যাবো। দরজা খুলে দে”।

এখন এমন পরিস্থিতি যে ওঁকে ঘরে আটকে রাখতে হয়। শুনেছি গীর্জা থেকে পাদ্রী সাহেবকেও ডেকে আনা হয়েছিল একবার, কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি।

এরপর আর পিটার দাদুর সাথে কখনো দেখা হয়নি আমার। স্কুলের ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। তবে পরে শুনেছিলাম পিটার দাদুর বাড়ির লোকেরা আরো নানা ধরণের চিকিৎসা করিয়েছিল, এমনকি গুনীন পর্যন্ত ডাকা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত ওই অবস্থাতেই উনি মারা যান।

কোনো মৃতের আত্মা জীবিত কাউকে possess করতে পারে কিনা আমার জানা নেই। এইসব তথ্য কতটা সত্য বা বিশ্বাসযোগ্য তা পাঠকরাই বলতে পারবেন, কারণ আমার নিজের এ নিয়ে তেমন একটা অভিজ্ঞতা নেই। শুধু একটা কথা বার বার মনে আসে – অতো রাতে পিটার দাদু বাগান ছেড়ে কেন যে ওই বনজঙ্গল এর মধ্যে ঢুকে কবরটার কাছে গিয়েছিলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা আজও পেলাম না।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত