ভূতের রাজা

ভূতের রাজা

সরকারি কাজে বিদেশে থাকি।ছুটি নিয়ে দেশে ফিরছি। সাঁওতাল পরগনায় যে জায়গায় আমার কর্মস্থল ছিল,সেখান থেকে রেলস্টেশনে যেতে প্রায় ত্রিশ মাইলের ও ওপর পথ পার হতে হয়। পাহাড়ি পথ-এক এক মাইল হচ্ছে দু-তিন মাইলের ধাক্কা। তার অপরে রাতের বেলায় বাঘ ভাল্লুকের সঙ্গেও আলাপ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।সকাল বেলায় বেরুলেও সন্ধ্যা হবেই। রাস্তায় একটা আশ্রয়ের দরকার। মাঝ পথের কাছাকাছি স্থানীয় রাজার একটি শিকার- কুঠি ছিল।রাজা বা তাঁর বন্ধুরা শিকারে এলে এই কুঠি হত তাঁদের প্রধান আস্তানা। রাজার ম্যানেজারের সঙ্গে আলাপ ছিল।তাঁকে গিয়ে অনুরোধ জানালুম, শিকার কুঠিরে একটা রাতের জন্য মাথা গোজাবার জায়গা দিতে হবে। ম্যানেজার বললেন,’এখন শিকারের সময় নয়,কুঠির খালি পড়ে আছে। আপনি এক রাত কেন,একমাস থাকতে পারবেন। আমাদের সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেব ও আজ রাতটা এখানে বিশ্রাম করবেন।কুঠিরে আরো ঘর আছে,আপনাদের থাকার কোনো অসুবিধা হবেনা।কিন্তু-

,’ কিন্তু কী?,’
`কিন্তু আপনি সেখানে থাকতে পারবেন তো?’
‘কেন পারব না?’
‘লোকের মুখে শুনি, কুঠিরে নাকি অপদেবতার বাস আছে।’
‘অপদেবতা?’
‘হ্যাঁ,অপদেবতা ছাড়া আর কি বলব?

কুঠির পাশেই শালবনের ভেতর সাঁওতালদের এক ভূতুরে দেবতা আছে। সেই দেবতা নাকি ভূতের রাজা।তাঁর ভয়ে সাঁওতালরা পর্যন্ত সন্ধ্যার পর ও পাড়া মাড়ায় না।তারা বলে,তাদের দেবতা নাকি রাতের বেলায় শিকার কুঠিরে ঘুমাতে আসে।’

আমি হো হো করে হেসে উঠে বললুম, ‘বেশ তো,কুঠিরে শুয়ে দেবতার সঙ্গে রাত্রিবাস করব,এটা তো মস্ত পূণ্যের কথা,আমি রাজি।’
ম্যানেজার বললেন, ‘আমি অবশ্য ওসব ছেলেমানুষী কথায় ততটা বিশ্বাস করিনা।,
তবু বলা তো যায়না- যথাসময়ে ডুলিতে চড়ে রওনা হয়ে সন্ধ্যার কিছু আগেই শিকার কুঠিরে পৌঁছলুম। ডুলি বেয়ারারা চলে গেল,মাইল তিনেক তফাতে তারা একটা গাঁয়ে গিয়ে আজকের রাতটা কাটাবে;কাল সকালে আবার ডুলি নিয়ে আসবে। কুঠির বারান্দায় একখানা বেতের চেয়ারে বসে টেলর সাহেব তামাকের পাইপ টানছিলেন। সাহেবের সঙ্গে আমারও বেশ পরিচয় ছিল।

আমাকে দেখে সাহেব বললে, ‘এই যে,গুপ্ত যে! তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
`ছুটি নিয়ে দেশে ফিরছি। তুমি?’
‘আমি,`হোমে’যাচ্ছি।তুমি কি আজ এখানে থাকবে?’
`হ্যাঁ সাহেব।’
`বেশ,বেশ,দুজনে একসঙ্গে রাত কাটানো যাবে, এ ভালোই হলো।’
‘দুজন কেন সাহেব,তিনজন।’ ‘তিনজন আবার কে?তুমি কি আমার আর্দালির কথা বলছ?’ ও,তাকে আমি মানুষের মধ্যেই গণ্য করি না।’ ‘না সাহেব, আমি আর্দালির কথা বলছি না।’ ‘তবে কি কুঠির দারবানের কথা ভাবছ? না,সে তো এখানে থাকে না।’
‘না,না, আমি দারবানের কথা ও বলছি না।তুমি শোনো নি সাহেব,সাঁওতালদের এক দেবতা রাত্রে আমাদের সঙ্গি হতে পারেন।’

টেলর হেসে বললেন,’ ওহো,শুনেছি বটে! তা এক রুপকথার এক বর্ণ ও আমি বিশ্বাস করিনা। তুমি কর নাকি?’ ‘করলে একলা এখানে রাত কাটাতে আসি?’ টেলর পাইপে তিন চারটা টান মেরে বললে,’দেখ গুপ্তা,সাঁওতালদের এই দেবতাটিকে আমি দেখেছি।এমন বীভৎস দেবতা আমি পৃথিবীতে আর দুটি দেখিনি।তাকে দেখে আমার ভারী পছন্দ হয়েছে।’ ‘পছন্দ হয়েছে?’

‘হ্যাঁ। তাই ঠিক করেছি,কাল যাবার সময় তাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব। ইংল্যান্ডে আমার বাড়ির বৈঠকখানায় তাকে আমি সাজিয়ে রাখব।আমার বন্ধুরা তাকে দেখলে খুব তারিফ করবেন।’ আমি হেসে বললুম,’তাহলে বোঝা যাচ্ছে কাল থেকে দেবতা আর এই কুঠিরে শুতে আসবে না।? তবে এইবেলা তাঁকে একবার দর্শন করে আসি।-তাঁর আডডা কোথায়?’ টেলর আঙুল দেখিয়ে বললে,’ ওই যে,ঐখানে মিনিটখানেকের পথ।’

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলুম।কুঠির পাশেই অনেকগুলো শালগাছ দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।তাদেরই ছায়ায় একটা পাথুরে ঢিবির উপর মানুষের সমান উচু একটা মূর্তিকে দেখতে পেলুম।

মূর্তিটা রঙ করা কাঠের।তার দেহ মাপে মানুষের মতন বটে,কিন্তু তার মুখ দানবের মতো প্রকান্ড।আর সে মুখের ভাব কি ভয়ংকর। দেখলেই দিনের বেলায়ই গা ছমছম করে। মাথার চুলগুলো সাপের মতোন ঝুলছে,কানদুটো হাতির মতোন,মুখখানা খানিক সিংহ আর খানিক ভাল্লুকের মতোন।দু দুটো গোল গোল কাঁচের স্ফটিকের চোখ আগুনের মতোন জ্বলছে।

হাঁ করা বড় বড় দাঁতওয়ালা মুখের ভিতর থেকে রাঙা টকটকে লকলকে জিভের আধখানা বাইরে বেরিয়ে পড়ে ঝুলছে। কাধ ও মুন্ডের মাজখানে গলাটা দেখলে মনে হয়,কে যেন একটা সরু বাঁখাড়ির উপর মুখখানাকে বসিয়ে দিয়েছে। হাত দুখানা বাঘের থাবার মতোন। কোমরের কাছ থেকে পা পর্যন্ত দেহের কোন অঙ্গ দেখা যাচ্ছে না।কাঠকে ক্ষুধে আর অঙ্গ গড়াই হয়নি। মূর্তির গায়ের রং আলকাতরার মতোন কালো আর মুখের রং খানিক সাদা,খানিক তামাটে ও খানিক হলুদ। ভাবলুম,এ মূর্তি যদি সত্য সত্য রাত্রে কুঠিরে ভিতরে ঘুমাতে আসে,তা হলে আমাদের ঘুম আর এ জীবনে ভাঙবে কি! ধীরে ধীরে কুঠির দিকে ফিরলুম।টেলর পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছিলেন।আমায় দেখে সে বললে,’গুপ্ত,খুব ঝড়-বৃষ্টি আসছে,ঐ দেখ।’ সত্য কথা!পশ্চিমের আকাশখানা ঠিকযেন কালো কষ্টিনপাথর হয়ে গেছে! ঝড় উঠতে আর দেরি নেই।

ঝড় এসে অরণ্যকে জাগিয়ে দিয়ে গেছে।এখন মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। টেলরের নিমন্ত্রণ নিয়ে,গল্প করতে করতে অনেক্ষণ আগে, ডিনার খেয়েছি। এখন টেলর হয়তো দিব্যি আরামে নিদ্রা যাচ্ছে-কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই। ভূত টুত কিছু মানিনা-তবু কেন জানি না,মনটা কেমন খুঁতখুঁত করছে।রাজার সেই ম্যানেজারের কথাগুলো আর সাঁওতাল দেবতার সেই ভয়ানক মুখখানা মনের ভিতর দিয়ে ক্রমাগত আনাগোনা করছে।যত তাদের ভূলবার চেষ্টা করছি আজেবাজে চিন্তা বলে-তত তারা মনের উপর চেপে বসে,নরম মাটির উপরে ভারী পায়ের দাগের মত। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে,রম-ঝম-রম-ঝম।মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া হা হা হা করে উঠছে!-যেন কোনো আহত আত্মার কান্না।

চারদিক থেকে বনের গাছপালাগুলো যেন সর সর সর করে কোন শত্রুকে অভিশাপ দিচ্ছে।তারই ভেতর থেকে একবার শুনলুম হায়েনার অট্টহাসি,একবার শুনলুম শৃগাল দলের মরাকান্না,একবার শুনলুম বাঘের গর্জন।

হঠাৎ আমার ঘরে দরজার উপর দুম দুম করে আঘাত পড়ল। ধড়মড় করে আমি বিছানার উপর উঠে বসলুম,সে কি আসছে? সে কি আসছে?

দরজার উপরে আর কোন আঘাত হল না। ঝোড়োহাওয়ার ঝাপটায় দরজা নড়ছে মনে হয়! নিজের কাপুরুষতার জন্যে নিজেই লজ্জিত হয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।

এমন সময়ে বাহির থেকে খনখনে গলায় গান শুনলুম:- ‘লোগোবুরু ধীরকো সীনিন ঘান্টাবাড়ি মা কাওয়ার!’ এ তো সাঁওতালি ভাষা! নিশ্চয়ই কোন সাঁওতালি গান গাইছে। কিন্তু,এতো রাতে, এই ঝর-বৃষ্টি রাতে এই হিংস্র জন্তু ভরা গহীন অরণ্যের মাঝে কোন সাঁওতাল মনের আনন্দে গান গাইতে আসবে? আবার দরোজায় খুব জোরে আওয়াজ হলো- এবারে আরো জোরে।

আমার সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।এ তো ঝড়ের ধাক্কা নয়,এ যে সত্যি সত্যিই কেউ দরোজা ঠেলছে। তবে কি সে এসেছে? সে কি সত্যিই এখানে থাকতে এসেছে? আবার গান শুনলুম।এবারে আমার খুব কাছে, একেবারে কুঠির বারান্দার উপরে।সেই তীব্র খনখনে গলার গান। ,’ লোগোবুরো ধীরকো সীনিন ঘান্টাবাড়ি মা কাওয়াড়!’  হঠাৎ উলটো বিপদ!কুঠির ভিতর দিককার দরজায় ঘন ঘন আঘাত! ভিতর বাহিরে বিপদ দেখে যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছি,এমন সময় শুনলাম-গুপ্ত!গুপ্ত! ভগবানের দোহাই,খোলো-দরজা খোলো শিগগির!’ এ তো টেলরের গলা!.. আঃ! বাঁচলুম! তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। টেলর হুড়মুড় করে ঘরের ভিতর ডুকে পড়লে-তার চোখ-মুখ পাগলের মত,হাতে বন্দুক। আমি তাকে দু’হাতে চেপে ধরে বললুম,’মি.টেলর হয়েছে কি?এত রাতে কি দরকার তোমার?’ টেলর দেয়ালে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললে,’গুপ্ত,আমার ঘরের দরজায় ক্রমাগত কে লাথি মারছে আর গান গাইছে! তুমিই কি আমার দরজার কাছে গিয়ে আমাকে ডাকছিলে?’ আমি বললুম,’না,না,আমি আমার বিছানা ছেড়ে এক পা-ও নড়িনি!কিন্তু আমারও ঘরের দরজায় যে কে নাড়ছে,গান গাইছে! ঐ শোনো!’

দুম দুম করে আমার ঘরের দরজায় আবার প্রচন্ড আঘাত হল- সঙ্গে সঙ্গে সেই গান:– ‘লোগোবুরু ধীরকো সিনিন ঘান্টবাড়ি মা কাওয়াড়!’ আচমকা আবার একটা ঝড়ের ঝাপটা এসে দরজা জানালার উপর আছড়ে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা খড়খড়ি দুমদাম করে খুলে গেল! সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের আলোকে স্পষ্ট দেখলাম বারান্দার উপরে কার একটা জীবন্ত ছায়ামূর্তি রয়েছে? কে ও? কে ও? ও কি সেই ই- যে প্রতি রাতে এখানে ঘুমাতে আসেআমার মাথার
চুলগুলো যেন খাড়া হয়ে উঠল! টেলরের বন্দুক ধ্রুম করে গর্জে উঠল।সঙ্গে সঙ্গে ছায়ামূর্তিটা সাৎ করে সরে গেল। টেলর চেঁচিয়ে বললে, ‘গুপ্ত,গুপ্ত,জানালা বন্ধ করে দাও,জানালা বন্ধ করে দাও!’ পা চলতে চাইছিল না।কিন্তু পাছে টেলর ভাবে বাঙালি কাপুরুষ,সেই ভয়ে নিজের সকল দূর্বলতাকে ত্যাগ করে আমি আবার জানালার পাল্লাদুটো বন্ধ করে দিলুম। টেলর টলতে টলতে আমার বিছানার উপর বসে পড়ে বললে,’গুপ্ত! কিছু মনে করো না,আমি আজ তোমার বিছানাতেই,তোমার সাথে রাত কাটাব।’ বাইরে আবার কে গান গাইলে–  ”লোগোবুরু ধীরকু সিনিন ঘান্টাবাড়ি মা কাওয়াড়!’ সকালবেলা কিন্তু তখনো মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। আস্তে আস্তে দরজা খোলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালুম। সারা আকাশখানা যেন কালো মেঘের ঘেরাটোপ দিয়ে ঢাকা। যতদূর চোখ যায়, খালি দেখা যায় অরণ্য শ্যামল তরুর মেলা। হঠাৎ বারান্দার এক কোণে চোখ গেল।চাদর মুড়ি দিয়ে কে একজন শুয়ে রয়েছে! কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম,’এই,কে তুই?’ বার কয়েক ডাকাডাকির পর চাদরের নিচ থেকে একখানা সাঁওতালি মুখ বেরোল।
,’এই,কে তুই?’
‘আমি ঠাকুরের পূজারী।’
‘ঠাকুর! কে ঠাকুর?’
‘যিনি ঐ শালবনে থাকেন।–‘
‘এখানে কই করছিস?’
‘ঠাকুর রোজ রাতে এখানে ঘুমাতে আসেন,তাই আমিও
তাঁর সঙ্গে আসি।’
‘কাল রাত্রে তাহলে তুই দরজা ঠেলছিলি?’
‘আমিও ঠেলছিলুম,ঠাকুরও ঠেলছিলেন।’
‘আর গান গাইছিল কে?’
‘আমি।’
এমন সময় টেলরও ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।তাকে সব খুলে বললুম।টেলর তো শুনেই রেগে আগুন।

সব শুনে ঘুসি পাকিয়ে পুরুতের দিকে যাবা মাত্রই সে এক লাফে বারান্দার রেলিং টপকে বাইরে বনের ভিতরে
অদৃশ্য হয়ে গেল। টেলর বললে,’রাস্কেলকে ধরতে পারলে একবার দেখিয়ে দিতুম। ওহ,সারারাত কি অশান্তিতেই না কেটেছে।’ আমি বললুম,’যাক,যা হবার তা তো হয়ে গেছেই। এখন আমাদের কি উপায় হবে। কুঠির দারবানও এল না,ডুলি বেয়ারারা ও এল না।আমরা যাব কেমন করে?’ টেলর বললে,’আমাকে যেমন করেই হোক আজ যেতেই হবে। বোম্বে যাবার টিকিট কিন্তু আমি কিনে ফেলেছি। উপায় থাকলে তোমাকেও আমি স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিতুম। কিন্তু অতটুকু গাড়িতে তো ধরবে না,কাজেই তোমাকে এখানে ফেলে রেখেই আমাকে যেতে হবে। আর্দালী!.

টেলরের আর্দালী এসে সালাম করলে। টেলর বললে,’আমার মালপত্তর সব গাড়িতে নিয়ে তোলো। তারপর শালবন থেকে সেই কাঠের পুতুল তুলে নিয়ে এস।’ আমি বললুম,’তুমি সত্য সত্যই ঐ পুতুলটা নিয়ে যেতে চাও?’ টেলর বললে,’ নিশ্চয়ই,আমার যেই কথা সেই কাজ।’ আবার রাত এল।বৃষ্টি এখনো থামেনি। আমি এখনো কুঠিরে বন্দী হয়ে আছি।

টেলর চলে গেছে একা।যাবার সময় সাঁওতালদের ভূতের রাজাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে।সে আর এই কুঠিরে ঘুমাতে আসবেনা। চোখে ঘুম আসছিলনা।একখানা ইংরেজি নভেল বার করে পড়তে বসলুম।ঘন্টা দেড়েক পরে ঘুমের আবেশ চলে এল। আলোটা কমিয়ে দিয়ে শয়নের উপক্রম করছি, এমন সময় শুনতে পেলুম বারান্দায় পায়ের আওয়াজ হল,ঠক ঠক ঠক। ‘ঠিক যেন কাঠের আওয়াজ’ ঠক ঠক করতে করতে আওয়াজটা আমার ঘরের কাছে চলে এল,তারপর শুনতে পেলুম দরজার উপরে ধাক্কার পর ধাক্কা।কী আপদ! টেলর তো পুতুলটাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে,এ আবার কে জ্বালাতে এল!

নিশ্চয়ই সেই সাঁওতাল পুরুত ব্যাটা।সেই হতভাগা রোজ রাত্রে এই কুঠিরে আরাম করে ঘুমোতে আসে আর চারদিকে রটিয়ে দেয় কুঠির ভিতরে ভূতের রাজা ঘুমাতে আসে।

ধাক্কার জোর ক্রমেই বেড়ে চলল।একবার ভাবলাম দরজা খোলে পুরুতটাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেই,তারপর মনে হল সে কাজ ঠিক হবে না।এই দুর্যোগে বিজন জঙ্গলের ভিতর রাত্রে একা আমি এখানে আছি,যদি কোন দুষ্টলোক কুমতলবে এসে থাকে!..

বন্দুকটা নিয়ে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়ালুম।দরজার এক জায়গায় ছ্যাদা আছে,বন্দুকের নলটা সেই জায়গায় রেখে চেঁচিয়ে বললুম,’কে আছ,চলে যাও,নইলে আমি এখনি বন্দুক ছুঁড়ব।’

কোন জবাব নেই।দরজার উপর ধাক্কা ও থামল না। ‘এখনো আমার কথা শোনো,নইলে– বাইরে বিশ্রী গলায় কে হাসতে লাগল–হিঃহিঃহিঃ– আমি বন্দুকের ঘোড়া টিপলুম,সঙ্গে সঙ্গে দরজার উপর ধাক্কা ও থেমে গেল। ঠক ঠক করে একটা আওয়াজ ঘরের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল– তারপর কুঠির সিঁড়ির উপরে শব্দ শুনলুম-ঠক ঠক ঠক। খানিক পরে অনেক দূরে আবার সেই বিশ্রী হাসি শোনা গেল,হিঃহিঃহিঃ হিহিহি—

এ হাসি অমানুষিক,শরীরের রক্ত যেন জল করে দেয়। শেষ রাতে জল ধরে এল। সকালে দরজা খুলতেই কাঁচা সোনার রোদ এসে ঘরখানা যেন হাসিতে ভরিয়ে তুললে।রোদ দেখে মনটাও খুশি হয়ে উঠল। বারান্দায় বেরিয়েই দেখি,এককোণে চাদর মুড়ি দিয়ে কে শুয়ে আছে! তেড়ে গিয়ে মারলুম এক ধাক্কা! ধড়মড় করে উঠে বসল।সেই সাঁওতাল পুরুতটা। ক্রুব্ধস্বরে বললুম,’কাল রাতে আবার এখানে এসেছিলি? ভারী চালাকি পেয়েছিস,না!’ লোকটার মুখের ভাব এতটুকুও বদলাল না করুণ স্বরে বললে,’আমার ঠাকুর কাল রাতে এখানে এসেছিলেন,তাই আমিও এসেছি। তোর ঠাকুর কোথায়?সাহেব তো থাকে নিয়ে চলে গেছেন।’ ‘আমার ঠাকুর যেখানে থাকেন,সেখানেই আছেন। মিছে কথা,আমি নিজের চোখে দেখেছি টেলর থাকে নিয়ে যেতে।’ ‘আমার ঠাকুর যেখানে থাকেন,সেখানেই আছেন। কুঠি থেকে বেরিয়ে পড়ে ছুটে শালবনে গিয়ে হাজির হলুম।সবিস্ময়ে দেখলুম,ভূতের রাজা চোখ পাকিয়ে লকলকে জিভ বার করে ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে! আর,আর এ কি? মুর্তির পেটের উপরে একটা গর্ত।ঠিক যেন বন্দুকের গুলির মত!গর্তের চারপাশে রক্ত জমাট হয়ে আছে—

মূর্তির আরো অনেক জায়গাতে রক্ত জমাট হয়ে আছে। তবে কি,আমার বন্দুকের গুলিই–

ভাবতে পারলুম না, মূর্তির দিকে আর তাকাতে ও পারলুম না,কেমন যেন একটা অজানা ভয়ে আমার সমস্ত শরীর আচ্ছন্ন হয়ে গেল–

প্রাণপনে দৌঁড়ে সেখান থেকে পালিয়ে এলুম। কলকাতায় ফিরে এসেই খবরের কাগজে এই বিবরণ পড়লুম
— সাঁওতাল পরগনায় পুলিশ সুপারিণ্টেন্ডেন্ট মি.জে.টেলর কর্ম হইতে অবসর লইয়া বিলেতে যাইতেছিলেন,কিন্তু পথের মধ্যে এক বিপদে পড়িয়া খুব সম্ভব তিনি প্রাণ হারাইয়াছেন। স্থানীয় জঙ্গলের মধ্যে তাঁহার মোটরগাড়ি পাওয়া । মোটরের ভিতরে,উপরে ও চারপাশে রক্তের দাগ পাওয়া গিয়াছে।কিন্তু মি.টেলির এবং তাঁর আর্দালীর কোন সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না।পুলিশ সন্দেহ করিতেছে যে মি.টেলর আর তাঁহার আর্দালীকে কোন হিংস্র জন্তু আক্রমণ করিয়াছে।নিকটস্থ এক জঙ্গলে নরখাদক ব্যাঘ্রের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে।’ সেই ভূতুরে মূর্তির গায়ে যে রক্তের দাগ লেগেছিল,সে রক্ত তাহলে হতভাগ্য মি.টেলরের আর তার আর্দালির গায়ের রক্ত!

এবং সেই সাঁওতাল পুরুতটাই নিশ্চয়ই কোন গতিকে খবর পেয়ে ভূতের রাজাকে এখানে ফিরিয়ে এনেছে। মনকে এই বলে প্রবোধ দিলুম বটে,কিন্তু প্রতিজ্ঞা করলুম, শিকার কুঠিরে আর কখনো রাত্রিবাস করতে যাব না! কিসে কি হয় কে জানে?

সমাপ্ত।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত