ভেতরের ছায়া

ভেতরের ছায়া

সন্ধ্যার পর ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে।

গ্রামের শীতলা মন্দিরের ফাটল ধরা চাতালে বসে উত্তেজিত জল্পনা-কল্পনা চলছিল। চাতালের ওপরে টিনের চালায় বৃষ্টি রীতিমতো আরতির ঢাক বাজাচ্ছে। মন্দিরে পুজো শেষ হয়েছে। ধূপধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে বাইরে। কিন্তু সবাই মজে আছে আজ সকালের কাণ্ড নিয়ে।

আজ ভোরবেলা পুকুরপাড়ে কচুবনের ভেতরে এ-গায়েরই একটি বউয়ের লাশ পাওয়া গেছে। কোনও হিংস্র জন্তু অল্পবয়েসি বউটাকে পাগলের মতো ছিড়েখুড়ে রেখে গেছে। এমনকী চুড়ি পরা একটা হাত পাওয়া গেছে মৃতদেহ থেকে প্রায় সাত হাত দূরে।

এককথায় সে-দৃশ্য তাকিয়ে দেখা যায় না।

সব দেখেশুনে সকলেরই মনে হয়েছে, এ-কাজ কোনও মানুষের নয়। কারণ, মানুষের গায়ে এরকম পাশবিক শক্তি থাকে না। এ নিশ্চয়ই কোনও ভয়ংকর জন্তুর কাজ। কিন্তু কোন জন্তু ?

গ্রামের শেষ প্রান্তে, শ্মশানের দিকটায়, শাল-পিয়ালের জঙ্গল আছে বটে, কিন্তু সেখানে চিতাবাঘ কিংবা নেকড়ে আছে বলে কেউ কখনও শোনেনি। তখন কে যেন প্রথম অপদেবতার কথাটা তুলল। বলল, একমাত্র অপদেবতার ভর হলেই কেউ এমন কাজ করতে পারে। তাই থানা-পুলিশের পাট চুকে গেলেও উত্তেজনা একটুও কমেনি। ভেতরে

ভেতরে সবাই ভেবেছে, অপদেবতার ভর কেটে না-যাওয়া পর্যন্ত এ রকম কান্ড চলতেই থাকবে। শীতলা মন্দিরের চাতালে বসে পুরুতমশাইকে ঘিরে এইসব আলোচনা চলছিল। এ-কথা সে-কথার পিঠে পুরুতমশাই তপোময় চক্রবর্তী ফস করে একটা মন্তব্য করে বসেছেন : ‘একটিই মাত্র উপায় আছে.ভেতরের ছায়াটা পরীক্ষা করলেই সব বোঝা যাবে।

ঠাকুরমশাইয়ের কথাটা সকলের কানেই নতুন ঠেকল। ভেতরের ছায়া আবার কী! ছায়ার আবার বাইরে-ভেতর আছে না কি? কেউ কেউ হেসে উঠল, আবার কেউ-বা অবাক হল।

পরিমল সামন্ত গ্রামের একমাত্র স্কুল তারামণি স্মৃতি প্ৰাথমিক বিদ্যালয়ের মাস্টারমশাই। এমনিতে অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়ান—তার ওপর আবার কট্টর যুক্তিবাদী লোক। তাই তিনিই প্রথম বাঁকাসুরে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন তপোময় চক্রবর্তীকে ঃ ঠাকুরমশাই, আপনার কথাটা একটু খোলসা করে বুঝিয়ে দিলে বড় ভালো হয় তাই না?’

তপোময় চক্রবর্তী পেশায় পুরোহিত। গ্রামের শীতলা মন্দিরের পূজারি। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি পুজোআচ্চা করে দিন গুজরান করেন। বছর দশেক আগে সুধাকান্তপুর টাউনের কোন এক স্কুলে যেন সংস্কৃত পড়াতেন। রোজ গায়ত্রী জপ সম্ৰাহ্মণ মানুষ-ব্রহ্মাতেজে অগাধ বিশ্বাস ।

পরিমল সামন্তের ব্যঙ্গের খোঁচায় তিনি কিন্তু রেগে উঠলেন না। হালকা হেসে একটা হাত তুলে ছাত্রকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন, ‘এখন অবিশ্বাসের যুগ, মাস্টারমশাই। তবে এটা জানবেন, কোনও মানুষের ওপরে অপদেবতার ভর হলে তার ভেতরের ছায়াটা বদলে যায়। কিন্তু বাইরের ছায়াটা একই থাকে।”

এবার কথা বললেন অমল রায়। হাই রোডের পাশে ওঁর বহুদিনের পুরোনো মুদিখানা দোকান-তার সঙ্গে চা, বিস্কুট, ওমলেটও পাওয়া যায়। রোগা শরীর, মাথার চুল সব সাদা ধপধপে, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। অমল রায় সুযোগ পেলেই বলেন, ‘বয়েস তো কম হল না! ছোটবেলায় এমন বহু জিনিস দেখেছি যা আজ তোমরা গল্পো বলে হাসবে…’

এই কারণেই আড়ালে সবাই ঠাটা করে বলে ও ‘অমলদা ঘোড়ায় টানা ট্রাম দেখেছেন কিংবা ‘অমলদার সঙ্গে লর্ড ক্লাইভের দারুণ আলাপ ছিল। সেই অমল রায় কপালে ভাজ ফেলে বললেন, ‘আপনার কথাটা ঠিক ক্লিয়ার হল না, ঠাকুরমশাই।’

আপনারা তো জানেন, গায়ে আলো পড়লে দেওয়ালে কিংবা মেঝেতে আমাদের ছায়া পড়ে। ওটা হল বাইরের ছায়া। তেমনি ভেতরেরও একটা ছায়া আছে। একটা পবিত্র আলো যদি কারও ওপরে ফেলা যায় তা হলে তার ভেতরের ছায়াটা দেখা যাবে। কোনও ভূত প্ৰেত পিশাচ যদি ভর না করে তা হলে ভেতরের ছায়া আর বাইরের ছায়া একইরকম দেখতে হবে-কোনও ফারাক থাকবে না। কিন্তু যদি অপদেবতার ভর হয়ে থাকে তা হলে সকলের মুখের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ঠাকুরমশাই ঃ .ওই যে বললাম দুটো ছায়াতে তফাত হয়ে যাবে।

এ-কথা শোনার পর পরিমল সামন্ত দমে গেলেন। আর সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। তার পরই সবাই কেমন থম মেরে গেল। পরিমল ভাবলেন, তপোময় চক্রবর্তীর কথাগুলো একেবারে ফাকা-ফক্কিকার নাও হতে পারে।

বৃষ্টির ছাটের গুড়ো হাওয়ায় উড়ে আসছিল। চোখেমুখে ঠান্ডা প্রলেপটা খারাপ লাগছিল না। মন্দিরের বালবের আলো ঠিকরে পড়েছে বাইরে। কারও কারও মুখে আলো আর অন্ধকারের নকশা।

তপোময় আবার বললেন, ‘তার ওপর কাল আবার পূর্ণিমা ছিল। পূর্ণিমার রাতে পিশাচের তেজ গাঢ় হয়। তখন ভেতরের ছায়াটা কায়া হয়ে যায়। মায়াবীর ক্ষমতায় সে নানান অপকর্ম করে। যেমন, নিরাপদর বউটাকে শেষ করল। যাকে সামনে পেত তাকেই খতম করত—ছাড়ত না।

অন্যদিন গল্পগুজব আড্ডা চলে অনেক রাত পর্যন্ত। কিন্তু আজ সাড়ে সাতটা বাজতে-না-বাজতেই উঠে পড়ল সবাই। ছাতা মাথায় দিয়ে জল-কাদা মাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরল। বৃষ্টির ঝমঝুম শব্দ ছাপিয়ে ব্যাঙের ডাক কানে যেন তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল।

বেশ কয়েকদিন গ্রামের লোকজন ভয়ে সিটিয়ে রইল। সন্ধ্যার পর বেশি রাত হওয়ার আগেই সব বাড়ি ফিরতে লাগল। চায়ের দোকানে বা হাটের কাছে গুলতানি মারা ছেলের দল পিশাচ নিয়ে তর্কবিতর্ক চালাতে লাগল। নিরাপদ নস্করের বউ কীভাবে বেঘোরে প্রাণ দিল তারই ব্যাখ্যা খুঁজতে মেতে উঠল সবাই।

গ্রামের শরীরচর্চার একমাত্র ঘাঁটি তরুণ ব্যায়ামাগার। তার দায়দায়িত্ব সব হরেন সেনাপতির ঘাড়ে। যাড় তো নয়, যেন ষাড়ের গর্দান। আর সারা বডিতে ঢেউ খেলানো পেশির ছড়াছড়ি।

পরিমল সামন্ত প্যান্টটা সামান্য তুলে ধরে কাদা প্যাচপেচে পথ ধরে স্কুলে। যাচ্ছিলেন, পথে হরেন সেনাপতির সঙ্গে দেখা। কয়েকদিন মেঘলার পর আজ সকাল থেকে ধারালো রোদ উঠেছে। ভ্যাপসা গরম কেটে গিয়ে ফুরফুরে  বাতাস বইছে। পথের বুনো ঘাস আর আগাছা

বর্ষায় টরতর করে বেড়ে উঠেছে। টইটুম্বর নালায় ঢোড়া সাপের বাচ্চা দিব্বি সাঁতরে যাচ্ছে। দূর থেকে পরিমল সামন্তকে দেখতে পেয়ে হরেন হাঁক পাড়ল : স্যার শুনছেন, ও মাস্টারমশাই, এই যে, এইদিকে !!’

চিৎকার শুনে ঘুরে তাকালেন পরিমল। একটু দূরেই টালির চাল দেওয়া দরমার ঘর। তার মাথায় সাইনবোর্ড ; তরুণ ব্যায়ামাগার। রং খানিকটা চটে গেছে, টিনটাও তোবড়ানো। ঘরটাকে ঘিরে কাঠাদুয়েক জমি–তার চারদিকে বাখারির বেড়া। বেড়া বরাবর ভেরেন্ডার ঝোপ ।

হরেনের কাছে এগিয়ে গেলেন পরিমল ঃ কী ব্যাপার?’ আপনি তো বিজ্ঞানের লোক-ডেঞ্জারাস যুক্তিবাদী। তো নিরাপদ নস্করের বউটা মারা গেল কেমন করে বলুন দেখি!

পরিমল দেখলেন, হরেনের কাছ থেকে হাত তিনেক দূরে একটা সাপের খোলস পড়ে আছে, আর তার পাশ দিয়ে একটা শামুক গুটিগুটি এগিয়ে চলেছে। তখনই হরেন সেনাপতির ছায়াটার দিকে নজর গেল পরিমলের। কটকটে রোদে উচু নিচু কাদা জমিতে ছায়াটা কেমন যেন অদ্ভূত চেহারা নিয়েছে। পরিমলের গলার কাছটা হঠাই শুকিয়ে গেল। এটা বাইরের ছায়া, নাকি ভেতরের ছায়া! সূর্যের আলোকে কি পবিত্র আলো বলা যায়? ঠাকুরমশাই তো বলছেন, এ মানুষ কিংবা জানোয়ারের কাজ নয়—প্ৰেত পিশাচের কাজ।

হো-হো করে হেসে উঠল হরেন। ওর গায়ের হাফশার্ট ছিড়ে পেশিগুলো যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর কী বড় বড় দাঁত। কই, আগে তো এসব নজরে পড়েনি। পরিমল শিউরে উঠলেন। মনে-মনে ভাবলেন, দিনের আলোয় নিশ্চয়ই কোনও ভয় নেই।

মাস্টারমশাই, গাজাখুরির একটা সীমা থাকা দরকার। আপনার মতো লোক এইসব এলেবেলে গল্প পাবলিসিটি করে বেড়াচ্ছে!’ হরেন গলা খাদে নামাল হঠাৎ ঠাকুরমশাইয়ের কথা ছাড়ুন। আপনার নিজের কী আইডিয়া বলুন দেখি.’

পরিমল সামন্ত কিন্তু কিন্তু করতে লাগলেন। হরেনের ছায়ার পাশে ওঁর ছায়াটাকে কী বড়ই না দেখাচ্ছে! স্রেফ ছায়া দেখেই বোঝা যায় পেটরোগা মানুষ ইসবগুলের কল্যাণে শরীর খাড়া করে চাকরিটা বজায় রাখতে পেরেছেন। কিন্তু উত্তর না দিলে হরেন কি ছাড়বে? যা একরোখা মানুষ।

‘দ্যাখো ভাই, ভূতপ্ৰেত পিশাচে আমার কোনও বিশ্বাস নেই। ওগুলো নেহাতই আমাদের মনের ব্যাপার। আসলে ভূতপ্ৰেত পিশাচ বলে কিছু নেই। যদি কখনও  তুমি ভূত দেখতে পাও তো জানবে সে তোমার দেখার ভুল। ঠাকুরমশাইকে সবাই মান্যি-গনি করে, তাই মুখের ওপরে কিছু বলতে পারি না। সেদিন উনি একটা অদ্ভুত থিয়োরি দিয়েছেন..’ ভেতরের ছায়ার আজগুবি তত্ত্বটা হরেনকে জানালেন পরিমল।

সেসব শুনে হরেনের কি অট্টহাসি, হাসি আর থামতেই চায় না। পরিমল বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। শুধু আড়চোখে নজর রাখছিলেন হরেনের বিকট ছায়াটার দিকে। ওটা বদলাচ্ছে নাকি? নাঃ, ওসব বে-যুক্তির কথার কোনও মানে হয় না।

যাই, ইস্কুলের দেরি হয়ে যাবে’ বলে হরেনের কাছ থেকে বিদায় নিলেন পরিমল। পিছন থেকে হরেন চেচিয়ে বলল, ‘বেড়ে বলেছেন মাস্টারমশাই, ভেতরের ছায়া..হাঃ..হাঃ..হাঃ..হাঃ..

পরিমল ততক্ষণে অনেকটা দূরে চলে গেছেন। হঠাৎই টুং-টাং ঘন্টার শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন, একটা বাচ্চা ছেলে তিনটে গোরু খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের গলার ঘন্টা বাজছে ঃ টুং-টাং-টুং..।

দু সপ্তাহ ঘুরতে-না-ঘুরতেই আবার একটা খুন। তবে এবার মানুষ নয়—বলদ।

শ্ৰীপতি সরকার গ্রামের হাফ জোতদার। লাঙল, বলদ, মই, ট্রাকটর, শ্যালো— সবই ভাড়া খাটান। ওঁর দুটো বলদ। মধু পোড়েল ভাড়া নিয়েছিল তিনদিনের কড়ারে। কিন্তু তেরাত্তির পোহাতে-না-পোহাতেই অপদেবতার কোপ। সকালে উঠে দ্যাখে খোঁটার দড়ি ছেড়া-একটা বলদ উধাও। নাইলন দড়ির ছেড়া ডগাটা দেখে মনে হয় যেন নিমের দাতন। কষে দাঁত মেজে কেউ ফেলে রেখে গেছে। ঘরের উঠোন থেকে উধাও হওয়া বলদ পাওয়া গেল খেলার মাঠ পেরিয়ে হোগলা ঝোপের আড়ালে। অতবড় বলদটাকে নখে দাঁতে তছনছ করে দিয়েছে কেউ। চারপাশ রক্তারক্তি। ভোজালির মতো শিং দুটো একপাশে খুলে পড়ে আছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য।

মধু পোড়েল তো সে-দৃশ্য দেখে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। না, বলদের শোকে নয়- বলদের দাম শোধ দেওয়ার শোকে। শ্ৰীপতি সরকার প্রবল সঞ্চয়ী লোক। পিপড়ে টিপে মধু খান, আর বাতাসার ছায়া ফেলে জল গলায় ঢালেন। বলদের পাই পয়সাটি শোধ নিয়ে তিনি ছাড়বেন না। দরকার হয় মধুকে গতরে খাটিয়ে গায়ে-গায়ে টাকা শোধ করে নেবেন।

সেদিন শীতলা মন্দিরে পুজোর ঝোক বেড়ে গেল। সকলেরই এক প্রার্থনা “আমার পরিবারকে পিশাচের তাণ্ডব থেকে রক্ষা কোরো, মা। পুজোপাঠ শেষ হলে তপোময় চক্রবর্তীকে ছেকে ধরল অনেকে। এ বিপদের কিছু একটা বিহিত করুন, ঠাকুরমশাই।’

তপোময় বললেন, ‘আমার কতটুকুই বা ক্ষমতা। মা যদি ভরসা দেন তা ছায়া পরীক্ষা করে চেষ্টা-চরিত্র করতে পারি..’

আবার সেই ভেতরের ছায়া!

অমল রায় বললেন, ‘আপনি সেদিনও ব্যাপারটা বলছিলেন বটে, কিন্তু ঠিক ভরসা হয় না। এত বয়েস হল..এমনটা কখনও শুনিনি তো, তাই। তা ছাড়া..আপনি কি গোটা গায়ের সবার ছায়া পরীক্ষা করবেন নাকি!

ঠাকুরমশাই হাসলেন : অমলবাবু, আমি তো নয়.মা-ই পরীক্ষা নেবেন। মা-ই পথ দেখাবেন.আমি তো চাকর মাত্র!’

কী যে সব হেঁয়ালি করেন?’ পরিমল সামন্ত মন্তব্য করলেন। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন ,আচ্ছা ঠাকুরমশাই, সূর্যের আলো কি পবিত্র?’

কিছুক্ষণ চিন্তা করে তপোময় বললেন, হ্যা, পবিত্র তো বটেই ‘তা হলে সেই আলোয় ছায়া পড়লে তা থেকে কিছু বোঝা যাবে না?’ হরেন সেনাপতির ছায়াটার কথা ভাবছিলেন পরিমল।

হাসালেন ঠাকুরমশাই, বললেন, “অত সহজ নয়, মাস্টারমশাই। সূর্যের আলো বহু ধুলোবালি মেঘ কুয়াশা ভেদ করে আমাদের কাছে পৌছয়। তখন আর ততটা পবিত্র থাকে কই৷

পরিমল সামন্তের কপালে ভাজ পড়ল। তা হলে উপায়?

সকলের মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া দেখে ঠাকুরমশাই দু -হাত তুলে বরাভয় দিলেন, বললেন, পিশাচের চিন্তা আমার ওপরে ছেড়ে দিন। মা আমাদের নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন। রক্ষা করবেন? অমল রায় অবাক হয়ে ভাবলেন। নিরাপদর বউটার তা হলে অমন হাল হল কেন?

তপোময় চক্রবর্তীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন পরিমল। ফরসা রোগা চেহারা। মাথায় চুলের তেমন বালাই নেই। গলায় পইতে। বুকে কাচা-পাকা চুল। ভাজ পড়া মুখে টানা-টানা চোখ কেমন যেন বেমানান।

না, মানুষটাকে দেখে বুজরুক বলে মনে হয় না। সেরকম হলে চাদা তুলে পিশাচ তাড়ানোর যজ্ঞ করার কথা বলতেন—সেখান থেকে টু-পাইস আমদানি রপ্তানি করতেন। কিন্তু ভেতরের ছায়া ব্যাপারটা কি পুরোপুরি লবডঙ্কা ?

পরিমল সামন্তর মনের ভেতরে পেণ্ডুলাম দুলতে থাকে। তপোময় চক্রবর্তী হঠাৎই বললেন, “আর রাত করবেন না আপনারা। সাবধানে বাড়ি যান। অপদেবতাকে কোনও বিশ্বাস নেই। সবাই চাতাল ছেড়ে উঠে পড়ল। পরিমল সামন্তর তাড়া থাকায় আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে আসছি’ বলে চটপট পা চালিয়ে রওনা হয়ে গেলেন। পোস্ট-অফিসের কেরানি রাজেন তপাদার মন্তব্য করলেন, কাল রাতে সদ্য একটা গোরু মেরেছে—আজ কি আর পিশাচ বাবাজির তেষ্টা পাবে? মাস্টারমশাই তো দেখি ভয় পেয়ে পালালেন’

তপোময় বললেন, পিশাচের তেষ্টা তো আর মানুষের মতো নয়। তেষ্টা পেলেই হল। রাজেন মিহি গলায় হেসে উঠলেন, বললেন, ‘হা–তা যা বলেছেন, বলদের ব্লাড আর মানুষের ব্লাড-দুটোর টেস্ট কি আর এক হয়! চলুন, চলুন, পা চালিয়ে চলুন..’ শ্ৰীপতি সরকারের ম্যানেজার রতন বসাক মন্তব্য করলেন, ‘রক্ত পিশাচরা আবার সবরকম ব্লাড টেস্ট করা পছন্দ করে। কিন্তু এ-কথা শুনে কেউ হাসল না। অমল রায় বললেন, ঠাকুরমশাই, একটা রিকোয়েস্ট করব?

‘বলুন-‘

‘আপনি মন্দিরে আর একা একা শোবেন না। গাঁয়ে যা শুরু হয়েছে.কিছু তো বলা যায় না’

হাসলেন তপোময়, পইতেটা ধরে বললেন, ‘এটা যতক্ষণ আছে ততক্ষণ কোনও ভূতপ্ৰেত ডাকিনি-যোগিনী আমার কিছু করতে পারবে না। আপনারা তাড়াতাড়ি রওনা হয়ে যান-‘

ওঁরা পাঁচজন আর দেরি করলেন না। জল-কাদা মাড়িয়ে মেঠো পথ ধরলেন। আকাশে ঘন মেঘ। বৃষ্টি নামতে পারে যে-কোনও সময়। এখানে-সেখানে জল জমে আছে। ব্যাঙের ডাক তো নয় যেন কানফাটানো গর্জন।

রাজেন তপাদার হঠাৎই জিগ্যেস করলেন, ‘আচ্ছা অমলদা, বর্ষার পর এই ব্যাঙের পাল কোথায় যায় বলতে পারেন ?

“হ্যাঁ পারি।

বর্ষার পরে ওরা বাড়ি চলে যায়। অমল রায় সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে জবাব দিলেন। বাড়ি?’ আর সবাই অবাক হয়ে তাকালেন বৃদ্ধ অমল রায়ের মুখের দিকে।

হ্যা, যমের বাড়ি।’ বলেই হো-হো করে হেসে উঠলেন অমল রায়। ওঁর হাসি পুরোপুরি থেমে যাওয়ার আগেই একটা গর্জন শোনা গেল—যেন রাগের চাপা গর্জন।

পাঁচজনের ছোট দলটি পিছন ফিরে তাকাল। অন্ধকারে সেরকম কিছু ঠাহর করা গেল না। আকাশে মেঘের ফোঁকর দিয়ে চাদের একটা সরু ফালি দেখা দিয়েছে ঠিকই কিন্তু নানান ঝোপ আর গাছপালা সেটাকে আড়াল করেছে। চাপা গর্জনটা আবার শোনা গেল। সেইসঙ্গে কাদা জলে কেউ যেন ছপছপ করে পা ফেলল। শব্দ শুনে মনে হল, পায়ের মালিকের শরীর বেশ ভারি। রতন বসাক হঠাৎই বলে উঠলেন, কিছু শুনতে পাচ্ছেন?’ পাচ্ছি।’ অমল রায় বললেন।

রাজেন তপাদার ঠাট্টা করে হাসলেন, বললেন, ‘দুর মশাই! এ হল রজ্জুতে সর্পভ্রম। নেহাতই কুকুর টুকুর হবে। সামান্য দু টুকরো ঘেউঘেউ শুনেই ভয় পেয়ে গেলেন।”

রাজেনের ব্যঙ্গের উত্তরে সবাইকে অবাক করে অমল রায় দৌড়তে শুরু করলেন। তার দেখাদেখি রতন বসাক এবং আরও দুজন সঙ্গী। রাজেন পিছন থেকে চেচিয়ে ডেকে উঠলেন, কী হল? কী হল?’

বৃদ্ধ-পায়ে ছুটতে -ছুটতেই অমল রায় বলে উঠলেন, কিছু হয়নি। শুধু তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে।’

সামান্য গর্জন শুনে বয়স্ক মানুষগুলো কী অদ্ভুত তেজে ছুটে পালিয়ে গেল! আশ্চর্য ভিতু তো! পিশাচ কি গাছে ফলে যে যেখানে-সেখানে ঘুরঘুর করবে।

রাজেন তপাদার যখন এইরকম ভাবছেন ঠিক তখনই বৃষ্টি শুরু হল। আর একইসঙ্গে একটা চাপা গর্জন শোনা গেল ওঁর ঘাড়ের ঠিক কাছটিতে। একটা জান্তব গন্ধও পেলেন। কিন্তু মুখ ফিরিয়ে তাকানোর আগেই ধারালো নখওয়ালা একটা লোমশ থাবা এক আঘাতে ওঁর কাধ এবং মুখের খানিকটা নামিয়ে দিল। রাজেন তপাদারের শেষ চিন্তাটা ছিল ঃ ‘কুকুরটা অস্বাভাবিক বড় তো’।

আতঙ্কে গোটা গ্রাম পাগল হয়ে গেল। পরিমল সামন্তের যুক্তি বুদ্ধি সবই কেমন তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল। তিনি স্কুল ছুটি হওয়ার পরই চলে গেলেন শীতলা মন্দিরে। আধঘণ্টা হল বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু আকাশ মোটেই পরিষ্কার হয়নি। গাছগাছালির পাতায় জলের ফোটা।

মন্দিরের চাতালে কয়েকজন পুরুষ আর মহিলা বসেছিলেন। এখনই কোনও বিহিত না হলে মন্দিরে ভিড় আরও বাড়বে। মন্দিরের পাশে আর পিছনে বেশ কয়েকটা ঝুপসি গাছ। তারই একটার নীচে টিউবওয়েল। কল পাম্প করে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের বালতিতে জল ভরছিলেন তপোময় চক্রবর্তী। পরিমল সামন্ত তার কাছাকাছি এগিয়ে যেতেই পাম্প করা থামিয়ে তপোময় জিগ্যেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, মাস্টারমশাই?’

আর ব্যাপার। আজ আছি, কাল নেই। আপনি আর কত দেরি করবেন?

‘দেরি মানে!

ভেতরের ছায়ার কোনও খোজ পেলেন?’

‘এখনও পুরোপুরি পাইনি, তবে একজনকে আমার সন্দেহ হয়। আমার মন্দিরে সে বারকয়েক এসেছে। আপনাকে ব্যাপারটা সামান্য খুলে বলি।’

পরিমলের কাছে চলে এলেন তপোময়। চাপা গলায় বললেন, রাজেন তপাদার খুন হওয়ার পর আমি আর দেরি করিনি। আমার মন্দিরের বাইরেটায় একটা আলো লাগিয়েছি—মন্ত্ৰপূত আলো। ওটা এমনভাবে লাগিয়েছি যে, কেউ মন্দিরের দরজার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালে কিংবা বসলে তার ভেতরের ছায়াটা পুবের দেওয়ালে গিয়ে পড়বে। তো গত পরশু একটা খারাপ ছায়া আমি দেখেছি—কিন্তু পুরোপুরি জমে ওঠার আগেই ছায়াটা লুকিয়ে পড়ল। আজ রাতেও সেই মানুষটার আসার কথা আছে, .।’

‘লোকটা কে জানতে পারি, ঠাকুরমশাই?’

হাসলেন তপোময়, বললেন, ‘ক্রোধ সংবরণ করুন, মাস্টারমশাই। যদি আমার সন্দেহ সত্যি হয় তা হলে তাকে কুপথ থেকে সুপথে আনতে হবে,তার ভেতরকার পিশাচকে ধ্বংস করে তাকে নবজন্ম দিতে হবে..’

একটু ইতস্তত করে পরিমল বললেন, ‘একজনকে আমারও সন্দেহ হয়..’ কাকে?’ ‘এখন না, পরে বলব।

নরম করে হাসলেন ঠাকুরমশাই ঃ ‘বলতে হবে না। হয়তো দেখবেন, একই লোককে আমরা দুজনে সন্দেহ করছি। আপনি রাতে একবার আমার কাছে আসতে পারবেন, মাস্টারমশাই?’

কৌতুহল পরিমলকে পাগল করে দিচ্ছিল। তাই তাড়াতাড়ি মাথা হেলিয়ে তিনি বললেন, ‘কেন আসব না। নিশ্চয়ই আসব।’

শনশন করে জোলো বাতাস বইছিল। গাছের পাতা থেকে টপটপ করে বৃষ্টির জল ঝরে পড়ছিল। কোথাও একটা কাঠঠোকরা গাছের গুড়িতে ঠোকরাচ্ছিল । ঠক ঠক-ঠক-ঠক।

আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হল, রাতে ভালো রকম বৃষ্টি হতে পারে। চলে আসার আগে হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ে গেল পরিমল সামন্তর। তাই ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘রাজেন তপাদারের হাতের মুঠোয় কালো রঙের লোম। পাওয়া গোছে..আপনি শুনেছেন তো?”

শুনেছি ঃএকটা দীঘশ্বাস ফেললেন ঠাকুরমশাই ‘অপদেবতার ভরে মানুষের চেহারার অনেকরকম পরিবর্তন হয়। হয়তো কেউ মানুষ থেকে নেকড়ে হয় গেল-কিংবা চিতাবাঘ-সবই মায়ের লীলা। আপনি সাড়ে সাতটা কি আটটা নাগাদ আসুন মাস্টারমশাই। এই ফাকে আমি পুজো-আচ্চার কাজটুকু সেরে নিই।” পরিমল সামন্ত ফেরার পথ ধরলেন।

ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় বিকেলের ঘোলাটে আলোকে তিনি অভিশাপ দিচ্ছিলেন। যদি সূর্যটা আকাশে থাকত তা হলে মাটিতে ঠাকুরমশাইয়ের একটা ছায়া অন্তত পাওয়া যেত। তারপর ছায়ার আকৃতি-প্রকৃতি দেখে হিসেব করা যেত সেটা বাইরের না ভেতরের। সূর্যের আলো তেমন পবিত্র না হলেও অপবিত্র তো আর নয়! না, অপদেবতার ব্যাপার যদি এটা হয় তা হলে কাউকেই সন্দেহের বাইরে রাখা যাবে না। এমনকী নিজেকেও না।

তোড়ে বৃষ্টি নেমেছে। ছাতা মাথায় দিয়েও কাকভেজা ভিজে গেছেন পরিমল সামন্ত। জামা-প্যান্ট ভিজে সপসপ করছে। হাওয়াই চটিটার একটা ফিতে বারবার খুলে যাচ্ছে। আকাশে বিদ্যুৎ বিলিক দিল। তার একটু পরেই মেঘের গর্জন। মন্দিরের চাতালে উঠে ছাতা বন্ধ করলেন পরিমল। দেখলেন, মন্দিরের দরজার। পাশে নতুন একটা বা ঝুলছে। সেই জ্বলন্ত বাল্ব থেকে তিনটে বেলফুলের মালা ঝুলছে। এটাই তা হলে সেই মন্ত্ৰপূত আলো!

পায়ের শব্দ পেয়েই ঠাকুরমশাই মন্দিরের ঘণ্টাটা একবার জোরে বাজিয়ে দিলেন। তারপর দরজায় এসে গলা বাড়াতেই পরিমলকে দেখতে পেলেন। “এটাই সেই আলো মাস্টারমশাই। এটার কথাই আপনাকে বলেছিলাম। দাঁড়ান, ধুনুচিটা নিয়ে আসি।”

পরিমল আলোটার কাছে গিয়ে দাড়ালেন। তারপর ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন পুবের দেওয়ালের দিকে। নিজের ছায়াকে কি বিশ্বাস করা যায়। উহু, ছায়াটাতো দিব্যি স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে।

ধুনুচি নিয়ে এসে জলন্ত বালবটার সামনে দাঁড়িয়ে আরতি করতে শুরু করলেন তপোময়। আর একইসঙ্গে বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র পড়তে লাগলেন। পরিমল সামন্তর ভীষণ অবাক লাগছিল। ধুনোর গন্ধে কেমন যেন নেশা ধরে যাচ্ছিল। আরতি আর মন্ত্ৰ কি বালবের আলোটাকে পবিত্র করছে।

কয়েক মিনিট পর তপোময় ধুনুচি নামিয়ে রেখে বললেন, মাস্টারমশাই , এবারে বলুন, কাকে আপনার সন্দেহ হয়। কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেন পরিমল। তারপর বললেন, ‘হরেন সেনাপতিকে। ওই যে, তরুণ ব্যায়ামাগারের ব্যায়ামবীর..’

তপোময় চক্রবর্তীর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ লক্ষণ ভালো নয়। পিশাচতিথির যোগ রয়েছে।”

কাকে আপনার সন্দেহ হয়, ঠাকুরমশাই?’ অধৈর্য সুরে জানতে চাইলেন পরিমল। ওঁর ভেতরে কেমন একটা রাগ তৈরি হচ্ছিল। পরিমলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন তপোময়। তারপর বললেন, এখনও বুঝতে পারেননি?’

পরিমল বোকার মতো মাথা নাড়লেন। না, তিনি বুঝতে পারেননি। পুবের দেওয়ালে আপনার ছায়াটার দিকে ঘুরে তাকান..। আচমকা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। কান ফাটানো শব্দে বাজ পড়ল খুব কাছেই।

বাজ পড়ল পরিমলের বুকের ভেতরেও। নিশির ডাকে পথচলা মানুষের মতো ধীরে-ধীরে দেওয়ালের দিকে ঘুরে দাঁড়লেন। তিনি। ওই তো ছায়াটা! আগের চেয়ে কি একটু বদলেছে? পিছন থেকে তপোময় বললেন, মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন। ছায়াটা একটু একটু করে বদলাচ্ছে না?’

সত্যিই তো! ছায়াটা মাপে বড় হচ্ছে যেন!

পরিমল সামন্তর বুকের ভেতরে উথালপাথাল শুরু হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে ছায়াটার পরিবর্তন লক্ষ করতে লাগলেন তিনি। কেমন একটা অপরাধ বোধে মন ছেয়ে গেল।

পিছন থেকে ঠাকুরমশাই কথা বলতে লাগলেন, ‘এ একটা অদ্ভুত অসুখ, মাস্টারমশাই। বিজ্ঞান এর কোনও জবাব দিতে পারে না। হঠাৎ হঠাৎ কোনও-কোনও মানুষের ওপরে পিশাচের ভর হয় তখন সে হয়ে যায় নরপিশাচ। সেই অবস্থায় সে যেসব কুকাজ করে পরে সেসব তার ভালো করে মনে থাকে না। কখনও সে সুস্থ মানুষ, আবার কখনও সে অসুস্থ নরপিশাচ। এই অসুখ যেমন হঠাৎ করে হয়, তেমন হঠাৎ করেই আবার মিলিয়ে যায়। এর ওপরে কারও কোনও হাত নেই। আমি আর কী করব বলুন। সবই মায়ের ইচ্ছে’

পরিমলের চোখের সামনে ছায়াটা এখন অনেকটা বদলে গেছে..লম্বায় চওড়া বেড়ে উঠছে ধীরে-ধীরে। ঠাকুরমশাই তখনও বলে চলেছেন, যখন মানুষটা পিশাচ হয়ে যায় তখন তার ভেতরের ছায়া আর বাইরের ছায়াটা এক হয়ে যায়।

ঠাকুরমশাইয়ের কথা কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে না? একইসঙ্গে একটা জান্তব একটা গন্ধ পরিমলের নাকে এল। চিড়িয়াখানায় বাঘের খাচার সামনে যে-গন্ধ পাওয়া যায়, অনেকটা যেন সেইরকম। কী মনে হতেই ঘুরে তাকালেন পরিমল। এবং পাথর হয়ে গেলেন।

তপোময় চক্রবর্তীকে আর চেনার উপায় নেই। ওঁর হাতে-বুকে গজিয়ে উঠেছে ঘন কালো লোম। চোয়ালটা লম্বা হয়ে বেরিয়ে এসেছে। দু-পাটি ধারালো দাঁতের ফাক দিয়ে বেরিয়ে আছে লাল টুকটুকে লম্বা জিভ। জিভ দিয়ে লালা ঝরছে। কানের ওপর দিকটা ছুঁচলো হয়ে গেছে। আর চোখ দুটো ঘোলাটে হলুদ,তার মধ্যে চোখের মণি দুটো কালো ফুটকি।

পবিত্র আলোর সঙ্গে একই সরলরেখায় দাড়িয়ে ছিলেন তপোময় আর পরিমল। সেই জন্যই পরিমল বদলে-যাওয়া ছায়াটাকে নিজের ছায়া । বলে ভুল করেছেন। আসলে ওটা ছিল ঠাকুরমশাইয়ের ছায়া।

আকাশের দিকে মুখ তুলে মাথা ঝাকিয়ে ভয়ংকর এক গর্জন করে উঠল লোমশ দানবটা। ঘোর বর্ষার শব্দে সে-আওয়াজ গ্রামের আর কারও কানে কি গেল না কে জানে! নরপশুটার প্রথম হিংস্র আঘাত যখন পরিমলের কানের পাশে আছড়ে পড়ল। তখনও পরিমল ভাবছেন, এ হতে পারে না। এ নিশ্চয়ই স্বপ্ন কিংবা মায়া। বিকট শব্দে বাজ পড়ল আবার।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত